| 1 মার্চ 2024
Categories
ধারাবাহিক লোকসংস্কৃতি

নারী পুরুষের মিলন কাহিনী (পর্ব-৬)

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

বিবাহ  মানব সমাজের প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান। যুগে যুগে প্রতিষ্ঠানটি এর আদি রূপ থেকে বর্তমান কাঠামোয় উপনীত হয়েছে। বিবাহপ্রথাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে প্রধানত ধর্ম। বিয়েসংক্রান্ত সকল নিয়মকানুন বিধিবদ্ধ হয়েছে ধর্মীয় অনুশাসনে। প্রাচীনকাল থেকে বাংলায় ধর্মীয় শাস্ত্রের বিধানই ছিল সামাজিক আইন, ধর্মীয় আইনের দ্বারাই শাসিত হতো সমাজ-সংসার। ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় আইনের পাশাপাশি লোকজ সংস্কৃতিও বৈবাহিক জীবনকে প্রভাবিত করেছে নানাভাবে। মনুস্মৃতি এবং অর্থশাস্ত্রে আট প্রকারের হিন্দু-বিবাহ পদ্ধতির উল্লেখ আছে। ‘ব্রাহ্ম’, ‘দৈব’, ‘আর্য’, ‘প্রজাপত্য’, ‘অসুর’, ‘রাক্ষস’, ‘পৈশাচ’ ও ‘গান্ধর্ব’ এই আট ধরনের বিবাহের মধ্যে ব্রাহ্ম বিবাহই শুধু গ্রহণযোগ্য ছিল। দায়ভাগ গ্রন্থে জীমূতবাহন উল্লেখ করেছেন যে, ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রজাপত্য এবং গান্ধর্ব বিবাহ অনিন্দনীয়। ধর্মশাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী নিজ বর্ণের মধ্যে বিবাহ ছিল সাধারণ নিয়ম। সবর্ণে বিবাহ উৎকৃষ্ট হলেও মনু ব্রাহ্মণ পুরুষকে নিজ বর্ণ ছাড়া নিম্নতর তিন বর্ণে বিবাহের অধিকার দিয়েছিলেন। মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে, যেমন চন্ডীমঙ্গলে, মুসলমানদের নিকা বিবাহের কথা বলা হয়েছে। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে, এমনকি বিশ শতকেও মুসলমানদের মধ্যে বহুবিবাহ ব্যাপক হারে প্রচলিত ছিল। উচ্চশ্রেণীর অবস্থাপন্ন মুসলমানদের একাধিক স্ত্রী থাকত। বিশ শতকের শুরুতে কুলীনদের বাইরে হিন্দু সমাজে বহুবিবাহ তেমন প্রচলিত ছিল না। বিয়ের এমন অনেক জানা অজানা বিষয়ে আলো ফেলেছেন ড. রোহিণী ধর্মপাল তাঁর এই ধারাবাহিক ‘নারী-পুরুষের মিলন কাহিনী’-তে। আজ থাকছে নারী-পুরুষের মিলন কাহিনীর ৬ষ্ট পর্ব।


গঙ্গার সঙ্গে এইভাবে আনন্দে থাকতে থাকতে স্বাভাবিক ভাবেই সন্তানের জন্ম হতে লাগল। সবাই জানেন, একটি করে সন্তান জন্মাতো, গঙ্গা তাকে জলে ফেলে আসতেন। কারণটাও আমাদের জানা। অষ্টবসুর সঙ্গে সেইভাবেই কথা হয়েছিল গঙ্গার । কিন্তু শান্তনু তো সে সব কথা জানেন না। তিনি প্রতিবারই ভয়ানক দুঃখ পান। কিছু বলতে আর পারেন না। এইভাবে সাতটি সন্তানের জন্ম হল, সাতজনকেই জননী ডুবিয়ে দিলেন স্রোতে। অষ্টম সন্তানকেও জলে ডোবানোর সময় শান্তনু আর পারলেন না। গঙ্গাকে শুধু আটকালেন না, তাঁকে পুত্রহত্যাকারিণী বলে বসলেন। গঙ্গা তৎক্ষণাৎ রাজাকে তাঁর শর্তের কথা মনে  করিয়ে দিলেন। জানালেন অষ্টবসুর শাপগ্রস্ত হওয়ার আর তাঁর এরূপ অদ্ভুত আচরণ করার কাহিনী। এবং পুত্রটিকে সঙ্গে নিয়ে শান্তনুকে ছেড়ে চলে গেলেন। অবশ্য বেশ কয়েক বছর পর, গাঙ্গেয় দেবব্রত, সেই পুত্রের নাম, অস্ত্রবিদ্যায় শাস্ত্রবিদ্যায় নিপুণ হয়ে ফিরে এলেন বাবার কাছে। বাবা-ছেলের দিন কেটে যেতে লাগল সুখে। 
চার বছর পর শান্তনু একদিন যমুনার তীরবর্তী কোনো বনে গেছেন(আগে গঙ্গার ধারে যেতেন, এখন যমুনার ধার!), এমন সময় নাকে এল উৎকৃষ্ট এক সুরভি। মনে আছে তো? সেই যোজনগন্ধা। সেই সত্যবতী । ইতিমধ্যে সেই কিশোরী যুবতী হয়েছে। আরো সুন্দরী আরো মোহমুগ্ধকর!!! শান্তনুও দীর্ঘ দিন নারীসঙ্গহীন! সত্যবতীর রূপ যা, তা কেমন মুনিঋষিদেরও মুণ্ডু ঘুরিয়ে দেয়,  তা তো জানি আমরা। শান্তনুর অবস্থা এমন হল, পারলে তখনই ঝাঁপিয়ে পড়েন আর কী! এও আমি বানিয়ে বলছি না কিন্তু । এমনটাই লেখা আছে মহাভারতে । 
রূপমাধুর্য্যগন্ধৈস্তাং সংযুক্তাং দেবরূপিণীম্। সমীক্ষ্য রাজা দাসেয়ীং কাময়ামাস শান্তনুঃ।। 
রাজা শান্তনু দাসরাজার  কন্যার রূপ লাবণ্য ও সৌরভ দেখে তার সঙ্গে সম্ভোগ করতে ইচ্ছে করলেন।
আর একটুও সময় নষ্ট না করে তৎক্ষণাৎ চলে গেলেন তার বাবা জেলেদের প্রধান  দাসরাজার কাছে। দাসরাজা এবার শর্ত দিল যে সত্যবতীর পুত্র হলে সেই সিংহাসনে বসবে, এমন কথা পেলেই তবেই সত্যবতীকে তিনি দেবেন। স্বাভাবিক । শান্তনু তখন প্রায় প্রৌঢ়। আটটি সন্তানের বাবা, সে যতই এখন একজনই বেঁচে থাকুক না কেন। সময় তো বয়ে গেছে স্রোতের মত। এমন একজন মানুষের সঙ্গে সত্যবতীর মত মেয়ের বিয়ে দেবেন, বাবা তো এমন শর্ত রাখতেই পারেন। 
তবে শান্তনু সেকথা একবারে মানতে পারলেন না। হস্তিনাপুরে ফিরে এলেন। ফিরলে হবে কি, তাঁর তখন কামজর্জর অবস্থা!!! সারাক্ষণ মূর্ছিতপ্রায়, হাত পা চিন্তাশক্তি — কিছুই আর স্ববশে নেই, স্বপনে শয়নে শুধুই সত্যবতী । এই করতে করতে তিনি রোগা হতে লাগলেন, চেহারার দীপ্তি ম্লান হতে লাগল। যৌনমিলনের অভাব সোজা বিষয় নয় কিন্তু । মানুষের জীবনে যৌনতা যে কতখানি প্রয়োজনীয়, তা ভারতবর্ষের প্রাচীন সাহিত্য, স্থাপত্য, চিত্রকলা সবেতেই প্রকাশিত । তা নয়ত দেবতার মন্দিরে নরনারীর মিলনদৃশ্যের বর্ণনা থাকত নাকি! কুমারসম্ভবম্ লেখা হত নাকি!!! প্রেম আর শরীরী মিলন– দুইই কিন্তু সমান গুরুত্বপূর্ণ ।
আমরা কালিদাসকে মনে রাখি মূলত তাঁর মেঘদূতম্, অভিজ্ঞানশকুন্তলম্, আর কুমারসম্ভবম্  দিয়ে । এই তিন কাব্যেই প্রেম আর শরীরী বর্ণনা আছে। তবে আসল গল্পকে ভিত্তি করে প্রয়োজনে তা এসেছে । কিন্তু তাঁর রচিত ছোট ছোট তিনটি কাব্যকথা নিয়ে, যেগুলি মূলত যৌনকথানির্ভর,  আমরা কমই আলোচনা করি। এমন কি, অনেক পণ্ডিত মানুষ সেগুলিকে কালিদাসের রচনা বলেই মনে করেন না। কারণ সেই এক, পরবর্তী কালে যৌনতা নিয়ে লুকোচুরি খেলার অভ্যাস । কিন্তু এই লুকিয়ে রাখা, রেখেঢেকে কথা বলা আমাদের সাহিত্যিকদের রক্তে মোটে ছিল না! 
শৃঙ্গারতিলক কাব্যে কবি কালিদাস দুই বন্ধুর কথোপকথন লিখছেনঃ
— ভাই, কোথায় চললে?
— বৈদ্যের বাড়ি ।
— সেখানে কেন?
—রোগ সারানোর জন্য ।
—-সর্বরোগহর প্রিয়তমা কি বাড়িতে নেই? — যদি বায়ু হয়ে থাকে, কলসের মত স্তন দুখানি মর্দনেই তা সেরে যাবে। যদি পিত্তি পড়ে থাকে, তাহলে প্রিয়ার ঠোঁটদুখানির রস অমৃতজ্ঞানে পান কর, সেরে উঠবে। আর যদি শ্লেষ্মা হয়ে থাকে!! সে তো আরো ভালো!! প্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গমের যে পরিশ্রম, রতিক্রীড়ার যা পরিশ্রম, তাতেই সর্দি-টর্দি দূরে পালাবে!! ঋতুসংহার কাব্যে প্রতি ঋতুর বর্ণনায় এসেছে রমণীর সৌন্দর্য্যের কথা। ঘনঘোর বর্ষায় মেঘের গম্ভীর রোষে ভরা গর্জনে আর বিদ্যুতের চমকে বিহ্বল রমণীরা স্বামীর ওপর রাগ ভুলে তাকে সজোরে জাপ্টে ধরে। হেমন্তের সময় কবি বলছেন, এই সময় রমণীরা সম্ভোগের আনন্দ উপভোগ করার জন্য সারা শরীরে চন্দন মাখে, মুখে কুঙ্কুম আর চন্দনের নক্সা আঁকে, অগুরু লাগিয়ে মাথার চুল সুগন্ধিত করে তোলে। রতিশেষে ক্লান্ত আর তৃপ্ত হয়েও ঠোঁটে দাঁতের কামড়ের জন্য আনন্দ হলেও জোরে হাসে না; পাছে ব্যথা লাগে! শীতের সময় প্রেমিক তার প্রিয়ার কুঙ্কুম-রাঙা, কোমল অথচ নতুন যৌবন-উষ্ণ বুক দুটি নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে নিজেও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আর বসন্তের আগমনে তো সবই আরোও লোভন আরো কামাতুর হয়ে ওঠে; এমনকী কামের তাড়নায় যুবকযুবতীরা স্থূল বস্ত্র ছেড়ে পাতলা সূক্ষ্ম বস্ত্র গায়ে জড়িয়ে নেয়। স্ত্রীর বিচ্ছেদে আকুল পথিক বউলে ভরা আমগাছ দেখেও উদ্বেলিত হয়ে বিলাপ করতে থাকে।  
মানে এই রকম খোলাখুলি কথাবার্তা ছিল আমাদের সাহিত্যে। সেই আমরা এমন হয়ে গেলাম, যে কোকিলের ডাকের কথা থাকলে অশ্লীলতা খুঁজে পেতাম । শেষে রবীন্দ্রনাথকে এসে উদ্ধার করতে হল। “মংপুতে রবীন্দ্রনাথ” এ মৈত্রেয়ী দেবীকে বলছেন রবীন্দ্রনাথ, আমি এসে তো তোমাদের সাবালক করলাম ।  যৌনতা নিয়ে আমরা বহুকাল ধরে বহু ভণ্ডামি করছি। তাই এত লুকোছাপা তাই এত নীল ছবি এত বটতলার সাহিত্য তাই এত ধর্ষণ। যৌনতাকে স্বাভাবিক জীবনের অঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করতে পারলে, সহজভাবে নিতে পারলেই কিন্তু বিকৃতি অনেকটা পরিমাণে কমে।
 যাক্, ক’দিন পরেই দেবব্রত খেয়াল করলেন বাবার এই পরিবর্তন । বাবাকে জিজ্ঞেস করে খুব একটা সদুত্তর পেলেন না। তখন গেলেন বাবার অত্যন্ত হিতৈষী বৃদ্ধ এক মন্ত্রীর কাছে। সেইখানে যখন শুনলেন আসল কারণটি, সোজা উপস্থিত হলেন দাসরাজার কাছে। এবং তাঁর শর্ত শুনে প্রতিজ্ঞা করলেন তিনি কখনোই হস্তিনাপুরের সিংহাসনের দাবিদার হবেন না, এমনকী আজীবন ব্রহ্মচারী থাকবেন। তার পরের ঘটনা বেশ সংক্ষিপ্ত । দেবব্রত সত্যবতীকে শান্তনুর কাছে নিয়ে গেলেন এবং বিয়ে করে শান্তনু নববধূকে নিয়ে আপন ভবনে ঢুকে গেলেন।
 এই আরেক আশ্চর্য! বা এইই স্বাভাবিক!!! যুবক পুত্র, সক্ষম পুত্র, যোগ্য পুত্র এমন ভীষণ প্রতিজ্ঞা করলেন যে সারা জীবন তিনি অনূঢ় থাকবেন। শুধু তাই নয়, স্ত্রী সঙ্গই করবেন না, ব্রহ্মচর্য পালন করবেন। সেই ছেলের প্রৌঢ় বাবা, তার এমন যৌন তাড়না, তিনি তা মেনে নিলেন!!! একবারের জন্যেও কিন্তু কোনো আপত্তি, বা কিছু বলা, যে এমন হয় না দেবব্রত; একটি শব্দ নির্গত হল না তাঁর মুখ থেকে!!! বাবার কামপূরণে ছেলের জীবনে এমন অন্ধকার নেমে আসা রামায়ণে তো বটেই আর মহাভারতের মহারণ্যেও আরো ঘটেছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত