| 22 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
গদ্য সাহিত্য

একটি দুর্লভ চোরাচালান

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

ব্যাপারটা শুরু হয়েঠিল ১৯৯৭ সালের অক্টোবর মাসে কুষ্টিয়ায় লালনোৎসবে যোগ দেয়ার ভিতর দিয়ে। অবশ্য এর আগেই মনের মধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছিল একটা সম্ভাবনাকে সফল করা যায় কিনা- এই আশার অঙ্কুরোদগম। তারও আগে সেই কবে যখন জেনেছিলাম বিনয় মজুমদার ঠাকুরনগরে থাকেন এবং পথ চেনা থাকায় সেখানে যাওয়াও সম্ভব- প্রকৃত শুরু বলতে গেলে তখনই। তারপর যখন হুমায়ূন যাযাবর জানালো, ওইপারে নদীয়াতে একটা লালনমেলা হচ্ছে এবং আমরা চাইলে যেতে পারি- তখন বিগত সবগুলি শুরু মনের মধ্যে এমন হৈচৈ লাগিয়ে দিল যে তাদের প্রতিশ্রুতি দেয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকলো না। কিন্তু প্রতিশ্রুতি দিলেইতো হয় না- আরো অনেককিছু, অনেক অনুষঙ্গ পিছন পিছন এসে হাজির হয়। আর এই রেওয়াজ বজায় রেখে প্রথমেই হাজির হলো ভয়। তারপর অর্থনৈতিক শীর্ণতাও ছিল। আর ছেউড়িয়ায় সময় কাটাতে গিয়ে নেই শীর্ণতা আরো কৃশ হয়ে পড়েছিল ততক্ষণে। ফলে যতটুকু জ্বালানী হলে উদ্যোগের ইঞ্জিন পুর্নোদ্যম পায়- স্বভাবতই তার দুর্ভিক্ষে একটা নিমভাব রচিত হচ্ছিল মনে। আর এটি ছিল সর্বাংশেই আমার তরফ থেকে। আমার সঙ্গী রিফাত চৌধুরী অবশ্য এসব নিমতা থেকে চিরকালই দূরে বাস করে, ফলে যখন আমি কিছুটা ঝুঁকে পড়ছিলাম নিষ্ক্রিয়তার দিকে- তখন সে ক্রুদ্ধ হচ্ছিল আর প্রতিমূহূর্তে জানাচ্ছিল যদি না যাওয়া হয় তাহলে এটাই হবে তার সঙ্গে আমার শেষ মিত্রতা। একে হাতের কাছে পেয়েও বিনয় মজুমদার দর্শনের বিফলতা- তায় আবার রিফাতের সঙ্গবঞ্চনা- এই দুই বিপুল আঘাত আমার পক্ষে সহ্য করা ছিল এমন কঠিন যে রাজি হওয়ার দিকে পা বাড়াতে আর কোন কুণ্ঠা দেখানোর সাহস আমি পেলাম না। শুরু হলো আমাদের যৌথ অভিযানের প্রথম অঙ্কের প্রথম দৃশ্যাভিনয়।

কিন্তু বললেই কি আর শুরু হয় সবকিছু? আমার নিষ্ক্রিয়তা আর অসাড়তা ততক্ষণে হারিয়ে ফেলেছে আমাদের পথ নির্দেশককে। সমস্ত মেলাপ্রাঙ্গণ তন্নতন্ন করে খুঁজেও হুমায়ূন যাযাবরকে পাওয়া যাচ্ছিল না কোথাও। ফলে তীরে এসেও যেন তরীটি ডুবে যাচ্ছিল আর আমাদের পায়ের পাতা ভিজে যাচ্ছিল ক্রমশ উচ্চতা বাড়াতে থাকা অনিশ্চয়তার জলে। সমস্ত আশা নিমজ্জনের মুখে দাঁড়িয়ে তখন হাতড়ে বেড়াচ্ছে যেকোন খড়কুটা। কিন্তু কোথায় কি? চারদিকে কেবল থৈথৈ নিরাশার জল আর আমাদের বুকে যেন জমছিল দীর্ঘদিন ধূমপানে আসক্ত কারো অন্তিম ফুসফুসের ঘন কালো কফের মতো মেঘ।

শেষপর্যন্ত স্বউদ্যোগের কুকুর গা-ঝাড়া দিল। ঠিক করলাম নিজেরাই পথ চিনে চলে যাবো একটা স্বাধীন বাতাসের ঝাপটার মতো। আর বিগত কয়েকটা কলকাতা ভ্রমণ এই স্থিরতাকে আরেকটু গতি দিল যেন। ভাবলাম- দেখাই যাক কি হয়। শোনা ছিল, সীমান্তে তখন যাতায়াত কিছুটা সহজ- পূজা এবং বিভিন্ন শীতকালীন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এর জন্য দায়ী। কুষ্টিয়ার যেদু’টি সীমান্ত পশ্চিমবঙ্গে যাওয়ার জন্য উপযুক্ত- যথা মহিষকুণ্ডি ও প্রাকপুর- তার একটাকে বেছে নিয়েই চলে যাবো ভাবলাম। শুনেছিলাম যাযাবর ওইদিকেই থাকে এবং মহিষকুণ্ডি ও প্রাকপুর একই মুখের দুই চোখের মতোই বেশ নিকট বসতি।

১৭ অক্টোবর দুপুরের ভাত খেয়ে চেপে বসলাম মহিষকুণ্ডির বাসে। তারপর সেখানে পৌঁছে যাযাবরকে খুঁজতে খুঁজতে পৌঁছে গেলাম পদ্মার পাড়ে। এখান থেকেই ছিটমহল মহম্মদপুরের দিকে নৌকা যায়। নৌকায় উঠতেই বুঝলাম এটা গরু পারাপারের নৌকা। বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য হওয়ার জন্য ভারতীয় গরুরা এরকম নৌকা দিয়েই কসাইখানার দিকে যায়। আমরা অবশ্য উল্টাদিকে যাচ্ছিলাম।

পদ্মার অন্য পাড়ে দেহের অধিক একটা ফোঁড়ার মতো বাড়তে একটা স্থলভাগের নাম মহম্মদপুর। যেরকম অন্ধকারে সামনের মাটির থেকেও নক্ষত্রকে মনে হয় কাছের- মহম্মদপুর যখন সেইরকম অন্ধকারে ঢাকা- আমাদের নৌকা ভিড়লো চরের খুব কাছে। আর ভিড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘটলো একটা দুর্ঘটনা- একজন মহিলা নিকটবর্তী জলে পড়ে গেলেন কোলের বাচ্চাসহ। কিন্তু বিষয়টা আমাদের খুব একটা থামিয়ে রাখতে পারলো না। একটা অনুচ্চারিত উত্তেজনা তখন মৃদু শব্দে ভরা একটা শক্তিশালী ইঞ্জিনের মতো সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

তীরের খুব কাছেই জোনাকীজ্বলা একটা ঝোঁপের মতো বসেছিল একটা কুপিজ্বলা দোকান। বন্দর খুঁজতে থাকা একটা জাহাজ যেভাবে একটা লাইট হাউজের অনুগমন করে- আমরাও তার কাছে এগিয়ে গেলাম পথের হদিশ জানতে। আর সহৃদয় দোকানদার সাথেসাথেই আমাদের টাকা আর দেশ বদলে দিলেন। কয়েকটি রাখাল গরু নিয়ে বাংলাদেশে এসে ফিরে গেল আমাদের নিয়ে। সহজ সীমান্ত, গ্রাম আর অন্ধকার ভেদ করে আমরা চললাম গোপালপুর বাজারের দিকে যেখানে ওসমান মন্ডল থাকেন।

ওসমান মন্ডল গোপালপুরের খ্যাতনামা বাউল। রাখালদের সর্দার নওশাদ ততক্ষণে জেনে ফেলেছে আমরাও গানটান গাই (এটি নওশাদের নিজের আবিস্কার এবং আমাদের নিরবতায় প্রতিষ্ঠিত) এবং লালনমেলায় যাচ্ছি। ফলে ওসমান মন্ডলকে চিনিয়ে দিতে তার ততটুকুই দেরি হলো, যতক্ষণে কেবল আরেকটি শ্বাস নেয়া যায়। ঠিক হলো, নওশাদ আমাদের ওসমান মন্ডলের বাড়িতে পৌঁছে দেবে এবং সেখানেই আমরা রাত্রিবাস করবো।

গোপালপুর বাজারের চা, জনসাধারণের কৌতুহল এবং পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের পর ওসমান মন্ডলের বাড়িতে পৌঁছলাম নওশাদকে বিদায় করে দিয়ে। সেখানে গাদাকরা অন্ধকারের মধ্যে আরো ঘন একটুকরা অন্ধকারের মতো একটা বাড়ির বারান্দায় আরো বেশি গাঢ় অন্ধকার হয়ে ঘুমাচ্ছিলেন দিনক্লান্ত ওসমান মন্ডল। কিন্তু তার মঙ্গলময়ী স্ত্রী আর অতিথিপ্রবণ পুত্র যুগ্মভাবে ঘুঁচিয়ে দিল তার নিদ্রাজনিত অভাব। আমরা পেলাম ভাত, তামা আর ঘুমানোর উপকরণ এবং স্থান। ওসমান মন্ডল জড়িতস্বরে কথা দিলেন সকালেই তার উষ্ণসখ্য শুষে নেবে অপরিচয়ের শিশির। কিন্তু আমাদের সকাল তার সকালকে সেই সুযোগ আর দিল না। অথবা বলা যায় আমরাই সেই অন্ধকার যা দিবাশাসনে গুপ্ত- ফলে না দেখা করেই পালালাম আমাদের রাতের আশ্রয়দাতার বাড়ি থেকে নিজেদের অবৈধতাকে আরো একটু স্পষ্ট করে দিয়ে। আসলে ওসমান মন্ডলের কাছে বায়না করার জন্য গতকালই বাংলাদেশ থেকে কয়েকজন লোক আসার কথা ছিল। নওশাদের কাছ থেকে একথা আমাদের শোনা। আর সময়মতো গোপালপুরে আমাদের পৌঁছে যাওয়া সকলকে এটাই ভাবতে বাধ্য করেছিল – আমরাই সেই বায়নাদার। কিন্তু বোরকার ভিতরের নারীটি যেমন জানে নিজের দেহরূপ- আমরাও সেরকম প্রকাশ্যের ভুলকেই ক্রাচের মতো বগলে নিয়ে পেরিয়ে গেলাম আমাদের পঙ্গুপথ। নাহলে গাছতলাতেই হয়তো কাটাতে হতো প্রথম ভারতীয় রাত।

গোপালপুর বাজার থেকে তিনঘণ্টার বাসরাস্তা কৃষ্ণনগর। মাটির পুতুল, গোপাল ভাঁড় আর নজরুলের গজলের জন্য যে শহর বিখ্যাত। তারপর সেখান থেকে ট্রেনে রানাঘাট। তারপর বনগাঁ। তারপর ঠাকুরনগর। ১৮ তারিখ সকাল ৬টায় গোপালপুর থেকে রওনা হয়ে আর সন্দেহের রোদে বিদ্ধ হতে হতে বিকাল তিনটা নাগাদ ঠাকুরনগরে পৌঁছলাম। স্টেশনের দুইদিকেই শিমুলপুর। একটা উত্তর, আরেকটা দক্ষিণ। বিনয় মজুমদার যেহেতু ঠাকুরনগরের এক চর্মকারকে নিয়ে একদা একটি কবিতা লিখেছিলেন, তাই শুরুতেই স্টেশনের পাশে বসা একজন চর্মকারকে তার কথা জিজ্ঞাসা করলাম। যদিও বিনয় মজুমদার চর্মকারকে বিখ্যাত করেছেন কিন্তু চর্মকারের কাছে তিনি আদৌ বিখ্যাত নন বোঝা গেল। দুজন তরুণও দেখলাম তার ব্যাপারে নির্বিকার। তাদের কথা শুনে মনে হলো স্টেশনের আশেপাশে তিনি থাকেন না।

বিষয়টা আমাকে কিছুটা মুষড়ে দিল যেন। ভেবেছিলাম ঠাকুরনগরে নেমে যাকে তাকে জিজ্ঞাসা করলেই সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমাদের বিনয় মজুমদারের বাড়িতে পৌঁছে দেবেন। এইরকম ক্ষুদ্র একটি উপশহরে তার মতো বিরাট মাপের একজন মানুষের ক্ষেত্রে সেটাইতো স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ঠাকুরনগরের একটা বিরাট একাংশ দেখা গেল তার বিষয়ে জন্মান্ধ। কি করা যায় ভাবছি- এমন সময় হঠাৎ মনে পড়লো তার নিয়মিত ওষুধ কেনার কথা। সঙ্গেসঙ্গে একটা ওষুধের দোকান খুঁজে বের করতে তৎপর হলাম আমরা। আর কাছেই পাওয়া গেল একটা।

অসুস্থতায় একটা ওষুধ যেভাবে বাতলে দেয় সুস্থতার খবর- দোকানটিও সেভঅবে আমাদের দেখিয়ে দিল বিনয় মজুমদারের বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা। স্টেশনের পিছনেই পাশ দিয়ে নেমে যাওয়া একটা রাস্তার প্রান্তে তিনি থাকেন। আমরাও রওনা হলাম উদ্দিষ্ট পথে। আর পথিমধ্যে একটা মিষ্টির দোকান থেকে সংগ্রহ করে নিলাম সিঙারা, সন্দেশ এবং আরেকবার তার বাড়ির পথের হদিশ।

পথ যতই শেষ হচ্ছিল- উত্তেজনাও বেড়ে যাচ্ছিল সেই সমানুপাতিকতায়। একটা ছায়াসুনিবিড় উঠানের মধ্যে ঢুকে একটা বেশ চকচকে পাকা বাড়ি ও একটা টিনের ঘরের মাঝখান দিয়ে এগিয়ে যাওয়া পথের পাশে তারে টানানো ময়লা ধুতির মতো একটা একতলা বাড়ি দাঁড়িয়েছিল। বাড়িটার মাথার উপরে খোলা আকাশ আর চারপাশের ঘন গাছপালা অনেকদিন পর খুঁজে পাওয়া একটা শান্তির সঙ্গে দেখা করিয়ে দিচ্ছিল যেন। একটা বর্গক্ষেত্র ভরা শান্তিকল্যাণ। বাড়িটার কপালে বাড়ির নাম এবং নির্মাণের সময়কাল লেখা। এটাই সেই বিখ্যাত বিনোদিনী কুঠি। আমি আর রিফাত যখন বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছি- দেখা গেল একজন খালি গায়ের বয়স্ক ভদ্রলোক একটা মোড়ায় বসে একটি বালকের সাথে কথাবার্তা বলছেন। মূহূর্তেই চিনে ফেললাম বিনয় মজুমদারকে। এ যেন অন্ধকার ঘরে একটা শিশুর মাতৃস্তনের বোঁটা খুঁজে পাওয়ার মতো। নিজেদের মধ্যেও ইশারা বিনিময় হয়ে গেল আমাদের। বুঝতে পারলাম, আমাদের যাত্রা হলো শেষ। সঙ্গেসঙ্গে মনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো বিজয়ের আস্বাদ। এডমন্ড হিলারি আর তেনজিং নোরগের সেই ঐতিহাসিক বিজয় যেন আমাদের হাতে ধরা দিল আরেকবার। বাংলা কবিতার বর্তমান শীর্ষবিন্দুকে স্পর্শ করবার বিজয়। এখনো জানি না এই বিনোদিনী কুঠিতে আমরাই প্রথম বাংলাদেশি পর্বতারোহী কিনা কিন্তু প্রথমই হই বা দ্বিতীয় বা অনেক অনেক দলের পরে স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া পথে চলা একটা মনোযোগহীন দল- আমরা বিচলিত হলাম না কিছুতেই। একটু কেশে, গলাটাকে জীবনের শ্রেষ্ঠ মসৃণতা দিয়ে, মৃদু কিন্তু স্পষ্ট একটা স্বরে ভদ্রলোককে আমাদের উপস্থিতি জানালাম। সাথেসাথেই তিনি আমন্ত্রণ জানালেন আমাদের। তিন চারটি সিঁড়ির ধাপ অতিক্রম করে, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় ধাপে পাদুকা বিসর্জন দিয়ে একটা কালো ঠাণ্ডা মসৃণ বারান্দায় উঠে এলাম আমরা। সেখানে একটা মোড়ার উপরে পায়জামা, চপ্পল আর চশমা পড়া খালি গায়ের বিনয় মজুমদার বসে বসে গল্প করছিলেন ঝন্টুর সঙ্গে। আমরা গিয়ে তার পায়ের কাছে বসলাম এবং জানালাম একটা ফিরতি সফরে বাংলাদেশ থেকে তার কাছে আমাদের আগমন সংবাদ। সেই সুদুর ১৯৬৭ সালে বিনয় মজুমদার বাংলাদেশে এসেছিলেন তথাকথিত বৈধতাকে প্রশ্রয় না দিয়ে নিজের মাতৃভূমির টানে। আমাদের এই সফর তার সেই মহান উদ্দেশ্যের তিরিশ বছর পুর্তিকে পালন করলো যেন।

বাংলাদেশ থেকে আমরা শুধু তার সঙ্গেই দেখা করার জন্য গিয়েছি জেনে বিনয় মজুমদার উচ্ছ্বসিত হলেন। তার বাড়িতে আশ্রিতা জনৈকা বিউটিকে উচ্চৈঃস্বরে সেটি জানালেনও। তারপর শুরু হলো তার সঙ্গে আমাদের এক ঘণ্টাব্যাপী রোমহর্ষক বাক্যালাপ।

এই একটি ঘণ্টা ছিল আলীবাবার গুহা আবিস্কার করার পরেকার প্রথম ঘণ্টাটির মতো মণিমুক্তাময়। উজ্জ্বল দ্যুতিময় বাক্যাবলীর ক্রমাগত উৎসারণ একটা দৃষ্টিনন্দন ফোয়ারার জন্ম দিল যেন। মুগ্ধ দর্শকের মতো আমরা কেবল তাতে হাত ভিজিয়ে মুখ ধুয়ে নিচ্ছিলাম নিজেদের। েএকটা নিবিড় শীতলতায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছিল আমাদের মুখমণ্ডলের ত্বক।

বিনয় মজুমদার বলছিলেন তার প্রবাস জীবনের কথা। এইপর্যন্ত আটবার তিনি নিজের মনোদেশের বাইরে (পাগলা গারদ) গেছেন। অবশ্য পাঁচবারই একটি দেশে। আর একবারতো বাংলাদেশের একজন পথপ্রদর্শক তাকে পৌঁছে দিয়েছিলেন লুম্বিনীতে। মনে হলো বিনয় মজুমদার প্রবাসে থাকতে ভালোবাসেননি। আর কোন কবিই বা তা চায়?

এখন তার নিজের ছায়াসুনিবিড় দ্বীপে বিনয় ‘রবিনসন ক্রুসো’ মজুমদার রচনা করছেন নিজের কবিতাক্ষেত। সেখানে শাকসব্জি থেকে শুরু করে পুষ্প পর্যন্ত সবকিছু ফোটে। আর আমরা পাই পুষ্টি থেকে সুগন্ধ পর্যন্ত যাবতীয় বৃক্ষ উৎপাদ।

আমাদের পত্রিকা ব্রহ্মপুত্রের জন্য বিনয় মজুমদার দিলেন একটি সাক্ষাৎকার, একটি গদ্য কবিতা ও একটি লিমেরিক। পুরাকীর্তির মতো মূল্যবান এই লেখা তিনটি সঙ্গেসঙ্গে নিরাপদে রক্ষা করে সেদিনের মতো বেরিয়ে এলাম তার বাড়ি থেকে। তারপর ট্রেনে চেপে শেয়ালদা স্টেশন- ‘আলো জ্বালাবার দায় বাঁচে’। সেখানেই একটি প্ল্যাটফর্মে রাত্রিযাপন ও পরদিন সকালে কলেজস্ট্রিট ও ধর্মতলা ঘুরে পুনরায় ঠাকুরনগর। আগের দিনই কথা হয়েছিল পরদিন দুপুর বারোটা থেকে বিকাল তিনটা পর্যন্ত বিনয় মজুমদার আমাদের সাথে কথা বলবেন। বারবার সময়সূচী মনেও করিয়ে দিয়েছিলেন আর রসেইসাথে আমাদের দুজনের নাম কয়েকবার জিজ্ঞাসা করে যেন মুখস্ত করে নিচ্ছিলেন।

কিন্তু পরদিন তারা বাড়িতে পৌছাতে আমাদের দুপুর দুইটা বেজে গেল। বাড়ির বারান্দায় তখন একটি উদ্ভিন্ন কিশোরী বসে আছে। ‘দ্বিতীয় মুকুল’। আমরা বিনয় মজুমদারের কথা জিজ্ঞাসা করলে সে বললো তিনি শুয়ে আছেন। আমরা তাকে ডাকতে বললাম আর সে ডাকতেই একটা সবুজ শার্ট পড়ে বিনয় মজুমদার দরজায় এসে দাঁড়ালেন। শার্টটার মাঝখানে একটা বোতাম লাল সুতা দিয়ে আটকানো। বাকি বোতামগুলি খাঁচার দরজা খোলা পেয়ে উড়ে পালানো পাখিদের মতো মিশে গেছে পৃথিবীর পাখিদের সম্মিলিত দেহে। বিনয় মজুমদারের ঘরে কি কোন দরজা বন্ধ খাঁচা থাকতে পারে? নাকি কোন আবদ্ধ চিড়িয়া? পৃথিবীর সমস্ত কিছুকেই যে ত্যাগ করতে পারে কবিতার জন্য- তার ঘরে আমি তীব্রতম স্বাধীনতা অনুভব করি। বিনোদিনী কুঠি পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাধীন রাষ্ট্রের নাম।

বিনয় মজুমদার আজ ক্লান্ত ছিলেন। অসুস্থতা আরো একটু বেড়েছে, ফলে জানালেন শুয়ে থাকতে চান। আমাদের বেশি সময় দিলেন না। আর আমরাও কবির অসুস্থতাকে সম্মান জানিয়ে ধরলাম ফিরতি পথ। যেতে যেতে ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিনয় মজুমদার তাকিয়ে আছেন আমাদের দিকে।

এবার বাংলাদেশে ফেরার পালা। ঠিক করলাম এবার বনগাঁ দিয়েই ঢুকে পড়বো মাতৃভূমিতে। বেরোবার একটা পথ নিশ্চয়ই এখানেও আছে। আসলে আমাদের পকেট তখন প্রায় ফাঁকা। এমনিতেই প্রায় শুকিয়েছিল জলাশয়- এখন এই জলটুকুকেই পাথেয় করলাম ‘সন্ত্রস্ত ভেকের মতো মনে’। কৃষ্ণনগর এখন কৃষ্ণগহ্বরের মতো দূরে।

বনগাঁয় যাবার রপর রপরিচয় হলো গনেশের সাথে। গনেশ ভ্যান চালায় আর দেশ পাল্টানো মানুষদের পৌঁছে দেয় সীমান্তের কাছে। সে জানালো, সীমান্ত পার হতে ভারতীয় মুদ্রায় জনপ্রতি তিনশ টাকা লাগে এবং আমরা যদি পার হতে চাই তাহলে সে ব্যবস্থা করে দেবে। কিন্তু আমাদের তখন ফোঁটায় জগত, সমুদ্রের স্বাদ তাই লবণাক্ত, থু থু কর। আমরা গনেশকে অকপটে জানালাম আমাদের সম্পদের পরিমাণ- ভারতীয় মুদ্রায় সত্তর টাকা এবং কয়েকদিন আগে কেনা একটা প্যান্টপিস। ইতিমধ্যে গনেশ আমাদের নিয়ে গিয়েছিল নাসিরের কাছে। নাসির লাইনম্যান- সীমান্তে মানুষ পারাপার করে। গনেশ ও নাসির আমাদের সম্পদের বিবরণে বাকরুদ্ধ হয়ে আমাদের ফিরে যেতে বললো কলকাতায়। কিন্তু আমাদের সকাতর অনুনয় ও প্যান্টপিসটির প্রতি গনেশের লোভ তাদের রুদ্ধবাকে ফিরিয়ে আনলো ভাষার নদী। শেষপর্যন্ত নাসির বললো, সে কেবল সীমান্তের ওইপারে যাওয়ার পথ দেখিয়ে দেবে এবং বাকিটুকু আমাদের দায়িত্ব।

তখন শুরু হলো রোমাঞ্চকর সীমান্ত অতিক্রম অভিযান। প্রথমেই মুখামুখি হলাম অন্ধকারের। নাসিরের নির্দেশিত দিগন্তের একটা ঢ্যাঙা গাছ লক্ষ্য করে পদক্ষেপ করতেই নিজেদের আবিস্কার করলাম একটা ধানক্ষেতের মধ্যে। কোনরকমে তার আল আবিস্কার করে তারপর ছুট। মাঝখানে পড়লো একটা গাছের ডালনির্মিত বেড়া। কিন্তু তখন আমি পিছনে ভয়ের ক্যানেস্তারা পেটানোর শব্দ নিয়ে অস্থির একটা মত্ত হাতি। চোখের পলকে নিহত হলো প্রতিবন্ধকতা। তারপর আবার ধানক্ষেত। কিন্তু এবার সে খোলসের ভিতরে শামুকের মতো নরম। নতুন স্যান্ডেলটা গোড়ালি পর্যন্ত সমুদয় পা-কে সঙ্গে নিয়ে কাদার মধ্যে ঢুকে গেল লিঙ্গ দৃঢ়তায়। কিন্তু এখানেও সেই মত্ততা। ফলে কোনরকমে পড়তে পড়তে, ধানগাছের কাঁধে ভর দিয়ে ভারসাম্য রক্ষা করে আর দিগন্তের সেই ঢ্যাঙা গাছটাকে নিজেই উঠে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে না কেন বলে গালাগালি করতে করতে, পথিমধ্যে চকিত একজন ছায়াকে আমাদের মতোই আমাদের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে দেখতে দেখতে ঢ্যাঙা গাছটার কাছে এসে দাঁড়ালাম। তারপরতো সামনেই মাতৃভূমির গ্রাম, আমাদের আত্মবিশ্বাসের মাটি।

ভারতের একজন মহান লেখকের দু’টি কবিতা ও আলাপচারিতা এখন আমাদের সঙ্গে। দুই দেশের প্রশাসনিক শৃঙ্খলগুলির আড়ালে আমরা পাচার করে নিয়ে এসেছি মূল্যবান এই রচনাগুলি। আমার মনে হয় এটাই সাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও দুর্লভ একটি চোরাচালান- যা কবিতার প্রতি প্রেমই আমাদের দিয়ে করিয়ে নিয়েছিল। ব্যাপারটা এখনো আমার মনে গর্বের জন্ম দেয়- অবশ্য রিফাতের মনের কথা জানিনা- আর এই গর্ব হিলারির এভারেস্ট জয়ের চেয়ে কোন অংশে কম হয়নি কখনো। হবেও না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত