| 3 মার্চ 2024
Categories
ধারাবাহিক লোকসংস্কৃতি

নারী পুরুষের মিলন কাহিনী (পর্ব-১৩)

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

বিবাহ  মানব সমাজের প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান। যুগে যুগে প্রতিষ্ঠানটি এর আদি রূপ থেকে বর্তমান কাঠামোয় উপনীত হয়েছে। বিবাহপ্রথাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে প্রধানত ধর্ম। বিয়েসংক্রান্ত সকল নিয়মকানুন বিধিবদ্ধ হয়েছে ধর্মীয় অনুশাসনে। প্রাচীনকাল থেকে বাংলায় ধর্মীয় শাস্ত্রের বিধানই ছিল সামাজিক আইন, ধর্মীয় আইনের দ্বারাই শাসিত হতো সমাজ-সংসার। ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় আইনের পাশাপাশি লোকজ সংস্কৃতিও বৈবাহিক জীবনকে প্রভাবিত করেছে নানাভাবে। মনুস্মৃতি এবং অর্থশাস্ত্রে আট প্রকারের হিন্দু-বিবাহ পদ্ধতির উল্লেখ আছে। ‘ব্রাহ্ম’, ‘দৈব’, ‘আর্য’, ‘প্রজাপত্য’, ‘অসুর’, ‘রাক্ষস’, ‘পৈশাচ’ ও ‘গান্ধর্ব’ এই আট ধরনের বিবাহের মধ্যে ব্রাহ্ম বিবাহই শুধু গ্রহণযোগ্য ছিল। দায়ভাগ গ্রন্থে জীমূতবাহন উল্লেখ করেছেন যে, ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রজাপত্য এবং গান্ধর্ব বিবাহ অনিন্দনীয়। ধর্মশাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী নিজ বর্ণের মধ্যে বিবাহ ছিল সাধারণ নিয়ম। সবর্ণে বিবাহ উৎকৃষ্ট হলেও মনু ব্রাহ্মণ পুরুষকে নিজ বর্ণ ছাড়া নিম্নতর তিন বর্ণে বিবাহের অধিকার দিয়েছিলেন। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে, যেমন চন্ডীমঙ্গলে, মুসলমানদের নিকা বিবাহের কথা বলা হয়েছে। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, এমনকি বিশ শতকেও মুসলমানদের মধ্যে বহুবিবাহ ব্যাপক হারে প্রচলিত ছিল। উচ্চশ্রেণীর অবস্থাপন্ন মুসলমানদের একাধিক স্ত্রী থাকত। বিশ শতকের শুরুতে কুলীনদের বাইরে হিন্দু সমাজে বহুবিবাহ তেমন প্রচলিত ছিল না। বিয়ের এমন অনেক জানা অজানা বিষয়ে আলো ফেলেছেন ড. রোহিণী ধর্মপাল তাঁর এই ধারাবাহিক ‘নারী-পুরুষের মিলন কাহিনী’-তে। আজ থাকছে নারী-পুরুষের মিলন কাহিনীর ১৩ পর্ব।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

হ্যাঁ। কুন্তী ছিলেন কৃষ্ণের পিসী। অর্থাৎ কৃষ্ণ বলরাম হলেন অর্জুনের মামাতো ভাই আর সুভদ্রা মামাতো বোন। চিত্রাঙ্গদা আর বভ্রুবাহনকে ছেড়ে অর্জুন ভারতের পশ্চিম প্রান্ত ঘুরতে ঘুরতে গিয়ে পৌঁছলেন প্রভাস তীর্থে। সেখানে মহানন্দে দুই ভাই, যাঁরা ভীষণ ঘনিষ্ঠ বন্ধুও,  আড্ডায় দিন কাটাতে লাগলেন। ক’দিন পরে, প্রভাসতীর্থের কাছেই, রৈবতক পর্বতে ভোজ বৃষ্ণি আর অন্ধক বংশের এক উৎসব শুরু হল, যেখানে নারী পুরুষ নির্বিশেষে মেতে উঠল নানাবিধ আনন্দে। সেইখানেই অর্জুন প্রথম মামাতো বোনটিকে দেখলেন এবং অন্য সব কিছু ভুলে তাঁর মন সুভদ্রা নাম জপতে লাগল। কৃষ্ণের তো প্রেমের অগাধ অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার, তাঁর অর্জুনের অবস্থা বুঝতে এতটুকু দেরী হল না । বরং মিটিমিটি হাসতে হাসতে তিনি বললেন, বনেচরস্য কিমিদং কামেনালোড্যতে মনঃ। বনেচর মানুষের মনটিতে মনে হচ্ছে কাম জেগেছে!!! অর্জুন যখন শুনলেন সুভদ্রার পরিচয়, কৃষ্ণকেই ধরে বসলেন। হে কৃষ্ণ, তুমিই একটা উপায় বার করো বাপু, প্রাপ্তৌ তু ক উপায়ঃ। কৃষ্ণ জানতেন সোজা পথে এ বিয়ে হওয়া মুশকিল, তাই তিনি প্রথমেই ব্যাঁকা পথটি ধরিয়ে দিলেন। বললেন স্বয়ংবর হলে সুভদ্রা তোমাকেই বাছবেন, তার কোন নিশ্চয়তা নেই হে পার্থ। সুতরাং আমার বোনটিকে তুমি নির্দ্বিধায় হরণ কর। বিয়ের উদ্দেশ্যে এই বলপূর্বক কন্যাহরণ বা রাক্ষস বিবাহে তো কোনো সমস্যা নেই।
এদিকে অর্জুনের সেই বারো বছরের বনবাসপর্ব শেষ হতে চলেছে। সুভদ্রাকে সঙ্গে নিয়ে ইন্দ্রপ্রস্থেই ফিরতে হবে। অন্য উপায় নেই। অপহরণের ব্যাপার তো! তাই অর্জুন চুপিচুপি দ্রুতগামী  অশ্বে লোকের মাধ্যমে যুধিষ্ঠিরের অনুমতিও আনিয়ে  নিলেন। কৃষ্ণ স্বয়ং সেই রথ পর্যন্ত তৈরি করিয়ে দিলেন, তাতে জুড়ে দিলেন শৈব্য ও সুগ্রীব নামে দুই তেজি ঘোড়া আর রথে রইল প্রভূত অস্ত্রশস্ত্র। কী দাদা ভাবুন একবার! বোনের kidnapping এর ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন! অর্জুনও একেবারে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে  সেই রথে উঠে এগোলেন।
সুভদ্রা কিন্তু  এতসব  পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছুই জানেন না। তিনি তো সেজেগুজে রৈবতক পর্বতের পুজো সেরে দ্বারকায় ফেরার জন্য পা বাড়িয়েছেন, হুড়মুড়িয়ে অর্জুনের রথ এসে পড়ল তাঁর সামনে আর অর্জুন তাঁকে জোর করে সেই রথে তুলে ইন্দ্রপ্রস্থের দিকে রওনা হলেন।
 চারপাশের সৈন্যসামন্ত যারা ছিল, সব ছুটল সভাপালের কাছে, তিনি সঙ্গে সঙ্গে  যুদ্ধের ভেরী বাজিয়ে দিলেন। আর চারিদিক থেকে পানভোজে মেতে থাকা বৃষ্ণি ভোজ আর অন্ধক পুরুষেরা ছুটে এলেন। আর মহাকলরবে সব যুদ্ধের জন্য তৈরি হলেন। এলেন বলরামও। কৃষ্ণ তো ছিলেনই । জানতেন পরিস্থিতি ঠাণ্ডা তাঁকেই করতে হবে। বলরাম কিন্তু যথেষ্ট রাগ দেখালেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় এই বীর ভাইকে অত্যন্ত ভালোবাসা মানুষটি দেশভ্রমণে বেরিয়ে গেছিলেন। কারণ দুর্যোধন তাঁর প্রিয়তম ছাত্র ছিলেন আর অর্জুনের প্রতি তাঁর মনে ক্ষোভ ছিল। ভীমের প্রতিও, জরাসন্ধ বধে ভীম তো যুদ্ধের নিয়ম পালন করেন নি। কিন্তু যেহেতু কৃষ্ণ পাণ্ডবদের পক্ষে, তাই তিনি ভাইয়ের বিরোধিতা করতেও পারবেন না, তাই দুর্যোধনের পক্ষেও থাকতে পারবেন না আর পাণ্ডবদের পক্ষে তিনি নিজেই থাকবেন না; ফলে কুরুক্ষেত্রের ধারেকাছেই তিনি রইলেন না। 
ভয়ানক রেগে কৃষ্ণকে তিনি বললেন, যে ব্যক্তিকে এত সম্মান এত আদর দেওয়া হল, সেই এমন করল!  এ তো যে থালায় খাচ্ছিল, সেই থালাই ফুটো করল, কো হি তত্রৈব ভুক্ত্বান্নং ভাজনং ভেত্তুম্ অর্হতি! এই লোক তো আমার মাথায় পা দিয়েছে। আমি কিছুতেই মেনে নেব না এই অপমান!
কিন্তু কৃষ্ণ তো তা হতে দিতে পারেন না। আবার এই সবটাই যে তাঁরই পরিকল্পনা প্রায়, মানে অর্জুনের প্রেমে পড়াটা জানার পর থেকে, তাও কাউকে জানাতে পারছেন না।  তিনি তখন অকাট্য সব যুক্তি দিতে লাগলেন, আর কে না জানেন যে কূটনীতিতে কৃষ্ণের মত কেই বা আছে!!!! তিনি বললেন, দেখো, সব তো বুঝলুম। কিন্তু রূপেগুণে অতুলনীয়া সুভদ্রার যোগ্য বর আর কোথায় আছে অর্জুনের মত? এ তো আমাদের ভাগ্য যে ঘরে বসেই এমন বর পেয়েছি আমরা। আর অর্জুন এমনিতেই অজেয়, তার উপর এখন তার সঙ্গে আছে আমার সবচেয়ে ভালো ঘোড়াজোতা অস্ত্রপূর্ণ রথ! এখন তো সে আরো অপ্রতিরোধ্য । এখন তাকে আক্রমণ করে হেরে গেলে আপনাদেরই বদনাম হবে! আর ভুলে যাবেন না, সে আমাদের পিসতুতো ভাই। ভাইয়ের সঙ্গে, আর এমন যশস্বী ভাইয়ের সঙ্গে কেউ শত্রুতা করে! বরং তাকে মিষ্টি কথায় ফিরিয়ে আনুন আর ধুমধাম করে সুভদ্রার বিয়ে দিন।
 কৃষ্ণেরই জয় হল। বলরাম চুপ করে গেলেন। সুতরাং অন্যদেরও আর যুদ্ধের ইচ্ছা রইল না। আর অর্জুনের বিক্রমের কথা সবাইই জানতেন। সত্যি তো, জেনেশুনে হারতে কেই বা কবে চায়! তাই, শেষ পর্যন্ত অর্জুন-সুভদ্রাকে ফিরিয়ে আনা হল। বনবাসের বাকি দিনক’টা কাটিয়ে সুভদ্রাকে নিয়ে অর্জুন রওনা হলেন ইন্দ্রপ্রস্থের দিকে। 
বুকের মধ্যে কিন্তু ঢেঁকির পাড়। কারণ এত বছর পর আবার কৃষ্ণা দ্রৌপদীর সঙ্গে দেখা হবে, আর সঙ্গে সুভদ্রা!!! না জানি দ্রৌপদী কি বলবেন, কি ভাববেন!!!!

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

চারটি বিয়ে অর্জুনের। না না, তিনটি। কারণ উলূপী যে অর্জুনকে বিয়ে করেছিলেন, তা তো কোথাও লেখা নেই। সারারাত সাধ মিটিয়ে রমণ করেন দুজন এবং ছাড়াছাড়ি হয়। অর্থাৎ সেখানে অর্জুন এক রাত কি সুহাগ!!! সব সময় পুরুষের দৃষ্টিকোণ দিয়েই দেখা হয় এই ধরণের ঘটনাগুলো। যেন মেয়েটিকে ভোগ করে পুরুষটি চললেন! এখানে স্পষ্ট অর্জুন উলূপীর শয্যাসঙ্গী হয়েছিলেন। উলূপীর কামেচ্ছাই এখানে প্রধান। এই রকম উদাহরণ রামায়ণেও আছে। সেখানে অবশ্য সন্তানকামনা প্রধান ছিল। কিন্তু তাও এখনকার নিরিখেও আশ্চর্য ঘটনা। রামায়ণের আদিপর্বেই এই অদ্ভুত কাহিনীটি আছে।  
চূলী নামে এক ব্রহ্মচারী ছিলেন। তাঁর সাধনভজনে সাহায্য করতেন সোমদা নামে এক গন্ধর্ব-কন্যা। কিছুদিন পর চূলী খুব সন্তুষ্ট হয়ে সোমদাকে বর দিতে চাইলেন। সোমদা তাঁর থেকে এক ধার্মিক পুত্র চাইলেন। কিন্তু সঙ্গে স্পষ্ট করে বলে দিলেন যে আমি আজ পর্যন্ত বিয়ে করিও নি, আর ভবিষ্যতেও করব না। আমি শুধু মা হতে চাই। single mother এর ধারণাটা কত প্রাচীন দেখুন একবার! দত্তক নেওয়া নয়, একজনের সঙ্গে শরীরী মিলনের ফলে স্বাভাবিক ভাবে যে সন্তান আসে, তেমন ভাবে সন্তান চাইছেন, অথচ বিয়ের বন্ধনে যেতে চাইছেন না তা একেবারে পরিষ্কার! এবং তেমনটিই হল। চূলীর ঔরসে এক পুত্র সন্তান জন্মালো সোমদার, তিনি নাম রাখলেন ব্রহ্মদত্ত। পরবর্তীকালে এই ব্রহ্মদত্তের সঙ্গে নিজের একশ কন্যার বিয়ে দেন মহারাজা কুশনাভ আর বধূদের পেয়ে ভীষণ খুশি হন সোমদা। অর্থাৎ এই একা মায়ের ছেলেকে তো সমাজ সাদরে গ্রহণ করেইছিল, মা-কেও।
মিলনের রকমফেরগুলো দেখছি আর চোখ কপালে উঠছে নিজেরই। সবচেয়ে অবাক হচ্ছি আর ভালো লাগছে এটা দেখেই, যে মেয়েদের ইচ্ছে প্রকাশ কতখানি স্বাভাবিক ভাবে করার সুযোগ ছিল! এমনকী মিলনের জন্য বিয়েটা আবশ্যিকও নয়!!! যদিও এই ধরণের উদাহরণ ভুরি ভুরি নেই আর হয়ত সামাজিক পরিকাঠামো বজায় রাখতে তা কাম্যও নয়; কিন্তু পুরো ব্যাপারটা অসম্ভবও ছিল না।
উলূপী হল। তার পর চিত্রাঙ্গদা। এখানে বিয়ে হল। কিন্তু ঘরজামাই হয়ে থাকার শর্তে temporary বিয়ে। সঙ্গে আরো একটা শর্ত।  সন্তান সম্পর্কে। বলেছি সে কথা আগেই। তবে এখানে না বললেই নয় একটা কথা। আমরা খুব নিন্দা করি বিয়ের আগে ভাবী বধূর রূপ নিয়ে নানারকম চর্চা হয় বলে। একইভাবে ভাবী শ্বশুরবাড়ি আর স্বামীর টাকাপয়সার ঝুলিটিও দেখে নেওয়া হয় কিন্তু! দুই ক্ষেত্রেই, রূপ আর টাকার বোঝায় চাপা পড়ে যায় গুণ, মনের ইচ্ছে-অনিচ্ছেগুলো। আর এত স্বাধীন হয়েছি, কিন্তু বিয়ের পরে কোনো কারণে ছেলেটি যদি এসে শ্বশুরবাড়ি থাকে, তো ফিসফিসানি হিসহিসানি শুরু হয়ে যায়! কেন, সবসময় মেয়েকেই শ্বশুরবাড়ি যেতে হবে, এই প্রথাটিকে ভঙ্গ করে যদি ছেলেটি আসে শ্বশুরবাড়ি, মেনে নিতে অসুবিধা কোথায়??? তার মানে বড় বড় কথাগুলো শুধু মুখেই। অর্জুনের মত সর্ব অর্থে পুরুষের মত একজন পুরুষের কিন্তু চিত্রবাহনের সমস্যা বুঝতে আর কিছুদিনের জন্য ঘরজামাই হয়ে থাকতে কোনো আপত্তি হয় নি!!!
 তিন নম্বরটি রাক্ষস বিবাহ অর্থাৎ ক্ষত্রিয় পুরুষটি পছন্দের কন্যাকে জোর করে হরণ করবে। সুভদ্রার ক্ষেত্রে সেই রাক্ষস বিয়ে। শুধু সাধারণ রাক্ষস বিয়ে নয়, পিসতুতো দাদার দ্বারা হরণ আর তাকে বিয়ে করা!!! আর পরিকল্পনা করে দিচ্ছে কে??? না, কনের দাদাটি!!! মানে পরতে পরতে চমক আর নাটক!!
 এবার শুরুর বিয়ে, প্রথম বিয়েতে আসি। অগ্নিসম্ভূতা তেজস্বিনী কৃষ্ণা দ্রৌপদী। মহাভারতের মূল নায়িকা। যেমন গুণ তেমন রূপ তেমন সাহস তেমন পরিশ্রমী তেমন তার্কিক তেমন সর্বংসহা । আগুনের মতোই জীবন । সর্বদা দাউদাউ করে জ্বলছে। কখনো প্রেমে কখনো লাঞ্ছনায় কখনো তেজোময়তায় কখনো বিরহে। সেই দ্রৌপদীর সঙ্গে যুক্ত হলেন অর্জুন। আবার বলা যায় যুক্ত হয়েও আলাদাই রইলেন।  একই সঙ্গে প্রেম আর বিচ্ছেদের কাহিনী।
দ্রৌপদীর জন্মের কাহিনী তো সকলেরই জানা। তাই সোজা চলে যাই স্বয়ংবর সভায়; যেখানে পুরো দেশ থেকে রাজপুরুষেরা এসেছেন, দুর্যোধন এসেছেন ভাইদের আর কর্ণকে নিয়ে, অশ্বত্থামা, শকুনি, বিরাটরাজা–যাঁর রাজ্যে পাণ্ডবদের আশ্রয় নিতে হবে অদূর ভবিষ্যতে, কলিঙ্গ তাম্রলিপ্ত মদ্র কম্বোজ থেকে রাজারা, বলরাম কৃষ্ণ প্রভৃতি বৃষ্ণি বংশীয়রা এবং আরো অসংখ্য অগণিত সব লোকজনে গমগম করছে সভা। সেই সভায় ব্রাহ্মণদের সঙ্গে বসে আছেন একচক্রা নগর থেকে আসা পাঁচ ভাই, যাদের দেখেই চিনতে পারলেন কৃষ্ণ। কিন্তু অন্যদের ততক্ষণে আর ঘাড় ঘোরানোর অবস্থা নেই, কারণ সভায় দাদা ধৃষ্টদ্যুম্নের সঙ্গে সভায় প্রবেশ করেছেন মণিখচিত সোনার মালা হাতে নিয়ে সদ্যস্নাতা সুসজ্জিতা দ্রৌপদী।
দ্রৌপদীর প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত সভা যেন উত্তাল হয়ে উঠল! উপস্থিত রাজপুরুষেরা সবাই দ্রৌপদীর দিকে তাকিয়ে, তাঁর রূপের ঝলক দেখে মনে মনে মত্ত হয়ে উঠলেন আর আগুনের দিকে পোকারা যেমন মৃত্যু নিশ্চিত দেখেও ঝাঁপিয়ে পড়তে দ্বিধা করে না, তেমন আসন ছেড়ে উঠে পড়লেন “দ্রৌপদী আমারই হবেন”, এই কথা ভাবতে ভাবতে । কিন্তু উঠে দাঁড়ানো আর মনে মনে দ্রৌপদীকে পাওয়ার কথা ভাবা এক আর দ্রুপদের শর্ত অনুযায়ী ওই মহাধনুকে গুণ পরিয়ে লক্ষ্যভেদ করা আরেক। লক্ষ্যভেদ তো দূর, অধিকাংশ রাজা ওই ধনু তুলতে গিয়ে গলদঘর্ম হয়ে হাল ছেড়ে দিলেন। শিশুপাল যদি বা ধনুটি তুললেন, গুণ পড়াতে গিয়ে সেটি ছিটকে হাঁটুতে এসে এমন লাগল, যে তিনি ওই সভার মধ্যেই হাঁটু ধরে বসে পড়লেন।
একমাত্র শর্তপূরণের কাছাকাছি গেলেন কর্ণ। ধনুটি তুললেন, গুণটি পরালেন, লক্ষ্যটি ভেদ করতে যাবেন; এমন সময় দাদা ধৃষ্টদ্যুম্নের ঘোষণা যে যিনি এই লক্ষ্যভেদ করতে পারবেন, দ্রৌপদী তাঁকেই বরমালাটি পরাবেন, তা উল্লঙ্ঘন করে রীতিমতো জোর গলায় দ্রৌপদী বললেন “আমি সূতপুত্রকে বিয়ে করব না।” এখানে একটা কথা না বলে পারছি না। নারী স্বাধীনতার কী চূড়ান্ত একটা উদাহরণ দ্রৌপদীর এই প্রতিবাদ। যেখানে সর্বসমক্ষে একটা কথা দেওয়া হয়েছে, সেখানে, একটা বিশাল সভার মাঝখানে দাঁড়িয়ে, সেই কথাটি ভাঙা আর অবিচল থাকা সহজ নয় কিন্তু; না, কোনোও পুরুষের পক্ষেও না। সেখানে দ্রৌপদী কারুর কথা না ভেবে, লোকে কি বলবে সে কথা চিন্তা না করে নিজের মনের কথাটি স্পষ্ট করে বলে দিলেন।”না। মতলব না। ” কিছুদিন আগেই মুক্তি পাওয়া অমিতাভ বচ্চন তাপসী পান্নু অভিনীত পিঙ্ক সিনেমাটি আর তার এই মূল বাক্যটি মনে আছে নিশ্চয়ই আপনাদের। মনে রাখা উচিত। সমাজ, এমনকী পরিবারও একজন মানুষের হয়ে সবটা ঠিক করে দিতে পারে না। না বলার অধিকার সবার আছে। একটি মেয়েরও। দ্রৌপদী সেই অধিকারটি প্রয়োগ করলেন, ‘না’ বলার অধিকার। হতে পারে, তোমরা যখন শর্ত তৈরি করেছিলে, তখন এমন কোনো সম্ভাবনার কথা ভাবোও নি। কিন্তু যদি তেমন পরিস্থিতি হয়, তাহলে না বলতে না পারাটাই তো অন্যায়! তাই, সময় থাকতে থাকতে বা শুরুতেই না বলে দিতে পারাটা অনেক ভালো, পরে তিলে তিলে নষ্ট হওয়ার থেকে! সেই শিক্ষা, সেই দৃঢ়তা, সেই সততা, সেই সাহস দ্রৌপদীর ছিল।
 আর সভায় উপস্থিত  একজনও কিন্তু একটা শব্দও বললেন না। একটি মেয়ে, তাকে তার নিজের ভবিষ্যতটা গড়ে তোলার পথে কেউ অন্তরায় হলেন না। এমনকী কর্ণ নিজেও না। রাগ আর ক্ষোভকে একটা নিষ্ফল হাসিতে পরিণত করে সূর্যের দিকে একবার তাকিয়ে  নিজের আসনে বসে পড়লেন। তার পর শিশুপালের কথা তো বলেইছি, একই অবস্থা হল চেদীরাজ জরাসন্ধ আর মদ্ররাজ শল্যেরও, হাঁটু-ভাঙা- দ যাকে বলে!! জরাসন্ধ তো সোজা নিজের রাজ্যে ফিরে দম নিলেন! তাহলে!!! রাজাদের মধ্যে তো আর কেউই বাকি রইলেন না! এমন সময়ে ব্রাহ্মণদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা থেকে উঠে দাঁড়ালেন অর্জুন; যাঁর কাঁধ, উরুদুটি ও বাহুদুটি সিংহের মত বলশালী, দেহে যেন মত্ত হাতীর মত চাপা বিক্রম, অপরূপ সুদর্শন এক যুবাপুরুষ। তাঁর দিকে তাকিয়ে দ্রৌপদীর বুকের ভেতরটা এই প্রথম কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠল।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত