Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

যুক্তিচিন্তা-পঞ্চম পর্ব: আটকে আছি কোন সে প্যাঁচে?

Reading Time: 3 minutes

অ.

রাতে সিভিট হাতে নিয়ে আমাদের পৌনে পাঁচের অব্যয় জানতে চাইল, আমি দাঁত ব্রাশ করেছি কিনা। করেছি, জানালে তার উপদেশ, বাবা, তাহলে তুমি সিভিট খেয়ো না, বালিশের নিচে রেখে দাও। এই যে দেখ, আমিও রেখে দিয়েছি। দাঁত ব্রাশ করার পর সিভিট খেলে, তার উচ্চারণে, দাঁত নোম্রা হয়ে যায়। পুত্রের ধৈর্য্যগুণ দেখে অধৈর্য্য পিতার বেশ একটু গর্ব হয়।

অব্যয় ইদানিং ইউটিউবে নাম্বার ব্লক দেখে দেখে সংখ্যার মজায় মজেছে। সারাক্ষণ এটা ওটা গুণেই চলেছে। সিভিট বালিশের নিচে রেখে সে জানাল, বাবা, এই বাসায় ফাইভজন মানুষ দাঁত ব্রাশ করেছে, কিন্তু বাসায় সিক্সজন মানুষ আছে। কে বাদ পড়েছে জানতে চাইলে তার তড়িৎ উত্তর, 

-ঠাম্মা।

-ঠাম্মা কেন ব্রাশ করেনি?

-কারণ, ঠাম্মার তো দাঁতই নেই!

-ঠাম্মার দাঁত নেই কেন, বাবা?

-কারণ, ঠাম্মা বুড়ো হয়ে গেছে! সঠিক উত্তর দেওয়ার একটা গর্বিত হাসি তার মুখে ছড়িয়ে পড়ে।

-ঠাম্মা কেন বুড়ো হয়ে গেছে, বাবা?

-কারণ … , এবার অব্যয়কে একটু ভাবতে দেখা যায়। সামান্য চিন্তার পরে একটা ইউরেকা টাইপের হাসি আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে সে জানায়, ঠাম্মার যে সব দাঁত পড়ে গেছে, তাই ঠাম্মা বুড়ো হয়ে গেছে।

একবার গ্রামের একজন শিশুকে এতগুলো তাবিজ কেন গলায় ঝুলিয়েছে জানতে চাইলে সে বলেছিল,

-আমি খালি হই আর মরি, তাই আম্মা তাবিজ দিয়ে দিছে।

-তুমি খালি হও আর মর কেন?

-আগে তাবিজ দেয় নাই যে, তাই…l

আমাদের অব্যয় আর ওই শিশুটার কথা ভাবছিলাম। ভাবা ছাড়া আর কোনও কাজ তো পারিই না, ভাবাটাও ঠিকঠাকমতো পারি না। এদিকে কবে যেন ফেসবুকে দেখলাম, কে যেন বলেছেন, ভাব, ভাব, ভাবা প্র্যাকটিস কর। এর কিছুদিন আগে ফেসবুকে একবার করোনা থেকে বাঁচতে তিনটা পুদিনা পাতা খেতে বলেছিল। আমি হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম, খাই নাই। পরে আমার জ্বর, গলাব্যথা হল, করোনা করোনা ভাব নিয়ে আট-দশদিন কাটাতে হল। টেস্ট করে নেগেটিভ রিপোর্ট নিয়ে কতগুলো টাকা গচ্চা দিতে হল! এবার তাই আমি আর রিস্ক নিতে রাজি না, ভাবা প্র্যাকটিস করতেই হবে।

আ.

আমি খেয়াল করেছি, বাবা মা যত কড়া ধাচের হয়, শিশুদের যত শক্ত শাসনে রাখে, সেই শিশুরা তত বেশি বাধ্য হয়, বাবা মা’র কথা বিনাপ্রশ্নে বিশ্বাস করে, মেনে চলে। এরকম কোনও শিশুকে আপনি যদি জিজ্ঞেস করেন, 

-তুমি এটাকে সত্য বলছ কেন? সে হয়তো জবাব দিবে, -কারণ, বাবা বলেছেন, এটা সত্য। 

-বাবা বললেই সত্য হয়ে যাবে? তার জবাব এমন হতে পারে,

-বাবা বলেছেন, বাবারা কখনও মিথ্যা বলে না।

এই সেই চক্র।

ই.

ভেবে দেখলাম, ওদের ছোট মাথা, বুদ্ধি বেশি পেকে ওঠে নাই, তাই ওদের চিন্তা বেশিদূর আগাতে পারে না, একটা ছোট চক্রের মধ্যে আটকে থাকে, ঘুরপাক খায়। অনেকক্ষেত্রে বড়রাও শিশুদের চিন্তাকে একটা ছোট চক্রের মধ্যে আটকে রাখতে চায়। তাহলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। ফলে চিন্তা একটু আগালে ধাক্কা খেয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে।

তাহলে বড় হতে হতে কি ওদের চিন্তার এই চক্রটা বড় হবে? ওরা কি চক্রটা ভেঙ্গে নতুন প্রশ্নে, নতুন চিন্তায় ঢুকতে পারবে?

ঈ.

কিছু বাবা মা যেমন অনেক সময় নিজেদের ক্ষমতা পোক্ত করতে শিশুদের বেশি প্রশ্ন করাকে প্রশ্রয় দেয় না, যৌক্তিক অযৌক্তিক সব কথা বিশ্বাস করতে বলে, কথামতো চলতে বলে, নইলে ভয় দেখায়, শাস্তি দেয়। তেমনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষ, যেমন সমাজ, ধর্ম, রাষ্ট্র, সংগঠন ইত্যাদি বা তাদের পরিচালকরা অনেক সময় নিজেদের কর্তৃত্ব শক্তিশালী করতে বা নিরঙ্কুশ রাখতে একইভাবে নতুন চিন্তা বা প্রশ্ন করাকে নিরুৎসাহিত করে, খারাপ হিসেবে চিহ্নিত করে, নিয়ন্ত্রণ করে, ক্ষেত্রবিশেষে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে থামিয়ে দেয় বা নির্মূল করে। তারাও চায়, চিন্তা, ব্যাখ্যা বা প্রশ্নের জবাব, আমাদের অব্যয়ের মতো, একটা চক্রের মধ্যে থাকুক। চক্র একটু ছোটবড় হলেও, মানে কিছুটা ইলাস্টিসিটি থাকলেও, যাতে প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষের কাঠামো (সিস্টেম) নিরাপদ থাকে। 

উ.

ধর্মীয় অনুভূতি আমাদের একটু বেশি নরম, ধর্মের কথা থাক। ধরা যাক রাষ্ট্রের কথা। সংবিধান মেনে চলতে প্রত্যেক নাগরিক বাধ্য। কেন? কেন সংবিধানকে বিনা প্রশ্নে মানতে হবে? কারণ, সংবিধানের ক্ষমতা সবার উপরে। সংবিধানের ক্ষমতা সবার উপরে-একথার ভিত্তি কী? রাষ্ট্রের সংবিধানে একথা লেখা আছে। অর্থাৎ সংবিধানের সর্বোচ্চ ক্ষমতার ভিত্তি সংবিধান নিজেই।

এই সেই চিন্তা ও যুক্তির চক্র!

সংবিধানের ক্ষমতা সবার উপরে একথার ভিত্তি কী-এই প্রশ্নের ভিন্ন এক‌টি উত্তর হতে পারে, জনগণের আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে তাদের মতামত অনুযায়ী এই সংবিধান তৈরি। তারাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তারা এটি মেনে চলবে। এক্ষেত্রে চিন্তা বা যুক্তির চক্রটি ভেঙ্গে যায়, অন্তত প্রশস্ত হয়। এতে জনগণের ইচ্ছায় সংবিধান বদলানোর প্রশ্ন তথা জনগণের সর্বোচ্চ ক্ষমতার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। উত্তরটি এরকম হলে রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানের বা এর কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা আর নিরঙ্কুশ থাকে না।

ঊ.

এরিস্টটল কতশত বছর আগে Begging the Question নামে চিন্তা বা যুক্তির এই ভ্রান্তির কথা বলেছিলেন। অথচ আজও সেই ‘চক্রক ছদ্মযুক্তি’র চক্রান্ত থেকে মানুষের মুক্তি মেলেনি। চারপাশে এরকম বহু ছদ্মুযুক্তি বড়দের হামেশাই ব্যবহার করতে দেখা যায়, যেখানে তিনি নতুন কোনও তথ্য, যুক্তি বা প্রমাণ ছাড়াই কোন এক‌টি কথাকে সেই কথা দিয়েই যুক্তিসঙ্গত বা বিশ্বাসযোগ্য বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। এই চক্রক ছদ্মযুক্তি’ বা Circular Fallacy চিন্তার বিকাশে এক ভয়ঙ্কর গুপ্তঘাতক হিসেবে কাজ করে চলেছে।

তাই সবাইকে বলি, ফেসবুকের কথাটি কেউ হেলায় উড়িয়ে দেবেন না, ভাব, ভাব, ভাবা প্র্যাকটিস কর।

আগের পর্বগুলো ও লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে ক্লিক করুন।          

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>