| 5 মার্চ 2024
Categories
ধারাবাহিক লোকসংস্কৃতি

নারী পুরুষের মিলন কাহিনী (পর্ব-২৫)

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট

বিবাহ  মানব সমাজের প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান। যুগে যুগে প্রতিষ্ঠানটি এর আদি রূপ থেকে বর্তমান কাঠামোয় উপনীত হয়েছে। বিবাহপ্রথাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে প্রধানত ধর্ম। বিয়েসংক্রান্ত সকল নিয়মকানুন বিধিবদ্ধ হয়েছে ধর্মীয় অনুশাসনে। প্রাচীনকাল থেকে বাংলায় ধর্মীয় শাস্ত্রের বিধানই ছিল সামাজিক আইন, ধর্মীয় আইনের দ্বারাই শাসিত হতো সমাজ-সংসার। ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় আইনের পাশাপাশি লোকজ সংস্কৃতিও বৈবাহিক জীবনকে প্রভাবিত করেছে নানাভাবে। মনুস্মৃতি এবং অর্থশাস্ত্রে আট প্রকারের হিন্দু-বিবাহ পদ্ধতির উল্লেখ আছে। ‘ব্রাহ্ম’, ‘দৈব’, ‘আর্য’, ‘প্রজাপত্য’, ‘অসুর’, ‘রাক্ষস’, ‘পৈশাচ’ ও ‘গান্ধর্ব’ এই আট ধরনের বিবাহের মধ্যে ব্রাহ্ম বিবাহই শুধু গ্রহণযোগ্য ছিল। দায়ভাগ গ্রন্থে জীমূতবাহন উল্লেখ করেছেন যে, ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রজাপত্য এবং গান্ধর্ব বিবাহ অনিন্দনীয়। ধর্মশাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী নিজ বর্ণের মধ্যে বিবাহ ছিল সাধারণ নিয়ম। সবর্ণে বিবাহ উৎকৃষ্ট হলেও মনু ব্রাহ্মণ পুরুষকে নিজ বর্ণ ছাড়া নিম্নতর তিন বর্ণে বিবাহের অধিকার দিয়েছিলেন। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে, যেমন চন্ডীমঙ্গলে, মুসলমানদের নিকা বিবাহের কথা বলা হয়েছে। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, এমনকি বিশ শতকেও মুসলমানদের মধ্যে বহুবিবাহ ব্যাপক হারে প্রচলিত ছিল। উচ্চশ্রেণীর অবস্থাপন্ন মুসলমানদের একাধিক স্ত্রী থাকত। বিশ শতকের শুরুতে কুলীনদের বাইরে হিন্দু সমাজে বহুবিবাহ তেমন প্রচলিত ছিল না। বিয়ের এমন অনেক জানা অজানা বিষয়ে আলো ফেলেছেন ড. রোহিণী ধর্মপাল তাঁর এই ধারাবাহিক ‘নারী-পুরুষের মিলন কাহিনী’-তে। আজ থাকছে নারী-পুরুষের মিলন কাহিনীর ২৫পর্ব।


Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com
দেখি এবার, ব্যাসদেবের ঔরসে, অম্বিকা অম্বালিকা আর অম্বিকার কর্মসহায়িকার গর্ভে যে তিন পুত্র জন্মেছিল, তাদের তো সেই সদ্যজাত অবস্থাতেই ছেড়ে এসেছিলাম; তাদের কি হলো! 
এদ্দিনে তো বিয়ের উপযোগী হয়ে উঠেছেন সব! লেখাপড়া শিখে,  অস্ত্র চালনা শিখে, রাজনীতির পাঠ নিয়ে হস্তিনাপুরের সিংহাসনের উপযুক্তও হয়ে গেছেন নিশ্চয়ই। তাদের জন্য কেমন কনে খোঁজা হলো, দেখা যাক্। এই কনেরাই তো ভবিষ্যত কুরুবংশকে জন্ম দেবেন, বড় করে তুলবেন নিজেদের সংস্কার সংস্কৃতি দিয়ে। সুতরাং পাত্র আর পাত্রী, উভয় পক্ষকেই চিনে নিতে হবে বইকী! আর আমরা অন্ধ বলে ধৃতরাষ্ট্রকে নিয়ে পরে আলোচনা করব না। seniority maintain করব, অন্তত উত্তরপুরুষের কাছে বেচারার অতৃপ্ত ইচ্ছের পূরণ হোক। 
ধৃতরাষ্ট্রের জন্য যে মেয়েটিকে ভীষ্ম নির্বাচন করলেন, তিনি গান্ধার দেশের রাজকন্যা গান্ধারী। গান্ধার দেশ, বর্তমানের কান্দাহার, অর্থাৎ আফগানিস্তান। সেই যে যযাতি আর শর্মিষ্ঠা, তাদের এক ছেলে, দ্রুহ্যু, তার প্রনাতির নাম গন্ধার, তার থেকে এই গান্ধার নগরী। অর্থাৎ গান্ধারী ছিলেন আফগান, পাঠান। ধৃতরাষ্ট্র ছিলেন অলৌকিক দৈহিক শক্তির অধিকারী । সহস্র হাতির বল ছিল তাঁর দেহে। এমন শক্তপোক্ত দৈহিক কাঠামো যার, স্বভাবতই খুব কোমল ছোটখাটো কনে হলে চলবে কি করে! “যেমন দেবা, তেমনি দেবী” বলে একটা কথা আছে না! তা সেই মতোই ধৃতরাষ্ট্রের বধূ নির্বাচন করা হলো। তবে আরো একটা কারণ ছিল। এই গান্ধারী ছিলেন শিবভক্ত, শিবের থেকে নাকি বর পেয়েছিলেন শতপুত্রবতী হওয়ার । সেই কথা হাওয়ায় ভেসে এসেছিল ভীষ্মের কানে! তখন তো লোকবল যার বেশি, তার তত ক্ষমতা! তা এমন বরের কথা শুনে পুলকিত হলেন ভীষ্ম! বাঃ! একশ’টি নাতি! সুতরাং দূত গেল গান্ধাররাজ সুবলের কাছে, “আপনার কন্যেটিকে আমাদের জ্যেষ্ঠ রাজকুমারের জন্য চাই  “এই বার্তা সহ।
 গান্ধার, একটি ছোট্ট রাজ্য, প্রস্তাব এসছে বিখ্যাত কুরু বংশ থেকে, হস্তিনাপুর থেকে। সুবলের সাধ্য কী না বলা! ভীষ্মের প্রার্থনা তো প্রার্থনা নয়, আদেশের নামান্তর। অথচ ভীষ্ম কিন্তু অম্বার প্রত্যাখ্যানকে হাসিমুখে মেনে নিয়েছিলেন। আসলে আমরা নিজেরাই শক্তিকে ভয় পাই, আর নিজের মনে কিছু ধারণা তৈরি করে নি। সুবল না বললে কি হত জানি না, কিন্তু সুবল না বলার ধার দিয়েই গেলেন না।
কিন্তু গান্ধারী! কেমন হয়েছিল তাঁর মনের ভাব! সুশীলা ধর্মপ্রাণা ঠিকই, কিন্তু একটি কিশোরী হৃদয় তো! যে স্বপ্ন দেখে প্রেমিকের, স্বপ্ন দেখে ভালোবাসার; কেমন লেগেছিল তাঁর, যখন জানলেন তাঁর জন্য প্রস্তাব এসেছে এক অন্ধ রাজকুমারের, আর তাঁর মা বাবা এক কথায় রাজী হয়ে গেছেন! আর রাজী হয়েছেন নিজেদের কথা ভেবে, পাছে না বললে অপমানিত হতে হয়! বা প্রবল প্রতিপক্ষ যুদ্ধ ঘোষণা করে বসে! এমনকী এমন বুদ্ধিমতী শিক্ষিতা মেয়েকে জিজ্ঞেস করার কথাও একবারও ভাবলেন না! 
অভিমানে ভরে গেল মেয়েটির মন। বেশ, যদি বলিপ্রদত্তই হতে হয়, তাহলে তাই হব। সেই মুহূর্তে গান্ধারী একখানি পট্টবস্ত্র দিয়ে নিজের চোখ দুখানি চিরতরের জন্য বেঁধে নিলেন। সমাজ হয়ত, হয়ত কেন, সমাজ গান্ধারীকে অসীম সম্মান জানিয়েছে, এমন পতিব্রতা মেয়েকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছে সমগ্র কুরুকুল; কিন্তু আমার মধ্যে তো এতটুকু মুগ্ধতা তৈরি হচ্ছে না! বরং দুঃখে সহমর্মিতায় ভরে উঠছে মন! কতখানি যন্ত্রণা পেলে একটি কিশোরী পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়! অথচ তার এই বিপুল অভিমানকে পাতিব্রাত্যের মর্যাদা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো। কেউ এসে বললে না, “ওগো মেয়ে, বাঁধন খোলো। অভিমান করে থেকো না। নিজেকে বঞ্চিত কোরো না”। সেই দিন থেকে শুরু করে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত গান্ধারী এই ভাবেই ছিলেন। হস্তিনাপুরে গেলেন ভাই শকুনির সঙ্গে, সেখানে সম্পন্ন হল বিয়ে। শুরু হল ধৃতরাষ্ট্রের দাম্পত্য জীবন ।
কুন্তী ছিলেন adopted। তাঁর বাবা শূরের পিসতুতো ভাই রাজা কুন্তিভোজের কোনো সন্তান ছিল না। শূর তাই নিজে বাবা হওয়ার আগেই কথা দিয়ে ছিলেন দাদাকে, “আমার প্রথম সন্তান তোমাকে দেব”। জন্ম নিলেন পৃথা। তাই পৃথাকে পেলেন কুন্তিভোজ। পৃথা হলেন কুন্তী। কুন্তী অতিথিসেবায় পটু ছিলেন। এতটাই, যে দুর্বাসার মত রাগী খিটখিটে মুনিকে এমন সন্তুষ্ট করলেন, যে তিনি কুন্তীকে একটা আশ্চর্য বর দিলেন।
তিনি কুন্তীকে একটি মন্ত্র দিলেন। মন্ত্রটির নাম পুরুষ-আকর্ষক-মন্ত্র (মহাভারতের আদি পর্বে, প্রথম খণ্ডের সূচিপত্রে এই নামটিই দেওয়া আছে)। এই মন্ত্রের ক্ষমতা হল, এটি উচ্চারণ করে কোনো দেবতাকে ডাকলেই, তাঁর অনুগ্রহে কুন্তীর পুত্র জন্মাবে (পুত্র সন্তানের প্রতি আমাদের সীমাহীন চাহিদা সবসময়ই, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে, হ্যাঁ তার জন্য কন্যা ভ্রূণ হত্যা করার মত নীচতা ছিল না, মেয়েদের লেখাপড়া না শেখানোর মতোও নীচ মানসিকতা ছিল না)।
কুন্তীর আর কতটুকু বয়স তখন! কুমারী, মানে বছর ষোল (মনিয়ের উইলিয়ামস এর অভিধান দেখে নেবেন), ভীষণ কৌতূহল হল! মন্ত্র বললে দেবতা আসবেন! আর তাঁর অনুগ্রহে সন্তান তৈরি হবে! এও কি সম্ভব! বেচারা কুন্তী! এও জানতেন না যে শুধু অনুগ্রহ দিয়ে সন্তান তৈরি হয় না! শারীরিক মিলন আবশ্যিক। অথবা অত কথাও হয়ত তলিয়ে ভাবেন নি। স্রেফ মজা কথার জন্য, যশস্বিনী কুন্তী কৌতূহলাণ্বিতা দেবম্ অর্কম্ অজুহাব।। সংস্কৃত শ্লোকটাকে একটু গদ্যে আনলাম। অর্ক অর্থাৎ সূর্য্যকে ডেকে বসলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে মেঘটেঘ সরিয়ে সূর্য্য এসে হাজির! “নীল চোখের সুন্দরী,  বলো, কি চাও!”
কুন্তী রীতিমতো ভয় পেয়ে গেলেন! এই রে, এ তো সত্যি এসছে! এবার কি হবে! তিনি মাথা নিচু করে সত্যি বললেন, “আমি শুধু মন্ত্রের শক্তি জানার জন্য আপনাকে ডেকেছি। এবার আপনি অনুগ্রহ করে ক্ষমা করুন আর চলে যান”।
“না তো সুন্দরী, আমি চলে গেলেও তো তোমার নিন্দা হবে! আর আমি তো মিলিত না হয়ে যেতেই পারব না। সুতরাং এস!” কী অবস্থা ভাবুন! সূর্য্য কুন্তীকে রমণের কথা বললে কি হবে! কুন্তীর পক্ষে তো ভয়ানক কথা! তিনি বার বার না বলতে লাগলেন। কিন্তু পিছু ফেরার তো উপায় নেই! শেষে সূর্য্য বললেন সেই কথা, যা কুন্তীর ভাবী প্রশাশুড়িমাকে বলেছিলেন পরাশর, “তুমি এই সঙ্গমের পরেও virgin-ই থাকবে, পুনঃ কন্যা ভবিষ্যসি”! এই বলে কুন্তীর ভয় দূর করে তাঁর সঙ্গে রমণে প্রবৃত্ত হলেন।
অনেকেই বিশ্বাস করেন যে সূর্য্য এবং পরবতীর্তে পবনদেব, ইন্দ্র কুন্তীকে অনুগ্রহ করেছিলেন। মাদ্রীকে অনুগ্রহ করেছিলেন অশ্বিনীকুমার ভাইয়েরা। বিশ্বাস করেন এই জন্যই যে পরবর্তী কালে সতীত্বের সংজ্ঞা পাল্টে দেওয়া হয়েছিল। যে মেয়ে কখনো পরপুরুষকে নিয়ে ভাবে পর্যন্ত নি, সেই সতী! অথচ, প্রাতঃস্মরণীয় পঞ্চ কন্যা, যাঁদের আমরা সতী বলেও আখ্যা দিয়েছি, তাঁদের প্রত্যেকে পরপুরুষের সঙ্গ করেছেন। তাঁদের মধ্যে কুন্তী অন্যতমা। বাকি চারজনের গল্পও তাই। ছুঁয়ে বা দয়া দিয়ে সন্তান হয় না। কোনোকালেই না। কুন্তী সূর্য্যের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। পরে পবনদেব আর ইন্দ্রের সঙ্গেও। এবং মজা হল মাদ্রীকে একবারের জন্য কুন্তী এই মন্ত্র ধার দিয়েছিলেন। মাদ্রী একবারে অশ্বিনীকুমারদের ডাকেন। দুই ভাই। এক সঙ্গে । এক ফুল দো মালী। দো চারা — নকুল এবং সহদেব। group sex তো ছিলোই। অধিকাংশ সময়ই রাজাদের বহু রাণী থাকত, রাজারা তাদের সঙ্গে দিব্যি জলকেলি রমণ এসব করতেন। মেয়েরাও। মাদ্রী স্বয়ং তার উদাহরণ। 
এই প্রসঙ্গে বলে নি, মেয়েরাও কেমন স্বেচ্ছাচারী ও স্বতন্ত্র ছিল সঙ্গী বাছার ক্ষেত্রে, কীভাবে তার বিরুদ্ধে নিয়ম তৈরি হল।
আসলে রামায়ণ মহাভারত, পুরাণ সব এমন কাহিনী উপকাহিনীতে পরিপূর্ণ, যে খেই রাখা মুশকিল। সোজা চলাও মুশকিল। এদিকে ওদিকে কত যে শাখা প্রশাখা, সবেতেই পা ভেজাতে ইচ্ছে করে! সর্বার্থে বিবিধের মাঝে মিলন মহান যাকে বলে!
সেই যে মমতা, বৃহস্পতির বৌদি, তাঁকে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ধর্ষণ করলেন বৃহস্পতি? সেই মমতার গর্ভস্থ ভ্রূণটি লাথি মেরে বার করে দিল ধর্ষকের বীর্যটিকে আর বৃহস্পতি অভিশাপ দিলেন তাকে অন্ধত্বের? চোরের মার বড় গলা আর কী! ধর্ষককে বাধা দেওয়া! তার ওপর এমন উচ্চ স্তরের শিক্ষিত ধর্ষক! কোথায় বলবে আসুন আসুন, আপনি ধর্ষণ করলে আমি ধন্য হয়ে যাব; তা না! আবার ভ্রণের সাহায্যে বাধা দান! কী স্পর্ধা!
দুঃখের বিষয়, এই ভ্রূণটি জন্ম নিল অন্ধ শিশু রূপেই। নাম হল দীর্ঘতমা, যে দীর্ঘ সময় ধরে অন্ধকারে নিমজ্জিত! এবার ছেলেটি তো বিদ্যায় বুদ্ধিতে সরেস হয়ে উঠল, বেদজ্ঞ পণ্ডিত হয়ে উঠল। বিয়েও হল প্রদ্বেষী নামে এক মেয়ের সঙ্গে, দুজনের একাধিক সন্তানও হল, যাদের মধ্যে গৌতম মুনি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। কিন্তু ওই কাকার প্রভাব, বা জন্মের আগেই ধর্ষণের জন্য কোনো প্রভাব কিনা জানি না, দীর্ঘতমা সুরভিপুত্রের থেকে (সুরভি হল বশিষ্ঠের গাভী কামধেনুর পুত্র) গোধর্ম শিখল, তা প্রয়োগ করতে আর শেখাতে আরম্ভ করল। গোধর্ম কি? দিবা বা রাত্রৌ বা, প্রকাশম্ অপ্রকাশম্ বা, যস্যাং কস্যাচিৎ স্ত্রিয়াং রমণম্ (নীলকন্ঠ কৃত টীকা, মহাভারত, আদি পর্ব, পৃঃ১১৫৮)। অর্থাৎ দিনে রাতে, যেখানে সেখানে নারীসঙ্গম!
এই যদি পণ্ডিতের আচরণ হয়, তো অন্যরা সহ্য করবেন কেন! সকল আশ্রমবাসী সেই পাপাত্মাকে বয়কট করল। এবং জেনে ভালো লাগবে, প্রদ্বেষীও স্বামীকে ত্যাগ করল! এবং স্পষ্ট বলে দিল যে “আমিই আপনাকে ভরণ করি, আর করব না।”
তখন সেই দীর্ঘতমা, যে নাকি যখন তখন সঙ্গম করে বেড়ানোকেই ধর্ম মনে করে, স্ত্রীর উপর রেগে সমস্ত মেয়েদের অভিশাপ দিল
অদ্যপ্রভৃতি মর্য্যাদা ময়া লোকে প্রতিষ্ঠিতা।
এক এব পতির্নার্য্যা যাবজ্জীবং পরায়ণম্ ।। 
অর্থাৎ আমি বলছি  আজ থেকে নারীর শুধু মাত্র পতিই অবলম্বন হবে এবং অভিগম্য পরং নারী পতিষ্যতি ন সংশয়ঃ। আর অন্য পুরুষের সংসর্গ করলে নারী অবশ্যই পতিত হবে। 
অর্থাৎ কিনা, ভাত দেওয়ার কেউ নয়, কীল মারবার গোঁসাই (যদিও তার মানে এই নয় যে ভরণ করলেই স্বামীর এমন করার অধিকার জন্মায়)।
সঙ্গে এও বলল,
অপতীনান্তু নারীণামদ্যপ্রভৃতি পাতকম্।
যদ্যসি চেদ্ধনং সর্বং বৃথাভোগা ভবন্তু তাঃ।
অকীর্তিঃ পরিবাদশ্চ নিত্যং তাসাং ভবন্তু বৈ।।
এই শ্লোকার্থ কিন্তু প্রমাণ করে, সেই সময় সতীদাহ মোটেও ছিল না! মানেটা বুঝুন,
অপতীনাং বিধবানাং নারীনাম্, অর্থাৎ অপতী নারী, মানে যার পতি মারা গেছে। তা আজ থেকে অন্য পুরুষের সংসর্গ করলে বিধবাদের পাপ হবে। তার মানে কি দাঁড়াল? সমাজে মৃতপতি মেয়েরা দিব্যি ছিল, আর তারা পুরুষসংসর্গও করতো। আর কি হবে সেসব করলে? না নিন্দা হবে আর বন্ধুরা তাকে ত্যাগ করবে!
সুতরাং বিদ্যাসাগরের জন্য আর একটা point উঠে এল। মৃতস্বামীর মেয়েদের অস্তিত্ব ছিল, তাই শুধু না, তারা দিব্যি ভোগ করত, ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশাও করত। আর প্রদ্বেষী স্বামীর এইসব কথা শুনে কি করল? চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল? কক্ষণো না! তার হুকুমে তার ছেলেরা দীর্ঘতমাকে বেঁধে ভেলায় করে নদীতে ভাসিয়ে দিলো। শুনতে একটু নিষ্ঠুর লাগছে ঠিকই, এতটা না হলেই ভালো হত, কিন্তু ওই দম্ভোক্তি মনে হলে মনে হচ্ছে, ঠিকই হয়েছিল!
দ্বিতীয় বারণ, এবং মূলত যার নিষেধাজ্ঞাই গুরুত্বপূর্ণ, তিনি হলেন উদ্দালকপুত্র শ্বেতকেতু। কিন্তু তাঁর নিষেধ-মুদ্রার একটি পিঠকেই বড় করে দেখানো হয়। দুটি শ্রেণী এই কাজটি সযত্নে করে এসছে। প্রথম, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন লোকজন, যারা সর্বরকমে চায় মেয়েদের অবদমিত করে রাখতে এবং দ্বিতীয় যারা প্রমাণ করতে চায় প্রাচীন ভারতবর্ষে শুধুমাত্র মেয়েদেরকেই পরাধীন করে রাখার জন্য নিয়ম তৈরি হত, ছেলেদের জন্য নয়।
মহাভারতের আদিপর্বে পাণ্ডু স্ত্রী কুন্তীকে বলছেন এই নিষেধের উৎসকাহিনী।
পুরাকালে মেয়েরা থাকত নিজেদের ইচ্ছেমতো। বিয়ের পরেও স্বামীকে ছাড়া অন্য পুরুষের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত। এই স্বভাবকে কেউ মন্দ বলত না, কারণ এইই প্রাণীর স্বভাব,  স হি ধর্মঃ সনাতনঃ। এবং মানুষ ছাড়া সমস্ত প্রাণী হিংসে ও রাগশূন্য হয়ে এমন আচরণই করে থাকে।
এবার এই যে খোলামেলা স্বভাব, এর জন্য নিজের দায়িত্ব থেকে কিন্তু কেউ চ্যুত হত না। রান্নাবান্না প্রভৃতি যাবতীয় ঘরের কাজ সুষ্ঠু ভাবে সারা হত। বা যা নিয়ে সবচেয়ে চিন্তা, গর্ভবতী হয়ে পড়া, তা যাতে অন্য পুরুষের সঙ্গে না হয়ে পড়ে, তাই ঋতুকালে একমাত্র স্বামীর সঙ্গেই সহবাস করত। কিন্তু অন্য সময় কোনো বারণ ছিল না। অর্থাৎ ঠিক উচ্ছৃঙ্খল জীবন বলা চলে না একে। মানুষ মূলত বহুগামী এবং তা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। তাই একেই সনাতন ধর্ম বলা হয়েছে। তার জন্য কেউ গৃহস্থ কর্মে কোনো অবহেলা করত না। স্বামী ভিন্ন অন্য পুরুষের দ্বারা যাতে সন্তানোৎপাদন না হয়ে পড়ে, সে ব্যাপারেও খেয়াল রাখত মেয়েরা।
এবার, একদিন হলো কি, শ্বেতকেতুর সামনেই এক ব্রাহ্মণ এসে তার মায়ের হাত ধরে বলল, “চল যাই”। আর এমন একটা ভাব করল, যেন জোর করে নিয়ে চলল। তাই দেখে শ্বেতকেতু রেগে কাঁই! তার বাবা উদ্দালক যতোই বোঝান, সে কোনো কথাই কানে তোলে না। শেষে জগতের সমস্ত স্ত্রী পুরুষের জন্য শ্বেতকেতু একটা নিয়ম তৈরি করে দিল। কি সে নিয়ম? “আজ থেকে কোনো মেয়ে পতিকে ত্যাগ (অর্থাৎ এই নিয়ম শুধু বিবাহিত মেয়েদের জন্য) করে অন্য পুরুষের সঙ্গে মিলিত হবে, তার পাপ হবে ভ্রূণহত্যার মত জঘন্য”। কিন্তু একইসঙ্গে এ কথাও বলা হল যে কন্যাকালেও ব্রহ্মচারিণী ও বিবাহের পর পতিব্রতা স্ত্রীকে ছেড়ে যে পুরুষ অন্য নারীর সঙ্গে মিলিত হবে, তারও সমান পাপ হবে।
অর্থাৎ বিবাহিত সব মেয়ে পুরুষের জন্যই কিন্তু একনিষ্ঠতা নিয়ম হয়ে গেল। অথচ তা লাগু হল শুধুই মেয়েদের জন্য! মানে আইন আর আইনের ফাঁক চিরকালই ছিল! আমরা ভুলে যাই, আসলে সব শাস্ত্রই শেষ পর্যন্ত মানুষেরই সৃষ্টি, তাই তা কিভাবে লেখা হবে; লেখা যেমনই হোক, কিভাবে তার প্রয়োগ হবে; কে কোনটা মানবে আর মানবে না; কোন নিয়ম দীর্ঘ দিন ধরে থেকে যাবে, কোনটা কখন উঠে যাবে; এই সবই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় যে থাকে, সেই ঠিক করে। সুতরাং কোনো কিছুই সম্পূর্ণ  অভ্রান্ত নয়, কোনো কিছুই অপরিবর্তনীয় নয়, কোনো কিছুই শেষ পর্যন্ত অপরিহার্য নয়। তাই পুত্রম্ দেহির পরিবর্তে সন্তানম্ দেহি বললে যদি সেই মন্ত্রের ত্রুটি ঘটে, তবে সে মন্ত্র বর্জন করো। নয়ত ধরে ধরে সংস্কৃত ব্যাকরণের ক্লাস নিয়ে বোঝাও যে পুত্রম্ মানে পুত্রকে চাওয়াও হতে পারে, বা পুত্র বা কন্যা- উভয়কে চাওয়াও হতে পারে! মনে রাখতে হবে, মনের স্থবিরতাই আসল মৃত্যু। তাই শিক্ষার সংজ্ঞাই হল আরো শিক্ষা, প্রতি মুহূর্তে নিজেকে সংশোধিত,  সংযোজিত, প্রয়োজনে বিয়োজিত ও পরিবর্তিত করে পরিবেশের সঙ্গে সুষ্ঠু সঙ্গতিবিধান করা এমন ভাবে, যাতে জগতের মঙ্গল হয়; তাইই শিক্ষা।
কুন্তী তাঁর কুমারী অবস্থার সেই সূর্য্যের সঙ্গে মিলনের ফলে জাত সন্তানকে নিয়ে কি করেছিলেন, তা আমরা সবাই জানি। সেই মুহূর্তে তাঁর সেই সাহস ছিল না। এটা শুধু মেয়ে বলে নয়, কোনো ছেলেও যদি এই বয়সে পিতৃত্ব অর্জন করে বসে, সে কি সর্বসমক্ষে তা বলার সাহস করবে? নিজের দায়িত্ব পালন করবে? না লোককে বোঝাতে সক্ষম হবে, এ নেহাতই আকস্মিক ভাবে ঘটে গেছে? সুতরাং ওই বয়সের একটি মেয়ের পক্ষে যা সহজ ছিল, কুন্তী তাইই করেছিলেন। 
এর পর কুন্তী আরো একটু বড় হলেন। ভোজ মেয়ের জন্য স্বয়ংবর সভার আয়োজন করলেন।
এই আরেকটি অসাধারণ বিয়ের প্রকার সেই সময় ছিলো, যেখানে কন্যার পছন্দ- অপছন্দই প্রাধান্য পেত। এই স্বয়ংবর কখনো শর্তসাপেক্ষে হত, যেমন সীতা ও দ্রৌপদীর ক্ষেত্রে। কখনো এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকত, অর্থাৎ কন্যার পিতা আগেই কন্যাকে বলে রাখতেন, “অমুককেই মালা দিবি” বলে! আর ছিল শর্তহীন সত্যি স্বয়ংবর, যা হয়েছিল কুন্তীর ক্ষেত্রে। এখানে কন্যা মালা নিয়ে, সর্বালঙ্কারভূষিতা হয়ে সখীদের সঙ্গে আসবেন, এক এক করে রাজা বা পাত্রর সামনে যাবেন, সঙ্গে থাকবেন কোনোও একজন ভাট- যিনি সেই পুরুষটি সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য বলবেন (এই থেকেই কি “ভাট বকা” শব্দটি  আরম্ভ হয়েছিল?),  কন্যার পছন্দ না হলে তিনি তাঁকে ছেড়ে পরের জনের কাছে এগিয়ে যাবেন। পেছনে অন্ধকার, সামনে তখনও আলো। এই একটি প্রথায় বিয়েতে ইচ্ছুক মেয়ে সবার সামনে প্রত্যাখ্যানের অধিকার পেত।
আমার তো বেশ লাগে এই প্রথা। এমনিতেই বিয়ে একটি জুয়াখেলা। এমনকী প্রেমের বিয়েতেও। তোমার এতদিনের চেনা, মিষ্টভাষী লোকটি বা সুহাসিনী মেয়েটি কেমন চোখের সামনে পাল্টে যেতে থাকে। অনেক সময় সম্পূর্ণ বিপরীত একটি চরিত্র উদ্ভাসিত হয়। তার চেয়ে এই প্রথা খারাপ কি! পাত্রও তো পাত্রী সম্পর্কে জেনেই আসছে! একেবারে এবার সামনাসামনি দেখা! পছন্দ হলে পেছন ফিরে, যে সখী যুথীবদ্ধ জুঁই ফুলের সুগন্ধী মালাটি সোনার থালায় করে নিয়ে কন্যার পেছন পেছন আসছে, সেটি নিয়ে ঝুপ করে পরিয়ে দাও!
কুন্তীও তাই করলেন। পাণ্ডুর সামনে এসে তাঁর কান্তি, সিংহের মত তেজ আর বিশাল বক্ষঃস্থল দেখে (দেখুন, মেয়েরাও ছেলেদের শরীর দেখে কিন্তু) ওখানে দাঁড়িয়েই রোমাঞ্চিত, চঞ্চল  আর আকুল হয়ে পড়লেন এবং ঝুপ করে মালাটি পড়িয়ে দিলেন। বেজে উঠল শত শত শঙ্খ! জয়ধ্বনি উঠল চারিদিকে।
ভীষ্ম, অদ্ভুত চরিত্র। নিজে বিয়ে করবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, বুঝলাম। কিন্তু যখন সেই প্রতিজ্ঞার কারণটাই বর্তমান রইল না, তখনও জেদ আঁকড়ে বসে রইলেন! নিজে বিয়ে করলেন না, এমনকী নিয়োজিত হতেও রাজি হলেন না। ভীষ্ম রাজি হলে ব্যাসদেব আসতেন না, অম্বিকা চোখ বন্ধ করার পরিবর্তে খুশি হতেন বরং! আচ্ছা, যাঁরা কঠোর নীতিপরায়ণ, তাঁরা বলবেন, ও সব জানি না। জবান দি, তো দি! একবার দিয়া হুয়া বচন ওয়াপস নেহি লিয়া যা সাকতা! বেশ বাবা! কিন্তু অন্যদের একাধিক বিয়ে করানোর এত তাড়া কেন? ভাইপোর জন্য মেয়ে আনতে গিয়ে তো নিজের মৃত্যুবাণ তৈরি করলেন (অম্বা)! ধৃতরাষ্ট্রের জন্য একটি মেয়েই আনলেন ঠিকই, কিন্তু খেয়াল করলেন না যে কত বড় শত্রু তৈরি করে ফেললেন (শকুনি)!
এবার পাণ্ডুর সঙ্গে কুন্তীর মত মেয়ের বিয়ে হওয়ার পর ফের তাঁর বিয়ে দিতে উদ্যোগী হলেন ভীষ্মই। মদ্ররাজ শল্যের থেকে কন্যাপণ দিয়ে মাদ্রীকে হস্তিনাপুরে এনে পাণ্ডুর সঙ্গে বিয়ে দিলেন।
এই প্রথম পণের কথা পাওয়া গেল। কিন্তু বরপণের বদলে কন্যাপন। শল্যবংশের এই ছিল কুলনিয়ম। আর ভীষ্মও তা মেনে প্রভূত মণিমাণিক্য অলঙ্কার বস্ত্র সব দিলেন। 
শুরু হল ধৃতরাষ্ট্র-গান্ধারী, পাণ্ডু-কুন্তী-মাদ্রীর দাম্পত্য জীবন ।
[চলবে]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত