| 23 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

তিন শালিক

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট

শ্রেয়ার কথা

কলকাতার একটি এনজিও শ্রেয়াকে (আসল নাম নয়) এই ‘স্বধার হোমে’ দিয়ে যায় সরকারি আদেশে। পুনের এক নিষিদ্ধপল্লীতে সে পাচার হয়ে গিয়েছিল।
শ্রেয়ার বাড়ি গোসাবা। রোগা, কালো, হিলহিলে চেহেরার মেয়ে। ‘কলকাতায় ভালো কাজ আছে, অনেক টাকা মাইনে’ এই প্রলোভনে সে সুনামি পরবর্তী সময়ে হাতবদল হয়ে বিক্রি হয়ে যায়। শ্রেয়া ভালো আঁকতে পারে। আঁকা সে কারও কাছে শেখেনি। ছোটবেলায় নিজে আঁকত। এখানে এসে কাগজ-পেন্সিল যোগার করে আঁকতে থাকে। মানুষ, প্রকৃতি, জীবশ্রেনী।
হোমের সুপারিনটেন্ডেন দেবিকা তার এই আঁকার বিষয়টি প্রথম খেয়াল করে। এই বেসরকারি হোমে শ্রেয়া এসেছে দিন কুড়ি পার হয়ে গেল। দেবিকা খবর করে হোমের কাউন্সেলর শর্মিষ্ঠাকে। কাউন্সেলিং রুমে শর্মিষ্ঠা বসে অফিশিয়াল কাজ সারছিল। দেবিকা এসে বলল, শ্রেয়া আঁকতে পারে জানো।
কি আঁকছে?
সে অনেক ছবি। তুমি যদি এখন যেতে একবার রুমের ভেতর।
কাউন্সেমিং রুম ও অফিসঘর একসাথে। বেশ বড় ঘর। দু’টি টেবল পাতা। চারটি চেয়ার। একটি বড় স্টিল আলমারি। পাশে একটি ঘর আছে। সেখানে শর্মিষ্ঠা-দেবিকা রাত্রিবাস করে। এর উল্টোদিকে হোমের দোতলা বাড়ি। ওপর নিচ মিলিয়ে বিশাল দুই হলঘর। সেখানে পরপর সিঙ্গল বেড পাতা। কালার টিভি।
সব ছবি ভালো লাগল না শর্মিষ্ঠার। ল্যান্ডস্কেপ যেমন এঁকেছে, ফিগারও আছে। চোখের সামনে সে যা দেখছে তাই পুরাতন কাগজের ওপর আলতা দিয়ে সে ছবি ফুটিয়ে তুলেছে।
এই হোমের কর্ণাধার একজন মহিলা। বছর পঁয়তাল্লিশের বিশাখা দাস। সবসময় উগ্র ও আনকমন সাজে সাজতে ভালোবাসেন। থাকেন এখান থেকে কিমি সতের দূরে হাওড়া শহরে। নিজের ফ্ল্যাটের উপরতলা ফ্লোর কিনে মনের মত করে অফিস সাজিয়েছেন। তাঁর এনজিও’র নাম ‘মমতাময়ী’। নিষিদ্ধপল্লীতে পাচার হয়ে যাওয়া মেয়েদের জন্য ভারত সরকারের ‘স্বধার প্রকল্প’টির চালু নাম ‘স্বধার হোম’। মুম্বই থেকে উদ্ধার হয়ে আসা দুটি মেয়েকে সাফল্যের সঙ্গে তিনি বাড়িতে ফিরিয়ে দিতে পেরেছিলেন। বিষয়টি মিডিয়া কভার করেছিল। তাতে ‘মমতাময়ী’র বেশ নামও হয়।
তাঁকে শ্রেয়ার আঁকার কথা বললে তিনি ফোনে বললেন, শ্রেয়ার এই গুণটি আমাদের কাজে লাগবে। ওকে আঁকার সরঞ্জাম কিনে দাও। কিছু আঁকার বই এনে দিও। ভালো ছবি বেছে নিয়ে সোসাল ওয়েলফেয়ার অফিসারকে আমরা গিফট করব।
নতুন দুটি মেয়ে পুনে নিষিদ্ধপল্লীতে এনেছিল দালাল। তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে পালায় ওরা তিনজন। ধরা পড়ার ভয়ে তারা স্টেশনে এসে আলাদা হয়ে যায়। শ্রেয়া রেলপুলিশের হাতে ধরা পড়ে। তাকে কলকাতায় রেফার করা হয়। সেখান থেকে কোর্ট মারফত এখানে আসে।
গ্রামের মধ্যে সে গেছুড়ে মেয়ে হিসাবে বিখ্যাত ছিল। ইস্কুল ওই চারক্লাস। তারপর যা হয়। মা বলে, মেয়েমানুষের বাড় হল কলাগাছের বাড়। অভাবের সংসার। যা জমি ছিল আয়লার বালি সব কেড়ে নিয়েছে। কোনোরকমে দিন গুজরান হয়। এসময় পাশের গ্রামের লতিকা মন্ডল এক মহিলাকে নিয়ে এল। সে বলল, কলকাতায় কাজ আছে। এক বুড়িকে দেখাশোনা করা।
তাকে সঙ্গে সঙ্গে পাচার করা হয়নি। মাস তিনেক সে এক বয়স্কা মহিলাকে সত্যিই দেখাশোনা করেছিল। একবার বাড়িও আসে। মাইনের টাকা দিয়ে যায়। তার দুই মাস পর তার বাড়িতে খবর পাঠান হয়, সে এক ট্যাক্সিওলার সঙ্গে পালিয়েছে।
শর্মিষ্ঠা বলল, আমরা তোকে বাড়িতে ফিরিয়ে দিয়ে আসব।
গিয়ে কি করব দিদি। অভাবের সংসার আমাদের। চারটি ভাইবোন আমরা। আমিই বড়। এক ভাই জমিতে খাটতে যায় বাপের সাথে। বাকিরা একদম ছোট। আমি গেলে তারা অসুবিধায় পরবে। কী জবাব দেবে লোকের কাছে? তিনবছর আমি ওদের কোন খবর নিইনি। এতদিন একটা মেয়ে বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ না করে বাইরে থাকা মানে সবাই ধরে নেয় পরিণতি কি। কেন ফিরে গিয়ে বাপ-মার মুখে চুনকালি মাখাব।
এখানে তোকে দিয়ে গেছে কেন বলতো? যাতে তুই হাতের কাজ শিখে মানুষ হতে পারিস। নিজেরটা নিজে করে নিতে পারিস।
আর সংসার?
শর্মিষ্টা জবাব দিল, সেটা পরের ব্যাপার। এত আগে থেকে কোন কিছুর উপর পার্মানেন্ট ধারণা করে ফেলা ঠিক নয়। সবে উনিশ তুই। এখনো বিয়ের কত বয়স পরে আছে জানিস? কাজ শিখে তুই নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে গেলি। তখন কি যে হতে পারে তোর ধারণা নেই।
তুমি সিনেমার মত বলছ।
জীবনের গল্প নিয়েই সিনেমা। তুই চেষ্টা কর। বাকি সময়ের হাতে ছেড়ে দে।
এমন স্বপ্ন আগে ছিল। আমাদের একটা গরু ছিল। তার অনেক দুধ হোত। তাকে বাঁট কানা রোগ ধরে। দুধ দুইতে গেলে দুধের বদলে রক্ত আসত। পরে সে মারা যায়। তাকে ভুলে গেছিলাম। কি করে যে সে মনে এল, রাতে স্বপ্ন দেখলুম। মঙ্গলা বালির উপর দিয়ে ছুটছে। সে কচি ঘাস চায়। কিন্তু সবই আয়লার বালি। আমি তার পিছু পিছু ছুটছি। খাবার না পেয়ে সে ক্ষেপে গেল। শিং নেড়ে তেড়ে এল। যতই বলি, ওরে এর জন্য কি আমি দায়ী? সে শোনে না। আমি তখন প্রাণ ভয়ে ছুটছি। ঘুমটা তারপর ভেঙ্গে গেল।
যেখানে ছিলাম সেখানে রোজ বেঁচে থাকার কথা ভাবতে হোত। স্বপ্ন দেখিনি। তোমরা এখন তা দেখাতে চাইছ। দেখে কি লাভ বল। যাই হোক না কেন, লোকে সেই বেশ্যা মাগীই বলবে।

 

শর্মিষ্ঠা’র কথা

এক সময় শর্মিষ্ঠার প্রেমিক হয়ে উঠেছিল তার ইস্কুলের অঙ্কের মাস্টার দেবেশ। শর্মিষ্ঠার তখন নাইন। তখনই সে রীতিমত ডাকসাইটে সুন্দরী হয়ে উঠেছে। সমবয়সী ছেলেরা ত বটেই কলেজে পড়া ছেলেও তার পিছনে লাইন লাগায়। বয়স্করা আড় চোখে চায়। সে সুন্দর। গঙ্গা মাটির মত গায়ের রঙ। টানা চোখ। লাল আভাযুক্ত অধর। পাশে এক তিল যা তাকে সকলের কাছে কামনাময়ী করে গড়ে তুলেছে। নরম ঝুলপি। ঘাড়ের কাছে রেশমি চুল তাকে পিছন থেকেও লোভনীয় লাগে। সে জানে এসব তার সম্পদ। এহেন দারুণ ফিগারের অধিকারিণী শর্মিষ্ঠা ভালোবেসে ফেলল তরুণ সুদর্শন মাস্টারকে।
শর্মিষ্ঠার বাড়ির অবস্থা ভাল নয়। সে, বিধবা মা আর ক্লাস ফাইবে পড়া এক ভাই নিয়ে তাদের সংসার। বাবা পেনশনের অর্ধেক তাদের ভরসা। দেবেশ থাকতেন এক ভাড়া বাড়িতে। টিউশনি করতেন। আর পাঁচজনের সঙ্গে টিউশন নিতে আসে শর্মিষ্ঠা। অন্যদের ছাড়িয়ে দেবেশ তার দিকে সতৃষ্ণ নয়নে তাকিয়ে থাকতেন। শর্মিষ্ঠা ব্যাপারটা উপভোগ করত। কেমন এক গর্ব বোধ ছিল ভেতরে।
ক্রমে ক্রমে দেখা গেল অন্য স্টুডেন্টদের তুলনায় শর্মিষ্ঠা আধ ঘন্টা আগেই পড়তে চলে যাচ্ছে। যেহেতু তার চাহেনেবালার সংখ্যা অন্য মেয়েদের তুলনায় বেশি তারা এই আগে ভাগে দেবেশ বাড়ি গিয়ে বসে থাকাটা ভাল ভাবে নিল না। খবর পল্লবিত হতে হতে রটে গেল শর্মিষ্ঠা গর্ভবতী।
শর্মিষ্ঠার মা ভেবেছিলেন, এটা রটে ভালোই হল। দেবেশ এবার বিয়ে করতে বাধ্য হবেন। শর্মিষ্ঠাও খুশি হল। দেবেশকে এবার সে নিজের করে পাবে।
দেবেশ বললেন উলটো কথা। ছাত্রী-শিক্ষকের পবিত্রতার কথা। গ্রামবাসীরা যদি অন্য কোন সন্দেহ করে থাকে তাহলে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য তিনি রাজি। ওর মাথা ভালো। জানার আগ্রহ আছে। যদি সে একটু আগে আসে তাতে দোষ কী হল?
ছেলের দল চুপ। খুব মুষড়ে পড়ল শর্মিষ্ঠা। দেবেশ নিজে মুখে বলেছিলেন তাকে ভালবাসার কথা। তার মত রূপ কারও ভেতর দেখেননি। বলেছিলেন, বিয়ে করবেন। সে উচ্চ মাধ্যমিকটা পাশ দিক, তারপর। সেই থেকে কত যে স্বপ্ন দেখত শর্মিষ্ঠা। দেবেশ তাকে নানা কথা বলত। সে সেই সব কথা নিয়ে স্বপ্নের জাল বুনে যেত।
দেবেশ সম্পর্ক অস্বীকার করার পর একদিন বহু কষ্টে সে মুখোমুখি হয়েছিল। বলেছিল, তুমি আমায় মিথ্যে স্বপ্ন দেখালে কেন? বলেছিলে একটা দোতলা বড় সাদা বাড়িতে আমরা থাকব। সামনে অনেকটা বাগান থাকবে। গাছপালা থাকবে। সারাদিন পাখি কিচিরমিচির করবে। সেখানে কেবল দু’জন দু’জনকে ভালোবাসব।
আমি এমনিই তোমার সঙ্গে গল্প করতাম। তুমি সত্যি ভেবে নেবে তা কি করে জানব।
শর্মিষ্ঠা ক্লাস টেনে ফেল করল। তাকে মামার বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হল। সেখান থেকেই সোসিওলজিতে মাস্টার্স করল। পঁচিশ বছরের জীবনে প্রথম চাকরি এটাই। সে মেয়েদের কাউন্সেলিং করে। দেবিকা দলুই বাদে হোমে আরও চারজন সাধারণ মহিলা কর্মী আছে। তারা সবাই লোকাল। মেয়েদের দেখাশোনা করা, ঘর-দোর পরিস্কার রাখা তাদের কাজ। তারা পালা করে নাইট স্টে করে মেয়েদের সঙ্গেই।
মোট পঁচিশজন মেয়ে। সবাইকে নিয়মিত কাউন্সেলিং করতে হয়। অভাব অভিযোগ শুনতে হয় শর্মিষ্ঠাকে। সে এখানের ইনচার্জ। যাবতীয় ঝামেলাতে তাকেই এগিয়ে আসতে হয়। সারা দিন নানা কাজের শেষে শর্মিষ্ঠা-দেবিকা একত্র হলে সারাদিন নিয়ে আলোচনা হয়। হোমের মেয়েরাও সেখানে আসে।
হোমের সামনে অনেকটা ফাঁকা জমি পড়ে আছে। সেখানে মেয়েরা দড়িলাফ খেলে, খোলা হাওয়া নেয়, মুক্ত আকাশ দেখতে পায়। হোমের ভেতর যে গাছ আছে, সেখানে হরেক পাখি এসে বসে। তারা সুর তোলে।
শোবার আগে শর্মিষ্ঠা বলল, আমি শ্রেয়াকে এক নদীর ছবি আঁকতে বলেছি। সঙ্গে একটা নৌকা। সেটা কেবল নদীতে ভেসে যায়। নৌকা কুয়াশা ভেদ করে, জলস্তম্ভ ছুঁয়ে ধীর গতিতে চলেছে। তার কোথায় গন্তব্য নৌকা জানে না। এই যে বসে আছি এই গাছের নিচে, মনে হল নৌকাটা ভেসে যাচ্ছে। চোখ খুলতে দেখি কোথায় কী! যেন হ্যালুশিনেশন। আসলে এটা আইডিয়াটিক ইম্যাজিনেশন। এটা ভাবতে আমার ভাল লাগে। এটা শুনে তোমার মনে হতে পারে, এমন করে আমি কারও সঙ্গে ঘুরছি। কিনতু সে-সব কিছু নয়।
দেবিকা বলল, শ্রেয়া মেয়েটা অনেক বদলে গেছে। আগে কেমন ঝগড়া করত। এখন নিজের মনে থাকে। অন্য মেয়েরা যখন চুলোচুলি, খিস্তি-খামারি করে, সে চুপ করে থাকে। মনে হয় ছবি নিয়ে ভাবছে।
নিজের জীবন নিয়েও ভাবতে পারে।
আমার মাঝে-মাঝে কি মনে হয় জানো, মেয়ে হয়ে জন্মানো পাপ।
হঠাৎ এমন বলছ কেন?
কেন বলব না বলো? সব সময় শাসনের ভেতর থেকেছি। ওদিকে বাপের, এদিকে স্বামীর। নিজের বলতে কি কিছু থাকবে না? যখন এমন মনে হল, তখন কিছু বলতে গেলেই দেখি সমাজ মুখ চেপে ধরে।
সমাজ বলতে কি তোমার কাছে কেবল পুরুষ?
না। কেবল পুরুষ নিয়ে কি সমাজ হয়? মেয়েদের দুর্ভাগ্যের জন্য মেয়েরাই বহুলাংশে দায়ী। যারা কাজের নামে, বাইরে নাচের নামে মেয়ে বিক্রি করে তারা বেশিরভাগই মহিলা। দেনা-পাওনা কম হলে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরাই বেশি অত্যাচার করে। বাড়ির ঠাকুমা-দিদিমারা মেয়ে হয়েও নাতনি চায় না। তোমার কী মনে হয়?
এই সব ব্যাপার নিয়ে আগে এত কথা হয়ে গেছে যে, আমার আর স্রেফ ভালো লাগে না। এসো না, আমরা অন্য কথা বলি। মজার কথা। তুমি জোকস বলো কিছু। যাতে একটু হাসতে পারি। তুমি খুশি হতে পারো। দু’জনে প্রাণ ভরে হাসি।
যখন ক্লান্ত হয়ে আসে বিকেল, বর্ষণমুখর রাত বা একলা চাঁদের দিনে দেবেশকে মনে পরে বইকি তার। তার আলতো ছোঁয়া মনে আসে। সেই হাসি কথা তাকানো। স্বপ্নের বাড়ি ভেসে ওঠে মনের পর্দায়। ক্রমে ক্রমে এক গভীর বিষাদ তাকে ছুঁয়ে যেতে থাকে। সেই বিষাদ হল এক অলৌকিক কুয়াশা স্তম্ভ। সে ঢুকে পড়তে থাকে কুয়াশা-বিষাদ খোলসে। রাতে যখন ঘুম আসে না, একাকী এই খোলা জায়গায় এসে দাঁড়ায়, তখন মনে হয় নীলচে আকাশ, কালো ঢেউ, তার ভেতর একটা নৌকা দুলে দুলে কোথায় যেতে চাইছে কিনতু পারছে না।

 

দেবিকা’র কথা

খুব সাধারণ ঘরের মেয়ে দেবিকা দলুই। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর তার বিয়ে হয় তাদের গ্রাম থেকে সাত কিমি দূরে সুবীর দলুই-এর সঙ্গে। বিয়ের আগে দেবিকা রায় ছিল। বিয়ের পর নিয়ম মেনে সে পদবি পাল্টাল। সঙ্গে বদলে গেলো জীবন।
দেবিকা নেতাজী সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল বাংলায় অর্নাস নিয়ে। একটা মেয়ে কেন বাইরে যাবে, রাত করে ফিরবে হাওড়া গার্লস কলেজে রবিবার ক্লাস করে—এই প্রশ্ন বাড়ি এবং পাড়ায় উঠল। দেবিকা নিষেধ মানল না। তার ইচ্ছে মাস্টারর্স করে।
শ্বশুরবাড়িতে অত্যাচার শুরু হল। একে পুরো পণ দেয়নি, তাতে মেয়ে এমন ঠ্যাঁটা, তাকে মেনে নেওয়া যায় না। দেবিকা প্রথম প্রথম কিছু বলত না। দাঁতে দাঁতে দাঁত চেপে লড়ে গেছে শুধু। ওর বাবা বলেছিল, বাকি যেটুকু জমি আছে তা বেচে— দেবিকা রাজি হয়নি। সব দিয়ে কি নিঃস্ব হয়ে যাবে তার পরিবার?
ইতিমধ্যে তার একটি মেয়ে হয়েছে। এতে আরও পরিস্থিতি ঘোরাল হল। ছেলে নয়, মেয়ে। যে বউ কোন কথা শোনে না, টিউশনি যাবার নাম করে বেরিয়ে যায়, ছেলে বিয়োলে কথা থাকত। মেয়ের আবার কি দাম? এতদিন যেটা মানসিক অত্যাচারের মধ্যে ছিল এবার তার বাইরে যেতে থাকল। দেবিকা দেখল, এবার সীমা পার হয়ে যাচ্ছে। ছোট থেকে তার শখ চাকরির। যখন বিয়ের সম্বন্ধ হয়, কথা ছিল পড়তে দেবে। পাত্র এইট ফেল। জমিজমা প্রচুর। বিয়ের পর পড়তে পারবে, এই কথাতে সে মত দিয়েছিল বিয়েতে। কিনতু ক’দিন যেতে না যেতে শুনল, সংসারই মেয়েমানুষের আসল পড়াশুনোর জায়গা। বাইরে পড়তে যাবার দরকার কি।
তবে বলেছিলেন কেন তখন?
তোমার বাবাও বিয়ের আগে বলেছিল একটা বাইক দেবে।
গ্রামে বিচার সভা বসল। সেখানে সিদ্ধান্ত হল, আসলে দোষী দেবিকাই। সে এখন আর বাড়ির মেয়ে নয় যে বেহেল্লাপনা করবে। সে বাড়ির বউ। সেই বাড়ির নিয়ম তাকে মানতে হবে। উচ্চমাধ্যমিক পাশটা কম কথা নয়। এরপর আর পড়ার দরকার কি। সে কি জজ-ব্যারিস্টার হবে? নাকি চাকরি না করলে দিন চলবে না?
তার এক গোঁ। আমি পড়ব। আমার ইচ্ছে।
এ কেমনতর ইচ্ছে? সেখানে স্বামী চায় না?
আমার কি নিজের মতামত নেই? স্বামীর মতই কি মেনে চলতে হবে? কেন?
এমন চোপায় কোন বিচারসভা অভ্যস্ত নয়। তারা বেজায় চটে গেল। বেশি চটল অন্যদের বউরা। তারা বলতে থাকল, আমরা কোনদিন পরপুরুষ দূরের কথা, স্বামীর সঙ্গে চোপা করিনি; এ মাগী কেমনতর কথা কইছে দেখ। ঘোমটার কোন বালাই নেই। বেশি লিখাপড়া শিখলে কী মেয়েমানুষ এমনি সৃষ্টিছাড়া বেহায়া হয়? দরকার নেই বাবা মেয়েকে লিখাপড়া করিয়ে।
শ্বশুরবাড়িতে টিঁকতে পারল না সে। কিনতু তাদের ছাড়ল না। থানা-পুলিশ-কোর্ট-মহিলা কমিশন-মানবধিকার কমিশন অবধি গেল। জেলা সমাজ কল্যাণ দপ্তরের সহায়তায় এক সরকারি ইস্কুলে সেলাই শেখার সুযোগ ও থাকার স্থান পেল। ডিভোর্সের পর মেয়েকে সরকারি হোমে রাখল। তারপর এই এনজিওতে চাকরি।
শর্মিষ্ঠাকে সে বলল, মানুষ কত কিছু চায় বলো। নিজের কাছে, ঈশ্বরের কাছে, সমাজ সংসারের কাছে। এই ভাবে তারা দ্রুত জীবনের গতি এগিয়ে নিয়ে যায়। আমরা এই তিনজন কেবল এক স্বপ্নহীন পৃথিবীতে বেঁচে আছি। এক সময় কত কিছু করার কথা ভেবেছিলাম। সেদিন যেমন শ্রেয়া বলছিল, দৈনিক বেঁচে থাকার কথা। আগামীর জন্য বাঁচার রসদ আমাদের কাছে নেই।
দেবিকা আধো ঘুমে আধো জাগরণে এক চিত্রকল্প দেখত। এক দীর্ঘ মাঠের মধ্য দিয়ে সে একাকী হেঁটে যাচ্ছে। চারিদিকে ফসল হয়ে আছে। চাষিরা সেই ফসল কেটে নিচ্ছে। ক্রমে মাঠ ফাঁকা হয়ে গেল। তীব্র রোদের দাপটে সবকিছু পুড়ে যেতে থাকল। মাঠ ফেটে চৌচির গেল। দেবিকার আর হাঁটতে পারছে না। মনে হল মাথা ঘুরে পরে যাবে সে। হঠাৎ চোখে পরল, আরে একখন্ড মেঘ না? তাই ত। মেঘই বটে। তারপর হুহু বাতাস দিতে থাকল। শুরু হল ঝড়জল। দেবিকা আশ্রয় খুঁজতে দৌড় দিল। দূরে বৃষ্টিতে আবছা এক কুটির।
আমি সেটাকে কখন ছুঁতে পারিনা। যত এগোই, সে সরে সরে যায়। মনে হয় কুটিরটি এক অলীক কল্পনা মাত্র।
ম্লান হেসে শর্মিষ্ঠা বলে, স্বপ্ন কী ছোঁয়া যায়?

 

স্বপ্নহীন পৃথিবীর স্বপ্নরা

শ্রেয়াকে যা যা সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছিল, তাতে সে নানা ছবি আঁকলেও স্বপ্নের কোন চিত্র আঁকতে পারল না। শর্মিষ্ঠা- দেবিকা তাড়া দেয়, কিন্ত আঁকতে পারে কই। বারবার বলে সেই একই কথা, পারছি না। একটা নৌকা, একলা দৌড়ের মাঠ এবং এক অবলা পশুর সংহার মূর্তি এই ছিল তার বিষয়। কিন্ত অন্যান্য ছবি আঁকলেও এই তিন ছবি সে আঁকতে পারে না। বা আঁকলেও তার মন ওঠে না। স্বপ্ন আঁকা যায় না? ছোঁয়া যায় না স্বপ্নকে? কেমন হয় স্বপ্নর গন্ধ?
অনেকদিন পর বৃষ্টি হল। গাছের সব পাতা ধুয়ে গেল। ধুলো মারা গেল। ফাট বুজল মাটির। মন ধরে যায় সোঁদা গন্ধে। ক’দিন পর কদমফুল আসবে, দেখে মন জুড়িয়ে যাবে।
শর্মিষ্ঠা বল, চলো দেবকাদি বাইরে গিয়ে বসি।
বাইরে কাদা। ছাদে চলো।
চরাচর জুড়ে চাঁদের আলো। উপর থেকে দেখা যায় কিছু মেয়ে ঐ কাদার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে। তারা নির্দিষ্ট সময়ের পর রুমে যাবে। তখন চাঁদ সংক্ষিপ্ত হয়ে উঠবে। চাঁদ প্রথম যখন ওঠে তার আকার পরে ছোট হয় এবং উজ্জ্বল হয়। মনে হয় চাঁদ ডাকে। সে এক দুর্ল্কক্ষ টান। তখন তারা মনে করে প্রতিটি মেয়ে ঐ চাঁদের মত। পৃথিবীর সকল জলস্তর, মানুষ-কীট-গাছপালাকে সে কেবল টেনেই যায় কিনতু কখনো আপন করে না।
তারা শ্রেয়াকে ডেকে নেয়। সে উপরে এসে বলে, আমাদের হোমের ভেতর কোন কদমগাছ নেই।
তুই কি কদমগাছ ভালোবাসিস?
আমার বাড়িতে ছিল। বাড়ির বাইরেও ছিল। বাড়ির পিছনেও ছিল নানা গাছের ভেতর অনেক কদম গাছ।
কদমগাছ নিয়ে এই আমরা কথা বলছিলাম। একটা গাছ করলে হয়।
শ্রেয়া বলে, মাঝরাতে আমি বাঁশির সুর শুনতে পেতুম। কী সুন্দর সে সুর দিদি কী বলব আর; মনে হয় যেন চোখের সামনে এক নতুন পৃথিবী তৈরি হয়ে যাচ্ছে। মনের দুঃখ-কষ্ট সব মুছে যাচ্ছে শরীর থেকে। মনে হত, জীবনে কোন সমস্যা নেই, কোন খারাপ কিছু নেই। মা বলত, কৃষ্ণ ভগবান কদমতলায় বাঁশি বাজায়।
একটু থেমে সে আবার বলে, দিনেরবেলা সেখানে দেখতুম দুই শালিক। তারা কদমগাছে ঘুরে বেড়ায়। আর বাঁশির সুরে নেচে যায়। মা মুড়ি ছড়িয়ে দেয়, তারা খুঁটে খায়।
তারা দুই জন এসব শুনতে শুনতে মোহিত হয়ে পরে। শর্মিষ্ঠা বলে, আমাদের গ্রামেও এমন লোক থাকত। মালকোচা মারা ধুতি আর একটা আড় বাঁশি নিয়ে সে মাঠ-জংগল-নদনদী-খেতের ফসলের ভেতর পাক দেয়। সে এক সৃষ্টিছাড়া মানুষ। হেন কাজ নেই সে জানে না। এমন কোন দূর্গম স্থান নেই যেখানে সে যেতে পারে না। তাকে কেউ কখনও রাগতে দেখেনি। কোন কাজ যখন তার না থাকত, সে আকাশের দিকে চেয়ে চুপ করে বসে থাকত। মা বলে, ও ভগবানদের দেখতে পায় তাই মিটিমিটি একা হাসে।
দেবিকা বলে, কী আশ্চর্য। এমন এক লোক আমাদের পাড়াতেও ছিল। সে একাকী খুব সুন্দর গান করত। তার গানে আকাশে মেঘ পাকায়। বৃষ্টি নামে। সেই পুরুষ তখন এক চাষি হয়ে ধান পোঁতে। নদীতে নৌকা বেয়ে সে মাছের খোঁজে যায়। তার নৌকার উপর বসে থাকে সেই দুই শালিক।
বলতে বলতে সে থামে। বলে, বেশ আনন্দ লাগছে ভেতরটা।
আমারও। মনে হচ্ছে কতদিন পর যেন একটু প্রাণ ভরে শ্বাস নিতে পারলাম। কেনো বলতো?
শ্রেয়া বলে, আমারও মনটা ফুরফুরে লাগছে। কতদিন পর যে ভালো লাগছে ভেতরটা।
এর পর তারা তিনজন ছাদের আলসে ধরে দাঁড়িয়ে থাকল। তারা দেখে চরাচর জুড়ে ভেসে যায় চাঁদের আলো। আশপাশের গাছ সেই আলোয় যেন রঙ্গিন হয়ে উঠেছে। এর ভেতর কী কোন কদমগাছ নেই? এতক্ষণ নিশ্চয় সেটি খুঁজে নিয়ে বাঁশি হাতে তার নিচে ত্রিভংগ হয়ে দাঁড়িয়ে পরেছেন এক নীল মানুষ। রাত যখন অধিকার করবে গোটা পৃথিবী, মাটির উপর দিয়ে বয়ে যাবে জীবনের সুর। সেই সঙ্গে তাদের মনে পরে যাবে ছেলেবেলার সেইসব ফেলে আসা দিন। ছোঁয়া যায় না সেইদিন। কিন্ত অনুভবে ধরা যায়।
আমাদের সেই আঁকার কথাটা মনে এল দিদি। চাঁদের আলো মাখতে মাখতে শ্রেয়া খুব শান্ত গলায় বলল। বলল, আমি আঁকব এক নীল-পুরুষ। সে যখন কদমগাছের নিচে বসতে আসে কাজের পর বিশ্রামের জন্য; দেখে সেই দুই শালিক গাছতলায় বসে আছে তারই প্রতীক্ষায়।
দেবিকা-শর্মিষ্ঠা একবাক্যে বলে, তাই। 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত