ফাঁস

সন্ধে ঘনিয়ে এলেও অন্ধকারটা মালুম হচ্ছে না আর। বালবের হলুদ আলো গুড়ো গুড়ো হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। প্যান্ডেলের দোকানের লোকজন কিছুক্ষণ আগেই খামারে বাঁশ, তিরপল, চেয়ার-টেবিল নামিয়ে দিয়ে গেছে। ছোট খালার ব্যাটা গাছে চেপে মাইকের চোঙা বাঁধতে ব্যস্ত। খুব একটা কুটুমজন আসেনি আজ।নদীপাড়ের ছোটখালারা এসেছে, আর বড়খালার বিয়ে হয়েছে তো এই গ্রামেই। বিপদ-আপদ, শুভকাজে সর্বক্ষণ নানাদের বাড়িতেই পড়ে থাকে। মা আর ভাইকে নিয়ে আমি এসেছি কাল বিকালে। আব্বা একটু বাইরে গেছে, বিয়ের দিন আসবে।

বড়মামার মেয়ে রুবিনার বিয়ে। রোগা-প্যাটকা টিংটিঙে মেয়েটা এই সেইদিনে হাফপ্যান্ট আর টেপ পরে ঘুরে বেড়াত। সবার চোখের অগোচরে এরই মধ্যে বিয়ের উপযোগী হয়ে উঠল! টের পেলাম দিন কেমন পানির মতো গড়িয়ে যাচ্ছে।

এই গ্রামে শেষ এসেছিলাম বড়খালার মেয়ে জ্যোৎস্নার বিয়েতে। তিন বছরেই কতকিছু পাল্টে গেছে।নানাদের ঘরটা ছিল মাটির। ওই ঘরেই আমার জন্ম।মা খালাস হতে এসেছিল বাপের ঘরে। সেই ঘর ভেঙে দুই মামা শেয়ারে পাকা বাড়ি তুলেছে।উঠোনের সামনে ছিল নানীর হাতে লাগানো একটা আঁজির গাছ।

তিন বছরে আমি একবারও আসতে পারিনি এখানে, তার একটা কারণ অবশ্য আছে। আমি আর বড়খালার সামনে দাঁড়াতে পারি না।

আমি যখন খুব ছোট ছিলাম তখন আমার মা বড় খালাকে নাকি কথা দিয়েছিল, যে জ্যোৎস্নাকে ঘরের বউ করবে।

বড় খালা হাসতে হাসতে মাকে বলেছিল, সে তো খুবই ভালো সুমোচার গো। বুনে বুনে বিয়ান হয়ে যাব।

ছোটতে কি আমরা এতোসব জানতাম! স্কুলের লম্বা ছুটিগুলো এখানেই কাটিয়ে যেতাম। নানাদের ঘরে তো খুব বেশি থাকতাম না। সারাটা দিন বড় খালাদের ঘরেই পড়ে থাকতাম। আর থাকব নাই বা কেন! নানাদের ঘরে তো আমার কেউ খেলার সঙ্গী ছিল না, ওখানে জ্যোৎস্না ছিল।জ্যোৎস্না! তমিজ ভাই তবিজ ভাই বলে সারাটাক্ষন আমার সঙ্গে ছায়ার মতো ঘুরত।

হয়তো খালা বলল, যা তো মা, ডহরের মাঠ থেকে পুঁইশাক তুলে আন।

তো সঙ্গে সঙ্গে জ্যোৎস্না জবাব দিল, একা যেতে পারবুনি মা, এতো দূরের মাঠ, আমার ডর লাগে।

খালা বলল, একা কেনে যাবি, তোর তমিজ ভাইকেও নিয়ে যা।

জোৎস্নার মুখের চোরা হাসি আমি কি দেখতে পেতাম না? মেয়েটা বকের মতো পা ফেলে ফেলে হাঁটত, আমি ওর পিছু পিছু যেতাম। মাঠে গেলে কী আর আমরা সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসতাম! কোনোদিন লোকের খেত থেকে আলু তুলে কাঠকুটো জোগাড় করে পুড়িয়ে খেতাম। কার খেতে শশা ফলেছে, কোথায় কোন চাষি ছোলা লাগিয়েছে সবই ছিল জ্যোৎস্নার নখদর্পনে। পরের অনিষ্ট করে ফিরতে অনেক দেরি হয়ে যেত। ওদিকে খালা আমাদের পথ চেয়ে বসে আছে।মারগুলো তো আমার পিঠে পড়ত না, সবই জ্যোৎস্নার পিঠে। তাতেও কোনো হেলদোল ছিল না ওর।

সব থেকে মজা হতো নতুন পুকুরে গোসল করতে গিয়ে। হেল দেওয়া-দেওয়ি খেলতাম আমারা।জোৎস্না আমাকে ‘হেল’ দিল, এবার ওকে ছুঁতে হবে আমায়। শুধু ছুলেই চলবে না। যদি হাত পিছলে চলে যায়, তো গেম শেষ হবে না। ও পানিতে নামলেই মাছ হয়ে যায়, তখন নাগাল পাওয়া খুবই মুশকিল। আমি ডুব সাঁতার দিয়ে জ্যোৎস্নাকে ধরার চেষ্টা করি, ও আমার হাত থেকে পিছলে যায়। হাঁফিয়ে গেছি দেখে একসময় ও নিজেই আমাকে ধরা দেয়।তেমনি একদিন খেলতে খেলতে ডুব দিয়ে জ্যোৎস্নার কোমরটা জড়িয়ে ধরে ফেললাম। কী করে যেন ওর প্যান্টে টান পড়ে নীচের দিকে নেমে গেল। জ্যোৎস্না চমকে গিয়ে চিৎকার করে উঠল। আমাকে এক চড় দিয়ে সরে পড়ল।আর থাকল না। কথা না বলে ভিজে কাপড়েই গট গট করে বাড়ি চলে গেল।

আমি ভয়ে খালাদের ঘর যেতে পারলাম না। উঠলাম নানাদের ঘরে। পাশাপাশি দুটো পাড়া। ভয়ে বুকটা ঢিপ ঢিপ করতে লাগল। পুকুরের ব্যাপারটা জ্যোৎস্না যদি খালাকে বলে দেয়!

না বলেনি। নানাদের বাড়িতে আমাকে ডাকতে এল জ্যোৎস্না! 

—এসো তমিজ ভাই, মা খেতে ডাকছে।

নানী বলল,কী গো! খালাত ভাইটাকে ছাড়বি নাই নাকি! এক-দুইদিন আমাদের ঘরেও খাক। আমরা পর হয়ে গেলাম!

—বকো না তো নানী। বলে জ্যোৎস্না আমাকে তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্য তাগাদা দেয়, চলো গো তমিজ ভাই, চলো।

পথে যেতে যেতে জ্যোৎস্না সেই আগের মতোই সমানে বকবক করে যাচ্ছিল। আমার অস্বস্তি কিন্তু তখনও কাটেনি।

দুই

নানাবাড়ির সঙ্গে আমার যে এক অদৃশ্য সুতোর টান ছিল, সেটা নানী ইন্তেকাল করার পরই আলগা হয়ে গেল। ছোট মামা বিয়ে করার পর ভাইয়ে ভাইয়ে পৃথক হল। নানাকে পালি খেতে হয় একমাস করে।আগের মতো আমার আর আসতে ভাল লাগত না।বয়স কম হলেও বুঝতে পারতাম, আমার কদর এবার কমে যাচ্ছে। খালার ভালোবাসা থেকে কিন্তু বঞ্চিত হয়নি। জ্যোৎস্নাও বড় হয়েছে, আগের মতো আর এতটা সহজ হয়ে মিশতে পারে না। স্কুল, টিউশন সামলাতে সামলাতে আমারও আসা-যাওয়া কমল।

কলেজে যখন ভর্তি হলাম, তখন জ্যোৎস্না টুয়েলভে উঠেছে। একদিন বড়খালা আমাদের বাড়ি এল।

রাত্রে খেতে বসেছি। পড়া কমপ্লিট করে একটু দেরি করেই খাই। সবাই খেয়ে উঠে গেছে। মা ভাত বেড়ে দিয়ে আমার সামনেটাই বসল। খাওয়া হলে এঁটো থালাবাসন গুটিয়ে তারপর উঠবে।হঠাৎ বলল, একটা কথা বলার ছিল বাপ।

মুখে ভাত পুরেই মায়ের মুখের দিকে তাকালাম।বুঝতে পারছি মা অনেকক্ষণ থেকেই কিছু বলার জন্য উশখুশ করছে। বললাম, কী কথা মা?

—তোর বড়খালা তোকে জামাই করতে চাইছে খোকা।

চমকে উঠলাম আমি! লজ্জায় সারা মুখ রাঙা হয়ে গেল।

—না মা, তা হয় না। জ্যোৎস্না আমার সম্পর্কে বোন।

—এমন কথা বলিস না খোকা। মুসলমানদের তো এই বিয়ে জায়েজ আছে রে। মান-সম্মানের ব্যপার।তোর বড় খালাকে আমি কথা দিয়েছিলাম যে! 

রাগে আমার সারা গা রি রি করে উঠল। বললাম, তুমি কথা দিয়েছিলে, তুমিই সামলাও গা। আমাকে এই নিয়ে আর একটা কথাও বল না। আমি বিয়ে করতে পারব না।

ভাতের থালাতেই হাত ধুয়ে খাবার ছেড়ে উঠে পড়লাম। সোজা নিজের পড়ার ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে অন্ধকার করে কতক্ষণ যে বসে ছিলাম! যে জোৎস্না তমিজ ভাই তমিজ ভাই বলে ছায়ার মতো ঘুর ঘুর করত আমার চারপাশে, সেই মেয়েটা আমার বউ হয়ে যাবে? না, তা হয় না।

সকালে আমার মতটা খালাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিল মা। তবুও খালা নাছোড়বান্দা। পর্দা সরিয়ে আমার পড়ার ঘরে খালা ঢুকল।

—পড়ছিস বাপ? বলে খাটের ওপর আমার পাশে বসল খালা।

আমি একটু সরে বসলাম। কোনো কথা খুঁজে পেলাম না। কী বলতে এসেছে খালা? থরথর করে কাঁপছি।আমার সারা গা ঘেমে উঠছে।

খালা এবার বলল, তোর মায়ের কাছে শুনলাম বাপ।তবুও আমার শেষ অনুরোধ,—বলে আমার হাতটা দুইহাতে চেপে ধরল খালা, আমার কতদিনের ইচ্ছা রে! জ্যোৎস্নাকে তুই বিয়ে করবি নাই বাপ?

বুকের ধুকপুকানিটা আরও বেড়ে গেল। হাতটা ছাড়িয়ে নেওয়া কী ঠিক হবে? আমার একটা হ্যাঁ বা না-এর অপেক্ষা মাত্র। একটা শব্দতেই সম্পর্ক কত বদলে যাবে। আমার বড় খালা শাশুড়ি হয়ে যাবে।জ্যোৎস্না আমার বউ, আর আমি জ্যোৎস্নার স্বামী।নাঃ! এই গন্ডি ছিঁড়ে আমাকে বেরতেই হবে।

খালাকে বললাম, আমি সবে ফাস্ট ইয়ারে পড়ছি খালা। তিন বছর লাগবে পড়াশোনা শেষ হতে।তারপর চাকরি-টাকরি খুঁজতে আরও বছর দুই।

খালা গদগদ হয়ে বলল, হলই বা বাপ! তুই করতে রাজী থাকলে একটা ভরসা পাব। তোদের বিয়ে পড়িয়ে রেখে দেব। তুই যখন চাইবি, তখন অনুষ্ঠান করে ঘরে তুলবি। জ্যোৎস্না খুবই লক্ষী মেয়ে, দেখবি তোদের সুখের সংসার হবেক।

বুঝলাম ফাঁসে আটকে যাচ্ছি। নরম করে বললে উদ্ধার পাওয়া মুশকিল। 

—না খালা। তাহলে সবসময় মাথায় একটা বাড়তি চিন্তা থাকবে, তাতে পড়াশোনার ক্ষতি হবে আমার।কিছু মনে কর না। জ্যোৎস্নাকে আমি বিয়ে করতে পারব না। আর এতো দিন ওকে রাখাও ভাল দেখাবে না।

খালা সুর সুর করে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। সেদিনেই চলে গেছিল। তারপর অনেকদিন যোগাযোগ রাখেনি।

তিন

হঠাৎ একদিন বড় খালু বিয়ের কার্ড দিতে এল আমাদের বাড়ি। কার বিয়ে? না জ্যোৎস্নার।সব ঠিকঠাক হয়ে গেছে। আমরা যেন গায়ে হলুদের আগের দিনই ঘরগুষ্টি হাজির হয়ে যায়।

আমরা অনেককিছুই দিতে চেয়েছিলাম জ্যোৎস্নার বিয়েতে। অভিমান করে ওরা কিছু নেয়নি আমাদের থেকে। কি আর করা যাবে!

আমার যাবার ইচ্ছা ছিল না। মায়ের জোরাজুরিতে গেলাম। মা বলেছিল,মাথা গরম করিস না খোকা।তুই না গেলে সম্পর্কটা আরও বেশি তেতো হয়ে যাবে। 

বিয়ে বাড়িতে গিয়েও আমি খালার সামনে দাঁড়াতে পারিনি। জ্যোৎস্নার থেকেও দূরে দূরে থাকছিলাম।ব্যাপারটা বুঝতে পেরে জ্যোৎস্না আমার কাছে এসে বসেছিল।

—কী গো তমিজ ভাই? সকাল থেকে এসেছ, ভালো করে সাড়াও দাওনি যে!

হাসি হাসি মুখ করে বললাম, তোর এখন বিয়ে বলে কথা। পাত্তা দিচ্ছিস কই!

—একদম বাজে কথা বলবে না। তুমিই লুকিয়ে লুকিয়ে থাকছ। তবে আমাকে দারুণ বাঁচিয়েছ তমিজ ভাই। কম টেনশনে ছিলাম! 

কী বলতে চাইছে জ্যোৎস্না? ও কি আমাদের ব্যাপারটা জানে? খালা কি বলেছিল ওকে? ওর কী ইচ্ছা সেটা তো জানা হল না। বললাম, আমি আবার তোকে কোথায় বাঁচালাম?

—আর ন্যাকামি কর না তো! বলে জ্যোৎস্না গলার স্বরটাকে নামিয়ে বলল, মা কে কতবার বলেছি তবিজ ভাই, মা তো শুনতেই চাই নি। যেদিন তোমাদের ঘর গেছিল, সেদিন ভয়ে আমার সারারাত ঘুম ধরেনি। পাছে তুমি যদি রাজী হয়ে যাও!

ভ্রু কুঁচকে তাকালাম জ্যোৎস্নার দিকে। আমার যা মত, ওরও কি তাই? তবুও একটু মজা করলাম, যদি সত্যিই রাজী হয়ে যেতাম, তাহলে কী হত রে?

জ্যোৎস্না আমার পিঠে আলতো করে থাপ্পড় মেরে বলল, বাঃ রে! তুমি আমার তমিজ ভাই না?

এই কয়েক বছরের মাথায় কী সুন্দর দেখতে হয়েছে জ্যোৎস্না! কলাগাছের মতো তর তর করে বেড়ে গেল মেয়েটা। গোলগাল গড়ন। সারা গায়ে চাঁদের আলোর মতো নরম আভা ছড়িয়ে। পূর্ণিমার রাতে জ্যোৎস্নার জন্ম। চাঁদের আলো যেন ওর গায়ে আটকে গেছিল। শুনেছি এতোই ওর উজ্জ্বলতা ছিল, অন্ধকার ঘরকেও আলো করে রাখত। খালা তাই ওর নাম দিয়েছিল জ্যোৎস্না। জ্যোৎস্নার দিকে একবার চোখ তুলে তাকালাম, বুঝলাম এই নাম ওর সার্থক। একবার মনে হল আমি যেন কিছু হারাতে বসেছি। 

জ্যোৎস্নাকে বললাম, তাই তো করলাম না রে! আর আগের যুগ আছে? এখন আমরা বড় হয়েছি।আমাদের তো একটা ইচ্ছা অনিচ্ছা বলে জিনিস আছে নাকি!

চার

এই গ্রামে আসার ইচ্ছা আমার একদম ছিল না।নিজেকে কেমন অপরাধী অপরাধী লাগে। খালার মুখের দিকে আর তাকাতেও পারছি না। কিন্তু না এসেও পারলাম না। মামাতো বোনের বিয়ে বলে কথা। রাগ করবে খুব। তাছাড়া এখানে আসার একটা চোরা টান আমার ছিল। জ্যোৎস্নাকে কতদিন দেখিনি! নিশ্চয়ই দেখা হবে।

কারও কাছে জ্যোৎস্নার খোঁজ নিতেও সংকোচ লাগছে। সবাই যেন আমাদের ব্যপারটা জানে। ওর নাম করলেই যেন একটা কেমন ভাবে তাকাবে। তবে আজ যে আসেনি বুঝতে পারলাম। না হলে কি একটিবারের জন্যও দেখতে পেতাম না? নিশ্চয়ই কাল আসবে। কিংবা বিয়ের দিন।

কাল থেকেই লক্ষ্য করছি খালার কথাবার্তায় আগের মতো আর সেই আন্তরিকতা নেই। বুঝলাম এখনো আমাকে মাফ করতে পারেনি।

আজ সকাল থেকেই সারাটাদিন কাজে কাজে কেটে গেল। বরপক্ষ থেকে দশ-বারোজন এসেছিল ‘লগন’ নিয়ে। মানে কনের শাড়ি-টাড়ি, গহনা, সাজের বিভিন্নরকম সরঞ্জাম দিয়ে গেছে। তাদের আজ জামাই আদরে আচ্ছা করে খাওয়াতে হয়েছে। কাল গায়ে হলুদ, তার পরেরদিন বিয়ে।

মামাদের বাড়ির উঠোনে বসে আছি একটা চেয়ারে।বেশ ক্লান্ত লাগছে। প্যান্ডেলের চেয়ারগুলো এনে অনেকেই বসেছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। ছোটখালার ব্যাটা মাইকগুলো গাছে বেঁধে কখন নেমে পড়েছে।মাগরিবের নামাজটার জন্যেই গান চালু করেনি এতক্ষণ। নামাজ শেষ হতেই বেজে উঠল গমগম করে। কান ঝালাপালা ।

মামি চা দিয়ে গেল কাপে করে। বসে বসে চা খাচ্ছি, হঠাৎ দেখলাম জ্যোৎস্না! কাঁকালে ছেলে নিয়ে মামাদের বাড়িতেই আসছে। জ্যোৎস্না বটে তো! এ কী অবস্থা হয়েছে মেয়েটার! সেই হাসিখুশি মুখটাই নেই। কেমন যেন চিমসে গেছে। গালগুলো বসা বসা, চোখগুলোও অনেকটা ভেতরে ঢুকে গেছে। সারা মুখ অন্ধকার। কেউ বিশ্বাস করবে, যে এই মেয়েটা অন্ধকার ঘরকেও আলো করে রাখত? সংসার সমুদ্রে ডুবে গেলে মানুষ কী এরকমই বদলে যায়?

হ্যাঁ জ্যোৎস্নায় তো। ওই তো মায়ের সঙ্গে কথা বলছে। আমি ডাকার আগেই ও আমাকে দেখে ফেলেছে। কাছে এসে দাঁড়াল।

বললাম, কখন এলি?

—এই একটু আগেই এসেছি। 

আগের মতো আর তেমন কথা এগচ্ছে না। যেন আমরা একে অপরের অচেনা। ভাগ্নিকে কোলে তুলে নিলাম। ঠিক যেন ছোট্ট জ্যোৎস্না। বললাম, এতো শুকিয়ে গেছিস কেন রে?

—আর বলো না তমিজ ভাই। রোগ-জ্বালায় কাহিল!

জ্যোৎস্না মামাদের বাড়িতে ঢুকল। বুঝতে পারলাম না ও কেন চলে গেল। ভাগ্নিকে আদর করতে লাগলাম আমি। এখনও কথা ফোটেনি তেমন।অচেনা মানুষের কোলে এসেও ভাগ্নি কিন্তু একটুও কাঁদেনি।

কিছুক্ষণ পর জ্যোৎস্না বেরিয়ে এল। আমার চেয়ারটার পাশেই দাঁড়াল। আমি ওকে বসতে বললাম। জ্যোৎস্না বলল, আর বসবনি তমিজ ভাই।কচিকে ঘুম পাড়াতে হবে। বাসটা খুব ভিড় ছিল, ঠেলাঠেলি করে এতদূরের পথ আসা। খুব জব্দ হয়ে গেছে।

মা কথাটা শুনতে পেল। বলল,এখানে ছেলেপুলের গাদা। সব হৈহৈ চৈচৈ করছে। তার থেকে ওই ধারের ঘরে চলে যা মা। শান্তিতে ঘুমতে পাবে তুর বিটি।তারপর আমার দিকে তাকিয়ে মা বলল, তুইও যাবি তো যা না খোকা। সারাটাদিন খুব খেটেছিস, তোর খালাদের ফাঁকা ঘর, একটু গড়িয়ে নিবি।

জ্যোৎস্না বলল, তাই চলো গো তমিজ ভাই। এধারে যা মাইক বাজছে!

ভাগ্নিকে কোলে নিয়ে জ্যোৎস্নার পিছু পিছু যাচ্ছি।এই মেয়েই বকের মতো লম্বা পা ফেলে ফেলে হাঁটত!

চলতে চলতেই বললাম, দুলাভাই এল না কেন?

—ওর অফিসে ছুটি দেয়নি।

—তোকে একলা পাঠিয়ে দিল এইভাবে? 

জ্যোৎস্না চূপ করে থাকল। বুঝলাম, ও আমার কাছে কিছু গোপন করছে।

খালাদের ঘরটা মাটির। পেছনে বাঁশবন, খুব ছায়াশীতল পরিবেশ। বাঁশের দরজাটা দড়ি দিয়ে বাঁধা আছে। ঘরগুষ্টি সবাই এখন বিয়েবাড়িতে। কাল থেকে আসব আসব করেও একবারও আসা হয়নি খালাদের ঘরে। যে ঘরে জ্যোৎস্না নেই,সেখানে আসি কী করে? আমার হারানো ছেলেবেলাকে খুঁজতে লাগলাম। জ্যোৎস্নাও কী খুঁজছে?

সুইচ টিপে বালবটা জ্বালাল জ্যোৎস্না। মেঝেতে মাদুর পেতে দিল। আমি একধারে বসলাম। ভাগ্নি এবার কেঁদে উঠল। মায়ের কোলে যাবে। জ্যোৎস্নার কোলে দিয়ে বললাম, খিদে পেয়েছে বোধহয়। 

জ্যোৎস্না আমার সামনে থেকে একটু পাশ ঘুরে, শাড়ির আঁচলে ঢাকা দিয়ে ভাগ্নিকে দুধ দিল। ভাগ্নি পরম তৃপ্তিতে দুধ খাচ্ছে।

জ্যোৎস্না বলল, তুমি এখন কী করছ তমিজ ভাই? 

—কী আর করব বল! পড়াশোনা শেষ করে কাজ খুঁজে বেড়াচ্ছি।

জ্যোৎস্নার মুখে অসহায়তার ছাপ। কী যে এতো ভাবছে কে জানে! একসময় নিজেই বলল, সময় কত কী বদলে ফেলে বলো তমিজ ভাই?

—হ্যাঁ রে। একবার করে তাই তো ভাবি। কেমন ছিল আমাদের দিনগুলো!

—সময়কে তো মেনে নিতেই হবে!

আমি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ বড় খালা ঘরে ঢুকল। আমাদের দু’জনকে একসঙ্গে দেখেই যেন চমকে উঠল। কোনো কথা না বলে, কী যেন নেওয়ার ভান করে সট করে বেরিয়ে গেল।

জ্যোৎস্নাকে বললাম, তুই বস, আমি একটু আসছি।

বাইরে বেরিয়ে এলাম। ঘরের খোলা দরজা দিয়ে বালবের একফালি আলোর ছটা উঠোনে পড়ে গা এলিয়ে দিয়েছে। আবছা আলো-আঁধারিতে দেখলাম খালা তারে মেলা কাপড়গুলো কুড়চ্ছে। কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। খালা আমাকে দেখল, তবুও কিছু বলল না। আমিই কথা বললাম, তুমি এখনও আমাকে মাফ করবে না খালা? ওরকম করে মুখ ঘুরিয়ে থাকলে আমি যে আরও কষ্ট পাব গো!

খালা কথাটার জবাব দিতে পারল না। একটু চুপ থেকে ধরা গলায় বলল, মেয়েটার পোড়া কপাল বাপ! ভাগ্য নিয়ে সবাই তো জন্মে না।

—কী হয়েছে একটু খুলে বলো না।

—শুনে আর কী করবি বাপ। আর তো সময় ঘুরে আসবে না। ওসব কথা পরিচয় দিতেও লজ্জা লাগে।

আমি চুপচাপ মাথা নুয়ে দাঁড়িয়ে আছি দেখে একটু পর খালা নিজেই বলল, দেখেশুনে একটা ছেলে দেখে বিয়ে দিলাম বাপ। তাতেও মানুষ চিনতে ভুল হল আমাদের।

—দুলাভাইয়ের সঙ্গে কিছু হয়েছে?একা পাঠিয়ে দিল যে জ্যোৎস্নাকে! জ্যোৎস্না বলল, অফিসে নাকি ছুটি দেয়নি?

—তোকে লজ্জায় বলতে পারেনি তাহলে। অফিস না আমড়া! একটা কারখানায় নাইট গার্ডের কাজ করে।যত বদমাইশ জ্যোৎস্নার শ্বশুর-শাশুড়ি। জামাইটাও হয়েছে তেমন, বাপ-মা ছাড়া কিছুই বুঝে না। এতো টাকার পন চাইল, তাও দিলাম। তিনভরি গহনা চেয়েছিল, বলেছিলাম পরে শোধ করে দেব। সব মিটিয়েই দিয়েছি, আর শুধু একভরি পাবে। সেটা নিয়েই যত অশান্তি! মেয়েটাকে রোজ কথা শুনতে হয়। একটু দম নিয়ে খালা আবার বলল, ঘরামী চালের ব্যবসাটা তো উঠে গেল বাপ, তোর খালু এখন অকেজো। এই অসময়ে কী করে শোধ করি বল তো! একটু তো বুঝতেও হয়। জামাইটা এখানে তো আসেই না, জ্যোৎস্নাকেও পাঠাতে চায় না।একলাই চলে এসেছে মেয়েটা।

—একথা আমাদের বলনি কেন? আমরা কী পর হয়ে গেলাম?

খালা চুপ করে থাকল। আমিও কিছু কথা খুঁজে পেলাম না। অন্ধকারটা আরও গাঢ় হয়ে উঠছে। গলা থেকে সোনার চেনটা খুলে ফেললাম আমি। খালার হাতে দিয়ে বললাম, এটা রাখো খালা। কাউকে বলো না কিন্তু, এমনকি জ্যোৎস্নাকেও না। গহনাটা শোধ করলে যদি সমস্যাটা মেটে তো মিটুক।

খালা বাধা দিতে যাচ্ছিল, বললাম, আমি তো খালা ছেলে। পরে ঠিক গড়িয়ে নেব। তুমি রাখো তো।কতকিছুই তো দিতে চেয়েছিলাম!

খালার চোখগুলো ছলছল করে উঠল। চেনটা কাপড়ের খুঁটে গিঁট দিয়ে বেঁধে রেখে বলল, গহনাটা দিলেই কি সব সমস্যার সমাধান?

আমি খালার দিকে চোখ তুলে তাকালাম।বললাম, মানে?

—সমস্যা তো আর একটা নয় বাপ।

—আবার কীসের সমস্যা?

—আসল সমস্যা তো তোকে নিয়ে!

আমি চমকে উঠলাম! 

খালা আর আমার সামনে একমুহূর্তও দাঁড়াল না।কাপড়গুলো নিয়ে ঘরে চলে গেল। পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম আমি। খালা আমাকে এ কীসের ইঙ্গিত দিয়ে গেল?

উদাস দৃষ্টিতে আকাশের পানে তাকালাম। আকাশে চাঁদ নেই। কিছু তারা মিটমিট করে জ্বলছে। গোটা দুনিয়াটা যেন অন্ধকারে ভরে গেছে। জ্যোৎস্না কি এবার ওর উজ্জ্বলতা ফিরে পাবে? পারবে অন্ধকারকে দূরে সরাতে? নাকি আমার দেওয়া সোনার হারটা আয়ত্তে-প্রস্থে বাড়তে বাড়তে, একদিন ফাঁস হয়ে নিষ্ঠুর চেপে বসবে জ্যোৎস্নার হাড়জিরজিরে গলায়!

One thought on “ফাঁস

  1. তোমার লেখা পারতপক্ষে না পড়ে থাকি না। এটাও দেখা মাত্র পড়ে ফেললাম।
    যথারীতি সুন্দর সাবলীল লেখা। চেনা পরিচিত কাহিনি হলেও তোমার লেখনীর গুণে অন্য ভঙ্গিমা দিয়েছে যেন! আরো অনেক অনেক লিখো ভাইটি।

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত