| 2 মার্চ 2024
Categories
জীবন যাপন রান্নাঘর

নামেই পোড়া আসলে অমৃত-ছানা পোড়া বা ছেনা পোড়া

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

সেদিন অনেকটা ছানা বেঁচে গেল।নয়াগড়ে দশপাল্লার বিদ্যাধর বা সুদর্শন সাহুর মিষ্টান্নের দোকানে আজ যে দুজন কারিগর ডুব মেরেছে। যতগুলো রসগোল্লা করার কথা একা সুদর্শন করে উঠতে পারে নি। ঝাঁপ বন্ধ করার আগে বেঁচে যাওয়া ছানাটায় চিনি মেখে শালপাতায় মুড়ে একটা বাটিতে রেখে নিভন্ত চুল্লিতে রেখে চলে গেল তার কাচেরি বাজারের বাড়ি। সকালে এসে বাটি বের করে সুদর্শন মাথা নাড়ে। সে এরকমই কিছু আশা করেছিল। এদ্দিন মিষ্টি বানাচ্ছে, একটা আইডিয়া তো হয়েছে। ১৯৪৭ সাল তখন। ইংরেজরা কেক বানঞ্চছে শুনেছে সে, যে ময়দায় ডিম ,দুধ, মাখন দিয়ে এরকমই চুল্লীতে পোড়ায়। কেবল ওদের ভাষায় বলে “বেক” করা। ছানা তো আধা তৈরি। দরকার কেবল ঐ মিষ্টির। তাই চিনি। আর দরকার সুগন্ধের। মনে মনে ঠিক করে ফেলে। সন্ধ্যের মুখে ছানা কাটিয়েই আলাদা করে রেখে দেয়। এলাচ গুঁড়ো আর ঘি যোগ হয় এবার। আবার ঠাঁই হয় নিভন্ত চুল্লীতে। এবার একদম ঠিকঠাক। সাজিয়ে রাখল। ক্রেতা এসে ঠিক নজর করল- কী হে ওটা? সুদর্শন তাকায় , এই রে নাম তো ভাবে নি। চুল্লীর আঁচে মিষ্টি তৈরি হতে হতে নীচের দিকটা লালচে, পাশের দিকেও তার আভা লেগে আছে। শাল পাতা আর কয়লার গন্ধ মিলিয়ে একটা লোভনীয় পোড়া গন্ধ। সুদর্শন জানত না এটাকেই ইংরেজরা স্মোকড বলে। কিন্তু যে ভাষাই হোক না কেন, গন্ধ একই হয়। তাই সুদর্শন বলে – নতুন মিষ্টি- ছেনা পোড়া।

ব্যস। হিট। নয়াগড়ের ঐতিহাসিক গুরুত্বও কম নয়। এখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বীর ভঞ্জ, শাল ভঞ্জদের কাহিনী, তাদের প্রাসাদ। ভঞ্জদের নবম রাজা পদ্মনাভ একদিন শিকারের সময় এক আশ্চর্য দৃশ্য দেখেন, একটা শিস দেওয়া পাখি হারিয়ে দিল একটা শিকারী পাখিকে। রাজার মনে হল এই স্থানের এক স্বতন্ত্র মহিমা আছে। অখনই তিনি একে রাজধানী করেন। পরে দশপাল্লা মানে দশটি পল্লী বা গ্রাম নিয়ে এই নাম দেন রাজা শাল ভঞ্জ, ১৪৯৫ সালে। আগে নাম ছিল যশপাল্লা। তারপর হেডকোয়ার্টারের বদল হয়েছে বিভিন্ন রাজাদের সময়। কিন্তু নয়াগড় বা দশপাল্লা আজও ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে ।আছে ঘড়িয়াল। আর এই ছানাপোড়া বা ওড়িয়া ভাষায় ছেনা পোড়া।

উড়িষ্যা বা ওঢ়িষার জাতীয় সড়ক নম্বর ৫-এর ওপরে , ভুবনেশ্বর আর কটকের মধ্যবর্তী এক গ্রাম। আজকের নাম পাহালা। এটাকে মিষ্টান্ন গ্রাম বলা যেতে পারে। রাজ্যের সেরা হালুইকরেরা আজ এখানেই। এখানেই এক বাইপাসে কলিঙ্গ সুইট মার্কেট। ঠিক যেমন আমাদের শক্তিগড়, এখানেও সব গাড়ি , ট্রাক, বাইক থামবেই। এক একটা ছোটো দোকানের সামনে পাতা কাঠের বেঞ্চিতে বসে রসিক মানুষ অর্ডার করবেন, রসগোল্লা, চেনাগজা নয় ছেনাপোড়া। কেউ কেউ কিনে নিয়ে যাবেন বাড়ির জন্যেও। সকাল ছ’টা থেকেই খুলে যায় দোকান , বিকিকিনি চলে মাঝরাত অবধি।

এবার লকডাউনের দৌলতে মানুষ, বিশেষ করে শহরের মানুষ টপাটপ মিষ্টি বানাতে শিখে গেল। এমনকি রসগোল্লাও। আসলে যে জিনিস সহজেই দোকানে মেলে তা অত হ্যাপা করে বানাতে কে চায়? কিন্তু ছানাপোড়ার এই এক গুণ, বানানো খুব সহজ। আর মাঝে মাঝেই দুধ কেটে ছানা হয়ে যায় সবার বাড়িতেই। আপনি হয় তো অনলাইন মিটিং বা ক্লাসে ব্যস্ত সকাল থেকে। রান্নার লোক এসে জলখাবার বানিয়ে ফ্রিজ থেকে দুধ বের করে ফোটাতে দিল। আর্ধেকদিন শুনবেন – বৌদি, দুধ ফেটে গেল। বলেই সাফাই গাইবে “ঝাঃ গরম পড়িছে!”

ওই দুধে একটু লেবুর রস দিন, গ্যাসটা বন্ধ করে দিয়ে। দুধ ফুটন্ত অবস্থায় ছানা কাটালে ছানার সফট ভাবটা চলে যায়। এবার জল ছেঁকে নিন একটা ঝাঁঝরিতে, জাঁকে বসিয়ে একদম ড্রাই করার দরকার নেই। এক লিটার দুধের ছানা হলে তাতে কম কম এক কাপ চিনি দিন আর দু চামচ সুজি। মিনিট পাঁচেক হাত দিয়ে মাখুন যতক্ষণ না চিনি গলে মিশে যাচ্ছে। এটা মিক্সিতে করতে যাবেন না। ছানার পায়েস হয়ে যাবে। এবার আধা ঘন্টা রেখে দিন চাপা দিয়ে। খুলে দেখবেন সুজির জন্য ছানামাখাটা ফুলে উঠেছে। অনেকে বেকিং পাউডারও দেন, আধা চামচ। না দিলেও ক্ষতি নেই। এবার ছোটো এলাচ গুঁড়ো এক চামচ, ঘি এক চামচ আর কাজু কুচো এক চামচ দিয়ে আবার ভালো করে মেখে নিন। একটা বেকিং ডিশ নিন।গোল আকারের হলে সবচেয়ে ভালো। ঘি মাখান, তার ওপরে বেকিং পেপার দিয়ে আর একটু ঘি মাখিয়ে দিন। সবচেয়ে ভালো হয় যদি শালপাতা যোগাড় করে তলায় বিছিয়ে দিতে পারেন, একটা দারুণ গন্ধ আসে। এবার গাসে একটা কড়াই বসান। শুকনো। তাতে স্ট্যান্ড বসান আর তার ওপরে বেকিং-এর বাটি। চাপা দিয়ে একদম ঢিমে আঁচে রেখে দিন পঁয়তাল্লিশ মিনিট। এটা অবশ্য কম বেশি হতে পারে। ঢাকা খুলে যখন দেখবেন পাশের দিকে লালচে রঙ ধরেছে আর ছেড়ে আসছে একটা টুথপিক বা ছুরি কেকের মাঝখানে আলতো করে বসিয়ে দিন। শুকনো বেরিয়ে এসেছে মানে হয়ে গেছে। গ্যাস অফ করে রেখে দিন ঠান্ডা হতে। রুম টেম্পারেচারে এলে একটা প্লেট ধরে উপুড় করে বের করে আনুন আপনার ছেনা পোড়া। কেকের মতোই কাটুন।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত