| 17 এপ্রিল 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

করোনা কালের পশুপাখি সভা

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

শাকবাড়িয়া নদীর ধারে আলোচনা শুরু হয়। অত্যাধিক গুরুত্বপূর্ণ সেই আলোচনার মধ্যে শেয়াল পন্ডিত মশাই বলে বসে, উস্তাদ আমার একখান কথা। কথাখান হইলো আমাগো সাথে প্রতিপক্ষ সুলভ আচরন কইরা আসতাছে বহুকাল ধইরা কুকুর। মানুষ জাতের সব থেইকা কাছের হইলো ওরা। ফলে লোকালয়ের জমিন দখলে গেলে মুশকিল। সভা প্রধান বাঘ মামা তার বৃদ্ধ এবং ভারী গলার স্বরে বলে, পন্ডিত আমাগো আশার বিষয়ডা ঐখানে। বুঝলানা মনে হয়! তোমার বুদ্ধি খান আরো ভালো থাকা দরকার ছিলো। উস্তাদ বুদ্ধি আরো একটু ভালো থাকতো কিন্তু ঐযে মানুষ জাত জঙ্গলে আইসা তাড়ায়। বাগানের মধ্যেও শান্তি নাই সেই খানে আইসাও জালায়। কাজেই দৌড়ের উপর থাকতে হয়। একটু কিতাব-কায়দা পইড়া বুদ্ধির কলকাঠি ঠিক রাখনের মতো সুযোগ হয়না। আর মানুষ জাতের এই তাড়া খাইয়া দৌড়ের উপর থাকার ফলে সভা সমিতিতে বসা হয় কম। তাই বুদ্ধি… বাঘ মামা বলে থামো পন্ডিত, আমার কথা শেষ করি। শোন আমাদের আশার বিষয় শোন। মানুষ জাত পড়ছে মহা বিপদে। করোনা ভাইরাসে এ্যাটাক করছে মহামারি শুরু হইছে বুঝলা। তাই নিজেগো খানা-খাদ্যের ব্যাবস্থা নাই আর কুকুরগো দিবো কেমনে। তাই ভুখা কুকুর গুলা আমাদের পথ-ঘাট বাতলে দিবে। এই সভায় শহরের একজন প্রতিনিধি কুকুর উপস্থিত আছে। তার মুখ থেইকা সার্বিক পরিস্থিতি জানুম। কুকুরটা যখন পাশথেকে উঠে বাঘ মামার পাশে গিয়ে দাড়ালো। তখন পশুপাখি সভায় পশুদের মধ্যে একটা নাড়াচাড়া গুঞ্জন শুরু হয়। যারা পেছনের দিকে ছিলো তারা সামনে ঝুকে আসতে চায়। শহরের মেয়ে কুকুরটা কে দেখতে। 

প্রতিনিধি মেয়ে কুকুরটা বলে, প্রিয় পশুপাখি সমাজ আমরা বহুকাল ধইরা মানুষ জাতের কাছাকাছি থাইকা আসতাছি। আমরা তাদের বিপদ আপদেরও সঙ্গী ছিলাম। মানুষ জাতের মধ্যেও শ্রেণী বিভাজন বেশি। কেউ ধনী তো কেউ গরীব, কেউ চোর কেউ ডাকাত। আরো হরেক রকম আছে। কাউরে চোরের হাত থেইকা বাচাইছি কাউরে ডাকাত থেইকা। আমরা তাদের উচ্ছিষ্ট খাইয়া জীবন বাচাইতাম। কিন্তু মানুষ জাত বড়ই অদ্ভুত কিসিমের মাল। এরা নিজেগো প্রভু বানাইতে আমাগো হত্যা করার জন্য কর্পোরেশনের এক শ্রেনীর মানুষে কামে রাখছে। যাই হক পশুপাখি সমাজ শোন। আইজ মানুষ জাত করোনার ভয়ে ঘর বন্ধী হইছে। যাও কিছু উচ্ছিষ্ট খাইয়া থাকতাম অহন সে উপায়ও নাই। মানুষ জাত সৃষ্ট জীব বইলা দাবি করে নিজেগো। অহন দেহি কোথায় গিয়া কি দাড়ায়। সময় যহন আমাগো দিগে আইতাছে। আমরা সবাই একত্রে লোকালয় দখলের দিকে আগাইতে পারি। 

সভার গাছ গুলোতে আসন নেয়া বানরদের মধ্যে একজন বলে ওঠে, উস্তাদ এসব তো শুনলাম বিবাদের কথা। কিন্তু আমাদের অপবাদ! মামা বাঘ বলে, সে কি বিষয় বাবা বানর কও শুনি। 

উস্তাদ মানুষ জাত বড়ই মিথ্যাচার করে। কি এক প্রবাদে কয় ‘মনের দুঃখে বনে গেলাম বানরে কয় হোল টেপ’। এই যে অপবাদ কান্ধে লইয়া আমাগো পূর্বপুরুষ এবং আমরা চলতাছি। আছে কোন বিচার! থাকবো কেমনে দেওনের যায়গা খানতো নাই। তাই উস্তাদ অহন সময় আমাগো তাই লোকালয় দখলে গ্যালে অনুরোধ উস্তাদ। মানুষ জাতের কয়ডারে খাচায় রাইখা হোলডা টেপাবো নিয়ম কইরা সকাল-বিকাল অনুমতি চাই। 

পাখি সমাজের মধ্যে থেকে কাক বলে ওঠে, উস্তাদ এইসব অপবাদ যদি আইজ সভায় আলোচনা হয় তাইলে আমাগো একখান দুঃখের কথা আছে। সভা প্রধান বাঘ মামা বলে, বলো তোমরাও মানুষ জাতের কাছাকাছি থাকো। আইজ তোমাগো বলার সুযোগ দেয়া হইলো। 

সুযোগ পেয়ে কাক বলে, উস্তাদ আমাগো আইজ পাখি সমাজের লগে বইসা নিজেগো অস্তিত্ব ফিরা পাইছি পাইছি লাগে। ময়লা-আবর্জনা খাইয়া জীবন বাচাইছি। মানুষ জাতের পরিবেশ রক্ষা করছি। বিনিময়ে পাইছি ধিক্কার আমাগো পাখি বইলা শিকার করে নাই। পাখির কাতার থেইকা আলাদা কইরা রাখছে। সেই দুঃখে মাঝে মধ্যে হাইগা দিছি গায়ে-মাথায়। তয় বেজায় গাইল মন্দ করছে। উস্তাদ আমাগো আরজি আপনারা মানুষ জাতরে যহন পরাস্ত কইরা ফালায়া দিবেন। ওঠনের কায়দা একদম বন্ধ হইলে অনুমতি দিবেন। আমরা একটু আয়েশ কইরা মানুষ জাতের গায়-গতরে হাইগা দিমু।  

বাঘ মামা বলে, বিবেচনায় থাকলো বিষয়খান। তয় মানুষ জাতের উপর কারো অভিযোগ আছে, কারো নাই। কিন্তু আমাগো যে বসবাসের যায়গা এই জঙ্গল। হেইডা দখল করছে তাতে কোন ভুল নাই। সব ফিরাইয়া আনতে চাই এইখানে আমাগো মত এক।  তাই আমাগো মূল আলোচনা হইলো এ্যাটাকে যাইতে হবে। কোন ভাবে যাইতে হবে সেই ব্যাপারে ফন্দি ফিকির করো। কুকুর আর কাক আমাগো পথ-ঘাট সাথে মানুষ জাতের দূর্বল যায়গা গুলা এবং মোক্ষম সময়ডা জানাইবো। শিয়াল পন্ডিত বলে, উস্তাদ আমার আর একখান কথা। কথাখান হইলো আমার মনে হয় একটা টোপ ফালাই আগে। আমাগো ব্রাদার হরিনগো পাঠাই আগে তারপর আমরা এ্যাটাকে যামু। সভা প্রধান বাঘ মামা বলে, আচ্ছা এইডাও বিবেচলায় থাকলো। আইজ আর না অন্য একদিন বসুম আলোচনা এই খানে শ্যাষ। 

২. 

লকডাউনের মধ্যে মৃদুলের কাজ দুই। নাম্বার এক. খাওয়া নাম্বার দুই. ঘুম। ঘুমের আগে-পরে মনযোগ দিয়ে ঠুমরী, টপ্পা শোনা। খাওয়ার আগে পরে অনলাইনে খবর পড়া। দুপুরের খাওয়ার আগে মৃদুল তার খবর পড়া কাজটাই সে করছে। একটা খবরে চোখ আটকালো। খবরটা হলো, সুন্দরবন সংলগ্ন শাকবাড়িয়া নদী। সেই নদী পার হয়ে বনের হরিন গ্রামে ঢুকে পড়েছে… 

মৃদুল তখন ভাবছে তা হলে পশুপাখি সমাজের বাকি আলোচনা কি হয়ে গেছে! কিন্তু কখন… আর হয়ে থাকলে আমাদের অস্তিত্ব নিশ্চয়ই হুমকির মুখে! তাহলে কি পশুরা… না আরো অপেক্ষা করি… 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত