| 1 মার্চ 2024
Categories
ইতিহাস

ইরাবতী ইতিহাস: জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা । জয়ন্ত ভট্টাচার্য

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

‘জাহাঙ্গীরের আমলের স্বর্ণমুদ্রা’, বললেন শঙ্করবাবু। ‘দেখুন, প্রত্যেকটিতে একটি করে রাশির ছবি খোদাই করা। এই জিনিস একেবারেই দুষ্প্রাপ্য।’
– সত্যজিৎ রায়, ‘জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা’
প্রাক-কথা:
ভারতের মুঘল বাদশাহ নূরউদ্দীন মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর (রাজত্বকাল ১৬০৫-১৬২৭ সাধারণাব্দ) বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত স্বর্ণমুদ্রার প্রচলনের জন্য মধ্যযুগের ভারতের ইতিহাসে খ্যাত। সমকালীন ভারতে, তাঁর স্বর্ণমুদ্রার চিত্র ও লেখের বিষয়বস্তু বহু বিতর্ক ও বিরোধের জন্ম দিয়েছে। আধুনিক যুগে জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা তার বৈচিত্র্য ও দুষ্প্রাপ্যতার কারণে সারা বিশ্বের মুদ্রা সংগ্রাহকদের কাছে আকর্ষণের বস্তু।
ভারতের প্রথম দুই মুঘল বাদশাহ, বাবর ও হুমায়ুনের রাজত্বকালে তামার মুদ্রা ফালুস, রূপার মুদ্রা শাহরুখী (দিরহাম) ও সোনার মুদ্রা আশরফী (দিনার) প্রচলন করা হয়েছিল। কিন্তু, ঐ সময় ভারতের মুখ্য বিনিময়ের মাধ্যম ছিল সুলতানী আমলের খাদ মেশান রূপার মুদ্রা ‘টংকা’। দক্ষিণ ভারতে বিজয়নগর সাম্রাজ্যের স্বর্ণমুদ্রা ‘বরাহ’ বা ‘হোণ’ প্রচলিত ছিল। ১৫৪২ সাধারণাব্দে শের শাহ সুরি ভারতে নতুন বিশুদ্ধ রূপার মুদ্রা ‘রূপয়া’ চালু করেন। বাদশাহ আকবরের সময় থেকে মূলতঃ তিন ধরণের মুদ্রা প্রচলিত ছিল – তামার মুদ্রা ‘দাম’, রূপার মুদ্রা ‘রূপয়া’ ও সোনার মুদ্রা মোহর (মুহর)। আকবরের আমল থেকে ১ তোলার মান ছিল প্রায় ১২ গ্রাম। সাধারণভাবে রূপয়া ও মোহরের ওজন হত ১ তোলার থেকে কিছুটা কম। রূপার মুদ্রা প্রধানতঃ ১১.৫ গ্রাম ও সোনার মুদ্রা মুখ্যতঃ ১১.০ গ্রাম ওজনের হত। সাধারণতঃ এই মুদ্রাগুলির এক পিঠে রাজার নাম ও উপাধি ও অন্য পিঠে প্রচলনের সাল ও রাজ্যাঙ্ক লেখা হত। প্রায় সমস্ত মুঘল বাদশাহের মুদ্রায় হিজরী সনের উল্লেখ রয়েছে। কেবল, আকবর ১৫৮৪ সাধারণাব্দে তারিখ-ই-ইলাহী সৌর পঞ্জিকা প্রচলন করে তাঁর মুদ্রায় ঐ পঞ্জিকার সাল লেখা চালু করেন। জাহাঙ্গীরের রাজ্যাভিষেকের পর এই রীতি বন্ধ হয় এবং তাঁর মুদ্রায় হিজরী সনের উল্লেখ শুরু হয়। কিন্তু, তিনি রাজত্বকালের বর্ষ ও মাস গণনার জন্য ইলাহী সৌর পঞ্জিকা ব্যবহার চালু রাখেন। শাহজাহান এই প্রথা বন্ধ করেন।

জাহাঙ্গীরের প্রচলিত অধিকাংশ স্বর্ণমুদ্রার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য মুদ্রার দুই পিঠে ফার্সী ভাষায় নাস্তালিক লিপিতে লেখা কবিতার পংক্তির মাধ্যমে মুদ্রার পরিচয়জ্ঞাপন। আকবরের মুদ্রায় এই রীতির সূত্রপাত হলেও, জাহাঙ্গীরের মুদ্রায় এই রীতির প্রয়োগ অত্যন্ত ব্যাপক। জাহাঙ্গীরের রাজ্যাভিষেকের পর, তাঁর নির্দেশে প্রথমে স্বর্ণমুদ্রার ওজন ২০% বাড়িয়ে দেওয়া হয় এবং রাজত্বকালের চতুর্থ বর্ষে স্বর্ণমুদ্রার ওজন আরও ৫% (অর্থাৎ মোট ২৫%) বাড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু, রাজত্বকালের ষষ্ঠ বর্ষে প্রজাদের অনুরোধে আবার আকবরের আমলের ওজন ফিরিয়ে আনা হয় এবং রাজত্বকালের শেষ পর্যন্ত ওজনের আর কোন পরিবর্তন করা হয় নি। জাহাঙ্গীরের প্রায় সব স্বর্ণমুদ্রাই গোলাকার, এবং সোনার শুদ্ধতা অতি উচ্চমানের (প্রায় ১০০%)। প্রত্যেক রাজকীয় টাঁকশালের ‘দারোগা’ এই শুদ্ধতার দিকে নজর রাখতেন।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


প্রথম স্বর্ণমুদ্রা:
আকবরের মৃত্যুর পর জাহাঙ্গীরের রাজ্যাভিষেকের পূর্বে আগ্রা টাঁকশাল থেকে প্রচলিত প্রথম ১ মোহরের স্বর্ণমুদ্রায় ইলাহী সন ৫১ (১৬০৫ সাধারণাব্দ) এবং আকবর ও জাহাঙ্গীর, উভয়েরই নাম খোদিত হয়। রাজ্যাভিষেকের অব্যবহিত পর, তিনি তাঁর স্বর্ণমুদ্রায় আমীর-উল-উমরাহ শরীফ খানের রচিত একটি ফার্সী বয়েৎ(দ্বিপদী) লিখতে নির্দেশ দেন:
“রুই জ়র রা সখ্ত্ নূরানী বরং মিহর-ও-মাহ।
শাহ নূর-উদ্দীন জাঁহাগীর ইবন আকবর বাদশাহ।”
[অনুবাদ: সূর্য আর চন্দ্রের কিরণের মতন এই স্বর্ণের মুখমণ্ডলকে উজ্জ্বল করেছেন বাদশাহ আকবরের পুত্র শাহ নূর-উদ্দীন জাঁহাগীর।]
জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালের প্রথম ৩ বছরে এই বয়েৎ সমন্বিত স্বর্ণমুদ্রা দিল্লী, আগ্রা, লাহোর, আকবরনগর(রাজমহল), কাশ্মীর(শ্রীনগর) ও কান্দাহার টাঁকশাল থেকে প্রচলন করা হয়েছিল।
বৃহদাকার স্বর্ণমুদ্রা:
মুঘল বাদশাহদের মধ্যে জাহাঙ্গীরই প্রথম ব্যাপক সংখ্যায় বৃহদাকার সোনার মুদ্রা নির্মাণ করতে শুরু করেন। আকবরের রাজত্বকাল থেকেই মুঘল কোষাগারে সোনা মূলতঃ এই বৃহদাকার স্বর্ণমুদ্রার আকারে সঞ্চয় করা হত। এই বৃহদাকার স্বর্ণমুদ্রাগুলি কেবল উপহার দেবার প্রয়োজনে ব্যবহার করা হত। জাহাঙ্গীরের আগে আকবরের রাজত্বকালের আগ্রার টাঁকশালে নির্মিত একটি ৫ মোহরের স্বর্ণমুদ্রা ছাড়া এরকম আর কোন বৃহদাকার স্বর্ণমুদ্রা নির্মাণের নিদর্শন এখনও পাওয়া যায় নি। আবুল ফজল, তাঁর ‘আইন-ই-আকবরী’ (আনুমানিক ১৫৯৫ সাধারণাব্দ) গ্রন্থে আকবরের রাজত্বকালের একাধিক ভারী স্বর্ণমুদ্রা, যেমন, শানশা, বিন্সত, রহস, আত্মাহ্ প্রভৃতির উল্লেখ করলেও এই মুদ্রাগুলি আজও চিহ্নিত করা যায় নি।
জাহাঙ্গীর প্রথম বৃহদাকার ২,৩,৫,১০,২০,৫০,১০০,২০০ ও ১০০০ মোহরের স্বর্ণমুদ্রা নির্মাণ করান। এর অধিকাংশ নির্মিত হয়েছিল আগ্রার টাঁকশালে। জাহাঙ্গীর, তাঁর রাজ্যাভিষেকের অব্যবহিত পরেই তাঁর প্রচলিত প্রত্যেকটি স্বর্ণমুদ্রার একটি বিশেষ নামকরণ করেন। ১ মোহরের স্বর্ণমুদ্রা নূরজাহানী, ৫ মোহরের স্বর্ণমুদ্রা নূরমিহর, ১০ মোহরের স্বর্ণমুদ্রা নূরকরম, ২০ মোহরের স্বর্ণমুদ্রা নূরদৌলত, ৫০ মোহরের স্বর্ণমুদ্রা নূরসুলতানী এবং ১০০ মোহরের স্বর্ণমুদ্রা নূরশাহী নামে অভিহিত হয়। ১/২ মোহরের স্বর্ণমুদ্রা নূরানী ও ১/৪ মোহরের স্বর্ণমুদ্রা ‘রওয়াজি’ নামে অভিহিত হয়। ‘তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরী’ বা ‘জাহাঙ্গীরনামা’ গ্রন্থে তিনি এর উল্লেখ করেছেন। জাহাঙ্গীরের নির্দেশে, তাঁর বৃহদাকার ১০, ২০, ৫০ ও ১০০ মোহরের স্বর্ণমুদ্রাগুলির উপর লেখা হত তাঁর সভাসদ আসফ খানের রচিত একটি ফার্সী বয়েৎ, যার অর্থ, “এই স্বর্ণের উপর অদৃষ্টের কলম আলোকের অক্ষরে লিখেছে শাহ নূর-উদ্দীন জাঁহাগীর।”
জানুয়ারী, ১৬২০ সাধারণাব্দে পারস্যের সুলতান শাহ আব্বাসের দূত জয়নুল বেগ জাহাঙ্গীরের রাজসভায় আসেন। ‘জাহাঙ্গীরনামা’ বা ‘তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরী’ গ্রন্থে জাহাঙ্গীর তাঁকে ১০০ ও ২০০ তোলার মোহর উপহার দেবার কথা লিপিবদ্ধ করেছেন। মারাঠী সেনাপতি উদাজীরামকে একটি ১০০ তোলার মোহর উপহার দেবার কথাও ‘তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরী’তে উল্লেখ রয়েছে। সমসাময়িক ডাচ ভৌগোলিক ও লেখক ইয়োহানেস দেলায়েত, তাঁর ১৬৩১ সাধারণাব্দে লিখিত মুঘল সাম্রাজ্য বিষয়ক গ্রন্থে জাহাঙ্গীরের ১০০ ও ৫০ তোলার সোনার মোহরের উল্লেখ করেছন।

জাহাঙ্গীরের প্রচলিত স্বর্ণমুদ্রাগুলির মধ্যে বিশালতম, ১০০০ মোহরের (অর্থাৎ ১০০০ তোলার) একটি মুদ্রা আজও সবার বিস্ময় আকর্ষণ করে। জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালের অষ্টম বর্ষে (১০২২ হিজরী সন = ১৬১৩ সাধারণাব্দ) আগ্রার টাঁকশালে নির্মিত ১১.৯৩৫ কিলোগ্রাম ওজনের ও ২০.৩ সেমি. ব্যাসের এই স্বর্ণমুদ্রাটি সম্ভবতঃ পৃথিবীর সর্ববৃহৎ স্বর্ণমুদ্রাগুলির একটি। ‘তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরী’ গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, জাহাঙ্গীর ২৮ মার্চ, ১৬১৩ সাধারণাব্দে এই মুদ্রাটি ইরানের রাজদূত ইয়াদগার আলিকে দান করেন। ‘ইকবালনামা-ই-জাহাঙ্গিরী’ গ্রন্থেও এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। দীর্ঘদিন এই মুদ্রাটির অস্তিত্বের কোন সন্ধান পাওয়া যায় নি। অবশেষে, ৯ নভেম্বর, ১৯৮৭ সালে সুইজারল্যান্ডের জেনিভায় এই মুদ্রার তৎকালীন অজ্ঞাতপরিচয় অধিকারী একটি নিলামে বিক্রয়ের জন্য দেবার পর এই অসামান্য মুদ্রাটি সাময়িকভাবে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু, ঐ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি মুদ্রাটি নিলামের সর্বোচ্চ ডাকের মূল্যে বিক্রয় করতে রাজি না হওয়ায়, মুদ্রাটি ঐ নিলামসংস্থা বিক্রেতার কাছে ফিরিয়ে দেয় এবং মুদ্রাটি কোন একটি সুইস ব্যাঙ্কের ভল্টে রাখা হয়। এরপর এই মুদ্রাটি আর কখনও প্রকাশ্যে আসে নি। জাহাঙ্গীরের এই বৃহত্তম স্বর্ণমুদ্রার বর্তমান অবস্থান রহস্যাবৃত।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


রাশিচক্র স্বর্ণমুদ্রা:
আকবর প্রচলিত তারিখ-ই-ইলাহী সৌর পঞ্জিকায় ১২টি মাস ছিল। এই সূর্যের ১২টি সৌরমাস রাশিচক্রের ১২টি রাশিতে অবস্থানের ভিত্তিতে গণনা করা হত। জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালের প্রথম দিকের মুদ্রায় হিজরী সনের সঙ্গে তারিখ-ই-ইলাহী পঞ্জিকার সৌরমাসের নামও উল্লেখ করা থাকত। কিন্তু, রাজত্বকালের ত্রয়োদশ বর্ষে (১০২৭ হিজরী সন = ১৬১৮ সাধারণাব্দ) জাহাঙ্গীর নতুন ধরণের মুদ্রার প্রচলন করেন। তিনি সৌরমাসের নামের পরিবর্তে ঐ মাসের রাশির চিত্রখোদিত স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা প্রচলন করেন। এই মুদ্রাগুলির অধিকাংশ আগ্রার টাঁকশালে নির্মিত। ‘তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরী’র একটি পাণ্ডুলিপিতে জাহাঙ্গীরের এই রাশিচক্র মুদ্রা প্রচলনের সিদ্ধান্তের বর্ণনার সঙ্গে স্বর্ণমুদ্রাগুলির চিত্র অঙ্কিত রয়েছে। রাশিচক্র স্বর্ণমুদ্রা জাহাঙ্গীরের জীবনাবসানের স্বল্পদিনের মধ্যেই দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছিল। রাশিচক্র স্বর্ণমুদ্রাগুলির প্রতি সংগ্রাহকদের আকর্ষণের কারণে বহু নকল মুদ্রা পরবর্তীকালে নির্মাণ করা হয়েছে।
প্রতিকৃতি স্বর্ণমুদ্রা:
জাহাঙ্গীর, সম্ভবতঃ ভারতের মধ্যযুগের মুসলিম শাসকদের মধ্যে বিরলতম ব্যক্তিত্ব, যিনি তাঁর স্বর্ণমুদ্রায় নিজের প্রতিকৃতি খোদাই করেছিলেন। ১৬০৫ সাধারণাব্দে সিংহাসনে আরোহণের পর প্রথম তিনি তাঁর পিতা আকবরের প্রতিকৃতি খোদাই করে এক মোহরের স্বর্ণমুদ্রা প্রচলন করেন। এর পর, তিনি রাজত্বকালের ষষ্ঠ বর্ষে (১০২০ হিজরী সন = ১৬১১ সাধারণাব্দ) এই প্রতিকৃতিযুক্ত স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন করেন। এই মুদ্রাগুলির এক পিঠে জাহাঙ্গীরের প্রতিকৃতি ও অন্য পিঠে মুঘল রাজকীয় প্রতীক, একটি সিংহের উপর সূর্য অঙ্কিত ছিল। জাহাঙ্গীরের মাথার পিছনে একটি জ্যোতির্বলয় অঙ্কিত হয়েছিল। জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালের নবম বর্ষ পর্যন্ত এই প্রতিকৃতি স্বর্ণমুদ্রা নির্মিত হয়। জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালের ষষ্ঠ থেকে অষ্টম বর্ষ পর্যন্ত প্রতিকৃতি স্বর্ণমুদ্রাগুলি কোথায় নির্মিত হয়েছিল জানা যায় নি। এই মুদ্রাগুলির উপর একটি ফার্সী বয়েৎ লেখা রয়েছে:
“ক়জ়া বর সিক্কা জ়র কর্দ তসবির।
শবীহ্ হজ়রত শাহ জাঁহাগীর।”
[অনুবাদ: “অদৃষ্ট এই স্বর্ণের উপর শাহ জাঁহাগীরের প্রতিকৃতি অঙ্কন করেছে”।]
নবম বর্ষে (১০২৩ হিজরী সন = ১৬১৫ সাধারণাব্দ) প্রচলিত প্রতিকৃতি স্বর্ণমুদ্রা আজমের টাঁকশালে নির্মিত হয়েছিল। নবম বর্ষে প্রচলিত স্বর্ণমুদ্রায় এক পিঠে জাহাঙ্গীরের উপবিষ্ট প্রতিকৃতি ও অন্য পিঠে কেবল সূর্যের ছবি আঁকা হয়েছে এবং একটি ফার্সী বয়েৎ যোগ করা হয়েছে:
“হরুফ় ‘জাঁহাগীর’ ওয়া ‘আল্লাহু আকবর’।
জ় রোজ় অজ়ল দর অদদ্ শুদ বরাবর।”
[অনুবাদ: সৃষ্টির প্রথম দিন থেকেই ‘জাঁহাগীর’ ও ‘আল্লাহু আকবর’ উভয় শব্দেরই অক্ষরগুলির সংখ্যাগত মান একই।]

প্রতিকৃতি স্বর্ণমুদ্রাগুলিও সম্ভবতঃ মুঘল অভিজাতবর্গকে উপহার দেবার জন্য নির্মিত হত।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com


নূরজাহানী স্বর্ণমুদ্রা:
জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালের ঊনবিংশ বর্ষে (১০৩৪ হিজরী সন = ১৬২৪ সাধারণাব্দ) মুঘল সম্রাজ্ঞী নূরজাহান কার্যতঃ সমস্ত ক্ষমতা অধিকার করে নেন। এই বছর থেকে নূরজাহান বাদশা বেগমের নাম খোদিত স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন শুরু হয়। আগ্রা, আহমদাবাদ, আকবরনগর(রাজমহল), ইলাহাবাদ, কাশ্মীর(শ্রীনগর), লাহোর, পাটনা ও সুরতের টাঁকশালে এই স্বর্ণমুদ্রাগুলি নির্মিত হয়েছিল। এই মুদ্রার উপর লেখা ছিল ফার্সী বয়েৎ:
“ব হুকম শাহ জাঁহাগীর ইয়াফ়ত সদ জ়েবর।
জ়ি নাম নূরজাঁহা বাদশাহ বেগম জ়র।”
[অনুবাদ: শাহ জাঁহাগীরের আদেশে স্বর্ণ শতগুণ সৌন্দর্য পেল, যখন, নূরজাঁহা বাদশাহ বেগমের নাম তার উপর লেখা হল।]
নূরজাহানের নামাঙ্কিত রাশিচক্র স্বর্ণমুদ্রাও প্রচলিত হয়েছিল। এই স্বর্ণমুদ্রা অবশ্য বর্তমানে অত্যন্ত দুস্প্রাপ্য। শাহজাহান ক্ষমতাসীন হয়েই নূরজাহানী স্বর্ণমুদ্রা বাতিল করে সমস্ত মুদ্রা গলিয়ে ফেলতে নির্দেশ দেন। কেউ এই স্বর্ণমুদ্রা বিনিময় করলে, তার মৃত্যুদণ্ড হবে বলে তিনি ঘোষণা করেন।
কথাশেষ:
মুঘল আমলের ভারতে, বিশেষ করে জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে, মুখ্য বিনিময়ের মাধ্যম ছিল রৌপ্যমুদ্রা রুপয়া। অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনের জন্য মুদ্রার পরিবর্তে কাগজে লেখা হুন্ডিও ব্যবহার করা হত। সাধারণ প্রজারা বিনিময় বা বেতনের জন্য তামার দাম বা দামরি মুদ্রা ব্যবহার করতেন। জাহাঙ্গীরের প্রচলিত স্বর্ণমুদ্রা মূলতঃ সাম্রাজ্যের অভিজাতবর্গ এবং বিদেশী রাষ্ট্রদূতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
তথ্যসূত্র:
১. Bruce, C.R., Deyell, J.S., Rhodes, N. and Spengler, W.F. (ed.)(1981). The Standard Guide to South Asian Coins and Paper Money since 1556 AD. Iola: Krause Publications.
২. Devdas, D., Khindaria, B. and Menon, A.K. (1987). “Rare Mughal coins put up for auction in Switzerland, Indian Government tries to get back” in India Today, December 15, 1987.
৩. Gupta, P.L. (1969). Coins. New Delhi: National Book Trust.
৪. Hodiwala, S.H. [1976](1923). Historical Studies in Mughal Numismatics. Bombay: The Numismatic Society of India.
৫. Lane-Poole, S. (1892). The Coins of the Moghul Emperors of Hindustan in the British Museum. London: Trustees of the British Museum.
৬. Rajgor, D. (2002). Collector’s Guide to Mughal Coins. Mumbai: University of Mumbai, Dinesh Mody Numismatic Museum.
৭. Rodgers, C.J. (1889). “Couplets or ‘Baits’ on the coins of Sháh Nuru-d-dín Jáhángír, the son of Akbar” in Journal of the Asiatic Society of Bengal, Vol. LVII, Part I, Calcutta: Asiatic Society. pp.18-26.
৮. Thackston, W.M. (ed.)(tr.)(1999). The Jahangirnama: Memoirs of Jahangir, Emperor of India. New York: Oxford University Press.
৯. Whitehead, R.B. (1914). Catalogue of Coins in the Panjab Museum, Lahore, Vol. II, Coins of the Mughal Emperors. Oxford: Clarendon Press.
১০. Whitehead, R.B. (1929). “The Portrait Medals and Zodiacal Coins of the Emperor Jāhāngīr, Part I: The Portrait Medals” in The Numismatic Chronicle and Journal of the Royal Numismatic Society, Fifth Series, Vol. IX. London: Bernard Quaritch. pp. 1-25.
১১. Whitehead, R.B. (1931). “The Portrait Medals and Zodiacal Coins of the Emperor Jāhāngīr, Part II: The Zodiacal Coins” in The Numismatic Chronicle and Journal of the Royal Numismatic Society, Fifth Series, Vol. XI. London: Bernard Quaritch. pp. 91-130.
১২. Wright, H.N. (1908). Catalogue of the Coins in the Indian Museum, Calcutta, Vol. 3, Mughal Emperors of India. Oxford: Clarendon Press.
আরও জানার জন্য:
১. Liddle, A. (2013). Coins of Jahangir: Creations of a Numismatist. New Delhi: Manohar Publishers and Distributors.
২. Thakur, A.S. (2006). Coins of Jahangir. Nagpur: Indian Coin Society.

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত