নপুংসক

রিক্তাকে আমি চিনি সেই ন্যাংটাবেলা থেকে।

আমরা দুজনে প্রায় পিঠাপিঠি বয়সের। একই সরকারী কোয়ার্টারে থাকতাম আমরা। রিক্তার আর আমার বাবা একটি সরকারী অফিসের তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী ছিলেন। সময়টা ছিল আশির দশকের মাঝামাঝি। খুব বেশি স্বচ্ছলতায় ভরা ছিল না আমাদের জীবন। জীবনের টুকিটাকি হাজার দুর্ভোগ আর ঝুট ঝামেলার মধ্য দিয়েই আমাদের বাবা-মা রা জীবনের ঘানি টেনে চলছিলেন।

এর মাঝেই আমরা বেড়ে উঠছিলাম, বাসাবাড়ির ফাঁকফোকড়ে অল্প একটুখানি পানির সংস্পর্শে গজিয়ে ওঠা পাকুড় গাছের মতোই। আড়ালে আবডালে চাপা পড়ে থেকেই কেটে যাচ্ছিলো আমাদের অযত্নের শৈশব। আমরা থাকতাম মানিকগঞ্জের বেউথার কাছে। আমাদের শৈশবের সময়টাতে সেই জায়গাটা ছিল সবুজের গালিচা। ইতিউতি চেয়ে থাকা অল্প দু’চারটি বাড়ি বাদ দিয়ে পুরোটা জুড়েই ছিল ক্ষেত। অপার সবুজের মায়া জড়ানো মমতাময় প্রকৃতি তার স্নেহের পরশ বিছিয়ে রেখেছিল আমাদের জন্য। নিজ নিজ ঘরের অবহেলা আর অযত্ন তাই আমাদের বিন্দুমাত্রও স্পর্শ করতে পারতো না।

রিক্তা বয়সে আমার সমসাময়িক হলেও সব কিছুতেই আমার ওপরে মাতব্বরী খাটাতে চাইতো। আর কথায় কথায় এক বস্তা নালিশের ঝুড়ি নিয়ে হাজির হয়ে যেত আমার মা’র কাছে। গাল ফুলিয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলতো,

‘মঞ্জু আমার জামা ছিঁড়ে দিছে। মঞ্জুরে মাইর দ্যান!’

‘মঞ্জু আমারে ঐ জোলার কাছে নিয়া গিয়া গায়ে হাত দিছে। মঞ্জু খারাপ। মাইর লাগান!’

অসভ্য অকথ্য সব নালিশের ফর্দ। যার মধ্যে বেশিরভাগেরই কোন ভিত্তি থাকতো না। কারণ রিক্তার গায়ে ছিল অনেক শক্তি। হয়ত ঐ বয়সেই ভাত খেত বেশি। আমি ছিলাম জন্মগত ভাবেই দুবলা পাতলা। রিক্তার সাথে শক্তিতে এঁটে ওঠা আমার পক্ষে অসম্ভব ছিল। সেই আমি ওকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে গায়ে হাত দিব, এটা কল্পনা করাও দুঃসাধ্য ব্যাপার ছিল। আর তাছাড়া রিক্তা দেখতে মোটেও তেমন কিছু আহামরী কিছু ছিল না। ফোলা ফোলা গালের ওপরে কুতকুতে দুটা চোখ। প্রায় সময়েই সেই চোখের কোণায় পিঁচুটি জমে থাকতো। থ্যবড়া নাকটাকে দেখে মনে হতো কেউ বুঝি এক ঘুষিতে ওটার ভবলীলা সাঙ্গ করে দিয়েছে। সেখান থেকে আবার ক্ষীণ ঝরণার মতো দিনরাত টিপটিপ ঝরতে থাকতো। ঠোঁটটারও নিস্তার ছিল না। দু’চারটা জ্বরঠোসা সেখানে বসেই থাকতো সবসময়। কাজেই একে নিয়ে সেই শিশু বয়সে আমার মনে কোনরকম ফ্যান্টাসি জাগতো না। ভালোমত ওসব কিছু বুঝতামও না আমি। রিক্তাটাই কোত্থেকে যেন দুনিয়ার ইঁচড়ে পাকা একটা মেয়ে হয়েছিল।

মা সত্যি মিথ্যা যাচাই করে সময় নষ্ট করতো না। ঝামেলা এড়ানোর জন্য আমাকে সাথে সাথেই পাকড়াও করে ঝপাং ঝপাং করে পাছা বরাবর কয়েকটা কিল বসিয়ে দিত। আমি প্রচণ্ড ব্যথায় কঁকিয়ে উঠতাম। সেটা দেখে রিক্তার ফোঁপানি সাথে সাথেই বন্ধ হয়ে যেত। একান ওকান হাসিতে চারদিক উদ্ভাসিত করে বলতো,

‘কেমুন মজা! আর লাগবি আমার পিছে?’

আমি পাছা ঘষতে ঘষতে শপথ নিতাম, এর শোধ আমি এই জন্মেই তুলবো। রিক্তাটাকে জন্মের শিক্ষা দিয়ে ছাড়বো।

দিনে দিনে বেউথা ঘাটে ভিড়বাট্টা বাড়তে লাগলো। জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী হতে লাগলো। বাবার পকেটের ওজন আরো কমে যেতে লাগলো। আমাদের দু’কামরার বাসাটা দিনে দিনে আরো বেশি জীর্ণ শীর্ণ হতে লাগলো। আমরাও শৈশব পেরিয়ে কৈশোরের শেষ মাথায় চলে এলাম।

রিক্তার সাথে এখনো আমার উঠতে বসতে ঝগড়া বাঁধে। ছেমড়ির কী যে বাজে স্বভাব! কথায় কথায় আমার পায়ে পাড়া লাগিয়ে ঝগড়া বাঁধাতে আসে। আমি যতই চুপ করে থাকি ওর গলার আওয়াজ ততই চড়তে থাকে। আর যদি ভুল করেও কিছু বলে ফেলি, তাহলে তো কথাই নেই। সেই ছোটবেলার মতো আমাকে টানতে টানতে মা’র কাছে নিয়ে যায়।

আমি রিক্তার অত্যাচারে ভেতরে ভেতরে অস্থির হয়ে উঠতে লাগলাম। ওকে দৃশ্যতঃই এড়িয়ে চলতে শুরু করলাম। কিছু বলতে এলে ভাব দেখিয়ে উল্টোদিকে হাঁটা দিতাম। মনে মনে বলতাম,

‘তোর সাথে আমার ইয়েটাও কথা বলবে না!’

এর মাঝেই আলগোছে কৈশোরকে ফাঁকি দিয়ে তারুণ্য এসে ইশারা করে গেল আমাদের।

আমরা তখন সদ্য যৌবনের ঘায়ে মুর্ছা পেতে আগ্রহী কিছু পোক্ত কিশোর কিশোরী। রিক্তার বান্ধবী নীলাকে আমার খুব ভালো লাগতো। নরম সরম স্বভাবের মৃদুভাষী একটি বালিকা। চোখে মুখে কিশোরীবেলার সবটুকু সৌরভ তখনো জড়াজড়ি করে মিশে আছে। আমার খুব ইচ্ছে করতো, রিক্তার চোখ বাঁচিয়ে নীলার সাথে দু’চারটা কথা বলি। ওর স্কুলের রেজাল্ট কিংবা পড়াশুনা নিয়েই হোক সেটা। তবুও চোখে চোখে তাকিয়ে একটুখানি ভাব বিনিময়। এটুকুই ইচ্ছে ছিল।

কিন্তু সেই ইচ্ছা আমার কোনদিনও আলোর মুখ দেখেনি। রিক্তার পুলিশী হাবভাব আর চালচলনে আমি নীলার ধারেকাছেও ঘেঁষতে পারতাম না। আমার প্রথম প্রেমের কুঁড়ি যত্নের অভাবে আফোঁটাই রয়ে গেল।

একদিনের কথা। ভর দুপুর। সেদিন ছিল ছুটির দিন। আমি দুপুরের ভাত খেয়ে বাসার পেছনের পুকুরপাড়ে গিয়ে একটু বসেছি। মা সেদিন কুমড়ো বড়ি শুকাতে দিয়েছিল ঘাটে। আমার ওপরে নির্দেশ ছিল, সেই কুমড়ো বড়ি দেখেশুনে রাখা। বিড়াল কিংবা কাক যাতে মুখ লাগাতে না পারে। আর মানুষের হাত যেন এর ত্রিসীমানাতেও ঘেঁষতে না পারে। আমি তিন গোয়েন্দার নতুন প্রকাশিত বইটা ধার করে এনেছিলাম আমার ক্লাসমেট শিহাবের কাছ থেকে। শিহাবের বাবা অনেক বড়লোক। মানিকগঞ্জ শহরে ওদের মস্ত তিনতলা বাড়ি। ওর বাবা রিক্সার ব্যবসা করে ভালোই পয়সাপাতি কামিয়ে ফেলেছে।

শিহাবেরও আমার মতো বই পড়ার নেশা। তিন গোয়েন্দা আর দস্য বেনহুরের সব কয়টা সিরিজ ওর কেনা চাই। আর শিহাবের কেনা মানেই আমার কেনা। চাতক পাখীর মতো দিন গুণে বসে থাকতাম, কবে শিহাবের পড়া শেষ হবে আর বইটা আমার হস্তগত হবে।

আমি আনমনে বই পড়ছিলাম।

আমার সামনে রাখা খবরের কাগজে বিছানো কুমড়ো বড়িতে পড়ন্ত দুপুরের তীর্যক রোদ এসে ওম ছড়াচ্ছিল।পুকুরের শান্ত পানিতে টুপ টাপ কখনো কখনো হাল্কা কম্পন এসে দোল লাগাচ্ছিল। দু’পাশের ডুমুর গাছগুলোর এলিয়ে পড়া শাখাগুলো আমার খুব কাছে এসে মৃদুমন্দ চামড় দুলিয়ে যাচ্ছিলো। আমার সমস্ত মন তখন তিনজন কিশোরের সম্ভাব্য এ্যাডভেঞ্চারের দিকে সাগ্রহে ঝুঁকে রয়েছে।

হঠাৎ পুকুরের পানিতে তুমুল আলোড়ন। আমি চমকে এদিক সেদিকে তাকাতে লাগলাম। আচমকাই খিল খিল হাসির শব্দে ভেঙে খানখান হয়ে গেল পড়ন্ত দুপুরের সমস্ত নৈঃশব্দ। এই হাসি আমার অতি চেনা। তবু আমি খানিক অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হাসির উৎসটাকে খুঁজে বের করতে মরিয়া হয়ে উঠলাম। খুব বেশিক্ষণ খুঁজতে হলো না আমার। একটু কিছু সময় আমাকে সাসপেন্সে রেখেই পুকুরের পেছন দিকের ঝোপালো ছাতিম গাছটার আড়াল থেকে বের হয়ে এলো রিক্তা, আমার জন্মের দুশমন। আমি চোখমুখ শক্ত করে বললাম,

‘তুই এখানে কী করছিস? এইসময় এখানে আসছিস কী করতে?’

রিক্তা ভ্রু নাচিয়ে ঢঙের তুফান ছুটিয়ে উত্তর দিল,

‘এটা তোর বাপের জায়গা নাকি যে আমি আসতে পারবো না?’

আমার গা জ্বলে গেল রাগে। জ্বলতে জ্বলতেই বললাম,

‘খবরদার, কথায় কথায় বাপ তুলবি না! ছোটলোক!’

রিক্তা তেড়ে এলো। এই সুযোগ সে সচরাচর পায় না। আজ আমার মুখে কথা ফুটেছে এতে সে ভেতরে ভেতরে মহাখুশি। বোবার সাথে ঝগড়া করে কীসের মজা!

‘আমি ছোটলোক? আর তুই কী রে? তুই একটা…তুই একটা…তুই একটা ন…নপুংসক!’

আমি এই ভয়ানক খটমট শব্দে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। বাংলা শব্দে আমার বিশেষ একটা পারদর্শীতা ছিল না। যদিও আমি বই কম পড়তাম না। কিন্তু সেই বইয়ের গল্প গেলাতেই আমি বেশি আগ্রহী ছিলাম। শব্দ নিয়ে মাথা ঘামাতে আমি মোটেও উৎসাহী ছিলামনা।

রিক্তা বুঝতে পারলো আমি শব্দটার অর্থ বুঝতে পারিনি। আর সেটার মজা সে পুরোপুরি চেটেপুটে উপভোগ করলো। নাকমুখ কুচকিয়ে দাঁতে দাঁতে ঘর্ষণ লাগিয়ে সে বলতে লাগলো,

‘ইহ্‌! নপুংসকের প্রেম করার ইচ্ছা জাগছে! তুই তো জানিসই না মেয়েদের শরীর কেমন হয়। মেয়েদের শরীর কিভাবে ছুঁয়ে দেখতে হয়। ট্যারা চোখে ছাগলের মতো তাকায় কারা জানিস? ঐ যারা নপুংসক হয়… তারা! ক্ষ্যামতা নাই যাদের! হি হি!’

আমার সারা শরীর কাঁপতে লাগলো। এসব কী ভয়াবহ কথা বলছে রিক্তা! এতদিন যা কিছু ঝগড়া ঝাঁটিই করুক, এসব আপত্তিকর শব্দ সে ঘুণাক্ষরেও উচ্চারণ করেনি। মেয়েদের শরীর কিভাবে ছুঁতে হয়, তা জেনে আমি কী করবো? আমার কি কোন মেয়ের শরীর ছুঁতে ইচ্ছা করেছে নাকি? ওসব আজেবাজে কথা আমি কখনো কল্পনাও করিনি। আর প্রেম করার কথা কী বললো রিক্তা? তাহলে কি এই ধুরন্ধর মেয়ে নীলার প্রতি আমার অন্যরকম আকর্ষণ টের পেয়ে গেছে? যে রকম চালবাজ একটা মেয়ে! ওর পক্ষে টের পেয়ে যাওয়া মোটেও কিছু অসম্ভব ব্যাপার নয়!

আর নপুংসক! ওটা কী জিনিস? নিশ্চয়ই খুব ভয়ানক জিনিসই হবে! রিক্তার মুখ থেকে ভয়ানক ছাড়া আর কিছু বের হয় নাকি?

আমি তোতলাতে তোতলাতে বললাম,

‘আ…আ…আমি এ…এ…এখনই তোর বাবাকে স…স…সব বলে দিব! তুই একটা পচা মেয়ে!’

রিক্তা দাঁত বের করে বললো,

‘বলগা যা! আমি কী বলবো জানিস? তুই একটা নপুংসক! তোর আজেবাজে কাজ করতে ইচ্ছা করে। তুই কিছু পারিস না তাই খালি ফাল পাড়িস!’

‘তুই একটা শয়তান!’

‘হি হি…আর তুই একটা নপুংসক!’

শব্দটার অর্থ মাথামুন্ডু বুঝতে পারছি না। তবু শব্দটা শোনামাত্রই আমার শরীরটা কেমন ঝিম মেরে যাচ্ছিলো। ইচ্ছে করছিল, অভিধান খুঁজে খুঁজে আজ কঠিন কঠিন গালি খুঁজে বের করে সব রিক্তার ওপরে ঝেড়ে দিই। এই মেয়ে নিশ্চয়ই সেসবের ঘোরতর যোগ্য!

আমি তখন রিক্তার কথাবার্তা শুনে তোব্দা মেরে আছি।

মুখে একটাও শব্দ জুটছেনা আমার। আচমকা রিক্তা একটা ঘটনা ঘটালো। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে ঝপ করে এসে আমার হাতটা ওর জামার নীচে চালান করে দিল। আমি শশব্যস্ত হয়ে হাতটাকে যতই বের করে আনতে চাইলাম, রিক্তা ততই সেটাকে শক্ত করে ধরে রাখলো। কিছুক্ষণ এভাবে ধরে রাখার পরে নোংরা একটা হাসি দিয়ে বললো… ‘কী বুঝলি? বুঝিস কিছু? কী করতে হয় জানিস কিছু? ছাগল একটা! তুই আসলেই ঐ জিনিস! নপুংসক! খবরদার নীলার দিকে তাকাবিনা। একেবারে চোখ গেলে দিব! হারামজাদা আমার বান্ধবীকে দেখে! কেন? আমি দেখতে খারাপ নাকি? তুই অন্যদিকে তাকালে এক্কেবারে চোখ গেলে দিব!

আমি ঘটনার আকস্মিকতায় তখন একেবারেই স্তব্ধ হয়ে গেছি। রিক্তা আমার সাথে কী করলো, কেন করলো…কিছুই তখন আমার মাথায় ঢুকছে না। আমার চারপাশে তখন যেন সহস্র ঝিঁ ঝিঁ পোকা সগর্বে তাদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। কান মাথায় তালা মেরে আমি সেই নিস্তব্ধ দুপুরে নিঝুম হয়ে বসে রইলাম।

রিক্তা কখন সেখান থেকে চলে গিয়েছে আমি জানতে পারিনি।

কিন্তু সেদিনের পর থেকে কিছু একটা পরিবর্তন ঘটে গেল আমাদের জীবনে। আমি রাতারাতি যেন কৈশোরের ছোট্ট ঘেরাটোপটাকে এক লাফে অতিক্রম করে যৌবনে ঢুকে পড়লাম। এখন আমি অনেক কিছুই বুঝি। জীবন, পারিপার্শিকতা, জীবনের রহস্য…সব যেন একটু একটু করে নিজেদের সব মায়াজাল ভেঙে ফেলে আমার জ্ঞানের সীমানায় এসে আস্তানা গেঁড়ে বসে গেল। আমি এখনো প্রকৃতি দেখি। কিন্তু সেই প্রকৃতির ভেতরের ছন্দটাকে আমি গভীর মমতায় অনুভব করতে চেষ্টা করি।

যার জন্য এতকিছু … সেই রিক্তা কিন্তু আমার চেয়েও আমূল বদলে গেল। এখন আর আগের মতো হুটহাট এসে আমার সাথে ঝগড়া বাঁধায় না। আমার চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে আমাকে উত্তক্ত করে না। আমার নিস্তব্ধ দুপুরের শান্তিগুলোকে আচমকা অশান্তিতে বদলে ফেলে না। আমি গভীর বিস্ময়ে অনুভব করলাম, বিষয়টা আমার কাছে ততটা ভালো লাগছে না। ইন্দ্রিয়ের ওপারের অন্য কোন ইন্দ্রিয় যেন চাতক পাখীর মতো রিক্তার উপস্থিতির আশায় দিন গুনতো।

কিন্তু সেই দিন আর কোনদিনও এলো না… অবোধ এক কৈশোরকে জাগিয়ে দেওয়া সেই নিস্তব্ধ দুপুর শুধু আমার স্মৃতিতেই ভাস্বর হয়ে জেগে রইলো।

দিনে দিনে আমরা সত্যি সত্যি বড় হয়ে গেলাম। স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজের দোরগোড়ায় এসে উঁকি মারলাম।

রিক্তার সেই বান্ধবী নীলার বাবা বদলী নিয়ে চলে গেলেন অন্য শহরে। আমার সুপ্ত প্রেম সুপ্তই রয়ে গেল। শুধু এক আশ্চর্য অন্তর্যামী সেই প্রেমের আদ্যোপান্ত জেনে গিয়ে আমার প্রেমের ভেলার সলিল সমাধি ঘটিয়ে দিল।

মেট্রিকে বেশ ভালো ফলাফল করলাম আমি। সব সাব্জেক্টে লেটার নিয়ে স্টারমার্ক পেলাম। স্কুলের টিচারেরা বোর্ড অফিস থেকে খবর নিয়ে জানালেন, অল্প কিছু নাম্বারের জন্য বিশজনের তালিকাতে ঢুকতে পারিনি। বাবা-মা’র চোখেমুখে আশার আলো ঝিকমিক করে উঠলো। বাবার নুয়ে পড়া ক্লান্ত শরীরটা অদ্ভুত এক অজানা টনিক পেয়ে তরতাজা হয়ে উঠলো। মা’র অবয়বেও খুশি খেলা করে আজকাল। পাড়া প্রতিবেশীরা এসে আমাকে দেখে যেতে লাগলো। ঈর্ষাকাতর প্রলুব্ধ চোখে চেয়ে থেকে তারা মাকে বলে,

‘রত্ন পেটে ধরছো। আমাদের তো আর সেই কপাল নাই! কেরানীগিরি করে কলম পিষেই জীবন কাটাবে। ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বানানোর আশা তো আর আমাদের পোড়া কপালে সয় না!’

আমার মনের কোণে সুপ্ত আশা ছিল। এবারে হয়ত রিক্তার দেখা পাবো। একটাবার কি অভিনন্দন জানাতে আসবে না আমাকে? কিন্তু আশা পূরণ হলো না। রিক্তা এতকিছুর পরেও আমাদের বাসায় এলো না। ওর রেজাল্ট মোটামুটি হয়েছে। কোনরকমে উতরে গেছে স্কুলের ধাপ।

কলেজের প্রথম বর্ষেই সব আবার অন্যরকম হয়ে গেল।

আমি ভর্তি হলাম ছেলেদের কলেজে, রিক্তা মেয়েদের কলেজে। মাঝে মাঝে কলেজে আসা যাওয়ার পথে ওদের কয়েকজনের দলটাকে দেখতে পেতাম। আমারও নতুন নতুন বন্ধু জুটেছিল। সবাই মিলে একসাথে সাইকেলে চেপে কলেজে যেতাম। যাওয়ার পথে গল্পের তুফান উড়তো। বন্ধুদের আজেবাজে জোক, হাসি মশকরা…দিনগুলো তখন ফুরফুরে হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো সুস্বাদু। কোন এক ঘোরলাগা দুপুরে এক ইঁচড়েপাকা মেয়ের মুখ থেকে শোনা সেই নপুংসক শব্দটা আমি প্রায় ভুলেই গেছি।

সেদিন রাতেই আমি চুপিচুপি বাংলা অভিধান বের করে শব্দটার অর্থ জেনে নিয়েছিলাম। আর সেটা জেনে ভীষণ মন খারাপে মুহ্যমান হয়েছিলাম কয়েকদিন। মনের মধ্যে মিশ্র একটা অনুভূতি হয়েছিল। তীব্র ঘৃণায় পিষে ফেলতে ইচ্ছে করেছিল রিক্তাকে। কিন্তু একই মনেরই অন্য কোন এক অজানা গহ্বরে অদ্ভুত একটা মমতাও জন্মেছিল সেই পাজী মেয়েটার জন্য। মনে হয়েছিল, হয়ত সত্যিই আমি কাপুরুষ। সোজাসুজি তাকাতে শিখিনি মেয়েদের দিকে। তাই এমন লুকিয়ে চুরিয়ে দেখি। হয়ত কাপুরুষ শব্দটাকেই বলতে চেয়েছিল রিক্তা। ভুল করে ঐ খটমট অজানা শব্দটা বলে বসেছিল।

রিক্তাদের দলটা আমাদের সামনে পড়ে গেলে আমি খুব সতর্কভাবে রিক্তার দিকে তাকাতাম।

সেও চোখের কোণ দিয়ে আমাকে লক্ষ করতো, বেশ বুঝতে পারতাম। যদিও সামনাসামনি আর কখনো কথা হয়নি আমাদের। সেই অদ্ভুত দুপুরটা আমাদের দুজনকে একেবারেই বদলে দিয়েছিল।

আমার কলেজের এক বন্ধু কমল, একটু বখাটে টাইপের। প্রতিদিন রিক্তাদের দলটাকে অতিক্রম করার সময়ে কমল কিছু না কিছু বাজে কথা বলবেই। কী সেসব কথার ছিরি!

‘সাগরে ঢেউ উঠেছে রে! ওহো… ইচ্ছে করছে এখানেই শুয়ে পড়ি!’

কমলের কথাগুলো শুনলে আমারই কেমন গা ঘিন ঘিন করতো। না জানি মেয়েগুলোর কাছে কেমন লাগতো! আমার অন্য বন্ধুরাও কমলের এই অতি তরল ভাবটাকে বরদাস্ত করতো না। কেউ কেউ বিরক্তি প্রকাশ করে বলতো,

‘এসব অসভ্যপনা করলে এখন থেকে তুই একা যাবি! আসবি না আমাদের সাথে।’

কমলের গায়েও লাগতো না এসব কথা। দাঁত কেলিয়ে বলতো,

‘তোরা মায়ের কোলে শুয়ে দুধ ভাত খাগে যা! মেয়েদের দিকে তাকাবো না তো কি আকাশ দেখতে দেখতে যাবো? তোরা হচ্ছিস সব নপুংসকের দল! আমি তোদের দলে পড়ি না, বুঝলি?’

কমলের মুখে ঐ শব্দটা শুনে আমি ভেতরে ভেতরে চমকে উঠতাম। অন্যরা নাক কুঁচকে বলতো,

‘তুই আসলেই নোংরা! তোকে দলে নেওয়াই ঠিক হয়নি!’

ধীরে ধীরে পড়াশুনায় ব্যস্ত হয়ে পড়লাম আমরা সকলে। আমি আগের চেয়েও এখন আরও বেশি মনোযোগী পড়াশুনায়। মনের মধ্যে সুপ্ত বাসনা, কিছু একটা হয়ে দেখাতেই হবে!

সেদিনও মন দিয়েই পড়ছিলাম নিজের ঘরে বসে। মা আমার ঘরে ঢুকে অগোছালো আলনা গোছগাছ করে রাখছিল। তারপর আলগোছে আমাকে জিজ্ঞেস করলো,

‘হ্যাঁ রে রিক্তার খবর শুনেছিস?’

আমি চমকে উঠলাম ভেতরে ভেতরে। প্রাণপনে সেই চমকের ধাক্কা সামলাতে সামলাতে বললাম,

‘কী খবর?’

‘ওর তো বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। ছেলে নাকি ব্যবসা করে। অনেক টাকাপয়সা। দেখতে শুনতেও ভালো। খালি একটাই সমস্যা। ছেলের একবার বিয়ে হয়েছিল। আগের বউয়ের বাচ্চা হয়নি দেখে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। রিক্তার বাবা-মা জেনেশুনেই বিয়েতে রাজি হয়েছে। রাজি না হয়েই বা কী করবে? রিক্তা তো দেখতে শুনতে মোটামুটি… পড়ালেখাতেও সুবিধার না! ওর পরে আরও তিনটা মেয়ে…’

মা আরো কী কী যেন বলতে লাগলো। আমার কানে সেসব কিছুই ঢুকলো না। অনেকদিন আগের সেই ঝিঁ ঝিঁ পোকার শব্দে তালা মেরে গেল আমার চারপাশে।

তারপর রিক্তার বিয়ে, শশুরবাড়িতে চলে যাওয়া…সবকিছুই খুব মোলায়েম ভাবেই ঘটে গেল। ঠিক সিনেমাতে যেরকম ছোট থেকে এক দৌঁড়ে বড় হয়ে যায়, অনেকটা সেরকম ভাবেই রিক্তার জীবনেরও পরবর্তী অধ্যায় শুরু হয়ে গেল।

শশুরবাড়িতে চলেযাওয়ার ঠিক আগেরদিন আবার হুট করেই রিক্তা আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। সেদিনও আমি একা একা বসেছিলাম আমার ঘরে। রিক্তা প্রায় নিঃশব্দে এসে দাঁড়ালো আমার পাশে। অনেক অনেক দিন পর আবার আমরা দুজনে মুখোমুখি হলাম। আমি সোজাসুজি তাকালাম রিক্তার মুখের দিকে। রিক্তার চোখের দৃষ্টিও আনত নয় আজ। এই ক’বছরে অনেকটা বদলে গেছে রিক্তা। সেই পরিবর্তন ওর সর্বাঙ্গে দৃশ্যমান। রিক্তা স্পষ্ট গলায় বললো,

‘কালকে চলে যাচ্ছি রে! আমার তো আর তোর মতো মাথায় ঘিলু নেই! পড়াশুনা করে কিছু উল্টায়ে দিব না। আর কেউ বসেও নেই আমার জন্য যে অপেক্ষা করবো। যাই…গিয়ে দোজবরের সাথেই ঘর করি! আর কী করবো?’

রিক্তা চলে গেল। আমি অজানা এক শূণ্যতায় কিছুদিন শোকগ্রস্ত হয়ে রইলাম।

তবু জীবনের ব্যস্ততা বেশিদিন আমাকে স্থবির হয়ে থাকার অনুমতি দিল না। আবার মিশে গেলাম জীবনের সপ্ত ব্যঞ্জনের সাথে।

রিক্তা চলে যাওয়ার পরে তিন তিনটা বছর পার হয়ে গেল। আমি ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি। ছুটিছাটায় বাড়ি আসি। এক ছুটিতে মা আবার একদিন আমাকে রিক্তার খবর দিল।

‘রিক্তার বিয়েটা বুঝি টিকবে না রে! আহা রে! কী দুর্ভাগা মেয়েটা!’

ততদিনে রিক্তার অনুপস্থিতি আমার মন বেশ ভালোভাবেই মেনে নিয়েছে। জীবনের ছোটখাট শূণ্যস্থানগুলোতে অনায়াসেই নতুন নতুন মুখ এসে জায়গা করে নিতে শুরু করেছে। আমি কিছুটা আনমনেই বললাম,

‘কেন? কী হলো!’

‘বাচ্চা হচ্ছে না দেখে শাশুড়ি উঠতে বসতে কথা শোনায়। এবার নাকি এক বছরের সময় দিয়েছে। এর মধ্যে বাচ্চা না হলে ছেলের আবার বিয়ে দিবে! রিক্তার মা তো কাঁদতে কাঁদতে শেষ হয়ে গেল!’

আমার মনটা একটু খারাপ হলো এবার। ভবিতব্য কাকে কীসের মধ্যে জড়িয়ে দেয় কে বলতে পারে!

সেই ছুটিতেই আমার আবার দেখা হয়ে গেল রিক্তার সাথে। এই তিন বছরেই অনেক বদলে গেছে মেয়েটা। চোখের নীচে কালি। সারামুখ জুড়ে ছিয়ালের ছোপছোপ দাগ। আমাকে দেখে তবুও জোর করে হাসি ফুটিয়ে বললো,

‘তোর সাথে একটু জরুরি কথা ছিল। এখানে বলা যাবে না। একটু পুকুরপাড়ে আসবি?’

আমার কেন যেন অজানা এক ভয় জন্মালো মনে। মেয়েটার মনে কী ঘুরপাক খাচ্ছে? পুকুরপাড়ে যেতে বলছে কেন? সেদিনের মতো উলটাপালটা কিছু করে বসবে না তো?

রিক্তা এক লহমায় আমার মনের কথা বুঝে গেল। হাসির দমকে শরীর কাঁপাতে কাঁপাতে বললো,

‘ভয় নাই রে… ভয় নাই! আমি কিচ্ছু করবো না তোর সাথে!’

লজ্জা পেলাম। ওর সাথে বহুদিন পরে গেলাম আমাদের কোয়ার্টারের পেছনের সেই পুকুরপাড়ে। রিক্তা আঁচলে আঙ্গুল জড়াতে জড়াতে বললো,

‘তোর একটা বন্ধু ছিল না? কমল? ওর সাথে একবার দেখা করিয়ে দিবি আমার?’

আমি চমকে উঠলাম। কমলের সাথে কী দরকার রিক্তার? কমল টেনেটুনে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে এখন ওর বাবার সাথে মেকানিকের কাজ করছে। কিছুদিন আগেই দেখা হয়েছিল আমার সাথে। এখনো ঠিক সেই আগের মতোই আছে, লুচ্চা।

আমি বিস্ময়মাখা গলায় বললাম,

‘ওর সাথে কী দরকার?’

‘সেটা তো তোকে বলে কাজ হবে না! হলে তোকেই বলতাম! কিন্তু তুই তো… বাদ দে! দেখা করিয়ে দিবি নাকি বল!’

আমি খানিক বিস্ময় খানিক কৌতুহল নিয়েই রিক্তার সাথে কমলের দেখা করিয়ে দিলাম। রিক্তা আমাকে সরিয়ে দিয়ে কমলের সাথে অনেকক্ষণ ধরে কথা বললো। ফেরার পথে কমল দাঁতের সারি মেলে ধরে বললো,

‘কী রে শালা… এদ্দিনে একখান কামের কাম করলি!’

রিক্তা কমলের দিকে তাকিয়ে চোখ নাচালো। কমল আর একটা কথাও বললো না। কেমন যেন কুলুপ এঁটে ফেললো মুখে। ওদের দুজনের মধ্যে কী কথাবার্তা হলো তার কিছুই আমি জানতে পারলাম না।

এই ঘটনার প্রায় পনেরদিন বাদে রিক্তা আবার শশুরবাড়িতে ফিরে গেল। আমিও আমার ভার্সিটি জীবন নিয়ে আগের চেয়েও অনেক বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। রিক্তার কথা এবারে প্রায় ভুলেই গেলাম।

পরেরবার বাড়িতে গিয়েই আবার মা’র মুখ থেকেই খবরটা শুনলাম।

‘শুনেছিস মঞ্জু… রিক্তার না বাচ্চা হবে! মেয়েটা বেঁচে গেল রে! এবার বাচ্চা না হলে শাশুড়ি ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বেরই করে দিত! যে দজ্জাল শাশুড়ি! একবার শুনেছিলাম সমস্যাটা নাকি ওর স্বামীরই। আগের পক্ষের বউ এমনটা বলে বেড়াতো। ছেলেটা নাকি নপুংসক।’ শব্দটা উচ্চারণ করেই মা একটু লজ্জা পেয়ে গেল। তারপর আবার নিজের মনেই বললো,

‘হয়ত মেয়েটারই কোন সমস্যা ছিল। সেজন্য এসব আজেবাজে কুৎসা ছড়ায়ে বেড়াতো!’

সেই বহুদিন আগের শোনা অশ্রাব্য শব্দটা শুনে আমিও চমকিয়েছিলাম। কিন্তু সেটা কিছুক্ষণের জন্য। মনে মনে আমিও রিক্তার খবরটা শুনে খুশিই হলাম।

যাক! মেয়েটার জীবনটা উতরে গেল অবশেষে! স্বামী সংসার নিয়ে সুখে থাকুক ইঁচড়েপাকা পাগলী মেয়েটা!

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত