তাজপুরের তাজ

আজ ২৯ অক্টোবর কথাসাহিত্যিক হিমি মিত্র রায়ের শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


 

“মন্দারমণিটা বড্ড বেশি গ্যাঞ্জাম হয়ে গেছে রে, দু’দন্ড শান্তিতে প্রকৃতি-দর্শন আর ফোটোগ্রাফি করবি সেটাও পারবি না। সব ছবির মধ্যে দেখবি লোকজন কিলবিল করছে, দমবন্ধ লাগবে। তার চেয়ে বরং চল তাজপুর যাই, ওটা অনেক ভালো। শান্ত জায়গা, তিনদিন আরাম করে প্রকৃতিপ্রেমী হওয়ার জন্য আইডিয়াল প্লেস।”

“তো আমি কোথায় মানা করছি? ওই ভিড় ভাট্টার মধ্যে কে থাকতে চায় বল তো? চল, তাজপুর ইজ ফাইনাল। শুধু নেচার আর নেচার। নো বসের কচকচানি।”

ঋতম আর সুতীর্থ অনেক ছোটোবেলার বন্ধু। যত বয়স বেড়েছে, ওদের বন্ধুত্বের বন্ধন তত দৃঢ় হয়েছে। এখন ওরা দু’জনেই প্রতিষ্ঠিত। সুতীর্থর বাবার খুব একটা ইচ্ছে ছিল না ও চাকরি করুক। বরং ওনার ব্যাবসার হাল ধরুক ছেলে এমনটাই চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সুতীর্থ নাছোড়বান্দা। বিজনেস ওর নাপসন্দ। যখন প্রয়োজন হবে তখন ঠিক সামলে নেবে, আপাতত এই চাকরিতেই থাকবে ও। কিন্তু অ্যাডভেঞ্চারের শখ ওর ছোটো থেকেই। ডিসকভারিতে বিভিন্ন রোমহর্ষক ঘটনা আর জঙ্গলে রাত কাটানোর মতো অভিজ্ঞতাগুলো মন দিয়ে দেখে ও। আর ভালোবাসে গোয়েন্দা গল্প পড়তে। ইংরেজি, বাংলা সবই ওর সংগ্রহে রয়েছে।

ঋতমও ঠিক তাই।ওদের ইচ্ছেগুলোও একইরকম বলে এত বন্ধুত্ব দু’জনের। সবে সবে স্কুল শিক্ষকের চাকরি পেয়েছে ও। ওর বাবাও শিক্ষক, গুরুগম্ভীর হেড মাস্টারমশাই। কিন্তু ছেলেকে কিছুতে বাধা দেন না। বলেন, ‘এখন ঘুরে নাও, এরপর সংসারী হতে হবে। তখন চাইলেই যখন তখন বেরোতে পারবে না।’ ঋতমের এক দিদি, আমেরিকায় থাকে। মা ছেলে অন্ত প্রাণ। তাজপুর যাওয়ার কথা বলায় খুব মন খারাপ। তিনটে দিন ছেলেকে দেখতে পারবে না যে!

অতঃপর যাওয়ার সমস্ত তোড়জোড় হয়ে গেল। হাজার না করা সত্ত্বেও ওদের মায়েরা প্রচুর খাবারদাবার দিলেন পথে ঘাটের কথা ভেবে। অগত্যা ব্যাগ ভরে গেল এমনিতেই। তাঁবুতে শুয়ে শুয়ে চালকুমড়োর মোরব্বা খাবে আর সমুদ্র দেখবে, কত প্ল্যান! এদিকে তাঁবুর কথা ঋতমরা বাড়িতে বলেনি। বললে আর দেখতে হত না। মা হয়তো যেতেই দিত না। ওরা বলেছে হোটেলেই থাকবে। এটুকু মিথ্যে বলতেই হল। নয়তো আর দেখতে হত না।

আজ ট্রেনে খুব ভিড়। একটু শান্তিমতো যাওয়া যাবে না। একটা কলেজ স্টুডেন্টদের দল উঠেছে, হৈ হৈ আর চিৎকারে টেঁকা দায়। তবে মন্দ লাগছিল না। বরং এনজয়ই করছিল ওরা। মাঝে মাঝে বেসুরো গিটার বাজাচ্ছিল, গলা মিলিয়ে গানও। শুধু ভালো লাগছিল না ওদিকের সিটে বসা একজন ষণ্ডামার্কা লোককে। অদ্ভুত চাহনি তার। ঘাড়ের কাছে কাঁকড়াবিছের উল্কি করা, হাতে একটা বড়ো ক্যারিব্যাগে কী এক জিনিস নিয়ে এমনভাবে ধরে বসে রয়েছে যেন এখুনি কেউ এসে ওটা নিয়ে যাবে। কী জানি বাবা, হতে পারে চোর-ডাকাত। কাউকেই বিশ্বাস করা যায় না।

দীঘা স্টেশনে পৌঁছতে দেরি হয়ে গেল, সন্ধে ছ’টা প্রায়। কী সুন্দর সামুদ্রিক হাওয়া বইছে! ওরা হেঁটে ট্যাক্সি-স্ট্যান্ডে এসে একটা গাড়ি ভাড়া করল। আর বেশি প্যাসেঞ্জার নেইও দু’একজন ছাড়া। অনেক দর কষাকষির পর কিছু বেশি ভাড়ায় রাজি হল বয়স্ক পাঞ্জাবি ড্রাইভার।

“এই সন্ধেবেলা তাজপুর কোই নহি যায়েগা, আপ পুছ লিজিয়ে।”

“কিউ নহি জায়েঙ্গে? কুছ হুয়া কেয়া?”

“রাস্তা ইতনা খারাব হ্যায় কি পুছনা মত। গাড়ি খারাব হো যাতা হ্যায়। অউর…”

“অউর ক্যায়া?” ঋতম জিজ্ঞেস করল।

“অভি খারাপ লোগ কা আনাযানা বঢ় রহা হ্যায় উধর। রাত জ্যাদা হোনে সে ক্রাইম হো রহা হ্যায়। ট্যুরিস্ট লোগ ভি লোকাল থানে মে কম্পলেন দরজ কর রহে হ্যায়। আপ লোগ সে বাত করকে আচ্ছা লগা, ইস লিয়ে আপকো বাতা দিয়া।”

“সুকরিয়া সর্দারজি। আপ সির্ফ হামে উস অ্যাড্রেস পে ছোড়কে চলে আইয়ে, অন্দর যানা নহি পঢ়েগা।”

ওদের কথামতো ড্রাইভার ওদের ‘সমুদ্র সৈকত’ বলে একটা সাধারণ বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। ঋতমের কথামতো এখানেই সমুদ্রের ধারে রাত যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাওয়া যাবে। ওর স্কুলের কলিগই এই অ্যাড্রেসটা দিয়েছিল।

কলিং বেল বাজানো মাত্রই একজন টাকমাথা মাঝবয়সী ভদ্রলোক দরজা খুললেন, “কী ব্যাপার?”

“আমরা সি-বিচে থাকার ব্যাপারে একটু কথা বলতাম। এই অ্যাড্রেসে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছিল। প্রণয় তালুকদার, আমার কলিগ আপনার কথাই বলেছে আমায়।”

কিছুক্ষণ আপাদমস্তক দেখে নিয়ে উনি বললেন, “আসুন।”

ভেতরটা বেশ প্রশস্ত। বাইরে থেকে দেখলে ছোটো মনে হয়, কিন্তু ঘরের ভেতরটা বেশ বড়ো, প্রচুর জিনিসে ঠাসা। হরেকরকম তাঁবু, স্লিপিং ব্যাগ, পোর্টেবল ল্যাম্প, মশা পোকামাকড় মারবার স্প্রে, আরও অনেককিছু।

“থাকতে চাইছেন ভালো কথা, কিন্তু আমাদেরও কিছু দায়দায়িত্ব আছে আপনাদের সাবধান করার, তাই বলছি। এখানে খুব চুরি, ছিনতাই শুরু হয়েছে। রাতেরবেলায় সমুদ্রের ধারে থাকাটা বিপজ্জনক। আমরা ব্যবসা করে খাই, কিন্তু ট্যুরিস্ট ভগবান। তারপর কিছু হলে আমাদের সম্পর্কে ভুল বার্তা যাবে। বলবে, আমরা জেনেও সাবধান করিনি।”

“সাবধান করে দেওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। তবে একবার যখন ডিসাইড করে ফেলেছি তাঁবুতে থাকব তখন অন্যখানে অর্থাৎ হোটেলে থাকলে পুরো মজা মাটি হয়ে যাবে। আপনি বরং প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো রেডি করে দিন। তাজপুর সি-বিচ এখান থেকে কতটা দূর হবে?” সুতীর্থ একনাগাড়ে কথাগুলো বলে গেল।

“তা প্রায় দশ কিলোমিটারের মতো।আপনাদের মালপত্রসমেত আমরা পৌঁছে দিয়ে আসব। তবে পুরো টাকাটাই কিন্তু আমরা আগে নিয়ে নিই। ভাড়ার জিনিসে কোনও ক্ষতি যাতে না হয় প্লিজ খেয়াল রাখবেন।”

“সে ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত থাকুন। কোনওরকম দুর্ঘটনা না ঘটলে আপনার সমস্ত জিনিস সম্পূর্ণ অক্ষত থাকবে।”

“আর একটা জিনিস, কাঁকড়া থেকে সাবধান।ওরা কিন্তু ডেঞ্জারাস। রাতে তাঁবুর ভেতর ঢুকে যেতে পারে। সেদিকে অবশ্যই খেয়াল রাখবেন।”

সন্ধে প্রায় আটটা। টেম্পোতে করে সি-বিচের দিকে রওনা হল ওরা। যাওয়ার পথে একটা ধাবা থেকে রুটি-মাংস কিনে নিল, আর সঙ্গে তো ঋতমের মায়ের দেওয়া প্রচুর খাবারদাবার রয়েছে।

সমুদ্র যত কাছে আসছে, জলের আওয়াজ তত তীব্র হচ্ছে।ভয়ানক সুন্দর এই বঙ্গোপসাগর। যতবার দেখা যায় এর সৌন্দর্য তত বাড়ে বই কমে না। অনবরত ঢেউয়ের আছড়ে পড়া দেখতে কার না ভালো লাগে!

সুতীর্থর মনে আছে, খুব ছোটোবেলায় ও পুরী ঘুরতে গেছিল বাড়ির সকলের সঙ্গে। ভাইবোনেরা মিলে খুব মজা করেছিল। ফেরার দিন হোটেল থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সিতে উঠে যেতে যেতে সমুদ্রের দিকে তাকিয়েই ছিল ও। একসময় সমুদ্রটা চোখের আড়ালে চলে যায়। খুব কান্না পেয়েছিল ওর, মনে আছে।

টেম্পোর ড্রাইভার ওদের জিনিসপত্র নামিয়ে দিল আর তাঁবু টানাতে হেল্পও করে দিল। যাওয়ার আগে, “সোমবার দেখা হবে,” বলে চলে গেল। সমুদ্রতটের ঠিক আগে থেকে শুরু হয়েছে ঝাউবন। অসংখ্য সারি সারি দিয়ে ঝাউগাছ জায়গাটিকে অন্যমাত্রা দিয়েছে। জ্যোৎস্নার আলোয় আরও সুন্দর দেখাচ্ছে। ঝিরঝির করে বাতাস বইছে আর ঝাউবনকে দুলিয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে। হোটেলে না থাকার প্ল্যানটা সার্থক হল যেন। বিচে কোনও লোক নেই, হয়তো এখন কেউ বিচে আসেনি। ওদের তাঁবুটা একটা ঝোপের আড়ালে টাঙানো হয়েছে। যত কম দেখা যায় বাইরে থেকে। ঝাউবনের রঙ আর তাঁবুর রঙ মিলেমিশে একরকম লাগছে, গাঢ় সবুজ।

জিনিসপত্র গোছাতে গোছাতে দশটা বেজে গেল। মোবাইলে কোনও নেটওয়ার্কই নেই। মুশকিল হল। কিন্তু কী আর করা যাবে। প্রকৃতির মাঝে এদেরকে বেশি গুরুত্ব না দেওয়াই ভালো। ওরা খুব খুশি।

রুটি, মাংস আর মোরব্বা দিয়ে রাতের খাবারের পাট চুকিয়ে হাঁটতে বেরোল ওরা। সঙ্গে নিয়ে নিল মোবাইল আর পার্স। চুরি হওয়ার বিশেষ কিছু নেই আর তাঁবুতে। জ্যোৎস্নালোকে বালির মধ্যে অসংখ্য লাল কাঁকড়া দেখা যাচ্ছে। ওদের পায়ের শব্দে সব এদিক ওদিক পালানো শুরু করে দিল। গর্তে ঢুকছে আর বেরোচ্ছে। বেশ মজা লাগে দেখতে। দূরে ট্রলারগুলোর আলো দেখা যাচ্ছে।মাছ ধরতে কত দূর দূর পাড়ি দিয়েছে এরা, জীবনের তোয়াক্কা না করে।

এবার আস্তে আস্তে তাঁবুতে ফিরে আসতে শুরু করল ওরা। হঠাৎ খট করে একটা আওয়াজে ঘুরে তাকাল। পেছন ঘুরতেই চোখে পড়ল কিছু লোকের ধস্তাধস্তি। একটা বন্ধ দোকানের পাশে পেছন ঘুরে বলে ঋতমদের দেখতে পাচ্ছে না ওরা। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে দুটো লোক একটা লোককে মারতে মারতে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে গেল। কী করবে ভেবে না পেয়ে ওরা তাঁবুতে ফিরে এল। পুলিশের খোঁজ করে লাভ নেই, জনমানবশূন্য। তাঁবুর কাছে এসে সুতীর্থ হঠাৎ চমকে গিয়ে বলল, “এটা কী?”

ঝোপের আড়ালে একটা বড়ো প্যাকেট, গার্ডার দিয়ে মুখ বাঁধা।

“বোম-টোম না তো আবার?”

“ধুর, এখানে বোম কে রাখবে, জঙ্গলে?”

সুতীর্থ প্যাকেটটা হাতে তুলতে গিয়ে দেখল বেশ ভারী। মনে হচ্ছে কোনও ধাতব জিনিস রয়েছে। ওরা ওটাকে তাঁবুতে এনে তাঁবুর মুখ ভালো করে বন্ধ করে দিল। ল্যাম্পের আলোয় প্লাস্টিকের রঙটা, আকারটা কেমন চেনা চেনা লাগছে।

“আচ্ছা, এটা সেই হলুদ প্যাকেটটা না?” ঋতম বলল।

“যেটা ট্রেনে ওই বিদঘুটে লোকটা ধরে বসেছিল, তাই তো?” সুতীর্থ মুচকি হেসে বলল।

“এগজ্যাক্টলি! ব্যাটাকে দেখে তখন থেকেই সন্দেহ হচ্ছিল যে সামথিং ইস রং! চ, খুলে দেখি।”

ভেতরের বস্তুটি দেখে ওদের মুখ দিয়ে কথা বের হল না বেশ কিছুক্ষণ। একটা বহু পুরনো মুকুট! সাধারণ নয় এ মুকুট। দু’পাশে কাঁকড়ার দাঁড়ের মতো শিং, যেন কোনও অসুর সম্রাটের মাথার। সোনালি রঙটা বিবর্ণ হলেও অদ্ভুত এক আভিজাত্য রয়েছে। তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।

“কী হতে পারে বল তো? মনে তো হয় কোনও মিউজিয়াম থেকে চুরি করা আর এখন পাচারকারীদের খপ্পরে,” সুতীর্থ হাঁ করে তাকিয়ে আছে মুকুটটার দিকে আর বলছে।

“সে বিষয়ে আর সন্দেহই নেই। এটা নিয়ে পুলিশের কাছে যাওয়া উচিত। যে কোনও মুহূর্তে ওই লোকগুলো চলে আসতে পারে। কিন্তু আজ রাতে কীভাবে যাব পুলিশে? কাল সকাল পর্যন্ত ওয়েট করতেই হবে।”

দূরে শোনা গেল গাড়ি থামবার আওয়াজ।

“মনে হয় ওই লোকগুলোই আবার এসেছে, প্যাকেটটা খুঁজতে! চল পালাই।”

“তাঁবুটা দেখে সন্দেহ করবে তো!”

“সেসব ভাববার সময় নেই আর।”

প্যাকেটটা দ্রুত হাতে নিয়ে তাঁবু থেকে বেরিয়ে দৌড়তে শুরু করল ওরা! আর কোনওদিকে তাকাচ্ছে না।

“মনে হয় তাঁবুটা দেখতে পাবে না, ঝোপের পেছনে রয়েছে,” হাঁপাতে হাঁপাতে বলছে ঋতম।

“যা হয় হোক। আপাতত এই মুকুটকে পুলিশের কাছে না দিতে পারা অবধি শান্তি নেই।”

অনেকটা দূর চলে এল ওরা। একটা টাওয়ার দেখতে পেয়ে দাঁড়াল। মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।

“চল, রাতটা এখানেই কাটিয়ে দিই। কোথায় বা যাব দৌড়ে!”

কিছু না ভেবে টাওয়ারের সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল অনেকটা। ওপরে উঠে মনে পড়ল নীচে ছিটকিনি আটকানো হয়নি। ঋতম আবার নীচে গেল কাঠের দরজা বন্ধ করতে। সুতীর্থ ওপরে কাচের জানালা দিয়ে নজর রাখতে লাগল যতদূর দেখা যায়।

চাঁদনি আলোয় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে তিনজন লোক। আবার আগের মতোই ওরা বাকি লোকটাকে মারতে মারতে নিয়ে এল। লোকটা আঙুল দিয়ে ঝোপটাকে দেখাল যেখানে ওরা প্যাকেটটা পেয়েছিল। সেই লোকটাই হবে বোধহয়, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। ওরা বোধহয় তাঁবুটাকে দেখতে পায়নি। বুক ধড়ফড় করছে সুতীর্থর। পেলে যে কী করবে! এদের কাছে অস্ত্রশস্ত্র থাকবে স্বাভাবিক।

দু’জন ঝোপের মধ্যে খোঁজাখুঁজি করতে থাকল। কিছুক্ষণ পর না পেয়ে আবার ওই লোকটাকে থাপ্পড় মারল একটা। কিছু বলার পর লোকটা নিজেই খোঁজা শুরু করল। ঋতম চলে এসেছে ততক্ষণে। মশার কামড় খেতে খেতে সামনে এসব দেখছে ওরা।

লোকটা এখনও পাগলের মতো খুঁজে চলেছে। আর সুতীর্থ প্যাকেটটা বুকের মধ্যে চেপে ধরে রয়েছে। কিছুতেই ওটা ওই বদ লোকগুলোর হাতে তুলে দিতে পারবে না। এত পুরোনো ঐতিহাসিক একটা নিদর্শনের স্থান শুধুমাত্র মিউজিয়ামেই। এই খারাপ লোকগুলো বহুমূল্য জিনিসটির কদর বুঝবেই না আর বিদেশিদের কাছে পাচার করবে। এটা মানা যায় না। যেভাবে হোক এদেরকে এই তাজ দেওয়া যাবে না।

ওই লোকটা চিৎকার করে বোঝানোর চেষ্টা করে চলেছে যে ও প্যাকেটটা ওখানেই রেখেছিল। মাঝে মাঝে গলার আওয়াজ ভেসে আসছে। ওয়াচ টাওয়ারের ঘড়িতে টং টং করে তিনটে বাজল। কীভাবে সময় চলে গেল বোঝাই গেল না। লোকগুলো আবার সবাই মিলে এদিক ওদিক খুঁজতে শুরু করল। ওরা দু’জনের হাত চেপে ধরে বসে রয়েছে। তাঁবু দেখতে পেলে রক্ষে নেই!

শেষপর্যন্ত তাঁবু দেখতে পেল না ওরা, নিরাশ হয়ে চলে গেল। আর হাঁফ ছেড়ে বাঁচল ঋতমরা। তবে আজ রাতে তাঁবুতে ফিরে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। এখানেই রাত কাটাতে হবে। লোকগুলো আবার ফিরে আসতে পারে।

ঋতম প্যাকেটটা খুলল। বের করা মাত্রই যেন একটা দ্যুতি ঠিকরে পড়ল ওটা থেকে। আবছা আলোয়ও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে পড়ল ওরা। তাজটাকে সামনে রাখল। অসম্ভব সুন্দর কারুকার্য, কতরকম নক্সা করা। সুতীর্থ ভাবতে থাকল এক কল্পনার অসুর সম্রাটের কথা, যার মাথায় এই তাজ শোভা পেত। নৃশংস এক সম্রাট, প্রজারা একে খুব ভয় পায়। সামনে যাওয়ার সাহস পায় না একদম। রাজার রাগ হলে তলোয়ারের এক কোপে মাথা কেটে ফেলতেও দ্বিধা করে না। আস্তে আস্তে কখন যে ওদের চোখ লেগে এল বুঝতেই পারল না ওরা।

ঘুম ভাঙল নীচে কড়া নাড়ার শব্দে।

“কৌন হ্যায় অন্দর? দরওয়াজা খোল!”

ধড়মড়িয়ে উঠে পড়ল ওরা। বাইরের ঝুলবারান্দা দিয়ে দেখল খাকি পোশাক পরা লোক। গার্ডই হবে।

“বন্ধ কিউ কিয়া? খোল জলদি!” লাঠি উঁচিয়ে তাবড় দেখাল। রাতে এই তাবড় কোথায় ছিল কে জানে।

ওরা গার্ডকে সবটা বলল। তবে প্যাকেটটা দিল না, দেখালও না।

“হমে ভি দিখাও তো ও প্যাকেট! একবার হাম ভি তো দেখে ক্যায়সা হ্যায়!”

“পুলিশ এলে একবারে দেখুন না!” সুতীর্থ বলল।

চুপ করে গেল গার্ড। কিন্তু বোধহয় মনঃপুত হল না। ওর থেকে ফোন নাম্বার নিয়ে ফোন করার পর পুলিশ এল। তাও বেশ কিছুক্ষণ পর।

“আমি তপন শীল। এই থানার চার্জে আছি। এবার বলুন তো কী কেস?” মোটা করে ইন্সপেক্টর অবাক মুখ করে তাকিয়ে।

ওরা সবকিছু বলার পর প্যাকেটা থেকে বের করে ওটা দেখাল।

“ওয়ান্ডারফুল! আপনারা নিজেও জানেন না কী কাজ করেছেন আপনারা! গ্রেট! আমাদের কাছে খবর ছিল হায়দ্রাবাদের সালার জং মিউজিয়াম থেকে চুরি গেছে একটা দামি জিনিস। সপ্তদশ শতকের এক অত্যাচারী রাজার মুকুট এটি। এর যে কত দাম বলা মুশকিল। পশ্চিমবাংলার সব কোস্টাল এরিয়ায় এলার্ট ছিল। এটা যে আপনারা উদ্ধার করেছেন ভাবতেই পারছি না! গ্রেড জব ডান, ইয়ং মেন!”

তাঁবুসহ সব জিনিস পুলিশের জীপে ঢোকানো গেল। থানায় গিয়ে সইসাবুদ আর রিপোর্টারদের ভিড়ে অস্বস্তিই হচ্ছিল ওদের। বাকি দু’দিন ওদের জন্য মন্দারমণিতে পুলিশ পাহারায় থাকার বন্দোবস্ত হল, এলাহি আয়োজনে।

ফেরার দিন মনখারাপই হচ্ছিল। ওই তাজটা হাতে নিয়ে একবার দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিল। এখন সঠিক জায়গায় পৌঁছলে শান্তি।

ক’দিন পর কাগজে উঠল পুরো ঘটনা। অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার থেকে ওদের আমন্ত্রণ জানান হল। আর সবচেয়ে বড়ো খবর, পাচারকারীরা পুলিশের জালে ধরা পড়েছে। বাড়ির সবাই তো ওদের সম্মানে আপ্লুত। ভীষণ খুশি বলাই বাহুল্য। তবে ওদের তাজপুর ভ্রমণ সার্থক, যেন এই তাজের পুনর্জন্ম হল তাজপুরেই।

 

 

কৃতজ্ঞতা: ম্যাজিক ল্যাম্প

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত