Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

হিম (পর্ব-২৩)

Reading Time: 5 minutes
পার্টি অফিসের চার তলা থেকে পাঁচ তলার মেঝেতে পা রাখার আগে যে সিঁড়ি তার সবচেয়ে উপরের ধাপে বসে থাকলে বিশাল জানালা দিয়ে খানিকটা দূরের বড়ো বিলবোর্ডে দেখা যায় অপি করিম হলুদ শাড়ি, হাতে কোনো একটা তেলের প্লাস্টিক জার। সদ্য তরুণী অপি করিমের প্রোফাইল দেখতে দেখতে সিগারেট খেতে ভালো লাগে- পয়সা থাকলে গোল্ডলিফ না থাকলে সানমুন, সানমুন এক প্যাকেট পেতেও কষ্ট, সব দোকানে থাকে না, লিজেন্ড এসে আস্তে আস্তে নাম করে ফেলছে৷ আজ নাটকের বৈঠক৷ নতুন নাটক তোলা হবে৷ সামনে নবীন বরণ৷ চারটায় বৈঠকের সময় দেয়া হয়েছিলো৷ সবার আসার কথা চারটায়, এখন সাড়ে চার। সুধন্যের হাতে ‘গোর্কি এন্ড হিজ টেমপোরারিজ’ বইটা৷ সে কয়েকদিন আগে কিনেছে ফুটপাথ থেকে। কনস্তান্তিন স্তানিস্লাভস্কি’র দ্য লোয়ার ডেপথ নিয়ে আলোচনাটা মন দিয়ে পড়ছিলো। ওর চোখে সমস্যা৷ সেইজন্য বই চোখের বেশ খানিকটা কাছে নিয়েই পড়তে হয়৷ পাশ দিয়ে মণীন্দ্র দাশকে উঠতে দেখে হাতের সিগারেটটা জুতোর আড়ালে নামিয়ে রাখে৷ শত হলেও জেলা পার্টির নেতা৷ তিনি কমরেড সম্বোধনে কুশল জানতে চান, ‘নিচ থেকে ওঠার সময় দেখছিলাম তুমি চোখের কাছে নিয়ে বই পড়ো৷ ডাক্তার দেখাও না?’ – এসব তাঁর কুশল জানবার ধরণ৷ ‘না, আমার অভ্যাস হয়ে গিয়েছে।’- মণীন্দ্র বাবু উঠে যান, সে লেখায় মন দেয়ার চেষ্টা করে৷ কিন্তু মণীন্দ্র দা’র কথাটায় মনটা বিষণ্ণ হয়ে থাকে। বাবু আর সে কয়েকদিন আগে ‘চন্দ্রকথা’ দেখতে গিয়েছিলো, হুমায়ূন আহমেদের সিনেমা। তাদের ভালো লাগেনি৷ পরে সুধন্য বাবুকে বলছিলো,’আমরা এমন এক সিনেমা বানাবো, অন্ধরা হাততালি দেবে দেখে।’ আনন্দে দুই বন্ধু হেসে ফেলেছিলো৷ আলমাস সিনেমা থেকে সাত/আট মিনিট হেঁটে গেলে ওয়াসার গা ঘেঁষে এক টংদোকানে মালাই চা বিক্রি করে। বাবু আর সুধন্য সিনেমা দেখতে এলে ওখানে মালাই চা খাবেই৷ পার্টিতে সিরিয়াস হওয়ার পর বাবু খানিকটা বদলে যাচ্ছে৷ আজকাল ক্লাসিকস ছাড়া তার আর কিছু ভালো লাগছে না৷ চিম্বুক হোটেলের নিচের ফুটপাথের ঘোর কৃষ্ণবর্ণ দাদা এখনো তার আশ্রয়। পুজোর আগে আগে সেপ্টেম্বর কিংবা অক্টোবরের গোড়াতেই যৌন গল্পপত্রিকার শারদ সংখ্যা আসে৷ ঠিকানা লেখা থাকে সত্তর বুক কর্পোরেশন রোড কলকাতা। সে নিজেও একটা গল্প পাঠিয়েছিলো৷ এক বৈজ্ঞানিক বৌদি আর তার দুষ্টু রোবটের গল্প। সে থেকে আশায় আছে, ছাপানো হবে। ইরোটিক সায়েন্স ফিকশন। ওরা বেয়ারিং ডাকে পাঠাতে বলে। সে পাঠিয়েছেও তাই। পাতলা বই পঞ্চাশ আর মোটা বই একশ টাকা জমা রেখে আনতে হয়৷ ফেরত দিলে ভাড়া কেটে রাখে। ফেরত কে আর দেয়৷ নিজেকে ফুরিয়ে দিতে দিতে বইটাও ফুরিয়ে যায় একদিন৷ বই আনার পথেই খবরের কাগজ দিয়ে সুধন্য মলাট লাগিয়ে নেয়৷ খুব ভোরে নয়তো সবাই ঘুমিয়ে পড়লে বিকেলে এই গল্পগুলি তাক্র আশ্চর্য এক ফ্যান্টাসির স্বাদ দেয়৷ এখানে বৌদিরা সকলেই হৃদয়বান। বোঝে,মাথায় দেবরের মাথায় সবসময় ‘ওসব’ চিন্তা ঘোরে বলে পরীক্ষার ফলাফলে ছাপ পড়ে। তাঁরা তখন ব্যবস্থা নেন৷ যথাসময়ে ব্যবস্থা নেয়ার ফলে রসায়ন বইয়ে পড়া উভমুখী বিক্রিয়া ঘটে, দাদার প্রবাস চাকরিজনিত একাকীত্ব কাটে বৌদির আর দেবরের নিষ্ঠার সাথে করবার মতো একটি কাজ পায় ও ফলাফল ভালো হয়ে ওঠে। পুরুষেরা এখানে মূলত যৌনক্ষুধায় আক্রান্ত প্রাণীবিশেষ৷ সালভাদর দালির মতো লোক অব্দি ‘আনস্পিকেবল কনফেশনস অফ সালভাদর দালি’ বইয়ের প্রথম বাক্যেই কবুল করছেন, সারাদিন যৌনচিন্তা মাথায় ঘোরায় তিনি ছবি আঁকায় মন দিতে পারেন না৷ রেলওয়ের মাঠে মাঝে মাঝে বইগুলো নিয়ে পাঠচক্র হয়  কিংবা কবিরাজ বিল্ডিং এর উল্টোদিকে দোভাষীর মাঠে। একজন পড়ে, বাকিরা হ্যা হ্যা করে হাসে। কামরুল হায়দার বেশ আবেগ দিয়ে পড়তে পারে। ওর পড়া শুনে ইমন কল্যাণ রোজারিও ফুট কাটবেই। ‘বদ্দা, ফরি যারগুই।’ রোজারিওর আবার ব্যক্তিগত এক্সপিরিয়েন্স আছে এই বয়সেই। সে এসব বেশ ক্লাইম্যাক্স দিয়ে বলতে পারে। যতোটা না শরীরের উত্তেজনা তার চেয়ে বেশি বন্ধুরা মিলে হাসি ঠাট্টা করা। সুধন্য ভেবে দেখেছে, যে কোনো রকম যৌন আনন্দের নিভৃতি জরুরি। এভাবে একদিন চটিবইয়ের পেছনের প্রচ্ছদে কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি শিখেছিলো সে। লেখা ছিলো, প্রকৃত পুরুষ কখনো ধর্ষণ করে না৷ আবার অপি করিনে ফিরে গেলো৷ সুবর্ণা মুস্তাফা আর আফসানা মিমির অওর সৌন্দর্য আর মেধার বিরল সমন্বয়। গোর্কির বন্ধুদের সম্পর্কে সংকলনটা ছাড়াও ওর হাতে আরেকটা বই আছে। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘তপন চরিত’- ছোটোগল্প সংকলন। মূলত হাসির গল্প-ই কিন্তু টেনিদা থেকে একেবারেই আলাদা। গোর্কি রেখে সেখান থেকে পরপর দুটো গল্প পড়ে ফেললো। আস্তে আস্তে সিগারেট ফুরিয়ে আসছে। পাঁচটা বেজে গেলো। সিটিসেলে ব্যালেন্স থাকলে কমরেড নিত্যানন্দ পালকে একটা ফোন করে দেখা যেত। একটা কালো মতো মানুষ এসে বললেন,’আপনার নাম কি? এইখানে চলাচলের পথে বসে আছেন যে? ভেতরে গিয়ে বসুন।’ – তারপর সুধন্যকে কথা বলতে না দিয়েই বললেন,’বাহ! চারদিকে বেশ গুছিয়ে বসেছেন তো। চলেন ভেতরে যাই৷’ কাঁধে ঝোলা ব্যাগ নিয়ে তিনি ভেতরে চলে গেলেন। সুধন্য উঠলো আরেকবার অপিকে দেখে নিয়ে৷ ভেতরের ঘরে পার্টির মুখপত্র স্তূপ করে রাখা। তিনি এস্ট্রে টেনে নিয়ে একটা সিগারেট ধরালেন। ‘বসেন, বসেন। আমি হলাম মাহবুব,মাহবুব আলম। সিগারেট খাবেন একটা?’ সে মাথা নাড়ে। ‘বই পড়তে পড়তে বেশ কয়েকটা খেলাম।’ মিষ্টি করে হাসলেন তিনি- ‘শুধু বই পড়ছিলেন? জানালা দিয়ে অপির বিল বোর্ড দেখেননি? আমার তো প্রায় ওদিকে চোখ যায়। ‘ হেসে ফেলে সুধন্যও। ‘দেখি কি বই পড়ছিলেন?’ তিনি বই দুটি নেড়ে চেড়ে দেখলেন খানিক। তখন ত্রপা, মণীশ, অপূর্ব একে একে আসছিলো। ‘আচ্ছা, আমরা সময়সচেতন হতে পারছি না কেন?’ ‘আমাদের ক্ষুদ্র সময়খণ্ড নিয়ে না ভেবে সময়ের অনেক বডো পরিসর নিয়ে ভাবতে হবে, বুঝলে কমরেড?’ হঠাৎ আপনি থেকে তুমিতে নেমে এলেন৷ অনেকদিন পর সুধন্য বুঝেছিলো, ওদের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া। সব ক্লাস সেরে ফিরতে বিকেল হয়ে যায়। তাছাড়া একেকজন সিরিয়াস কর্মীর উপর অনেক রকম চাপ থাকে৷ একই মানুষ পোস্টার লাগাচ্ছে, আবার কালেকশন করছে, ভ্যানগার্ড বিক্রি করছে, দেয়াললিখন করছে রাত জেগে। লোকজনের অভাবে তাকেই আবার নাটকে অংশ নিতে হচ্ছে। ত্রপা সেরকমই একজন। শ্যামলা। পার্টির মেয়েরা কখনো কেন যে সাজে না! একটু সাজলেই পণ্যসভ্যতার খপ্পরে পড়ে যাবে! নাটকের আলোচনার আগে নাট্যকারকে নিয়ে খানিকটা বললেন। এডাপ্টেশনের জরুরি কারণটাও। প্রায় একশো বছর আগে লেখা একটি নাটককে সমসাময়িক করে তুলতে খানিকটা সম্পাদনা ও সংযোজনের অনিবার্যতাটুকু নিয়ে কথা বলতে বলতে সন্ধ্যে গভীর হয়ে নামলো। সুধন্য যদিও একটি ক্লাসিকের শরীরে আঁচড়টুকু  পর্যন্ত মেনে নিতে পারে না। তার কথা হলো এতোই যদি সময়কে তুলে ধরার দায় বোধ করো আরেকটা জিনিস কাটাকুটি না করে নিজেই একটা লিখে ফেলো বাপু। তবু মানুষটার বলবার ধরণ তার ভালো লাগলো। সপ্তাহখানেক পরে আবার বসবার দিন ঠিক করে সবাইকে নাটকটা ফটোকপি করে নিতে বলা হলো। মিটিং শেষে একখানা পার্টির মুখপত্র কিনে সে নেমে আসে৷ নিজের শহরের সন্ধ্যার রূপ সে হৃদয় দিয়ে উপভোগ করে। ফোনে রিং হয়। রিসিভ করবার পর ওদিক থেকে উৎকণ্ঠিত গলা,’তুমি কোথায় গেলে ভাই?অফিসের নিচে আসো একটু।’ স্টেশন রোডের  দিকে যাচ্ছিলো সুধন্য, পুরনো বইয়ের দোকানে ঢুঁ মারার জন্যে। আবার ফিরলো। মাহবুব ভাই ত্রপাকে আর মণীশকে কিছু একটা বোঝাচ্ছিলেন। সুধন্যকে দেখে মুখে হাসি ফুটলো৷ ‘কোন ফাঁকে বেরোলে?’ বলতে বলতে তিনি কাঁধের ঝোলা ব্যাগ থেকে একটা বই বের করলেন। শঙখ ঘোষের বই ‘কালের মাত্রা ও রবীন্দ্রনাটক।’ ‘এটা তখনই পড়তে দিতে চেয়েছিলাম। মাথা থেকে ছুটে গেলো।’ সে আস্তে বললো,’বইটা পড়েছি।’ খানিকটা চমকালেন বোধ হয় মাহবুব আলম। ‘বাসায় যাওয়ার তাড়া আছে?’ সুধন্য বললো,’একটা ছোটো টিউশন ছিলো।’ ‘সুধন্য, আজ টিউশনে যেও না। চলো, তোমায় এক জায়গায় নিয়ে যাই।’ আগ্রহ হলো সুধন্যের। এই আগ্রহ তার চিন্তার পৃথিবীকে অনেকটাই পাল্টে দিলো। 
****
একটি যুবক মানসিক হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলো। চারপাশ অনেক রঙিন মনে হচ্ছে। কিন্তু আকাশ মেঘলা। ঈশ্বর কোথাও কোথাও জল রঙের ছিটে বেশি দিয়ে ফেলেছেন। অনেক স্মৃতি তার বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। অনেক স্মৃতি হঠাৎ হঠাৎ বিদ্যুতের ভোল্টেজের মতো আসে আবার চলে যায়। আবছা মনে পড়ে তার স্ত্রী ছিলো। তারা ছিলো নিঃসন্তান। স্ত্রী প্রায়ই চিৎকার করতো, অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতো আর সে ডুবে থাকতো রঙের জগতে। বয়সে বেশ ছোটো এক মেয়েকে ভালো লেগেছিলো তার। মেয়েটির হাত ধরে তার মনে হয়েছিলো বহুরঙা এক সম্ভাব্য সম্পর্কে সারাজীবনের জন্য জড়িয়ে পড়ছে। তার সর্বস্বজুড়ে তীব্র উল্লাস হতে থাকে৷ না, যৌনউল্লাস নয়। একটিই মিথ্যে নয় একাধিক মিথ্যেই বলেছিলো, না বলে পারেনি। বিয়ের কথা রেখেছিলো গোপন। আজ হঠাৎ মেয়েটির কথা  মনে পড়লো। মনে পড়া মানে চকিত এক মুখের ঝিলিক। সামনে এক টং দোকান। ক্ষুধা পেলো তার। দুটি বন আর একটি কলা কিনলো। এখন আর তার কেউ নেই। যেতে পারে এমন কেউ নেই। তবু সুস্থিরভাবে বসে খানিক ভাবা দরকার। এখন চিন্তারা আর আগের মতো অতোটা জট পাকিয়ে থাকে না৷ বন কলা নিয়ে রাস্তার অন্যদিকে দেখলো ঝাঁকড়া এক গাছের নিচে বসার জায়গা। রাস্তা পার হওয়ার সময় একটা দ্রুতগামী ট্রাক তার উপর দিয়ে চলে গেলো৷ রক্তের লালে কলার হলুদ আর বনের বাদামী রং জীবনের শেষ স্টিল লাইফ পেইন্টিং হয়ে রইলো যেন৷ তারপর যা যা হয়, লোক জমা। পুলিশ আসা। তার পকেট থেকে ন্যাশনাল আইডি কার্ড পাওয়া গিয়েছিলো। নাম শামস উল মমীন। পেশা ফ্রি ল্যান্স আর্টিস্ট।  মর্গে ওর বিছানা হলো একটা। মর্গের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছিলো বৃষ্টি হচ্ছে। 

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>