হুমায়ূন আহমেদ ও ছোটগল্প

হানিফ মোল্লা

গত শতাব্দীর নব্বই দশক এর শেষ দিকের কথা, তখনও আমি হাইস্কুল এর বেড়ার ভেতর ঘুরপাঁক খাচ্ছি। এক বন্ধুর বাসায় মাঝে মধ্যে যেতাম। কখনও কাজে কখনো বা নিছক সময় কাটাতে।

গত শতাব্দীর নব্বই দশক এর শেষ দিকের কথা, তখনও আমি হাইস্কুল এর বেড়ার ভেতর ঘুরপাঁক খাচ্ছি। এক বন্ধুর বাসায় মাঝে মধ্যে যেতাম। কখনও কাজে কখনো বা নিছক সময় কাটাতে। হঠাৎ একদিন বন্ধুটির বাসার ক্যাসেট প্লেয়ারে বেজে উঠল কবিতার মতো দুঃখী কিছু কথা। স্তব্ধ হয়ে শুনতে থাকলাম। কিছুক্ষণ শুনে যাবার পর বুঝলাম এটা কবিতা নয়, গল্প। হুমায়ূন আহমেদ-এর ছোট গল্প। কে বা কারা পাঠ করেছিল এখন মনে পড়ে না, কিন্তু গল্পের কাহিনীর বর্ণনা এখনও আমার মস্তিষ্কের কোঠরে সঞ্চিত।

বাংলা সাহিত্যে আজ পর্যন্ত যত রথী মহারথী এসেছেন তার মধ্যে হুমায়ূন নিঃসন্দেহে সবচেয়ে জননন্দিত। এই জননন্দিত শব্দটি নিয়ে আমাদের সাহিত্য সমাজে বা সিভিল সমাজে এক ধরনের নাক উঁচু ভাব লক্ষণীয়। সেটা হতে পারে অপারগতার ঈর্ষাকাতরতা অথবা অযথাই অন্য এক জনের সমালোচনা। মানছি, জনপ্রিয়তাই শিল্পের মানদণ্ড নয়। তাই বলে ওহি নাজিল হবার মতো ধুম করে একজন লেখক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে না। যে শক্তির বলে হন, সেটা হলো তাঁর লেখনীর অসাধারণত্ব, পাঠকের চাওয়া ও রুচিবোধের জ্যামিতিক নিয়মে।

হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টির সোনার তরী অনেক ফসলে, বহুবিধ সৃষ্টির উজ্বলতায় ভরপুর। আমার কাছে সবচে উজ্জলতম রত্নটি মনে হয় তাঁর রচিত অসাধারণ সব ছোট গল্প। আমরা এখন মিডিয়া যুগে বসবাস করি। অনেক পাঠক তাঁর ছোট গল্প না পড়ে থাকলেও টেলিভিশনে তাঁর গল্প থেকে করা অনেক নাটক দেখেছেন। যেমনঃ- চোখ, খাদক ইত্যাদি। কাহিনীর বিন্যাসে, চরিত্র সৃজনে এবং গল্প বলে যাওয়ার ঢঙ লক্ষ্য করলে হুমায়ূন সবার চেয়ে আলাদা। পাঠককে তিনি বুঝতেই দেন না যে, গল্পের চরিত্ররা কেবল গল্পের জন্যই নয় বরং যেন চরিত্র আমাদের চারপাশের মানুষ।

হুমায়ূনের ছোট গল্পের মধ্যে আমরা দেখতে পাই তাঁর প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, মুক্তিযুদ্ধ, মধ্যবিত্তের টানাপোড়েন, ভৌতিক গল্প সহ নানা আঙ্গিকের সব গল্প। গল্পগুলান পড়তে গিয়ে লক্ষ্য করি তাঁর বাস্তব যাপিত জীবন ঘনিষ্ঠ কিছু গল্প।

রবীন্দ্রনাথের একনিষ্ঠ ভক্ত হুমায়ূন ভৌতিক ও পরাবাস্তব সব গল্পের প্রেরণা রবীন্দ্রনাথ থেকেই নিয়েছেন বলে ঘোর লাগে। কিন্তু গল্পের বর্ণনার ভঙ্গিতে, চরিত্র গঠনে, ঘটনার বর্ণনায় হুমায়ূন স্বতন্ত্র।

‘রুপা’ গল্পে প্লাটফর্মে বসে থাকা একজনের সাথে আলাপচারিতার ভেতর দিয়ে একটি ঘটনার অসামান্য বর্ণনা পাওয়া যায় খুব ছোট্ট পরিসরে। মেদ নেই, বাহুল্য নেই, কথার বাড়াবাড়ি নেই। সহজ সরল বর্ণনা, কিন্তু অসাধারণ!

‘বুড়ি’ গল্পটিকে প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতাই বলা যায়। গল্পটি একজন নিঃসঙ্গ আমেরিকান বৃদ্ধার একাকীত্ব পাঠককে নাড়া দেয়। ছোট্ট একটি উপহার একজন বৃদ্ধাকে আবেগ আপ্লুত করে। স্বল্প পরিচিত কয়েকজন মানুষ মুহূর্তেই যেন বিশ্ব মায়ার, মানবতার বাঁধনে বাঁধা পড়ে। এই সহজ বর্ণনা হয়ত হুমায়ুন ছাড়া সম্ভব ছিল না।

প্রায় বেশীরভাগ সমালোচক-পাঠক এর একটি সাধারণ অভিযোগ হুমায়ূন সাহিত্তে ইতিহাস নেই, সমাজের প্রতি দায় খুঁজে পাওয় যায় না… ইত্যাদি, ইত্যাদি। কিন্তু তাঁর ছোট গল্প যেন উল্টো কথা বলে। সঙ্গত ভাবে ছোট গল্পের মেজাজ হয়ত এরূপ। কয়েকটি গল্পে মুক্তিযুদ্ধ এসেছে। যেমনঃ- ‘উনিশ শ` একাত্তর’, বা ‘জলিল সাহেবের পিটিশন’ গল্পে। ‘উনিশ শ` একাত্তর’ গল্পে এক ভীতু গ্রামীণ স্কুল মাস্টারের ঘৃণা ও দৃঢ়তা সেই সময়ের বাঙালির মানসিক দৃঢ়তা ও সততার প্রতীক। অন্যদিকে ‘জলিল সাহেবের পিটিশন’ গল্পে মুক্তিযুদ্ধে দুটি ছেলে হারানো পিতার নতুন এক যুদ্ধ। যে যুদ্ধ ন্যায় প্রতিষ্ঠার। আজকে যখন যুদ্ধ অপরাধের বিচার চলমান ‘জলিল সাহেবের পিটিশন’ আমাদের প্রেরণার একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস হতে পারে।

‘নিশিকাব্য’ ও ‘একজন ক্রীতদাস’ হুমায়ূন এর অসাধারণ দুটো ছোট গল্পই নয়, অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছোট গল্পও বলা যায়। ‘নিশিকাব্য’ গল্পে পরী ও ‘একজন ক্রীতদাস’ গল্পে নায়কের বেদনা ভিন্নতর কিন্তু একজনের না পাওয়া ও অন্যজনের পেয়েও যেন কিছুই না পাওয়া পাঠকের বুকে বেদনা জাগায়।

অতিপ্রাকৃত গল্পগুলোর মধ্যে ‘পিঁপড়া’, ‘কুকুর’, ‘বেয়ারিং চিঠি’ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া কল্পবিজ্ঞান ভিত্তিক কিছু অসাধারণ গল্পও তিনি লিখেছেন, যেমনঃ- ‘সে’, ‘যন্ত্র’ ইত্যাদি।

বাঙলায় অনেক অনেক ছোট গল্পকার গল্প লিখেছেন, লিখছেন। অন্য সবার কথা তুলনা করে কথা কেবল দীর্ঘই হবে। হুমায়ূনকে যে স্থলে সবার চেয়ে স্বতন্ত্র মনে হয় তা হলো সহজ সরল কাহিনীর চিত্রায়ন, বর্ণনায় বাহুল্য বর্জন এবং বিষয় নির্বাচনে ভিন্নতা। হুমায়ূন আহমেদ এখন আমাদের মাঝে নেই। হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্টির মূল্যায়ন-পুনঃর্মূল্যায়ন এবং বাংলা সাহিত্যে সত্যিকার অর্থে তাঁর টিকে থাকার পরীক্ষা কেবলই শুরু হয়েছে। তাঁর অনেক অনেক লেখার মাঝখানে হয়তো ছোট গল্পগুলোই ভবিষ্যতে আধুনিক নাগরিক পাঠকের কাছে আদরনীয় হয়ে উঠবে।

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত