উদ্বেগকে এড়িয়ে যাবেন না

ডাঃ মোঃ রমজান সরকার সাজ্জাদ
এমবিবিএস, এমপিএইচ, সিসিডি
মনোরোগ ফিজিশিয়ান, টিএম‌এস‌এস মেডিকেল কলেজ, বগুড়া

 

 

মানসিক অসুখ নিয়ে আমাদের সমাজে বিস্তর দৈন্য ও অপপ্রচার দেখা যায়, অথচ মানবদেহের সামান্য একটি কোষের পচন যেমন মনোযোগ দাবী করে তেমনই মনের অসুখ চিকিৎসার আওতায় আনা আবশ্যক, জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে মানসিক সুস্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক, একটি সামাজিক গবেষণায় দেখা যায় সাউথ এশিয়ান মহিলারা মানসিক সমস্যাকে যে কোন লাইফ ইভেন্ট হিসেবে দেখে এবং এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করে। যেমন, আপনজনের মৃত্যু, পরীক্ষায় খারাপ ফল, দাম্পত্য কলহকে সমস্যা বলে তুলে ধরে মনের সমস্যাকে ধামাচাপা দেয়। এই প্রবণতা এই অঞ্চলের একটি গুরুতর সমস্যা। এর কুফল হিসেবে হীনমন্যতা, পেশাগত দৈন্য, পারিবারিক দুর্দশা একেকজন সম্ভাবনাময় মানুষকে ছিটকে ফেলে গুণগত জীবনধারা হতে।

 

এই অঞ্চলে মানসিক ব্যাধিকে সামাজিকভাবে হেয় করার চল রয়েছে, এ কারণে প্রায় ৭০ ভাগ মানসিক সমস্যাকে ব্যক্তি তাঁর সমগ্র জীবন বহন করে চলেন এবং তীব্র গ্লানিতে ভোগেন।  সময়ের পরিক্রমায় এই দৃশ্যগুলির কৌশলগত পরিবর্তন আবশ্যক। মানসিক ব্যাধি যখন শারীরিক উপসর্গ তৈরি করে ঠিক তখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন লোকজন, এবং তখন হয়তো উপসর্গের ইতিহাস জেনে চিকিৎসক পথ্য দেন, এভাবে দিনের পর দিন উপসর্গের চিকিৎসায় রোগি একসময় বিফল হয়ে নিজেকে বিশেষ কোনরোগের শিকার ভেবে হতাশ হয়ে পড়েন।  এই পর্যায়ে আমরা উদ্বেগজনিত নানাবিধ সমস্যা নিয়ে আলোচনা করব যা প্রতিযোগিতামূলক দৈনন্দিক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্থ করে এবং ব্যক্তিকে তাঁর যথাযথ জীবনমান থেকে সরিয়ে দেয়।

 

উদ্বেগকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে Neurosis বলা হয় যা কিনা এমন কোন মানসিক উপসর্গের উদ্রেক করে যেগুলি ব্যক্তির পারিবারিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগত পারফর্মেন্সে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে তবে মনের থট কন্টেন্ট বা চিন্তাপ্রক্রিয়া বাস্তবতার সীমানায় আবদ্ধ থাকে, তীব্র মানসিক চাপ থেকে ব্যক্তি যখন সার্বক্ষণিক দুশ্চিন্তায় ভুগতে শুরু করে এবং নিজের দৈনন্দিক কার্যক্রমে স্থবিরতা ও গ্লানি বোধ করতে শুরু করে তখন এটি Anxiety Disorder নামক একটি বিশেষ ব্যাধিতে পরিণত হয়।  Anxiety Disorder এ সাধারণত নিচের উপসর্গসমূহ প্রতীয়মান হয়-

 

মানসিক উপসর্গঃ

-অস্থিরতা

-পাপবোধ

-মৃত্যুভয়

-মনোযোগে ঘাটতি

-অল্পতেই চমকে ওঠা

-দুশ্চিন্তা

 

শারীরিক উপসর্গতঃ

-অতিরিক্ত ঘাম

-শরীরে কাঁপুনি

-বুক ধড়ফড় করা

-বুক চাপবোধ হওয়া

-শ্বাসকষ্ট হওয়া

-গলা শুকিয়ে আসা

-ঘন ঘন প্রসাব হওয়া

-পাতলা পায়খানা

-খাবার গিলতে কষ্ট হওয়া

-যৌন অনাগ্রহ

-ঝিমুনি লাগা

-পেশি শিরশির বোধ করা

-মূর্ছা যাওয়া

-অনিদ্রা

সাধারণত এই উপসর্গগুলি আরো বিশেষ কিছু রোগের উপসর্গের সাথে মিলে যায়, এবং সঠিক ধারণা না থাকায় রোগিরা হৃদ্ররোগ/ স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে ছুটে যান এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যাতিরেকেই হতাশ হয়ে পড়েন, নিচে উল্লেখ্য রোগেও এই লক্ষণগুলি পাওয়া যায়-

 

-হার্ট এটাক

-থাইরয়েডজনিত রোগ, হাইপোথায়রডিজম

-রক্তে শর্করা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া, হাইপোগ্লাইসেমিয়া

-ফিওক্রোমোসাইটোমা

-দীর্ঘদিনের সেবনকৃত কোন ওষুধ চট করে বন্ধ করে দেয়া

 

এইসব কারণে ব্যক্তি আতংকিত হয়ে পড়েন এবং প্রচুর অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে শুরু করেন, আসল বিষয়টি হলো যথাযথ রোগেতিহাস লিপিবদ্ধ করে সঠিক চিকিৎসার আওতায় আসা। প্রথম কথায় ফিরে যাই, Anxiety Disorder একটি গুরুতর মানসিক ব্যধি যদি একে গুরুত্ব না দেয়া হয়, এবং সামান্য একটি রোগ যদি চিকিৎসা করানো যায়। সামাজিক লজ্জার ভয়কে কাটিয়ে চিকিৎসা করালে রোগটি পূর্ণ নির্মূল সম্ভব এবং এতে ব্যক্তিজীবন সুন্দর করে তোলা সম্ভব।

 

…চলবে

One thought on “উদ্বেগকে এড়িয়ে যাবেন না

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত