| 22 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
ধারাবাহিক সাহিত্য

হিম (পর্ব-৯)

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট
মানুষ নিজের শরীর কখনো দেখে উঠতে পারে না ঠিকমতো। দেখে, সঙ্গীর চোখে। যাকে ভালোবাসে অথবা যে তাকে ভালোবাসে বলে ভাবে তার চোখে। এই মুহূর্তে দেয়ালে হেলান দেয়া সুধন্যর বুকে ইশরাত, ক্রন্দনরত৷ আর সুধন্য তার মাথায় আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে যাচ্ছে। বাচ্চাদের যেভাবে শান্ত করা হয় তার সাথে কিছু মিল আছে। কান্না কিছু থেমে এলে তাকে নিয়ে বড়দির মাস্টারবেডে বসায়, এ সি ছেড়ে দেয়। ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে কমলার জুস বানিয়ে আনে, কিছু বরফ দেয়। বানাতে বানাতে, ব্লেন্ডারে যখন চূর্ণ হচ্ছিলো কমলা, একবারো বিস্মৃত হচ্ছিলো না পুষ্পার কালসিটে পরা করুণ মুখ৷ ফিরে এসে দেখে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে সে, খোলা পিঠে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন, জামার পিঠের দিকের চেইন খোলা। পাশের টেবিলে গ্লাসটা রেখে আস্তে চেইনটা লাগায়৷ পুষ্পা বসে৷ ‘সুধন্য, কোথাও পালিয়ে যাবো আমি?’ প্রশ্নের উত্তর সাথে সাথে কি বলবে বুঝে উঠতে পারে না৷ মাথা নিচু করে বসে থাকে। তার অস্বস্তি হয়। পূর্বাপর জ্ঞান হারিয়ে আবার রান্নাঘরে যায়৷ এবার দুটো দুটো চারটা ডিম ভাজে। পাউরুটি বের করে বাক্স থেকে৷ কলা ছিঁড়ে নেয়৷ জেলির জার নেয়। সব একটা ট্রেতে নিয়ে ফেরে৷ ‘ সব সময় বলবার মতো কথা আমি খুঁজে পাই না। বুঝলে?’ চুপ থাকলো আর কিছুটা সময়। ‘এসো, খেয়ে নিই।’ দুজন বন্ধু চুপচাপ খেতে থাকে। শব্দহীন। আবার উঠে গিয়ে জলের জগ, গ্লাস নিয়ে আসে৷ মুখে খানিক খাবার, চোখে আবার জল। ‘আমি আর পারছি না’, হাতের উল্টো পিঠে চোখের জল মুছে দেয় আরেকবার। ‘শোনো, মুখে খাবার নিয়ে কথা বলতে নেই৷ আগে খেয়ে নাও।’ গলা ইচ্ছে করে ভারি করলো সুধন্য। তারপর তরল গলায় ‘সেই কোন ছেলেবেলা থেকে বাবার মুখে এই কথা শুনে আসছি!’ একটু হাসে পুষ্পা অনেকক্ষণ পরে। খাওয়া শেষ করে বললো,’ অনেকদিন পর ঘর থেকে বেরিয়ে শান্তি পেলাম।’ চুপ করে যায়। ‘ আচ্ছা, সুধন্য কোনোদিন তোমার কাছে বরাবরের মতো চলে এলে, থাকতে দেবে আমায় তোমার কাছে?’ এবার আর সুধন্যের সময় লাগে না বলতে৷ ‘দেখো, আমি এখনো নিজে চলার সামর্থ্য অর্জন করতে পারিনি৷ আমার জীবন চলছে টিউশন আর প্রুফ কাটার পয়সায়। তবে নিজে না পারলেও তুমি যাতে ভালো থাকো সে ব্যবস্থা আমি করবো নিশ্চয়ই।’ ‘কেমন যেন পাজলের মতো শোনাচ্ছে! কেমন করে!’ পরিবেশে এখন খানিক আগের টানটান ভাব কেটেছে। ‘ আমার তো অনেক বন্ধু। তার মধ্যে দুজন শহরের অন্যতম ধনী৷ বুঝলে কি না, আমাকে মাঝে মাঝে নানারকম পশ জায়গায় আড্ডা দিতে, বিভিন্ন রকম পানাহারে ডাকেন৷ কিন্তু আমি কখনো নিজের জন্য কিছু বলতে পারি না। তোমার জন্য নিশ্চয়ই বলবো। ‘ জোরে শব্দ করে হেসে ওঠে পুষ্পা।  ‘ আমার ইলিয়াসের এক গল্প মনে পড়লো’, ওর কথায় জানতে চাইলো সুধন্য। ‘ এক ডকুমেন্টারিতে তিনি বলছেন, তিনি ভূত দেখেননি কিন্তু ভূত দেখেছে এমন লোককে দেখেছেন।’ দুজনেই শব্দ করে হেসে ওঠে তারপর। রাত হয়ে আসছে আরো৷ ‘কে যেন বলেছিলেন সু, বাংলা-ই একমাত্র ভাষা যেখানে আসি বলে চলে যাওয়া যায়।’ পুষ্পা ওঠে। এগিয়ে দিতে সুধন্যও। দরজার বাইরে বেরিয়েও আবার ফিরে এসে সুধন্যর কপালে চুমু খায় সে। যাওয়ার আগে বলে যায়, ‘তুমি খুব ভালো’, অনেকদিনের জন্য এই তার শেষ উচ্চারণ৷ শোবার ঘরে ঢুকে সুধন্য দেখে বিছানার উপর খাম। খাম নিয়ে বাইরের ঘরের ইজি চেয়ারে বসে একটা সিগারেট ধরায়। চিঠি পড়তে শুরু করে: 
‘সুধন্য, অনেকদিন ধরে তোমায় লিখতে চেয়েও পারিনি। দু একদিন পর পর প্রবল মার খেলে, ব্যথা পেলে সে শক্তি থাকে না বোধ করি৷ তুমি আমার গভীর বন্ধু, নিজের জীবনের বিড়ম্বনাগুলো দিয়ে তোমায় বিব্রত করতে আমার ইচ্ছে করে না। তবু সহ্যের অতীত হয়ে গেলে দু একটা কথা বলে ফেলি। খালি তোমাকেই বলতে ইচ্ছে করে কারণ তুমি ওং কার ওয়াইয়ের সিনেমার মধ্যকার সত্য পুরুষদের মতো যারা ভেতরে অনেক গোপন কথা, সাধ, ইতিহাস নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। চিঠি লিখতে গিয়ে একটু শিল্প করে ফেললাম কি! তুমিই তো ইন দ্য মুড ফর লাভ দেখিয়েছিলে। বিবাহোত্তর সম্পর্কের এমন সংবেদনশীল সিনেমা আমার চোখে তুমি বললে বলেই পড়লো। আমি যে অনেক সিনেমা দেখি, তা নয়। তা ছাড়া, অনেক কিছু ছেড়ে যেতে যেতে এখন আমার জীবনে তুমি ছাড়া আমার বন্ধু আর নেই খুব একটা যার সামনে আমি ব্যক্তিগত সুখ দুঃখের ঝাঁপি খুলতে পারি। কারণ, আমাদের সমাজে মানুষ মানুষের দুঃখ ও তার অনুষঙ্গ নিয়ে মজা করতে, সেসব জিনিসে রং মাখাতে পছন্দ করে৷ অথচ দুঃখ আনন্দ এসব তো বাজারে তোলার জিনিস নয়। আমি আর আমার বর পরস্পরকে ভালোবেসেই বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু দেখলাম, ভালোবাসা এমন এক চারা গাছ, প্রকৃতির আবেগসমগ্রের এমন এক বিকশিত রূপ যার পরিচর্যা না করলে হারিয়ে যায়। এমনিতে সে ভালো লোক। কিন্তু না মারলে, আমি ব্যথা না পেলে তার ভাল লাগে না। তা-ও ভবিতব্য বলে মেনে নিয়েছিলাম। আমার পরিবারের একেবারেই টাকাপয়সা নেই৷ ওখানে ফেরার পথ বন্ধ৷ আমার পরপর দুটো বাচ্চা সে নষ্ট করে ফেলেছে। আমার সার্টিফিকেটগুলো তার লকারে আটকানো। কি করব আমি বলতে পারো! না, তোমার কিছু বলতে হবে না। নিজেকে হালকা করলাম, তোমায় সব বলে। ভালোবাসা জেনো।’ সিগারেট কখন যে নিভে গেলো! আরেকটা সিগারেট ধরাতে গিয়ে টের পেলো চোখ ভিজে গেছে। সাধে কি আর ছেলেবেলায় বাবা ছিঁচকাঁদুনে বলতো! আমাদের ভালোবাসার, সম্পর্কের কোনো নাম নেই। নিজেকেই নিজে বলে সুধন্য।
****
সুপ্রতিম একজন ডাক্তার, শহরের অন্যতম ব্যস্ত তরুণ ডাক্তার। তার বউ রুখসানা সমাজসেবা করে। আর কবিতা লেখে। সুপ্রতিম গাড়িতে  বউয়ের প্রথম কবিতার বইয়ের পান্ডুলিপি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আজ দু সপ্তাহ। ব্যস্ততার দরুণ কোথাও যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। ফোনে কাজ সারা যায় অবশ্য৷ তাও নিজে গেলে ভালো৷ সে তার বউকে ভালোবাসে। বউয়ের কবিতাগুলোকে আবর্জনা মনে করে৷ সাংসারিক শান্তি ঠিক রাখতে আবর্জনাকে পারিজাত পুষ্প বলবার বিধান সমাজে বহুল প্রচলিত। সেলফোনে রিং৷ ‘হ্যালো সোনা, কাউকে দিলে বইটা?’ বউয়ের কথায় গাড়ির এসির মধ্যেই কিঞ্চিৎ ঘেমে ওঠে। ভয়ও তো পায়। ভালোবাসার উল্টোদিকে কি ভয় নেই? ‘ এখনো না। আজই ফাইনাল করছি।’ বলতে না বলতেই ধমকায় রুখসানা ‘তুমি কোনো কাজের নও। বিছানায়, বিছানার বাইরে ঢ্যাড়শ একটা!’ ক্লিক শব্দে লাইন কেটে যায়। সঠিক জায়গায় হাত দেয়ার বেলায় রুকু লিজেন্ড। সত্যিই কয়েক বছর সব ইচ্ছে জড়ো করলেও নিজেকে ফিরে পাওয়া যাচ্ছে না। সব ভেঙে চুরে যাচ্ছে বার বার৷ নিজে ডাক্তার হলেও রহস্যটা টের পাচ্ছে না কোনোভাবেই। না কি ভালোবাসা ফুরিয়ে গেলে এমন হয়! প্রতিদিন নিয়ম করে চার মাইল দৌড়ায়, কোনো নেশা নেই তবু এমন হচ্ছে কেন বুঝে উঠতে পারে না৷ রুখসানাও তো ফুরিয়ে যায়নি৷ তার জিওগ্রাফিতে তো বড় বদল ঘটেনি – ডায়েট, স্কিপিং আর ইয়োগার বদৌলতে সে তো এখনো প্রায় কচি খুকিটি। ড্রাইভ করতে করতে আরেকবার ফোন। ‘বিমলাকে আনালাম৷ বাসায় থাকবে৷ কাজকর্ম করবে৷ দুপুরে খেতে এলে দেখবে। ‘ ‘ঠিক আছে’ বলতে কেটে যায় আবার। রুখসানাকে ভাবতে ভাবতে শরীর কি একটু জেগে উঠছে অনেকদিন পর? কিন্তু আর আধ ঘন্টা পরেই জরুরি অপারেশন আছে, তিনটে টানা, পরপর। বেসরকারি হাসপাতালের গ্যারাজে গাড়ি ঢুকিয়ে, ওয়াশরুমে ঢুকে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিজের চেয়ারে বসে প্রফেশনাল ডাক্তার সুপ্রতিম নিজেকে ফিরে পেলো যেখানে কোনো দোলাচলের জায়গা নেই, প্রতিটি সিদ্ধান্ত যেখানে ইহকালিক, যুক্তির মাপে মাপা। কফি এলো। আস্তে পত্রিকা দেখতে দেখতে চুমুক দিলো। উপভোগ করে সময়টা। টেবিলে রাখা এ মাসের ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের ছবিগুলো উল্টেপাল্টে দেখলো৷ এ জীবনে আর অরোরা বোরিয়ালিস সামনে থেকে দেখা হলো না! চুপি চুপি একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে পড়ে।   আরো কিছু সময় যায়৷ তারপর উঠে পড়ে ও টি’র দিকে যেতে হয়। এখানে প্রতিদিন মৃত্যুর দেবতার সাথে দাবা খেলা চলে৷ কিংবা লুকোচুরি। রুমালচুরিও বলা যায়, রুমালের মধ্যে জীবন। আধ সেন্টিমিটারের এপারে জীবন ওপারে মৃত্যু৷ সবার মুখে যেহেতু সার্জিক্যাল মাস্ক,  এখানে ক্রিয়াশীল দুটি চোখ। জীবন মৃত্যুর মধ্যবর্তী এই অতি উজ্জ্বল আলোর ঘরে চোখের ইশারাতেই মৃত্যুপ্রতিরোধী অস্ত্র নড়ে চড়ে, পরস্পরের পাশে স্থিরপ্রতিজ্ঞ হয়ে দাঁড়ান চিকিৎসক ও তাঁর সহকারীরা। অথচ দরজা খুলে বেরিয়ে এলেই ভেতরঘরের সহমর্মিতা ভুলে প্রফেশনাল রাইভালরিতে মেতে ওঠেন প্রায়ই। অপারেশন তিনটি সেরে ফেলতে ফেলতে প্রায় পৌনে চারটা হয়ে গেলো। আবার গ্যারেজে নেমে গাড়ি নিয়ে ঘরের দিকে যাত্রা। প্রতিটি অপারেশনের সময় সুপ্রতিমের তার মেন্টর সোবহান সাহেবের কথা মনে পড়ে৷ ‘মনে রেখো, ওখানে তুমিই কিন্তু ঈশ্বরের প্রতিনিধি। তোমার মধ্য দিয়ে তিনি যাবতীয় নির্দেশনা পাঠাচ্ছেন৷ তার পাঠানো ইশারা, সংকেত বোঝার কর্তব্যে অবহেলা করো না এক বিন্দু।’ কথাটা মনে আছে বলেই সুপ্রতিমের কাছে প্রত্যেকটা আলাদা অপারেশন ধ্যানের মতো৷ রাতে ঘরে ফিরে ফ্রেশ হয়ে পড়ার ঘরে বসে ক্ল্যাসিকাল মিউজিক শোনার যে সহজ আনন্দ, সেই আনন্দ সে ফিরে ফিরে পায় অপারেশন থিয়েটারে৷ মনে হয়, এই বুঝি কোনো এক বড় ওস্তাদ তার বাদনের মধ্যে লীন হয়ে গিয়েছেন৷ কলিং বেল টিপতে এক জোড়া ভীরু চোখ কি হোলে, সে-ও তাকালো যেন সে চিরকিশোর। ‘আমি সুপ্রতিম৷’ মুখেও জানান দেয় সে-ই কর্তা। দরজা খুলে যায়। একটি শীর্ণকায় কিশোরী, গায়ের রং ময়লা। গ্রামের গন্ধ এখনো লেগে আছে গায়ে। ‘তুমি খেয়েছো কিছু?’ প্রশ্নের উত্তরে মাথা নাড়ে বিমলা। কী আশ্চর্য কমনসেন্স! মনে মনে ভাবে, সমাজসেবার চূড়ান্ত! ‘তুমি ফ্রিজ খুলে কিছু একটা খেয়ে নাও। আমি স্নান করে আসি। তারপর খেতে বসবো। ‘ শাওয়ার নিতে ভালো লাগে সুপ্রতিমের। সারাদিনের ভার ধুয়ে যায়৷ 
সুপ্রতিম, বিমলা কেউই জানে না, দুজনের সম্পর্কে একটা হঠাৎ ঝড় উঠবে অল্প কয়েকদিন পরেই যা তাদের দুজনের জীবন পাল্টে দেবে। 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত