রানা প্লাজা দূর্ঘটনাঃ ট্রমাহত হিমু ও আমরা

মানুষ ও পশুপ্রেমী হিমালয় হিমুর আত্মহত্যা, আমাদের জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার নতুন গল্প। শহীদুল জহির বেঁচে নেই বলে সেই গল্প আমাদের আর কেউ শোনাবে না। রানা প্লাজা ট্র‍্যাজেডি শুধু জাতীয় বিপর্যয় নয় এটা মানবসৃষ্ট বিশ্ব বিপর্যয় ছিল। একটা ছেলে ছয় বছর আগের যে দিনে রানা প্লাজা থেকে টেনে টেনে লাশ বের করেছে, সেই ছেলে ছয় বছর পরের একই দিনে,একই জায়গায় নিজের গায়ে আগুন ঢেলে আত্মাহুতি দিয়েছে। ছেলেটার নাম নওশাদ হাসান হিমু। পরিচিত অনেকের বন্ধু ও কমরেড। আমার সাথে মিউচুয়াল ছিল। ছবির হাটে অনেকবার দেখেছি। কথা হয়নি কখনো। শোনা যাচ্ছে, প্রেমাহত হয়ে লাশ কাটা ঘরে গিয়েছে ছেলেটা। আহ মরণ! কিন্তু মরণের জন্য সাভার ট্রাজেডির দিনটাকেই কেন বেছে নিল সে। প্রেম ও জনজীবনের বেদনা নিয়ে রাষ্ট্র কাঠামো মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে তার
মৃত্যুতে। প্রেমের কাছে আহত মানুষ ডুবে মরেছে মরে যাওয়া রাষ্ট্রের কাছে। যে ছেলেটা হেক’স ব্লেড দিয়ে ঘষে ঘষে লোহা লক্কড় কেটে, পাথরের গাঁথুনি সরিয়ে ধ্বংসের স্তুপ থেকে বের করেছে খন্ডিত মানুষের দেহ। যে ফালি ফালি করে কাটা মাছের মত ঘাসের উপরে বিছিয়ে বিছিয়ে রেখেছে টুকরো টুকরো মৃতদেহ সেই ছেলেটা জীবন ও মৃত্যুর তোপের মুখে পরেছিল। সেই তোপের অনলে পুড়েছে সে। যে রাষ্ট্র রানা প্লাজার হত্যাকারীদের বিচার করেনি; তারা এসব সেভিওরদের জন্য কোন পূনর্বাসন কর্মসূচী নেয়নি। নেয়ার কথাও না। তারা তো কাঠামোগত হত্যার যোগান দাতা। কাঠামোর মালিকদের রক্ষক। ওদের তৈরি বিপর্যয় থেকে মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে জেরবার হয়েছে হিমুর জীবন। যে হিমু ধ্বংসস্তুপের নীচ থেকে খনন করে এনেছে জীবিত মানুষ, মৃত মানুষ, বিচ্ছিন্ন করে কেটে ফেলা মানুষ সে নিজেই সবার অজান্তে হয়ে উঠেছে আরেক বিপর্যস্ত জীবন। ধসে পরা বিপর্যয় সবার কাছে চাক্ষুষ হয়েছে। কিন্তু হিমুদের বিপর্যয় কারো কাছে চাক্ষুষ প্রতীয়মান হয়নি। হিমু তাই অবলীলাক্রমে বিপর্যয়ের স্তুপে পর্যবসিত হয়েছে। এদের অবস্থা হয়েছে কার্ল মার্কসের কথিত সেই শ্রমিকদের বিচ্ছিন্নতার মত। যারা নিজে শ্রম দিয়ে পণ্য তৈরি করে কিন্তু তার মূল্য পায় না, যারা উৎপাদন করে কিন্তু ভোগ করতে পারে না, যারা মেহনত দিয়ে সভ্যতা নির্মাণ করে কিন্তু উন্নত সভ্যতা তাদের ততটাই অসভ্যে পরিনত করে। এরা রাষ্ট্রের কাছে বিচ্ছিন্ন হয়, নিজের বিপর্যয় নিয়ে সমাজেও বিচ্ছিন্ন হয়। এই বিচ্ছিন্নতা ব্যাক্তিজীবনে প্রবেশ করলে পরিবার থেকেও ক্রমশ তারা সরে যায়। সবশেষে নিজের আন্ত:ব্যাক্তিক জীবনটাও দুর্বিষহ হয়ে পরলে সে পরিত্রাণ নেয় নিজের কাছ থেকেও। হিমুও তাই করেছে। সে নিজের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছে। মার্কসের বিচ্ছিন্নতা ঘটে শ্রমিকের উৎপাদন আর বন্টনের ভেতর দিয়ে কিন্তু হিমুদের এই বিচ্ছিন্নতা ঘটেছে চূড়ান্ত মানবিক বিপর্যয় হতে। এই বিপর্যয় ক্রমে তাকে পিষে পিষে মেরেছে। প্রেম সেখানে উপলক্ষ্য মাত্র। মনের বিপর্যয় হয়তও প্রেমটাকে ভারী করে তুলেছিল। যে হিমু সারাদিন কুকুর আর বিড়ালের নিবিড় বান্ধব ছিল, এই মানুষটাও নির্মলতা হারিয়েছে অবলা পশুর থেকে। হিমুর জন্য বেঁচে থাকাটা কঠিন হয়ে উঠেছিল। সহজ ছিল মরে যাওয়াই। যে আমাদের আনসাং হিরো হবার কথা ছিল, সে ধীরে ধীরে মিইয়ে গেছে। আমরা কেউ তাকে বাঁচাইনি। তার বন্ধুরা, তার পার্টি, তার পরিবার আমরা সবাই রাষ্ট্রের মতই দুরবর্তী ভুমিকা পালন করে গেছি হিমুর প্রতি।

আট তলা ভবনের স্তপের নীচে থাকা জীবনের গোঙানি যাকে করে তুলেছিল লৌহ মানব। লোহার রডের আড়ে পরে থাকা যে নিষ্পাপ মুখ তাকে বলেছিল ভাই ” হাতটা কেটে নিয়ে হলেও আমাকে বাঁচান” সেই নিষ্পাপ মুখের আর্তির কাছেও জীবন ধরা দেয়নি হিমুর। হিমু এতোটাই প্যারানয়েড ছিল। এতোটাই ট্রমায় ছিল। এই ট্রমা আমাদের সবার।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত