| 3 মার্চ 2024
Categories
ধারাবাহিক সাহিত্য

ইন্দু বিন্দু (পর্ব-১৩)

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

শ্রীচৈতন্যের জীবনী নিয়ে মধ্যযুগেই কয়েকটি গ্রন্থ লেখা হয়েছিল। তবে বাংলা সাহিত্য-আসরে আত্মজীবনী সাহিত্য এসেছিল বেশ চমক দিয়ে। চমক এ জন্য যে, আধুনিক যুগ ইংরেজ এবং ইংরেজি সাহিত্যনির্ভর হয়ে উঠেছিল। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিতরাই সমাজ-সাহিত্য-রাজনীতিতে অবদান রেখেছিলেন। কিন্তু বাংলায় ‘আত্মজীবনী’ লেখার ইতিহাস একেবারেই ভিন্নভাবে এসেছে। কোনো ইংরেজ প্রভাবিত বা কোনো শিক্ষিত লোক আত্মজীবনী লেখেননি। লিখেছেন অজপাড়াগাঁয়ের প্রায় অশিক্ষিত এক মেয়ে। তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, কেউ তাঁকে পড়তে বা লিখতে শেখাননি। লেখাপড়া অর্জন করেছিলেন তিনি নিজে, সম্পূর্ণ একাকী। তাই সাহিত্যের আঙ্গিনায় তিনি একটি বিস্ময়। তাঁর নাম রাসসুন্দরী। তাঁর বইয়ের নাম ‘আমার জীবন’। তারপরে আত্মজীবনী অনেক পেয়েছে বাংলা সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যের পাঠক।

আরও একটি আত্মজীবনী ইন্দু বিন্দু’র সাক্ষী হতে যাচ্ছেন আপনি। আদরের নৌকা,শব্দের মিছিল-এ বিক্ষিপ্তভাবে নিজের জীবন নিয়ে লিখেছেন, ইরাবতীর পাঠকদের জন্য ধারাবাহিকভাবে নিজের জন্মতিথিতে নিজের আত্মজীবনী লেখা শুরু করলেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। আজ রইলো আত্মজীবনী ইন্দু বিন্দুর ত্রয়োদশ পর্ব।


গরমকালের নরম কথা


বসন্তের অন্তিম নিঃশ্বাসে মাটি ফুঁড়ে সারেসারে ভুঁই চাপার উদ্ধত স্টক ফুটতে দেখলেই মনে পড়ে যেত শীত বিদায়ের কথা। গরমকাল আসছে ভাবলেই মনে পড়ে যায় আমাদের ঘটিবাড়ির বারব্রতের কথা। এইসময়টাতেই অশোক ষষ্ঠী, অশোক অষ্টমী আর নীল ষষ্ঠী পালন। মায়ের কাছে ঠান্ডা ঠান্ডা ছাতু মাখা, নারকোল কোরা, দুধ আর কলা দিয়ে… এ ছিল দুপুরের আহার। সঙ্গে বেলের পানা অথবা তরমুজের সরবত। শ্বশুরবাড়ি এসে সেই ছাতুর বদলে একই ফলাহার জুটল সাবুমাখা দিয়ে। গরমের দুপুরে যেন প্রাণ ফিরে পাওয়া। আর রাতে ফুলকো ফুলকো লুচির সঙ্গে গরমে সদ্য ওঠা মহার্ঘ কচি পটল, কুমড়ো, ছোলা, আলু আর এক টুসকি হিং দিয়ে মিষ্টি মিষ্টি কুমড়োর ছক্কা। মনে হয় গরমকাল সার্থক।  
এবার কাঁচা আমের পালা। এই অনবদ্য ফলটি জানান দেয় আসন্ন গরমের। কাঁচামিঠে আম কোরা নুন-চিনি, কাঁচা লঙ্কা কুচোনো ছড়িয়ে দিয়ে মা রোদে রেখে দিতেন কাঁচের পাত্রে। দুপুরবেলায় সেই আম-কুরোনো পড়ার টেবিলে রেখে দিতেন। গ্রীষ্মের ছুটির বাড়ির কাজ অনায়াস হয়ে যেত অম্ল মধুর এই মুখরুচিতে। মা আবার বানাতেন কাঁচা আমের পায়েস। কাঁচা আম কুরোনো চুনজলে ভিজিয়ে রেখে অ্যাসিড প্রশমিত করে তারপর ঘিয়ে ভেজে দুধে ফেলা। অসাধারণ সেই পায়েস। এই গরম পড়ার মুখেই মা বানাতেন আম-মৌরলা বা মৌরলামাছের টক। শেষপাতে কি যে ভালো লাগত!  মনে হয় গরমকাল আসুক বারেবারে।  
কাঁচা আম উঠলেই মনে পড়ে যায় আমাদের বাড়ির এক সাবেকী রীতির কথা। আম-কাসুন্দী হাত করার কথা।  ব্রতবিলাসে বলেছি এই কাসুন্দি বানানোর পদ্ধতি । আমার ঠাকুমার রোজ দুপুরে শেষপাতে ভাতের ওপর ঠান্ডা জল ঢেলে এই আম কাসুন্দির সঙ্গে  কলা মেখে, গন্ধরাজ লেবু চটকে খুব খেতে দেখেছি। এছিল বাঙলার বিধবাদের গ্রীষ্মবিলাস। এছাড়া সর্ষে ফোড়ন দিয়ে আমের অম্বল কিম্বা টক-ডাল তো বাঙালীর গ্রীষ্মবরণের অঙ্গ স্বরূপ। আর ছিল হাতায় ধরে উনুনে দিয়ে হাত-অম্বল । লোহা বা স্টিলের হাতার মধ্যে তেঁতুল গোলা, লেবুপাতা, নুন আর চিনি দিয়ে ফুটিয়েই ভাতের মধ্যে ঢেলে দেওয়া এই চটজলদি  অম্বলের নাম হাত-অম্বল। কাঁচা আম থাকতে থাকতেই দেখতাম ঠাম্মার আমবারুণী পালন।

পরে বড় হয়ে মতি নন্দীর “কোনি” উপন্যাসে পড়েছিলাম আমবারুণীর কথা ।  
“আজ বারুণী। গঙ্গায় আজ কাঁচা আমের ছড়াছড়ি। ঘাটে থই থই ভীড়”    

বারুণ শব্দটি জলের দেবতা বরুণের বিশেষণ । বারুণীর অর্থ হল জলে স্নান বা জল দিয়ে স্নান। স্ত্রীলিঙ্গে বারুণী আবার বরুণ দেবের পত্নীও বটে। আমার জন্ম যেহেতু গঙ্গাপারে আড়িয়াদহতে সেই হেতু ছোটবেলায় ঠাম্মাকে বলতে শুনেছি “বৌমা, কাল আঁব-বারুণী, আমি সকালে উপোস করে গঙ্গায় নেয়ে এসে তবেই চা খাব” ।
ঘটিরা আমকে আঁব বলতেন সেসময়।  বাংলাদেশে কেউ আবার বলে আম-বান্নি।  
সদ্য ওঠা পাঁচটি নিটোল কাঁচা আম নিয়ে গঙ্গায় গিয়ে পুজো করে আসতেন ঠাম্মা । তবেই বছরের প্রথম আম বাড়ির রান্নাঘরে ঢোকার ছাড়পত্র পাবে। এর অর্থ খুব সোজা। বাঙালীর সবচেয়ে প্রিয় এবং উত্কৃষ্ট ফলটি মা গঙ্গার চরণে নিবেদন করে তবেই মুখে দেওয়া। তখনকার দিনে গঙ্গাপুজোর মহাবারুণীকেই আমবারুণী বলে। এখন তা লুপ্ত। তবে এখনো গ্রামেগঞ্জে আমবারুণী উপলক্ষে মেলা বসে।

আমবারুণীও একসময় খুব ঘটা করে পালন করত দুই বাংলার মানুষেরাই । ঠিক এই তিথিতেই ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশেও বারুণী স্নান ও মেলার প্রচলন আছে। এই তিথির অপর নাম মধু কৃষ্ণা ত্রয়োদশী । মণিপুরে এটি শিবের পূজা। ওডিশায় বঙ্গোপসাগরের জলে স্নান সেরে, তীরে বসে পূর্বপুরুষের আত্মার উদ্দেশ্যে পিন্ডদান করে পুণ্যি লাভ করে মানুষ। মূলতঃ এই বারুণী হল পূর্বভারতের রীতি।  এই স্নানকে ঘিরে মেলার প্রচলনও বর্তমান ।
এইদিনে কৃষিপ্রধান বঙ্গে নদীর জলে বাঙালীর সোজাসুজি আমকে ভক্তিভরে নিবেদন করার আরেকটি অর্থ  প্রতিবছর ঐ নদীর জল থেকে বৃষ্টি পেয়ে আমের ফলনটি যেন ভাল হয়। আম ভাল হলে আমবাঙালী খুশি। বেলপাতা, ফুল, ধান, দুর্বা, হরিতকি, ডাব এবং সর্বোপরি কাঁচা আমের গায়ে সিঁদুর লাগিয়ে  নিবেদন করা হয়। গঙ্গার এই বিশেষ পুজোটিতে নাকি পাপ মোচন হয়।    
 আরামবাগে প্রতিবছর আমবারুণীকে ঘিরে বেশ উত্তেজনা হয়।
গরমের চোখরাঙানি বাড়তে থাকে। আমে রঙ ধরে।
একবার বাবা মালদা থেকে অফিস ট্যুর করে ফেরার পথে বাড়ি নিয়ে এলেন এক টুকরি হিমসাগর আম। আমি তখন বছর তিনেকের । মা আমপাতার ওপর সেই আমগুলিকে একে একে বিছিয়ে উঁচু খাটের তলায় রেখে দিলেন। দিন দুয়েক পর বাড়িতে খোঁজ খোঁজ। আমাকে পাওয়া যাচ্ছেনা কোথাও। ছাদ থেকে বারান্দা, সিঁড়ির তলা থেকে মেজানাইনের ঘর কোথাও নেই আমি। তারপর এঘর সেঘর খুঁজতে খুঁজতে মা হঠাত খাটের তলায় নীচু হয়ে দেখতে পেলেন আমাকে। একরত্তি সেই আমি একটা আর্দির পেনিফ্রক পরে মনের সুখে টুসটুসে একটা পাকা আম ফুটো করে মনের আনন্দে খেয়ে চলেছি। আমার  মুখ, দুই হাত, কনুই বেয়ে সেই আমের রস সাদা ফ্রকের কোলে। এককথায় আমি ও খাটের তলা তখন আম্রময়! মা আমাকে সানন্দে কোলে তুলে নিয়ে সোজা কলঘরের দিকে পা বাড়ালেন।  
পেতলের বালতিতে থরে থরে বোঁটা কাটা, গায়ে দাগ দেওয়া আম ভেজানো থাকত অন্তত পক্ষে ঘন্টা দুয়েক যাতে আঠা মুক্ত হয়। আমার দাদু নাকি দুপুরে ও রাতে খাওয়ার আগে  সেই বালতি নিয়ে খেতে বসতেন। ঠাকুমা ভাত খাওয়ার পর সেই বালতি থেকে একটা একটা করে আম দাদুর পাতে দিতেন যতক্ষণ না দাদু থামতে বলেন। সেই ট্র্যাডিশান অনেক দিন চলে এসেছে আমাদের বাড়িতে তবে মধুমেহ ও ইত্যাদির কবলে পড়ে ভীত আমবাঙালীর আম্রপ্রীতি কিছুটা কমেছে এখন। গরমের ছুটিতে আমাদের ব্রেকফাস্ট ছিল ফলাহার। চিঁড়ে দিয়ে আম, দুধ আর চিনি। কখনো মুড়ি আর খই দিয়েও। সেই ফলাহারের স্বাদ এখনকার ছোটরা পেল কিনা জানিনা তবে গ্রীষ্মের লাঞ্চ ব্যুফেতে যে আইসক্রিমের সঙ্গে আম কুচোনো থাকে তা তারা খুব ভালো জানে ।  

গরমকাল এলেই মা’কে দেখতাম তুলসী চারা বাঁচিয়ে ছাদের তুলসীমঞ্চে শুকনো পাতার অড়ালে রেখে তাকে যত্ন করতে। তারপরেই পয়লা বৈশাখের দিন তার মাথায় মাটির ছোট্ট ঘটি দিয়ে ঝারা করে দেওয়া হত। সারাটা বৈশাখ মাস ধরে সকালে সেই ঝারায় ঘটি করে জল ঢালা হত । তির তির করে সেই ঝারার ফুটো দিয়ে তুলসী গাছে অবিরত জলঝারি হত। কারণ একটাই। প্রকৃতি সুপ্রসন্না হলে বর্ষা আসবে তাড়াতাড়ি সেই আশায়। মা জল ঢালতে ঢালতে বলতেন
“তুলসী, তুলসী নারায়ণ, তুমি তুলসী বৃন্দাবন, তোমার শিরে ঢালি জল, অন্তিমকালে দিও স্থল।”  

আজও যেন গরমের বিকেলে চোখ বুঁজলে কিউটিকিউরার গন্ধ পাই। মোতি সাবানে গা ধুয়ে ছাপা শাড়ি পরে মায়েদের দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেই মাদুর নিয়ে ছাদে বসার আয়োজন ।  মায়ের হাতে একটা হাতপাখা আর অন্যহাতে বাড়িতে পাতা টক দইয়ের ঘোল। ওপরে কাগচিলেবুর সুবাস ছড়ানো। ফ্রিজ তখনো ঢোকেনি বাড়িতে। বরফ যেন আমাদের কাছে সোজা হিমালয় পৌঁছনোর মত ব্যাপার। বাজারে একটা দোকানে সন্ধ্যের ঝুলে বরফ বিকত । সেখান থেকে বরফ কিনে এনে শরবত খাওয়া হত। সেদিন যেন চাঁদ হাতে পেতাম। গরমের ছুটিতে বাবা একবার বাসে করে কলকাতায় নিয়ে গেলেন “হিমক্রিম” খাওয়াতে। সেও যেন এক অতি আশ্চর্য রকমের প্রাপ্তি। আমাদের উত্তর কলকাতার এক মিষ্টির দোকানে আইসক্রিম  মিলত। কোয়ালিটির আইসক্রিমের কাপ।কোনোকোনো দিন দুধের বড় ক্যানের মধ্যে বরফ দিয়ে সেই আইসক্রিম আসত গরমের ছুটির বিকেলে । ছাদের ওপর হয়ে যেত আমাদের ছোট্টবেলার আইসক্রিম পার্টি। শর্ত থাকত একটাই। ছুটির কাজ শেষ করে নেওয়া।  
আমাদের স্কুলজীবনে গরমকালের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল লোডশেডিং।  তখন ইনভার্টার ছিলনা রোজ নির্দ্দিষ্ট সময়েই পাওয়ার কাটের পূর্বাভাস পেয়ে যেতাম আমরা। তখন আমাদের দখিণের খোলা বারান্দাই ভরসা। সেখানেই জ্যামিতি, পরিমিতি আর উপপাদ্যে নিয়ে জোর কসরত চলত আমাদের। সকাল থেকেই হ্যারিকেনে কেরোসিন ভরে, ঝেড়ে পুঁছে রেখে, তার সলতে ঠিকমত কেটে সমান করে  দেওয়া হত ।  রাতে লোডশেডিংয়ে মা টানতেন হাতপাখা। শাড়ির পাড় দিয়ে মোড়া থাকত হাতপাখাটি। টেঁকশই হবে বলে । ছোটদের বেয়াদপির দাওয়াই ছিল এই পাখার বাড়ি। যে খায়নি এই পাখার বাড়ি সে জানেওনা তা কেমন খেতে ।  সেই তালপাতার পাখাখানি টানতে টানতে বাইচান্স আমাদের গায়ে ঠুক করে লেগে গেলেই মায়ের যেন একরাশ মনখারাপ। যেন কি ভুলই না করেছেন। সেই পাখা সাথে সাথে মাটিতে ঠুকে তিনবার আমাদের কপালে, চিবুকে হাত রেখে চুক চুক করে ক্ষমা চাইতেন। দোষ কাটিয়ে নিতেন। সন্তানের গায়ে হাতপাখা লেগে যাওয়া যেন দন্ডনীয় অপরাধ।  
মাটির কুঁজো বা জালার জল ছিল আরেক প্রাণদায়ী বন্ধু সে গরমে। মা আবার এক ফোঁটা কর্পূর দিয়ে রাখতেন জালার জলে। জীবাণুনাশক আবার সুন্দর গন্ধ হবে বলে। জলের লীনতাপকে ধাক্কা দিয়ে বাইরে বের করে দেবার জন্য সকাল থেকেই লাল শালু ভিজিয়ে জড়িয়ে দেওয়া হত মাটির জালার বাইরে। এখন গর্বিত বাঙালির ঘরে ঘরে ফ্রিজ। সে মাটির কুঁজোও নেই আর নেই সেই হাতপাখা।  
সকলে বলে গরম বেড়েছে। কারণ নাকি বিশ্ব উষ্ণায়ণ। মায়ের এখন থাইরয়েড তাই গরম আরো বেশি। হোমমেকারের হটফ্লাশ তাই গরম বেশি। বাজারদরের আগুণ নেভেনা তাই বাবার কপালের ঘাম শুকোয়না। ছেলেপুলেরা জন্মেই ফ্রিজ দেখেছে তাই ফ্রিজে জল না থাকলে তারাও অগ্নিশর্মা। কি জানি লোডশেডিং, মাটির জালা, হাতপাখার বাতাস, ছাদে বসে বরফকুচির দেওয়া সীমিত শরবত এগুলোই বোধ হয় ভালো ছিল। তাই বুঝি এত গরম অনুভূত হতনা। 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত