| 3 মার্চ 2024
Categories
ধারাবাহিক লোকসংস্কৃতি

নারী পুরুষের মিলন কাহিনী (পর্ব-২৬)

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

বিবাহ  মানব সমাজের প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান। যুগে যুগে প্রতিষ্ঠানটি এর আদি রূপ থেকে বর্তমান কাঠামোয় উপনীত হয়েছে। বিবাহপ্রথাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে প্রধানত ধর্ম। বিয়েসংক্রান্ত সকল নিয়মকানুন বিধিবদ্ধ হয়েছে ধর্মীয় অনুশাসনে। প্রাচীনকাল থেকে বাংলায় ধর্মীয় শাস্ত্রের বিধানই ছিল সামাজিক আইন, ধর্মীয় আইনের দ্বারাই শাসিত হতো সমাজ-সংসার। ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় আইনের পাশাপাশি লোকজ সংস্কৃতিও বৈবাহিক জীবনকে প্রভাবিত করেছে নানাভাবে। মনুস্মৃতি এবং অর্থশাস্ত্রে আট প্রকারের হিন্দু-বিবাহ পদ্ধতির উল্লেখ আছে। ‘ব্রাহ্ম’, ‘দৈব’, ‘আর্য’, ‘প্রজাপত্য’, ‘অসুর’, ‘রাক্ষস’, ‘পৈশাচ’ ও ‘গান্ধর্ব’ এই আট ধরনের বিবাহের মধ্যে ব্রাহ্ম বিবাহই শুধু গ্রহণযোগ্য ছিল। দায়ভাগ গ্রন্থে জীমূতবাহন উল্লেখ করেছেন যে, ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রজাপত্য এবং গান্ধর্ব বিবাহ অনিন্দনীয়। ধর্মশাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী নিজ বর্ণের মধ্যে বিবাহ ছিল সাধারণ নিয়ম। সবর্ণে বিবাহ উৎকৃষ্ট হলেও মনু ব্রাহ্মণ পুরুষকে নিজ বর্ণ ছাড়া নিম্নতর তিন বর্ণে বিবাহের অধিকার দিয়েছিলেন। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে, যেমন চন্ডীমঙ্গলে, মুসলমানদের নিকা বিবাহের কথা বলা হয়েছে। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, এমনকি বিশ শতকেও মুসলমানদের মধ্যে বহুবিবাহ ব্যাপক হারে প্রচলিত ছিল। উচ্চশ্রেণীর অবস্থাপন্ন মুসলমানদের একাধিক স্ত্রী থাকত। বিশ শতকের শুরুতে কুলীনদের বাইরে হিন্দু সমাজে বহুবিবাহ তেমন প্রচলিত ছিল না। বিয়ের এমন অনেক জানা অজানা বিষয়ে আলো ফেলেছেন ড. রোহিণী ধর্মপাল তাঁর এই ধারাবাহিক ‘নারী-পুরুষের মিলন কাহিনী’-তে। আজ থাকছে নারী-পুরুষের মিলন কাহিনীর ২৬পর্ব।


না। বিদুরও অবিবাহিত রইলেন না। ভীষ্মই খোঁজ আনলেন দেবকরাজার এক শূদ্রারাণীর গর্ভে এক ব্রাহ্মণের ঔরসে জন্মানো রূপযৌবনসম্পন্না এক কন্যা আছে; একেবারে রাজযোটক! সুতরাং একদিন ধুমধাম করে বিদুরের বিয়েও হয়ে গেল! তবে, বিদুর ওই পড়াশোনা নিয়ে থাকা মানুষ তো, তাঁর জীবনে সেই অর্থে খুব বেশি ওঠাপড়া নেই। তিনি চুপচাপ থেকেছেন বেশির ভাগই । হ্যাঁ, মাঝে মাঝে বিবেকের ভূমিকা পালন করেছেন, তাতে অবশ্য কিছু আটকায় নি। ধৃতরাষ্ট্রের কাছে তিনি ছিলেন ওই চ্যর্চের দোষ স্বীকারের যাজকের মত। ধৃতরাষ্ট্র ভুলগুলো বলতেন, আর আবার তাইই করতেন। তাছাড়া বিপদের সময় যুধিষ্ঠিরকে কখনো সখনো কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। নারী-পুরুষ সম্পর্কে জটিলতার মধ্যে তিনি বিশেষ নেই। সুতরাং তিনি থাকুন তাঁর মতো, আমরা গান্ধারী কুন্তী মাদ্রীকে দেখি।
ধৃতরাষ্ট্রের সত্যি খানিক ভাগ্য খারাপ। নিজে রাজা হতে পারলেন না, গান্ধারী গর্ভ ধারণ আগে করলেও কিছু সমস্যার জন্য সেই গর্ভ দুই বছর ধরে রয়ে গেল। তিনি আগেই শিবের বর পেয়েছিলেন, পরে বেদব্যাসও তাঁর সেবায় খুশি হয়ে “শতপুত্রবতী হও” বলে আশীর্বাদ করেন।
এতো সবাই জানেন, যে পরে গর্ভবতী হয়েও কুন্তী আগে মা হলেন, গান্ধারী ভয়ানক ক্ষোভে পেটে এমন আঘাত করলেন যে সেই গর্ভটি বেরিয়ে এল।  লৌহপিণ্ডের মত শক্ত সেই মাংসপিণ্ডটিকে ব্যাসদেব প্রথমে একশোটি, পরে গান্ধারীর “আমার একটি মেয়ে চাই” এই অনুরোধ শুনে একশো এক’টি খণ্ডে ভাগ করে সেগুলো আলাদা আলাদা কলস (টিউব?) এ রাখালেন। এক বছর পর তা থেকে দুর্যোধন এবং তাঁর নিরানব্বই ভাই আর একমাত্র বোন দুঃশলা জন্মালেন।
এখানে তিনটি কথা আছে। এক, গান্ধারীর ক্ষোভ হল কেন? তার মানে স্বভাবতই ধৃতরাষ্ট্রের মতো তাঁরও সমান সুতীব্র ইচ্ছে ছিল যে অন্তত তাঁদের সন্তান রাজা হোক্। 
দুই, এই যে দুটি বছর গান্ধারী গর্ভ বহন করে গেলেন, ক্রমে অনেকটাই অচল হয়ে পড়লেন, তখন এক বৈশ্যকন্যাকে ধৃতরাষ্ট্রের দেখাশোনার কাজে নিযুক্ত করা হল। এই দেখাশোনার ফল হল এই যে ধৃতরাষ্ট্র সেই কন্যার সঙ্গে যৌন আকাঙ্ক্ষাটি মেটাতে লাগলেন। এবং এক পুত্রের জন্ম দিলেন, যুযুৎসু। ধৃতরাষ্ট্রের এক মাত্র সন্তান যে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সর্বসমক্ষে যুধিষ্ঠিরের আহ্বানে পাণ্ডবপক্ষে যোগ দিয়েছিলেন।
তিন, এই দেখলাম স্পষ্ট করে কন্যালাভের ইচ্ছা। নাই চাইতে পারতেন গান্ধারী। একশো পুত্র পাচ্ছেন, আর কী চাই! কিন্তু চাইলেন। একটি মেয়ের মা হওয়া যে একটা অন্যরকম আনন্দ, তা বললেনও ব্যাসদেবকে এবং সেইমতো মেয়ের ব্যবস্থাও হলো।
এইবার পাণ্ডবদের জন্মের ঘটনায় যেতে হচ্ছে। কারণ দুর্যোধন জন্মেছেন ভীমের সঙ্গে, একই দিনে। তাই বোধহয় আড়াআড়িটা এত বেশি ছিল! কিন্তু যুধিষ্ঠির তো তার আগেই জন্মে গেছিলেন! এবার যুধিষ্ঠির যে ধর্মপুত্র, সে তো সবাই শুনেছি। কিন্তু ধর্মপুত্র কেন? কি এমন হল যে পাণ্ডু বাবা হতে পারলেন না?
পাণ্ডু গেছেন সপরিবারে, মৃগয়ায়। রাজাদের অন্যতম ব্যসন, অর্থাৎ আমোদ আহ্লাদের মাধ্যম। একদিন সকালে শিকারে বেরিয়েছেন, সেখানে শিকারের খোঁজে ইতিউতি ঘুরতে ঘুরতে দেখতে পেলেন মৈথুনরত এক হরিণদম্পতীকে। ব্যস, শাঁ শাঁ করে পাঁচটি বাণ বিদ্ধ করল সেই পরস্পর আবদ্ধ হরিণযুগলকে। তারপরেই সেই হরিণটির মুখে মানুষের বিলাপ শোনা গেল!
পাণ্ডু স্তম্ভিত হয়ে জানলেন কিমিন্দিম নামে এক মুনি হরিণের রূপ ধারণ করে এক হরিণীর সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন।
আমাদের প্রাচীন কাহিনীর মধ্যে কিন্তু এইরকম পশু মিলনের কথা আরো আছে। স্বয়ং সূয্যদেবের পত্নী সংজ্ঞা, সূর্য্যের তেজ সহ্য করতে পারছিলেন না। এই দুজনের প্রথম পুত্র প্রথম মনু বৈবস্বত। প্রথম মিলনের সময় প্রথম অনুরাগের সময়। কিন্তু তারপরে সংজ্ঞার পক্ষে অত তেজ মেনে নেওয়া গেল না, তিনি সূর্য্যকে দেখলেই চোখ নামিয়ে ফেলতেন। এমতাবস্থায় জন্ম হল যমের, সূর্য্য বললেন, “আমাকে দেখে যেমন চোখ বুজে আসে, তেমন মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে (তুলনীয় চোখ বোজা মানেই মৃত্যু ) যুক্ত হবে এই যম”! হ্যাঁ, মৃত্যুর অধিপতি, অন্ধকারের অধিপতি আসলে আলোরই পুত্র। স্বাভাবিক, আলোর অভাব মানেই তো অন্ধকার। তাই আলোর সঙ্গে অন্ধকারের নিবিড় যোগ। 
দ্বিতীয় বার সূর্য্যের রাগ দেখে সংজ্ঞা ভয় পেয়ে চপলভাবে দৃষ্টিপাত করতে লাগলেন, চঞ্চল হয়ে পড়লেন মনে মনে! সূর্য্য আবার বললেন, “তুমি এক চপল নদীকে জন্ম দেবে”। জন্ম হল যমুনার। সেই যে internal দুই ভাই বোন, যম আর যমুনা। এবার সংজ্ঞা সত্যি ধৈর্য্য হারালেন আর সূর্য্যকে ছেড়ে চলে গেলেন এক নকল সংজ্ঞাকে রেখে, নিজের ছায়া। দেখুন, গল্পের চরিত্রগুলি কি বিজ্ঞানসম্মত। সূর্য্য থাকলে ছায়াও তো থাকবেই, তাই না?
এবার সংজ্ঞা কিছু দিন নিজের বাড়ি ফিরে যান। কিন্তু বাবা বিশ্বকর্মা বারবার জিজ্ঞাসা করতে থাকেন, কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি এবং সব জেনেও মেয়েকে সূর্য্যের কাছেই ফিরে যেতে বলেন। সংজ্ঞা কেন ফিরবেন? অত সহজ নাকি! তিনি এক ঘোটকীর রূপ ধরে উত্তরকুরুবর্ষে (হিমালয়ের উত্তরে প্রাচীন একটি দেশ, ঐতরেয় ব্রাহ্মণ এ এর উল্লেখ আছে, এছাড়া আরো মত আছে, পামির মালভূমির কাছে বা কাশ্মীরে; পৌরাণিক অভিধান, অমল কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, পৃঃ ১৬১ ) ঘুরে বেড়াতে থাকেন।
সূর্য্য সব জানতে পেরে সংজ্ঞাকে খুঁজতে বেরোলেন এবং খুঁজেও পেলেন ঘোটকীরূপে। ভালো লাগে ভাবতে, যে সংজ্ঞা মোটেই সহজেই গলে গেলেন না। সূর্য্যও নিজের ভুল বুঝতে পেরে যতক্ষণ না সংজ্ঞা নিজেই ক্ষমা করেন, ততক্ষণ কোনো জোর করলেন না। বরং ওখানেই থেকে গেলেন নিজেও অশ্বরূপ ধারণ (অমল কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, পৌরাণিক, পৃঃ ২৬৪) করে। এবং এই ঘোটকী অবস্থায় মিলনের ফলে সংজ্ঞার তিন ছেলে এক মেয়ে হয়। প্রথমে যমজ। বিখ্যাত যমজ। দেবতাদের চিকিৎসক দুই ভাই, অশ্বিনীকুমারদ্বয়। অশ্ব থেকে জাত, তাই অশ্বিনীকুমার । আসল নাম নাসত্য ও দ্রস্য। বাকি দু জন রেবন্ত আর ভয়া। গল্পটা বলার কারণই ওই অশ্ব রূপে মিলনের জন্য । পশুসংগম ছিল বলেই না এইসব গল্প তৈরী হয়েছে!
আবার পাণ্ডুর কাছে যাওয়া যাক্ । মুনি তো পাণ্ডুকে শাপ দিতে উদ্যত। পাণ্ডু বললেন, “দেখুন, আমি রাজা। মৃগয়া করতে বেরিয়েছি। হরিণ দেখে মেরেছি। আপনি মানুষ, আবার ব্রাহ্মণ, কী করে বুঝব! আমার কি দোষ এতে!”
কিমিন্দম বললেন, “পশুহত্যার জন্যেও না, ব্রহ্মহত্যার জন্যেও না।  মৃগো ভূত্বা মৃগৈঃ সার্দ্ধং চরামি গহনে বনে। হরিণের রূপ ধরে আমি হরিণীর সঙ্গে বনে ঘুরছিলাম, তারপরে মৃগ্যাং মৈথুনমাচরম্, তার সঙ্গে মৈথুনরত ছিলাম, 
মৃগরূপধরং হত্বা মামেবং কামমোহিতম্, সেই কামমোহিত অবস্থায় অর্থাৎ মৈথুনে রত অবস্থায় তুমি একটি প্রাণীকে হত্যা করেছ, এই তোমার আসল অপরাধ। তাই তুমিও যখনই রমণ করতে যাবে, তোমার মৃত্যু হবে”
(আদিপর্ব, খণ্ড তিন, পৃঃ ১২৫০-৫১)!
পাণ্ডু তো শিবিরে ফিরে আকুল হয়ে কাঁদতে লাগলেন, নিজের বাবা যে অতিরিক্ত যৌনাচারের ফলেই মারা গেছিলেন, সে কথাও বলতে লাগলেন । আর তিনি সেই অর্থে কোনো দোষ না করেও সেই কামের কারণেই এমন অভিশপ্ত হলেন। তিনি ঠিক করলেন কুন্তী মাদ্রীকে ছেড়ে, হস্তিনাপুর ছেড়ে তিনি দূরে কোথাও চলে যাবেন, ভিক্ষান্নে জীবনধারণ করবেন। কিন্তু যেমন সীতা রামকে ছেড়ে দিতে রাজি হন নি, তেমনই কুন্তী আর মাদ্রীও ছাড়তে রাজি হলেন না স্বামীকে। তখন পাণ্ডু সঙ্গে আসা অনুচরদের বললেন, “হস্তিনাপুরে গিয়ে জানিও যে পাণ্ডু তাঁর স্ত্রীদের নিয়ে বনেই প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেছেন, তিনি আর ফিরবেন না।” এই বলে সবাইকে ফেরত পাঠিয়ে তাঁরা বিভিন্ন পার্বত্য অঞ্চলে ঘুরতে ঘুরতে শতশৃঙ্গ পর্বতে এসে উপস্থিত হলেন।
এইখানে এসে তিনি চাইলেন আরো উপরে উঠতে। কিন্তু সে পথ বড়ই দুর্গম বলে ঋষিরা, যাঁরা ওই পথেই যাচ্ছিলেন, তাঁরা বারণ করলেন। তাঁরা পাণ্ডুর অনুনয়ে এও বলে গেলেন যে তাঁদের সন্তান হবে আর তারা হবে দেবতুল্য। পাণ্ডু কিন্তু কুন্তীর সেই “পুরুষ আকর্ষক” মন্ত্রটি সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। এই বার তিনি কুন্তীকে বোঝাতে বসলেন, যাতে কুন্তী অন্য পুরুষের সংসর্গ করে মা হতে রাজি হন। সবার আগে তিনি সন্তানের প্রকার আর কোন উপায়ে সন্তান কাম্য, তা বোঝাতে বসলেন। বেশ ইন্টারেস্টিং, তাই এখানে দিচ্ছি।
এখানে, মানে মহাভারতে বারো প্রকার পুত্রের কথা আছে। তার মধ্যে প্রথম ছয়প্রকার পূর্বপুরুষের ধনের উত্তরাধিকারী, পরের ছয় প্রকার তা নয়। একটু দেখি এই প্রকারগুলির ধরণ? 
[চলবে]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত