| 22 এপ্রিল 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প গল্প সাহিত্য

গোধূলিবেলার খেলা

আনুমানিক পঠনকাল: 10 মিনিট

অনুবাদ : দুলাল আল মনসুর

বিকেলের চা নাস্তার পর্ব শেষ। স্নান সেরে পরিপাটি করে চুল আঁচড়ানোও হয়ে গেছে সবার। কিস্তু প্রচণ্ড তাপদাহের কারণে বাইরে খেলতে যাওয়া যাচ্ছে না কিছুতেই। সারাদিন পার হয়ে গেল বাড়ির ভেতরে বন্দি থেকে। বাড়ির ভেতরেও ঠান্ডা আবহাওয়ার লেশমাত্র নেই; সূর্যের আগুন থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে শুধু। বাচ্চারা সবাই বাইরে যাবার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টায় উদগ্রীব হয়ে আছে। মুখ দেখেই বোঝা যায়, কেমন ফোলা ফোলা রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু মা কিছুতেই বাইরের দরজা খুলবেন না। জ্বলন্ত সূর্যের আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বাড়ির সবকিছু পর্দা-ঘেরা, অস্থায়ী আবরণে মোড়া। এতে বাচ্চাদের দম বন্ধ অবস্থা আরো বেড়ে গেছে। মনে হচ্ছে বাইরের আলো বাতাসে বের হতে না পারলে দম বন্ধ হয়ে মারা যাবে: ফুসফুসের মধ্যে ছেঁড়া ছেঁড়া তুলো আর নাকের মধ্যে ধূলোর আস্তরণ জমে গেছে। 
মায়ের কাছে তাদের আবদার, প্লিজ, মা, প্লিজ। আমরা বারান্দাতেই খেলব। বারান্দা থেকে এক পাও বাইরে যাব না।
আমি জানি, তোমরা বাইরে যাবেই। তখন?
না, মা, আমরা যাব না, ওরা এমন করুণ সুরে অনুরোধ জুড়ে দিল যে মা না শুনে পারলেন না। শেষে মা সদর দরজার খিল খুলে দিলেন। অতিরিক্ত পাকা ফলের ভেতর থেকে বিচি যেভাবে ছিটকে বের হয় তেমনি করে সবাই বের হয়ে গেল উল্লাসে চিৎকার করতে করতে। মা ফিরে এলেন। এখন তার গোসল করার সময়। গোসল সেরে ট্যালকম পাউডার আর নতুন শাড়ি পরবেন। নইলে গ্রীষ্মের এই বিকেল সন্ধ্যা সামলানো কঠিন।  
কড়কড়ে গরম আর চোখ ধাঁধানো আলো ছড়ানো বিকেল তাদের সামনে। বারান্দার সাদা দেয়ালে আলো পড়ে ঠিকরে বের হচ্ছে। বারান্দার সামনে ঝুলে আছে সীস রঙের বেলুনের মত নীলাভ আর গাঢ় লাল বাগান বিলাস। বাইরের বাগানটাকে মনে হচ্ছে পেটানো ব্রোঞ্জের তৈরি বারকোষ- লাল সুরকির মাঝে পেতে রাখা হয়েছে। পাথুরে মাটিতে যেন অ্যালুমিনিয়াম, দস্তা, তামা ইত্যাদির মিশেল। দিনের এই শুষ্ক সময়ে চার পাশের কোনো কিছুতেই জীবনের লক্ষণ নেই। পাখিগুলো পাকা ফলের মত গাছের কাগুজে তাবুতে ঝুলে আছে। বাগানের জলের ট্যাপের নিচে ভেজা মাটিতে কাঠবিড়ালি মরার মত শুয়ে আছে। বাইরের কুকুরটা বারান্দার মাদুরে মরার মত পড়ে আছে: লেজ, থাবা আর কান চার পাশে ছড়িয়ে পড়ে আছে যেন পিপাসার্ত পথিক পানির খোঁজে ব্যস্ত। সাদা মার্বেলের মত চোখের মণি দুটো লালচে গর্তের মধ্যে এমন আকুতি নিয়ে ঘোরালো কুকুরটা যেন বাচ্চাদেরকে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছে তার প্রতি সদয় আচরণ করার জন্য। বাচ্চাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা দেখানোর জন্য লেজ নাড়তে চাইল কুকুরটা। কিন্তু লেজটা কিছুতেই উঠল না। একটুখানি কেঁপে উঠে নিস্তেজ হয়ে পড়ে গেল।
বাচ্চাদের হৈ চৈ’য়ে ইউক্যালিপটাস গাছ থেকে একদল টিয়া পাখি উল্লাস মাখা প্রাণ প্রাচুর্যে উড়ে বের হয়ে রোদে পোড়া কড়কড়ে আকাশের গায়ে হোঁচট খেল। তারপর সারি বেধে মিশে গেল সাদা আকাশের  শূন্যে।
বাচ্চারাও হৈহুল্লোড় জুড়ে দিল। একে অন্যের গায়ে আছড়ে পড়তে পড়তে ধাক্কা ধাক্কি ঠেলা ঠেলি শুরু হয়ে গেল তাদের মধ্যে। এখন তাদেরও শুরু করার সময়। কী শুরু করবে? তাদের যে একমাত্র ব্যস্ততা অর্থাৎ খেলা। 
চলো, লুকোচুরি খেলি।
চোর হবে কে?
তুমি হবে।
আমি কেন হবো? তুমি হবে।
তুমিই তো সবার বড়!
তাতে কী?
ঠেলাঠেলি আরো বেড়ে গেল। কেউ একজন অন্য কারো লাথি খেয়ে ছিটকে পড়ে গেল। মিরা মাতৃত্বসুলভ ভূমিকা নিয়ে সবাইকে মেটামুটি দুদলে ভাগ করে ফেলল। কার যেন জামা ছিঁড়ে গেল ফট করে। চিৎকার চেচামেচি আর ধাক্কাধাক্কির মধ্যে অন্য কেউ খেয়ালই করল না কার জামা ছিঁড়ে কাঁধের সঙ্গে ঝুলতে লাগল। 
গোল হয়ে দাঁড়াও, গোল হয়ে দাঁড়াও, মিরা ঠেলাঠেলি করে মোটামুটি এক রকম গোল হয়ে দাঁড়নোর ব্যবস্থা করে দিল সবার জন্য। এখন হাততালি দিতে থাকো, মিরার কথামত সবাই হাততালি দেয়া শুরু করল সমস্বরে, সমতালে,  দিপ দিপ দিপ, আমার নীল শিপ, তারপর একজন একজন করে দল থেকে বাদ পড়ে যেতে লাগল। যার এক হাতের তালু আরেক হাতের তালুতে কিংবা এক হাতের উল্টোপিঠ অন্য হাতের তালুতে পড়ে সেই বাদ। সঙ্গে সঙ্গে সবাই লাফ ঝাঁপ দিয়ে হৈহৈ করে ওঠে।
তারপর দেখা গেল রঘু চোর হয়েছে। কিন্তু সে এটা মেনে নিতে পারছে না। সে চিৎকার করা শুরু করল, মিরা কাঁই করেছে! অনু কাঁই করেছে! সবাই কাঁই করেছে আমার বিরুদ্ধে। আমি মানি না।
কিন্তু ততক্ষণে সবাই তার ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে। তারপরও তার চেষ্টা ওদেরকে থামানো। সে বলে, শুধু বারান্দায়, মা বলেছেন বেশি দূরে যাওয়া যাবে না। 
কিন্তু তার কথা শোনার মত কাছাকাছি দূরত্বে কেউ নেই। সবাই পার হয়ে গেছে। রঘু শুধু দেখতে পেল ওদের কেউ কেউ দেয়াল বেয়ে উঠে যাচ্ছে, কেউ বা আগাছার ঝোপ, জৈব সারের স্তুপ মাড়িয়ে সামনে দৌড়াচ্ছে। ওদের পায়ের নিচের অংশ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেল না রঘু। বাগান বিলাসের লালচে ছায়ায় বাগান আর বারান্দা আগের মতই ফাঁকা হয়ে পড়ে রইল। খুঁড়িয়ে চলা কাঠবিড়ালিটাও হঠাৎ কোথায় যেন চলে গেল। চোখ ধাঁধানো কড়কড়ে আলোয় চার দিক শূন্য হয়ে গেল। রঘু ছাড়া আর কেউ রইল না তার চারপাশে।
শুধু পিচ্চি মনু কিছুক্ষণ পর ফিরে এল যেন অদৃশ্য মেঘ থেকে পড়ে গেছে কিংবা কোনো শিকারি পাখির থাবা থেকে নিচে পড়ে গেছে। হলুদ লনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মনু আঙ্গুল চুষতে চুষতে কেঁদে ফেলে আর কি। রঘু বারান্দার দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে গুণে যাচ্ছে, তিরাশি, পঁচাশি, উননব্বই, নব্বই……। রঘুকে দেখে মনু পড়ি মরি করে দৌঁড় দিতে গিয়ে পড়ে গেল মহাফাঁপরে। এক মনে চায় দক্ষিণ দিকে যাবে, আরেক মনে চায় উত্তরে যাবে। রঘু মনুর সাদা হাফ প্যান্টের নিচের অংশ আর লাল চপ্পলের চটচট শব্দ শুনে মনুকে ধাওয়া করল। রঘুর রক্ত হিম করে দেয়া সজোর চিৎকারে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে দৌঁড়তে গিয়ে মনু বাগানে পানি দেওয়ার জন্য রাখা হোস পাইপে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। পাইপের রাবারের গোলাকার অবয়বের ওপর পড়ে থেকেই মনু পরাজয়ের গ্লানিতে কেঁদে ফেলল, আমি চোর হবো না! তুমি ওদের সবাইকে খঁজে বের করো! সবাইকে এ এ!
পায়ের আঙ্গুল দিয়ে মনুকে গুতো দিয়ে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে রঘু বলল, ওঠ গাধা! তোকে চোর হতে কে বলেছে? তুই তো মরা!
জিহ্বা দিয়ে ওপরের ঠোটে জমে ওঠা ঘামের বিন্দু চাটতে চাটতে রঘু উর্ধ্বশ্বাসে দৌঁড় দিল যাতে মনুর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো শিকার ধরতে পারে। শিকারের উদ্দেশ্যে রঘু জোরসে শিষ বাজাতে থাকে যাতে তার শব্দে ওরা ভয়ে কেঁপে ওঠে।  

ভয়ে আর আতঙ্কে ওর দিকে লুকিয়ে এক নজর দেখে নিল রঘুর পা। ধরা পড়ার ভয়ে চুপচাপ রবি নাকে জমা হওয়া একদলা শক্ত পোঁটা খেয়ে ফেলল। 

গ্যারাজের পেছনে উল্টে রাখা একটা ফুলের টবের পেছন থেকে রবি রঘুর শিষ বাজানো শুনতে পেল। মনে হল এই জায়গাটা লুকিয়ে থাকার জন্য বেশি সুবিধাজনক নয়। রবির একবার মনে হল গ্যারাজের পেছনে লুকিয়ে থেকে রঘুর আসার শব্দে একটু একটু করে এদিক ওদিক এগিয়ে গিয়ে রক্ষা পাবে। কিন্তু রঘুর লোমঅলা ফুটবল খেলা পায়ের সঙ্গে নিজের পুচকে পায়ের তুলনা করতে গিয়ে মনে আর জোর পেল না। রঘু যখন পায়ের তলায় লতাগুল্ম আর ফার্নের দল মাড়িয়ে এদিক ওদিক করছিল রবি ওর পায়ের একাংশ দেখে ফেলল। ভয়ে আর আতঙ্কে ওর দিকে লুকিয়ে এক নজর দেখে নিল রঘুর পা। ধরা পড়ার ভয়ে চুপচাপ রবি নাকে জমা হওয়া একদলা শক্ত পোঁটা খেয়ে ফেলল। 
গ্যারাজের দরজায় বিশাল তালা ঝুলছে। চাবি ড্রাইভারের কাছে। তার ঘরের দেয়ালে ঝুলানো শার্টের তলায় একটা পেরেকের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। উকি দিয়ে দেখল ড্রাইভার দড়ি দিয়ে বানানো একটা খাটিয়ায় ঘুমাচ্ছে। পরনে গেঞ্জি আর আন্ডারপ্যান্ট। তার শ্লেষা ভরা নাক ডাকার শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বুকের আর নাকের ভেতরের লোম ওঠা নামা করছে। রবির মনে হল যদি চাবি রাখা পেরেকেটা ধরার মত উচ্চতা তার থাকত! কিন্তু সে জানে আরো অনেক বছর লাগবে ওই উচ্চতা পর্যন্ত ছোঁয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে। ব্যর্থ মনে সরে গিয়ে রবি ফুলের টবের কাছে বসে পড়ল। আপাতত এই জিনিসটাই তার মাপ অনুযায়ী ঠিক হয়েছে।
গ্যারাজের পেছনে আরেকটা ঘর। সেটাও তালা দেয়া। চাবি কার কাছে কেউ জানে না। এই ঘরটার দরজা বছরে একবার করে খোলা হয়। মা তখন ভাঙ্গা আসবাবপত্র, অকেজো ফুটো হওয়া বালতি, ছেঁড়া মাদুর ইত্যাদি ফেলে দিয়ে থাকেন। সে সময় ঝাঁটা দিয়ে পিঁপড়ের বাসাগুলো ভেঙে ফেলা হয়। মাকড়সার জাল আর ইঁদুরের গর্তে ওষুধ ছিটিয়ে দেয়া হয় যেন হতদরিদ্র পড়ো কোনো নগর দখল করা হল। দরজা দুটোর পাল্লাগুলো বেঁকেচুরে গেছে। মরচে-পড়া কব্জাগুলো খসে পড়ার উপক্রম হয়েছে, দরজা আর কব্জার মাঝে বিশাল ফাঁকা তৈরি হয়ে গেছে। ফাকার মধ্যে দিয়ে ইঁদুর, বিড়াল, কুকুর এমনকি রবিও ঢুকে যেতে পারে অনায়াসে।
রবি আগে কখনো প্রাণি-গন্ধে ভরা আসবাবপত্রের শবাগারের এরকম অন্ধকার  ঘরে প্রবেশ করেনি আগে। কিন্তু রঘুর শিস বাজানো যতই জোরে জোরে বাজতে লাগল এবং লতাগুল্মের ওপর দিয়ে তার শক্তপোক্ত পায়ের আওয়াজ যতই ভয়াবহ হয়ে উঠল রবি আর দেরি করতে পারল না। দরজার ফাঁক গলিয়ে সুরুৎ করে ঢুকে পড়ল ভেতরে। নিজের কৃতিত্বে নিজেই আস্তে করে হেসে উঠল। ভেতর থেকে রবি দেখতে পেল রঘু লতাগুল্ম মাড়িয়ে ফুলের টবের কাছে চলে এল।  কিন্তু রবিকে কোথাও দেখতে না পেয়ে রঘু চিৎকার করে বলে উঠল, তোমার শব্দ আমি শুনেছি! আমি আসছি। ধরা পড়ার জন্য প্রস্তুত হও। 
গ্যারাজের চারপাশে ঘুরে ঘুরে রঘু কাউকে পেল না। শুধু উল্টে পড়ে থাকা ফুলের টব, হলুদ ধূলো আর দরজার পাশে পিঁপড়ের ঢিবি ছাড়া আর কিছুই পেল না। চিৎকার করতে করতে রঘু উবু হয়ে একটা কাঠি কুড়িয়ে নিয়ে গ্যারাজের দেয়ালের গায়ে বাড়ি মারতে মারতে এগিয়ে যেতে লাগল যেন এই আঘাত তার শিকারের গায়ে লাগছে। 
ভয় আর আনন্দে মেশানো অনুভূতিতে রবি কেঁপে কেঁপে উঠল কয়েকবার। ঘরের ভেতরে ভুতুরে অন্ধকার আর কবরের মত চাপা দম বন্ধ অবস্থা। এরকম অভিজ্ঞতা রবির আছে: একবার লিনেন কাপড়ের কাবার্ডে বন্দি হয়ে আধা ঘণ্টার মত অসহায় অবস্থায় কেঁদেছিল। কিন্তু সে জায়গাটা ছিল বেশ চেনা জানার মত। মায়ের মাড় দেয়া কাপড়ের গন্ধে একটা আরামের আবেশ ছিল। আর এই ছাউনির ভেতরটা ইঁদুর, পিঁপড়ের ঢিবি, ধূলা আর মাকড়সার জালের পচা গন্ধে ভরা। বলে বোঝানো যায় এমন সব ভয়ভীতির আখড়া যেন একটা। দরজার ফাটল দিয়ে আসা সামান্য আলো ছাড়া জায়গাটা প্রায় অন্ধকার। ভেতরে কোনো রকম আলোর ব্যবস্থা নেই। ছাদটাও খুব নিচু। উচ্চতা কম হলেও রবির একবার মনে হল আঙুলের ডগা দিয়ে ছাদটা ছুঁয়ে দেয়। অবশ্য এর জন্য দাঁড়ানোর দরকার হলেও রবি এক চুল নড়ল না। নিচে পাছা ঠেকিয়ে বলের মত গোল হয়ে বসে পড়ল যাতে কোনো কিছুর সঙ্গে ছোঁয়া না লাগে। এই অন্ধকারে তাকে ছুঁয়ে দেয়ার জন্য কত কী-ই তো থাকতে পারে। ঠান্ডা পিছলে সাপের মত…., সাপ! বাইরে রঘু দেয়ালের গায়ে জোরসে বাড়ি মারতে মারতে যাচ্ছে। বুঝতে পেরে রবির মনে হল বাঁচা গেল, তাহলে সাপ নয়। 
কিন্তু রঘুও চলে গেল খুব শিঘ্রই। গ্যারাজের বাইরে পায়ের আওয়াজ মিলিয়ে গেলে আর কোনো শব্দই শোনা গেল না। পর মুহূর্তেই রবি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে গেল। কী যেন কাঁধের ওপর সুড়সুড়ি দিল মনে হল! কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল হাত তুলে দেখার সাহস সঞ্চয় করতে। হয়ত কোনো কীট; হতে পারে মাকড়সা। দেখতে এসেছে তাদের জগতে এ আবার কে এল। হাত দিয়ে থাবা মেরে গলিয়ে দিতে দিতে রবির মনে হল না জানি আর কত শত কীট পতঙ্গ আছে এই রাজ্যে। তার মত অচেনা আগন্তকের আকস্মিক আগমন হেতু জানতে অপেক্ষা করছে হয়তো।

 চিৎকার করে বলতে লাগল, আমি জিতেছি, আমি জিতেছি। বলতে বলতে রবি এত জোরে মাথা ঝাঁকাতে লাগল যে বড় বড় অশ্রুবিন্দু ছিটকে পড়তে লাগল এদিক ওদিক। রবি আবারো চিৎকার করে বলতে লাগল, রঘু আমায় খুঁজে পায়নি! আমি জিতেছি, আমি জিতেছি! 

এখন আর কিছুই নেই। মিনিটের পর মিনিট, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওইভাবে পিঠের ওপর হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে রবি টের পেল পোকাটার গলে যাওয়া শরীরের রস শুকিয়ে তার হাতের সঙ্গে লেগে গেছে। এত দীর্ঘ সময় অনড় দাঁড়িয়ে থেকে পা কাঁপতে শুরু করল। এতক্ষণে ভেতরের জিনিসপত্রগুলো কিছুটা স্পষ্ট দেখার মত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। পুরনো ওয়ার্ডরোব, ভাঙা বালতি, ছেঁড়া বিছানাপত্র তার চারপাশে গাদগাদি করে রাখা। চোখে পড়ল একটা পুরনো ভাঙা বাথটাব- এনামেলের চকচকে টুকরোগুলো যেন তার দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে আছে। শেষে সে ওই ভাঙ্গা টুকরোর ওপর নিচু হয়ে বসল। 
একবার ওখান থেকে বের হয়ে সবার সঙ্গে খেলার মূল স্রোতে মিশে যাওয়ার কথা মনে হল। রঘুর হাতে ধরা না পড়লে সূর্যালোকের মধ্যে ভাইবোন আর অন্যান্যদের হৈচৈয়ের সঙ্গে একাত্ব হয়ে যেতে পারত। বাগানের খোলা চত্বর আর পরিচিত পরিবেশের কথা মন টানতে লাগল। খুব শিঘ্রই সন্ধ্যা নামবে। খেলার সময় শেষ হয়ে যাবে। একটু পরেই বাবা মা লনে বেতের চেয়ারে বসবেন। চার পাশে অন্যান্য বাচ্চারা ছোটাছুটি করবে, নয়তো চুরি করে আনা তুঁত ফল কিংবা দাঁত টক করে দেয়া যমুন ফল খাবে কাড়াকাড়ি করে। মালী পানির পাইপের মুখ ট্যাপের মুখে লাগিয়ে বাগানে পানি দেয়া শুরু করবে। পানির ধারা শূন্যে উঠে তৃষ্ণার্ত শুকনো মাটির বুক, হলুদ ঘাস আর লাল সুরকির পাঁজর ভিজিয়ে দিবে। ভেজা মাটি থেকে একটা প্রাণ ঠান্ডা করা ঘ্রাণ বের হবে। আহ্ কী মধুর সুবাস! রবি ভেতরে থেকেই শ্বাস নিতে থাকে। বাথটাব থেকে অর্ধেকখানি ওঠার পরই শুনতে পেল একটা মেয়ের আর্ত চিৎকার। রঘু হয়তো ওকে ধরে ফেলেছে। ঘাসের মধ্যে, লতাপাতার মধ্যে ধস্তাধস্তির আওয়াজ পেল রবি। তারপরই আর্তনাদ আর চিৎকার। এবং শেষে ফোঁপানির সুরে নালিশ, আমি কোট ছুঁয়ে ফেলেছি!
না, তুমি ছুঁতে পারোনি!
না, আমি ছুঁয়েছি!
না, ছুঁতে পারোনি!
আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেল ওদের ঝগড়ার শব্দ। তারপর আবার নীরবতা।
বাথটাবের ভাঙা চকচকে টুকরোর ওপর বসে মনে হল আরেকটু দেরী করা উচিত। যদি সবাই ধরা পড়ে যায় আর শুধু রবি বাদ থেকে যায়, অপরাজেয় অপরাজিত- তাহলে কী মজাটাই না হবে! এরকম অভিজ্ঞতা খুব একটা নেই তার। একবার এক কাকামণি চকলেটের আস্ত একটা টুকরো শুধু রবির একার জন্য এনেছিলেন। আরেক বার লালচে দাড়িঅলা কান খাড়া কোচোয়ান তার ঘোড়ার গাড়িতে তোলার মত প্রশ্রয় দিয়েছিল রবিকে। বাড়ির সদর দরজা পর্যন্ত রবি গাড়ি চালিয়ে এসেছিল সেবার। লোমশ পায়ের, হেঁড়ে গলার, ফুটবল চ্যাম্পিয়ন রঘুকে হারিয়ে দিতে পারলে বড়দের আর অন্যান্য ছেলেমেয়েদের সামনে রবির গৌরবের সীমা পরিসীমা থাকবে না। এরকম মজা যেন শুধু কল্পনাতেই সম্ভব। নিজের বিজয়ের কথা ভেবে রবি লজ্জা মেশানো আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে নিজের হাঁটু চেপে ধরল বুকের সঙ্গে। 
ওখানে বসে থেকে রবি বাথটাবের ভাঙা টুকরোর গায়ে পায়ের আঙুল ঘষতে ঘষতে কিছুক্ষণ পর উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজার ফাটলের কাছে কান লাগিয়ে শুনতে চেষ্টা করল খেলার কী খবর। তার পর ফিরে এসে অটল সিদ্ধান্তে বসেই রইল। সে এত সহজে বের হবে না। খেলায় জিততেই হবে। সবার রেকর্ড ভাঙ্গবে সে। চ্যাম্পিয়ন তাকে হতেই হবে। 
ছাউনিটার ভেতরে অন্ধকার বেড়ে যাচ্ছে। দরজার বাইরেও আলো নিভে আসছে। আর আবছা আবহে বাইরে ফেসোর মত ভাঙা ভাঙা সবুজ, নীল, ধূসর পুষ্প রেণুর মত আলোর রেখা ছড়িয়ে পড়ছে। গোধূলির এই লগ্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে এখনই সন্ধ্যা নেমে আসছে। বাগানে পাইপের মুখ থেকে পানির ধারা পতনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। তৃষ্ণার্ত মাটি পিপাসা মিটিয়ে সেই সবুজ সতেজ ঠান্ডা হাওয়া ছেড়ে দিচ্ছে। দরজার ফাটল দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখল রবি বাইরে ছাউনিটার এবং গাড়ি-ঘরের ছায়া এখনও বাইরের উঠোনে শুয়ে আছে। তার পরেই বাড়ির সাদা দেয়াল চোখে পড়ছে। বাগান বিলাসের ডালে রঙের আভা একটু যেন কমে এসেছে। ডালগুলো এদিক ওদিক দুলছে। ওখান থেকে চড়ুইয়ের দলের কিচির মিচির শোনা যাচ্ছে। ঘরে ফেরা চড়ুইয়ের দল বাগান বিলাসের ডালে আশ্রয় নিয়েছে। ছাউনির ভেতর থেকে লনের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। আহ্ যদি ওদের কণ্ঠ একবার শোনা যেত! মনে হল রবি ওদের কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছে। ওরা হাসছে, গান গাচ্ছে, হৈহুল্লোর করছে। কিন্তু খেলার কী হল? খেলা কি শেষ? শেষ হয় কী করে? রবি তো এখনও অপরাজিত! 
হঠাৎ মনে হল অনেক আগেই সে তো ওখান থেকে বের হয়ে বারান্দার পাশ দিয়ে এগিয়ে গিয়ে কোট ছুঁয়ে দিতে পারত। খোলায় জিততে হলে এটা ছাড়া উপায় নেই। একথাটা রবি ভুলেই গিয়েছিল। তার শুধু মনে ছিল লুকিয়ে থাকার কথা, খোঁজকারীর চোখকে ফাঁকি দেয়ার কথা। লুকিয়ে থাকার কাজটা সে এতই সফলভাবে করেছে যে বাকি অংশটার কথা তার মনেই নেই। মনে নেই যে কোট ছুঁয়ে চিৎকার দিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিতে হবে সে জিতে গেছে। 
আর্তনাদের চিৎকার করে রবি দরজার ফাঁক গলে বের হয়ে ছায়াঘেরা উঠোনে বোধহীন পায়ে হাটু মুড়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। প্রাণ উজাড় করা কান্না জুড়ে দিয়ে বারান্দা পর্যন্ত পৌঁছে গেল। সাদা থাম পেরিয়ে খেলার কোট পর্যন্ত যেতে যেতে কান্না আরো বেড়ে গিয়ে রাগ আর ক্ষোভে মিশে গেল। রাগে অপমানে কণ্ঠ ভেঙে সমস্ত গ্লানি যেন চোখের জলে বের হয়ে যাচ্ছে। 
লনের অন্যান্য ছেলেমেয়েরা খেলা থামিয়ে বিস্ময়ে থমকে দাঁড়াল। বিস্ময়ে গোধূলির আলোয় সবার মুথ যেন লম্বা হয়ে গেছে। চারপাশের গাছপালা অন্ধকারের কালিতে লেপে যাচ্ছে। বিষণ্নতার নীরব পতনে কবরের আবহ চলে আসছে। গাছপালার ভেতর দিয়ে লম্বা ছায়াগুলো জলের মত গড়িয়ে পড়ছে। অন্যরা সবাই রবির দিকে তাকিয়ে ভেবে পাচ্ছে না সে কোথা থেকে এল, পশুর মত হাউমাউ করে কান্নার কারণটাই বা কী। বিরক্তি আর দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে মা চেয়ার ছেড়ে উঠে এলেন রবির কাছে, কী হচ্ছে রবি! থামো। বোকার মত কাঁদছ কেন? ব্যথা পেয়েছ?
রবিকে মা দেখছেন দেখে অন্যরা নিজেদের খেলায় ফিরে গেল। ছন্দে ছন্দে হাততালি দিয়ে সুর মেলাতে লাগল সবাই, ঘাসগুলো সবুজ, গোলাপগুলো লাল…। 
কিন্তু রবি ওদের খেলা এভাবে চলতে দিতে পারে না। মায়ের হাত থেকে ছুটে  মাথাটা নিচু করে এক দৌঁড়ে রবি ওদের দলের কাছে পৌঁছে গেল। চিৎকার করে বলতে লাগল, আমি জিতেছি, আমি জিতেছি। বলতে বলতে রবি এত জোরে মাথা ঝাঁকাতে লাগল যে বড় বড় অশ্রুবিন্দু ছিটকে পড়তে লাগল এদিক ওদিক। রবি আবারো চিৎকার করে বলতে লাগল, রঘু আমায় খুঁজে পায়নি! আমি জিতেছি, আমি জিতেছি!
রবি কী বলছে, এমন কি রবিটা অদৌ তাদের জগতের কেউ কি না এটা বুঝতেই অনেকখানি সময় লেগে গেল অন্যদের। অনেকক্ষণ আগেই রঘু সবাইকে খুঁজে পেয়েছে। ওরা রবিকে ভুলেই গিয়েছিল প্রায়। সে পর্বে রঘুর পরে কে চোর হবে সে নিয়ে অনেক ঝগড়াঝাটিও হয়েছে। শেষে মা উঠে এসে মিটমাট করে বলে দিলেন অন্য খেলা খেলতে। তারপর অন্য খেলা খেলেছে, তারপরে আরেকটা। গাছ থেকে তুঁত পেড়েছে, মালিকে বাগানে পানি দেয়ার কাজে সাহায্য করতে গিয়ে জ্বালিয়েছে। শেষে মালি বিরক্ত হয়ে বাবা মার কাছে নালিশ করে দেবে বলাতে ছেড়েছে। বাবা মা বাগানে এসে চেয়ার নিয়ে বসেছেন। এরপরে রঘু, মিরা সবাই এই খেলাটা শুরু করেছে। এতক্ষণ রবির কথা কারো মনেই পড়েনি। চোখের আড়ালে ছিল বলে রবি ওদের মন থেকেই হারিয়ে গিয়েছিল। পুরোপুরি নেই হয়ে গিয়েছিল। 
ধাক্কা দিয়ে রবিকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে রঘু চিৎকার করে বলল, বোকার মত করো না তো!
মিরা তাকে এক কোণায় শক্ত করে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলল, হাউ মাউ করে কেদো না রবি! যদি খেলতে চাও তো এই লাইনের এক কোণায় দাঁড়াও! 
খেলা আবার শুরু হল। তাদের হাত দুজোড়া মাথার ওপরে অর্ধচন্দ্রাকারে মিলিত হতে লাগল ছন্দে ছন্দে। সবাই দল বেধে গোলাকার চক্রে বিষণ্ন সুরে এক তালে গাইতে লাগল:

               সবুজ সবুজ ঘাসগুলো
               আর গোলাপগুলো লাল,
               আমায় তোমরা ভুলো না গো
               মনে রেখো চিরকাল!

ওদের হাতের অর্ধচন্দ্রাকারের ছবি গোধূলির আলোয় কেঁপে কেঁপে উঠছে। সবার মাথা বিষণ্নতায় নোয়ানো হচ্ছে আর পাগুলো মুখে উচ্চারিত সুরের তালে তালে মাটিতে পড়ছে। সুর আর তালে বিষণ্নতা আর অসহায়ত্ব এত গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ছে যে রবি আর পারছে না। রবি আর ওদের তালে তাল মেলাবে না। ওদের এই দাফনের গানে আর নিজেকে জড়াবে না। রবি চেয়েছিল বিজয়, এই বিষণ্নতা চায়নি সে। কিন্তু ওরা তাকে ভুলে গেছে। ওদের সঙ্গে কিছুতেই মেশা যাবে না। তাকে ভুলে যাওয়ার অপমান কী করে সইবে সে? বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠছে, সামলানো কঠিন। ভেজা ঘাসের মধ্যে মুখ গুজে পড়ে গেল রবি। আর সশব্দ কান্না নেই। অমর্যাদার গ্লানি বুকের ভেতর চেপে বসেছে পাথরের মত।

 

 

 

  

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত