হিম (পর্ব-১৫)

আলহাজ্ব গণি মিয়া স্মৃতি ক্রিকেট টুর্ণামেন্টের ফাইনাল ম্যাচের প্রাইজ দিতে এসে রুখসানার সাথে চ্যাম্পিয়ন দলের ক্যাপ্টেন তিতুমীর আহমেদের সাথে পরিচয় হলো। শ্যামলা, চর্চিত শরীর। কাপ নিয়ে হ্যান্ডশেক করবার সময় ওর দুঃসাহস দেখে রুখসানা স্তম্ভিত হয়ে গেলো। কেবল জোরে চাপ দেয়া তো নয়, মাঝের আঙুল দিয়ে তার হাতের তালুতে আঁচড় পর্যন্ত কেটেছে ছেলেটি। রোদ গড়িয়ে আসা শীতের বিকেল। মাঝারি সাইজের মাঠে লোকজন কম জমেনি। সবার চোখের সামনে এমন সিডিউসিং তৎপরতায় কি করবে ভেবে উঠতে না পেরে যেহেতু আঞ্চলিক দৈনিকের ক্যামেরা তাক হয়ে আছে তাদের দিকে জোর করে হাসতে হলো। দু’ চারটে ইন্সপায়ারিং কথাও বলতে হলো, আজকাল ভাষায় কিছু কিছু মোটিভেশনাল কথাবার্তা জনপ্রিয়তা বাড়ায়। সে বিশেষ অতিথি। প্রধান অতিথির বলা শুরু হলে নিজের জায়গায় বসে মাঠের চারদিকে চোখ বোলাতে লাগলো।

গণি মিয়ার নাতি ততক্ষণে সত্তর আশি বছর আগে কেমন করে তার দাদা চারপাশের মানুষদের খেলাধুলায় উৎসাহ দিতেন সেসব গল্পে মশগুল। খয়েরি জার্সি নাম্বার নাইনকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলো রুখসানার চোখ। মঞ্চের খানিকটা সামনেই অফিশিয়াল ড্রিংক পার্টনার খেলোয়াড়দের ফলের রস খাওয়াচ্ছে। চ্যাম্পিয়ন দলের কোচ একটা প্লাস্টিকের চেয়ার টেনে বসে ফূর্তিতে সিগারেট খেতে খেতে কি যেন বলছেন সামনে দাঁড়ানো প্লেয়ারকে, সে খানিকটা সরতেই টের পেলো তিতুমীর সোজা তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে চোখে শুধু কৌতুহল না অন্য কিছু! রুখসানাও তাকিয়ে থাকলো খানিক কিন্তু ঐ তীব্রতা বেশিক্ষণ নিতে পারলো না। এই প্রথম খেয়াল করলো, ওর চোখের মণি ছাই রঙের। হাত তালির শব্দে সম্বিত ফিরে এলো। মঞ্চের পেছনে অস্থায়ী ক্যাম্পে অতিথিদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা। ওর মন অনেকক্ষণ ধরে ঠান্ডা কিছু খেতে চাইছিলো। অনেকদিন এইরকম ফিজিক্যাল ইরিটেশন হয়নি তার। ট্রে করে একজন নাস্তা দিয়ে গেলো, জুসের গ্লাস-বাটিতে কিছু ফল আর চানাচুর কেক এসব হাবিজাবি। একটু শাওয়ার নিতে পারলে হতো, অস্বস্তিতে আপাদমস্তক ভরে আছে। জুসে চুমুক দিতে দিতে মনের ভেতরটা কি এক অনুভূতিতে যেন আলোকিত হয়ে উঠলো।

না! এই অনুভবটা একেবারেই অচেনা নয়। অনেক দিন আগে যখন সে কিশোরী ছিলো তখন এক পারিবারিক বিয়ের অনুষ্ঠানে সুপ্রতিমকে দেখে তার এমনই লেগেছিল। নিজেই হ্যাংলার মতো গায়ে পড়ে ভাব জমিয়েছিলো আর চলেও গিয়েছিলো একদিন মেডিকেল হোস্টেলে। সাথে ছিলো সুধন্য। ওরা তখন রতন স্যারের বাসায় অংক শিখতে যেত। মাত্র উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষে ওরা। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ওদের ফার্স্ট ব্যাচ শেষ হলে সে নিজেই সুধন্যকে বলে তাকে হোস্টেলে পৌঁছে দিতে, সেদিন ছিলো হরতাল। তার আগে অবশ্য স্যারের ক্লাসেই স্যার যখন ওদের একটা ক্যালকুলাস দিয়ে ভেতরে গেছেন উল্টো দিকে বসা সুধন্য ওকে বলে বসলো, ‘এই রুকু তোমার ঠোঁট দুইটা এরকম কাঁচ কাঁচ কেন? কেমন করে করলে এরকম?’, মাত্র সপ্তাহ দুই হলো ছেলেটা ওদের সাথে পড়তে এসেছে, পড়াশোনায় ঘোড়ার ডিম, ক্লাসে বসে কবিতা লেখার চেষ্টা করে, সরল মনে হয় ছেলেটাকে, ওর কাছ থেকে জয় গোস্বামীর একটা কবিতাবই ধার নিয়েছে, এখনো দেয়া হয়নি।

‘আসলে এটা গ্লসি লিপজেল, বুঝলে?’ কিছু না বুঝেই মাথা নেড়ে দিল সুধন্য। এখন ওরা রিক্সায়। রুখসানার চুল উড়ে আসে সুধন্যের মুখে লাগছে আর শরীর থেকে আশ্চর্য এক গন্ধ। ‘মেডিকেল হোস্টেলে কে থাকে তোমার? দাদা?’ হেসে ফেলেছিলো রুকু, ছেলেটার দেখা যাচ্ছে সিঙ্গেল ট্র্যাক মাইন্ড, বস্তুপৃথিবীর জটিলতা হয়তো সে ক্যালকুলাসের মতোই বুঝতে পারে না। ‘সে আমার কে আমি এখনো জানি না ভাই, তাকে আমার ভালো লাগে।’ তার কথার উত্তর শুনতে শুনতে ওরা দুজনেই একটা ককটেল ফাটার শব্দ শুনেছিলো, রিক্সা চলার গতি বেড়ে গেলো আর দুমদাম শাটার নেমে যেতে লাগলো রাস্তার দুপাশের দোকানের। রুখসানা সুধন্যের একটা হাত চেপে ধরেছিলো ভয়ে। সুধন্য ভয় ঠিক পায়নি। ছেলেবেলায় উপেন্দ্রকিশোরের ছেলেদের মহাভারত পড়বার পর তার মনে হয়েছিলো তার ইচ্ছে মৃত্যু হবে। এমন উদ্ভট কথা অবশ্য সে কাউকে বলেনি। হাত চেপে ধরায় শরীরের রক্তপ্রবাহ খানিক বেড়ে যাওয়াটা স্পষ্ট বুঝতে পারলো। আবার অপরাধবোধ হলো, নিজেকে চোখ রাঙালো। ছিঃ! সুধন্য! কিন্তু এই যে চুল উড়ে এসে পড়ছে, এই যে ওড়নার খানিকটা তার উরুর উপর পড়ে আছে এসব থেকে নিজেকে আলাদা করে নেয়ার মনের জোরও তো খুঁজে পাচ্ছে না।

গুলজার সিনেমার সামনে থেকে মেডিকেল হোস্টেল পেরিয়েও যে রাস্তাটা চলে গেছে তা পুরো শুনশান। কাজের দিন বলে মনেই হচ্ছে না। সাড়ে দশটাও বাজেনি। রিক্সাভাড়া সুধন্যই দিলো, জোর করেছিলো রুখসানা। শোনেনি, ছেলেরা শিভালরি জিনিসটা মনে হয় আগেভাগেই শিখে ফেলে। অবশ্য ঐ কয়টা টাকাই ছিলো। হোস্টেলের দোতলায় উঠতেই বাম দিকের ঘরটা সুপ্রতিম দার। তিনি সামনে ঝোলানো কংকালের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসেছিলেন। ঘরটা পরিপাটি। টেবিলে অনেকগুলি বই ।

সুধন্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। সে যে ক্লাসে বসে কবিতা লেখে সে কথাও পরের দশ মিনিটে জানা হয়ে গেলো তার। কবি শুনে সুপ্রতিম সুন্দর এক ডায়েরি দিলেন সুধন্যকে আর সাথে কলমও। কলমটার নানা রঙের সাতটা মুখ। ‘কবিতা আমি বুঝি না ভাই সুধন্য, এইটুকু বুঝি ভালো মানুষ না হলে কবিতা লেখা যায় না।’ খানিক চুপ থেকে হঠাৎ চোখ নাচিয়ে বললেন, ‘তুমি জেমসের ঐ গানটা শুনেছো?’ ‘ঐ যে ছয়টি তারে লুকিয়ে আছে ছয় ধরণের কষ্ট আমার’, শুনেছে সুধন্য জানায়। ‘এই গান যার সে অনেক বড়ো কবি কিংবা… আচ্ছা বাদ দাও’ হাত নেড়ে প্রসঙ্গটা বাদ দিলেন তিনি। কিছু সময় গেলে সুধন্য টের পেলো ওকে নিয়ে তারা অস্বস্তিতে পড়েছে।

সে নিজেই উঠলো। দোতলার বারান্দা থেকে সুধন্যকে আস্তে চলে যেতে দেখলো ওরা। বিছানা থেকে বইপত্র সরিয়ে রুখসানাকে বসিয়ে তার পাশে বসলো সুপ্রতিম। প্রথম চুমু কানের লতিতে, পরের চুমু নাকের ডগায় তারপর আর হিসেব থাকলো না। ‘ম্যাডাম, খামটা দিতে বললো তিতুমীর’, হাতে ধরা জুসের গ্লাস তেমনই রয়ে গেছে, তার শরীরের মতোই গরম হয়ে উঠেছে। পুরনো কথাগুলো মনে পড়তে সুপ্রতিমকে খুব মিস করা শুরু করলো। অন্যমনস্কভাবে খামটা নিলো। ‘ম্যাডাম, আপনার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।’ জানালেন, টুর্ণামেন্টের পাবলিক রিলেশনস অফিসার। রুখসানা গাড়িতে গিয়ে ওঠে। ফোন করে সুপ্রতিমকে, বার বার, সুইচড অফ আসে। আজ সুপ্রতিমকে দরকার। কতদিন দেখা পায় না পরস্পরের শরীর, এতো ব্যস্ত কেমন করে হয়ে পড়লো তারা? বিয়ের কিছুদিন পর কি ফুরফুরে কেটেছিলো! কত যুদ্ধ করেই না তাদের বিয়ে হলো। শহরে আরেকটা বিকেল ঘন হচ্ছে। তিতুমীরের খামটা পাশে পড়ে আছে। হাতে নিয়ে খুলে দেখলো, একটা টুকরো কাগজে ফোন নম্বর, হাতে লেখা- ‘একদিন কফি খেতে পারি?’ নিজের নামটুকু সই করা। বিরক্তিতে নাকমুখ কুঁচকে গেলো তার। দলা করে জানালা দিয়ে ফেলে দিলো। পরমুহূর্তেই আবার সেই হাত মেলানোর উষ্ণতাটুকু অস্বীকার করতে পারলো না। ফ্ল্যাটে ঢুকে দেখলো বিমলা বইপত্র খুলে বসেছে, কিছু তার ছিলো আর বাকিটা সুধন্য এনে দিয়েছে। গায়ে সুতোটি না রেখে শাওয়ার নিতে সব সময় ভাল লাগে রুখসানার। সামনের মানুষসমান আয়নায় নিজেকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলো। একফোঁটা বাড়তি মাংস নেই কোথাও। বাথটাবে জল ভরে শুয়ে থাকলো চুপচাপ, নাকটা ডুবিয়ে রাখলে মামাবাড়ির পুকুরে ডুবডুব খেলার কথা মনে পড়ে। উচ্চ মাধ্যমিক পাশের পর আর সুধন্যের দেখা নেই। মাঝে মধ্যে শহরের দৈনিকে ওর কবিতা চোখে পড়ে, মনে মনে জানে যত চেষ্টাই করুক ওরকম ভালো কবিতা সে লিখতে পারবে না। প্রথম তারুণ্যের বন্ধুর জন্য তার মন কেমন করে উঠলো।

অনেকটা সময় কেটে যাওয়ার পর নিজেকে গুছিয়ে নিলো সে। গা মুছে জামা পরে ডাইনিংয়ে এসে দেখলো বিমলা নাস্তা বানিয়ে ঢেকে রেখেছে। টেবিলে রাখা ফোনে সাতটা মিসকল। আননোন হলেও চেনা চেনা ঠেকে। বিমলা কিছু লাগবে কি না জিজ্ঞেস করে গেছে এক ফাঁক, সে না করে দেয়। অষ্টম বারে ধরতে ওপাশ থেকে সপ্রতিভ এক কণ্ঠ বলে উঠলো, ‘হাই, আমি তিতুমীর। কথা বলতে পারি?’ এখন বিকেলের সেই অস্বস্তির বিন্দুটাও নেই। ‘কি কথা আর কেনই বা অত কথা?’ চিৎকার করে ওঠে। সে শব্দে কিছু বিভ্রান্ত বিমলাও পড়া ছেড়ে উঠে আসে। ‘আমি আসলে অনেকদিন ধরে আপনাকে অনেকদিন ধরে দেখছি। আপনি আমার অল্প বড়োই হবেন, কি হয় আমরা বন্ধু হলে? বিশ্বাস করুন আমি ক্ষতিকর মানুষ নই।’ প্রায় এক নিঃশ্বাসেই বলে তিতুমীর। একটু নরম হয়ে আসে রুখসানার মন। ‘একটু’ নয়, বেশ খানিকটা বড়ো সে। ‘আচ্ছা, ধরো বন্ধু হলাম, তারপর?’ কণ্ঠে খানিক কিশোরীর লাস্য কি চলে আসে অনিচ্ছাতেও? ‘ তারপর কিছু না রুকু, কফি খাবো, ঘুরতে যাবো এদিক সেদিক, এইমাত্র’, ফোন ধরে রাখে রুখসানা। ‘তাহলে কফির নিমন্ত্রণ নিচ্ছেন?’ ওদিকের জিজ্ঞাসায় রাজি হয়ে যায় সে। ফোন কেটে দেখে বিমলা আবার পড়তে চলে গেছে। সুপ্রতিমের ফোন বন্ধ। টেবিলে বসে আস্তে আস্তে পাস্তা শেষ করতে থাকে। তিতুমীর কি চায় দেখাই যাক না।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত