| 15 এপ্রিল 2024
Categories
নারী প্রবন্ধ সাহিত্য

বাংলা সাহিত্যের প্রথম মেয়ে গোয়েন্দা অগ্নিশিখা

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

 


রণিতা চট্টোপাধ্যায়


ন’বছর বয়সে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে ফেলে-আসা বাড়ির জন্য মনখারাপ করায় বাঁকা কথা কানে এসেছিল। মুহূর্তে নতুন বাড়ি আর সম্পর্ক, দুই-ই ছেড়ে সে ফিরে এসেছিল পুরোনো ঠিকানায়। কিছুদিন পরে আবার ঠিকানা বদল হল, এবার ভাইয়ের পড়াশোনার জন্য। পাঁচ বোন এক ভাইয়ের সংসারে বোনের স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর চেয়ে ভাইয়ের কলেজে ভরতি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ ছিল বৈ কি।

 

বারবার এমন ছেড়ে যাওয়ার বাধ্যতাই হয়তো তাঁকে বুঝিয়ে দিচ্ছিল মেয়েদের নিজের ঘর গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাকে। তাই চলতি ছকের মধ্যেও বারবার তাঁর কলমে উঠে আসছিল শিক্ষিতা, কর্মপটু, স্বয়ংসম্পূর্ণ মেয়েদের ছবি। যার গহনে দৃষ্টি ফেরালে দেখা যায় গৎ-বন্দি তকমা পাওয়া এই লেখিকা পৌঁছোতে চাইছেন নারীর অনাশ্রয় আর সহায়হীনতার ইতিহাসে। সেই একই পরম্পরার অংশভাক প্রভাবতী দেবী তাদের সমাজ-নিয়তির প্রতারণা থেকে বাঁচাতে চাইছিলেন আত্মশৃঙ্খল আর কর্মশৃঙ্খলার নিদান দিয়ে। আর এই প্রণোদনা থেকেই হয়তো জন্ম গোয়েন্দানী কৃষ্ণা আর শিখার। কে জানে, নিজের জীবন-অভিজ্ঞতায় মেয়েদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিকে যেভাবে চিনেছিলেন তিনি, তা-ই অবচেতনে তাঁকে সাহস জুগিয়েছিল কি না এমন আত্মপ্রত্যয়ী দুটি নারীচরিত্র সৃষ্টি করতে! 

 

যাঁর কথা হচ্ছে এতক্ষণ, তিনি প্রভাবতী দেবী সরস্বতী। স্কুলের গণ্ডি পেরোতে না-পারা সেই মেয়েটি লিখেছিলেন তিনশোরও বেশি বই। তাঁর বই রঙ্গমঞ্চ আর চলচ্চিত্রেও রূপায়িত হয়। যোগাযোগ ছিল ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে, নবদ্বীপের বিদ্দ্বজ্জন সভা থেকে পেয়েছিলেন ‘সরস্বতী’ উপাধি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘লীলা পুরস্কার’। জীবদ্দশায় এতখানিই জনপ্রিয় ছিলেন প্রভাবতী দেবী সরস্বতী, যে, তাঁর নাম নকল করে বাজারে প্রচলিত উপন্যাসের বাড়াবাড়ি রুখতে তাঁকে বিজ্ঞপ্তি দিতে হয়েছিল। সেই জনপ্রিয়তার কারণেই দেব সাহিত্য কুটীরের বিখ্যাত দুটি সিরিজ ‘প্রহেলিকা’ ও ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’-তে তাঁর সৃষ্ট কৃষ্ণা চরিত্রের সাফল্য, প্রকাশককে একখানা সম্পূর্ণ ‘কৃষ্ণা’ সিরিজ প্রকাশে প্ররোচিত করেছিল। 

 

উনিশ শতকের প্রৌঢ়ত্বে বাংলা সাহিত্যে গোয়েন্দাকাহিনি বলে একটি নতুন জঁরের জন্ম হলেও রীতিমতো গোয়েন্দার ভূমিকার মেয়েদের অবতীর্ণ হওয়ার ঘটনা এই প্রথম। গোয়েন্দাসুলভ বুদ্ধি বা শারীরিক সক্ষমতা কেবল পুরুষেরই অর্জন, এই অনড় মিথের শিকড়ে শুধু আঘাত হানাই নয়, পূর্বপ্রচলিত ওই ধারণাকে নস্যাৎ করে দিয়ে বাংলা গোয়েন্দাসাহিত্যের দুনিয়াকে চমকে দিল যে মেয়ে গোয়েন্দা এবং সেই চমকের জের ধরে রাখল আগামী অনেকগুলো বছর, তার জন্মও হল আর-এক মেয়ের হাতেই। ‘আকস্মিক বিপদে পড়ে শুধু উপস্থিত বুদ্ধির জোরে কেমন করে উদ্ধার পেতে পারেন’ মেয়েরা, এ বইয়ে রয়েছে তার ইঙ্গিত- ‘শুকতারা’-র বৈশাখ, ১৩৫৯ সংখ্যায় সিরিজ প্রবর্তনের এই বিজ্ঞাপনটিই এযাবৎ প্রচলিত মেয়েদের বুদ্ধিহীনতার মিথকে নাড়িয়ে দিতে যথেষ্ট। আর ‘মহিলা গোয়েন্দা’ বিষয়টিই যখন প্রায় অচেনা, সেকালে এই ঝুঁকি নেওয়া যে বিফল হয়নি, তা বোঝা যায় অব্যবহিত পরেই মেয়ে গোয়েন্দা অগ্নিশিখা রায়কে নিয়ে প্রভাবতী দেবীর আরও একটি সিরিজ প্রবর্তনে। লেখিকা জানান- “শুধু ছেলেদের ছাড়া মেয়েদের ‘অ্যাডভেঞ্চারে’র বই এ পর্য্যন্ত কেউ লেখেন নি। এই কারণেই ‘কুমারিকা সিরিজের’ আবির্ভাব। কোন আকস্মিক বিপদ এলে কলেজের মেয়েদের যা করা প্রয়োজন, ‘কুমারিকা সিরিজ’ পড়লেই তার ইঙ্গিত পেয়ে যাবে।”

 

উপযুক্ত ব্যায়ামের ফলে সুগঠিত চেহারা, মাতৃভাষা ছাড়াও পাঁচ-সাতটা ভাষায় অনর্গল বাক্যালাপের দক্ষতা, অশ্বারোহণ, মোটর চালানো, কৃষ্ণা ও শিখার গুণাবলির তালিকা কমবেশি একই। একজন যেমন মা-বাবার হত্যার প্রতিশোধ নিতে অকুতোভয়, অন্যজন অনায়াসে অপরের হুকুমের পরোয়া না করে নিজের শর্তে জীবনে বাঁচার ঘোষণা করে। সেদিনের নারী নয়, নারী যা হয়ে উঠতে পারে, ছাত্রীদের সামনে সেই আগামীর মডেল উপস্থিত করতে চেয়েছিলেন চিরন্তনী শিক্ষিকা প্রভাবতী দেবী। তাঁর ধারণার আদর্শ নারী গড়ে তোলার তাগিদেই কৃষ্ণার জবানিতে জানিয়েছিলেন- “মেয়েরাও মানুষ মেসোমশাই! তারাও যে শিক্ষা পেলে ছেলেদের মতোই কাজ করতে পারে, আমি শুধু সেইটাই দেখাতে চাই। চিরদিন মেয়েরা অন্ধকারে অনেক পিছিয়ে পড়ে আছে, আমি তাদের জানাতে চাই, পিছিয়ে নয়- সামনে এগিয়ে চলার দিন এসেছে, কাজ করার সময় এসেছে,- মেয়েরা এগিয়ে চলুক, তাদের শক্তি ও সাহসের পরিচয় দিক।” 

 

এমন মেয়ে স্বপ্নে ছিল তাঁর! স্বপ্ন বলেই লাগাম ছিল না তাতে। ছিল আতিশয্য আর অতিনাটকীয়তা। পাশাপাশি মেয়েদের সম্বন্ধে প্রচলিত দীর্ঘদিনের নির্বুদ্ধিতার মিথ ভাঙতে পারলেও সহজ ছিল না সুপ্রাচীন পিতৃতন্ত্রের শিকল ভাঙা। কৃষ্ণা সিরিজের বিজ্ঞাপনে সদ্যস্বাধীন দেশের ‘মা-বোন’দের পরমুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্ত হবার ডাক দিলেও সে স্বনির্ভরতার মধ্যে নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের কোনও ভাবনা ছিল না, কেবলমাত্র ‘স্বৈরাচারীদের অত্যাচার’ থেকে আত্মরক্ষাই ছিল তার লক্ষ্য। তাই কৃষ্ণাকে দিয়ে ‘স্বৈরাচারী দুর্বৃত্ত নরপশুদের কবল থেকে’ তার ‘নারীধর্ম্ম’ বজায় রাখার পবিত্র কর্তব্যটি বরাবর সম্পাদন করে যান লেখিকা। উনিশ শতকের চলতি ধারা পেরিয়ে গোয়েন্দাকাহিনির নাগরিক সাহিত্যে প্রবেশের জন্য এ তো আবশ্যিক শর্ত, ‘ভালো’ মেয়েদের ‘চরিত্ররক্ষা’।

আসলে গোয়েন্দাসাহিত্যের ‘নাগরিকত্ব’ লাভের পাশাপাশি যে আমজনতা ছিল তার টার্গেট অডিয়েন্স, তারও তো রূপান্তর ঘটে গেছে। কলকাতার তলায় থাকা লোকেদের জায়গা নিয়েছে মধ্যবিত্ত ঘরোয়া পাঠক, মূলত বাঙালি মধ্যবিত্তের অন্দরমহল। কৃষ্ণা-শিখার স্বাবলম্বী হওয়ার মধ্যে একইসঙ্গে পূর্ণতা পাবে তাদের অপূর্ণ ইচ্ছে, আবার তার সতীত্বরক্ষার আখ্যানে নিশ্চিন্ত হবে অভ্যস্ত পিতৃতান্ত্রিকতা। তাই প্রবল জনপ্রিয়তায় কৃষ্ণা-শিখার মতো চরিত্রকে মর্যাদা দেওয়ার ছলে নারীকে তার পিতৃতান্ত্রিক সংজ্ঞা মনে করিয়ে দেওয়ার রাজনীতিও হয়তো রয়ে গেল কোথাও। পিতৃতন্ত্র তো বরাবরই যে-কোনো সুযোগে আদর্শ মেয়ে বানানোর সিলেবাস লেখে। শুধু সময় বা পরিস্থিতির বদলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তার ছক বদলে যায়। সময়ের চাহিদাকে মান্য করেই জনপ্রিয় হয়েছিলেন প্রভাবতী দেবী, আর সময়ের দাবি মেটাতে গিয়েই পিতৃতন্ত্রের কাছে মাথা নোয়াতে হয়েছিল তাঁকে।

 

কৃতজ্ঞতা: বঙ্গদর্শন

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত