| 19 জুন 2024
Categories
গল্প ধারাবাহিক সাহিত্য

হিম (পর্ব ৪)

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট
আর্ত চিৎকার, বার বার। কোনো এক মেয়েকে কেউ মারছে, কোনো উদ্ধার নেই৷ এমন প্রায়ই। চিৎকারগুলো সুধন্যকে স্বস্তি দিতো না। বাংলাদেশে বউ পেটানো মোটামুটি স্বাভাবিক ঘটনা, চারপাশের লোকজনও তেমন গা করে না বেশিরভাগ সময়। দিদির ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়ালে কয়েক গজ দূরে আরেকটা বারান্দা৷ বেতের চেয়ারে বসা কালসিটে পরা মেয়েটাকে আবিষ্কার করেছিলো কোনো এক গ্রীষ্মের দুপুরে। মেয়েটির চোখে হাজার বছরের ইতিহাস। হাসি, প্রতিবেশিসুলভ, সুধন্যও। এমন করে দিন যেতে থাকে। তখন সুধন্যের সাত বছরের প্রেম তাকে ছেড়ে গিয়েছে সদ্য সদ্য। সব কাজ বাদ দিয়ে দিদির ফ্ল্যাটে আস্তানা। এক ধর‍ণের শীতনিদ্রা ও নিজের রেস্টোরেশন প্রসেস।
একদিন সাহস করে বড়ো হরফে লিখলো: ‘কথা বলা যায়?’, প্ল্যাকার্ডখানা ধরলো বারান্দার গ্রিলে চেপে। মেয়েটি সম্মতি দিলো, হাসি ছিলো না যদিও। হয়তো আগের রাতের মারের ব্যথা যায়নি৷ আরো ক’দিন গেলো। একদিন, সন্ধ্যা নামার আগে, মেয়েটি আঙুল তুলে বোঝালো উপরের দিক, ছাদ কিংবা আকাশ অথবা পরপার।  অপশনগুলো এক এক করে পরীক্ষা করতে সে লিখলো : ‘ছাদে যাবেন?’, মেয়েটি আবারো সম্মতি দিলো। ছাদে গিয়ে খানিক হাঁটাহাঁটি করতে করতে একটা কাগজের প্লেন তার সামনে ল্যান্ড করলো৷ আর অন্য ছাদে তাকাতে দেখা গেলো, মেয়েটি চলে যাচ্ছে। প্লেনখানা পকেটে পুরে নেমে এলো আমাদের নায়ক। একটা এ ফোর সাইজ কাগজে একটা মেল আইডি আর ফোন নম্বর। তখনই মেল পাঠিয়ে দিতে ইচ্ছে করলো: 
‘সম্বোধন ছাড়াই লিখি আপাতত। রাতের বেলা যখন সিনেমা দেখতে বসি আপনার কান্না কানে আসে৷ কিছু করতে পারি না বলে অনুশোচনায় হয়। এই পরিপার্শ্ব থেকে বেদনাসমগ্রকে উপড়ে ফেলি এমন শক্তসমর্থ হয়ে তৈরি হতে পারিনি। তবে একটা সঙ্গ, কথা বলার জায়গা হয়তো কিছু উপশম হতে পারে৷ আমারো কান্না আছে। অবশ্য শব্দহীন। কথা বললে দু’জন বিপন্ন মানুষের ভালো লাগতে পারে তাই কথা বলতে ইচ্ছে করলো। আমি সুধন্য।’ মেলটা পাঠিয়ে কফি বানাতে রান্নাঘর গেলো। ডিম মামলেট আর কফি, নাস্তা৷ সিগারেট ধরাতে ধরাতে মেল আসার শব্দ৷ 
‘আমি ইশরাত জাহান পুষ্পা। আমাদের প্রেমের বিয়েই ছিলো, প্রেম তো একদিন ফুরিয়ে যায়, তাই না? আপনাকে প্রায়ই দেখি। ছাদে, রাস্তায়, শহরের দু’একটা অনুষ্ঠানে শ্রোতা কিংবা বক্তার জায়গায়। কথা হয়ে ভালো লাগলো। পুনশ্চ: শুরুতেই ফোন না করে মেল করাটা ভালো লাগলো। বাঙালি পুরুষ কেন জানি না নাম্বার পেলেই কথা বলতে হামলে পড়ে। আপনি বেশ আলাদা। তাই ভালো লাগলো। ফোন নাম্বার তো দিলেন না। ‘আশ্চর্য শেষ যতির পর একটি স্মাইলি। সে স্মাইলির দিকে খানিক তাকিয়ে থাকলো, সেদিন আর কথা হলো না, নিজের ফোন নাম্বার মেল করে দিলো। সাথে একটা গানের ইউটিউব লিংক: ‘তোমার কথা হেথা কেহ তো বলে না’। বেশ কিছুদিন ফোনে,  মেইলে আর ছাদে উড়ে আসা, উড়ে যাওয়া কাগজের প্লেনে নামহীন সম্পর্কটি চলতে থাকলো। বাসা থেকে ফোন এলো এক সন্ধ্যায়। বাবা খুব ঘামছিলেন৷ হাসপাতাল বাসা। চৌদ্দ দিন। 
.
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বড় চমৎকার জায়গা। এখানে প্রতি ইঞ্চি জায়গা টাকা ছাড়া নড়ে না৷ এখানকার প্রতিটি ভোর, সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা, রাত, গভীর রাত আলাদা শেডের৷ একদিন পুষ্পা এসে দেখে গেলো ফলমূল নিয়ে আরেকদিন রত্না মাসী এসেছিলেন, শৈশবের প্রথম শিক্ষক, অনেকগুলো দিন তাঁর ঘরে বসেই কেটেছিলো। আরেকজন মা তিনি। মাসী ডাকতে তিনি-ই বলেছিলেন। মাথার দুদিকে আস্তে আস্তে কাশফুলের বাগান। তখন আই সি ইউ থেকে বাবা জেনারেল বেডে। বিকেলে সুধন্য একাই থাকে। বোনেরা আর মা যারা যেদিন আসে তারা খানিক বিশ্রাম নিতে যায়৷ মাসীকে বসিয়ে সে নিচে নেমেছিলো প্রেসক্রিপশন নিয়ে৷ ফিরে আসতে দূর থেকে দেখলো মাসী বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন, দুজনের চোখেই জল। একটা কমলা খুলে যেন কোনো বাচ্চাকে খাওয়াচ্ছেন সেভাবে আস্তে আস্তে খাইয়ে দিচ্ছেন, চোখের জল মুছে দিচ্ছেন। খানিক দাঁড়িয়ে দেখলো। বয়স হতে হতে খানিকটা আঁচ করতে পারে, ছেলেবেলার কিছু দৃশ্য আর বড়বেলার কিছু মিলিয়ে একটা পাজলের নানা টুকরো আস্তে আস্তে আস্ত হয়ে ওঠে। হাসপাতালের জনারণ্য ছোট্ট এক টুকরো নিভৃতি হয়ে ওঠে কোন যাদুবলে! এর নাম মায়া! পৃথিবীর বিচ্ছিন্ন টুকরোগুলো এরজন্যেই পরস্পরের সাথে সেঁটে আছে, এখনো নানা টুকরো নানা দিকে দৌড় দেয়নি৷ নামার সময় মাসীকে এগিয়ে দিতে গেলো। ততক্ষণে তৃষা আর রুলি চলে এসেছে৷ তিনি রিক্সায় ওঠার সময় জোর করে কিছু টাকা গুঁজে দিলেন, সে নিচ্ছিলো না তাও৷ বললেন, যদি না নাও কষ্ট পাবো রাজু! আমার তো আর কেউ নেই। ফিরে আসতে আসতে ভাবছিলো সুধন্য কতদিন পর মাসী ডাকনামে ডাকলো। খামটা ওভাবেই পড়ে রইল পকেটে৷ দুই বোন বাবার সাথে কথা বলছে। একটু সিগারেটের তৃষ্ণা পেতে না পেতেই দেবদূতপ্রতিম আবির্ভাব ঘটলো অনিশ্চয়ের। বাবাকে দেখতে এসেছে৷ রাতে থাকবে। বন্ধু, শিল্পের মধ্য দিয়ে পরস্পরের আত্মা স্পর্শ করেছিলো বলেই এ বন্ধুত্ব৷ যদিও চলে যাওয়া প্রেমিকাটি মনে করতেন, এদের একমাত্র সম্পর্ক গাঁজার৷ হাসপাতালের পেছনের মাঠে ছেলেমেয়েরা জোড়ায় বসে আছে। ফুটবল খেলা চলছে, এলাকার কোন এক নেতার নামে, তিনি কিছুদিন আগে দুই পক্ষের শক্তি প্রদর্শনের সময় মারা গিয়েছেন। ‘ বুঝছো, জিনিস কিন্তু ভালো, কুষ্টিয়ার’, দ্রুত দক্ষ যাদুকরের মতো একটা বানিয়ে দুই বন্ধু ধীরে ধীরে শেষ করে। ‘আমি একটা কবিতা লিখেছি, বহুদিন পর, শুনবে নাকি?’, সুধন্য মাথা নাড়াতে  অনিশ্চয় ভৌমিক কবিতা পড়া শুরু করে: 
‘মানুষের হিংসা ও তাহার বিদ্বেষ
ঝরে পড়ে থাকে
মরা পাতা যেন
আমি দেখি স্থির
আমি শুনি স্থির
তাকিয়ে থাকি পাতাদের দিকে
ঝরা পাতাদের দিকে
বাতাসেরা আসে, ঠান্ডা বাতাসেরা আসে
পাতা উড়ে যায়
ঝরা পাতা উড়ে যায়
স্থির আমি দেখি
স্থির আমি শুনি’ 
– ‘তুমি তো সত্যই শান্ত হইতে পারো নাই বন্ধু, নইলে তো গাঁজা খেতে হতো না।’ 
তীর্যক মন্তব্যে রাগে না অবশ্যি- 
– ‘কবি ও কবিতা তো সবসময় এক না, কবি যা পারে না সেইটাই তো কবিতা হয়ে ওঠে আস্তে ধীরে’
শেষ টান দিয়ে জানতে চায়, ‘মেসো তো কয়েকদিন হাসপাতালে, লেখার কথা না, তাও তুমি কি নতুন কিছু লিখলে?’ সুধন্য হাসে৷ মোবাইলের নোটপ্যাডে জ্যামে বসে দু একটা মনে আসা শব্দ, বাক্য যদি ভুলে যায় লিখে রাখে। ‘শোনো তাহলে’-
‘বাতিল কমরেড তুমি 
সর্বঘটে কাঁঠালী কলা
ঝালেঝোলে অম্বল
বলেছো আমায় – অতিথি পাখি
তুমি ছিলে পাখি সঠিক, খাঁচার
মতবাদ তোমার পেছন মেরে গেছে প্রতিদিন
লেনিনোত্তর কোনো দুনিয়া এনে দাওনি তো
নানা পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় গুছিয়েছো আখের
পার্টি যেমন ঠুলি পরায় কমরেডচোখে
আমি অতিথি পাখি কিংবা প্রজাপতি
মুক্ত উড়েছি
নানা বইয়ে মুখে গুঁজে করতে চেয়েছি ভাষায় বিপ্লব
শেষ বিচারে আমরা দুজনই ব্যর্থ
ফারাক একটাই
মানুষকে পার্টিনিরপেক্ষ দেখি এই ঝাপসা চোখে
সভ্যতার আদিতম পার্টি গড়েছিলো হনুমান কী আহ্লাদে চোখ বুঁজে সাম্যবাদী কলা খেয়েছিলো তাঁরা, হলুদ হলুদ পলিটব্যুরোবিহীন। 
এসো কমরেড, একসাথে আরেকবার কলা খাই হলুদ হলুদ ‘
জোরে হেসে ওঠে অনিশ্চয়৷ দু তিনটে ওর এই হাসিতে চমকে এদিক ওদিক তাকায়৷ ‘পার্টির প্রতি তোমার এতো রাগ কেন হে? তুমি জানো শ্রমিক বেল্টে আমাদের কতো কাজ!’ অনিশ্চয়ের প্রশ্নে খানিক চুপ থেকে সুধন্য মৃদু স্বরে বলে, ‘দেখো ভাই, কারো প্রতি আমার কোনো রাগ নেই৷ আমি খালি ভাবছি হয়তো নতুন কোনো রাস্তা আমাদের বের করতে হবে, আমাদের লেফটিস্ট ঐক্যগুলো কদিন বাদে বাদেই ছুতোনাতা মতবাদিক বিতর্কে ভেঙে পড়ে আর প্রতিক্রিয়ার শিবির দিন দিন আরো শক্তিশালী হচ্ছে।’ একটা  সিগারেট ধরিয়ে আবার বলতে থাকে,’আমাদের পার্টিটাও দেখো যত দিন যাচ্ছে টুকরো হয়ে যাচ্ছে। অথচ আমাদের কারোরই বিশ্বাসটুকু অন্তত এতো ঠুনকো ছিলো না।’ পিঠে জোরে একটা চড় বসিয়ে অনিশ্চয় পুরনো বুড়ো কমরেডদের ধরণে কথা বলে ফেললো,’কিন্তু কমরেড যুদ্ধটা তো আমাদের দলের মধ্যে থেকেই করতে হবে।’ ‘না ভাই, এ আমার পথ নয়৷ যদি দু’একটা কবিতা রেখে যেতে পারি বাংলা ভাষার ফুটনোটে ব্যবহারের জন্য, সে-ই যথেষ্ট, বিপ্লব আমার পথ নয় আর সংসদীয় এ রাস্তায় বিপ্লব এ দেশে হবে না।’ সুধন্য একটুও উত্তেজিত হলো না দেখে অনিশ্চয়ও চুপ করে গেলো। অন্ধকার হয়ে আসছিলো চারপাশ। একটি মেয়ে সুধন্যর দিকে এগিয়ে আসছিলো, সাথে একটি শ্যামলা ছেলে- খুব ভারী কাঁচের চশমা পরা৷ কাছে আসতে চেনা গেলো, বাল্যবন্ধু ইকবালের ছোটো বোন, নাক দিয়ে সবসময় সর্দি গড়াতো আর দু হাতে ঢিলে প্যান্ট তুলতো। ‘দাদা, আমার বন্ধু সুমন। ‘ছেলেটি হাত মেলালো।’ এখানে দেখেছেন দাদাকে বলবেন না কেমন’ মেয়েটি মুখ অনুনয়ে ছোটো হয়ে আছে। ‘বেশি ভেবো না, আমি তো তোমাদের দেখিইনি।’  কি মনে হতে এটুকু বলে অনিশ্চয়কে বললো, ‘ছেলেটাকে ভালো করে দেখে রাখ। আমাদের বোনকে ছেড়ে গেলে সার্জারি ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দেবো।’ ছেলেটা চমকে হেসে ফেলে। ওরা খুশিমনে চলে যায়৷ তার আগে হাসপাতাল গেটে সবাই মিলে আইসক্রিম খেলো। মোবাইলে ডাটা অন করা ছিলো। শব্দ হতে দেখলো পুষ্পার মেল: ‘সু, তোমার সাথে খুব কথা বলতে ইচ্ছে করে৷ দু দিন আগে দেখা হলো তবু৷ আজ দুপুরেই কথা বলেছি তাও।  একটু আগে জন্তুটা আবার মেরেছে, আঁচড়ে কামড়ে খেয়ে আবার মেরেছে, এতেই নাকি তার আনন্দ! গরিব হলে কত কষ্ট সুধন্য! তুমি একদিন লা স্ত্রাদার কথা বলেছিলে না, সেই গেলোসমিনা মনে হয় নিজেকে বার বার৷ এখন আমায় আর ফোন করো না। আমিই করবো। তোমায় কোনোদিন হাগ করিনি। আজ খুব ইচ্ছে করছে৷ দেখা হবে শিগগির। বাবার যত্ন নিও, নিজেরও।’ মেলটা খুব অস্থির লাগছিলো। কিন্তু আজ হাসপাতালে বাবার সাথে থাকতে হবে৷ রাত আটটার দিকে বোনেরা চলে গেলো। মা ফোন করলেন একবার। শান্ত থাকার কথা বলে মেল করলো একটা ছোটো। আবার টেক্সট পর পর কয়েকটা। উত্তর নেই। টিফিন ক্যারিয়ারের খাবার দুই বন্ধু খেয়ে নিল। বাবাকেও খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলো। বাবার ঘুমন্ত মুখ শিশুদের মতোন। শেষ রাতে একটা খারাপ স্বপ্নও দেখলো ঝিমুনির ঘোরে। সকালের দিকে অনিশ্চয়কে রেখে বাসার দিকে গেলো ফ্রেশ হতে। দেখলো একটা লাশ যাচ্ছে মানুষের কাঁধে চড়ে। একজনকে জিজ্ঞেস করে জানলো। সে রাস্তায় পড়ে গেলো, আমাদের সুধন্য। লোক জমতে লাগলো আস্তে আস্তে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত