হেঁড়ল

হেঁড়ল

হামিরউদ্দিন মিদ্যা

ধর! ধর! ধর! ছাগল নিয়েছে রে! হেঁড়লে ছাগল নিয়েছে!

সবেমাত্র খাওয়া-দাওয়া করে সারাদিন খেতে-খামারে খেটে আসা ক্লান্ত মানুষগুলো শুয়েছে, ঠিক তখনই বাগদীপাড়া থেকে সমস্বরে হইচই করে মাঠে নেমে এল কয়েকজন। হাতে টর্চ, লাঠি, কেউবা খালি হাতেই বেরিয়ে এসে ইঁটের টুকরো, শুকনো ঢিল তুলে নিয়েছে হাতে।

অঘ্রাণ শেষ হয়ে পৌষ মাস পড়ে গেল। বুকে লাড়া নিয়ে জমিগুলো চিৎ হয়ে পড়ে পড়ে শিশির খাচ্ছে। কেলে বাগদী ঘরের সামনে যে মাঠটার লাড়াগুলো কোঁদাল দিয়ে চেঁছে পরিস্কার করে, অস্থায়ী খামার করেছে সেখানে খড়-পোয়াল জ্বেলে আগুন পোহাচ্ছিল কয়েকজন।

হঠাৎ চিৎকার চেঁচামেচি শুনে আগুনের ওম ছেড়ে সবাই উঠে পড়ল। কেলে, গণা, বংশে বাগদী ছাড়াও  হাসু মন্ডলও গুটিসুটি মেরে আগুনের কাছে বসেছিল। বাগদী পাড়াটা মুসলমান পাড়ার কাছ ঘেঁষে। হাসু খেয়েদেয়ে রোজকার মতোই একটু পায়চারি করতে বেরিয়েছিল, আগুন পোহাতে দেখে হাত পা-গুলো আঁচে সেঁকার লোভ সামলাতে পারেনি।

আগুন ফেলে রেখেই সবাই মাঠে নেমে পড়ল। এদিক সেদিক টর্চের আলো পড়ছে।দলটার কাছাকাছি পৌঁছে হাসু জিজ্ঞেস করল, কার বাড়ির ছাগল নিয়েছে রে?

-আর বল না কত্তা! আমাদের সেই পাঁইশে রঙের ছাগল-ছা’টা ধরেছে গো! শালার হেঁড়ল কয়েকদিন ধরেই তক্কে তক্কে ছিল।গোহালের ভেতর ছাগলগুলো ভরে  টর্চটা আনতে গেছি, এসে সব গোঁজে বাঁধব ভেবেছি। গিয়ে দেখি ছাগল হাপিস! লেউলের বাঁশতলায় ছাগলটা একবার ভ্যাবালেক। ছুটে গেলাম, সেখানেও নাই!

কথাগুলো হাফাতে হাফাতে বলল ভক্তে বাগদী। দলের মধ্যে ভক্তের বউ চম্পাও আছে।

-চল, চল। আখবাড়ির ভিতরটা একবার দেখে আসি। কয়েকজন তেঁতুলের ঝোপটার কাছে গিয়ে দেখ। আর কী জিয়ন্ত রাখবেক!তবু বলা যায় না, হইচই শুনে যদি ভয়ে ছেড়ে দিয়ে পালাইছে। হাসু মন্ডল নির্দেশ দিয়েই, লুঙিটা সেঁটে, চম্পার হাত থেকে লাঠিটা কেড়ে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে আখবাড়ির দিকে দৌড় লাগাল। ভক্তের ব্যাটা, আর চম্পাও হাসুর পিছু নিল।

ধানকাটা ফাঁকা মাঠের মধ্যে হন্তদন্ত হয়ে ছুটছে ওরা। আকাশে ভাসা মেঘ পাকা ধান রঙা চাঁদটার গা একবার করে ঢেকে দিয়েই কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের ধারে ধারে তাল, খেঁজুর আর বাঁশবনের মাথায় অন্ধকারটা কেলে সাপের মতো ফণা তুলে আছে। পিছন ফিরে দেখার সময় নেই কারও। মশ্ মশ্ পা ফেলে সিংদের আখবাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পাশের গ্রাম কুসুমডোবার সিংবাবুরা কয়েকঘর আখ লাগিয়েছে।

রাঢ় বাংলার গাঁ-গ্রামে ধান পেকে এলে এমনিতেই শিয়াল, খঁটাশ, হেঁড়লের উপদ্রব।তার উপর মাঠগুলো ফাঁকা হলে বাসস্থান হারিয়ে, খাবার জন্য হা-পিত্যেশ করে ঘুরে মরে। শুকনো মাঠে তো আর নিশাচর পাখি, বা বালিহাঁস, বাচকা-বক মেলে না! তখন গ্রামের ভেতর ঢুঁ মারে। শেয়ালে দরমা ফাঁক করে হাঁস-মুরগির টুঁটি ধরে নিয়ে যায়, হেঁড়লে ছাগল ছানা। একসাথে দু’-তিনটে এলে ধাড় ছাগল নিয়ে যাওয়াও তাদের কাছে কিছুই নয়।

চম্পার বুকটা ঢিপ ঢিপ করছে। রাতদিন খেটেখুটে কত কষ্ট করে সংসারটা দাঁড় করিয়ে রেখেছে। মরদটা খাবার সময় খায়, আর রোজ মদ মারে। ছেলেটা ইস্কুলে পড়ছে। পড়াশোনা বাদ দিয়েও কখনো মাঠে শীষ কুড়িয়ে, ইঁদুরের গর্ত খুঁড়ে ঝুরো ধান বের করে ঘরে আনে। জ্বালনটা-কুটোটা জোগাড় করে। সংসারের হাল ফেরানোর উদ্দেশ্যেই চম্পা হাসু মন্ডলের বউয়ের কাছ থেকে একটা ছাগল ভাগে নিয়েছে। দুটো ছানা হলে একটা চম্পার, আর একটা ধার সমেত ফেরত দেবে, এই শর্তে।

সেই ধার ছাগলটারই একটা ছানা হেঁড়লে নিয়েছে। কাজকর্ম সেরে এসেও মাঠ থেকে চারটি ঘাস ছিঁড়েখুঁড়ে এনে ছাগলটার মুখের সামনে দেয় চম্পা। ছেলেটা বটের ডাল, শ্যাওড়া পাতা এনে খাওয়ায়। তবেই গতরটা লেগেছিল ধাড়টার। কয়েকমাস পর গোব্বিন হল। ভগবানের ইচ্ছায় দু’-দুটো হালোয়ান ছানা হল। ঘাস-পাতা খেলেও এখনো মায়ের দুধ ছাড়েনি।

চম্পা মন্ডলগিন্নীকে কথামতো ধার সমেত একটা ছানা ফেরত দিতে গিয়েছিল।মন্ডলগিন্নী বলল, আর একটু ফর-ফরে হোক চম্পা। এত ছোট ছা’ আমরা মানুষ করতে পারবনি। তুর কাছেই আর কিছুদিন থাক।

চম্পা ঠিক করেই রেখেছে পাঁইশে রঙা ছানাটা তার, আর কালো রঙেরটা মন্ডলগিন্নীকে দেবে। কিন্তু ভাগ্যের কী লিখন, মরার হেঁড়লে নিল নিল, চম্পার শখের ছাগলটায় নিল!

আখবাড়ির কাছে পৌঁছে হাসু তিন ব্যাটারির টর্চটা মারল। মুখে শব্দ করল, হেয় হুট, হাট।হাতে তালি মেরে চম্পা, চম্পার ব্যাটাও জোরে জোরে শব্দ করে মুখে অদ্ভুত আওয়াজ করতে লাগল। যাতে হেঁড়ল ভয়ে ছাগল ছেড়ে পালায়।

নেকড়ে বাঘের মতো দেখতে শেয়ালেরই এক হিংস্র প্রজাতি হেঁড়ল। ফাঁকা মাঠে মানুষকে সামনে পেলেও আক্রমণ করতে পিছ-পা হয় না। ছাগল ধরলে সঙ্গে সঙ্গে মেরে ফেলে না।গোহাল থেকে ঘাড়ে বা কানে ধরে চড়চড় করে টেনে সুবিধা মতো জায়গায় নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলে। পরের দিন সকালে হাঁড়-পাজরার টুকরো, পায়ের খুর আর দাঁত কপাটিটা ঝোপেঝাড়ে  পড়ে থাকতে দেখা যায়।

শব্দ শুনেও কেউ বেরিয়ে এল না।চ ম্পা এবার ডাকল, মতি-ই-ই! আ,আ,আ…

এই ডাক শুনে ছাগল ছানাটা যেখানেই থাকুক, ম্যাঁ ম্যাঁ করে ভেবিয়ে একছুটে চম্পার কাছে চলে আসত। এখন চম্পার ডাকটা ফাঁকা মাঠে ঘুরতে ঘুরতে নিজের কানেই ফিরে এল।

হাসু টর্চ জ্বেলে আখবাড়ির চারিধার ঘুরে দেখছে। গ্রামের বড় চাষী সে। বিঘে বিঘে ধানিজমি। খামারে বড় বড় ধানের মরাই বাঁধে। নিজেদের পুকুর, ইঁটভাটা, ট্রাক্টর গাড়ি সব আছে। খেতে-খামারে বারোমাস অনেকগুলো  মুনিষ খাটায়।

চম্পার মরদ ভক্তে বাগদী শুধু ইঁটের পাঁজা করার সময় ইঁট কাটে। চম্পা চাষের সময়ে হাসুর খেতে-খামারে কাজ করে। সেই রাশভারি মানুষটা এখন চম্পার মতো তুচ্ছ এক মেয়ে মানুষের ছাগল ছানা খুঁজতে এসেছে আখবাড়িতে! তাও আবার কনকনে শীতের রাতে! চম্পার কেমন সন্দেহ হয়।আধবুড়ো হাসুর যে তার গতরটার দিকে বহুদিনের নজর, তা চম্পাকে হাবেভাবে, আকারে-ইঙ্গিতে বুঝিয়েছে। চম্পা পাত্তা দেয়নি। তবুও হাল ছাড়েনি হাসু।

চম্পা একবার হাসুর গোহালে বসে বঁটি দিয়ে গোরুর জন্য খড় কাটছিল, হাসু সুর সুর করে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল। লোভার্ত চোখে দেখছিল তাকে। চম্পা পেছন পানে তাকাতেই চমকে উঠেছিল। শাড়ির আচলটা ঠিক করে কাঁপা কাঁপা গলায় বলেছিল, কিচু বলবে কত্তা!

মুখে কেমন একটা হাসি এনে হাসু মন্ডল বলেছিল, খড়-টড় লাগলে নিয়ে যাবি চম্পা।গিন্নীকে বলার দরকার নাই। যা দরকার আমাকে বলবি।

সেই থেকে হাসু চম্পার পেছনে ছুঁকছুঁক করে। চম্পা নিজেকে ধরা দেয় না। শুধু একটু খেলা করে। তাতেই অনেক কিছু পায় সে। ধানের সময় পোয়াল ঝাঁড়া দু’-এক মন ধান গিন্নীর চোখের আড়ালে হাসু কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দেয় চম্পার বাড়ি।

হঠাৎ আখবাড়ি থেকে অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে এল একটা কালো মূর্তি। বেরিয়েই গ্রামের দিকে ভং ভং করে ছুট লাগাল। মরণ দৌড় দিয়েছে। ব্যপারটা এতো তাড়াতাড়ি ঘটল যে, মুখটাও ঠিক মতো বোঝা গেল না।চম্পাও ছুটতে দেখল। তারপর হাসুর চোখাচোখি হল। হাসুর সেই ক্ষমতা নেই, যে ছুটে গিয়ে ধরবে।

চম্পার ব্যাটা বলল, লোকটা এমন খ্যাপার মতন ছুটছে কেনে মা?

হাসু বলল, চুপ করে দাঁড়া, আমি দেখছি।

শীতের রাতে এমন নির্জন জায়গায় মানুষটা কে ছিল? আর আখবাড়িতেই বা কী মতলবে! কেউ বুঝে উঠতে পারল না।

চম্পা বলল, আখ চুরি করতে এইছেল মনে হয়।

হাসু বলল, আখ চুরি করলে এমন দৌড় মারার কী আছে! আর আমাদের কথাবার্তা তো কানে গেছে। আমরা যে মালিক লয়, এটা তো নিশ্চয়ই টের পেইছে।

চম্পা বলল, ভিতরটা দেখোদিনি কত্তা।আমার তো মনে হচ্চে আরও কেউ আছে।যদি অনুমান সত্যি হয়, থাকারই কতা।

-ঠিকই বলেছিস। তুরা দাঁড়া আমি ঢুকে দেখছি।

দু’ধারে আখের সারি, মাঝে জল পেরনোর সরু দাঁড়া। সেই ফাঁক দিয়ে কোনোরকম হাসু শরীরটাকে গলিয়ে দিয়ে ভেতরে তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগল। কত বড় খেত! বিঘে তিনেক হবে।হ ঠাৎ টর্চের আলোটা অনেক দূরে একটা ঝাঁকাল আখ গাছের গোড়ায় থমকে গেল। একটা শাড়ি পরা মেয়ের পিঠের দিকটা নজরে পড়েছে। হাসু কাছে গিয়ে দাঁড়াল। মাথাটা নীচে নামিয়ে গুটিসুটি মেরে বসে আছে মেয়েটা। ভয়ে থর-থর করে কাঁপছে। পেছন থেকে চুলের মুঠি ধরে মুখটা সামনের দিকে করল হাসু। দেখেই চমকে উঠল! জনবালি সেখের বিধবা মেয়ে লাইলি!দু’-বছর হল স্বামীর মাথা খেয়ে ভাইদের ঘরে ঠাঁই নিয়েছে। বাপটা অভাগা মেয়েটাকে আর কোথাও উদ্ধার করতে পারেনি। নাতিটার নামে বিঘে দেড়েক ধানিজমি লিখে দিয়েছে।মরদের মতো খেটেখুটে পেটের ভাতটা জোগাড় করলেও শরীরের খিদে মেটাবে কে!

চম্পা আখবাড়ির বাইরে থেকে হাঁক পাড়ল, কিছু পেলে কত্তা?

হাসুর মনে অন্য এক ফন্দি মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। জেগে উঠল সুপ্ত ইচ্ছাটা।লাইলির থর থর করে কাঁপতে থাকা শরীরটার দিকে তাকিয়ে চোখগুলো কেমন চকচক করে উঠল। ঢোক গিলে বলল, কই! কেউ নাই তো!

লাইলি ফিসফিস করে বলল, বাঁচালে কত্তা।

হাসু বলল, একদম নড়িস না। আমি যাব আর আসব। কথার অমান্য যদি করিস, তাইলে ভালো হবেক নাই কিন্তু! সব ফাঁস করে দিব। গাঁয়ে টিকতে পারবি নাই।

আখবাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল হাসু। সারা গায়ে কুটোকাটা, মাকড়সার জাল লেগেছে।ছাড়াতে ছাড়াতে বলল, মনে হয় আমাদের কথাবার্তা শুনে মেয়েটা আগেই সুরসুর করে কেটে পড়েছে। না হলে ওসব কিছু লয়, আখ চুরি করতেই এসেছিল লোকটা।

চম্পা বলল, আখ চুরি লয় কত্তা। আমি এবার বুঝতে পেরিচি। ওই ছোড়া মেহের আলীর নাতি। সেই চুলে লাল রঙ করেছে গো, ওই নাতিটা। কী যেন নাম!

-জমিরউদ্দিন?

-হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। উয়ার সাথেই তো লটরপটর। তুমি তো উ ধারে ছিলে, মুখটা তেমন দেখনি। আঁধারে দেখলেও আমি ঠিক চিনেছি।

-উ এখানে কী করবেক?

-ন্যাকা! জানো না বুজি! গোটা গাঁ জানে সে কতা! তুমাদের সেখপাড়ার বেধবা মেয়েটা গো, ওই ছেমড়িই তো ছোড়ার মাথাটা খেইচে। আমি একদিন বার বসতে উঠে দেখেছেলম, রেতের বেলা গুটগুট করে মাঠের পানে যাচ্চে দু’টিতে। কাউকে কিচু বলিনি। সোয়ামি নাই যার, তার কেউ নাই।শরীলের খিদের জ্বালা সইবে কেমন করে!

চম্পার মুখে শরীর, লটরপটর এই শব্দগুলো শুনে হাসু মন্ডলের বয়সটা যেন রাতারাতি কমে যেতে থাকে। মনেপ্রাণে ভর করে সেই যুবক বয়সের তীব্র বাসনা। গা-টা শিরশির করে ওঠে। ছাগল খোঁজার কথা ভুলে গেল হাসু।

চম্পার ব্যাটা একটা আখ ভেঙেছে। এমন মোক্ষম সুযোগ হাত ছাড়া করেনি। রাতের বেলাতেই মুখে দিয়েছে। ছাল ছিঁলে চিবোতে চিবোতে পিছনে পড়ে যাচ্ছে।

চম্পা ডাকল, টপটপ আয় লালু।

হাসু বলল, তুই চিন্তা করিস না চম্পা।ছাগলটা না পেলে, বাকি ছা’টা তোকেই দিয়ে দিব। কী আর করবি! উপরওয়ালার মার!

মাঠের পূর্ব ধারে তেঁতুলের ঝোপ। বহুবছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা আদ্যিকালের তেঁতুলগাছ, তাকে ঘিরেই লতাগুল্মর বেষ্টনী।ডালপালার বিস্তার বিশাল! যত রাজ্যের পাখিরা এসে বাসা করেছে। মাঠের মুনিষরা গ্রীষ্মের দিনে খেত থেকে উঠে এসে ছায়ায় জিরোয়। সেই ঝোপে হেঁড়ল বাবাজীর ঘাপটি মেরে বসে থাকা অসম্ভব নয়। কয়েকজন সেখানেও খুঁজতে গেছে। হঠাৎ সেদিক থেকেই ওদের ‘ধর! ধর!’ চিৎকার শোনা গেল। তাহলে হেঁড়লটা ও’ধারেই ঢুকেছে!

চম্পার ব্যাটা আধখাওয়া আখটা ফেলে দিয়েই ছুটতে আরম্ভ করল। চম্পাও হনহন করে এগিয়ে গেল।

হাসু পিছু ডাকল, লাঠিটা নিয়ে যা চম্পা। আর দৌড়তে পারছি নাই। তুরা যেয়ে দেখ ছাগলটা পেলেক কিনা। আমি ঘর চললাম।

পৌষের শীত ফাঁকা মাঠে বতর পেয়ে যেন পিঠে চাবুক মারছে। হাত পা-গুলো শীতে কনকন করে উঠলেও, হাসুর রক্তটা ফুটছে টগবগ করে। যুবক বয়সের সেই তেজ যেন ঢুকে পড়েছে শরীরে।

চম্পাকে তেঁতুলের মাঠের দিকে চলে যেতে দেখে হাসুর বুক ঠেলে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। হেঁড়লের মুখ থেকে ছাড়া পাওয়া ছাগলের মতো চলে যাচ্ছে চম্পা।

হাসু এবার আখবাড়ির দিকে গুটিগুটি পা বাড়াল। আর একটু পৌঁছে গেলেই শীত ভাবটা কেটে যাবে। যত কাছাকাছি পৌঁছায়, খিদেটা ততই তীব্র হতে থাকে।

আখবাড়ির কাছে এসে হাসু ডাক পাড়ল, কই গো লাইলি!

ভেতর থেকে কোনো সাড়া-শব্দ ভেসে এল না। বুকটা ধক করে উঠল হাসুর! চোখে ধুলো দিয়ে পালাল নাকি!

খ্যাপা মোষের মতো আখের পাতা-ফাতা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল হাসু। যেখানে লাইলি মুখ গুঁজে বসে ছিল, দেখল সেখানটাও ফাঁকা। রাগে অভিমানে অতৃপ্ত আত্মাটা ফুঁসে উঠল-নচ্ছার মেয়ে কোথাকার!

খেত থেকে বেরিয়ে এল হাসু।বার কয়েক লাইলির নাম ধরে জোরে জোরে ডাকল।শরীরের উষ্ণ রক্তটা এবার জুড়িয়ে যেতে বসেছে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর একবুক হতাশা নিয়ে গ্রামের দিকে পা বাড়াল। শীতের এই কনকনে রাতে এই সময় হাসুকে দূর থেকে যদি কেউ দেখে, নির্ঘাত ভাববে একটা হেঁড়ল হেঁটে আসছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত