হেনরী স্বপনের কবিতাগুচ্ছ

আঁচলে জড়াবে ভোর

বাইরে এখনো চাঁদকে সজাগ রেখেছি ভুলিয়ে,

ঘরের আলোটা এক্ষুনি নিভিয়ে দিতে হবে—

ফিনাইল জলে

ভিজিয়ে রাখতে হবে ছোলা আর কাজু বাদামের শাঁস

ফুলে উঠবে স্তনের বোঁটা বুকের পাঁজরে

ভরে উঠবে বাগানবিলাস আনছান করা রজনীগন্ধার ডালপালা

ছড়াবে শাড়ির হোলিখেলা—

আঁচলে জড়াবে ভোর !

স্বপ্ন দেখবে হাঙর সাঁতার কাটছে হাইওয়ের জোছনায় ড্রাইভিং কোর্স…।

.

উড়ালপুলের ডানা

উড়াল পুলের ডানা খসে পড়ল পালক খুলে,

লোহার গায়ে যে পেরেক ঠুকেছ ঘাসের

বুকে!

সেখানে রক্তের ফোয়ারায় মৃত্যুর যন্ত্রণা

ঝরছিল—

চাপা পড়ে থাকা বহু প্রজাপতি উড়ছিল ডানা ভাঙা

কল্পনা ছাড়াই, ভাসছিল তরী…

বহু মানুষের লাশ টেনে তুলতে হয়েছে

থেঁতলে থাকা নিশ্চুপ মায়ের বুকের শিশুকে—

দেখে, ন্যুব্জ কাতর দেখেছি, কলকাতার ক্রুশবিদ্ধ যিশুকে।

.

কোলাহল হবে

কালোকে কালো বললে, কোলাহল হবে

সানগ্লাস ছাড়াই চোখের উপর চৈত্রের রোদ্দুর ছড়াবে,

দুর্ভিক্ষের গম খেয়ে আফ্রিকার মেয়েরা কৃষ্ণাঙ্গ

হয়েছে র‌্যাবের পোশাক খুলে…

বাঘের চামড়া গায়ে দিয়ে মিলিটারি

ক্যাম্পের সার্কাস খেলা হতো সূর্যমণি মেলার প্রাঙ্গণে

লোক সমাগম—

সকলে দাঁড়িয়ে রয়েছে নির্বাক, সকলের পাষাণ হৃদয়-মন…

তখনো পথের পাশে তড়পাচ্ছিল পোশা একটি কালো বেড়াল!

.

নাভির উঠোন ছুঁয়ে

অবাক বাসর ঘরে, কীট আর আরশোলা বাস করে
এ কেমন সংসার পেতেছ, কুমিরের ঘর ভাঙা ঝড়ে ?
ব্যাকুল বাতাস, কখন ধানের ক্ষেতে করে ওড়াউড়ি ?
যখোন আড়ালে চিতাবাঘ হয়ে ওঠে হৃদয়ের ঘুড়ি।

আঁজলায় ভরা জল তোলপাড় করে হাওয়ার কামড়ে।

চুম্বন এঁকে দিয়ে যায় বুঝি কেউ ? আবগাহন ধুয়ে
আভিভূত সেই ঝড় বয়ে যায় নাভির উঠোন ছুঁয়ে।

.

আলপথ দূরে

রাজহাঁস নেই, পাখির ফসিল কফিনের ঘুমে ছিলে
চুম্বনে চাঁদের আলো গ্রন্থিল স্ফটিক ডানা ঝাপটায়
পালক ছড়ালে দেখি, উদ্দীপ্ত রয়েছ স্তনের বোঁটায়।
ভিতরে ক্ষরণ রাখা বিষ কামড়ের সুখে উগ্রে দিলে,

লোনাজলে ভেজা জরায়ূতে লবন ইলিশ গন্ধ ছিলে।

আঁধার সম্ভোগে কাঁপা জ্বালায় অঙ্গ কেমন শক্সখচূড়ে
কামসূত্র বরফ ঠাণ্ডায় গলে যাওয়া আলপথ দূরে।

.

শারদীয় ঘ্রাণ নুয়ে পড়ে ঘাসে

শরৎ এসে, শারদীয় ঘ্রাণ নুয়ে পড়ে ঘাসে
শাড়ির আঁচল ছুঁয়ে…
মৃত্তিকায় জড়ালে মমতা মাখা মহুয়া আকাশে।

শাঁখের ধ্বনিতে বুঝি, দুঃসহ লড়াই রপ্ত করে
পূর্ণিমা গমনে দেবী…
বাপের ঘরে এলে দুর্গা সাজে ভৈরবী প্রহরে ।

বোধন ভোরের ঝলমলে রোদ ঝাঁপাচ্ছে বেশ
প্রতিমা তোমার মূর্তি…
শিবের জটায় বাঁধবে বেণী রুদ্র কালোকেশ।

কাশেরবনে কলুষ ছায়া, ফর্সা ফুলের আলোয় ঢাকা
কুয়াশা কোমল…
হিমশীত নেমে এসে ধানের পাতায় শিশির জমে থাকা।

কলাবতী বউয়ের পাশে গণেশ ঠাকুর বর
ভিডিও গানের সিডি…
শিউলি ঝরা উঠোন ভরা আছে সন্ধ্যা নদীর চর।

আমাদের গায়ে রঙিন পোষাক, সিল্ক-সালোয়ারি
নতুন সাজের গন্ধ নিয়ে…
আমরা যাচ্ছি পুজো মন্দিরে -পুরনো কালিবাড়ি।

আমরা বেড়াচ্ছি রাত জেগে মণ্ডপ ঘুরে ঘুরে
ঢাকের-উল্লাসে…
আকাশে বিদ্যুৎ ঝলকায়-পেঁচাপাখি যায় উড়ে।

লাইটিং-এ রাত জ্বলজ্বলে ডিজিটাল জোনাকিরা
অসুর বুকে ধনুক ছুড়ে…
ধুপের তাওয়ায় তপ্ত আরতি নাচছে শাকিরা।

আঁধার কাটবে, ঝুমকা জবায় পাপড়ি ঝিরিঝিরি
মহিষ তাড়াতে…
সিংহের লড়াই শুরু তবু সাইবারে গেম বিচ্ছিরি।

জায়া লক্ষ্মী-সরস্বতী বোন, মোহিনী বীণায় বাজে
ভাদুই মাল্লারে গায়…
মা তোর জঠরে আশ্রয় খুঁজে পাওয়া এসরাজে।

আমরা অতসী, আমরা খুশির উত্তেজনায়
অপরাজিতা অঞ্জলি তো, মায়ের মুখেই মানায়…

.

বেসিনের সিরামিকে সাদা পাণ্ডুলিপি

হেসে হেসে ট্যাপকলের জল ঝরে
বেসিনের সিরামিকে সাদা পাণ্ডুলিপি ভিজিয়ে ফেললে;
কামিজের ছিটেফোটা বিবর্ণতা-
মুছে ফেলা যায়…

বিমূঢ়তা আগোচরে থাকে ;
দীর্ঘশ্বাসে বুকের মাছিরা গুনগুনিয়ে ডাকলে
জিয়নকাঠির ছোঁয়ায় মুচড়ে ওঠে হৃদয়ের মূর্তি
হাতেগড়া প্রতিমাও প্রার্থনায় নতমুখ
কৌতূহলে-ক্ষমার অযোগ্য পাপ বলে-
খুলে বললে সবই…

পদ্ম-গোক্ষুর সাপের কামড়ে
ভ্রমরের বিষ পর্যন্ত নামিয়েছিলে পুকুরের জলে…

ইস্পাতের আয়ু
দুধ রান্নায় হলুদ রঙের ডেকচি ভরে ওঠে
গ্রিলে মরচে ধরার রহস্য দেখেই-
বোঝা যায় ইস্পাতের আয়ু।

গল্পে না হয়; ঘটনা সাজানো নিসর্গ !
সূর্যাস্তের মিঁউমিঁউ আলো
বসন্ত…নিশ্বাস নিতে আসে…
টিভি মেরামতের তুখোড় মিস্ত্রীদের
মশানিধন কাজর প্রযুুক্তি প্রয়োজন;
কর্পোরেশন কর্মীদের বাড়তি চাপ নেই
নগর জায়গা ঘিরে ধরে
কিছু ট্যাক্স বিলের বাড়তি প্রশাখা নুইয়ে
পড়ে আছে-

যেখানে ঝরছে আবর্জনার স্তুপ-পালক পুচ্ছ !
মশারি-চাঁদর বিছানায় নরম তোষক…

 

 

 

.

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত