| 28 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
গদ্য সাহিত্য

স্মৃতিকথায় অভিজিৎ সেন

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

আজ ২৮ জানুয়ারী কথাসাহিত্যিক অভিজিৎ সেনের শুভ জন্মতিথিতে তাঁকে নিয়ে ইরাবতীর পাঠকদের জন্য স্মৃতিকথা লিখেছেন সাহিত্যিক প্রতিভা সরকার।


আশির দশকে যখন বালুরঘাটে প্রথম অধ্যাপকের চাকরি নিয়ে যাই তখন আমি সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় ফেরত এবং  নিতান্ত তরুণী। অজানা মফস্বলে স্বজন বলতে কেউ ছিল না। মন-খারাপের বিকেলগুলো অনেক সময় জানালার ধারে বসেই কেটে যেত। অফিস ছুটির সময় হলে প্রায়ই দেখতাম এক শ্যামাঙ্গী, অসাধারণ সুন্দরী, কোমর ছাড়ানো মোটা কালো বিনুনির ছন্দিল এধার ওধারের সঙ্গে বাড়ি ফিরছেন। 

কৌতুহল হলে শুনলাম তিনি শঙ্করী সেন। জেলা পরিষদের চাকুরে। লেখক অভিজিৎ সেনের স্ত্রী। কিভাবে যেন ভাব হয়ে গেল আমাদের। দেখলাম, ওর রূপই শুধু টানে না, ব্যক্তিত্বও সমান আকর্ষণীয়। অভিজিৎদার সঙ্গেও আলাপ হয়ে গেল এই সূত্রেই। প্রায়ই যেতাম ওদের বাড়িতে। খুব খোলামেলা জায়গায় আলো বাতাসময় একটা বাড়ি। লেখালিখি করার পক্ষে আইডিয়াল। ঐ বাড়িতেই লেখা হয়েছিল রহু চন্ডালের হাড়। 
লেখক অভিজিৎকে নিয়ে অনেক লেখালিখি হয়েছে। মানুষ অভিজিৎকে কতটা চেনে সবাই আমার ধারণা নেই। পাঠকের পাওনার ওপরেও আমার বাড়তি লাভ ওঁর এবং ওঁর পরিবারের সঙ্গে হৃদ্যতা। সেই অধিকারে যা লিখছি সবটাই আমার দেখা প্রেক্ষিতজাত। তাই সত্যি, মিথ্যে, সন, তারিখের হিসেব করে এ লেখা পড়লে অসুবিধে হতে পারে। এ লেখার শেকড়ে সার দিচ্ছে ঐ একটি চার অক্ষরের শব্দ – ভালোবাসা, অভিজিৎদা এবং ওঁর পরিবারের জন্য, ওদেরও আমার জন্য। ওঁদের জন্য কিছু ভাবলে বা বলতে গেলে বার বার এই শব্দটাই অনুভব করি। ফলে আমার লেখা বস্তুনিষ্ঠ নাও হতে পারে এই সতর্কীকরণ শুরুতেই রইল।
অভিজিৎদা স্বভাবগম্ভীর। সেটা এতোটাই যে ওঁকে অহঙ্কারী, দাম্ভিক মনে হতে পারে। অল্প কথা বলতেন চিরকাল, যদিও এখন সেটা অল্পবিস্তর শুধরেছে।  আমার সঙ্গে আলাপের সময় উনি কিছুকাল হলো গৌড় গ্রামীণ ব্যাংকে ঢুকেছেন অনেক লড়াইয়ের পর। নকশালী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে বহুদিন আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে, অনেক কষ্ট যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে পারিপার্শ্ব সম্বন্ধে অনেকটা মোহমুক্ত হয়ে তবে উনি বালুরঘাটে আসেন। শঙ্করীদি ওখানেই থিতু তখন। দুটি সন্তান ওঁদের। বড় মেয়েটি মায়ের মতোই রূপসী, কিন্তু জন্মলগ্নে ফরসেপের আঘাত ওর মানসিকতাকে জড়ত্বের কাছাকাছি নিয়ে যায়। উপরি পাওনা নানা শারীরিক অসুবিধে। ওকে নিয়ে মা বাবার চূড়ান্ত নাজেহাল অবস্থার মধ্যেও দুজনকেই সন্তানের অসম্ভব যত্ন করতে দেখেছি। অফিস করা, লেখালিখি, নানা সুস্বাদু রান্না, যাতে শঙ্করীদি অসম্ভব পারদর্শী ছিলেন, সবকিছুই ওরা সময় বেঁধে করতেন। বিশেষ ক’রে দাদা যখন লিখতে বসতেন তখন বাড়িতে উচ্চকন্ঠ হওয়াও বারণ ছিলো। যে পরিবেশে নিপাট মনোযোগের সঙ্গে সারস্বত সাধনা করা যায়, সেই পরিবেশ বুননে শঙ্করীদি কখনোই চেষ্টার ত্রুটি রাখেননি। স্বামীকে চিরকাল আগলে রেখেছেন পক্ষীমাতার মতো।   
ওদের মধ্যেকার বোঝাপড়া সত্যি দেখার মতো ছিল। অভিজিৎদা যখন রাজনীতি থেকে দূরে, থিতু হবার চেষ্টায় ব্যস্ত, তখন আর্থিক কষ্ট কিছু কম ছিল না। ঘরে লুকিয়েও থাকতে হয়েছে ওঁকে। রাষ্ট্রের নিপীড়ন হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছিল, পার্টির পুরনো শুভানুধ্যায়ীদের কৃপাদৃষ্টিও। কোনদিনও এসব নিয়ে কোনো তিক্ততার লেশমাত্র দেখতে পাইনি ওঁদের মধ্যে।  মেয়ের শরীর নিয়ে দুশ্চিন্তা, ওর ভবিষ্যত নিয়ে দুর্ভাবনাকে নিজেদের সম্পর্কের ওপর কখনো ছায়া ফেলতে দেননি এই জুটি। ওঁরা পরস্পর চিরকাল পরস্পরের আশ্রয় হবার কাজটি ভারী সুন্দরভাবে করে গেছেন। মফস্বলের মধ্যে যেমন সারল্য থাকে, আপন করে নেবার প্রবণতা থাকে, তেমনি অকারণ গুজব, নাক গলানো, মুখ চেনাচিনি এবং অনেক উস্কানিও থাকে। সৌন্দর্য, রাজনীতি, লেখার খ্যাতি, আরো অনেক কারণে এই জুটি মফস্বলের নজরবন্দী থাকলেও ওদের প্রেম তখনই গল্পকথা। এখনও এই পরিণত বয়সেও যখন শঙ্করীদি বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, এর ব্যত্যয় ঘটেছে বলেছে জানিনা। 
অভিজিৎদাকে চিরকাল বড় টেবিল চেয়ারে গভীর মনোনিবেশ নিয়ে লিখতে দেখেছি। এখনকার মতো আলিশান টেবিল না সেটা, কম্পিউটার শোভিতও নয়, কিন্তু বালুরঘাটের টেবিলটিও বেশ গম্ভীরদর্শন ছিল। অনেক কাগজ কলম সুন্দর করে সাজানো থাকতো, কারণ শঙ্করীদি এলোমেলো থাকা একেবারেই পছন্দ করতেন না। ঐ চেয়ারে বসেই অভিজিৎদা উদাত্ত কন্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন, সূর্য তোমার আলোকধেনু…। ওঁঁর মন্দ্র কন্ঠ, পরিশীলিত উচ্চারণ এক মায়াবী পরিবেশ গড়ে তুলতো। শ্রোতা হয়তো আমি, শিবাণী আর শঙ্করীদি। একটার পর একটা গান গাইছেন আর ওদের বাড়ির পাশের খোলা আকাশে সোনার থালার মতো সূর্য বিদায় নিচ্ছেন। অন্ধকার ঘন হয়ে না আসা অব্দি সেদিন চলবে আমাদের গানের আসর। 
অনেক সুন্দর দিন কাটিয়েছি এই দম্পতির সান্নিধ্যে। ওঁদের কয়েক বছর আগেই কলকাতার কলেজে চলে আসি আমি। ওঁরা নাগের বাজারের ফ্ল্যাট কেনার পর আবার যাতায়াত শুরু হয়। এখনো তা বজায় আছে। যেতে পারি কম। গেলেও ওঁদের বড় মেয়েকে দেখে মরমে মরে যাই। কতো বড় হয়েছে, কিন্তু শারীরিক মানসিক অবস্থা উত্তরোত্তর খারাপ হয়েছে। কিন্তু সে এখনও আমাকে মনে রেখেছে আমার ডাকনামসহ। গেলেই একগাল হেসে বলে, ঝিকিপিসি এলে! 
ছোট মেয়েটি খুব ঝকঝকে। নিজের সংসারে শ্রীময়ী। বাবার গানের গলা ওতে বর্তেছে। নানা জায়গায় গাইবার নিমন্ত্রণে ব্যস্ত থাকে। শঙ্করীদিও খুব অসুস্থ। এবার তাঁকে ছায়া দিচ্ছেন অভিজিৎ সেন। পরস্পরের পাশে প্রকান্ড শিলার মতো অটুট এই দম্পতি মানুষ হিসেবেও খুব বড়মাপের। জীবনের ঝড়ঝঞ্জা অক্লেশে নয়, ক্লেশেই পার করেছেন ওঁরা, কিন্তু সেই ক্লেশকে কখনো বড় করে দ্যাখেননি। এই আশাবাদ, এই মঙ্গলপিপাসা অভিজিৎ সেনের সাহিত্যকৃতিরও একটি বিশিষ্ট দিক এটা ওয়াকিবহাল মাত্রেই জানবেন।  

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত