| 27 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
ধারাবাহিক লোকসংস্কৃতি

নারী-পুরুষের মিলন কাহিনী (পর্ব-৫)

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

বিবাহ  মানব সমাজের প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান। যুগে যুগে প্রতিষ্ঠানটি এর আদি রূপ থেকে বর্তমান কাঠামোয় উপনীত হয়েছে। বিবাহপ্রথাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে প্রধানত ধর্ম। বিয়েসংক্রান্ত সকল নিয়মকানুন বিধিবদ্ধ হয়েছে ধর্মীয় অনুশাসনে। প্রাচীনকাল থেকে বাংলায় ধর্মীয় শাস্ত্রের বিধানই ছিল সামাজিক আইন, ধর্মীয় আইনের দ্বারাই শাসিত হতো সমাজ-সংসার। ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় আইনের পাশাপাশি লোকজ সংস্কৃতিও বৈবাহিক জীবনকে প্রভাবিত করেছে নানাভাবে। মনুস্মৃতি এবং অর্থশাস্ত্রে আট প্রকারের হিন্দু-বিবাহ পদ্ধতির উল্লেখ আছে। ‘ব্রাহ্ম’, ‘দৈব’, ‘আর্য’, ‘প্রজাপত্য’, ‘অসুর’, ‘রাক্ষস’, ‘পৈশাচ’ ও ‘গান্ধর্ব’ এই আট ধরনের বিবাহের মধ্যে ব্রাহ্ম বিবাহই শুধু গ্রহণযোগ্য ছিল। দায়ভাগ গ্রন্থে জীমূতবাহন উল্লেখ করেছেন যে, ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রজাপত্য এবং গান্ধর্ব বিবাহ অনিন্দনীয়। ধর্মশাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী নিজ বর্ণের মধ্যে বিবাহ ছিল সাধারণ নিয়ম। সবর্ণে বিবাহ উৎকৃষ্ট হলেও মনু ব্রাহ্মণ পুরুষকে নিজ বর্ণ ছাড়া নিম্নতর তিন বর্ণে বিবাহের অধিকার দিয়েছিলেন। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে, যেমন চন্ডীমঙ্গলে, মুসলমানদের নিকা বিবাহের কথা বলা হয়েছে। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, এমনকি বিশ শতকেও মুসলমানদের মধ্যে বহুবিবাহ ব্যাপক হারে প্রচলিত ছিল। উচ্চশ্রেণীর অবস্থাপন্ন মুসলমানদের একাধিক স্ত্রী থাকত। বিশ শতকের শুরুতে কুলীনদের বাইরে হিন্দু সমাজে বহুবিবাহ তেমন প্রচলিত ছিল না। বিয়ের এমন অনেক জানা অজানা বিষয়ে আলো ফেলেছেন ড. রোহিণী ধর্মপাল তাঁর এই ধারাবাহিক ‘নারী-পুরুষের মিলন কাহিনী’-তে। আজ থাকছে নারী-পুরুষের মিলন কাহিনীর ৫ম পর্ব।


ব্যাসদেবের জন্ম হওয়ার পর একটু সরে আসি সত্যবতীর থেকে। সত্যবতীর যিনি স্বামী হতে চলেছেন, তাঁর জন্মের আগেই কীভাবে তাঁর বিবাহ ঠিক হয়ে গেছিল, সেখানে একটু যাই। 
ভরতকুলের রাজা প্রতীপ ছিলেন অত্যন্ত প্রজাহিতৈষী ধার্মিক রাজা। সেই রাজামশাই প্রজাদের মঙ্গলের জন্য তপস্যা পর্যন্ত করতেন। এইরকমই গঙ্গাতীরে বসে একবার তপস্যা করছেন, স্বয়ং গঙ্গা উঠে এসে তাঁকে propose করলেন। আজ্ঞে হ্যাঁ, তখন মেয়েরাও propose করত। প্রেম নিবেদনের ক্ষেত্রে তো বটেই, এমনকি শুধুমাত্র  শরীরী মিলনের জন্যেও। গঙ্গা শুধু প্রেমপ্রস্তাব দিলেন না, উঠে একেবারে প্রতীপের কোলে গিয়ে বসলেন, তাঁর ডান উরুতে। ভাবুন একবার!!
কিন্তু প্রতীপ রাজা  বললেন, তুমি তো আমার বাম উরুতে বস নি। ওইটি ভার্য্যার জন্য । ডান উরু সন্তান আর পুত্রবধূর জন্য । সুতরাং তুমি আমার কন্যাসম হলে, তোমার সঙ্গে তো যৌনসম্পর্ক স্থাপন করতে পারব না! তুমি বরং আমার ছেলের বউ হও। গঙ্গা তাতেই রাজি। অসুবিধা একটাই, শান্তনু তখনও জন্মান নি পর্যন্ত! তাহলে বুঝে দেখুন, প্রিয়াঙ্কা চোপড়াকে তার থেকে দশ বছরের ছোট নিককে বিয়ে করার জন্য কত বিশ্রী কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য সহ্য করতে হল আমাদের দেশে, যে দেশের মহাকাব্যে এমন ঘটনা আছে। অত দূরের কথাও যদি ছেড়ে দি, আমাদের দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার মশাইয়ের ঠাকুর্দার ঝুলি, যা একটু কম জনপ্রিয়, সেখানেও কিন্তু এই ধরণের বিয়ের গল্প আছে,  যেখানে এক বারো বছরের কন্যার সঙ্গে সদ্যজাত পুত্রের বিয়ে দেওয়া হচ্ছে । আর এই গল্পগুলি তো লোককাহিনী । অর্থাৎ এই প্রচলন কম হলেও ছিল। স্বামীকেই বড়  হতেই হবে, তা নয়! এবার থেকে মনে রাখবেন, আমাদের পূর্বমাতাদের একজন তাঁর স্বামীর থেকে বয়সে বড় ছিলেন।
যথাবিহিত কালে শান্তনু জন্মালেন,  বড় হতে থাকলেন, যৌবনে পা’ও দিলেন। প্রতীপ তাঁকে বলে দিলেন কোনো সুন্দরী মেয়ে যদি তাঁকে propose করে, তিনি যেন তাকে প্রত্যাখ্যান না করেন। এমন কি কিছু জিজ্ঞাসা টিজ্ঞাসাও না করে সব মেনে নেন।
তো একদিন শান্তনু শিকারে গেছেন, প্রায়ই যেতেন। গঙ্গার তীর ধরে ধরে। বনে শিকার-টিকার সেরে গঙ্গার হাওয়া খেয়ে তবে প্রাসাদে ফিরতেন। সেই রকম একটা সময়ে একদিন হঠাৎই এক অপরূপ সুন্দরী মেয়েকে দেখে তাঁর সমস্ত শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল। চোখ দিয়ে সেই সৌন্দর্য্য পান করে তৃপ্তি হল না। এই মেয়েকে না পেলে চলবে না। সুতরাং সরাসরি প্রস্তাব দিলেন, তুমি বাপু যেই হও, আমার বউ হও। এই মেয়েটি তো আমাদের সেই গঙ্গা। তিনি তো এসেইছেন এই কারণে। সুতরাং তিনি তাঁর শর্তগুলি বলে নিলেন। শান্তনুর তো তখন এমন অবস্থা, গঙ্গা যা বলছেন, তাতেই হ্যাঁ! গঙ্গা শান্তনুর স্ত্রী হলেন। 
এখানে কিন্তু কোনোভাবেই বিয়ের কথা লেখা নেই। live together। বাস করা। নির্দিষ্ট কিছু শর্ত মেনে আমি আপনার সঙ্গে বাস করব, আর কোনোও কাজে বারণ করলে বা কটু কথা বললে আপনাকে ত্যাগ করব– এই কথা বললেন গঙ্গা। এই মিলন live together ছাড়া আর কী! এবং সেই একত্র বসবাসের শর্ত স্থির করছেন মেয়েটি। 
যাক্, শুরু হল একত্র বাস এবং সহবাস। কারণ দেখা গেল গঙ্গা  শান্তনুকে সর্ব-রকমে আটকে ফেললেন। এমন নাচ দেখাতে লাগলেন, যা মনকে তরতাজা করে; এমন ভালোবাসার প্রকাশ দেখালেন, যা মনকে আরো অনুরক্ত করে তোলে; এমন শৃঙ্গার-ব্যবহার করতে লাগলেন, যাতে শরীর আর মন মাদকতাময় হয়ে ওঠে; দৈহিক মিলনে এমন নৈপুণ্য দেখালেন যে দিন মাস বছর কোথা দিয়ে কেটে যেতে লাগল, রাজার খেয়ালই রইল না।
এখানে একটু বাৎস্যায়নের চৌষট্টি কলার কিছু কিছু আলোচনা করা যাক, যা কিন্তু নারী পুরুষ, উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। শুধু মাত্র শরীর দিয়ে, শুধু মাত্র যৌনতা দিয়ে সত্যিই বেশিদিন চলে না। আমরা কেবল পড়াশোনা জাতীয় ব্যাপারকেই একঘেয়েমি ভাবি। আর বিশেষ করে ছাত্রাবস্থায়, কম বয়সে যৌনতাকে দুর্ধর্ষ আগ্রহের বিষয় বলে ভাবি, তাতে যে একঘেয়েমি আসতে পারে, তা তখন কল্পনাতেও আসে না। তবে ফ্রয়েড তাই নিয়ে আলোচনা করেছেন। আর তার বহু বহু আগে তাই নিয়ে কথা বলে গেছেন, পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করেছেন বাৎস্যায়ন।
আর তাই এই চৌষট্টি কলা শেখার কথা বলে গেছেন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে। কারণ এই কলাবিদ্যাগুলির চর্চা পরস্পরের মধ্যে একঘেয়েমি আসতে দেবে না, পরস্পরের প্রতি সমান তীব্র আকর্ষণ বজায় রাখতে সাহায্য করবে। আর এর মধ্যে কিন্তু যৌন-মিলনের কলাকৌশল নেই; সে সব আলাদা প্রসঙ্গ। এ হল চায়ের সঙ্গে মুখরোচক সব টা, মদের সঙ্গে মুচমুচে ঝালঝাল চাট, অনুপানের সঙ্গে যোগ্য সহপান। এই সব শিক্ষা আর তার প্রয়োগ বাস্তবেও কাজে লাগে, প্রেমেও কাজে লাগে।
গান, বাজনা, নাচ, ছবি আঁকা, চুল বাঁধা, ফুল দিয়ে বিছানা সাজানো, বিভিন্ন ধরণের বিছানা সাজানো নানা আস্তরণে- সেই শয্যাবিলাসীর গল্প মনে পড়ছে? ঘর সাজানো, আসবাবপত্র তৈরি, সাঁতার ও জলকেলি– মানে শুধু সাঁতার কাটা না, জলে নেমে নানা খেলাধুলো, একটু আধটু ছেড়ছাড় জাতীয় ব্যাপারস্যাপার আর কী! নিজেকে সব রকমে সাজানো,  উৎসবের প্রকার ও সময়  অনুযায়ী কিন্তু, মানে অষ্টমীর সাজ দশমীতে না, বসন্তোৎসবের সাজ সরস্বতী পুজোতে না, দিনের সাজ একরকম, রাতের সাজ অন্য ধরণের,  অভিসারের রঙই তো ঘন নীল, ফ্যাশনের হাল হকিকত কম জানতেন নাকি বাৎস্যায়ন! এখন থাকলে ফ্যাশন জগত লুফে নিতো একেবারে! তারপর আছে সুগন্ধি তৈরি করা, নানা প্রসাধনী তৈরি করা; একেবারে ভেষজ, একেবারে দেশজ কিন্তু! ধূপের ধোঁয়ায় চুল শুকোনো, ভাবা যায়! ওই  সুরভিত চুলে মুখ ডুবিয়েই তো দুজনের নিশি ভোর হয়ে যাবে!!
তারপর নানা ধরণের রান্না, একেবারে লেহ্য আর পেয় পর্যন্ত। মানে বুঝলেন তো! লেহ্য মানে চেটে যা খেতে হয়, চাটনি থেকে আচার; আর পেয় হল পানীয়, তা ককটেল হোক বা মকটেল! ভাবছেন এখনও পর্যন্ত সবটাই তো মেয়েলি কাজ-কারবার! মশাই, আবার বলছি, সবার জন্যই। দুই পক্ষইকেই শিখতে হবে পরস্পরের মনোরঞ্জন করার জন্য। পুরুষ যদি এইসব করতে না শেখে, গায়ে দুর্গন্ধ নিয়ে কাছে আসে, একটু আধটু সাজগোজ না জানে, কখনো-সখনো একটু আম পোড়া সরবত একটু কষা মাংস করে না খাওয়ায়; মেয়েদেরও প্রেম পালায় মশাই, খানিক অভ্যেস পড়ে থাকে।
এবার আসি মাসাজে। মর্দন আর কী। দেহ মন সতেজ হবে, ফুরফুরে হবে, রক্ত চলাচল ভালো হবে; তবে না মিলনও জোরদার হবে। সুতরাং অন্যতম এই মর্দন কলাটি। এরপর বাগান করা।  তারপর আসছে এমন সব বিষয়, যাকে আপনারা পুরুষালি ভেবে রেখেছেন। দেখুন তাহলে। রাজনীতি, সামরিক নীতি, গণিত, কাব্যচর্চা, দর্শন নিয়ে আলোচনা, অভিনয় ও নাটক নিয়ে চর্চা, কাব্য রচনা, কঠিন শব্দের অর্থ জানা, বিভিন্ন ভাষা শিক্ষা, ছন্দের জ্ঞান,  বক্তৃতার নিয়ম জানা, দাবা ও পাশার চাল জানা, এমনকী মানুষের মুখ দেখে চরিত্র বুঝতে পারা পর্যন্ত।
শরীরের মিলনের ফাঁকে ফাঁকে এই সমস্ত বিষয়েও খেয়াল রাখতে হবে, জানতে হবে। সব না হোক, অনেকটাই। এই সব চর্চার মধ্যে দিয়েই তো দুজনে দুজনের মধ্যে মগ্ন হবে। প্রেমের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠবে। তবেই তো বাঁধন মজবুত হবে। শুধু শরীর তাই যৌনতাকে বাঁচিয়ে রাখে না, এই সব কিছু মিলিয়েই যৌনতা, এই সব কিছু দিয়েই সম্পর্ক। এই সব কিছুর মিলনই আসলে নারী পুরুষের যথার্থ মিলন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত