| 20 জুলাই 2024
Categories
প্রবন্ধ সাহিত্য

হিন্দু পেট্রিয়টের হরিশচন্দ্র মুখার্জী । দিলীপ মজুমদার

আনুমানিক পঠনকাল: 12 মিনিট

 

                           

।।  ১  ।।

পি জি হাসপাতালের পাশ দিয়ে যে রাস্তাটা সোজা চলে গেছে হাজরার দিকে , তার নাম হরিশ মুখার্জী রোড । উত্তর কলকাতা থেকে বেহালার পর্ণশ্রীতে বাসা বদলের ফলে মাঝে মাঝে এই রাস্তা ব্যবহার করতে হত । গত শতকের সত্তর দশকের মাঝা মাঝি সময়ের কথা বলছি । তখন এই রাস্তা দিয়ে যাবার সময় আমার কোন রোমাঞ্চ হত না , পরবর্তীকালে যেমন হত । পি জি হাসপাতাল ছাড়িয়ে যাবার পর  কিছু দূরে বাম দিকে একটা পার্ক । হরিশ পার্ক । সেই পার্কে হরিশ স্মরণে একটা স্তম্ভ আছে । সে স্তম্ভে কোন ছবি নেই । স্তম্ভের গায়ে লেখা আছে ( ইংরেজি ও বাংলায় )  :

                                         স্বর্গীয় হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়

যিনি ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ পত্রিকার সম্পাদক ও ‘ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ান সভা’র অধিনায়ক ছিলেন এবং সমকালে বহুবিধ বিষয়ের আন্দোলন প্রসঙ্গে দক্ষতা সহকারে ও নিঃস্বার্থভাবে বিচার বিতর্ক দ্বারা  স্বদেশের প্রভূত কল্যাণ সাধন করিয়াছিলেন।

                                          যিনি অসামান্য সাহস , সত্যনিষ্ঠা ও স্বাধীনতার সহিত অন্যায় পক্ষের পরাজয়ে  প্রবৃত্ত হইতেন ও ন্যায়ের পক্ষ সমর্থন করিতেন ;

                                          যিনি বিদ্রোহসঙ্কুল সংকট সময়ে  রাজপুরুষগণকে সৎ পরামর্শ দিয়াছিলেন ও রাজনীতির প্রকৃত অভিপ্রায় সাধারণের গোচর করিয়াছিলেন ;

                                         যিনি উৎপীড়িত দীন দরিদ্রের পিতৃস্বরূপ  ছিলেন এবং তাহাদের সহায়তা করিতে সাধ্যপক্ষে কখনই বিমুখ হইতেন না :

                                         যিনি স্বীয় জীবনে স্বার্থত্যাগ ও কর্তব্যপরায়ণতার উজ্জ্বল আদর্শ প্রদর্শন করিয়াছেন ;

                                         যিনি একাধারে প্রজাবৃন্দের শরণ্য পৃষ্ঠপোষক ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অবলম্বনী্য় স্তম্ভস্বরূপ ছিলেন ;

                                                          সেই মহাপুরুষের স্মৃতিচিহ্ন এই কীর্তিস্তম্ভ

তদীয় চিরকৃতজ্ঞ স্বদেশবাসিগণকর্তৃক সাধারণের প্রদত্ত অর্থ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হইল

কলিকাতা , ভবানীপুর

সন ১২৩১ সালে তাঁহার জন্ম ও সন ১২৬৮ সালে মৃত্যু হয় ।

স্তম্ভের গায়ে এই লেখাগুলি কালের প্রহারে বিবর্ণ হয়ে গেছে । কিন্তু সে লেখা পড়ে আমার তেমন কোন প্রতিক্রিয়া হয় নি। আমি ভেবেছিলাম ব্যাপারটা গৌরবে বহুবচনের মতো । অতিরিক্ত প্রশস্তি বা বাড়িয়ে বলা । তখন বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম বলে এই মানুষটিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দালাল বলেও মনে করেছিলাম । কারণ, ওই যে স্তম্ভের গায়ে লেখা ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অবলম্বনীয় স্তম্ভস্বরূপ ছিলেন’ ।

বাস্তবিক , হরিশ মুখার্জীর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে বিস্তৃত ও পরিচ্ছন্ন ধারণা ছিল না তখনও । না থাকার কারণও ছিল । বিদ্যালয়পাঠ্য গ্রন্থ এ ব্যাপারে আমাকে সহায়তা করে নি । স্নাতক বা স্নাতকোত্তর স্তরে ইতিহাস নিয়ে পড়লে হয়তো হরিশ মুখার্জী সম্বন্ধে আরও একটি বেশি জানতে পারতাম ।

।।  ২  ।।

কলেজ রো দিয়ে দুপুর বা বিকেলের দিকে ধুতি পাঞ্জাবি পরা , সৌম্যদর্শন এক ভদ্রলোক হেঁটে চলে যেতেন কফি হাউজের দিকে । তাঁর নাম নির্মাল্য আচার্য । তিনি অভিনেতা সৌমিত্র চ্যাটার্জির বন্ধু । পরিচালক সত্যজিৎ রায়েরও আপনজন । তিনি যে পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন , তার নাম ‘এক্ষণ’ । উচ্চমানের পত্রিকা । সেই পত্রিকার ১৯৭০ সালের একটি সংখ্যায়  পুনর্মুদ্রিত হয় একটি পুরানো বই । ‘হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের জীবনী’ । লেখক রামগোপাল সান্যাল । এই লেখকের নাম আমি শুনি নি ।

অনেক পরে অলোক রায় সম্পাদিত  ‘Reminiscences and Anecdotes of Great Men of India—1894-95 ( written by Ramgopal Sannyal) বইটির ভূমিকায় রামগোপালের সংক্ষিপ্ত  পরিচয় পেয়েছিলাম । নদিয়া জেলার মেহেরপুরে ঈশ্বরচন্দ্র সান্যালের ঊরসে রামগোপালের জন্ম । মেহেরপুরে জন্ম হলেও পরে তাঁরা চলে আসেন কৃষ্ণনগরের গোয়াড়ি অঞ্চলে । এন্ট্রান্স ও এফ এ পাশ করার পরে রামগোপাল শিক্ষকতায় ব্রতী হন । প্রথমে  কৃষ্ণনগরের এ ভি হাই ইংলিশ স্কুল এবং  তারপর একে একে চুয়াডাঙা হাইস্কুল , কুষ্টিয়া হাইস্কুল , মামজোয়ানি হাইস্কুল ও সর্বশেষে  ওড়িশার সম্বলপুর হাইস্কুলে শিক্ষকতা করেন ।

শিক্ষকতা করলেও সাংবাদিকতায় তাঁর আগ্রহ ছিল । কৃষ্ণনগর স্কুলে থাকার সময়ে তাঁর সাংবাদিকতার সূত্রপাত । ১৮৯০ সালে কলকাতার তালতলায় বাড়ি কেনেন রামগোপাল সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য । ‘বেঙ্গলি’ ও ‘ইণ্ডিয়ান মিরর’ পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন । রামগোপালের প্রথমা পত্নী মনমোহিনী রামতনু লাহিড়ীর ভ্রাতা  শ্রীপদ লাহিড়ীর কন্যা।

                                  হরিশচন্দ্র মুখার্জীর জীবনী তাঁর প্রথম বই । এটি প্রকাশিত হয় ১৮৮৭ সালে । তারপরে একে একে প্রকাশিত হয় বাবু কৃষ্ণদাস পালের জীবনী (১৮৯০) ;  History of the Celebrated Criminal Cases and Resolutions Recorded thereon by both Provincial Supreme Government (1888)  ; A General Biography of Bengal Celebrities  both  Living and Dead  ( 1888)  ;  Reminiscences and Anecdotes of Great Men of India ( 1894-95 ) ।

হরিশচন্দ্রের মৃত্যুর ২৭ বৎসর পরে প্রকাশিত হয় রামগোপালের হরিশ জীবনী । বইটি উৎসর্গ করা হয় ভাওয়ালের অধিপতি রাজেন্দ্রনারায়ণ রায় মহাশয়কে । বই প্রকাশের ব্যাপারে রামগোপালকে তিনি অর্থসাহায্য করেছিলেন । বাংলা ভাষায় লিখিত এটি প্রথম হরিশ জীবনী । হরিশের মৃত্যুর ২ বছর পরে মুম্বাইএর এলফিনস্টোন কলেজের পার্শি অধ্যাপক , ফ্রানজি বোমানজি ইংরেজি ভাষায় হরিশের যে জীবনী লেখেন তার নাম : ‘Lights and Shades  of the Life of Baboo Hurish Chunder Mookerjee and Passing Thoughts on India and its People, their Present and Future’.

রামগোপাল তাঁর বইএর ভূমিকায় লিখেছেন  :

               “ আজ প্রায় ২৭ বৎসর হইল বঙ্গের শিরোভূষণ হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু হইয়াছে । এ পর্যন্ত তাঁহার জীবনী ইংরেজিতে বা বাঙ্গালায় কেহই লিখিতে প্রয়াস পান নাই (সম্ভবত রামগোপাল ফ্রামজি বোমানজির বইটির হদিশ পান নি) । এত দিন পরে তাঁহার জীবনী সম্যকরূপে লেখা অনেক কারণে কঠিন হইয়া উঠিয়াছে । প্রথমত , হরিশের সহবর্তী লোকের অনেকেরই পরলোকপ্রাপ্তি হইয়াছে ।

                                          “দ্বিতীয়ত , হরিশের লিখিত হিন্দু পেট্রিয়ট কাগজ বা চিঠিপত্র  প্রায় কিছুই পাওয়া যায় না। এই সকল কারণে তাঁহার জীবনের আনুপূর্বিক বিবরণ সংগ্র্হ করা কঠিন । কিন্তু ‘নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো’—ইহা বিবেচনা করিয়া আমার অল্পবুদ্ধি ও ক্ষমতানুসারে যথাসাধ্য হরিশের জীবনী সঙ্কলিত করিলাম । ইহাতে যে অনেক পরিমাণে অঙ্গহীনতাদি দোষ আছে , তাহা আমি স্বীকার করি এবং ভরসা করি পাঠকগণ সে সকল ক্ষমা করিবেন । হরিশের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সম্মান প্রদর্শনই এই পুস্তক প্রচারের উদ্দেশ্য ।

                                                                           “ বাঙ্গালা গ্রন্থ প্রণয়ন এই আমার প্রথম উদ্যম । ইহা কৃতজ্ঞতার সহিত স্বীকার করিতেছি যে, এই পুস্তক লিখিবার সময়ে শ্রীযুক্ত বাবু রজনীকান্ত গুপ্ত ও শ্রীযুক্ত বাবু অক্ষয়চন্দ্র সরকার মহোদয়গণ আমায় অনুগ্রহ করিয়া বিশেষ সাহায্য করিয়াছেন । সহৃদয় পাঠকগণ এই গ্রন্থপাঠে কিয়ৎ পরিমাণর তৃপ্তিলাভ করিলেই পরিশ্রম  সফল বোধ করিব ।

                                    “ এই পুস্তক সঙ্কলিত হইবার পর ভবানীপুরস্থ শ্রীযুক্ত বাবু ব্রজলাল চক্রবর্তী আমায় বলেন যে ১৮৫৪ খ্রিঃ মধুসূদন রায় আপনার মুদ্রাযন্ত্র  বিক্রয় করায় হরিশ ভবানীপুরের সত্যজ্ঞান সঞ্চারিণী সভার প্রেস হইতে হিন্দু পেট্রিয়ট বাহির করেন এবং ১৮৫৬ খ্রিঃ হিন্দু পেট্রিয়ট সংস্থাপন করেন । ”

এই সংক্ষিপ্ত জীবনীতে আলোচিত বিষয়গুলি : হিন্দু পেট্রিয়টের জন্ম  , হরিশচন্দ্রের বাল্য জীবনী , বাল্যে নির্ভীকতা , মুখার্জীস ম্যাগাজিনে লিখিত তাঁহার ক্লেশের কথা , টলা কোম্পানির অফিসে চাকরী , মিলিটারি জেনারেলের অফিসে চাকরী,কর্নেল চ্যাম্পনিজের প্রতি কৃতজ্ঞতা , বাবু ক্ষেত্রচন্দ্র ঘোষের গল্প , তাঁহার সত্যপ্রিয়তা , নিজের চেষ্টায় জ্ঞানোন্নতি, বিবাহ , সম্পাদকীয় কার্য , সিপাহী যুদ্ধ , উহার কারণ , আশঙ্কার অবস্থা ও গ্র্যাণ্ড জুরির কথা , খবরের কাগজ ও সিপাহী বিদ্রোহ , ধর্মবিষয়ে লাট ক্যানিংএর ঘোষণাপত্র , ফ্রেণ্ড অব ইণ্ডিয়ায় লিখিত পলাশীর শতবার্ষিকী সমাপ্ত, মার্সিয়াল আইন ও হরিশের লেখা , ১৬ আইন , জেনারেল নীল ও যথেচ্ছ হত্যা , পঁচেতের রাজা ও হরিশচন্দ্র , ৩১শা জুলাইর ঘোষণাপত্র , মহারাণীর ঘোষণাপত্র , তাঁহার রাজনীতিজ্ঞতা , সিপাহী বিদ্রোহ সম্বন্ধে হরিশের লেখা , নীল বিদ্রোহ , নীলের সম্বন্ধে আইন, নীলের দৌরাত্ম্য , মহাত্মা আসলি ইডেন ও অন্যান্য রাজকর্মচারীদের কথা , কৃষ্ণনগরের মিশনারীগণের কথা , রেভারেণ্ড সুরের জবানবন্দী , আমির মল্লিকের জবানবন্দী , গণি দফাদারের জবানবন্দী , ইণ্ডিগো কমিশনের নিকট হরিশের জবানবন্দী, হরিশের মৃত্যু ,  তাঁহার স্মরণার্থ কমিটি , হরিশের সম্বন্ধে নানা গল্প , হরিশের সম্বন্ধে রামগোপাল ঘোষের বক্তৃতা , ব্রাহ্মসমাজ ও হরিশচন্দ্র , ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ান সভা ও হরিশচন্দ্র . হরিশচন্দ্রের বৈর নির্যাতন , হরিশের চরিত্র ।

।। ৩ ।।

রামগোপালের এই সংক্ষিপ্ত হরিশ জীবনী পড়ে আমি হরিশচন্দ্রের প্রতি আকৃষ্ট হই ।  যে মানুষের বংশগরিমা আছে , মুরুব্বি আছে , প্রথাগত শিক্ষার ছাড়পত্র আছে , সে মানুষের খ্যাতনামা হবার সুযোগ আছে । হরিশচন্দ্রের সেসব ছিল না । এখানে কিছুটা বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তাঁর মিল আছে । বিদ্যাসাগর  এক অজ পাড়াগাঁ থেকে এসেছিলেন কলকাতায় । তখন কলকাতা যাঁরা মাতিয়ে তুলেছিলেন , তাঁদের প্রায় সকলেরই বংশগরিমা ছিল , অর্থকৌলীন্য ছিল , বাবা-কাকা-দাদা-মামা গোছের মুরুব্বি ছিল ; বিদ্যাসাগরের ছিল না । কিন্তু বিদ্যাসাগরের যা ছিল  তা হরিশচন্দ্রের ছিল না । সেটা হল প্রথাগত শিক্ষার ছাড়পত্র । লোকে অর্থকে যেমন সমীহ করে , তেমনি করে  বিদ্যাকে ।

হরিশচন্দ্র হতদরিদ্র ঘরের সন্তান । ভবানীপুরে মামার বাড়িতে মানুষ । মামার বাড়িও গরিব । তার উপর বাবা মারা গেলেন অকালে । বিধবা মা দুই সন্তানকে নিয়ে বাপের বাড়িতে নাজেহাল। কিছুদিন ভবানীপুরের ইউনিয়ন স্কুলে পড়লেও মাঝপথে ছেড়ে দিতে হল স্কুল । বেরিয়ে পড়তে হল জীবিকার সন্ধানে । তারপরে টলা কোম্পানিতে একটা চাকরি জুটে যেতে অবসর সময়ে শুরু করলেন পড়াশুনো । যেতে লাগলেন লাইব্রেরি । মেটকাফ হলে। একেবারে নিজের চেষ্টায় আয়ত্ত করে নিলেন ইংরেজি ভাষা। তাঁর সেই ইংরেজি ভাষার সৌরভে ইংরেজ রাজপুরুষরাও ফিদা হয়ে  যেতেন । শুধু ভাষা শিক্ষা নয় , বিষয় শিক্ষাও শুরু হল। রাজনীতি , সমাজ , ইতিহাস , অর্থনীতি , আইন ইত্যাদি বিচিত্র বিদ্যার চর্চা । মিলিটারি অডিটার জেনারেলের অফিসে চাকরি পাবার পরে , জীবিকার ক্ষেত্রে আরও সুস্থিত হবার পরে , বিদ্যাচর্চার গতি বাড়ল হরিশচন্দ্রের ।

কিন্তু শুধু পড়া নয় , সেই সঙ্গে চাই লেখা। কি লেখা? কবিতা , গল্প , নাটক , উপন্যাস ? না , মোটেই তা নয়। লিখতে হবে রাজনৈতিক প্রবন্ধ। ইংরেজের শাসন নিয়ে , দেশবাসীর অবস্থা নিয়ে। লিখতে হবে চোখা যুক্তি দিয়ে। জানি না , বাংলাদেশের যুক্তিবাদের দীক্ষাগুরু ডিরোজিওর প্রভাব পড়েছিল কি না হরিশচন্দ্রের জীবনে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে আপ্তবাক্যকে তিনি প্রশ্রয় দেন নি কখনও , সংস্কারের বেড়াজালে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখেন নি।

এই স্বশিক্ষিত হরিশচন্দ্র, এই হার-না-মানা হরিশচন্দ্র আমাকে আকৃষ্ট করলেন।

আকর্ষণের আরও একটা কারণ আছে। রামগোপালের ভূমিকায় দেখলাম হরিশচন্দ্রের প্রতি তাঁর সমকালের মানুষের অবহেলা । এই অবহেলা সচেতন অবহেলা না কি? বংশগরিমাহীন, অর্থকৌলীন্যহীন , প্রথাগতশিক্ষাহীন , মুরুব্বিহীন একটা মানুষকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা ! তাঁর মৃত্যুর ২৭ বছর  পরে তাঁর জীবনী লিখছেন তাঁর সঙ্গে সম্পর্কহীন একটি অখ্যাত মানুষ । কি করছিলেন শম্ভুনাথ মুখোপাধ্যায় ? কি করছিলেন প্যারীচাঁদ মিত্র ? কি করছিলেন শিশির ঘোষ ? কেন চুপ করেছিলেন রামগোপাল ঘোষ ? হরিশের মৃত্যুর পরে ‘হিন্দু পেট্রিয়টে’র পাতায় প্রকাশিত হয় এক বিজ্ঞাপন । সে বিজ্ঞাপনে জানানো হয় শম্ভুনাথ হরিশের জীবনী লিখবেন। কিন্তু সে জীবনী কোনদিন প্রকাশিত হয় নি । কেন? সে জীবনী আদৌ কি লেখা হয়েছিল? কেন হয় নি?

জীবনী লেখা তো দূরের কথা হরিশচন্দ্রের স্মৃতিরক্ষারও কোন চেষ্টা তাঁরা করেন নি। কালীপ্রসন্ন সিংহ ব্যতিক্রম। তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন , অসাধারণ এক পুস্তিকা লিখেছেলেন , এক কথায় ৫ হাজার টাকা দান করেছিলেন , স্মৃতিমন্দির তৈরির জন্য সুকিয়া স্ট্রিটের ২ বিঘা জমি দান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ।  কালীপ্রসন্নের প্রস্তাব কেন কার্যকরী করা হল না ? শেষে দেখা গেল হরিশের স্মৃতিরক্ষা তহবিলের ১০ হাজার টাকায় ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ান সভার বাড়ি তৈরি হয়েছে । এটা কার মস্তিষ্কপ্রসূত দুরভিসন্ধি ?

হরিশচন্দ্রের কোন জিনিস কেউ সংগ্রহ করে রাখেন নি । না তাঁর কোন ছবি , না কোন চিঠিপত্র । অথচ তাঁর সময়কালের অনেকেরই সে সব জিনিস হাতের নাগালে পাওয়া গেছে ।

১৯১০ সালে নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত হরিশচন্দ্রের ইংরেজি রচনার ( হিন্দু পেট্রিয়টে প্রকাশিত )  একটা সংকলন প্রকাশ করেন এবং তাতে তিনি হরিশ সম্পর্কে তথ্যের অভাবের জন্য তিনি আক্ষেপ করেছেন।  জাতীয়  গ্রন্থাগারে গিয়ে দেখলাম নরেশচন্দ্র সম্পাদিত সে বই সেখানে আছে । খুব পুরানো বই বলে তা বাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে  না , রিডিংরুমে বসে পড়তে হবে। আমি হরিশের লেখাগুলো কপি করে নেবার কথা ভাবলাম। তবে ঢাউস এই বই হাতে লিখে নেওয়া অসম্ভব।

তখন জেরক্স আসে নি। টাইপ করে নিতে হবে। আমি জাতীয় গ্রন্থাগার ইউনিয়নের আশিস নিয়োগীকে ধরলাম। ইনি স্বপনবুড়ো অর্থাৎ অখিল নিয়োগীর ছেলে। ক্যান্টিন বসে কথা হচ্ছিল। এলেন অচিন্ত্য মল্লিক। ইনি অ্যানেক্স বিল্ডিংএ   বসেন। এঁদের চেষ্টায় পুরো বইটা টাইপ করা হল। যিনি করে দিলেন তাঁকে আমি পারিশ্রমিক হিসেবে ৩০০ টাকা দিলাম।

দিনকয়েক বাদে শ্যামাচরণ দে স্ট্রিটের সুজিত আচার্যের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। সুজিতদা সিপিএমের বিদ্যাসাগর লোকাল কমিটির সম্পাদক ছিলেন । আমাকে ভালোবাসতেন। আমার সম্পাদনায় নবজাতক থেকে সোমেন চন্দের রচনাবলি প্রকাশ পাবার পরে সে ভালোবাসা আর একটু বেড়ে যায় । সুজিতদা বললেন নরেশচন্দ্রের বইটি তিনি রিপ্রিন্ট করবেন। হরিশ সম্পর্কে মান্য-গণ্য লোকের লেখা জোগাড় করতে বললেন । আমি বিনয় ঘোষ, হিরণ্ময় বন্দ্যোপাধ্যায় , মঞ্জু দত্তগুপ্ত, ক্ষেত্র গুপ্ত , রবীন গুপ্তকে অনুরোধ করলাম। ‘বাংলাদেশ’ পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বেরিয়ে গেল । তারপর একটা দুর্ঘটনায় সব এলোমেলো হয়ে গেল। প্রেস থেকে টাইপকরা কপিগুলি আনা হল না। চাপা পড়ে গেলেন হরিশ মুখার্জী।


আরো পড়ুন: শতবর্ষের আলোকে বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন  ।  দিলীপ মজুমদার


।। ৪ ।।

কোন এক রবিবার দুপুরের দিকে দেবদূতের মতো এল দয়াময় । দয়াময় বিশ্বাস । রবীন্দ্রভারতীর ছাত্র । পরে ব্যাঙ্কে চাকরি পেয়েছে । হরিশ মুখার্জী নিয়ে কথা হতে সে বলল , ‘দিলীপদা , নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত সম্পাদিত বইটা দেখেছেন ?’

বললাম , ‘দেখেছি , কিন্তু পড়ি নি ।‘

সে বলল , ‘বইটা আমার কাছে আছে। এখন আমার বই বলতে পারেন।’

আমি বলি , ‘১৯১০ সালে ছাপা বই তোমার কাছে এল কি করে ! ’

দয়াময় বলল , ‘কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথ থেকে পুরানো বই কেনা আমার নেশা । সেখানেই দশ টাকায় কিনেছি । ’

বললাম , ‘আমাকে কিছুদিনের জন্য দিতে পারবে ?’

দয়াময় হেসে বলল , ‘কিছুদিনের জন্য দিতে পারব না। একেবারেই দিয়ে দেব । তবে একটা শর্ত। ’

সে বলে , ‘এঁকে নিয়ে যদি বইটই কিছু লেখেন তবে কৃতজ্ঞতা স্বীকারে যেন আমার নাম থাকে।’

পরের সপ্তাহে দয়াময় সেই বই দিয়ে গেল আমাকে । আজও আমি সে বই যত্ন করে রেখেছি। দয়াময়ের একটা কথা আমার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল —‘যদি বইটই কিছু লেখেন’।  কিন্তু দুটি গুরুতর সমস্যা আছে এক্ষেত্রে। আমি সাহিত্যের লোক , আর এ বিষয়টা ইতিহাসের । আর দ্বিতীয় সমস্যা তথ্য সংক্রান্ত।

নরেশচন্দ্রের বইটি হাতে আসায় বিভিন্ন বিষয়ে হরিশচন্দ্রের মতামত উদ্ধৃতি দেওয়ার ব্যাপারে কোন সমস্যা রইল না। নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত সম্পাদিত  ‘ Selection from the Writings of Hurrish Chunder Mookerji ’  বইতে মোট ১০টি বিভাগ আছে । নিচে বিভাগ ও তার প্রবন্ধ সংখ্যা দেওয়া হল :

1] The Mutiny ——-35  

2] The Transfer of the Crown—–16

3] The Army —-3

4]  Land Law —7

5] Indigo—-7

6]  Industrial and Commercial —4

7] Administration of India —18

8]  Indians and Europians—–17

9] Social and Religious —7

10]  Educational—8

এছাড়া পরিশিষ্টে আছে মোট 15টি প্রবন্ধ ।

এখন রামগোপাল সান্যালের বইটি সামনে রেখে আমি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা , জীবনী ও আলোচনাগ্রন্থ থেকে তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করে দিলাম । বেশ কয়েক বছরের চেষ্টায় সে কাজ সম্পন্ন হল । বইটির নাম দিলাম   : ‘হরিশ মুখার্জি : জীবন ও ভাবনা’ ।

অধ্যায়গুলি সাজানো হল এভাবে :

১] জীবনবৃত্ত       ২]  হিন্দু পেট্রিয়ট ও হরিশচন্দ্র      ৩] ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ও হরিশচন্দ্র     ৪] সমাজোন্নতিবিধায়িনী সমিতি ও হরিশচন্দ্র       ৫]  ব্রাহ্মধর্ম ও হরিশচন্দ্র     ৬]  জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ও হরিশচন্দ্র     ৭] মিঃ ওয়াকোপ : কিশোরীচাঁদ ও হরিশচন্দ্র      ৮] লর্ড ক্যানিং ও হরিশচন্দ্র      ৯] সিপাহি বিদ্রোহ , ক্ষমতার হস্তান্তর  ও হরিশচন্দ্র     ১০] হরিশচন্দ্রের সমাজ ও শিক্ষা ভাবনা      ১১] নীলবিদ্রোহ ও হরিশচন্দ্র      ১২] কৃষি ও কৃষক ভাবনার ঐতিহ্য ও হরিশচন্দ্র    ১৩] রাজনৈতিক ভাবনার ঐতিহ্য ও হরিশচন্দ্র      ১৪] হরিশচন্দ্রের সমকালীন কয়েকজন

আমার বইএর বিভিন্ন অধ্যায় বই বেরোনোর আগে ‘সমতট’ , ‘সত্যযুগ’ ,’নন্দন’ , ‘পশ্চিমবঙ্গ’ প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল । আকাশবাণী কলকাতার বেঙ্গলি স্পোকনওয়ার্ডের পরিচালিকা কবিতা সিংহ আকাশবাণীতে আমাকে একটি কথিকা বলার সুযোগ দিয়েছিলেন । আমি সাহস করে ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার ও আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের আশীর্বাদ প্রার্থনা করে চিঠি দিয়েছিলাম । ১৪.০২.৭৪ সালে লেখা এক চিঠিতে ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছিলেন : ‘এ কাজটিতে আমার সম্পূর্ণ সহানুভূতি আছে । হরিশচন্দ্রের প্রতি দেশবাসী যথাযোগ্য সম্মান দেখায় নাই। আশা করি এই গ্রন্থের প্রচার হইলে তাঁহার স্মৃতি দেশবাসীর মনে শ্রদ্ধার উদ্রেক করিবে।’ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সহকারী অনিলকুমার কাঞ্জিলালও সুনীতিবাবুর আশীর্বাদ জানিয়েছিলেন।

বইটি প্রেসে  দেওয়ার আগে নবজাতকের কর্ণধার , আমার বন্ধু মজহারুল ইসলাম বললেন , ‘সরকারি অনুদানের জন্য পাণ্ডুলিপি জমা দে। ’   তাঁর কথামতো মহাকরণে গিয়ে আমি অমিতাভবাবুর হাতে পাণ্ডুলিপি জমা দিয়ে এলাম। ১৯৮২ সালে ৪ হাজার টাকা অনুদান মঞ্জুর হয় । সে টাকা অবশ্য মজহারুল আমাকেই দিয়েছিলেন। 

 

।। ৫ ।।

‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সেই সময়’ । যার নায়ক নবীনকুমার বা কালীপ্রসন্ন সিংহ । সে লেখার বেশ কিছুটা অংশ জুড়ে আছে হরিশ মুখার্জীর কথা। ইতিহাসের সঙ্গে মোটামুটি সংগতি রেখেই সুনীলদা হরিশ মুখার্জীর কথা লিখেছেন। তাই আমার বই প্রকাশিত হলে আমি তাঁকে বই দিয়ে এলাম। সুনীলদা একদিকে যেমন সর্বগ্রাসী পাঠক, অন্যদিকে গুণগ্রাহী। পরিচয়ের আগে তাঁর চরিত্রের এই দিকগুলি সম্বন্ধে অবহিত ছিলাম না। ১৫.১২.১৯৮৬ তারিখে একটি চিঠিতে সুনীলদা লিখলেন :

                                              “ আপনার ‘হরিশ মুখার্জী : জীবন ও ভাবনা’ পড়ে ফেলেছি এবং ভালো লেগেছে । আপনি প্রচুর তথ্য সংযোজন করেছেন , সময়ের পটভূমিকায় আপনি  হরিশের উদ্যম ও বিশ্বাসের  যথার্থ  বিশ্লেষণ করেছেন।”   

নবজাতক প্রকাশন ‘হরিশ মুখার্জী : জীবন ও ভাবনা’ প্রকাশ করেছিলেন । সে বই নিঃশেষিত হবার পরে এডুকেশন ফোরাম ‘হরিশ মুখার্জী  : যুগ ও জীবন ’   নাম দিয়ে সে বইএর নতুন সংস্করণ প্রকাশ করেন । । ‘দেশ’ পত্রিকার ‘গ্রন্থলোক’ বিভাগে ২০১০ সালের ১৭ মে তার সমালোচনা করেন  সোমনাথ রায় । সমালোচনা না বলে তাকে চরিত্রহনন বলা সঙ্গত । ‘দেশ’ পত্রিকায় আমার প্রতিবাদপত্র প্রকাশিত হয় ২০১০ সালের ২জুন ।  চিঠি লিখে সুনীলদাকে ব্যাপারটা জানাই । ততদিনে সুনীলদা অবসর নিয়েছেন । সুনীলদা আমাকে জানান যে আমাদের দেশে গ্রন্থসমালোচনার সঠিক মানদণ্ড  এখনও ঠিক হয় নি ।

‘হরিশ মুখার্জী : জীবন ও ভাবনার’ সমালোচনা প্রকাশিত হয় বেশ কয়েকটি পত্রিকায় । ‘যুবমানস’এ ঐতিহাসিক নিশীথরঞ্জন রায় লিখলেন,

                           “সম্পূর্ণ এককভাবে হরিশচন্দ্রের জীবনী ও ভাবনা নিয়ে বাংলা ভাষায় গ্রন্থ রচনার কৃতিত্ব দিলীপ মজুমদারের । এই গ্রন্থটি রচনা করে গ্রন্থকার ইতিহাস অনুরাগী এবং বাংলা ভাষাভাষী মাত্রেরই প্রশংসাভাজন হয়েছেন।”    

‘আজকাল’ পত্রিকায় অগ্নিমিত্রও একটি দীর্ঘ সমালোচনা লেখেন । এই অগ্নিমিত্রই পরবর্তীকালে ‘আপোষ করিনি’ নামে হরিশ মুখার্জীর একটি চমৎকার জীবনোপন্যাস রচনা করেছিলেন । অগ্নিমিত্র লিখলেন :

                                               “ শ্রী দিলীপ মজুমদার বাংলা সাহিত্যের একটি বিরাট অভাব পূর্ণ করেছেন । এ কথা আবারও বলছি । তাঁর গবেষণারীতির মধ্যে একরোখা মনোভাব এবং পূর্ব সিদ্ধান্তের প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যগ্রতা নেই । এটি ইতিহাস গবেষকের পক্ষে সুলক্ষণ । ”     

‘সত্যযুগ’ পত্রিকায় নন্দগোপাল সেনগুপ্ত লিখলেন :

                                           “বইটি লিখে শ্রীমজুমদার একটি জাতীয় কর্তব্য পালন করেছেন । হরিশচন্দ্রের নামে কলকাতার একটি বৃহৎ রাস্তা চিহ্নিত করে দেশবাসী তাঁকে সম্মানিত করেছেন । কিন্তু আশ্চর্যের কথা , তাঁর কোন প্রতিকৃতি নেই । ”  

।। ৬ ।।

‘দেশবাসী হরিশচন্দ্রের প্রতি সুবিচার করে নি’—ঐতিহাসিক  রমেশচন্দ্র মজুমদারের এই কথা কয়টি আমার মনে গেঁথে বসে গিয়েছিল । তাই আমি সাধ্যমতো হরিশের প্রচার ও স্মৃতি সংরক্ষণের কথা ভাবছিলাম । পত্র –পত্রিকায় আমার বইটির সমালোচনা প্রকাশিত হওয়ায় কিছুটা প্রচার হয় । ‘সংবাদ প্রতিদিন’ , ‘সকালবেলা’ , ‘আজকাল’ , ‘গণশক্তি’ , ‘বর্তমান’ প্রভৃতি পত্র পত্রিকায় চিঠি ও নিবন্ধ লিখি হরিশ মুখার্জী সম্বন্ধে । এই সময়ে আমার এক প্রাক্তন সহকর্মী এক প্রস্তাব দেন । তিনি হরিদাস মুখোপাধ্যায় । তিনি ছিলেন বর্ধমান জেলা পরিষদের সহ সভাপতি ।  তিনি বলেন বর্ধমান টাউন হলে সি পি এমের একটি সভায় আসছেন মন্ত্রী অশোক মিত্র । তাঁকে দিয়ে আমার বইটি উদ্বোধন হবে । উদ্বোধনপর্ব শেষ হবার পর হরিদাসবাবু তাঁদের গাড়িতে আমাকে নিয়ে যান হরিশ মুখার্জীর পৈত্রিক নিবাস শ্রীধরপুরে । গ্রামটি বর্ধিষ্ণু । এখানকার সমবায় সমিতি বেশ নামকরা । দেখি হরিশের একটি স্মৃতিস্তম্ভ । দাশরথি তা মহাশয়ের উদ্যোগে এটি তৈরি হয় । একটি মাটির একতলা বাড়ি দেখিয়ে বলা হয় , সেখানেই হরিশের বাড়ি ছিল । কিন্তু হরিশের আত্মীয়-স্বজনের হদিশ পাই নি । এখানে একটা কথা বলা দরকার । আমার বই প্রকাশিত হবার কিছুদিন পরে আমেরিকা থেকে দিবাকর মুখার্জীর একটি চিঠি পাই। তিনি নিজেকে হরিশ মুখার্জীর প্রপৌত্র বলে দাবি করেন । তাঁর হাতের লেখা ছিল দুর্বোধ্য । আর যে তিনি কি লিখেছিলেন , উদ্ধার করতে পারিনি । ঠিকানা অস্পষ্ট থাকায় তাঁকে চিঠিও দিতে পারিনি ।

হরিশের স্মৃতিরক্ষার ব্যাপারে আমি পত্রিকায় বেশ কয়েকটি চিঠি লিখেছিলাম । যেহেতু শাসক দলের আনুকূল্য ব্যতীত স্মৃতি রক্ষা সম্ভব নয় , তাই ১৯৯২ সালের ১৪ এপ্রিল বামফ্রন্টের প্রধান শরিক সি পি এমের মুখপত্র ‘গণশক্তি’তে একটি দীর্ঘ চিঠি লিখি। আমি ভেবেছিলাম হরিশের প্রতিবাদী, যুক্তিবাদী ভাবমূর্তি বামপন্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। সরকার যে কার্যকর কিছু করেননি তার একটি প্রমাণ ‘ সংবাদ প্রতিদিন’এ ২০১০ সালের ২৮ মে আমার লেখা একটি নিবন্ধ  :

                                                   “ সম্প্রতি হরিশ মুখার্জী রোডে হরিশ মুখার্জীর বাস্তুভিটা বলে পরিচিত একটি বাড়ি ভেঙে বহুতল করার ব্যাপারে পুরসভায় সরকারপক্ষ ও বিরোধীপক্ষের প্রবল বাদ-প্রতিবাদ হয়েছে । মেয়র মহাশয়ের বক্তব্যে জানা গেল , যে বাড়িটি ভাঙা হয়েছে সেটিতে হরিশ মুখার্জী জন্মগ্রহণ করেননি , জ্ঞানীগুণী সমন্বিত হেরিটেজ কমিটি সে কথা তাঁদের নিঃসংশয়ে জানিয়েছে ।

                                              “ হরিশ পার্কের উল্টোদিকে একটি হলুদরঙা দোতলা বাড়ির সামনে দেওয়ালের উপর লাগানো ছিল একটি প্লেট । সেই প্লেটে লেখা ছিল  ‘ এখানে হরিশ মুখার্জী জন্মগ্রহণ করেন’ । এখন প্রশ্ন হল হেরিটেজ কমিটির বক্তব্য অনুযায়ী সে বাড়ি যদি হরিশ  মুখার্জীর জন্মস্থান না হয় , তাহলে এই প্লেট কারা কবে লাগিয়েছিলেন ? তার কি কোন রেকর্ড আছে ? যে বাড়িটি ভাঙা হল সেটি কবে তৈরি হয় ? তার মালিকের নাম কি ?

                                             “ মেয়র মহাশয় এসব প্রশ্নের উত্তর দেন নি । কোথায় যে হরিশ মুখার্জীর বাড়ি ছিল , হেরিটেজ কমিটি বা পুরসভা এখনও পর্যন্ত তা নির্ণয় করতে পারেন নি । সঠিক স্থান নির্ণয়ের পূর্বে প্রচলিত বিশ্বাসকে বিনষ্ট করা অনৈতিক হয়েছে । ”

শুধু কলকাতার মেয়র নন, আমি এ ব্যাপারে মুখ্যমন্ত্রী , পৌরমন্ত্রী , তথ্য-সংস্কৃতিমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছিলাম। কোন উত্তর পাইনি।

দুর্ভাগা হরিশচন্দ্রের ছবি সংগ্রহের ব্যাপারেও ব্যর্থ হয়েছি এবং তাজ্জব বনে গেছি ।  বহু বাংলা ও ইংরেজি জীবনী গ্রন্থ ঘেঁটেছি । কোথাও তাঁর ছবি পাইনি । ২০১০ সালের ৩১ অক্টোবর বর্তমান পত্রিকার ‘রবিবারের পাতায়’ ‘বঞ্চনার শিকার হরিশ মুখার্জী’ নামে আমার একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয় । সেই পত্রিকা হাতে নিয়ে দেখি শিরোনামের উপর একটি ছবি। হরিশ মুখার্জীর এ ছবি কোথায় পেলেন ? পত্রিকার পক্ষে সফিউন্নিসা জানালেন তাঁরা নেট থেকে পেয়েছেন । তখন আমার কম্পিউটার ছিল না । আমি যাচাই করতে পারিনি । কিছুদিন পরে হরিশ মুখার্জীর আর একটি ছবি আমার সামনে হাজির হল।  আকাশবাণী কলকাতায় হরিশ মুখার্জী সম্নন্ধে আমার  ‘অপরাজে্য়’ নামে একটি শ্রুতিনাটক সম্প্রচারিত হয়। প্রযোজনা করেছিলেন সমরেশ ঘোষ। কয়েক বছর বাদে সে নাটক পুনঃ সম্প্রচারিত হলে সমরেশ তার সংবাদ হরিশের ছবি দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করেন । ‘বর্তমানে’র ছবির সঙ্গে এ ছবির মিল নেই । সমরেশ কোথা থেকে পেলেন এই ছবি ? তিনি জানালেন নেট থেকে পেয়েছেন। গুগল সার্চ করে আমি এবার সে ছবি দেখতে পেলাম । কিন্তু ছবির সূত্র দেওয়া নেই । ছবিটা আসল না নকল কে জানে ! হতভাগা হরিশ মুখার্জীকে কি জাল (!) ছবির বোঝা বয়ে বেড়াতে হবে?

এসে গেল ২০২৪ সাল । হরিশ মুখার্জীর দ্বিশত জন্মবর্ষ। এডুকেশন ফোরাম যে বইটি প্রকাশ করেছিলেন , তা নিঃশেষিত। আমি নব সংস্করণ প্রকাশের তাগিদ দিলাম প্রকাশককে। তিনি গুরুত্ব দিলেন না। এর মধ্যে আলাপ হয়েছে বাংলার মুখ প্রকাশনের প্রদীপকুমার চক্রবর্তীর সঙ্গে । তাঁকে বলাতে তিনি আগ্রহ দেখালেন । রাজি হলেন ‘ হিন্দু পেট্রিয়টের হরিশ মুখার্জী : ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব’ নামে বইটি প্রকাশ করতে। এটি সংশোধিত ও সংযোজিত সংস্করণ। তবু ক্ষোভ রয়ে গেছে আমার মনে। হরিশ মুখার্জীর ব্যক্তিগত জীবনের তথ্য , তাঁর হাতের লেখা , তাঁর আসল ছবি এখনও জোগাড় করতে পারি নি।

কতকাল ধরে হরিশ মুখার্জীর সন্ধান করে বেড়াচ্ছি। বারবার ব্যর্থ হয়েছি। কানে ভাসে বঙ্কিমচন্দ্রের কথা: ‘ বাঙ্গালীর ইতিহাস নাই, বাঙ্গালী ইতিহাস লিখিতে জানে না।’ 

 

 

 

 

         

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত