| 18 জুন 2024
Categories
লোকসংস্কৃতি

শীতলা দেবী করোনায় আজও প্রাসঙ্গিক

আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিট

যারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না তাঁরা হয়ত বিতর্কে যাবেন কিন্তু তাহলে কি জন্মজন্মান্তরে মানুষের বিশ্বাস কি সব মিথ্যে? এখনও কেন মানুষ জপে চলেছেন অহোরাত্র এই মন্ত্র?

নমামি শীতলাং দেবীং রাসভস্থাং দিগম্বরীং
মার্জ্জনীকলসোপেতাং সূর্পালঙ্কৃতমস্তকাম্‌।।  

এই সংস্কৃত শ্লোকের  অর্থ হলঃ

সেই দিগম্বরী শীতলা দেবীকে প্রণাম জানাই যিনি গাধার উপর বসে থাকেন, যিনি ঝাঁটা ও কলস শোভিতা, যাঁর মাথার অলংকার হল কুলো।

তিনি আমাদের মরশুমি দেবী।  হিন্দুর ‘শীতলা’, মুসলমানের ‘বুড়াবুবু’, বৌদ্ধের পর্ণ শর্বরীর সঙ্গে বিরাজিতা ‘হারিতী’, আদিবাসীদের ‘বসন্তবুড়ি’, উত্তরভারতের পার্বতী, দক্ষিণের শীতলাম্মা ও বাংলাসাহিত্যের শীতলামঙ্গলে বহু চর্চিতা লৌকিক দেবী।

আমাদের ছোটবেলায় ইশকুলে দেখেছি টিকাকরণ। নিয়েছি সেই প্রতিষেধক টীকা। মারণরোগ গুটিবসন্ত বা স্মলপক্স ১৯৭৯ সাল নাগাদ সারা বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ নির্মূল হয়েছে। কিন্তু তার আগে বহু বছর ধরে এই মারণ অসুখের বলি হয়েছেন কোটি কোটি মানুষ। আমাদের অনেক আত্মীয়, বন্ধুদের দেখেছি যাঁরা প্রাণে বেঁচে গেছিলেন তাঁদের শরীরে এই ভয়াবহ রোগের প্রমাণ স্বরূপ গর্ত গর্ত দাগ আর অনেকে দৃষ্টিশক্তি হারানোর কথা।

ছোটবেলায় বাড়ির কাজের লোকেদের বলতে শুনেছি বসন্ত রোগকে বাংলা আবহমান কালে ‘মায়ের দয়া’র দাগ । এই ‘মা’ হলেন দেবী শীতলা। আমাদের দেশের এক প্রাচীন লৌকিক দেবী। কিন্তু বসন্ত রোগের দেবী শীতলার মাহাত্ম্য অনুসন্ধান করতে গেলে এমন কিছু অন্য উপদেবতার কথা উঠে আসে যারা বঙ্গসমাজে ব্রাত্য।

স্কন্দপুরাণ এবং ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে শীতলাদেবীর উল্লেখ আছে। সেখানে তিনি গুটিবসন্তের ত্রাণকর্ত্রী। তিনি যজ্ঞাগ্নি সম্ভূতা।
ব্রহ্মা কেবল তাঁকে নয়, তাঁর সহচর জ্বরাসুরকেও পুজো করার জন্য মানবজাতিকে উপদেশ দিয়েছিলেন।

শীতলা পুজো শুধুমাত্র গ্রামের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, গোটা ভারতেই পূজিত হন। দক্ষিণ ভারতের কয়েকটি এলাকা বাদ দিয়ে সর্বত্রই শীতলাম্মার আরাধনা হয়। বৌদ্ধধর্মেও জ্বরাসুর এবং শীতলাকে মেনে নেওয়া হয় তাদের রোগব্যাধির প্রধান দেবী পর্ণ-শর্বরীর সঙ্গী হিসেবে। নেপালেও শীতলা হলেন যক্ষিণী রূপে পূজিতা।সেই সময় তিনি অনার্য সমাজের দেবী রূপেই পরিচিত ছিলেন। শবর জাতীয়রাই নাকি  শীতলার পুজো চালু করেন। পরে সকল সম্প্রদায়ের কাছেই তিনি বসন্ত রোগের দেবী রূপে পূজিতা হন।বসন্তে পৃথিবী পৃষ্ঠ উত্তপ্ত হতে শুরু করে। ভক্তদের বিশ্বাস, এই সময় দেবী নিজে গঙ্গায় স্নান করে নিজে যেমন শীতল হন তেমনই পৃথিবীর মাটিকেও শীতল বা ঠাণ্ডা করেন।

শীতলার ক্ষমতা নিয়ে অনেক গল্প আছে পুরাণে। শিবের পরম ভক্ত বিরাটরাজা তাঁকে যথেষ্ট ভক্তি করতেন না, এই অপরাধে শীতলা তাঁর রাজ্যে নানা রোগব্যাধির এমন মহামারী লাগিয়ে দেন যে, রাজা শেষ পর্যন্ত নতিস্বীকার করতে বাধ্য হন।  তিনি শীতলার করুণা ভিক্ষা করলে দেবীর মন গলে, বিরাটরাজ্য রোগমুক্ত হয়। শীতলা কাল্টের বিষয়ে যে কাহিনি বাংলার লোকসমাজে প্রচলিত, তা হল এমন। দেবী কাত্যায়ন ঋষির কন্যা কাত্যায়নী। কালকেয় নামের এক অসুর সেই সময়ে তার অনুচরদের সহায়তায় বিপুল উপদ্রব শুরু করে। তাদের দমন করতেই দেবী কাত্যায়নী রূপ পরিগ্রহ করেন। সেই সময়ে জ্বরসুর নামে এক দানব মানব সংসারে এমন এক জ্বর ছড়াতে শুরু করে, যা অনারোগ্য। কাত্যায়নীর সঙ্গীসাথীরা সেই জ্বরে আক্রান্ত হয়। সেই সঙ্গে দেখা দেয় মহামারী রূপে কলেরা, বসন্ত রোগও। কাত্যায়নী তাঁর দৈবশক্তি দিয়ে বেশ কিছু বন্ধুর অসুখ নিরাময় করেন। কিন্তু সেই রোগগুলি একেবারে নির্মূল হয়নি। তখনই কাত্যায়নী দেবী শীতলার রূপ ধারণ করেন।অর্থাৎ জ্বর ঠাণ্ডা করেন যিনি।  

ব্রহ্মার কন্যা এবং কার্ত্তিকেয়ের স্ত্রী নাকি এই শীতলাকে। পুরাণ ছাড়াও এই দেবী আছেন সহজ সরল লোককথায়, যেমন শীতলামঙ্গল কাব্যে।  আঠারো শতকের শেষের দিকে বাংলায় কবি মানিকরাম গাঙ্গুলি, দ্বিজ হরিদেব বা কবি জগন্নাথ, এমনকী আরও এক শতাব্দী আগে কবি বল্লভ এবং কৃষ্ণরাম দাস শীতলার বন্দনা করেছেন। মনসামঙ্গলের মত বাংলা সাহিত্যে শীতলামঙ্গল রচিত হয়। শীতলামঙ্গলেও সেই মনসামঙ্গলের মত পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কে ঘোল খাইয়ে একজন প্রান্তিক, লোকদেবীর মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠা পাওয়া। দেবতাদের অধিকার থাকবে কিন্তু মেয়েদের দেবী হবার অধিকার লাভের জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে হয়েছে যুগে যুগে। শীতলা তাই বুঝি স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নেমেছিলেন এলোচুলে, মারণরোগ ছড়িয়ে, অনুচর জ্বরাসুরকে নিয়ে। মানুষের দেহে জ্বর হয়ে প্রবেশ করে শিবভক্ত রাজা চন্দ্রকেতুর রাজ্যে ছড়িয়ে দিলেন সেই রোগ। নিজে রূপ নিলেন বৃদ্ধার। রাজ্যের সবাই মুখ ঘোরালো তার থেকে।আরো রেগে গেলেন তিনি। সমাজের আনাচেকানাচে আবাল-বৃদ্ধবনিতার মধ্যে ছড়াতে লাগলেন সেই রোগ, হাতে লাঠি, কাঁধে চৌষট্টি বসন্তের ঝুলি নিয়ে।

শীতলামঙ্গলে পাই,
কেবা কার পুত্র বধূ কেবা কার পিতা/ মরিলে সম্বন্ধ নাই শুন এই কথা।।
জম্মেও ছাড়িবে না মহেশঠাকুর/ শুন রে অজ্ঞানবুড়ি এথা হইতে দূর।।  

রাজার সঙ্গে এভাবেই চাপানউতোর চলেছিল শীতলার। ঠিক মনসার সঙ্গে চাঁদসদাগরের। রাজপুত্র বসন্তে আক্রান্ত হতে রাজারাণীর টনক নড়ল। দেবী শীতলা তখন জরতি বেশে রাজকুমারের পত্নী চন্দ্রকলার নিকট উপস্থিত হলেন।

ব্রাহ্মণী দেখিয়া দন্ডবত হইল সতী/ ঈশ্বরী বলেন হও জনম এয়োতি।।  

মহাযান বৌদ্ধ ধর্মে শীতলাকে দেবী পর্ণশর্বরীর সঙ্গিনী হিসেবে কল্পনা করা হতে থাকে। পর্ণশর্বরী রোগব্যাধির দেবী। বজ্রযানী মতে, তিনি আবার দেবী তারার সঙ্গিনী। পাল যুগ থেকে বাংলায় শীতলা মূর্তির সঙ্গী হতে শুরু করে জ্বরাসুর।

বাংলায় তাঁর পুজো হয় বসন্তকালে, ফাল্গুন চৈত্রমাসে। বসন্ত ঋতুর নামের সঙ্গেও বসন্ত  রোগের সংযোগ।  যতই সে কোকিলের মিষ্টি ডাক, ফুলেল প্রকৃতি, দখিনা বাতাস আর ভালোবাসা-ভালোবাসির শুভ বার্তা নিয়ে আসুক না কেন  মহামারীর জীবাণুও বয়ে আনে এই বসন্তকাল। সেইকারণেই বুঝি শাস্ত্রে এই সিজন চেঞ্জের সময় কে বলা হয় যমদংষ্ট্রা অর্থাৎ রোগের কবলে পড়ে মানুষ মৃত্যু  মুখে পতিত হওয়াটাও বিচিত্র নয়। শুধু শীতলাই নয় তাঁর সঙ্গে এই সময় পুজো পান কলেরা বা ওলাওঠার ওলাদেবী, চর্মরোগের অধিষ্ঠাত্রী ঘেঁটু এবং রক্তের সংক্রমণ জনিত রোগের সঙ্গে জড়িত রক্তদেবী। জনজীবন থেকে গুটিবসন্ত বিদায় নিলেও এখনও বসন্তকালী দেবী শীতলা এদেশে আসেন গাধায় চড়ে আসেন সম্মার্জনী এবং কলসি হাতে, পুজো পেতে।

চৈত্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের সপ্তমী ও অষ্টমীতে এই পুজোর রীতি। শরীর ঠাণ্ডা রাখতে পান্তা খাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে এখনও। এই পুজো কোথাও কোথাও বসন্তবুড়ী ব্রত নামেও পরিচিত।

উত্তরভারতে শীতলা শিবের সঙ্গী পার্বতী। দক্ষিণ ভারতে দেবী শীতলাম্মার ভূমিকাটি সর্বার্থসাধিকা দেবীর অবতার মারিয়ম্মান বা মারিয়াত্থা দ্রাবিড় ভাষীদের মতে। হরিয়ানা রাজ্যের গুরগাঁওয়ে শীতলাকে কৃপী গুরু দ্রোণাচার্যের স্ত্রী বলে মনে করে শীতলা মন্দিরে পুজো হয়। আধুনিক শহুরে মানুষ শীতলাকে নিতান্তই গ্রামের অশিক্ষিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষের আরাধ্য লৌকিকদেবী বলে মনে করেন। অথচ তিনি গোটা ভারতে প্রবলভাবে পূজিতা অথচ যাকে প্রাতিষ্ঠানিক হিন্দুধর্ম বার বার পরিশুদ্ধ করতে তৎপর হয়েছে, কিন্তু তাঁর মাহাত্ম্যের কাছে হার মেনেছে।গোটা দেশে তিনি পরিচিত নিজের জোরে। এটাই তাঁর বিরাট সফলতা আর প্রান্তিক জনজীবনের গভীর শিকড়কেই চিনিয়ে দেয় বারেবারে। তাই বুঝি এখনও শহুরে মানুষ শীতলাকে সারাবছর ভুলে গেলেও বাচ্চাদের হাম, চিকেন পক্স হলে একুশ দিন পর শীতলা মন্দিরে পুজো চড়ান।

যদিও ১৯৭৯ সালে পৃথিবীতে এই রোগের জীবাণু নির্মূল হল, দেবীর আশীর্বাদ এবং প্রতিষেধকের সম্মিলিত জোরে। তার আগে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে গুটিবসন্ত ছিল এক কালান্তক রোগ, কোটি কোটি মানুষ তার বলি হয়েছে। তাঁর মধ্যে আক্রান্ত শিশুদের আশি শতাংশই মারা যেত, বড়দের মধ্যেও যাঁরা প্রাণে বাঁচতেন তাঁদেরও দেহে এই ব্যাধি ভয়াবহ দাগ রেখে যেত, অনেকেই দৃষ্টিশক্তি হারাতেন। এ রোগের জীবাণু হাওয়ায় ভেসে সংক্রমণ ঘটাত, ফলে খুব সাবধান হয়েও রেহাই মিলত না। এমন রোগের মোকাবিলায় বিজ্ঞানের জয় হল ঠিকই কিন্তু যেভাবে মা শীতলা দেবী হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন সেটা প্রমাণ করে আজ করোনার মোকাবিলায় তাঁকে নিয়ে ভাববার। ব্রাহ্মণ্যবাদ বিচিত্রতম লোকাচারকে পাত্তা দেয়নি কিন্তু তাই বলে প্রান্তিক জনজীবন এককাট্টা হয়ে শীতলার পুজো চালিয়ে গেছে এবং এখনও যাচ্ছে। নানান পুরাণে কত অসুরকে বধ করা হল, কিন্তু জ্বরাসুর পুজো পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হল এই শীতলা পুজোয়। কারণ তার জন্ম নাকি যে শিবের উষ্ণ স্বেদ থেকে। তাহলে বৌদ্ধধর্মে কেন  জ্বরাসুর এবং শীতলাকে মেনে নেওয়া হল?কারণ ব্যাধির চেয়েও বড় হল আধি। মনে মনে আমরা হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ যে ধর্মের ই হই না কেন সবাই মহামারীকে ভয় পাই। তার আগেই দেহ মন সঁপে দি দৈবের কাছে। অলৌকিক সেই শক্তি এসে যাতে উদ্ধার করে আমাদের।
নয়ত সেই কোন যুগে সাহেবরাও এদেশে এসে তা উপলব্ধি করেন? সাহেবদের গবেষণায়  কত কত পেপার প্রকাশিত হয় এই শীতলা কে নিয়ে।

“ভারতবাসীরা কী ভাবে শীতলা পুজো করে গুটিবসন্তের বিভীষিকা থেকে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করত, ব্রিটিশ পর্যবেক্ষকরা তা বিভিন্ন সময়ে দেখিয়েছেন। তিন শতাব্দী আগে কলকাতার ‘ব্ল্যাক হোল’ খ্যাত জে জেড হলওয়েল এই দেবীর আরাধনা বিষয়ে লিখেছেন। দুই শতাব্দী আগে জন মুর তাঁর হিস্ট্রি অব স্মলপক্স বইতে শীতলার কথা উল্লেখ করেছেন। এক শতাব্দী আগে সি এইচ বাক লিখছেন, ‘শীতলা বা মাতা হলেন সাত বোনের এক গোষ্ঠীর নেত্রী, এই সাত দেবীই মহামারী ঘটিয়ে থাকেন এবং তাঁকে নিয়মিত তুষ্ট করা নারী ও শিশুদের দায়িত্ব।’ দেড়শো বছর আগে স্কটিশ মিশনারি জন মারডক লিখেছিলেন, ‘শীতলা পুজো একেবারে ঘরোয়া অনুষ্ঠান, কেবল সন্তানবতী সধবারাই এই পুজো করেন।’ আধুনিক ওযুধপত্রের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে শীতলা ও তাঁর বোনদের প্রতিপত্তি কমেছে ঠিকই, কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, গোড়ায় তিনি ছিলেন এক অশুভ শক্তি। মার্কিন নৃবিজ্ঞানী র‌্যাল্ফ নিকোলাস গত শতকের সত্তরের দশকে মেদিনীপুরে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে স্থানীয় ধর্মাচারকে খুঁটিয়ে দেখেছেন এবং এ বিষয়ে বেশ কিছু মূল্যবান লেখা লিখেছেন” (জহর সরকার)
 
জহরবাবুর মতে, “শীতলার আরাধনা নিয়ে গবেষণা করেছেন ফাব্রিসিয়ো ফেরারি, সম্প্রতি তাঁর বই প্রকাশিত হয়েছে। ফেরারি শীতলার মন্দির খুঁজে পেয়েছেন ভারতের নানা প্রান্তে। গুড়গাঁও থেকে পাটনা, বারাণসী থেকে সালকিয়া, উত্তরপ্রদেশের আদলপুরা থেকে অসমের নওগাঁও, জোধপুর-বাঢ়মের থেকে নেপালের বিরাটনগর, উত্তরাখণ্ড থেকে নাগপুর, জালন্ধর থেকে কলকাতা। গোটা দেশে তাঁর একই নাম, এটাও তাঁর সামর্থ্য এবং জনজীবনে গভীর শিকড়কেই চিনিয়ে দেয়। শীতলা আসেন গাধার পিঠে চড়ে— কে জানে? আর সব বাহনকে ইতিমধ্যেই অন্য দেবদেবীরা দখল করে ফেলেছিলেন বলেই বোধহয়। তবে কারোর মতে গাধাই হল জ্বরাসুর। যাকে শীতলা বধ না করে দয়া করে মুক্তি দিয়েছেন।”

চতুর্ভুজা শীতলার হাতে থাকে একটি চামর বা সম্মার্জনী যা দিয়ে ধুলোবালি থেকে জীবাণুকে আলাদা করেন তিনি। মাথায় তাঁর কুলো বা হাতপাখা অর্থাৎ কুলোর বাতাস দিয়ে বিদায় করবেন রোগ ব্যাধি আর থাকে একটি জলপূর্ণ কলসি, যার ঠান্ডা জলে রোগীকে আরাম দেবেন ও  একটি ঔষধের পাত্র, যার মধ্যে ব্যাধিকে বন্দি করবেন। সত্যিই তো গুটিবসন্ত বিদায় নিয়েছে, কিন্তু মা শীতলা গাধায় চড়ে এখনও নিয়মিত আসছেন। এই রূপ ধারণ করে রোগ নিরাময় শুরু করে তাঁর এক সহচর বটুককে পাঠান জ্বরাসুরকে মোকাবিলা করতে। কিন্তু বটুককে পরাস্ত করে হত্যা করে জ্বরাসুর। বটুকের মৃতদেহ মুহূর্তে ধুলোয় মিশে যায়। কিন্তু তার ক্ষণিক পরেই বটুক ভৈরব মূর্তি ধারণ করে আবির্ভূত হয়। ঘোর কৃষ্ণবর্ণ বটুকভৈরব তাঁর ত্রিশূল দিয়ে জ্বরাসুরকে হত্যা করেন।

শীতলা-বটুকভৈরব-জ্বরাসুরের এই কাহিনি পরে অন্য রূপ নিতে শুরু করে। শীতলার হাতের জলপূর্ণ পাত্রকে ধরা হতে থাকে বসন্ত রোগের বিষপূর্ণ পাত্র। চতুর্ভুজা শীতলাকে দ্বিভুজা হিসেবেও চিত্রিত করা শুরু হয়। তাঁর এক হাতে ঝাঁটা ও অন্য হাতে বিষপাত্র। কল্পনা করা হয়, তিনিই একহাতে রোগ ছড়ান ও অন্য হাতে তা ঝাঁটা দিয়ে দূর করেন।

প্রাচীন তন্ত্রপুথিতে জ্বরাসুরের যে উল্লেখ রয়েছে, সে কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন সাহিত্যিক তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘তারানাথ তান্ত্রিক’ গ্রন্থের এক আখ্যানে। তিনি লিখেছেন এক ভয়ঙ্কর উপচারে জ্বরাসুরের পূজার কথা। তিন মাথাওয়ালা জ্বরাসুরের ভয়ানক মূর্তির বিসর্জন হয়না। তার সামনে বলি হয় অগণিত ছাগল।

শীতলা কাল্টে আজ জ্বরাসুর নেই। কিন্তু বাংলার বৌদ্ধ মন্ত্রযান, বজ্রযান ঐতিহ্যে সে রয়েছে। আজকের শীতলা পূজায় হয়ত বৌদ্ধ আচারবিচার খুঁজে পাওয়া যাবে না। আজকের পাড়ায় পাড়ায় হিন্দুদের শীতলা পুজোর আলোর রোশনাইতে  হয়ত দেবী অনুপস্থিত কিন্তু এই ঋতু পরিবর্তনের সময় মরশুমি দেবীর স্মরণ মনন বাদ দিতেও ভরসা হয়না আমাদের। অতএব বিশ্বাসে মিলায় বস্তু।

One thought on “শীতলা দেবী করোনায় আজও প্রাসঙ্গিক

  1. অত্যন্ত সময়োপযোগী নিবন্ধ! অনেক তথ্যসমৃদ্ধ এবং সুখপাঠ্য! লেখিকাকে শুভকামনা জানাই|

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত