| 5 মার্চ 2024
Categories
শিশুতোষ

শিশুতোষ গল্প: হেমাপ্যাথি, এ্যালাপ্যাথি । হাসান আজিজুল হক

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট
 
 
তিরিশ পঁয়ত্রিশ বছর আগে আমাদের গাঁয়ে দু’জন ডাক্তার ছিলেন। একজন হেমাপ্যাথি আর একজন এ্যালাপ্যাথি।
গাঁয়ের লোক ঠিক ঠিক বলতে পারতো না। একজনকে বলত হেমাপ্যাথি আর একজনকে বলত এ্যালাপ্যাথি।
 
দু’জনের চিকিৎসার ধরণ ছিল বাঁধা। ওষুধও দিতেন একরকম। হোমিওপ্যাথ অঘোর ডাক্তারের কাছে গেলেই একটুখানি শাদা ময়দার মতো গুঁড়োতে দু’তিন ফোঁটা স্পিরিট টপ টপ করে ফেলে তিন চারটি পুরিয়া করে দিতেন। খেতে ভালোও লাগত না, মন্দও লাগত না। কখনো কখনো আবার স্রেফ টিউবওয়েলের পানিতে দু’তিন ফোঁটা স্পিরিট মিশিয়ে দিয়ে বলতেন, যা খাগে যা।
 
ওষুধ হাতে নিয়ে, আমি হয়তো ফস করে জিজ্ঞেস করে বসতাম, ডাক্তারবাবু ভালো হবেতো? অঘোর ডাক্তার দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বলে উঠতেন, ভালো হবে না মানে? ভালো হয়ে উপচে পড়বে। যা, ওষুধ খাগে।
 
আমি বলতাম, পেটের মধ্যে যে কেমন করে সব সময়।
 
করবে না? যা, আরো বেশি করে কাঁচা আম খাগে নুন মরিচ মাখিয়ে।
 
আমি বলতাম, পেটের ভেতর গরগর করে।
 
ও কিছু না, ব্যাঙ হয়েছে তোর পেটে।
 
ওরে বাবা ব্যাঙ হয়েছে আমার পেটে! গোঁ গোঁ শব্দ হয় যে ডাক্তারবাবু।
 
ও কিছু না, ব্যাঙ ডাকে গোঁ গোঁ করে। আমার ওষুধ যেই এক পুরিয়া খাবি, দেখবি তখন ব্যাঙের লাফানি।
 
কি করে দেখবো? ব্যাঙ যে পেটের ভেতরে। অঘোর ডাক্তার তখন বলতেন, ওরে বাবা, দেখবি মানে বুঝবি। বুঝবি খেলা।
 
এই হচ্ছে আমাদের গাঁয়ের এক নম্বর ডাক্তার অঘোরবাবুর কথা। এইবার দুই নম্বর তোরাপ ডাক্তারের কথা বলি। আগেই বলেছি, ইনি ছিলেন এ্যালোপ্যাথ ডাক্তার। কি করে যে তিনি ডাক্তার হয়েছিলেন, কেউ জানে না। শোনা যায়, বাল্যকালে তিনি নাকি এক বড় ডাক্তারের হুঁকো সাফ করতেন।
 
সে যা হোক, তোরাপ ডাক্তারের একটা ছোট্ট শেয়ালে রঙের বেতো ঘোড়া ছিলো। তার সামনের পা দুটি ছাঁদনা দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকতো প্রায় সময়। এই বাঁধা পা নিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে গাঁয়ের আশপাশে চরে বেড়াতো ঘোড়াটা। কারো ক্ষতি করতে দেখিনি কোনদিন।
 
বাইরের গাঁয়ে ‘কল’ থাকলে তোরাপ ডাক্তার ঘোড়াটার পিঠে একটা চটের বস্তা চাপিয়ে তার উপর জুৎ করে বসতেন। তিনি নিজে জুৎ করে বসতেন বটে, কিন্তু ডাক্তারের দেহের চাপে ঘোড়াটার শিরদাঁড়া বাঁকা হয়ে যেত। তারপর হটর হটর করে সেই বেতো ঘোড়া মাঠের মধ্যে দিয়ে আলপথ ধরে রুগীর গাঁয়ের দিকে এগোত।
 
তোরাপ ডাক্তারের দেহের কাঠামো ছিল বিরাট। কিন্তু কেমন যেন লোনা ধরা পুরনো ইটের বাড়ির মতো। সারা দেহটা তাঁর হলবল নড়বড় করছে! ইয়ামোটা চওড়া হাতের কব্জি, এই চওড়া মুখ; গালের উপরের দিকে দুই উঁচু হাড় যেন চামড়া ফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে। তাঁর গায়ের চামড়া ছিল খসখসে, চুলগুলো খোঁচা খোঁচা, ধ্যবড়া পা-জোড়া ছিল ফাটা। লোহার ডাণ্ডার মতো শক্ত কালো কালো মোটা মোটা আঙুল। দেখলেই পিলে চমকে যেত। লোকে বলতো, তোরাপ ডাক্তারকে দেখলেই রোগ পালায়, তা ঐ রকম চেহারা দেখলে কি আর রোগ থাকতে পারে?
 
তোরাপ ডাক্তার খালি ডাক্তারিই করতেন না কিন্তু। নিজের হাতে হালচাষ করতেন। বর্ষা আর শীতের সময় ডাক্তারির ধার ধারতেন না তিনি। বর্ষাটা হচ্ছে চাষবাসের সময় আর শীতকালটা হচ্ছে ফসল কাটার মরশুম। এই দুই মরশুমে তোরাপ ডাক্তার সারা দিনই থাকতেন মাঠে, নিজের একজোড়া রোগা বুড়ো বলদ দিয়ে জমি চষছেন, না হয় নিজের হাতে ধান রুইছেন। এই সময় রুগী মরে গেলেও তোরাপ ডাক্তারকে পাওয়া যাবে না।
 
বর্ষা আর শীতে গাঁয়ের লোকদের রুগী হয়ে শুয়ে থাকার কোনো উপায় নেই। এই দুই সময়ে কাজেই রোগটোগ সব শিকেয় তুলে রেখে দিতে হতো তাদের বাধ্য হয়ে। তারপর শরৎকাল এলে তোরাপ ডাক্তারের মোটামুটি অবসর হতো আর গাঁয়ের লোকদেরও রুগী হয়ে শুয়ে থাকার একটু-আধটু মওকা মিলতো।
 
এই সময়ের জন্যই যেন ওঁৎ পেতে থাকতো ম্যালেরিয়া জ্বর। বাঘ যেমন গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ লাফ দিযে ঝাঁপিয়ে পড়ে শিকারের টুটি কামড়ে ধরে ঠিক তেমনি করে ম্যালেরিয়া জ্বর এসে গাঁয়ের গরীব লোকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। এটা ঘটতো আশ্বিন মাস থেকে। ম্যালেরিয়ার মতো বাঘা জ্বর তখন আর কিছু ছিল না। ঘরে ঘরে মানুষ ছেঁড়া কাঁথা, ন্যাকড়া, ত্যানা গায়ে চাপিয়ে কোঁকাতো। আর সেকি কাঁপুনি! কাঁপুনি থামাবার জন্য পাথরের জাঁতা পর্যন্ত গায়ে চাপাতে দেখেছি।
 
এই সময়টায় ছিল তোরাপ ডাক্তারের মজা। ঘরে ঘরে লোক মালেরিয়া জ্বরে ধুঁকছে। চিকিৎসার জন্য তোরাপ ডাক্তার ছাড়া গতি নেই। ম্যালেরিয়া পুরনো হয়ে গেলে কিছুতেই সারতে চায় না। পেটের মধ্যে পিলে উঁচু হয়ে ওঠে, হাত পা হয়ে যায় প্যাঁকাটির মতো সরু। তোরাপ ডাক্তারের এই রকম অনেক পিলে-ওঠা পুরনো ম্যালেরিয়া রুগী ছিল।
 
রোগের আর একটা সময় ছিল চোত-বোশেখ মাস। এই সময়টায় কলেরা আর বসন্ত হয়ে গ্রামকে গ্রাম সাফ হয়ে যেত। গাঁয়ে কলেরা লেগেছে শুনলে আনন্দে তোরাপ ডাক্তারের চোখ চকচক করে উঠতো। ম্যালেরিয়া আর কলেরার সব রুগী তোরাপ ডাক্তারের। এখানে অঘোর ডাক্তারের কোনো ভাগ ছিলো না। জ্বর হলে, সর্দি হলে, বেশি খেয়ে বা অখাদ্য কুখাদ্য খেয়ে পেট ছেড়ে দিলে লোক অঘোর ডাক্তারের কাছে যেত। আনা দুই পয়সা দিলেই, তিনি দিয়ে দিতেন দুই তিন পুরিয়া ওষুধ। পয়সা দিতে না পারলে ধারেও দিতেন। এমন কি একটা লাউ বা দুটো শশা নিয়ে গেলেও তিনি রুগী ফেরাতেন না।
 
অঘোর ডাক্তারের চাষবাসও ছিল না, ভিনগাঁয়ে ‘কলে’ যাবার ঘোড়াও ছিল না। হোমিওপ্যাথি ওষুধ রাখার জন্য একটা কাঠের বাক্স ছাড়া চিকিৎসার সরঞ্জাম বলতে আর কিছুই ছিল না তাঁর। তবে ওরকম বাক্যবাগীশ লোক লাখে একটা মিলবে কিনা সন্দেহ।
 
বেলা আটটার সময় তিনি ঝকঝকে একটা পেতলের গাড়ু হাতে মাঠ থেকে প্রাতঃকৃত্য সেরে রুগীদের বসিয়ে রেখেই তাঁর বৈঠকখানার উঁচু দাওযার একদিকে বসে নিমের দাঁতন দিয়ে দাঁত মাজতেন, আর হাক-থু হাক-থু করে গলা, জিভ পরিষ্কার করতেন। সারা গাঁয়ের লোক টের পেতেন অঘোর ডাক্তার মুখ-হাত ধুচ্ছেন। একদিকে হাত মুখ ধোয়া চলছে, অন্যদিকে কথার তুবড়ি ছুটছে তাঁর মুখ দিয়ে।
 
তিনি বলতেন, বলি মরতে তোরা আমার কাছে আসিস কেন বল দিকিনি। তোরাপের কাছে যা না। তা তো যাবি না, গেলে যে ব্যাটা কসাই ঘাড়টি মটকে তাজা রক্ত খাবে তোদের। বলি, একি ডাক্তারি বল দিকিন তোরা? তুই বললি, আমার অসুখ করেছে, আর অমনি তোরাপ হয় ছুরি বার করবে, না হয় কোদাল বার করবে, না হয় কুড়াল বার করবে…
 
একজন রুগী হয়তো বাধা দিযে বললো, না না ডাক্তাবাবু, তোরাপ ডাক্তার আবার কোদাল কুড়ুল কবে বার করলে!
 
ঐ হলো, লাঙলের ফালের মত ছুঁচওয়ালা একটা বোতল বার করলে। কি? না ইঞ্জেকশন দোব, গলা কাটবো, মারবো, ধরবো। তারপর ওষুধ চাও, দেবে তোমাকে এক বোতল পিশেচের রক্ত, ওয়াক থুঃ! যেমন দুর্গন্ধ, তেমনি বিচ্ছিরি সোয়াদ, ছ্যা ছ্যা ছ্যা! আর আমাদের হোমিওপ্যাথ কি করছে? বাঘ যেমন ভেড়ার পাল তাড়িয়ে নিয়ে যায় ঠিক তেমনি করে একটি পুরিয়ার আমার এই ওষুধ তোমার পায়ের আঙুলের ডগা থেকে বীজাণু বাবাজীদের খেদাতে খেদাতে মাথার চুলের ডগা দিয়ে বার করে দিচ্ছে। অথচ তুমি জানতেও পারছো না।
 
এই রকম তোড়ে বক্তৃতা করতেন অঘোর ডাক্তার। পয়সা কম লাগে বলেই হোক, আর বক্তৃতার জন্যই হোক, সারা বছরই দু’চারটি রুগী অঘোর ডাক্তারের কাছে যাতায়াত করতো। রুগী না পেলে তোরাপ ডাক্তার রাগে গজ গজ করতেন, ও ব্যাটা অঘোরের সব ওষুধ আমি একবারে খাবো, আমার কিছুই হবে না। আর ও খাক দিকিনি আমার একশিশি ওষুধ, দ্যাখ কি হয়!
 
কেউ হয়তো জিজ্ঞেস করল, কী হবে ডাক্তার সাহেব?
 
একশিশি খেলে? তোরাপ ডাক্তার জিজ্ঞেস করতেন, তারপর নিজেই জবাব দিতেন, জামা-কাপড় খারাপ হয়ে যাবে, গাড়ু হাতে ঘর বার করতে করতে জান নিকেল যাবে।
 
আপনার ওষুধে বিষ আছে সবাই জানে।
 
এই কথা শুনে রাগে তোরাপ ডাক্তারের মুখের চেহারা একেবারে গরিলার মতো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠত। জ্ঞানহারা হয়ে চিৎকার করতেন তিনি গলা ফাটিয়ে, বিষ আছে? আছেই তো। বিষ ছাড়া ওষুধ হয় ইগনোরেন্ট কোথাকার! নিয়ে আয় তোদের অঘোর ডাক্তারকে, একটি ডোজে তাকে চৌদ্দভুবন দেখিয়ে দেব।
 
সে বছর শরৎকালে ধান কেবল ডাঁসিয়ে উঠছে, ধানের ভেতর সাদা দুধ জমে চাল বাঁধছে, বেশ ঝরঝরে আবহাওয়া, আকাশ ভর্তি রোদ, একটু একটু ঠাণ্ডা হাওয়া বইতে শুরু করেছে। এমনি সময়ে হুড়মুড়িয়ে চলে এলো ম্যালেরিয়া জ্বর। ঠিক যেন পাহাড় বেয়ে একটা পেল্লাই ভালুক নেমে এলো।
 
ব্যাস, ম্যালেরিয়া জ্বরে লোক দমাদম বিছানা নিতে লাগলো। ছেলে-বুড়ো কেউ বাদ যায় না। ম্যালেরিয়া যাদের পুরনো হয়ে গেছে তাদের তো খুব মজা। ঠিক বেলা দশটার সময় চোখে সূর্যটা একটু হলুদ হলুদ ঠেকে, তারপর গা একটু গরম হয়, চোখ দুটি সামান্য জ্বালা করে। তবে তারপর হুড় হুড় করে এসে পড়ে জ্বর। সঙ্গে সঙ্গে কি পিপাসা! ঘটি ঘটি পানি খেয়ে পিপাসা কমে না।
 
পানি পেটে গিয়ে গরম হয়ে যায়, তারপর গা-টা গুলিয়ে ওঠে, তারপরেই বমি। বমি হয়ে গেলেই আবার পিপাসা। আবার ঘটি ঘটি পানি খাওয়া, তারপর আবার বমি। এই করতে করতে বিকেল হয়ে যায়, নীল আকাশে একটা অদ্ভুত সুন্দর আলোর আভা রেখে সূর্য ডুবে যায়। জ্বর কমে আসে আস্তে আস্তে! রাত দশটার দিকে একদম জ্বর চলে গিয়ে গা ঠাণ্ডা।
 
পরের দিন আবার বেলা ঠিক দশটার সময় জ্বর-ভালুক গুঁড়ি মেরে লোকের বাড়ি বাড়ি চলে আসে। গাঁয়ের অর্ধেকের বেশি লোক ম্যালেরিয়া জ্বরে পড়লো। তোরাপ ডাক্তারের আনন্দ আর ধরে না। হলুদ রঙের বড়ো বড়ো বিকট দাঁত বের করে এ্যাই-বড় সিরিঞ্জ নিয়ে, রুগীদের বাড়ি বাড়ি ঘুরতে লাগলেন তিনি। দুই পকেট ভর্তি ম্যাপাক্রিন বড়ি। সে যে কি ভয়ানক বড়ি ভাবা যায় না। রুগী যেখানেই থাক, সে মাটির দাওয়াতেই হোক আর খোলা আকাশের নীচের উঠোনেই হোক বা ঘরের ভেতরেই হোক, গলায় স্টেথোটি ঝুলিয়ে ইনজেকশনের বাক্সটি হাতে নিয়ে তোরাপ ডাক্তার ঠিক হাজির।
 
লোকেই বা আর কি করে, যেমন তেমন করে সুস্থ হয়ে না উঠলেও তো পেট চলে না। ছেলেমেয়ে খাবে কি? কষ্টে-সৃষ্টে চাষবাস করে বা জনমজুর খেটেই তো সবাই কোনরকমে সংসার চালায়। কাজেই বাধ্য হয়ে তোরাপ ডাক্তারকে ডাকতেই হয়। বেচারা অঘোর ডাক্তারের গুঁড়োতে যে কোন কাজই হয় না।
 
সে যাই হোক, ঘরে ঘরে ঢুকেই গোদ গোদা এ্যাঁকাব্যাঁকা আঙুল দিয়ে তোরাপ ডাক্তার রুগীর কব্জী চেপে ধরে কিছুক্ষণ নাড়ী পরীক্ষা করতেন। মুগুরের মতো সেই ধ্যাবড়া আঙুলের চাপেই রুগীর নাড়ী ছেড়ে যাবার দশা হতো। নাড়ী দেখা হলে তোরাপ ডাক্তার রুগীকে বলতেন, জিভ বার কর। তারপর সেই জিভ বার করা অবস্থাতেই আদ্যিকালের স্টেথোটা গলা থেকে কুলে খানিকক্ষণ বুক পেট দেখে বলতেন, হয়েছে, আর জিভ বা করে থাকতে হবে না, আমার বোঝা হয়ে গেছে।
 
রুগীর সব বলাই সাধু। হয়তো জিজ্ঞেস করলো, তবে কি ‘ম্যালোরি’ জ্বর ডাক্তার সাহেব?
 
তোরাপ ডাক্তার দাঁত কড়মড়িয়ে বলতেন, তাছাড়া আর কি হবে? এই যে দেখাচ্ছি মজা, একটি ইঞ্জেকশনে ম্যালেরিয়ার ভূত ছাড়াবো, এই বলে আশপাশের লোকদের আদেশ দিতেন ধরোতো এটাকে চেপে, সুঁইটা দিয়ে দিই একবার। আর দুটো টাকা রাখো এখানে আমার সামনে, আমার ফি আর ওষুধের দাম। উঁহু আগে টাকা রাখ, তারপর অন্য কাজ।
 
এই বলে তোরাপ ডাক্তার একদিকের পকেটে টাকা দুটো ভরতেন, পকেট থেকে বের করতেন ইঞ্জেকশন দেবার সিরিঞ্জ। কি প্রচণ্ড সিরিঞ্জ আর তার ছুঁচ তো নয়, ঠিক যেন মোষের লাঙলের ফলা। লোকের গায়ে ফুঁড়তে ফুঁড়তে ছুঁচের মাথা গিয়েছে ভোতা হয়ে। সেই ভয়ানক যন্ত্র দেখেই তো রুগী বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে পালাবার চেষ্টা করতো। তোরাপ ডাক্তার চিৎকার করতেন, ধর ধর, ঠেসে, চেপে ধর, সঙ্গে সঙ্গে তিন চারজন ষাড়গোছের লোক গিয়ে বিছানার সঙ্গে চেপে ধরতো রুগীকে।
 
তারপর কোমরের কাপড়ের কষিটা খুলে তোরাপ ডাক্তার মাংসের মধ্যে প্যাঁট করে ঢুকিয়ে দিতেন সেই মোটা ছুঁচ। সাথে সাথে রুগীর সমস্ত পা-টা যেত অবশ হয়ে। এইরকম করে ইঞ্জেকশন দিয়ে সে বছর শৎকালে তোরাপ ডাক্তার দু’হাতে টাকা রোজগার করতে লাগলেন। ম্যালেরিয়ার প্রকোপ যত বাড়ে ততই বাড়ে তাঁর রোজগার। ইঞ্জেকশন দিয়ে তিনি দু’তিনটে লোককে তো চিরদিনের জন্য খোঁড়া করে দিলেন। তাঁর ম্যাপাক্রিন বড়ি খেয়ে কয়েকজন তো চিরকালের জন্য কালা হয়ে গেল।
 
তবু লোকে বাধ্য হয়ে তার কাছেই যেতে লাগরো। হোমিওপ্যাথি ওষুধ দিয়ে ম্যালেরিয়ার মতো দুর্দান্ত জ্বর ঠেকানোর সাধ্য ছিল না অঘোর ডাক্তারের। তাঁর কাছে আর কেউ যান না। এদিকে ম্যালেরিয়ার ভয়ে সর্দি, কাশি, হাঁপানি, অজীর্ণ, পেট ফাঁপা এইসব রোগ কোথায় যে পালালো! অঘোর ডাক্তার সকালবেলায় বৈঠকখানার ফাঁকা দাওয়ায় বসে হাক-থু হাক-থু করে গলা পরিষ্কার করেন আর তোরাপ ডাক্তারের মুণ্ডুপাত করে গালাগালি দিতে থাকেন। এক পয়সা উপার্জন নেই, একটা রুগীও এদিকে মাড়ায় না। তাঁর সংসার চলাই দায় হয়ে উঠলো।
 
শেষ পর্যন্ত কি আর করেন তিনি। একদিন অঘোর ডাক্তার চুপিচুপি জেলা শহরে গিয়ে একটা সিরিঞ্জ আর কিছু কুইনাইন ইঞ্জেকশন কিনে আনলেন। মনে মনে বললেন, তোরাপটার বড্ড বাড় বেড়েছে। খুব দু’পয়সা করে নিচ্ছিস না? কিন্তু আমি হচ্ছি সব্যসাচী, সে খবরটা তো জানিস না তোরাপ। আমি দুই হাতে তীর ছুঁড়তে পারি। ইচ্ছে হলে হোমোপ্যাথি করবো আবার ইচ্ছে হলে এ্যালাপ্যাথি ইঞ্জেকশন দেব। মনে মনে এইসব কথা ভেবে তিনি সিরিঞ্জের ছুঁচ কিনলেন খুব মিহি দেখে। কাউকে কোন কথা না বলে সরঞ্জাম সব কিনে চুপি চুপি বাড়ি ফিরে এলেন সন্ধ্যেবেলা।
 
পরের দিন সকালবেলায় মুখটি ধুয়ে দাওয়ায় কাঠের টুল পেতে কেবল বসেছেন তিনি। এমন সময় ইদরিস আলীর বাড়ি থেকে লোক এলো। ইদরিস আর তার পুরো পরিবার অনেকদিন থেকে তাঁর রুগী। শত অসুখে বিসুখে তারা কোনদিন তোরাপ ডাক্তারের কাছে যায় না, বলে হেমাপ্যাথির ওপর ওষুধ আছে নাকি ডাক্তারবাবু? মরলে আপনার হেমাপ্যাথি খেয়েই মরব, তবু তোরাপ ডাক্তারের হাতে জান দিতে পারব না।
 
ইদরিস আলীর বাড়ির লোকের কাছ থেকে অঘোর ডাক্তার শুনলেন যে গত পাঁচ সাত দিন থেকে ইদরিস নিদারুণ ম্যালেরিয়া জ্বরে বেহুঁশ। কিন্তু তোরাপ ডাক্তারের নাম করলেই তার হুঁশ ফিরে আসছে আর তখন সে বলছে, আমি অঘোর ডাক্তারের হেমাপ্যাথি খেয়ে মরবো, কিছুতেই এ্যালাপ্যাথি চিকিচ্ছে করাবো না।
 
কথা শুনে অঘোর ডাক্তার মিটিমিটি হেসে বললেন, কেন রে, এ্যালাপ্যাথি চিকিচ্ছেটা খারাপ হলো কোথায়। তোরাপ হলো ডাকাত, ও আবার ডাক্তার হল কবে ? এখন থেকে আমিই এক-আধটু এ্যালাপ্যাথি করবো ভাবছি। ইদরিসের বাড়ির লোকটা অবাক হয়ে বলল, তুমি এ্যালাপ্যাথি করবে কি গো? তুমি আবার সুঁই দেবে নাকি?
 
অঘোর ডাক্তার রেগে বললেন, কেন দেব না কেন? সব বিদ্যাই জানা আছে আমার বুঝলি? চিকিচ্ছেটা তোরাপের লাঙল চালানো নয়। কেমন মিহি সুঁই কিনেছি দেখবি। ইদরিসকে আজ ফুঁড়বো। তুই যা, আমি আসছি। আর শোন বাবা, দুটো টাকা আগে জোগাড় করে রাখিস। তোরাপও দু’টাকা করে নেয়, আমাকে দিবি না কেন?
 
অঘোর ডাক্তার কুইনাইন ইঞ্জেকশন দিবেন এই খবর দেখতে দেখতে সারা গাঁয়ে চাউর হয়ে গেল। গাঁয়ের যত সুস্থ মানুষ ছিলো, সব ছুটলো ইদরিসের বাড়ির দিকে। ইদরিসের মেটে বাড়ির ছোট্ট ঘরে আর তিল ধারণের জায়গা নেই, একটা লোক কোমরে চাদর জড়িয়ে হেঁড়ে গলায় চেঁচাতে লাগলো, এই, এই সব বাতাস ছেড়ে দাও, বাতাস আসতে দাও। কিন্তু কে কার কথা শোনে! অঘোর ডাক্তার হেমাপ্যাথি ছেড়ে ইঞ্জেকশন দেবে একি সোজা কথা!
 
রোগা অঘোর ডাক্তার বহু কষ্টে ঘরে ঢুকে, ট্যাক থেকে সিরিঞ্জ, ওষুধ এইসব বের করলেন। লোকজনের দিকে তাকিয়ে তাঁর দুই হাঁটু থর থর করে কাঁপতে লাগলো। মুখে অবশ্য তম্বি করলেন, ভিড় কমাও, আলো আসতে দাও তোমরা।
 
এই কথা বলে বহু কষ্টে সিরিঞ্জের মাথায় ছুঁচ লাগালেন, তারপর ওষুধ ভরে রুগীর দিকে এগিয়ে গেলেন। ঠিক এই সময় জ্বরের ঘোর ভেঙ্গে জবা ফুলের মত গোল দুটো চোখ মেলে ইদরিস বলল, ডাক্তারবাবু শেষে আপনার এই কাজ। এই বলে ইদরিস চোখ বন্ধ করে মড়ার মত পড়ে রইল। অঘোর ডাক্তার বললেন, ধর বাবা তোরা, ইদরিসকে একটু ধর। চোখ না খুলেই ইদরিস বললো, কাউকে ধরতে হবে না ডাক্তারবাবু আপনি ইঞ্জিশন দ্যান। বরঞ্চ আপনাকে ধরতে হলে বলুন ওদেরকে বলুন।
 
হঠাৎ কেমন বোকার মতো অঘোর ডাক্তার হাসলেন, তারপর ইদরিসের কোমরের নিচে মাংসে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, হেঁ হেঁ বড় মিহি কিনেছি ছুঁচটা, এই তুললাম, এই কথা বলে সকলের দিকে প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় আবার বললেন, হেঁ হেঁ তোরাপের কম্ম নয়, তোমরা দ্যাখো একবার, এই তুললাম সিরিঞ্জ, এইবার এইবার বলেই প্যাঁট করে সিরিঞ্জের ছুঁচ ঢুকিয়ে দিলেন ইদরিসের কোমরের মাংসে। হাত কাঁপতে লাগলো তাঁর, বারবার বলতে রাগলেন, গভীর করে ফুঁড়তে হবে, গভীর করে ফুঁড়তে…এই যাঃ।
 
পট করে একটা আওয়াজ উঠল আ হাহাকার করে উঠলেন অঘোর ডাক্তার, হায় হায়, ছুঁচ ভেঙ্গে গেছে, ছুঁচ ভেঙ্গে গেছে, গেল গেল, সর্বোনাশ হল, হায় হায়…
 
ছুঁচটা তখন মাংসের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে। অঘোর ডাক্তারের শীর্ণ দুই হাত আঁতিপাঁতি করে খুঁজে বেড়াচ্ছে সেটাকে। তখন কোথা থেকে একটা জোয়ান ছেলে ছুটে এসে দাঁত দিয়ে কামড়ে তুলে ফেলল ছুঁচটা ইদরিসের কোমর থেকে। সবাই চুপ করে আছে, ছেলেটা দাঁত থেকে খুলে হাতে নিল ছুঁচাটা, অঘোর ডাক্তারের দিকে চেয়ে বললো, এই যে ডাক্তারবাবু পেয়েছি। অঘোর ডাক্তার দেখতে পেলেন না। ক্ষোভে দুঃখে তখন তাঁর চোখে অশ্রুর ঢল নেমেছে।
 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত