| 2 মার্চ 2024
Categories
ধারাবাহিক সাহিত্য

ইন্দু বিন্দু (পর্ব- ৩ )

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট
শ্রীচৈতন্যের জীবনী নিয়ে মধ্যযুগেই কয়েকটি গ্রন্থ লেখা হয়েছিল। তবে বাংলা সাহিত্য-আসরে আত্মজীবনী সাহিত্য এসেছিল বেশ চমক দিয়ে। চমক এ জন্য যে, আধুনিক যুগ ইংরেজ এবং ইংরেজি সাহিত্যনির্ভর হয়ে উঠেছিল। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিতরাই সমাজ-সাহিত্য-রাজনীতিতে অবদান রেখেছিলেন। কিন্তু বাংলায় ‘আত্মজীবনী’ লেখার ইতিহাস একেবারেই ভিন্নভাবে এসেছে। কোনো ইংরেজ প্রভাবিত বা কোনো শিক্ষিত লোক আত্মজীবনী লেখেননি। লিখেছেন অজপাড়াগাঁয়ের প্রায় অশিক্ষিত এক মেয়ে। তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, কেউ তাঁকে পড়তে বা লিখতে শেখাননি। লেখাপড়া অর্জন করেছিলেন তিনি নিজে, সম্পূর্ণ একাকী। তাই সাহিত্যের আঙ্গিনায় তিনি একটি বিস্ময়। তাঁর নাম রাসসুন্দরী। তাঁর বইয়ের নাম ‘আমার জীবন’। তারপরে আত্মজীবনী অনেক পেয়েছে বাংলা সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যের পাঠক।

আরও একটি আত্মজীবনী ইন্দু বিন্দু’র সাক্ষী হতে যাচ্ছেন আপনি। আদরের নৌকা,শব্দের মিছিল-এ বিক্ষিপ্তভাবে নিজের জীবন নিয়ে লিখেছেন, ইরাবতীর পাঠকদের জন্য ধারাবাহিকভাবে নিজের জন্মতিথিতে নিজের আত্মজীবনী লেখা শুরু করলেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। আজ রইলো আত্মজীবনী ইন্দু বিন্দুর তৃতীয় পর্ব।


সেই যে আমার টিন বেলার দিনগুলি 

খেলার কথা বললেই মনে পড়ে যায় আমার পুতুলবেলার কথা। আমি খুব গুছিয়ে পুতুল খেলেছি।
ছোটবেলার সেই আগলহীন পুতুল সংসার, যেখানে আমার অবিরাম কর্তৃত্ত্ব, পুতুলদের ওপর শাসন, পড়ার ফাঁকে নজরদারি আজো যেন স্মৃতিতে ভারাতুর করে তোলে মন। মাটির পুতুল গড়ে রং তুলি দিয়ে পাটের ওপর কালো রঙ করা পরচুলো পরিয়ে মা বানিয়ে দিতেন। ছেলে পুতুল আর মেয়ে পুতুল।  তাদের বিয়ের দিন ধুম পড়ে যেত বাড়িতে। ঠাম্মা কালীঘাট থেকে এনে দিয়েছিল তাদের জন্য কাঠের খাট। পুরনো শাড়ি দিয়ে বিছানা, বালিশ, চাদর সব মায়ের হাতে বানানো । ঠিক আমাদের মত। ফুল ফুল ছাপ, কত রঙীন! কত নরম! মায়ের হাতের স্নেহ মাখা। কাশী থেকে কাঠের ওপর গালা দেওয়া ডাইনিং টেবিল সেট, ড্রইংরুমের সোফাসেটি, সেন্টারপিস, কিউরিও, বেডরুমের আলনা আর ড্রেসিং টেবিল সব এনে দিলেন মাসী। দিদা দক্ষিণেশ্বর থেকে টিনের বাসন সেট দিলেন। সব জোগাড়যন্তর হল। অনুষ্ঠানের কোনো ত্রুটি নেই। যেন সেইকারণেই ঝটপট আমার পুতুল মেয়ের বিয়ের তোড়জোড় হল। তবে শর্ত একটাই। আমার পুতলি শ্বশুরবাড়ি যাবেনা। এত্ত জিনিষপত্তর গুছিয়ে দিয়ে তাকে আমার পড়ার টেবিলের নীচেই রেখে দেব বুকে করে, যত্ন করে। টিনের জর্দার কৌটোর ওপর মাটি লেপে উনুন হল। লাল টুকটুকে জনতা স্টোভ এল রথের মেলা থেকে। এখন দেখি গ্যাস আভেনও পাওয়া যায়। সঙ্গে সিলিন্ডার। তা দেখে মরণকালে আবার মনে হয় পুতুল খেলি।
খুব লোডশেডিং হত আমাদের সময়ে। একটা ইঞ্চিচারেকের হ্যারিকেনও এল। আমাদের কল্পনার দুনিয়ায় বার্বিডলের সাজানো গোছানো সাহেবী সংসার ছিল না। যা ছিল সব দিশী। ঠিক মায়ের সংসারের মত। রোজ পাড়ার গলি দিয়ে হাতে করে ফটফট করে কি যেন লারেলাপ্পা বাজাতে বাজাতে যেত রোগাপ্য্যাঁটকা প্ল্যাসটিকের খেলনাওয়ালা। প্ল্যাস্টিক আমাদের আধুনিক জীবনে তখন সবেমাত্র প্রবেশ করছে। পাউডারের টিনের কৌটো, নারকেল তেলের কৌটোর বদলে একরাশ প্ল্যাস্টিকের খেলনা দিতসে । বাড়ির আবর্জনা বিদেয় করতে মা উত্কর্ণ থাকতেন সেই লোকটার জন্য। আওয়াজ পেলেই একতলার গ্রিলের মধ্যে হাত গলিয়ে পাউডারের টিন, নারকোল তেলের টিন দিয়ে পছন্দের খেলনা নিতাম। মনে আছে সেবার পুতুল বিয়ের আগে প্ল্যাস্টিকের লাল ছোট্ট জগ আর টি সেট নিল মা। সাজাতে হবে পুতুলের সংসার। সাজানো গোছানো সেই সংসারে একদিন জল ঢেলে দিল আমাদের পোষাকুকুর জুডি। আমরা কোথায় যেন  গেছি। জুডি ছাড়া ছিল বাড়ির মধ্যে রাতে ফিরে এসে দেখি একটাও প্ল্যাস্টিকের সেই লাল কাপ ডিশ আর জগ নেই। খোঁজ খোঁজ। আমার চোখে জল। মায়ের গোয়েন্দাগিরি। পরদিন রহস্যের নিরসন। জুডি খুব পটি করেছে ছাদে। ছাদময় সেই লাল লাল প্ল্যাস্টিকের কুচি জুডির বিষ্ঠায় দেখে এত্ত মনখারাপ করেছিলাম। তারপর আর কোনোদিন সেই প্ল্যাসটিকের খেলনাওয়ালা টা বাজনা বাজিয়ে আসেনি আমাদের পাড়ায়। আমারো আর সেই লাল জগ আর কাপ প্লেট কেনা হয়ে ওঠেনি এ জীবনে।  
বড় হয়ে কতকিছু আর তেমন করে খুঁজে পাইনা। এই যেমন পাইনা রোববার কে। আমি বয়সে বড় হলাম আর রোববার আমার চেয়েও অনেক বড় হয়ে গেল তাই বারেবারে তাকে ধরতে চেয়েও হারিয়ে ফেললাম।  রোববার আসে, রোববার যায় অচিন পাখির মত, তার পায়ে আর মনোবেড়ি পরাতে পারিনে। অথচ এই রোববার ছোটবেলায় ছিল আমার একরত্তি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। রোববার মানে সপ্তাহান্তের পড়াশুনো ঝালাই করে নিজের সাফসুতরো হবার দিন।পড়ার টেবিল গোছানোর দিন। কেডস জুতোয় সাদা রং, স্কুল ড্রেসে জলের ছিটে দিয়ে ইস্ত্রি করার দিন।  বিকেল বেলায় একটু গানের রেওয়াজেরও দিন। একের পর এক ফরমায়েশি রাগরাগিণীর ভেলায় ভেসে গলায় সুর তোলা আর স্বরক্ষেপণ করা। এটায় সুর লাগছে না অথবা ওটায় গলা উঠছে না এভাবেই চলত । হঠাত পরীক্ষার চাপে আবিষ্কার করলাম হারমোনিয়ামের রিডে ধুলো পড়েছে। বুঝলাম বড় হচ্ছি আমি।

গানের রেওয়াজের পাশাপাশি ছেলেবেলার রোববার ছিল রেওয়াজি খাসিরও দিন।    
রবিবার আশপাশের সব বাড়ি থেকেই প্রেসার কুকারের হুইসল বেজেই চলত। মায়ের হেঁশেলও তার ব্যতিক্রম ছিল না। বাবা সকাল সকাল বাজারের ব্যাগ দুলিয়ে লাইন দিয়ে কিলোখানেক খাসির মাংস এনে দিয়েই যেন রবিবাসরীয় দায়িত্ব সম্পন্ন করে যারপরনাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচতেন। এসেই বলতেন কচি খাসি এক্কেবারে। সামনের রাং আর পেছনের রাং মিলিয়ে দিয়েছে। প্রেসার কুকারে দিতে বারণ করেছে, বুঝলে? কষতে কষতেই সেদ্ধ হয়ে যাবে বলেছে, শুনছ? মা বলত, না শুনিনি। আমি কষে নিয়ে একটা সিটি দিয়ে কাজ সেরে বসব, শত্রু মেরে হাসব। রেডিওর নাটক শুরু হয়ে যাবে।
সেদিন প্রথম পাতে একটা কিছু তেতো অথবা শাকভাজা আর তারপরেই কব্জি ডুবিয়ে মাংসর ঝোল ভাত। শেষপাতে চাটনী।  বাড়িতে পাতা টক দই। রোব্বারে মায়ের হাতে সেই আগ জ্বলন্ত ধোঁয়া ওঠা মাংসের ঝোলের সে গন্ধটা যেদিন আর পেলাম না সেদিন সম্মুখে উচ্চ মাধ্যমিকের দুস্তর পারাবার । আরো পরে জানলাম ইউরিক অ্যাসিড আর ব্লাড প্রেশারের ফতোয়া জারি হয়েছে। সুস্থ শরীরের বিপক্ষে জেহাদ ঘোষণা করেছে রেড মিট। বুঝলাম আমার বয়সও বেড়ে গেছে।
 
ওদিকে রোববারের চান ঘরে  লাইফবয়, মার্গো কিম্বা মোতি সাবান হাত ফসকে তুবড়ে যেত কলতলায়। রবিবাসরীয় ব্যস্ততায়, ঘষা মাজায়। রান্নাঘর থেকে মা এসে রিঠের জলে মাথা ঘষে দিচ্ছে কিম্বা খড়ি ওঠা পিঠে ধুধুলের ছোবড়া দিয়ে সাবান মাখিয়ে চানের পর পরম স্নেহে গ্লিসারিন মাখিয়ে দিচ্ছে আলগা হাতের আঙুলে ।
চল্, চল্, ভাতের ফেন ঝরাব কিম্বা মাংসটা গলে গেল বুঝি অথবা নুন টা চেখে দ্যাখতো একবার। বেশি দিলাম না তো?  একটুঁ চেখে দ্যাখ তো গরম মশলার গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে তো? প্রেসার কুকার খুললেই পিয়াজ-আদা-রসুন-লংকার কেমিস্ট্রি তে মাখো মাখো মাংসের ওপর  ভেসে থাকা সেই তেল দেখে পেটের খিদে বেড়ে যাওয়া আর  গোল গোল বড় বড় আলুর সেই ডুবুডুবু ঝোলে লাবণ্যপ্রাপ্তি আর দেখিনা তেমন করে। বড় হয়েছি যে! রোবাবারের সব মাংসের ঝোল ভাত যেন কেমন বারোয়ারী হয়ে গেল। খাসি এখন মহার্ঘ্য।খাসি এখন শারীরিক কারণে ব্রাত্য। তবুও রোববার আসে, রোববার যায়। বাবাদের চোখে ছানি পড়ে। মায়ের সেই মেয়েটাও কেমন বড় হয়ে যায় ।

আকাশবাণীতে বিনাকার আসর, আমীন সাইনির উদ্দাত্ত গলা, ইথার তরঙ্গে ভেসে আসা সাপ্তাহিক নাটকের কুশীলব দের সঙ্গে একাত্ম হওয়া… এমন কতকিছু । আর চোখের সামনে খোলা রবিবাসরীয় কাগজের গল্পের পাতা?    
 টেলিভিশন টুক করে ঢুকে পড়ল আমবাঙালির অন্তঃপুরে। ইথারতরঙ্গের সেই বনেদী নাটকগুলো ঐ খাসির মাংস, বিনাকার আসরের মতই হারিয়ে ফেললাম অচিরেই।  সিরিয়ালের দাপটে বানভাসি ঘরদুয়ার। রোববারের মাংস আছে।খাসি নেই। খাসি বলেই চালানো মহার্ঘ পাঁঠার মাংস আছে । পাতি সস্তার ব্রয়লার মুরগী আছে আমার স্বাস্থ্যের কারণে। মাটনের মত বিনাকায় এখন ফ্যাশন আউট। দন্তরুচি কৌমুদীর সৌন্দর্য্য রক্ষায় অনেকেই হাজির এক আকাশের নীচের প্রতিযোগিতায় । কিন্তু তারা কেউ অনুরোধের গান ভাসিয়ে দেয় না তড়িতচুম্বকীয় তরঙ্গে ঠিক যেমন দিত সেই গীতমালা । কেউ  জমিয়ে রাখার মত দৃষ্টিনন্দন পশুপখিও বিকোয় না বিনামূল্যে । আর সেইসব খুদে খুদে পশুপাখিরাও বিদায় নিয়েছে শিশুদের ছোটবেলা থেকে।ওরা প্রতিনিয়তই বলে দেখো আমি বাড়ছি মামি। কিন্তু সেই বিনামূল্যের পশুপাখি না জমিয়ে কি বড় হওয়া যায়?
 
বাবার হাত ধরে কোনও এক রোববারে আমিও হাতের মুঠোয় ভরে এনেছিলাম একটা জিরাফ। সেই রবিবার ছিল আমার জীবনে সর্বোত্তম। আমি পৌঁছেছিলাম খুদে জিরাফময় এক সব পেয়েছির দেশে যেখানে মাংসের ঝোল ভাত অতি সামান্যএক ছুটির অনুষঙ্গ। তেমনি এক রোববারেই আবিষ্কার করেছিলাম আমি বড় হয়ে গেছি। টোল পড়া গালে দুই বিরুণী ঝুলিয়ে আয়নায় ঘুরেফিরে দেখছিলাম নিজেকে। সেদিন মা বলেছিল বুকের কাছে ফ্রিল দেওয়া ফ্রক পরতে হবে এবার।

ছোটবেলায় আমরা এত প্রসাধন দ্রব্য দেখিনি। ময়শ্চারাইজার, স্কিন টোনার, এস্ট্রিনজেন্ট…হেয়ার কন্ডিশানার ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার বড় জ্যাঠামশাই জিওফ্রি ম্যানার্সে চাকরী করতেন। একদিন হঠাত আমাদের সব বোনেদের উনি অ্যানিফ্রেন্চ ডিপ ক্লিনজিং মিল্কের স্যাম্পেল প্যাক উপহার দিয়ে বললেন, মেয়েদের স্কিন নাকি আরো সুন্দর হয় এই লোশন মাখলে। নরম হবে স্কিন ঠিক এই ছবির ফুলের মত।  
জ্যেঠতুতো পাঁচবোনেদের মধ্যে তখন আমি সবচেয়ে ছোট এগারো কিম্বা বারো। দুই বিনুনি, স্কুল আর গান সর্বস্ব অন্তর্মুখী জীবন আমার।  শীতকালে মা স্নানের পর মাখিয়ে দিত ঐ ক্লিনজিং মিল্ক। আমার তৈলাক্ত বয়ঃসন্ধির গনগনে আঁচে মুখভর্তি সেবাম নিঃসরণে ঐ মিল্ক আমার কাজে এলনা। আমি হলাম ব্রণ সর্বস্ব সুন্দরী। অগত্যা মা বেসন, চন্দন ইত্যাদির প্রলেপ দিয়ে সেই তৈল নিঃসরণকে চাপা দিতেন। আরো বড় হতে লাগলাম। দূরদর্শন সর্বস্ব ড্রয়িংরুম ইতিহাস-ভূগোলের ফাঁকে ফাঁকে মডেল দর্শনের বেলা। তদ্দিনে মাধ্যমিক আমার। ল্যাকমে ডিপ পোর ক্লিনজিং মিল্ক একটু আধটু চলে মায়ের কাছ থেকে। আমি কিছুটা বিভ্রান্ত। স্কুলবেলায় সাজুগুজু নৈব নৈব চ।  
এখন সেই ক্লিনজিং মিল্কের ব্রান্ড ডাইল্যুশান। বাজারে হরেক কিসিমের ময়শ্চারাইজার। কারে ধরি আর কারে ছাড়ি। রাস্তার মোড়ে মোড়ে  বিউটি স্যাঁলো, স্পা আর দোকানে থিকথিক করছে বাহারী সুদৃশ্য বোতলে প্রসাধন দ্রব্য।  শপিংমলে গেলে সেলস গার্লরা গছিয়েই ছাড়বে একটা কিছু তাদের প্রডাক্ট। টিভি খুললেই বিউটি-বিদুষীরা নিজেদের ফর্মুলা নিয়ে ঢাক পিটিয়ে চলেছেন। যত মত তত পথ।  
দিনগুলো সব সোনার খাঁচায় রইলনা, রইলনা… সেই যে আমার যতকিঞ্চিত প্রসাধনের দিনগুলি, ডিপ ক্লিনজিং মিল্কয়ের দিনগুলি, ফ্রক ছেড়ে শাড়ি ধরার দিনগুলি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত