Site icon ইরাবতী

ইন্দু বিন্দু (পর্ব-৯)

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com
Reading Time: 6 minutes

শ্রীচৈতন্যের জীবনী নিয়ে মধ্যযুগেই কয়েকটি গ্রন্থ লেখা হয়েছিল। তবে বাংলা সাহিত্য-আসরে আত্মজীবনী সাহিত্য এসেছিল বেশ চমক দিয়ে। চমক এ জন্য যে, আধুনিক যুগ ইংরেজ এবং ইংরেজি সাহিত্যনির্ভর হয়ে উঠেছিল। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিতরাই সমাজ-সাহিত্য-রাজনীতিতে অবদান রেখেছিলেন। কিন্তু বাংলায় ‘আত্মজীবনী’ লেখার ইতিহাস একেবারেই ভিন্নভাবে এসেছে। কোনো ইংরেজ প্রভাবিত বা কোনো শিক্ষিত লোক আত্মজীবনী লেখেননি। লিখেছেন অজপাড়াগাঁয়ের প্রায় অশিক্ষিত এক মেয়ে। তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, কেউ তাঁকে পড়তে বা লিখতে শেখাননি। লেখাপড়া অর্জন করেছিলেন তিনি নিজে, সম্পূর্ণ একাকী। তাই সাহিত্যের আঙ্গিনায় তিনি একটি বিস্ময়। তাঁর নাম রাসসুন্দরী। তাঁর বইয়ের নাম ‘আমার জীবন’। তারপরে আত্মজীবনী অনেক পেয়েছে বাংলা সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যের পাঠক।

আরও একটি আত্মজীবনী ইন্দু বিন্দু’র সাক্ষী হতে যাচ্ছেন আপনি। আদরের নৌকা,শব্দের মিছিল-এ বিক্ষিপ্তভাবে নিজের জীবন নিয়ে লিখেছেন, ইরাবতীর পাঠকদের জন্য ধারাবাহিকভাবে নিজের জন্মতিথিতে নিজের আত্মজীবনী লেখা শুরু করলেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। আজ রইলো আত্মজীবনী ইন্দু বিন্দুর নবম পর্ব।


রাজাবাজার রঙ্গ কলেজ থেকে ইউনিভার্সিটির একলাফে ট্রানজিশান যেন একফোঁটা দস্যি ইলেকট্রনের  গ্রাউন্ড লেভেল থেকে এক্সাইটেড স্টেটে প্রথম ঝাঁপিয়ে পড়া। কে বলে ইলেকট্রনের চার্জ নেগেটিভ? কে বলে ইলেকট্রন ভর শূন্য? রক্ষণশীল পরিবারে বড় হওয়া একটি মেয়ের মেয়েদের ইশকুল,মেয়েদের কলেজ থেকে সোজা অচেনা কো-এড বাতাবরণে মিশে যাওয়াটা ঠিক তেমনি। রঙীন চশমা চোখে আর সদ্য ফুটিফুটি যৌবনে পা রাখার আনন্দে টইটুম্বুর ইহকাল । হেদোর মোড়ে ফুচকা, বিবেকানন্দ রোডের ধারে চাচার এগ রোল তদ্দিনে পার্শিবাগানে পাড়ি দিয়েছে ।

জীবনের সবচেয়ে ব্যস্ততার বছর দুটো কেটেছিল রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজে । বেথুন কলেজের রক্ষণশীলতার লক্ষণরেখা ডিঙিয়ে সেই প্রথম কো-এড বাতাবরণে গা ভাসিয়ে দেখলাম মেয়েরা সেখানে সংখ্যালঘু। সংখ্যাগুরু ছেলের দল সারা রাজ্যের জেলার সব কৃতি ছাত্র। বন্ধুতার জোয়ারে ভেসে গেলাম ।

সে ছিল বৃষ্টিভেজা শ্রাবণ সকাল । রাজাবাজারে ক্লাস শুরু হ’ল । রোজ সাড়ে দশটায় ক্লাস শুরু । দক্ষিণেশ্বর থেকে ব্রেকজার্নি । অধিকাংশ দিন শ্যামবাজারে নেমে ১২ নম্বর লেডিস ট্রাম  চড়ে বসতাম । তারপর সার্কুলার রোড ধরে ট্রাম আমাকে বয়ে নিয়ে পৌঁছে দিত সায়েন্স কলেজ ।  শুরু হ’ল প্রতিনিয়ত যাতায়াতের লড়াই । কিন্তু দুবছরে কোনোদিনো আমি ফার্স্ট ক্লাস মিস করিনি । মায়ের কাছে শিখেছিলাম পাঙচয়ুয়ালিটি আর টাইম ম্যানেজমেন্ট।  যারা কাছে থাকত তারা বরং লেট করে পৌঁছাত । স্যার একদিন সবার সামনে বলেছিলেন “একে দেখে শেখো, She is nearest to the God, farthest from the Church!”

থিয়োরি ক্লাসের পর থাকত লাঞ্চব্রেক । তারপর প্র্যাকটিকাল ক্লাস । রোজ সাতটা সাড়ে সাতটা নাগাদ ক্লাস শেষ হত । তারপর অফিসের ভীড় ঠেলে বাড়ি ফেরা। কলেজে ক্লাস শুরুর ঠিক পরেপরেই চোখে নিদারুণ কনজাংটিভাইটিস সংক্রমণ হল । নতুন ক্লাস আর দ্বিতীয় কেউ নেই যে আমার পড়া বুঝিয়ে দেবে । ক্লাস-নোটসের ওপর ভিত্তি করেই পড়া আর পরীক্ষা দেওয়া । তাই শুরু থেকেই হুঁশিয়ারি সেকেন্ড ইয়ারের দাদাদিদিদের “কোনো ক্লাস কামাই করবে না”। ইউনিভার্সিটিতে যারাই রক্ষক, তারাই ভক্ষক অতএব ক্লাসে যা পড়ানো হবে সেটা নিয়মিত ফলো করে গেলে আর তাকে ভিত্তি করে নিজে পাঁচটা জার্নাল আর বই ঘেঁটে নোটস বানিয়ে নিলেই ফার্স্টক্লাস অবধারিত । তাই নিদারুণ  চক্ষুশূলেতেও বাসবদল করে  আলমবাজার থেকে রাজাবাজারে গেছি ক্লাস করতে ।   ইউনিভার্সিটিতে প্রোমোশানের জন্য নতুন রোদচশমা চোখে সেদিন দুগ্গা দুগ্গা বলে কলেজে গেছি ।  ক্লাসরুমে ঢোকার মুখে আমার ক্লাসেরই একপাল ছেলে (তখনো সবার সঙ্গে আলাপ পরিচয় হয়নি )  তুমুল শব্দ করে উঠল । বুঝলাম যে আমাকে দেখে ওরা অমন করছে । চশমাটা কায়দা করে মাথায় তুলে তাদের দিকে চেয়ে বললাম ” এই তো সবে ক্লাস শুরু হল, দুবছর তোদের সঙ্গে ঘর করব কি করে! ক্লাসের বন্ধুকে তোরা আওয়াজ দিস বুঝি! বুঝতাম তোরা আমার সিনিয়ার তাহলেও নয় একটু আধটু  র‍্যাগিং ভেবে ক্ষমাঘেন্না করে দিতাম !” তক্ষুনিই আমার ছেলে বন্ধুরা sorry বলেছিল । তারপর থেকে ওরাই আমার সবচেয়ে উপকারী বন্ধু হয়েছিল। রোজ প্র্যাক্টিকাল ক্লাস শেষ করে মেয়েগুলোকে বাসে তুলে দিত ওরাই। প্রতি শুক্রবার আমাদের থিয়োরি ক্লাস হত প্রেসিডেন্সি কলেজে । সেখান থেকে  দল বেঁধে পায়ে হেঁটে  ট্রাম রাস্তা, অলিগলি দিয়ে পার্সিবাগান লেন ও সব শেষে সায়েন্স কলেজে এসে প্র্যাকটিকাল ক্লাস করা । সেই ফাঁকে পরিচয় হল কলেজস্ট্রীট  কফিহাউসের সঙ্গে ।  ঐ দুটো বছর অনেক ভালো বন্ধু পেয়েছিলাম । কফিহাউস ছাড়াও সায়েন্স কলেজের ক্যান্টিন, সাহা ইনস্টিটিউট ও বোস ইনস্টিটিউটের ক্যান্টিনে দুপুরের টিফিন খাওয়ার মজাটাই ছিল অন্য স্বাদের । ন্যাশানাল লাইব্রেরীতে পড়াশুনোও চলত সেই ফাঁকে ।  

আমরা তখন স্নাতোকোত্তর, আমরা খোলা হাওয়া স্বপ্ন নেশা চোখে মেখে, রঙীন হয়ে যাওয়া   খগেনদাদার  চায়ের  ঠেকে, ল্যাবের সেই কোণা মিনিট পাঁচেক জিরেন, টেস্টটিউব  হাতে নিয়ে…

আমরা তখন সেকেন্ড ইয়ার, একশো কুড়ি জন   কফিহাউস, বইপাড়া, জটিল সমীকরণ  । মাতাল  হাওয়ায় উড়ে গেল, বুদবুদ উদ্বায়ী হারিয়ে গেল ওরা যেন আজব পরিযায়ী  ।

কফিহাউসের দুধ সাদা টেবিল লিনেনে ছোঁয়া রেখে চলে গেল  সাতাশি সালের এম এস সি ব্যাচ । পড়ে রইল নিঝুম পার্শিবাগান লেন আর ব্যাস্ত এপিসি রোড, কলিকাতা সাতলক্ষনয়ের সড়ক ধরে পথচলার গসিপ ।  

বিশুদ্ধ রসায়নের সিলেবাসের চাপে ঐ দুটো বছর কোথা দিয়ে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত হয়েছিল তা টের পাইনি । তখনো আমার সাহিত্যের ধারাপাত অধরা, অনবরত মস্তিষ্কের  রাসায়নিক বিক্রিয়ার  টানাপোড়েনে । দিক্‌পাল সব কেমিষ্ট্রির অধ্যাপকের সান্নিধ্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল ভবিষ্যতের দিশা । একদিকে ক্লাসিক্যাল মেকানিক্স, অন্যদিকে কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এহেন আমি হাবুডুবু খেতে খেতে অর্গ্যানিক কেমিষ্ট্রিতে স্পেশালাইজ করলাম ।  ডাঃ অসীমা চট্টোপাধ্যায়, ডাঃ জুলি ব্যানার্জি,  ডাঃ অভিজিত্ ব্যানার্জি,  প্রোফেসর তলাপাত্র,  ডাঃ প্রিয়লাল মজুমদার, ডাঃ শিবদাস রায়  এদের সঙ্গে  সর্বক্ষণের ওঠাবসা আমার জীবন রসায়নকে অনেকটাই বদলে দিয়েছিল । জৈব রসায়নের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় ন্যাচারাল প্রোডাক্টস নিয়ে পড়াশুনো করতে করতে আশ্চর্য্য হতে লাগলাম । সকালে ঘুম ভাঙা থেকে রাতে শুতে যাওয়া অবধি জৈব রসায়ন আমাদের আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে এই কথা ভেবে । চায়ের মধ্যে ফ্ল্যাবোনয়েডস, তারপর প্রাতরাশের ফ্রুট প্ল্যাটার ভর্তি রঙীন সব এন্টি কার্সিনোজেনিক বিটা ক্যারোটিন ! পরণের সূতির কাপড়… সে ন্যাচারাল পলিমার  ফাইবার, আবার সিন্থেটিক শাড়ি বা ড্রেস মেটিরিয়াল সে সিন্থেটিক পলিমার ।  এইভাবে অর্গ্যানিক কেমিষ্ট্রি তখন আমার শয়নে, স্বপনে, জাগরণে ।   সিনথেটিক অর্গ্যানিক কেমিষ্ট্রি আমাকে আবিষ্ট করে রাখত সে সময় । এন্টিবায়োটিক্স পড়াতেন প্রোফেসর কে এম বিশ্বাস । উনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ছিলেন ।  ডাঃ শিবদাস রায় পড়াতেন হেটেরোসাইক্লিক কম্পাউন্ডস । ডাঃ প্রিয়লাল মজুমদার পড়াতেন নিউক্লিয়ার ম্যাগনেটিক রেসোনেন্স আর অ্যারোমেটিক কম্পাউন্ডস । প্রতিটি ক্লাস ছিল ভীষণ উপভোগ্য । স্যারের সঙ্গে আমার খুব দোস্তি হয়েছিল । বাবা চাকরী করতেন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে । বাবাদের নতুন প্রোডাক্ট লঞ্চ হলেই সেই ওষুধের লিটারেচার নিয়ে স্যারের সঙ্গে আলোচনায় বসতাম । স্যার শিখিয়েছিলেন ডক্টর কোনো ওষুধ প্রেসক্রাইব করলেই ওষুধের কম্পোজিশান পড়ে নিতে । সেই ট্র্যাডিশন এখনো চলছে আমার বাড়িতে । কাশির ওষুধ সেই যে বাড়িতে ব্যান করেছিলাম আজো তেমনি আছে । এফিড্রিন দেওয়া কাফ সিরাপ যে কত ক্ষতিকারক স্যার বোঝাতেন । এছাড়াও হলুদের কারকিউমিনের কত গুণ বা খয়েরের ক্যাটেচিন যে কতখানি ক্ষতিকারক সেগুলো জেনেছিলাম । সালফার ড্রাগে আমার চিরকাল এলার্জি । অ্যান্টিবায়োটিক সালফার ফ্রি কিনা ডক্টর প্রেসক্রাইব করলে এখনো নেট ঘেঁটে দেখে নি। এভাবেই চলছিল আমার পড়াশুনোর জৈব রাসায়নিক দোস্তি ।   বেথুন কলেজে যেমন  দুই মহিলা চন্দ্রমুখী দেবী এবং কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর  প্রথম স্নাতক হওয়ার শতবর্ষে আমি ছিলাম ঠিক তেমনি সায়েন্স কলেজে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের রসায়ন বিভাগ প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ উদযাপনের সামিল হবার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার । ১৮৮৬   সাল থেকে ১৯৮৬  এই একশো বছরে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে কত নাম করা মানুষেরা কেমিষ্ট্রি পড়েছিলেন আর এহেন আমিও সেই ডিপার্টমেন্টের ১০০ বছরের এক সামান্য ছাত্রী ! একসপ্তাহ ধরে প্রেসিডেন্সি কলেজে ও রাজাবাজারে সায়েন্স কলেজে কত সেমিনার, লেকচার, সিম্পোশিয়াম হয়েছিল তার ইয়ত্ত্বা নেই । আমি ছিলাম প্রথম দিনের রেজিস্ট্রেশনের দায়িত্ত্বে । তারপর শেষদিনের খাওয়াদাওয়া ও নাচাগানা । ল্যাবের মধ্যে বিশাল বিশাল বাক্স প্যাকিং । পাশেই হচ্ছে রান্নাবান্না । বিশাল ল্যাব জুড়ে লুচি, মুর্গির মাংস সব প্যাকিংয়ের দায়িত্ত্বে আমরা । এই যজ্ঞির দুমাস আগে থেকে সারা কলকাতা ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন কোম্পানির থেকে বিজ্ঞাপন চেয়ে আনার দায়িত্ত্বও ছিল আমি সহ একটি টিমের ।  কোথায় পাস্তুর ল্যাব, কোথায় ক্যালকাটা কেমিক্যালস, কোথায় বেঙ্গল কেমিক্যালস, হিন্দুস্তান লিভার , রেকিট এন্ড ক্যোলম্যান  ও নামীদামী ফার্মাসিউটিকালের অফিস থেকে শুরু করে কলেজ স্ট্রীটে ছোট বড় সব ল্যাব ইকুয়িপমেন্টসের অফিসে পায়ে হেঁটে হেঁটে, ট্রামে, বাসে দৌড়ে মরেছি আমরা বিজ্ঞাপনের জন্যে । তবে সায়েন্স কলেজের নাম শুনে কেউ মুখের ওপর দরজা বন্ধ করেনি সেটাই রক্ষে । আরো একটি কারণ  হল  এই সব কোম্পানিগুলোতে তখন সায়েন্স কলেজের পোষ্ট গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্টরা চাকরীতেও জয়েন করতে যেত । তখন ছাত্রদের মধ্যে বিদেশ যাওয়ার ঢল এতটা নামেনি ।   কত বাদামী বিকেল পেয়েছিলাম আমরা । আমাদের জন্মদিনের সন্ধে হত রঙিন  । পরীক্ষার ভালো ফলের পার্টি হত অথবা কারোর সফল কোর্টশিপ ।  সেদিনের কফির পেয়ালার বিকেল আজো রয়ে গেছে। একমুঠো রোদ ভর্তি সকাল গড়িয়ে নোট তৈরী হতে হতে বিকেলের চৌকাঠে পা দেওয়া ফুরিয়েছে  ।   শিল্পীর ক্যানভাসের সেই রঙ এখন সেপিয়া ! মেহগিনি টেবিলের ওপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ত সেই রং । কবিতার খোলাখাতায় টুপটাপ ঝরে পড়ত সাবলীল শব্দকণা সেই মেহগিনি টেবিলে ।   যার ওপরে  ধূমায়িত কফিবিন্‌সের গুঁড়ো গুঁড়ো গন্ধ হাওয়ায় ভেসে বেড়াত অনবরত ।   আমার একভুবন আকাশ জুড়ে তখন ঐতিহ্যের রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ আর কলেজ স্ট্রীট কফিহাউসের আড্ডা ।       একরাত স্বপ্ন নিয়ে, একসন্ধ্যে গল্পের নেশা নিয়ে, একঘর হুল্লোড় নিয়ে চেয়েছিলাম তোমায়, পেয়েওছিলাম তোমায়।   রঙতুলির টানে সজীব হয়েছিল একরাশ চিন্তা-দৃশ্যপট ! আর সেই টেবিল? সেই রাশিরাশি আড্ডা, তুফানি তর্কের মুঠো মুঠো সংলাপ, যুক্তির খেল! সেই সাদা নীলছোপ ধরা টেবিল লিনেনে কত কাপ কফির উষ্ণতা ! কত ত্রিকিণমিতি, হাতে হাত ছুঁয়ে যাওয়া স্মৃতির পরিমিতি, উপপাদ্যের ছেঁড়া পাতা, চিকেন কাটলেটের গন্ধ ! মনে পড়ে… সেই পড়ন্ত বিকেলের ফুটপাথের বইপাড়া, সেই আমাদের চলার সাক্ষী সব পুরোণো-নতুন বইয়েরা ! সেই রঙচটা, তার ছিঁড়ে দাঁড়িয়ে পড়া ট্রামেদের সারি।   কফির বাদামী গন্ধ কেড়ে নিয়েছিলে আমার থেকে, নিয়ে গেছিলে সব রঙ তুমি । তবুও বেঁচে র‌য়ে গেলে সেই পুরনো   রঙচটা ছাল ওঠা খোলসের শহরে..  

সেই শ্রাবণের কলেজ পাড়া ধরেছিল বৃষ্টির রঙিন ছাতা,   কলেজবেঞ্চে  থকে যাওয়া শীতের দুপুরে দিয়েছিল এককাপ ভর্তি অতিচেনা উষ্ণতা,   গ্রীষ্মের ল্যাব-পালানো চুপকথার গোপন দুপুর, আরো কত কি!

আজও যেন শুনতে পাই

সেই ভেঙে যাওয়া আড্ডা-বিকেলগুলোর শব্দ,   সেই ক্লান্ত একব্যাগ দুপুরের বয়ে চলার ফিসফিস   আর সেই টেবিলের লিনেনের একটুকু ছোঁয়া লাগা কফির ধোঁয়ার ওম সেই উর্দিপরা আমাদের আবদারের ক্লান্ত মানুষগুলো,     মাথার ওপরে মান্ধাতা আমলের পাখাগুলো এখনও  বনবন শব্দ করে ঘোরে।   সব যেন ঝরে পড়ে গেছিল আমাদের কথাবৃষ্টির বর্ণমালার সাথে মিশে গেছিল দুকূল ছাপানো কফির বাদামী গন্ধ নিয়ে..    

আমি তখন উনিশ কুড়ির সাঁঝবেলা । রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের আকাশ আমার আকাশকে চিনিয়েছিল সেই বাদামী গন্ধ। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম সেই গন্ধ নিয়ে। সেই ওম নিয়ে, সেই রঙ নিয়ে। 

Exit mobile version