হেল্পিং হ্যান্ড

শিক ঘড়ি দেখলো। ঘড়িতে তিনটা পনেরো বাজে। দশটা থেকে এইখানে এই আধো-অন্ধকার ঘরটাতে বসে আছে সে। সকালে দুটা ডালপুরি খেয়েছিলো মোড়ের দোকান থেকে। খিদেটা বাড়ছে ক্রমশ। তার ওপর পেটের মধ্যে গুটগুট গুটগুট শব্দ হচ্ছে, অ্যাসিডিটি। আর কতোক্ষণ বসতে হবে তিনি বুঝতে পারছে না। পানির পিপাসাও পেয়েছে। কিন্তু পানি খাওয়ার কোনো ব্যবস্থাও দেখছে না।

তার সিরিয়াল তেরো। তারপরে আর কেউ নেই। কাকতালীয়ভাবে আজকের তারিখটাও তেরো। আনলাকি থার্টিন। তবে তেরো সংখ্যাটি তার জীবনে কখনো আনলাকি হিশেবে আসেনি। তার প্রথম যৌন অভিজ্ঞতাও তেরো তারিখেই হয়েছিলো। এটা অবশ্য কাকতাল ছিলো না। এটা ছিলো পরিকল্পিত, আগে থেকেই ঠিক করা। ইচ্ছে করেই তারা তেরো তারিখে ডেট করেছিলো। মেয়েটার ইচ্ছাতেই সব হয়েছিলো। আশিক মনে হয় মেয়েটার প্রেমেও পড়েছিলো। কারণ সেইদিনের পর মেয়েটার সঙ্গে আর দেখা হওয়ার কোনো সুযোগ ছিলো না বলে একদিন সারারাত সে চিৎকার করে কেঁদেছিলো। মেয়েটা সেদিন দুপুরে যখন তার ঘরে এসেছিলো, তারপাশে বিছানায় শুয়ে উন্মোচিত হয়েছিলো—তখন আশিকের মনে হয়েছিলো তার সস্তার খাটটা আসলে জাহাজের ডেক। তারা আসলে গভীর সমুদ্রে জাহাজের ডেকের ওপর শুয়ে আছে।


কলিংবেলের শব্দে আশিকের ভাবনাজাল ছিঁড়ে গেলো। সে নড়ে চড়ে বসলো। এখন বারো নম্বর সিরিয়ালের লোকটি ঢুকলো। এর পরেই তার ডাক পড়বে। সে কাগজের বিজ্ঞাপনটাতে আরেক বার চোখ বুলালো। অস্ফূটে পড়লো, ‘হেল্পিংহ্যান্ড’।


‘কী নাম?’

‘আশিক।’

‘ভালো নাম?’

‘আশিকুল ইসলাম।’

‘জন্ম?’

‘১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১।’

‘বাহ্! আপনার নাম তো আশিক না হয়ে স্বাধীন হওয়া উচিত ছিলো। কই, কাগজপত্র দেখি।’

আশিক তার সামনে বসা ভারিক্কি চেহারার লোকটিকে হাতের ফাইলটি এগিয়ে দিলো। লোকটি ফাইল খুলে কাগজপত্র এলোমেলো করে ফাইল ব›ধ করলো।

‘পড়াশোনা?’

‘কমার্স গ্রাজুয়েট।’

‘কোন ক্লাস?’

আশিক অস্বস্তিতে পড়ে গেলো। সে অস্বস্তি নিয়েই বললো, ‘থার্ড ক্লাস’।

‘এই চাকরি নিতে আসছেন কেনো?’

‘দরকার, স্যার।’

‘পাহাড়ে চড়ার অভিজ্ঞতা আছে?’

‘জি, স্যার।’

‘কতোবার উঠেছেন?’

‘স্যার, কতোবার হিশেব নাই। আমার জন্ম তো স্যার পাহাড়ে…’

‘ইন্টারেস্টিং তো! কীভাবে?’

‘মানে আমার বাবা স্যার ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে চাকরি করতেন।’

‘গুড! তাহলে তো আপনার জন্যে কাজ করা সহজ হবে।’

‘জি, স্যার।’

‘ঠিক আছে যান। কাজে লেগে পড়েন। এখন থেকেই পারবেন তো।’

‘জি স্যার।’

‘ওকে, গুড।’

‘কিন্তু স্যার কাজটা কী ঠিক বুঝতে পারছি না। যদি বলতেন…’

‘না বুঝেই চলেই এসেছেন?’

আশিক নম্রভাবে হাসলো, ‘বিজ্ঞপ্তিতে লেখা ছিলো আপনাদের একজন হেল্পিংহ্যান্ড দরকার।’

‘হ্যাঁ, হ্যাল্পিংহ্যান্ড। আপনার কাজ একমাসের। একমাসের কাজ একদিনে শেষ করলেও পুরো পেমেন্ট পাবেন। এক সপ্তাহে পারলেও তা, একমাসেও তা। তবে মনে রাখবেন একমাসের মধ্যেই শেষ করতে। এর পরে আপনাকে আর দরকার হবে না।’

‘কাজটা কী, স্যার?’

‘পাশের রুমে যান। আমার সেক্রেটারি আপনাকে কাজ বুঝিয়ে দেবে।’

আশিক ভেবেছিলো সেক্রেটারি সুন্দরী কোনো মেয়ে হবে। সিনেমার ভিলেন টাইপ একটা লোক তাকে বসতে বললো। আশিক বসলো। বসেই মেঝেতে চোখ আটকে গেলো, দশবারোটা ভাঙা গ্লাস পড়ে আছে। মেঝেতে ভাঙা গ্লাস কেনো সে ভেবে বের করতে পারছে না।


তেত্রিশ মিনিট মতো হয়ে গেলো সেক্রেটারি লোকটা তার দিকে একবার তাকিয়েও দেখেনি। কম্পিউটারে ঘটরঘটর করে কী যেনো কাজ করছে। হঠাৎ করে লোকটা তার দিকে চোখ তুলে তাকালো। এবং মৃদু হাসলো। লোকটার হাসি সুন্দর। লোকটা টেবিলের কোণায় রাখা ফ্লাক্স থেকে একটা গ্লাস পূর্ণ করে তার দিকে এগিয়ে দিলো। বললো, ‘নেন ভাই, কফি পান করেন। ভালো কফি। একটু তিতা লাগবে কিন্তু টেস্ট অন্য রকম। মেশিনে বানিয়ে দিতে পারলে আরো ভালো হতো…’


আশিক কফির গ্লাসটা হাতে নিতে নিতে নম্রভাবে জানতে চাইলো, ‘ভাই, আমার কাজটা যদি বুঝিয়ে দিতেন!’

সেক্রেটারি লোকটা সহজ ভঙ্গিতে বললো, ‘আপনাকে একটা খুন করতে হবে।’

আশিকের হাত থেকে কফির গ্লাসটা মেঝেতে পড়ে গেলো।

 

এই পাহাড়টা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে থেকে আটহাজার ফিট উঁচু। হাত দিলেই মেঘ ছোঁয়া যায়। কালোমেঘ, শাদামেঘ, ছাইমেঘ, লালচেমেঘ, ঘুল্লুমেঘ, উল্লুমেঘ, খোকামেঘ, বোকামেঘ আরো কতো কতো মেঘ! রামধনুর হাতল ধরে রঙের চাকাও চাইলে হয়তো ঘোরানো যায়। আশিকের অবশ্য এখনো তা করতে ইচ্ছে করেনি। সে পাহাড়ের প্রান্তে দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার মন কী এক প্রশান্তিতে ডুবে আছে। সে জানে তার চাকরির মেয়াদ আগামীকাল তিনসপ্তাহ পূর্ণ হবে। তারমানে এই পাহাড়ের ওপর মেঘদূত রিসোর্ট এ তারা আছে তিনসপ্তাহ ধরে। কিন্তু তার এখনো কাজের কোনো অগ্রগতি হলো না। এই নিয়ে অবশ্য তার ভাবনা নেই। সে ভাবছে অন্যকিছু। কেমন করে এইসব মেঘের ওপর পা রেখে রেখে দূরের পাহাড়টার কাছে যাওয়া যায়। সে ঘোরলাগা চোখে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে। তার মনে হচ্ছে অনেক দূর থেকে তার নাম ধরে কেউ ডাকছে। তার ঘোর কেটে গেলো। সে পেছন ফিরে তাকালো। আরিফ তাকে ডাকছে।

‘আশিকভাই, আপনি এইখানে! সেই কখন থেকে খুঁজছি আপনাকে।’

‘সরি। কিছু লাগবে?’

‘হ্যাঁ তো! আসেন, ঘরে আসেন, আমাকে কবিতা পড়ে শোনান।’

আরিফ আশিককে ঘরে ডেকে নিজেই হুইলচেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে তার কাছে চলে এলো।

‘আশিকভাই, আপনি বলছিলেন মেঘের ওপর হেঁটে একদিন দূর পাহাড়ে চলে যাবেন। আমি কেমন করে যাবো? আমিতো হাঁটতে পারি না।’

প্রত্যুত্তরে আশিক কী বলবে ভেবে পেলো না। শুধু মৃদু স্বরে বললো, ‘হাঁটতে আমি তো পারি।’ বলে সে কবিতা পড়তে লাগলো,

যে প্ররোচনায় আমি খুলেছি অক্লেশে

আমি খুলেছি শিকড়ের অতল শিকল

আমি খুলেছি শাদামেঘের ভস্ম বাকল

আমি খুলেছি নদীমুখি রাতের করাত

আমি খুলেছি কারো চোখের কাজল

আমি খুলেছি সপ্তগন্ধ তারার হাসি ও কান্না

আমার হাত আঙুলবিহীন

শিকড় খুলে বুঝেছি কিভাবে গাছবন

বাকল খুলে বুঝেছি মেঘের শুদ্ধতা

করাত খুলে বুঝেছি ঘাতকের যন্ত্রণা…


আজ শ্রাবণের পূর্ণিমা। সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছিলো। ঘন্টাখানেক আগে বৃষ্টি থেমে গেছে। এখন কতো রাত কেউ জানে না। আশেপাশে শাদাকালো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। কখনো চুল ছুঁয়ে যাচ্ছে। ছুঁয়ে যাচ্ছে চিবুক। আরিফ মুগ্ধ হয়ে আশিকের কবিতাপাঠ শুনছে। এই লোকটা চাঁদের আলোতে কবিতা পড়ছে। খাতা দেখে। তার নিজের লেখা কবিতা। অদ্ভুত!


যখন কাজল খুলেছি

কাজল হয়েছে দীঘল রাত্রির অভিমান

অভিমানের অধরে নক্ষত্রের ক্ষত

আর সে রাত্রির দীর্ঘশ্বাস

যে প্ররোচিত করেছিলো

সে কার ছিলো বলেনি তখনো…

শুনতে শুনতে আরিফ অন্যমনস্ক হয়ে গেলো। তার ভাবনার ভিতর ঢুকে গেলো কালো ছাত আর লাল শরীরের একটা গাড়ি, সমুদ্র, বৃষ্টির ভিতর ছুটে আসা একটা বাস, হাসপাতাল, অষুধের গন্ধ এইসব। সে ভালো করেই জানে আশিকের সঙ্গে তাকে এইখানে কেনো পাঠানো হয়েছে, কোন কাজে পাঠানো হয়েছে। সে এও জানে যে আশিক কাজটা করতে পারবে না। কিন্তু লোকটাকে কেনো জানি তার খুব সাহায্য করতে মন চাইছে। আরিফ জানে, কোনো হাওয়াবদল নয়। সব ঠান্ডামাথায় পরিকল্পিত। এই পরিকল্পনা তার চাচার মাথায় ঘুরছে বছরসাতেক আগে থেকে—তাও সে জানে। সেদিন গাড়িতে তারা সমুদ্রে যাচ্ছিলো, সে, মা, বাবা। বৃষ্টি হচ্ছিলো। আর সামনে থেকে একটা… আহ্, মা!

‘কী হলো!’

‘কিছু না, আশিকভাই। আমাকে একটা শাল এনে দেবেন। বড্ড শীত লাগছে।’

আশিক ওঠে ঘরের দিকে যাচ্ছিলো। পেছন থেকে আরিফের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলো,

‘শাদা শালটা, আশিকভাই’।

আশিক শাদা শালটা হাতে বের হয়ে দেখেন হুইলচেয়ারটা ফাঁকা। তার বুকের ভিতর ধক্ করে ওঠলো। তারপর এক অভাবনীয় দৃশ্যের মুখোমুখি হলো সে। দেখলো, আরিফ শাদা শাদা মেঘের ওপর পা রেখে হেঁটে যাচ্ছে দূরে। দূর পাহাড়ের দেশে। আশিক গভীর ঘোরের ভিতর চলে গেলো। এবং নিঃশব্দে আরিফকে অনুসরণ করলো।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত