| 14 এপ্রিল 2024
Categories
ধারাবাহিক সাহিত্য

ইরাবতীর কথা (পর্ব-৪)

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

নারীর নিজের মুক্তির জন্য, নিজের স্বাধীনতার জন্য নিজের উপর নিজেকে আস্থা রাখতে হবে, লড়াইটা নিজেকেই করতে হবে। নারীবাদ বলি কী নারী স্বাধীনতা বা নারী মুক্তি- অর্জন না করলে পাওয়া যাবে না। নরওয়ে নারী-পুরুষের সমতার জন্য একটি পারফেক্ট দেশ বলা চলে। তারপরও এই দেশেও তেমন নারীর সাক্ষাৎ মেলে যে নিজে ডাক্তার হয়েও ডাক্তার স্বামীর ভয়ে তটস্ত থাকে।স্বামী শুধু স্যান্ডউইচ দিয়ে লাঞ্চ করতে চায় না বলে স্ত্রীকে সাথে স্যুপও বানাতে হয়। আর এই স্যুপ বানানোটা ভালোবেসে বানানো না রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে বানানো। এর জন্য নিজের অফিসিয়াল কাজ শেষ কোথাও বসে দু’দণ্ড জিরায় না, পাছে বাসার কাজে দেরী হয়ে যায়। অথচ নরওয়ের সমাজে স্বামী-স্ত্রী সপ্তাহের দিনগুলো ভাগাভাগি করে রান্নাসহ ঘরের যাবতীয় কাজ করার নিয়ম। দেখা যাচ্ছে, আইন থাকলেও সব নারী তা যথাযথ নিতে পারছে না। এমন শিক্ষিত নারীকে কে নারী-স্বাধীনতা এনে দেবে বা তার কাছে নারী স্বাধীনতা বা নারীমুক্তির সংজ্ঞা কী কে জানে! ’ইরাবতীর কথা’ ধারাবাহিকে ইরাবতীকে নারীর অনেক না বলতে পারা কথায় ও রূপে সাজিয়েছেন বিতস্তা ঘোষাল আজ থাকছে ইরাবতীর কথা ধারাবাহিকটির ৪র্থ পর্ব।


আকাশ জুড়ে এখনো মেঘের ঘনঘটা। গাড়ির রেয়ার গ্লাসের বাইরে ফোটা ফোটা বৃষ্টি। ওয়াইপার দিয়ে যেন মুছে ফেলতে চাইছে বহুদিন ধরে জমে থাকা নানা ক্ষত। সামনের স্ক্রিনে এক একটা মুখ ক্রমশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে। ইরাবতী ভাবছিল, ভালবাসা প্রেম এগুলো কী একেবারেই মানে হীণ!

বাড়ি ছেড়ে চলে যাবার পর বহু দিন হয়ে গেল ঐহিক ফেরেনি। ফোনও সেভাবে ধরে না। ধরলেও দায়সাড়া উত্তর দিয়ে ‘ব্যস্ত আছি’ বলে কেটে দেয়। বিদেশে থাকতেই আজকাল সে বেশি ভালবাসে।

 আচ্ছা ঐহিক ওখানে শাপলাকে বিয়ে করেনি তো! হঠাৎই মনে হল ইরাবতীর। ভেবেই বুকের ভিতরটা কেমন কেঁপে উঠলো।শেষবার ঐহিকের কাছে গিয়ে ওর বাথরুমে ব্রা, প্যান্টি আর চুলের ক্যাচার দেখেছিল। যদি সেটাই স্থায়ী হয়ে থাকে…। সেই মেয়েটাই তো এখনো ওর সেক্রেটারি। এত কিছু ঘটে যাবার পরেও তাকে ছাড়েনি ঐহিক। কিন্তু সেটা হলে তো তাকে ডিভোর্স দিয়ে আরেকটা বিয়ে করতে হবে। তাহলে কী লিভ টুগেদার করছে ওরা!

শাপলাও কী কম অপমান করেছে তাকে! নিজের বরকে সাটিস্ফাই করতে পারেন না, কী পেয়েছেন স্যার আপনার থেকে? সব জানি আপনার সম্পর্কে। দুনিয়ার পুরুষের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক, অস্বীকার করতে পারবেন যে আপনি অফিস চালাবার নেপথ্যে আসলে বেশ্যা বৃত্তি করেন!

শাপলার মুখে এসব শুনে ঘেন্নায় অপমানে কুঁচকে গেছিল ইরাবতী। কোনো উত্তর দিতে পারেনি সেদিন সে। খালি মনে মনে ঈশ্বরকে ডেকেছিল যেন এই ভয়ঙ্কর অপমান আর যন্ত্রণা সহ্য করার ক্ষমতা তাকে দেন তিনি।       

সেদিনের কথাগুলো মনে আসতেই চোখ বুজে ফেলল ইরাবতী।

জোরে ব্রেক কষে গাড়িটা দাঁড়িয়ে গেল। সামনের সিটে থুতনিটা লাগল ইরাবতীর। সামলে নিয়ে চিৎকার করে উঠল। এত জোরে কেউ ব্রেক কষে ? হলটা কী? কতবার বলেছি তোকে গাড়ি আসতে চালাতে। একেই বৃষ্টি…

বাবু বলল, ম্যাডাম আমি কী করব? সামনে তো বাইকটা স্কিট করে ঘুরে পড়ে গেল। আমি ব্রেক না মারলে তো ওদের গায়েই…তখন থেকে আমার গাড়ির সামনে এসে যাচ্ছে। আর আপনার জানলার কাছে গিয়ে কিছু ইশারা করছে। আপনি তো নিজের মনে কিছু ভেবেই যাচ্ছেন। যেই ওভারটেক করে এগোতে যাচ্ছি সেই সামনে এসে যাচ্ছে। বেশ হয়েছে পড়েছে।

ইরাবতী শুধু ওঃ বলে, গাড়ির দরজা খুলে নামতে গেল।

ম্যাডাম নামছেন কেন? বলতে বলতে বাবুও নামল।

চল, দেখি কী অবস্থা! হাত পা ভাঙল কিনা! এত বৃষ্টিতে কেউ সাহায্য করবে না মরে পরে থাকলেও।

ম্যাডাম ফালতু ঝামেলা বাড়াচ্ছেন। স্যার জানলে বকবেন আমাকে ।

ইরাবতী কোনো কথা না বলে এগিয়ে গেল। বাইকটা  ছিটকে পড়েছে বেশ খানিক দূরে। একটা ছেলে সেটাকে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছে। সামনের দিকে তাকিয়ে দেখল আরেকটা ছেলের হাত ঝুলে পড়েছে। আরেকজনের কপালের সামনেটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। সে আর একটু সামনে গিয়ে বাবুকে বলল, ছেলে দুটোকে তোল।

গাড়ির সামনে ফিরে এল। সিটে পড়ে থাকা মোবাইল হাতে নিয়ে ডায়েল করল এমার্জেন্সি নম্বরে। রিং হয়ে হয়ে কেটে গেল। হঠাৎ মনে পড়ল নীল আছে হেড কোয়াটারে আছে। ভাবা মাত্রই রিং করল। প্রথমবার রিং হয়ে কেটে গেল। দূর! এবার কী এদের হাসপাতাল নিয়ে যাব, ভাবতে ভাবতেই মোবাইল বেজে উঠল।

হাই সুইট হার্ট। এই অধমকে কী কারণে স্মরণ করেছেন জানতে পারি কী?

ইয়ার্কি রাখো নীল। দ্বিতীয় হুগলী ব্রিজের কাছে আমার গাড়ির সামনে বাইক উলটে পড়েছে। তিনটে ছেলে সিরিয়াসলি আহত। সাহায্য চাই।

তুমি ঠিক আছ?

আছি। এখন এদের ঠিক থাকাটা জরুরী। তুমি পারলে এসো। আমি এদের হাসপাতালে নিয়ে যাচ্চি।

এক মিনিট হোল্ড করো। লাইনটা ধরে থাকো।

ইরাবতী ফোনটা স্পিকারে দিয়ে বাবুকে বলল, কী অবস্থা রে?

পুরো টাল হয়ে আছে ম্যাডাম। অফিসের গেটের সামনে থেকে আপনাকে বিরক্ত করছিল।

কাকে বিরক্ত করছিল?

কাকে বলছি! আপনি কোনো দিকে খেয়াল করলে তো! বেমাক্কা ঝামেলায় জড়াচ্ছেন।

হ্যালো ইরাবতী, লোকাল থানার ও সি এখনি পৌঁছে যাচ্ছে। উনি যা করার করে নেবেন। তুমি ওনারা এলেই হ্যান্ডওভার করে বাড়ি যাও। বৃষ্টি হচ্ছে তো!

হুম।

হায়! হায়! এক সঙ্গে বৃষ্টি আর ইরাবতী।

ফাজলামি রাখো নীল। বলতে বলতেই একটা কালো জিপ এসে দাঁড়ালো।

নীল ওনারা এসে গেছেন। রাখছি। কল কাটা মাত্র একটি অল্প বয়স্ক ছেলে সামনে এসে দাঁড়ালো। ইরাবতী এক নজরে বুকের উপর লাগানো ব্যাজে দেখল ও সি তাপস রায়।

ম্যাডাম আপনি এবার যেতে পারেন। আমরা এখনি এদের হাসপাতালে নিয়ে যাব। তারপর লিগ্যাল প্রসিডিওর যা আছে করব।

আমার থাকার দরকার নেই?

না। স্যার আপনার ফোন নাম্বার দিয়ে দিয়েছেন। দরকার হলে ডেকে নেব। থ্যাঙ্ক ইউ। আর একমুহূর্তও না দাঁড়িয়ে ওসি নিজের কাজ শুরু করে দিলেন।

ইরাবতী দেখল ছেলেগুলোকে জিপে তোলা হল। বাবু বাইকটা ততক্ষণে সাইড করে দিয়েছে।

জিপটা বেরিয়ে যাবার পর ইরাবতী গাড়িতে ফিরে এল।

ম্যাডাম, যে ছেলেটা বাইকটা তোলার চেষ্টা করছিল, সে বাঁচবে না। কান দিয়ে রক্ত পড়ছিল। নির্ঘাত ব্রেন হ্যামারেজ।

আজকাল দেখছি তুইও ডাক্তার। আলফাল না বকে চল এবার। আর হ্যাঁ, দয়া করে আস্তে চালাস।

আমি ২০ থেকে চল্লিশের বেশি স্পিড তুলি না ম্যাডাম।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত