| 27 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
ধারাবাহিক সাহিত্য

ইরাবতীর কথা (পর্ব-৮)

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

নারীর নিজের মুক্তির জন্য, নিজের স্বাধীনতার জন্য নিজের উপর নিজেকে আস্থা রাখতে হবে, লড়াইটা নিজেকেই করতে হবে। নারীবাদ বলি কী নারী স্বাধীনতা বা নারী মুক্তি- অর্জন না করলে পাওয়া যাবে না। নরওয়ে নারী-পুরুষের সমতার জন্য একটি পারফেক্ট দেশ বলা চলে। তারপরও এই দেশেও তেমন নারীর সাক্ষাৎ মেলে যে নিজে ডাক্তার হয়েও ডাক্তার স্বামীর ভয়ে তটস্ত থাকে।স্বামী শুধু স্যান্ডউইচ দিয়ে লাঞ্চ করতে চায় না বলে স্ত্রীকে সাথে স্যুপও বানাতে হয়। আর এই স্যুপ বানানোটা ভালোবেসে বানানো না রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে বানানো। এর জন্য নিজের অফিসিয়াল কাজ শেষ কোথাও বসে দু’দণ্ড জিরায় না, পাছে বাসার কাজে দেরী হয়ে যায়। অথচ নরওয়ের সমাজে স্বামী-স্ত্রী সপ্তাহের দিনগুলো ভাগাভাগি করে রান্নাসহ ঘরের যাবতীয় কাজ করার নিয়ম। দেখা যাচ্ছে, আইন থাকলেও সব নারী তা যথাযথ নিতে পারছে না। এমন শিক্ষিত নারীকে কে নারী-স্বাধীনতা এনে দেবে বা তার কাছে নারী স্বাধীনতা বা নারীমুক্তির সংজ্ঞা কী কে জানে! ’ইরাবতীর কথা’ ধারাবাহিকে ইরাবতীকে নারীর অনেক না বলতে পারা কথায় ও রূপে সাজিয়েছেন বিতস্তা ঘোষাল আজ থাকছে ইরাবতীর কথা ধারাবাহিকটির ৮ম পর্ব।


কিরে কতদূর? বাড়ি ফিরেছিস?

না বাবা। ফিরছি। ফোনটা ধরে ইরাবতী বলল।

অনেক রাত করে ফেললি। এখানে কখন আসছিস?

 রাত বেশি হয়নি। সবে সাড়ে সাতটা। বাড়ি ফিরে স্নান পূজো সেরেই আসছি বাবা।

হ্যাঁ, তুই না এলে মনটা ভালো লাগে না। দেরি করিস না। সাবধানে ফিরে যা।

হ্যাঁ বাবা।

ফোন রেখে ইরাবতী ভাবল এই পৃথিবীতে দুজন মানুষই তো রয়েছে যাদের জন্য তার ঘরে ফেরা। বাবা আর মেয়ে। মেয়ে তাও অনেক সময় মায়ের উপর চোটপাট করে, তখন মন ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে না। কিন্তু বাবা! সেতো অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে তার সন্তানের জন্য। তাকে ফেলে তো পালানো যাবে না।

তুমি কী দাদুর কাছ হয়ে এলে? দরজা খুলেই প্রান্তি জানতে চাইলো।

নাতো! একটু বাদে যাবো। কেন? তুমি যাবে?

যেতেও পারি। দাদু ফোন করেছিল,

ও। কী বলল?

জানতে চাইল তুমি ফিরেছ কিনা! আমাকে বকাবকি করো কিনা! আমার মনে কোনো দুঃখ আছে কিনা!

তা কী বললে শুনি?

বলব আবার কী! বললাম আজ যেতে পারি।

আচ্ছা তাহলে রেডি হয়ে নাও। পড়েছ একটুও? ইরাবতী গামছা নিয়ে বাথরুমে ঢোকার মুখে জানতে চাইল।

ইয়েস মা…আ…ম্মি। এতক্ষণ পড়ছিলাম। তুমি এলে বলে দরজা খুলতে উঠলাম।

ও সোনা আমার, বলে মেয়ের গালে একটা চুমু খেয়ে স্নানে ঢুকে গেল ইরাবতী।

স্নান পুজো সেরে রেডি হয়ে বেদভ্যাসের কাছে পৌঁছতে প্রায় ন’টা বাজল।স্টিলের রেলিং দেওয়া সিঁড়ির একপাশের দেওয়ালের অসাধারণ পেন্টিং পেড়িয়ে দোতলায় উঠে বিশাল ডাইনিং রুম। তার বাঁদিকের প্রথম ঘরটা বেদভ্যাসের। ঘরের বাইরে থেকেই চন্দন আর ধূপের সুগন্ধ নাকে এল। বাবা কী পুজোয় বসে গেল, ভাবতে ভাবতেই দরজা খুলে ইরাবতী দেখল চেয়ারে বসে বেদভ্যাস।

সে আলতো স্বরে ঢাকলো- বাবা আসব?

আয়। কখন থেকে বসে আছি তোর জন্য। রাত করে ফেললি। একটু বিরক্তির সুরে বলল বেদভ্যাস। জানিস তো এবার স্নান পুজো সারতে হবে। তারপর বলল, তোর মা’ও তোর জন্য অপেক্ষা করে। দেখা করেছিস মায়ের সঙ্গে?

না বাবা। সোজা তোমার ঘরেই ঢুকলাম।

যা আগে মায়ের মুখটা দেখে আয়। নইলে দুঃখ পাবে। এমনিতেই তো মায়ের ধারণা তুই আমাকেই বেশি ভালোবাসিস। আর আমি তুই ছাড়া কিছুই জানি না।

ইরাবতী হাসল বেদভ্যাসের কথা শুনে। যাচ্ছি বাবা।

প্রান্তি এসেছে নাকী?

হ্যাঁ। বলল, তুমি আসতে বলেছ। মায়ের ঘরে গেছে।

যা, দেখা করে আয়। ততক্ষণ আমি একটা সিগেরেট ধরাই।

ক’টা হল সারাদিনে?

বেশি না। আজকাল আর অত খাই না।

তাও ক’টা শুনি? ইরাবতী বেদভ্যাসের সামনের টেবিলে রাখা আশট্রের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল। অন্তত পনেরোটা তো হবেই, তার আন্দাজ বলল। আর কিছু না বলে- আসছি, বলে, মায়ের ঘরে গেল।

সংযুক্তা প্রান্তির সঙ্গে গল্পে ব্যস্ত দেখে সে বলল, তোমাদের কথা শেষ হলে ডেকো। আমি বাবার কাছে আছি।

আচ্ছা। বলে মেয়ের দিকে তাকিয়ে হেসে আবার নাতনির সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে দিলেন সংযুক্তা।

যেতে যেতে ইরাবতীর কানে এল দিদা নাতনিকে বলছেন, তোর মা মুখটা দেখিয়ে গেল। আসলে তো আসে বাবার কাছে। দিনরাত খালি বাবা বাবা বাবা…

বাদ দাও তো দিদুন। আমরা গল্প করি।

বাবার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ইরাবতী নিজের মনেই হাসল মায়ের কথা শুনে। তারপর বেদভ্যাসের সামনের চেয়ারে গিয়ে বসল।

দেখা করলি ?

হুম।

ব্যাস, ওতেই হবে। না গেলে অভিমান হোতো। ভাবত এসেই মেয়েটা খালি বাবার ঘরে ঢুকে যায়। মার প্রতি কোনো টান নেই। বয়স হচ্ছে। খুব রাগ অভিমান বেড়েছে তোর মায়ের।

ইরাবতী হাসল।

কী করলি আজ সারাদিন? এতক্ষণ কোথায় থাকিস ?

কাজে ছিলাম বাবা। প্রথমে অফিসে, তারপর আরেকটা অফিসে গেছিলাম কাজেই।

হচ্ছে কিছু? নিজেরটা নিজে চালাতে পারছিস?

ইরাবতী উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল।

এই যে তেল পুড়িয়ে অফিস যাচ্ছিস, এত জায়গায় ঘুরছিস, তেলের টাকা উঠছে নাকি সেটাও ঐহিককেই দিতে হচ্ছে?

তেলের টাকা আমিই দিই বাবা।

আর ড্রাইভারের মাইনে?

সেটা সে দেয়। কিন্তু বাবা, আমি তো ঐহিকের থেকে আমার নিজের জন্য আর কোনো টাকা নিই না। এইটুকু তো দাবি করতেই পারি তাই না? ইরাবতী নিজের পক্ষে যুক্তি দেবার চেষ্টা করল।

সেলফ ডিফেন্স কোরো না। এর মানে তুমি এখনো সেই টাকাটা দেবার মতো সামর্থ্য অর্জন করোনি। তাই বাধ্য হচ্ছ নিতে। কিন্তু নিজের ব্যক্তিগত কাজে অন্যের থেকে সুবিধা নেওয়া ঠিক নয়।

বাবা, ঐহিক আমার অন্য কেউ কেন হবে? সেতো আমার বর!

ঠিক। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক জগতে বিবাহিত স্ত্রী সন্তানকে খাওয়ানো, পরানো, ভালো ভাবে রাখা এটা তার দায়িত্ব। কিন্তু তুমি নিজেকে ওয়ার্কিং ওম্যান বলে ভাববে, আবার নিজের গাড়ির ড্রাইভারের খরচ সামলাতে পারবে না, তার বেলায় বরের উপর নির্ভর করবে তাতো হয় না।

ইরাবতী চুপ করে রইল। নিজের মনেই বিড়বিড় করল, এত ছোটো প্রতিষ্ঠান চালিয়ে গাড়ি চড়া যায় না বাবা। স্টাফেদের মাইনে, অফিসের খরচ, বাচ্চাদের বই খাতা, ডাক্তার, ওষুধ এসব তুলতেই তো হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি। তাতেও যে তেলের দাম নিজে দিতে পারছি সেটা কী অনেক নয়! এর থেকে বেশি করতে হলে অসৎ হতে হয়।মিথ্যে কাজ দেখিয়ে গ্রান্ট আদায় করতে হয়। ইরাবতী এসব মনের মধ্যে রেখেই বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।  

বেদভ্যাস সিগারেটের শেষ অংশটুকুতে ভালো করে টান দিয়ে আশট্রেতে ফেলল। ধূমায়িত ধোঁয়ার দিকে একবার তাকিয়ে মেয়ের দিকে তাকালো। তারপর বলল- কত বছর আগে মা সারদা বলে গেছেন অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া সব স্বাধীনতাই মানেহীণ। তোমাকে তো পড়াশোনা কম শেখায় নি। তাবড় তাবড় পন্ডিতের থেকে তোমার যোগ্যতা কিছু কম নেই। কাজও করছ। তাহলেও কেন এখনো সেই উচ্চতায় পৌঁছতে পারোনি? তার মানে তোমার মেধা,পরিশ্রম, বুদ্ধির সঠিক মেলবন্ধন ঘটছে না। কোথাও ফাঁকি থেকে যাচ্ছে।

ইরাবতীর খুব বলতে ইচ্ছে করল, বাবা যুগটা বদলে গেছে। এখন শুধু মেধা বা পরিশ্রম দিয়ে সব কিছু হয় না। আরো অন্য কিছুও লাগে।

না বলে সে শান্ত ভাবে বলল, এত কম লোকবল নিয়ে কী এসব কাজ হয় বাবা! মার্কেটিং, বিজ্ঞাপনের জন্য আরেকজন পেলে ভালো হত। আমি একা কত জায়গা দৌড়ব?

একটা টিম তৈরি করো, যারা তোমার জন্য কাজ করবে।

 আজকাল বিনা ইন্টারেস্টে কেউ কাজ করে না। প্রত্যেকেই আগে নিজে তার থেকে কি সুবিধা পাবে সেটার হিশেব করে।

আবার যুক্তি সাজাচ্ছ! আমি তো বহু মানুষকে পাশে পেয়েছিলাম। সমস্ত সরকারি সাহায্য পেতাম। এছাড়া কর্পোরেট হাউজগুলোয় ছিল। কত সেমিনার, ওয়ার্কশপ করেছি। গ্রান্টও এসেছে নিয়মিত। তুমি গ্রান্টের জন্য আবেদন করিসনি ?

রেগে গেলে বেদভ্যাস মেয়েকেও তখন আর তুই না বলে তুমি বলে, ইরাবতী সেদিকে নজর রেখে ধীর স্বরে বলল, করেছিলাম । কিন্তু এখন পাওয়া শক্ত।

বেদভ্যাস সিগারেট ধরালেন। কিছু একটা ভাবলেন। এখন দেখছি তোকে নিয়েই আমাকে চিন্তা করতে হবে। বেশ কিছু টাকা রেখে না গেলে তোমার চলবে কী করে!

ইরাবতী হাসল। এত চিন্তা কোরো না। আমি ঠিক চালিয়ে নেব।

চালিয়ে নেব আর ঠিকভাবে থাকাটা তো এক নয়। একটা মুটের বৌও তার স্বামীর আয় অনুযায়ী চালিয়ে নেয়। কিন্তু তুমি তো সেটা পারবে না। আর ঐহিকের টাকার উপর নির্ভর করে চলার জন্য তুমি জন্মাও নি। এখন যাও। দেখি কী ব্যবস্থা হয়।

মুখ শুকনো করে ইরাবতী বলল- আমার অর্থ লাগবে না। তোমার আশির্বাদ মাথার উপর থাকলে আমি নিজেই পারব সব কিছু সামলে নিতে। তুমি শুধু ভরসা রাখো।

করতে পারলে ভাল লাগত। যাও রাত কোরো না। রিকশা ভাড়া আছে? উত্তরের অপেক্ষা না করেই চেয়ার ছেড়ে উঠে টেলিফোন রাখার তাকের নিচ থেকে টাকা বের করে ইরাবতীর হাতে দিল। মেয়েকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়ে মাথায় হাত রেখে বলল, তোকে নিয়েই আমার যত চিন্তা। বাবা ছাড়া কিছুই জানলি না। এই ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর স্বার্থপর পৃথিবীতে তোকে ছেড়ে গিয়েও আমি শান্তি পাব না। তারপর কপালে একটা চুমু দিয়ে বলল, যা প্রান্তিকে ডেকে দে একবার। একটু কথা বলি।

ইরাবতী কোনো কথা না বলে চুপ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বাবার কপালে চুমু দিয়ে বেরিয়ে এসে প্রান্তিকে ডাকল।

মায়ের সঙ্গে কিছু মামুলী কথা শেষ করে যখন তারা রাস্তায় বেরল, তখন ঘড়ির কাঁটায় রাত এগারোটা।

 বাড়ি ফিরে বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে রইল ইরাবতী। চাঁদের একটা ক্ষীণ রেখা জানলা ভেদ করে ঘরে এসে পড়ছিল। ইরাবতী মুখ ঘুরিয়ে আলোটার দিকে তাকালো। তার বুকটা কেমন উদাসী হয়ে গেল।

সে উঠে বসে মোবাইলে লিখল, জানো আমার ভীষণ ইচ্ছে করছে তোমার সঙ্গে গল্প করতে, ইচ্ছে করছে চুপ করে তোমার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে থাকতে। কিংবা শুধুই বসে থাকতে।হাতটা ধরা থাক বা না থাক, পাশাপাশি থাকা, কখনো তোমার কথা শুনব,কখনো নিজের কথা বলব। হয়তো ইচ্ছে হলে জড়িয়ে ধরে তোমার গায়ের গন্ধ নেব, কিংবা আঙুলে আঙুল… কোনো একদিন লং ড্রাইভে যাব। সবুজের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া কিংবা রাস্তা ভুল করে এক অপরিচিত জায়গায়। উৎকন্ঠা কিংবা নিরাপদ আশ্রয় কোনটাই আমাদের তোলপাড় করল না। এমনটিই তো চেয়েছিলাম আমরা। স্পর্শ গন্ধ দৃষ্টি সব দিয়ে তোমাকে ছোঁয়া। তোমার আমাকে দেখা। অথচ দেখো এগুলো সবই ইচ্ছে। ভালোবাসাটাও একটা ইচ্ছে অথবা স্বপ্ন। কোনো আঁকড়ে ধরার তাগিদ বা বাধ্যতা নেই।

লেখার পর মনে হল এই মানুষটা কে , কার সঙ্গে তার গল্প করতে ইচ্ছে করছে? কেউ নেই এ জীবনে যাকে সে এভাবে চাইতে পারে, ভেবে লেখাটা ডিলিট করে দিয়ে মোবাইল অফ করে দিল।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত