| 2 মার্চ 2024
Categories
ফিচার্ড পোস্ট লোকসংস্কৃতি

ইরাবতী ফিচার: প্রাচীন রত্ন মুক্তা । নুসরাত জাহান

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

সৌন্দর্য বর্ধন, ঐশ্বর্য, প্রেম, গৌরব, মর্যাদা ইত্যাদি প্রকাশে নানা রকম রত্নের ব্যবহার হয়ে আসছে সেই সুপ্রাচীন কাল থেকেই। মুক্তা এর মধ্যে অন্যতম। একে ‘রত্নের রানি’ও বলা হয়। কারণ মুক্তা নারীর কমনীয়তাকে প্রতীকায়িত করে। মুক্তাকে বলা হয় প্রাচীনতম রত্ন। খ্রীষ্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দেও মুক্তার ব্যবহারের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রাচীন মিসরে শোপিস হিসেব মুক্তা ব্যবহৃত হতো। রানি ক্লিওপেট্রার বিশেষ দুর্বলতা ছিল মুক্তার প্রতি। গ্রীক সভ্যতায় মুক্তা ছিল ভালবাসা ও বিয়ের স্মারক। চীনা সম্রাটদের মুকুটে মুক্তা ব্যবহার করা হতো সম্মানের প্রতীক হিসেবে।

মুক্তার ইংরেজি হলো Pearl। আরবিতে একে ডাকা হয় ‘লুলুউ’ নামে। মুক্তা একটি প্রাণীজ রত্ন। সমুদ্র, নদী, হ্রদে বসবাসকারী ঝিনুকের মধ্যে মুক্তা জন্মায়। ঝিনুকজাতীয় প্রাণীটি তার অতি কোমল ও মোলায়েম দেহটি শক্ত একটি খোলস বা আবরণের মধ্যে লুকিয়ে রাখে। কোনো কারণে এই শক্ত আবরণের ভেতরতে কঠিন কোনো জিনিস যেমন বালুকণা, মাটি বা পাথরকণা ঢুকে গেলে প্রাণীটি অস্বস্তি বোধ করতে থাকে এবং অনাহুত জিনিসটিকে ধ্বংস করার জন্য তরল ক্যালসিয়াম কার্বনেট নিঃসরণ করে। প্রাণীটির দেহ থেকে নিঃসৃত ক্যালসিয়াম কার্বনেট জমাট বেঁধে মুক্তায় পরিণত হয়। মুক্তা জন্মদানকারী এসব ঝিনুককে Mother of Pearl বলে। মুক্তা বেশ কয়েক প্রকারের হয়। একটি হলো ঝিনুক থেকে পাওয়া মুক্তা, যাকে বলা হয় Oyster pearl। আরেকটি হলো সমুদ্রচারী শঙ্খ থেকে পাওয়া মুক্তা, যাকে বলা হয় Conch pearl। মুক্তা দুভাবে আমরা পেয়ে থাকি। প্রাকৃতিকভাবে এবং চাষ করে। প্রাকৃতিক মুক্তা পাওয়া যায় যে ঝিনুক থেকে তাকে বলে ‘পিংকটাডা মার্গারিটিফেরা’ এবং কৃত্রিম মুক্তা চাষ করা হয় যে ঝিনুকের মাধ্যমে তাকে বলা হয় ‘পিংকটাডা মারটেনসি’। হাজার হাজার বছর ধরে সমুদ্র থেকে মানুষেরা প্রাকৃতিক মুক্তা আহরণ করে আসছে। আরব সাগর, বঙ্গোপসাগর, পারস্য উপসাগর, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, সিংহল, মাদ্রাজ ইত্যাদি জায়গা প্রাকৃতিক মুক্তার জন্য প্রসিদ্ধ। এসব মুক্তা সাদা, অফহোয়াইট, ধূসর, নীলচে সাদা, গোলাপি, কালো ইত্যাদি নানা রঙের হয়ে থাকে। শঙ্খমুক্তাগুলো হয় গোলাপি রঙের এবং এগুলো বেশ দামী। প্রাচীনকালে বাংলাদেশে পিংক পার্ল বা গোলাপি মুক্তা পাওয়া যেত। কক্সবাজারের মহেশখালী বিখ্যাত ছিল গোলাপি মুক্তার জন্য। চীনা ধর্মগ্রন্থ ‘বৃহত্‍ সংহতি’তে এ মুক্তার উল্লেখ রয়েছে। মোঘল সম্রাট আকবরের নবরত্ন সভার অন্যতম আবুল ফজল তাঁর রচিত ‘আইন-ই-আকবর’ গ্রন্থে গোলাপি মুক্তার কথা উল্লেখ করেছেন। কালো মুক্তা সবচেয় দুর্লভ। মেক্সিকোর উপকূলে কদাচিত্‍ কালো মুক্তাওয়ালা ঝিনুকের সন্ধান মেলে। বহুযুগ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের মুক্তা ছিল বিশ্ববিখ্যাত। বাহরাইনের একটি ছোট্ট দ্বীপ বসেরা, একসময় এটি উন্নত মানের মুক্তার জন্য ভুবনবিখ্যাত ছিল।


how-identify-real-pearls


সর্বপ্রথম কৃত্রিম উপায়ে মুক্তা চাষ কোথায় শুরু হয়েছিল, তা নিয়ে যথেষ্ট দ্বিমত রয়েছে। তবে ইতিহাস বলে সবার আগে কৃত্রিম উপায়ে মুক্তা চাষের পদ্ধতি আবিষ্কার হয় চীনে। দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দীতে চীনের হুচাও প্রদেশের বাসিন্দা জিনইয়াং প্রথম আবিষ্কার করেন মুক্তার সৃষ্টিরহস্য। তখন থেকেই চীনে মুক্তার কৃত্রিমভাবে চাষের চেষ্টা শুরু হয়। ধীরে ধীরে সারাবিশ্বের নানা দেশে কৃত্রিম মুক্তা চাষ শুরু হয়। বর্তমানে জাপান মুক্তা চাষের শীর্ষে রয়েছে। সম্প্রতি ফরাসি গবেষকগণ সংযুক্ত আরব আমিরাতে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন মুক্তার সন্ধান পেয়েছেন। প্রায় সাড়ে সাত হাজার বছর পুরোনো এই মুক্তাটি একটি কবর থেকে উদ্ধার করা হয়। উম আল কুয়েইন থেকে পাওয়া এই মুক্তাটি খ্রীষ্টপূর্ব ৫৫৪৭ থেকে ৫২৩৫ অব্দের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। মুক্তা এমন একটি রত্ন যাকে ঘিরে রয়েছে নানা ধরনের মিথ, কাহিনী, কুসংস্কার! প্রাচীনতম রত্ন বলেই হয়তো মুক্তা সম্পর্কিত এসব তথ্য মানুষ বছরের পর বছর ধরে এসব বিশ্বাস করে আসছে। যেমন –

– বিশেষ ধরনের কিছু মুক্তা গুঁড়ো করে বাঘের দুধের সাথে মিশিয়ে খেলে অনন্ত যৌবন পাওয়া যায়।

– রানি ক্লিওপেট্রা তাঁর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে গোলাপি মুক্তা খেতেন।

– রূপকথায় পাওয়া যায় যে ঝিনুকের মতো হাতির মাথাতেও মুক্তা জন্মে, একে বলা হয় ‘গজমতি’।

– সাপের মাথায় মুক্তা জন্মে, অনেক মাছের মাথায় মুক্তা জন্মে এমনকি শুকরের মাথায়ও মুক্তা জন্মে বলে মানুষ মনে করত।

– প্রচলিত বিশ্বাসে রয়েছে যে, মুক্তা পরিধান করলে সংসারে সুখ সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়, মানসিক রোগ দূর হয়। এমনকি কোনো বিষধর ও হিংস্র জন্তু বা সরীসৃপ দংশন করলে মুক্তা সে বিষ নষ্ট করতে পারে!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত