| 3 মার্চ 2024
Categories
ধারাবাহিক সাহিত্য

ইন্দু বিন্দু (পর্ব-১২)

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

শ্রীচৈতন্যের জীবনী নিয়ে মধ্যযুগেই কয়েকটি গ্রন্থ লেখা হয়েছিল। তবে বাংলা সাহিত্য-আসরে আত্মজীবনী সাহিত্য এসেছিল বেশ চমক দিয়ে। চমক এ জন্য যে, আধুনিক যুগ ইংরেজ এবং ইংরেজি সাহিত্যনির্ভর হয়ে উঠেছিল। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিতরাই সমাজ-সাহিত্য-রাজনীতিতে অবদান রেখেছিলেন। কিন্তু বাংলায় ‘আত্মজীবনী’ লেখার ইতিহাস একেবারেই ভিন্নভাবে এসেছে। কোনো ইংরেজ প্রভাবিত বা কোনো শিক্ষিত লোক আত্মজীবনী লেখেননি। লিখেছেন অজপাড়াগাঁয়ের প্রায় অশিক্ষিত এক মেয়ে। তাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই, কেউ তাঁকে পড়তে বা লিখতে শেখাননি। লেখাপড়া অর্জন করেছিলেন তিনি নিজে, সম্পূর্ণ একাকী। তাই সাহিত্যের আঙ্গিনায় তিনি একটি বিস্ময়। তাঁর নাম রাসসুন্দরী। তাঁর বইয়ের নাম ‘আমার জীবন’। তারপরে আত্মজীবনী অনেক পেয়েছে বাংলা সাহিত্য ও বাংলা সাহিত্যের পাঠক।

আরও একটি আত্মজীবনী ইন্দু বিন্দু’র সাক্ষী হতে যাচ্ছেন আপনি। আদরের নৌকা,শব্দের মিছিল-এ বিক্ষিপ্তভাবে নিজের জীবন নিয়ে লিখেছেন, ইরাবতীর পাঠকদের জন্য ধারাবাহিকভাবে নিজের জন্মতিথিতে নিজের আত্মজীবনী লেখা শুরু করলেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। আজ রইলো আত্মজীবনী ইন্দু বিন্দুর দ্বাদশ পর্ব।


দোলের রঙ



ফাগুন ফুরিয়ে আসে। লেপ-বালাপোষ-পশমিনারা মথবলের উদ্বায়ী সুখে আবার বাক্সবন্দী হয়। মা’কে দেখতাম, মসলিন কাপড়ে কাচা শীতপোষাক ঢেকে শুকনো লঙ্কার পুঁটলি দিয়ে রাখতে। আমাদের বাপু অত সময় নেই । আমরা ইউজ এন্ড থ্রো। অত যত্ন কত্তি পারব নি বাপু। সে ফাগুনই হোক, প্রেম পিরীতিই হোক আর শাল-কার্ডিগানই হোক ।
শীতের সবজী দুচোখের বিষ। সেই দামড়া দুধ সাদা ফুলকপিগুলো? আর সেই পাকা পাকা হলদে হলদে শিষ পালং ? রক্ষে করো মা! এবার ক্ষান্ত দাও! মন তখন ফকিরের মত ঝুল ঝুল চোখে চেয়ে দেখে একশো টাকা কিলো কচি পটল কিম্বা মাগ্যির ঝিঙের দিকে। লিকলিকে সবুজ সজনে ডাঁটা আর নতুন বসন্তের নিমঝোলের জন্য মন উচাটন। বিকেলের রোদ গড়িয়ে পড়ে গা-ধোয়া ব্যালকনির আরামকেদারায় । ফুল ফুটল, বসন্ত এল কিন্তু তারপর? খোলা গায়ে বারান্দায় দখিন হাওয়ায় দুদন্ড জিরেন নিতেও ঝামেলি। বসন্তে ফাগুন আসে না কি ফাগুনে বসন্ত আসে? কোকিল ডাকে। কাকের বাসা বাঁধার সময় হয়। ঝাঁটার কাঠি নিয়ে টানা আর পোড়েন তার। রোজ ডে, প্রোপোজ ডে, কিস ডে’র ইঁদুর দৌড়ে সামিল হয়ে এ ভ্যালেন্টাইনস ডে, সরস্বতী পুজো পেরিয়ে দোলযাত্রা চলে আসে তার তিথিপুজোয়।
কি মহিমা এ বসন্তের! তবুও শান্ত হয়না পৃথিবী, সেটাই বড় কষ্টের।

একটু বিষাদ, একটু বিরহ, একটু প্রেম, একটু ভালোলাগা সব মিলিয়ে আমাদের বেশ একটা ফিল গুড ফ্যাক্টর কাজ করে এই সময়। ভোগ্য পণ্য সবেতেই অফ সিজন ডিসকাউন্ট। কেন রে ভাই? বসন্ত তোদের কাছে একটা অফ  সিজন? ব্যবসায়িক কেমিষ্ট্রি অবিশ্যি আমরা বুঝব না। আসলে লোকটানার কৌশল। ছুতোয় নাতায় স্প্রিং ফেস্টের আকর্ষণ। ছলে বলে কৌশলে কখনো গোলাপ ফুল, কখনো চকোলেট, কখনো বা টেডি বেয়ার আর ভ্যালেন্টাইন গিফ্ট তো হাতের পাঁচ। বসন্তে মানুষের সম্পর্ক ঝালিয়ে নেবার পালা। সেই আবার নতুন করে পাব বলে।
আমার দোল পিঁড়ি রঙিন হয়েছিল একসময়। খুব পরিশীলিত ভাবে কো এড বাতাবরণে। বছর দুয়েক আগে দোলের আগের দিন কোলকাতার এক নামী কলেজের পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম । দেখলাম ছেলেগুলি মেয়েদের সিঁথিতে সিঁদুরে আবীর ঢেলে দিচ্ছে নিপুণ ভাবে তারপর সেই লাল টুকটুকে সিঁথিতে মেয়েটি ছেলেটিকে জাপটে ধরে মোটরসাইকেলে করে এক নিঃশ্বাসে অন্তর্হিত হল সেখান থেকে ।  
দোলের আবীরগুঁড়ো অহোরাত্র উড়তেই থাকে ফেসবুক জানলায়, দেওয়ালে, বারান্দায় । দোলের রঙের গড়িয়ে পড়তে লাগল অর্কুট অলিন্দ দিয়ে । সেই রঙ গিয়ে পড়ল ফেসবুক উঠোনে । দোল এখন পণ্য সংস্কৃতি। দোল এখন হোলির দেখনদারিতে দুষ্ট।

এখন দোলের রঙের ওপরেও টেকশো ! রূপ সচেতন বঙ্গতনয়ারা স্কিনফ্রেন্ডলি রং চায় ! ইকোফ্রেন্ডলি আবীর, ভেষজ গুলালে ফ্যাশন ইন ! তাই ডিজিটাল দোল খেলো বাবা!  নো হ্যাপা !  আমার যেমন বেণী তেমনি রবে চুল ভিজাব না, রং খেলবোনা ! রসায়ন পড়ুয়াদের কত আর অ্যান্ড ডি ছিল এই রঙ নিয়ে।
তবুও খেলব হোলি, রঙ দিয়ে নয়। ফাগ মেখে।  
ভাগ্যি সোশ্যালনেটওয়ার্ক ছিল প্রেমের সঙ্গে! দোলখেলার বৃত্তটা কিন্তু ছড়িয়েছে আগের থেকে । এখন দোলখেলার প্রেম বেঁচে বরতে থাকে দিনের পর দিন রাতের পর রাত । সেই রঙ সোশ্যাল মিডিয়ায় ওড়ে । ফেসবুক উজাড় করে ঘন্টার পর ঘন্টা দোলখেলা পেরোয় ডিঙিনৌকো করে । ডিজিটাল ঢেউ পেরিয়ে ট্যুইটারের চিলেকোঠাতেও মুখ লুকোয় সেই দোলখেলা । দোলের রং ঝরছে সর্বত্র । ফাগ উড়ছে অনাবিল আনন্দে ।

তবে পড়াশোনোর প্রবল চাপে আমাদের সামান্য দোলখেলা ছিল প্রকৃত দোলের মতন । বড় মায়াময়। অন্যরকমের মাদকতায় আর একটা বিশেষ ছুটির দিনে দোলকে দোলের মত করে পাওয়া ।
দোল পূর্ণিমার আগের রাতে খেজুরপাতা, সুপুরীপাতা আর শুকনোগাছের ডালপালা জ্বালিয়ে আগুণের চারপাশে ছোটছোট ছেলেমেয়েদের মহা উত্সাহে নৃত্য করে করে গান গাওয়াটাই ছিল যেন আরো সামাজিক। স্কুল থেকে ফিরতে ফিরতে দেখতাম পাড়ায় পাড়ায় ন্যাড়াপোড়ার তোড়জোড়। হই হই করে সব গেয়ে উঠত…  
“আজ আমাদের ন্যাড়াপোড়া, কাল আমাদের দোল, পূর্ণিমাতে চাঁদ উঠেছে বল হরিবোল”
তখন না ছিল ইন্টারনেট না মোবাইল ফোন অথবা হাজারো কেবল চ্যানেল । অগত্যা দূরদর্শনের দোলের বৈঠকিই ছিল ভরসা ! আমার দোলে সবথেকে কাছের জিনিষ ছিল ফুটকড়াই-মুড়কি আর রংবেরঙের মঠ । ভোর হতেই স্নান সেরে ঠাকুরের পায়ে এব্ং গুরুজনদের আবীর দিয়েই  নড়তে চড়তে সেই মুঠোমুঠো ফুটকড়াই চিবোনো ছিল দোলের নেশা । তারপর রং খেলে নিয়ে সেই রঙ তোলার যুদ্ধ । সন্ধ্যেবেলায় ছাদে উঠে দোল-পূর্ণিমার চাঁদ দেখা । দূর থেকে কারো ঘরে সত্যনারায়ণ পুজোর কাঁসর ঘন্টার শব্দ। তারপরেই সেই বাড়ি থেকে আসবে শিরণি প্রসাদ। এসব আজকাল অচল। নিজেদের বাড়িতে নিজেদের মত করে একটু দোলের বৈঠকী আড্ডা। গানবাজনা, মহাপ্রভুর স্মরণ মনন, কীর্তন আর জমিয়ে খাওয়াদাওয়া ।

সত্যি দোলযাত্রা যেন পরাণের সঙ্গে পরাণ বাঁধার উত্সব!  চির বন্ধুতার আবেগে মাখোমাখো উত্সব  ।  

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত