| 19 এপ্রিল 2024
Categories
ধারাবাহিক সাহিত্য

হিম (পর্ব-১)

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট
আজ ২ আগস্ট কবি ও কথাসাহিত্যিক সৈকত দে’ র শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


অক্ষরের মধ্যে আছে এক শান্ত, নিরিবিলি আশ্রয়। আপাদমাথা দীঘিস্নান, প্রসন্ন ও শীতল। বাংলা অক্ষরেরা মাঝে মাঝেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। কে যে লেখে তখন বোঝা ভারি মুশকিল! মিহি এক আরাম- অপার্থিব ও উচ্চাশাবিনা, এ কথা বুঝতে পেরে আগের থেকে অনেক বেশি শান্ত হয়ে পড়েছে সুধন্য। আগে জীবনের অপ্রাপ্তিগুলো ভাবাতো। দিনে বারো তেরো ঘন্টা খেটেও কেন একজন মানুষ নিরুদ্বেগ, দুশ্চিন্তাহীন ঘুম পাবে না বুঝতে পারতো না৷
এখন জীবনের প্রতি প্রত্যাশা নেই কোনো, মিরাকল শৈশবের রূপকথায় আর বাংলা মেইনস্ট্রিম ফিল্মে ঘটে থাকে বুঝে গেছে সে। প্রেম কেটে যাওয়া জীবন এখন এক সুনির্দিষ্ট রুটিন। তিন বোনের জীবনের ক্লান্তিও তাকে স্পর্শ করে না। ভোর ছয়টায় ঘুম থেকে উঠে পুরো এলাকা এক চক্কর দিয়ে এসে মোড়ের মাথা থেকে দিনের প্রথম কাপ চা, জীবনে একমাত্র বিলাসিতাটুকু রয়ে গিয়েছে। প্রথম চায়ের সাথে সিগারেট। সারাদিনে এখন অবশ্যি দুটোর বেশির পয়সা থাকে না সচরাচর। কোম্পানি উঠে যাওয়ার পর, জীবন আগাপাশতলা ছিবড়ে বানিয়ে দিতে চাইছে প্রতিনিয়ত আর তার যুদ্ধ হচ্ছে ছিবড়ে না হওয়ার বিরুদ্ধে। চা সেরে এসে একগাদা প্রুফ দেখা, ততোক্ষণে সারা সংসার জেগে উঠছে। মা স্নান করে বারান্দায় নিজের তৈরি বাগান থেকে ফুল তোলেন, কতোরকমের ফুল সেখানে! তারপর অনেকক্ষণ ধরে প্রার্থনা করেন তাঁর গোপালের ছোটো ঘরের সামনে বসে। মৃদু শব্দে ঘন্টা বাজান। সাড়ে সাতটা নাগাদ বাবার দুই ছাত্র চলে আসে। বারান্দার একপাশে চেয়ারটেবিল পাতা। সেখানে বাবা তাদের টিউশন দেন। মাঝে মাঝে কেউ কেউ কয়েক মাসের টাকা বকেয়া রেখে কেটে পড়ে তখন নতুন কেউ আসে, টাকাপয়সার ব্যাপারে বাবা এখনো শক্ত হতে পারেননি।সামনেই ষাট হবে বাবার৷ মোটামুটি দশটা নাগাদ কোনো বোন হয়তো রুটি আর আলু ভাজা দিয়ে গেলো, যেদিন যে ফ্রি থাকে।
প্রতিদিন রুটি আলু ভাজা, হঠাৎ আস্ত সেদ্ধ ডিম। নাস্তা সেরে রং চা, তার বাদে মাইল আড়াই হেঁটে পাবলিশারের অফিসে, রিজওয়ানুল করিম, কাজ বেশি দেয় পয়সা কম। সেখান থেকে দুপুরে টিউশন। বিশাল বড়লোক পরিবার, নাস্তা দেয় না অবশ্যি। ঘরে সুধন্য কোনো কোনো দিন ফেরে না।লাইব্রেরিতে বসে পড়াশোনা করে খানিক, বই কেনার পয়সা নেই এখন তার কিন্তু ছিলো এক সময়। ছোলাবুটে প্রচুর শক্তি, বাসায় না এলে লাইব্রেরির নিচে রাব্বী মামার দোকান থেকে ছোলাবুট আর মুড়ি দিয়ে লাঞ্চ।
বিকেলে আর সন্ধ্যায় তিনটে সব মিলে, সেরে রাত সাড়ে দশটা নাগাদ যেদিন পয়সা থাকে রিক্সায় নয়তো হেঁটে ঘরে ফেরা। প্রায়দিনই ঘরে ফিরে ছোটবোনকে দেখে সিরিয়াল নিয়ে ব্যস্ত থাকতে। উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রী পড়ে যে কখন! অথচ বৃত্তি পায়, ভালো রেজাল্ট করে। এই বোনটার জন্যে পরিবারকে কখনো ঝাঁকুনি খেতে হয়নি। বালতিতে জল ধরা থাকে, আরেকবার স্নান সেরে নেয়। মা আর বাবা ছোট বোনের সাথেই আছে সবসময়, ছোটো মেয়েকে ঘিরে তাঁদের অনেক আশা। মেজো বোন রুলির ঘটনাটার পর ওকে আর কেউ ঘাঁটায় না।
রুলি শ্রমিক রাজনীতি করে, নিয়মিত পার্টি অফিস যায়- মিছিল করে, একটা পত্রিকায় চাকরি করে- পয়সা প্রায়ই পেতে দেরি হয়, কঠিন সব বইপত্রের পাহাড় করেছে ফুটপাথ থেকে। সুধন্য বাতাসে খানিকটা পর্দা সরিয়ে তাকে দেখলো কিছু একটা পড়তে। স্নাতক শেষ না করেই রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছিলো সে অনেক দিন আগে। পত্রিকা অফিসের চাকরির বয়সও মন্দ হলো না। বড় বোন তৃষা একটু দূরেই থাকে- একটা একার ফ্ল্যাটে, নিঃসন্তান। তৃষা আর রঞ্জনের প্রেমের বিয়ে, রঞ্জন দেশের বাইরে এখন কাজের সূত্রে, বছরে দু বছরে আসে, থাকে কয়েকদিন। এই পরিবারে তখন কয়েকটা নিশ্চিন্ত দিন আসে। রুলির তাতে কিছু যায় আসে না। বেশিরভাগ সময় বড়দি এখানেই থাকে। ঐ ভূতের বাড়ির মত ফাঁকা ফ্ল্যাট ভালো লাগে না তার। ছুটির দিনে সুধন্য ঐ ফ্ল্যাটে গিয়ে ছাপান্ন ইঞ্চি পর্দায় বিশ্বের সেরা সব সিনেমা দেখে, বত্রিশ জিবি পেন ড্রাইভ বন্ধু অভীকের উপহার সিনেমাসমেত, কদিন বাদে বাদে পাল্টে দেয়। কিছু অতিরিক্ত পয়সা সংগ্রহ করতে পারলে সারাদিন বসে সিগারেট খায়। খেতে ভালো লাগে তার। সেসব দিন দুষ্প্রাপ্য, উৎসবের মতো- এসব দিন আসে বলে বাঁচাটা সহ্যের বাইরে যায়নি আজো। লেখার মধ্যেই থাকতে পারাটা আশ্রয়। নিরানন্দ জীবন আর অভাবের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসতে পারে।
বই আর লেখাপত্র তার আছে কিছু শহরের নানা বইদোকানে আর লাইব্রেরিতে কিন্তু একটাও তার নিজের নামে নয়, হয় কোনো প্রবাসী কিংবা শিল্পপতির স্ত্রী হঠাৎ লেখক হতে চান, অন্তত নামে, সমাজে খানিকটা পাত্তা পেতে চান, অনেক সময় বইয়ের জন্য কোনো কাঁচা বাজার সমিতি কিংবা আঞ্চলিক মৎস্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দেয়া সাহিত্য পুরস্কার পেয়ে যান তাঁরা। এসব ভূতের বেগারে ভালো আয়। গোপন কম্পিটিশন শহরের আরো কোনো হতদরিদ্র হলেও হতে পারতো লেখকের সাথে আর নিজের ভেতরে নিজে গলে গলে ফুরিয়ে যাওয়া। হয়তো করিম ভাই তার একটা বই পয়সা ছাড়া করে দেবে একদিন। আশা দিয়েছে, নিশ্চয়ই দেবে৷ এখন অনেক রাত, সুধন্য ঘুমাতে পারছে না। কুষ্টিয়া থেকে আনা সামান্য গাঁজা খেয়েছে আর এক গ্লাস গরম দুধ৷ কাল ছুটির দিন৷ এক গল্প লিখে দিলে দেড় হাজার টাকা দেবে করিম ভাই। বেরোবে এক অধ্যাপকের নামে। তাদের ছাত্র বয়সে তিনি বেশ মধুসূদন আওড়াতেন। আশেপাশে তাঁর বন্ধুদের একাধিক বই, তাঁর নেই। মৌসুমী এসব বাসনায় সঙ্গত না করলে বাংলা বাজার শুধু তো আর বেস্টসেলার কিংবা ক্ল্যাসিকে টিকে থাকে না, তখন সুধন্যদের ডাক পড়ে, একে অন্যকে চেনে না, হয়ত বন্ধুও তারা কিন্তু এসব গোপন গোয়েন্দা কাজ যেন। সাত আটটা গল্প জমা পড়লে একটা পাঁচ ফর্মার বই নেমে যায়। এমন অনেক পিতৃমাতৃহীন বই বাংলা প্রকাশনায় দত্তক নেয়া বাবা মায়েদের পৃষ্ঠপোষকতায় বড় হচ্ছে। তার নিজেরও এমন কাজ কর্ম আছে, পেটের দায়েই করতে হয়।
একবার শহরের এক হলঘরে তো দারুণ কান্ড, তার লেখা এক বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান, এক কলেজের অধ্যক্ষের নামে বেরিয়েছে। সবাই প্রবন্ধগুলোর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। মজা ভালো-ই জমেছিলো। সমকালীন সাহিত্যে রাজনীতি, বইটার আগাপাশতলা টোকা, কত কত ফিল্ম রিভিউও, সাহিত্য রিভিউ হয়ে বেরিয়ে গেলো। সত্যজিতের জায়গায় বিভূতি বসালে কে আটকাচ্ছে কিংবা সমকালীন বিশিষ্ট লেখক অমলেশ দত্তের নাম! চল্লিশ পঞ্চাশ বছর আগের সব প্রবন্ধ গুগলে এন্ট্রি হয়নি। তো, নিজেকে প্রেতাত্মা মনে হচ্ছিলো।
এইভাবে সমকাল খ্যাতি কুড়াচ্ছে। আলোচনা শেষে আপেল, জিলিপি, মিষ্টির প্যাকেট ছিলো আবার করিম দার এক্সট্রা প্যাকেট। অবশ্য কোম্পানিটা এভাবে লাপাত্তা না হলে এসব দিনেদুপুরে ডাকাতির দরকার পড়তো না৷ প্রেমেন্দ্র মিত্রের সাথে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের একটা মিক্সচারে খানিকটা মনিকা বেলুচ্চি গুঁজে একটা গল্পের প্লট খাড়া করবার কাজে লেগে পড়লো সব চিন্তা এক পাশে রেখে৷ সব তথ্যের মাছ গুগল মাঝি ধরতে পারে না, এই জায়গা দিয়েই সুধন্যেরা দু’চার পয়সা আয় করছে। ফ্ল্যাটের একটু দূরে সুধন্যদের বাসায় বালিশে মাথা চেপে রুলি, শব্দহীন কাঁদছিলো, রাত সাড়ে তিনটায় কখনো কার্ল মার্ক্স আর্তকে রক্ষা করতে নেমে আসেন না।
[চলবে]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত