ইন্দু বিন্দু (পর্ব-১৪)

শ্রীচৈতন্যের জীবনী নিয়ে মধ্যযুগেই কয়েকটি গ্রন্থ লেখা হয়েছিল। তবে বাংলা সাহিত্য-আসরে আত্মজীবনী সাহিত্য এসেছিল বেশ চমক দিয়ে। চমক এ জন্য যে, আধুনিক যুগ ইংরেজ এবং ইংরেজি সাহিত্যনির্ভর হয়ে উঠেছিল। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিতরাই সমাজ-সাহিত্য-রাজনীতিতে অবদান রেখেছিলেন। কিন্তু বাংলায় ‘আত্মজীবনী’ লেখার ইতিহাস একেবারেই ভিন্নভাবে এসেছে। কোনো ইংরেজ প্রভাবিত বা কোনো শিক্ষিত লোক আত্মজীবনী লেখেননি। লিখেছেন অজপাড়াগাঁয়ের প্রায় অশিক্ষিত এক মেয়ে। তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, কেউ তাঁকে পড়তে বা লিখতে শেখাননি। লেখাপড়া অর্জন করেছিলেন তিনি নিজে, সম্পূর্ণ একাকী। তাই সাহিত্যের আঙ্গিনায় তিনি একটি বিস্ময়। তাঁর নাম রাসসুন্দরী। তাঁর বইয়ের নাম ‘আমার জীবন’। তারপরে আত্মজীবনী অনেক পেয়েছে বাংলা সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যের পাঠক।

আরও একটি আত্মজীবনী ইন্দু বিন্দু’র সাক্ষী হতে যাচ্ছেন আপনি। আদরের নৌকা,শব্দের মিছিল-এ বিক্ষিপ্তভাবে নিজের জীবন নিয়ে লিখেছেন, ইরাবতীর পাঠকদের জন্য ধারাবাহিকভাবে নিজের জন্মতিথিতে নিজের আত্মজীবনী লেখা শুরু করলেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। আজ রইলো আত্মজীবনী ইন্দু বিন্দুর চতুর্দশ পর্ব।


মনখারাপের বৃষ্টি বেলা 

অকালবৈশাখীর বিকেল গুলো খুব মনে পড়ে। দুপুর থেকেই চারিদিক অন্ধকার করে এলেই টের পাওয়া যেত মরশুমের প্রথম বৃষ্টির পূর্বাভাস। ঝড়ের প্রতীক্ষায় মা বলতেন মধ্যদিনের রক্তনয়ন অন্ধ করার সেই কবিতা। পরে খুব অনুভূত হত সেই লাইন দুটো। তারপর জীবনে সবকটা হঠাত ঝড়ের ক্ষণকেই মনে হত অকাল বৈশাখীর মত। শিলাবৃষ্টির মত নিষ্ঠুর। আবার কত সুন্দর! টুপটাপ ঝরে পড়া শিল কুড়িয়ে মুখে পুরে দুধসাদা ছাদের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা। এই করতে করতে চৈত্র, বৈশাখ পেরিয়ে এসে যেত বর্ষা।
বর্ষা বড় স্মৃতিমেদুর। কাচের শার্সির গায়ে টুপটাপ, ঝমঝম, ঝিরঝির নানারকমের বৃষ্টিফোঁটার আলপনা দেখতাম চেয়ে চেয়ে। এই বৃষ্টি দেখলেই মনে পড়ে যায় সে বছর জমা জলে কি হয়েছিল, তার দুবছর আগে কোথায় জমা শেওলায় পা হড়কেছিল কিম্বা কলেজবেলায় বৃষ্টির হাত থেকে রেহাই পেতে দুদন্ড কফিহাউসের ছাদের নীচে, এক ছাতার নীচে বন্ধুর মুখে তার প্রেমিকের সঙ্গে একটুকু ছোঁয়া লাগা স্মৃতি। আমার তো আর প্রেম আসেনি কলেজ বেলায়। তাদের প্রেমের গরগরে উপাখ্যান শুনেই দিনযাপন।

তখন মায়ের বৃষ্টিশাড়িগুলো ছিল ভরসা। আধ পুরণো ডেক্রণ, নতুন মার্বল শিফন কিম্বা পাতলা প্রিন্টেড উলি শাড়ি অথবা সেই সি-থ্রু  ব্রাসো শাড়ি। এখন বাজারে ঢেলে পাওয়া যায়। কেউ বলে জর্জেট, কেউ বলে সিন্থেটিক। পরে জেনেছি যাহাই সিন্থেটিক তাহাই পলিমার। সে ডেক্রণ কি নাইলন অথবা শিফন কি টেরিলিন। ভিজে গেলেও শুখোয় তাড়াতাড়ি তাই বৃষ্টিতে এরাই ভরসা। তবে পিওর শিফন মানে কুড়ি-বাইশ গ্রামের ফুজি শিফন পরে বর্ষায় বেরুনো নৈব নৈব চ। জল পড়লেই তা হাঁটুর নীচে স্কার্ট । আমার মায়ের হয়েছিল। বরানগর থেকে ভাড়ার গাড়িতে আমরা শিবপুর গেছি নেমন্তন্ন খেতে। মুম্বাই থেকে আনা রাণী আর তুঁতে রঙের নতুন ফুজি শিফন পরে মা চলেছেন মুখেভাতের রিসেপশানে। গাড়ি থেকে নেমে নেমন্তন্ন বাড়ি খুঁজতে গিয়ে ভিজে গেছি আমরা। পৌঁছে দেখি মায়ের শাড়ি লং স্কার্ট। পিওর শিফনের কি জ্বালা রে বাবা!  

আষাঢ়ের ক’দিন যেতে না যেতেই অম্বুবাচী, রথযাত্রা। তারপরেই প্যাচপ্যাচে অবস্থা। যেন বর্ষাকে তাড়িয়েই ছাড়ে লোকে। জামাকাপড় শুকোচ্ছে না, বাজার যেতে পাচ্ছিনা, চালে, ময়দায়, সুজিতে পোকা, ইলিশের দাম এখনো কমলনা, আলমারীতে কেমন গুমশুনি গন্ধ একটা, কালো জামদানীটা মসনে ধরে গেছে… এমন হাজার একটা অভিযোগ।
মেঘকালো সকালে মন বলত, আয় কবিতা লিখি। এখন মনখারাপে উজাড় করি ফেসবুকের দেওয়ালে বৃষ্টিকাব্য। ওদিকে রান্নাঘর ডাকে আয়। টেষ্টবাড গুলো লকলক করে বলে খিচুড়ি আর ইলিশমাছ ভাজা। বিকেল ডাকে মুড়ি-তেলেভাজা আর পা ছড়িয়ে বসে ভূতের গল্প পড়তে। কিন্তু সময় নেই কারোর। বৃষ্টিতেও সকলে ছুটছে। স্কুল পড়ুয়াদের রেনকোট, কাজের মাসীর সেলাই করা আধপুরোণো রঙীন ছাতা, বাবার বাজার করার ফ্লোটার্স সব ভিজে টুসটুসে কাজের তাড়নায়। বৃষ্টি যে দেখবে সময় নেই কারোর। বৃষ্টিকে যে বরণ করবে খেয়াল নেই কারোর। এদিকে যতক্ষণ না সে আসছিল ততক্ষণ সকলের যেন ভাবখানা এলেই তাকে রূপোর আসনে বসিয়ে সোনার থালায় পাখার বাতাস করে জুঁইফুলের মত ভাত বেড়ে দেবে।
ছোটবেলায় বৃষ্টি আসত বাড়ি বয়ে। মেঘ ডাকত চার দেওয়াল জুড়ে। বৃষ্টির ছাঁট জানলার খড়খড়ি চুঁইয়ে মাঝেমধ্যে এসে নামত উইন্ডোসিলের ওপর। মেঝের ওপর জলের আলপনা আঁকতাম মনের সুখে। কত আঁকিবুঁকি আঙুল দিয়ে। জোরে মেঘ গুড়গুড় করলে মা’কে জাপটে ধরতাম গিয়ে। ভাই তখন বড্ড ছোট ছিল। কেবল বলত কাগজের নৌকো বানিয়ে দিতে । বাড়ির সামনে ছিল খোলা নর্দমা। বেশী  বৃষ্টি হলেই জল দাঁড়িয়ে যেত। ভাদ্রমাসে আবার গঙ্গায় ধেয়ে আসা বানের জল । কতদিন ইশকুল থেকে ফেরার পথে বানের জলে পা ভিজিয়ে আনন্দ হত। সেই জল এসে মিশত রাস্তার জলে। একাকার হত নর্দমার সঙ্গে। তো কি? আমাদের কোনও ভ্রূক্ষেপ ছিলনা। এখন ঘেন্নায় মরি সেকথা ভাবলে। ভাই গিয়ে নীচের সিঁড়ির তলায় দাঁড়িয়ে নৌকো ভাসাত। আমি ছিলাম তার দোসর। হঠাত ওপর থেকে মা হাঁক দিত ঠান্ডা লেগে যাবার ভয়ে। ছুট্টে দুজনে ওপরে চলে যেতাম। বারান্দা দিয়ে দেখতাম নৌকোটা কোথায় যায়! বৃষ্টি এলে কেমন যেন হয়ে যেত সে সকালগুলো। আচমকা অকালবৈশাখীর বিকেলের মত ভালোলাগা…. রেনিডে হত সকাল জুড়ে। সারাদিনের অবসর আমার পুতুলখেলা আর ছবি আঁকা নিয়ে।
বৃষ্টি এলে কি ভালো লাগত পড়তে পড়তে উঠে গিয়ে বৃষ্টির সঙ্গে খুনসুটি আর ভাইয়ের সঙ্গে হুটোপাটি। রাস্তার জমা জলে কাগজের নৌকা ভাসাতাম দুজনে মিলে।
বৃষ্টি এলে আরো জমে যেত টিনবেলা। সেই জলসিঁড়ি, কাকভেজা হয়ে এগারো-বারোক্লাসের স্কুলফেরা।
বৃষ্টি এলে কলেজ দুপুর কফিহাউসের ছাদের তলায়, এক আকাশের নীচে অনেক বন্দী মানুষ।
বৃষ্টি এলে মনখারাপের বিকেলগুলো গোমড়া মুখে বন্দী হত বারান্দায়। তখন টিন পেরিয়ে শাড়ি। বৃষ্টি এলেই কবিতা পেত বিষম জোরে।
সবচেয়ে ভাল্লাগত বর্ষার রেনিডেতে বাড়ি ফিরে হঠাত ইলিশের গন্ধটা। কোনদিন শনিবারের হাফছুটিতে বাড়ি ফিরে দেখতাম স্মোকলেস উনুনের মরা আঁচে মা বসিয়ে রাখতেন ভাতের হাঁড়ি। পাশে রাখা স্টিলের কৌটোয় ইলিশ ভাপা। তার পাশে কড়াইয়ে রাখা মাছের তেল, ডিম আর এক টুকরো মাছ ভাজা। হঠাত ইলিশ যেন আমাদের জীবনের অকাল বৈশাখীর মত পরম প্রাপ্তি ছিল।
 
এ ছিল সেসময়ের বর্ষার ছুটির সাতকাহন।  

যত বড় হতে থাকলাম আরও সব ভাবনারা ভীড় করে এল জীবনে। ভালো মনসুন হল তো ফিদা দেশবাসী তথা সরকার নয়ত মাগ্যিগন্ডার শুরু আবার। তারপর শিখলাম বৃষ্টিতে মন্দা মানে হৈ হৈ সেনসেক্স পতন, মুদ্রাস্ফিতী, সোনার দাম, ইনফ্লেশন। সব লাইন করে জায়গা করে নেবে অর্থনীতির শিরোনামে। তারপর শিখলাম কোথায় পিঁয়াজ পচে গেল, গমে ছাতা ফুটল অতিবৃষ্টিতে। লিচু মিষ্টি হলনা মোটেও, ধানচারা জল না পেয়ে মরে হেজে গেল অনাবৃষ্টিতে । এতসব বায়নাক্কা তো আছেই। আরও বড় হয়ে শিখলাম। বর্ষার বদহজম, ক্ষুধামান্দ্য, অরুচি, বাতাসে অক্সিজেনের অভাবে হাঁফের কষ্ট সব নিয়ে অনেক অভিযোগ।

কোন্‌দিন ইলশেগুঁড়ি কোন্‌দিন আবার কেরাণী খ্যাদানো! অভিজ্ঞতার পারদ বাড়তেই থাকল। নবনির্মিত স্কাইস্ক্রেপারের বাইরে স্নোসেমের তুলির পোঁচ আর আমাদের ছাদ ফেটে ঘরদোর জলে থৈ থৈ।পূর্বপুরুষের সত্তরবছরের পুরণো শক্তপোক্ত বাড়ি। কিন্তু বর্ষাকালে সে বাড়ির ছাদ ফেটে জল পড়ে।বর্ষা আসার আগেই দাঁড়িয়ে থেকে ছাদে ঘোলা দেওয়া আমাদের সম্বচ্ছরিক দায়। কিছুদিন বন্ধ থাকে জলপড়া তো আবার শুরু হয়। ভোলাদের বস্তির টালিগুলো দিয়েও জল পড়ে টসটস করে। বর্ষা এলেই ওদের প্রাণ বেরিয়ে যায়। তারমধ্যে বর্ষা মানেই আমবাঙালীর মত আমারও কবিতার ভ্রূণের জন্ম। বর্ষা মানেই ঝাঁকেঝাঁকে রূপোলী শস্যের জালে জড়িয়ে পড়া। বর্ষা মানেই শহরের আনাচ কানাচ জলে টইটুম্বুর। বর্ষা মানেই জলকাদায় শাড়ি-জিনস-সালোয়ারে থ্যাপথ্যাপ। কারোর বর্ষায় মনখারাপ তো কারোর শরীর। কারোর ইলিশমাছ তো কারোর চারামাছ। চাষীদের আনন্দ, চাষীবৌয়ের ঢলঢল কাঁচা যৌবন আর সবুজ ধানচারার লকলকে বাড়বৃদ্ধি অন্যদিকে জমা জলে ম্যালেরিয়া-ডেঙু-আন্ত্রিকের চোখরাঙানি। ছোটবেলায় বৃষ্টি এলে মন খারাপ হত না, এখন যেমন হয়। 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত