| 3 মার্চ 2024
Categories
ধারাবাহিক সাহিত্য

ইরাবতীর কথা (পর্ব-১)

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

নারীর নিজের মুক্তির জন্য, নিজের স্বাধীনতার জন্য নিজের উপর নিজেকে আস্থা রাখতে হবে, লড়াইটা নিজেকেই করতে হবে। নারীবাদ বলি কী নারী স্বাধীনতা বা নারী মুক্তি- অর্জন না করলে পাওয়া যাবে না। নরওয়ে নারী-পুরুষের সমতার জন্য একটি পারফেক্ট দেশ বলা চলে। তারপরও এই দেশেও তেমন নারীর সাক্ষাৎ মেলে যে নিজে ডাক্তার হয়েও ডাক্তার স্বামীর ভয়ে তটস্ত থাকে।স্বামী শুধু স্যান্ডউইচ দিয়ে লাঞ্চ করতে চায় না বলে স্ত্রীকে সাথে স্যুপও বানাতে হয়। আর এই স্যুপ বানানোটা ভালোবেসে বানানো না রীতিমতো আতঙ্কিত হয়ে বানানো। এর জন্য নিজের অফিসিয়াল কাজ শেষ কোথাও বসে দু’দণ্ড জিরায় না, পাছে বাসার কাজে দেরী হয়ে যায়। অথচ নরওয়ের সমাজে স্বামী-স্ত্রী সপ্তাহের দিনগুলো ভাগাভাগি করে রান্নাসহ ঘরের যাবতীয় কাজ করার নিয়ম। দেখা যাচ্ছে, আইন থাকলেও সব নারী তা যথাযথ নিতে পারছে না। এমন শিক্ষিত নারীকে কে নারী-স্বাধীনতা এনে দেবে বা তার কাছে নারী স্বাধীনতা বা নারীমুক্তির সংজ্ঞা কী কে জানে! ’ইরাবতীর কথা’ ধারাবাহিকে ইরাবতীকে নারীর অনেক না বলতে পারা কথায় ও রূপে সাজিয়েছেন বিতস্তা ঘোষাল আজ থাকছে ইরাবতীর কথা ধারাবাহিকটির প্রথম পর্ব।


সকাল থেকে আকাশটা মুখ ভার করে।কালো মেঘ ঘিরে রেখেছে চারদিক।এখনি বুঝি তার গা ফুটো হয়ে গ্যালন গ্যালন অভিমান ঢেলে দেবে মাটিতে। তাকে নাকি বৃষ্টি বলে! এই বৃষ্টি শব্দটা কবে থেকে এলো কে তা জানে! অথচ কোন অতীত থেকে এই বৃষ্টির আগমন। সেই কবেই কালিদাস বলে গেছেন- সেই গিরিবনে ফেরে আনমনে। প্রিয়া নেই সাথে হায়, অভাগা যক্ষ বিরহ ব্যাকুল উদাস নয়নে চায়। খসেছে স্বর্ণ বলয় শীর্ণ প্রকোষ্ঠ হতে ধীরে, নব  আষাঢ়ের প্রথম দিবসে শৈল সানুটি ঘিরে ঘোরে প্রমত্ত মাতঙ্গসম অতিকায় কালো মেঘ…’।     

আকাশের দিকে তাকিয়ে ইরাবতীর মনে হল এই বৃষ্টি আসলে তারই ভারাক্রান্ত হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি। তার মন ভাল নেই। বেকার সে টেনে নিয়ে যাচ্ছে পরে পাওয়া ষোলো আনার এই জীবন। এই জীবনটা বড় ক্লান্তিময়। তার রাগ হয় নিজের উপর। কেন যে সংসার নামক অদ্ভুত এক বিষয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পরলাম! 

ভাবতে ভাবতে তার ইচ্ছে হয় পালাতে। ঠিক যেমন ভাবে সে ছোটোবেলায় কারোর উপর রাগ হলে পালাতো। ট্রেনে চেপে। কু ঝিক ঝিক কু ঝিক ঝিক শব্দ করে ট্রেন যত এগোতো সে তত নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিত বাড়ির চার দেওয়াল, বন্ধু বান্ধব আত্মীয় স্বজন, স্কুল, মা , বোন সবার থেকে।

ক্রমশ সে ডুবে যেত নিজের এক কল্পলোকের জগতে। এক রাজকন্যা- দৈত্য- রাজপুত্র। কিন্তু সে নিজে রাজকন্যা হতে চায় না কোনোদিন। বড্ড কষ্ট রাজকন্যাদের। চতুর্দিকে কেবল দাস দাসী, পাহারা, শাসন। স্বাধীনভাবে ঘোরার অনুমতি নেই। না , সে কখনো রাজকন্যা হবে না।

একবার, তখন সবে সে স্কুলে ভরতি হয়েছে। যেমন খুশি সাজা প্রতিযোগীতায় নাম দিয়েছিল স্কুল। শিশুতীর্থ স্কুলের রত্নাদি সবাইকে নানা সাজে সাজতে বলেছিলেন। মা তাকেও সেই অনুযায়ী সাজাতে লাগলেন।

ইরাবতী খুব কেঁদেছিল সেই সাজ দেখে। সে এসব কিছু হতে চায় না। সে হতে চায় বাসনওয়ালী। কী সুন্দর সুর করে তারা ডাকতে ডাকতে যায় বাড়ির পথ ধরে।

বাসন লেবে বাসন. . বাড়ি থেকে মা কাকিমারা বেরিয়ে এসে কাপড় দিয়ে বাসন কেনার পর সেই বাসনওয়ালী কেমন একা একা চলে যায় সুর করে ডাকতে ডাকতে। 

আহা অমনি করে সেও যদি বেরিয়ে পড়তে পারত, তবে আর কখনো ফিরে আসত না ।

 কিন্তু পালাতে পারছে কই! আজকাল যতবার পালাতে চায়, একটা ছোট্ট মেয়ে লাল ফ্রক পরে চুল এলো করে তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে মা বলে ডাকে। যেই সে তাকে সামনে আনতে যায়, অমনি  মেয়েটা দৌড়ে পালায়, কখনো নদীর বুকে মিলিয়ে যায়, কখনো গাছে চড়ে দোল খেতে খেতে কোথায় হারিয়ে যায়।

গাছে উঠে তাকে ধরতে গিয়ে ইরাবতীর মনে পরে যায়, এমনি ভাবেই সে গাছের ডাল ধরে ঝুলতে ঝুলতে এ গাছ ও গাছ  করে মায়ের নাগালের বাইরে চলে যেত।

তারপর যখন পাড়া নিঝুম হয়ে, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসত, শাঁখ বেজে উঠে জানান দিত, যে যার ঘরে ফেরো, তখন সে চুপি চুপি দেওয়াল ডিঙিয়ে ঘরে ঢুকে পড়তে বসে যেত।

ইরাবতীর আবার রাগ হচ্ছে নিজের ওপর। পালালি  যখন কেন ফিরে এলি আবার!  নিজের পায়ে নিজেই কুড়ুল মারলি। ডুবে মর এই সংসারের গোলক ধাধায়।

মায়াময় বড় মায়াবী এ সংসার। এই স্বামী সন্তান। 

দূর! কী করে যে ঐহিকের প্রেমে পরেছিল সে! অবশ্য তার কী দোষ ছিল! সেই তেরো বছর বয়স থেকে বিয়ের সম্বন্ধ আসা শুরু হয়ে গেল।

 তখন বিয়ে- প্রেমের মানে বুঝত না সে। শুধু ওই ঝামেলাগুলো থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য ঐহিকদাকে বলেছিল, তাকে ভালবাসি। কিন্তু ভাবেনি সে এটা সত্যি বলে ভেবে নেবে। 

দিব্বি ছিলাম পড়াশোনা নিয়ে, কে যে তাকে বলল, পুরুলিয়া  ছেড়ে কলকাতা আসতে! আর কেনই বা চিঠি দিল, মন খারাপ করছে বলে! আমার তো মন খারাপ করত না। আমি খালি আমার চারপাশের এত ভিড় থেকে সরে আসার জন্য ঐহিক নামে একটা ঢাল বা লক্ষণ রেখা টেনে দিয়েছিলাম।

কিন্তু বাবা! তুমি কেন মেনে নিলে! তুমি তো জানতে আমার পিছুটান কেবল তোমাতেই। তুমি দুম করে উনিশেতেই বিয়ে দিয়ে দিলে! কি না আমি তোমার বাল্য বন্ধুর ছেলেকে ভালবাসি- একথা বলেছি! একবারও আমার থেকে জানতে চাইলে না আমি সত্যি কী চাই! 

কোনো মিল ছিল না ২২ বছরের ঐহিকের সঙ্গে! এত যত্ন করে , প্রাচুর্য দিয়ে বড় করা নিজের সন্তানকে দিলে তুলে এক প্রায় বেকার ছেলের হাতে! হ্যাঁ,  আজ সে সমাজে প্রতিষ্ঠিত, ক্ষমতাবান পুরুষ। কিন্তু তার সঙ্গে   কোনো মানসিক বন্ধন তৈরি হল না। সম্পূর্ণ ভিন্ন রুচি, ভিন্ন সংস্কৃতি মনস্ক এক পুরুষ। কী হল বাবা! দুটো জীবনই বয়ে গেল। না পারলাম পালাতে, না পারলাম মরতে। বিড়বিড় করছিল ইরাবতী।

তবু কী জটিল মন। ছোট্ট মেয়ে যখন মা বলে ডাকে তখন সব ভুলে যাই। ভুলে যাই অসময়ের নদী দিক ভুলে গেছি। ঠিকানা খুঁজছি সেই থেকে. . ।

ইরাবতী নিজের অফিসের ঘরে বসে এইসব কথাই ভাবছিল। এভাবেই কেটে গেল কয়েক ঘন্টা।

এ্যাসিস্টেন্ট অমল তার ঘরে এল।

ম্যাডাম, মিনিস্টার সাহেব কথা বলতে চাইছেন

ভ্রু কপালে তুলে জানতে চাইল ইরাবতী, কে? 

উন্নয়ন. . 

আবার আমাকে কেন? 

উনি কথা বলতে চাইছেন। প্রায় ফিসফিস করে কথাগুলো বলে অমল এতক্ষণ লাইনে থাকা ওপাশের মানুষটিকে বলল, হ্যাঁ স্যার, ম্যাডামের সঙ্গে কথা বলুন।

ভীষণ বিরক্তি নিয়ে ফোন ধরল ইরাবতী। যথাসম্ভব শান্ত গলায় বলল, হ্যাঁ, দাদা বলো, কেমন আছ? 

আরে ইরাবতী, তুমি তো আমাকে ভুলেই গেছ। বছরে একবারের বেশি তোমার দেখা পাই না।

বারবার তোমাকে কী বিরক্ত করা উচিত দাদা! তুমি এত ব্যস্ত মানুষ।

হ্যাঁ, ব্যস্ত এটা যেমন ঠিক, তেমনি তুমি এলে আমার খুব ভালো লাগে। মনে হয় খুব কাছের কেউ এসেছে। মিনিস্টারের কথা শুনে একটু হেসে ইরাবতী বলল, বোন দাদার কাছে আপনই হয়। যাব একদিন সময় করে।

আচ্ছা শোনো,তুমি আমাকে রাত নটার পর একটা ফোন করতে পারবে? 

কবে? 

তোমাকে তো আমি রোজই করতে বলি। কিন্তু তুমি অমলকে দিয়েই ফোন করাও।

ইরাবতীর ইচ্ছা করছিল না কথা বলতে। অথচ ফোন কেটে দিলে উনি পরমুহূর্তেই ব্যাক করবেন। সেটা খারাপ দেখায়। যতই হোক সম্মানীয় মন্ত্রী। 

সে মৃদুস্বরে বলল, দাদা সারাদিন তুমি এত ব্যস্ত থাকো, তারপর বাড়ি ফিরেও যদি তোমাকে বাইরের লোকেরা বিরক্ত করে সেটা কী ভাল দেখায়।! 

বলেই মনে হল, ভুল শব্দ ব্যবহার করে ফেলেছে সে। বাইরের লোক বলাটা ঠিক হল না। এখনি প্রতিক্রিয়া জানাবেন তিনি।

সেকী ইরাবতী , তুমি আমার বাইরের লোক হলে কবে! তুমি জানো না তোমাকে আমি কতটা ভালবাসি, শ্রদ্ধা করি, তুমি আমার খুব কাছের। হৃদয়ের একদম কাছাকাছি । 

ইরাবতীর খুব হাসি পেল। হাসি চেপে বলল, দাদা , পরে কথা বলি! এখন অফিসে অনেক ভিজিটর। তাদের ছেড়ে দিয়ে কল ব্যাক করছি।

ক’টা নাগাদ হতে পারে! আমার দুটো থেকে সি এম অফিসে মিটিং আছে।

করলে তারমধ্যেই করে নেব কেমন। রাখি এখন। প্রণাম নিও। বলেই আর প্রত্ত্যুতরের আশা না করে ফোন অমলকে ফেরত দিয়ে দিল।

ম্যাডাম, আপনি কী বলুন তো! অন্য কোনো মানুষ মন্ত্রী নিজে ফোন করে কথা বলতে চাইলে হেঁদিয়ে মরে, আর আপনি? উনি সত্যিই আপনাকে পছন্দ করেন। একটু থেমে বলল, ভালোও বাসে। পুরো পাগলের মত করেন ক’দিন আপনার ফোন না পেলে।

সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে ইরাবতী বলল, পাগলদের থেকে দূরে থাকাই মঙ্গলের । আবার ফোন করলে বোলো, ম্যাডাম অফিসে ফোন ফেলে রেখে চলে গেছেন।

আপনি রাতে কেন ফোন করেন না? উনি নিরিবিলিতে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান। নিজেকে এত ইমপরট্যান্ট কেন ভাবেন আপনি? কী আছে আপনার! বুঝতে পারি না, সবাই কেন আপনাকে এত পছন্দ করেন! এত অহঙ্কারী আর উদ্ধত আপনি। একটানে কথাগুলো বলে গেল অমল।

তোমার কোনো কাজ না থাকলে এবার এসো অমল। আমি এখন. . . ।

অমল জানে, এরপর ম্যাডাম একটা কথাও বলবেন না। সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কার অফিসে যে চাকরী করছি! পুরো ছিটিয়াল। নিজের মনেই গজরাতে গজরাতে বিড়ি ধরালো অমল।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত