Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

ঝরা পালক । জীবনানন্দ দাশ

Reading Time: 32 minutesঝরা পালক (ইংরেজি: Jhora Palok) কবি জীবনানন্দ দাশের লেখা প্রথম কাব্যগ্রন্থ। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে (১৩৩৪ বঙ্গাব্দ) কলকাতা থেকে এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ঝরা পালক কাব্যগ্রন্থের ভূমিকায় জীবনানন্দ লিখেছেন: “ঝরা পালকের কতকগুলি কবিতা প্রবাসী, বঙ্গবাণী, কল্লোল, কালি-কলম, প্রগতি, বিজলি প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছিলো। বাকিগুলি নূতন।” কবিতাসূচীঃ এই কাব্যগ্রন্থে মোট ৩৫টি কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়। কবিতাগুলোর নাম হলোঃ আমি কবি,— সেই কবি নীলিমা নব-নবীনের লাগি কিশোরের প্রতি মরীচিকার পিছে জীবন-মরণ দুয়ারে আমার বেদিয়া নাবিক বনের চাতক— মনের চাতক সাগর-বলাকা চলছি উধাও একদিন খুঁজেছিনু যারে আলেয়া অস্তচাঁদে ছায়া-প্রিয়া ডাকিয়া কহিল মোরে রাজার দুলাল কবি সিন্ধু দেশবন্ধু বিবেকানন্দ হিন্দু-মুসলমান নিখিল আমার ভাই পতিতা ডাহুকী শ্মশান মিনার পিরামিড মরুবালু চাঁদনীতে দক্ষিণা যে কামনা নিয়ে স্মৃতি সেদিন এ ধরণীর ওগো দরদিয়া সারাটি রাত্রি তারাটির সাথে তারাটিরই কথা কয়
  ঝরা পালক (১৯২৭)     অস্তচাঁদে ভালোবাসিয়াছি আমি অস্তচাঁদ, -ক্লান্ত শেষপ্রহরের শশী! -অঘোর ঘুমের ঘোরে ঢলে যবে কালো নদী-ঢেউয়ের কলসী, নিঝ্ঝুম বিছানার পরে মেঘবৌ’র খোঁপাখসা জোছনাফুল চুপে চুপে ঝরে,- চেয়ে থাকি চোখ তুলে’-যেন মোর পলাতকা প্রিয়া মেঘের ঘোমটা তুলে’ প্রেত-চাঁদে সচকিতে ওঠে শিহরিয়া! সে যেন দেখেছে মোরে জন্মে জন্মে ফিরে’ ফিরে’ ফিরে’ মাঠে ঘাটে একা একা, -বুনোহাঁস-জোনাকির ভিড়ে! দুশ্চর দেউলে কোন্-কোন্ যক্ষ-প্রাসাদের তটে, দূর উর-ব্যাবিলোন-মিশরের মরুভূ-সঙ্কটে, কোথা পিরামিড তলে, ঈসিসের বেদিকার মূলে, কেউটের মতো নীলা যেইখানে ফণা তুলে উঠিয়াছে ফুলে, কোন্ মনভুলানিয়া পথচাওয়া দুলালীর মনে আমারে দেখেছে জোছনা-চোর চোখে-অলস নয়নে! আমারে দেখেছে সে যে আসরীয় সম্রাটের বেশে প্রাসাদ-অলিন্দে যবে মহিমায় দাঁড়ায়েছি এসে- হাতে তার হাত, পায়ে হাতিয়ার রাখি কুমারীর পানে আমি তুলিয়াছি আনন্দের আরক্তিম আঁখি! ভোরগেলাসের সুরা-তহুরা, ক’রেছি মোরা চুপে চুপে পান, চকোরজুড়ির মতো কুহরিয়া গাহিয়াছি চাঁদিনীর গান! পেয়ালায়-পায়েলায় সেই নিশি হয় নি উতলা, নীল নিচোলের কোলে নাচে নাই আকাশের তলা! নটীরা ঘুমায়েছিল পুরে পুরে, ঘুমের রাজবধূ- চুরি করে পিয়েছিনু ক্রীতদাসী বালিকার যৌবনের মধু! সম্রাজ্ঞীর নির্দয় আঁখির দর্প বিদ্রূপ ভুলিয়া কৃষ্ণাতিথি-চাঁদিনীর তলে আমি ষোড়শীর উরু পরশিয়া লভেছিনু উল্লাস-উতরোল!-আজ পড়ে মনে সাধ-বিষাদের খেদ কত জন্মজন্মান্তের, রাতের নির্জনে! আমি ছিনু ‘ক্রবেদুর’ কোন্ দূর ‘প্রভেন্স্’-প্রান্তরে! -দেউলিয়া পায়দল্-অগোচর মনচোর-মানিনীর তরে সারেঙের সুর মোর এমনি উদাস রাত্রে উঠিত ঝঙ্কারি! আঙুরতলায় ঘেরা ঘুমঘোর ঘরখানা ছাড়ি ঘুঘুর পাখনা মেলি মোর পানে আসিল পিয়ারা; মেঘের ময়ূরপাখে জেগেছিল এলোমেলো তারা! -‘অলিভ’ পাতার ফাঁকে চুন চোখে চেয়েছিল চাঁদ, মিলননিশার শেষে-বৃশ্চিক, গোক্ষুরাফণা, বিষের বিস্বাদ! স্পেইনের ‘সিয়েরা’য় ছিনু আমি দস্যু-অশ্বারোহী- নির্মম-কৃতান্ত-কাল-তবু কী যে কাতর, বিরহী! কোন্ রাজনন্দিনীর ঠোঁটে আমি এঁকেছিনু বর্বর চুম্বন! অন্দরে পশিয়াছিনু অবেলার ঝড়ের মতন! তখন রতনশেজে গিয়েছিল নিভে মধুরাতি, নীল জানালার পাশে-ভাঙা হাটে-চাঁদের বেসাতি। চুপে চুপে মুখে কার পড়েছিনু ঝুঁকে! ব্যাধের মতন আমি টেনেছিনু বুকে কোন্ ভীরু কপোতীর উড়ু-উড়ু ডানা! -কালো মেঘে কেঁদেছিল অস্তচাঁদ-আলোর মোহানা! বাংলার মাঠে ঘাটে ফিরেছিনু বেণু হাতে একা, গঙ্গার তীরে কবে কার সাথে হয়েছিল দেখা! ‘ফুলটি ফুটিলে চাঁদিনী উঠিলে’ এমনই রূপালি রাতে কদমতলায় দাঁড়াতাম গিয়ে বাঁশের বাঁশিটি হাতে! অপরাজিতার ঝাড়ে- নদীপারে কিশোরী লুকায়ে বুঝি!- মদনমোহন নয়ন আমার পেয়েছিল তারে খুঁজি! তারই লাগি বেঁধেছিনু বাঁকা চুলে ময়ূরপাখার চূড়া, তাহারই লাগিয়া শুঁড়ি সেজেছিনু-ঢেলে দিয়েছিনু সুরা! তাহারই নধর অধর নিঙাড়ি উথলিল বুকে মধু, জোনাকির সাথে ভেসে শেষরাতে দাঁড়াতাম দোরে বঁধু! মনে পড়ে কি তা!-চাঁদ জানে যাহা, জানে যা কৃষ্ণাতিথির শশী, বুকের আগুনে খুন চড়ে-মুখ চুন হয়ে যায় একেলা বসি!       আমি কবি– সেই কবি– আমি কবি– সেই কবি– আকাশে কাতর আঁখি তুলি হেরি ঝরা পালকের ছবি! আন্‌মনা আমি চেয়ে থাকি দূর হিঙুল-মেঘের পানে! মৌন নীলের ইশারায় কোন্ কামনা জাগিছে প্রাণে! বুকের বাদল উথলি উঠিছে কোন্ কাজরীর গানে! দাদুরী-কাঁদানো শাঙন-দরিয়া হৃদয়ে উঠিছে দ্রবি! স্বপন-সুরার ঘোরে আখের ভুলিয়া আপনারে আমি রেখেছি দিওয়ানা ক’রে! জন্ম ভরিয়া সে কোন্ হেঁয়ালি হল না আমার সাধা– পায় পায় নাচে জিঞ্জির হায়, পথে পথে ধায় ধাঁধা! -নিমেষে পাসরি এই বসুধার নিয়তি-মানার বাধা সারাটি জীবন খেয়ালের খোশে পেয়ালা রেখেছি ভ’রে! ভুঁয়ের চাঁপাটি চুমি শিশুর মতন, শিরীষের বুকে নীরবে পড়ি গো নুমি! ঝাউয়ের কাননে মিঠা মাঠে মাঠে মটর-ক্ষেতের শেষে তোতার মতন চকিতে কখন আমি আসিয়াছি ভেসে! -ভাটিয়াল সুর সাঁঝের আঁধারে দরিয়ার পারে মেশে,– বালুর ফরাশে ঢালু নদীটির জলে ধোঁয়া ওঠে ধূমি! বিজন তারার সাঁঝে আমার প্রিয়ের গজল-গানের রেওয়াজ বুঝি বা বাজে! প’ড়ে আছে হেথা ছিন্ন নীবার, পাখির নষ্ট নীড়! হেথায় বেদনা মা-হারা শিশুর, শুধু বিধবার ভিড়! কোন্ যেন এক সুদূর আকাশ গোধূলিলোকের তীর কাজের বেলায় ডাকিছে আমারে, ডাকে অকাজের মাঝে!     আলেয়া প্রান্তরের পারে তব তিমিরের খেয়া নীরবে যেতেছে দুলে নিদালি আলেয়া! -হেথা, গৃহবাতায়নে নিভে গেছে প্রদীপের শিখা, ঘোমটায় আঁখি ঘেরি রাত্রি-কুমারিকা চুপে চুপে চলিতেছে বনপথ ধরি! আকাশের বুকে বুকে কাহাদের মেঘের গাগরী ডুবে যায় ধীরে ধীরে আঁধার সাগরে! ঢুলু-ঢুলু তারকার নয়নের পরে নিশি নেমে আসে গাঢ়-স্বপনঙ্কুল! শেহালায় ঢাকা শ্যাম বালুকার কূল বনমালীর সাথে ঘুমায়েছে কবে! বেণুবনশাখে কোন্‌ পেচকের রবে চমকিছে নিরালা যামিনী! পাতাল-নিলয় ছাড়ি কে নাগকামিনী আঁকাবাঁকা গিরিপথে চলিয়াছে চিত্রা অভিসারিকার প্রায়! শ্মশানশয্যায় নেভ-নেভ কোন্‌ চিতা-স্ফুলিঙ্গেরে ঘিরে ক্ষুধিত আঁধার আসি জমিতেছে ধীরে! নিদ্রার দেউলমূলে চোখ দুটি মুদে স্বপ্নের বুদ্‌বুদে বিলসিছে যবে ক্লান্ত ঘুমন্তের দল- হে অনল-উন্মুখ, চঞ্চল উন্নমিত আঁখিদুটি মেলি সন্তরি চলিছ তুমি রাত্রির কুহেলি কোন্‌ দূর কামনার পানে! ঝলমল দিবা অবসান বধির আঁধারে কান্তারের দ্বারে একি তব মৌন নিবেদন! -দিগভ্রান্ত-দরদী-উন্মন! পল্লীপসারিণী যবে পণ্যরত্ন হেঁকে গেছে চ’লে তোমার পিঙ্গল আঁখি ওঠে নি তো জ্বলে আকাঙ্কার উলঙ্গ উল্লাসে! জনতায়-নগরীর তোরণের পাশে, অন্তঃপুরিকার বুকে, মণিসৌধসোপানের তীরে, মরকত-ইন্দ্রনীল-অয়স্কান- খনির তিমিরে যাও নি তো কভু তুমি পাথেয় সন্ধানে! ভাঙা হাটে-ভিজা মাঠে-মরণের পানে শীত প্রেতপুরে একা একা মরিতেছ ঘুরে না জানি কী পিপাসার ক্ষোভে! আমাদের ব্যর্থতায়, আমাদের সকাতর কামনায় লোভে মাগিতে আস নি তুমি নিমেষের ঠাঁই! -অন্ধকার জলাভুমি কঙ্কালের ছাই, পল্লীকান্তারের ছায়া-তেপান্তর পথের বিস্ময় নিশীথের দীর্ঘশ্বাসময় করিয়াছে বিমনা তোমারে! রাত্রি-পারাবারে ফিরিতেছ বারম্বার একাকী বিচরি! হেমন্তের হিম পথ ধরি, পউষ, আকাশতলে দহি দহি দহি ছুটিতেছ বিহ্বল বিরহী কত শত যুগজন্ম বহি! কারে কবে বেসেছিলে ভালো হে ফকির, আলেয়ার আলো! কোন্‌ দূরে অস-মিত যৌবনের স্মৃতি বিমথিয়া চিত্তে তব জাগিতেছে কবেকার প্রিয়া! সে কোন্‌ রাত্রির হিমে হয়ে গেছে হারা! নিয়েছে ভুলায়ে তারে মায়াবী ও নিশিমরু, আঁধার সাহারা! আজও তব লোহিত কপোলে চুম্বন-শোণিমা তার উঠিতেছে জ্ব’লে অনল-ব্যথায়! চ’লে যায়-মিলনের লগ্ন চ’লে যায়! দিকে দিকে ধূমাবাহু যায় তব ছুটি অন্ধকারে লুটি লুটি লুটি! ছলাময় আকাশের নিচে লক্ষ প্রেতবধূদের পিছে ছুটিয়া চলিছে তব প্রেম-পিপাসার অগ্নি অভিসার! বহ্নি-ফেনা নিঙাড়িয়া পাত্র ভরি ভরি, অনন্ত অঙ্গার দিয়া হৃদয়ের পান্ডুলিপি গড়ি, উষার বাতাস ভুলি, পলাতকা রাত্রির পিছনে যুগ যুগ ছুটিতেছ কার অন্বেষণে।     একদিন খুঁজেছিনু যারে- একদিন খুঁজেছিনু যারে বকের পাখার ভিড়ে বাদলের গোধূলি-আঁধারে, মালতীলতার বনে, কদমের তলে, নিঝুম ঘুমের ঘাটে-কেয়াফুল, শেফালীর দলে! -যাহারে খুজিয়াছিনু মাঠে মাঠে শরতের ভোরে হেমন্তের হিম ঘাসে যাহারে খুজিয়াছিনু ঝরঝর কামিনীর ব্যথার শিয়রে যার লাগি ছুটে গেছি নির্দয় মসুদ চীনা তাতারের দলে, আর্ত কোলাহলে তুলিয়াছি দিকে দিকে বাধা বিঘ্ন ভয়- আজ মনে হয় পৃথিবীর সাঁজদীপে তার হাতে কোনোদিন জ্বলে নাই শিখা@ -শুধু শেষ নিশীথের ছায়া-কুহেলিকা শুধু মেরু-আকাশের নীহারিকা, তারা দিয়ে যায় যেন সেই পলাতকা চকিতার সাড়া! মাঠে ঘাটে কিশোরীর কাঁকনের রাগিণীতে তার সুর শোনে নাই কেউ গাগরীর কোলে তার উত্থলিয়া ওঠে নাই আমাদের গাঙিনীর ঢেউ! নামে নাই সাবধানী পাড়াগাঁর বাঁকা পথের চুপে চুপে ঘোমটার ঘুমটুকু চুমি! মনে হয় শুধু আমি, আর শুধু তুমি আর ঐ আকাশের পউষ-নীরবতা রাত্রির নির্জনযাত্রী তারকার কানে কানে কত কাল কহিয়াছি আধো আধো কথা! আজ বুঝি ভুলে গেছে প্রিয়া! পাতাঝরা আঁধারের মুসাফের-হিয়া একদিন ছিল তব গোধূলির সহচর, ভুলে গেছ তুমি! এ মাটির ছলনার সুরাপাত্র অনিবার চুমি আজ মোর বুকে বাজে শুধু খেদ, শুধু অবসাদ! মাহুয়ার, ধুতুরার স্বাদ জীবনের পেয়ালায় ফোঁটা ফোঁটা ধরি দুরন্ত শোণিতে মোর বারবার নিয়েছি যে ভরি! মসজেদ-সরাই-শরাব ফুরায় না তৃষা মোর, জুড়ায় না কলেজার তাপ! দিকে দিকে ভাদরের ভিজা মাঠ-আলেয়ার শিখা! পদে পদে নাচে ফণা, পথে পথে কালো যবণিকা! কাতর ক্রন্দন,- কামনার কবর-বন্ধন! কাফনের অভিযান, অঙ্গার সমাধি! মৃত্যুর সুমেরু সিন্ধু অন্ধকারে বারবার উঠিতেছে কাঁদি! মর্‌মর্‌ কেঁদে ওঠে ঝরাপাতাভরা ভোররাতের পবন- আধো আঁধারের দেশে বারবার আসে ভেসে কার সুর!- কোন্‌ সুদুরের তরে হৃদয়ের প্রেতপুরে ডাকিনীর মতো মোর কেঁদে মরে মন!   ওগো দরদিয়া -ওগো দরদিয়া তোমারে ভুলিবে সবে, যাবে সবে তোমারে ত্যজিয়া; ধরণীর পসরায় তোমারে পাবে না কেহ দিনান্তেও খুঁজে কে জানে রহিবে কোথা নিশিভারে নেশাখোর আঁখি তব বুজে! -হয়তো সিন্ধুর পারে শ্বেতশঙ্খ ঝিনুকের পাশে তোমার কঙ্কালখানা শুয়ে রবে নিদ্রাহারা উর্মির নিশ্বাসে! চেয়ে রবে নিষ্পলক অতি দূরে লহরীর পানে, গীতিহারা প্রাণ তবে হয়তো বা তৃপ্তি পাবে তরঙ্গের গানে! হয়তো বনচ্ছায়া লতাগুল্ম পল্লবের তলে ঘুমায়ে রহিবে তুমি নীল শষ্পে শিশিরের দলে; হয়তো বা প্রান্তরের পারে তুমি রবে শুয়ে প্রতিধ্বনিহারা- তোমারে হেরিবে শুধু হিমানীর শীর্ণাকাশ-নীহারিকা-তারা, তোমারে চিনিবে শুধু প্রেম জোছনা-বধির জোনাকি! তোমারে চিনিবে শুধু আঁধারের আলেয়ার আঁখি তোমারে চিনিবে শুধু আকাশের কালো মেঘ-মৌন-আলোহারা, তোমারে চিনিয়া নেবে তমিস্রার তরঙ্গের ধারা! কিংবা কেহ চিনিবে না, হয়তো বা জানিবে না কেহ কোথায় লুটায়ে আছে হেমন্তের দিবাশেষে ঘুমন্তের দেহ! -হয়েছিল পরিচয় ধরণীর পান’শালে যাহাদের সনে, তোমার বিষাদ-হর্ষ গেঁথেছিলে একদিন যাহাদের মনে, যাহাদের বাতায়নে একদিন গিয়েছিলে পথিক-অতিথি তোমারে ভুলিবে তারা- ভুলে যাবে সব কথা, সবটুকু স্মৃতি! নাম তব মুছে যাবে মুসাফের-অঙ্গারের পান্ডুলিপিখানি নোনা ধরা দেয়ালের বুক থেকে খসে যাবে কখন না জানি! তোমার পানের পাত্রে নিঃশেষে শুকায়ে যাবে শেষের তলানি, দন্ড দুই মাছিগুলো করে যাবে মিছে কানাকানি! তারপর উড়ে যাবে দূরে দূরে জীবনের সুরার তল্লাসে মৃত এক অলি শুধু পড়ে রবে মাতালের বিছানার পাশে! পেয়ালা উপুড় করে হয়তো বা রেখে যাবে কোনো একজন, কোথা গেছে ইয়োসোফ্‌ জানে না সে, জানে না সে গিয়েছে কখন। জানে না যে, অজানা সে, আরবার দাবি নিয়ে আসিবে না ফিরে- জানে না রে চাপা পড়ে গেছে সে যে কবেকার কোথাকার ভিড়ে! জানিতে চাহে না কিছু-ঘাড় নিচু করে কে বা রাখে আঁখি বুজে অতীত স্মৃতির ধ্যানে, অন্ধকার গৃহকোণে একখানা শূন্য পাত্র খুঁজে! যৌবনের কোন্‌ এক নিশীথে সে কবে তুমি যে আসিয়াছিলে বনরানি। জীবনের বাসন্তী-উৎসবে তুমি যে ঢালিয়াছিলে ফাগরাগ-আপনার হাতে মোর সুরাপাত্রখানি তুমি যে ভরিয়াছিলে-জুড়ায়েছে আজ তার ঝাঁঝ, গেছে ফুরায়ে তলানি। তবু তুমি আসিলে না, বারেকের তরে দেখা দিলে নাকো হায়! চুপে চুপে কবে আমি বসুধার বুক থেকে নিয়েছি বিদায়- তুমি তাহা জানিলে না-চলে গেছে মুসাফের কবে ফের দেখা হবে আহা কে বা জানে! কবরের পরে তার পাতা ঝরে, হাওয়া কাঁদে হা হা!   কবি ভ্রমরীর মতো চুপে সৃজনের ছায়াধূপে ঘুরে মরে মন আমি নিদালির আঁখি, নেশাখোর চোখের স্বপনে! নিরালায় সুর সাথি, বাঁধি মোর মানসীর বেণী, মানুষ দেখে নি মোরে কোনোদিন, আমারে চেনে নি! কোনো ভিড় কোনোদিন দাঁড়ায় নি মোর চারি পাশে- শুধায় নি কেহ কভু-আসে কি রে,- সে কি আসে-আসে। আসে নি সে ভরাহাটে-খয়াঘাটে-পৃথিবীর পসরায় মাঝে পাটনী দেখে নি তারে কোনোদিন-মাঝি তারে ডাকে নিকো সাঁঝে। পরাপার করে নি সে মণিরত্ন-বেসাতির সিন্ধুর সীমানা,- চেনা-চেনা মুখ সবই-সে যে সুদুর-অজানা! করবীকুঁড়ির পানে চোখ তার সারাদিন চেয়ে আছে চুপে, রূপসাগরের মাঝে কোন্‌ দূর গোধূলির সে যে আছে ডুবে! সে যেন ঘাসের বুকে, ঝিলমিল শিশিরের জলে; খুঁজে তারে পাওয়া যাবে এলোমেলো বেদিয়ার দলে, বাবলার ফুলে ফুলে ওড়ে তার প্রজাপতি-পাখা, ননীর আঙুলে তার কেঁপে ওঠে কচি নোনাশাখা! হেমন্তের হিম মাঠে, আকাশের আবছায়া ফুঁড়ে বকবধুটির মতো কুয়াশায় শাদা ডানা যায় তার উড়ে! হয়তো শুনেছ তারে-তার সুর, দুপুর আকাশে ঝরাপাতাভরা মরা দরিয়ার পাশে বেজেছে ঘুঘুর মুখে, জল-ডাহুকীর বুকে পউষনিশায় হলুদ পাতার ভিড়ে শিরশিরে পুবালি হাওয়ায়! হয়তো দেখেছ তারে ভুতুড়ে দীপের চোখে মাঝরাতে দেয়ালের পরে নিভে যাওয়া প্রদীপের ধূসর ধোঁয়ায় তার সুর যেন ঝরে! শুক্লা একাদশী রাতে বিধবার বিছানায় সেই জোছনা ভাসে তারই বুকে চুপে চুপে কবি আসে সুর তার আসে। উস্‌খুস্‌ এলো চুলে ভরে আছে কিশোরীর নগ্ন মুখখানি,- তারই পাশে সুর ভাসে অলখিতে উড়ে যায় কবির উড়ানি! বালুঘড়িটির বুকে ঝিরি ঝিরি ঝিরি ঝিরি গান যবে বাজে রাতবিরেতের মাঠে হাঁটে সে যে আলসে, অকাজে! ঘুমকুমারীর মুখে চুমো খায় যখন আকাশ যখন ঘুমায়ে থাকে টুনটুনি, মধুমাছি,ঘাস হাওয়ার কাতর শ্বাস থেমে যায় আমলকী সাড়ে, বাঁকা চাঁদ ডুবে যায় বাদলের মেঘের আঁধারে, তেঁতুলের শাখে শাখে বাদুড়ের কালো ডানা ভাসে, মনের হরিণী তার ঘুরে মরে হাহাকারে বনের বাতাসে! জোনাকির মতো সে যে দূরে দূরে যায় উড়ে উড়ে- আপনার মুখ দেখে ফেরে সে যে নদীর মুকুরে- জ্বলে ওঠে আলোয়ার মতো তার লাল আঁখিখানি। আঁধারে ভাসায় খেয়া সে কোন্‌ পাষাণী! জানে না তো কী যে চায়- কবে হায় কী গেছে হারায়ে। চোখ বুজে খোঁজে একা-হাতড়ায় আঙুল বাড়ায়ে কারে আহা।-কাঁদে হা হা পুরের বাতাস, শ্মশানশবের বুকে জাগে এক পিপাসার শ্বাস! তারই লাগি মুখ তোলে কোন মৃতা-হিম চিতা জ্বেলে দেয় শিখা, তার মাঝে যায় দহি বিরহীর ছায়াপুত্তলিকা!   কিশোরের প্রতি     যৌবনের সুরাপাত্র গরল-মদির ঢালো নি অধরে তব, ধরা মোহিনীর উর্দ্ধফণা মায়া-ভুজঙ্গিনী আসেনি তোমার কাম্য উরসের পথটুকু চিনি’, চুমিয়া-চুমিয়া তব হৃদয়ের মধু বিষবহ্নি ঢালেনিক’ বাসনার বধু অন্তরের পান পাত্রে তব; অম্লান আনন্দ তব, আপ্লুত উৎসব, অশ্রুহীন হাসি, কামনার পিছে ঘুরে’ সাজো নি উদাসী। ধবল কালোর দলে, আশ্বিনের গগনের তলে তোর তরে রে কিশোর, মৃগতৃষ্ণা কভু নাহি জ্বলে! নয়নে ফোটে না তব মিথ্যা মরুদ্যান। অপরূপ রূপ পরীস্থান দিগন্তের আগে তোমার নির্মেঘ-চক্ষে কভু নাহি জাগে! আকাশ-কুসুম-বীথি দিয়া মাল্য তুমি আনো না রচিয়া, উধাও হও না তুমি আলেয়ার পিছে ছলাময় গগনের নিচে! -রূপ পিপাসায় জ্বলি’ মৃত্যুর পাথারে স্পন্দহীন প্রেতপুরদ্বারে করোনিক’ করাঘাত তুমি সুধার সন্ধানে লক্ষ বিষপাত্র চুমি’ সাজনিক’ নীলকন্ঠ ব্যাকুল বাউল! অধরে নাহিক’ তৃষ্ণা, চক্ষে নাহি ভুল, রক্তে তব অলক্ত যে পরে নাই আজো রাণী, রুধির নিঙাড়ি তব আজো দেবী মাগে নাই রক্তিম চন্দন! কারাগার নাহি তব, নাহিক বন্ধন; দীঘল পতাকা, বর্শাত ন্দ্রাহারা প্রহরীর লওনি তুলিয়া, -সুকুমার কিশোরের হিয়া! -জীবন-সৈকতে তব দুলে যায় লীলায়িত লঘুনৃত্য নদী, বক্ষে তব নাচেনিক’ যৌবনের দুরন্ত জলধি; শূল-তোলা শম্ভুর মতন আস্ফালিয়া ওঠে নাই মন মিথ্যা বাধা বিধানের ধ্বংসের উল্লাসে! তোমার আকাশে দ্বাদশ সূর্যের বহ্নি ওঠেনিক’ জ্বলি’ কক্ষচ্যুত উল্কাসম পড়েনিক’ স্খলি’, কুজ্‌ঝটিকা আবর্ত্তের মাঝে অনির্বাণ স্ফুলিঙ্গের সাজে! সব বিঘ্ন সকল আগল ভাঙিয়া জাগোনি তুমি স্পন্দন-পাগল অনাগত স্বপ্নের সন্ধানে দুরন্ত দুরাশা তুমি জাগাওনি প্রাণে! নিঃস্ব দুটি অঞ্জলির আকিঞ্চন মাগি’ সাজোনিক দিক্‌ভোলা দিওয়ানা বৈরাগী! পথে পথে ভিক্ষা মেগে কাম্য কল্পতরু বাজাওনি শ্মশান-ডমরু! জ্যোৎস্নাময়ী নিশি তব, জীবনের অমানিশা ঘোর চক্ষে তব জাগেনি কিশোর! আঁধারের নির্ব্বিকল্প রূপ, স্পন্দহীন বেদনার কূপ রুদ্ধ তব বুকে; তোমার সম্মুখে ধরিত্রী জাগিছে ফুল্ল-সুন্দরীর বেশে; নিত্য বেলা শেষে যেই পুষ্প ঝরে, যে-বরহ জাগে চরাচরে গোধূলির অবসানে শ্লোক-ম্লান সাঁঝে, তাহার বেদনা তব বক্ষে নাহি বাজে; আকাঙ্ক্ষার অগ্নি দিয়া জ্বাল নাই চিতা, ব্যথার সংহিতা গাহো নাই তুমি! দরিয়ার তীর ছাড়ি দেখ নাই দাব-মরুভূমি জ্বলন্ত নিষ্ঠুর! নগরীর ক্ষুব্ধ বক্ষে জাগে যেই মৃত্যু প্রেতপুর, ডাকিনীর রুক্ষ অট্টহাসি ছন্দ তার মর্মে তব ওঠে না প্রকাশি’! সভ্যতার বীভৎস ভৈরবী মলিন করেনি তব মানসের ছবি, ফেনিল করেনি তব নভোনীল, প্রভাতের আলো, এ উদ্‌ভ্রান্ত যুবকের বক্ষে তার রশ্মি আজো ঢালো, বন্ধু, ঢালো!     চলছি উধাও চলছি উধাও, বল্গাহারা- ঝড়ের বেগে ছুটে শিকল কে সে বাঁধছে পায়ে! কোন্‌ সে ডাকাত ধরছে চেপে টুটি! -আঁধার আলোর সাগরশেষে প্রেতের মতো আসছে ভেসে! আমার দেহের ছায়ার মতো, জড়িয়ে আছে মনের সনে, যেদিন আমি জেগেছিলাম, সেও জেগেছে আমার মনে! আমার মনের অন্ধকারে ত্রিশূলমূলে, দেউলদ্বারে কাটিয়েছে সে দুরন্ত কাল ব্যর্থ পূজার পুষ্প ঢেলে! স্বপন তাহার সফল হবে আমায় পেলে, আমায় পেলে! রাত্রিদিবার জোয়ার স্রোতে নোঙরছেঁড়া হৃদয় হ’তে জেগেছে সে হালের নাবিক চোখের ধাধায় ঝড়ের ঝাঁঝে মনের মাঝে মানের মাঝে আমার চুমোর অন্বেষণে প্রিয়ার মতো আমার মনে অঙ্কহারা কাল ঘুরেছে কাতর দুটি নয়ন তুলে, চোখের পাতা ভিজিয়ে তাহার আমার অশ্রুপাথার-কূলে! ভিজে মাঠের অন্ধকারে কেঁদেছে মোর সাথে হাতটি রেখে হাতে! দেখিনি তার মুখখানি তো, পাইনি তারে টের, জানি নি হায় আমার বুকে আশেক-অসীমের জেগে আছে জনমভোরের সূতিকাগার থেকে! কত নতুন শরাবশালায় নাবনু একে একে! সরাইখানার দিলপিয়ালায় মাতি কাটিয়ে দিলাম কত খুশির রাতি! জীবন-বীণার তারে তারে আগুন-ছড়ি টানি গুঞ্জরিয়া এল-গেল কত গানের রানি, নাশপাতি-গাল গালে রাখি কানে কানে করলে কানাকানি শরাব-নেশায় রাঙিয়ে দিল আঁখি! -ফুলের ফাগে বেহুঁশ হোলি নাকি! হঠাৎ কখন স্বপন-ফানুস কোথায় গেল উড়ে! -জীবন মরু- মরীচিকার পিছে ঘুরে ঘুরে ঘায়েল হয়ে ফিরল আমার বুকের কেরাভেন- আকাশ-চরা শ্যেন! মরুঝড়ের হাহাকারে মৃগতৃষার লাগি প্রাণ যে তাহার রইল তবু জাগি ইবলিশেরই সঙ্গে তাহার লড়াই-হল শুরু! দরাজ বুকে দিল্‌ যে উড়–উড়-! ধূসর ধু ধু দিগন্তরে হারিয়ে যাওয়া নার্গিসেই শোভা থরে থরে উঠল ফুটে রঙিন-মনোলোভা! অলীক আশার, দূর-দুরশার দুয়ার ভাঙার তরে যৌবন মোর উঠল নেচে রক্তমুঠি, ঝড়ের ঝুঁটির পরে! পিছে ফেলে টিকে থাকার ফাটকে কারাগারে ভেঙে শিকল ধ্বসিয়ে ফাঁড়ির দ্বার চলল সে যে ছুটে! শৃঙ্খল কে বাধল তাহার পায়ে- চুলের ঝুটি ধরল কে তার মুঠে! বর্শা আমার উঠল ক্ষেপে খুনে, হুমকি আমার উঠল বুকে রুখে! দুশমন কে পথের সুমুখে -কোথায় কে বা! এ কোন মায়া মোহ এমন কার! বুকে আমার বাঘের মতো গর্জাল হুঙ্কার! মনের মাঝের পিছুডাকা উঠল বুঝি হেঁকে- সে কোন সুদূরে তারার আলোরে থেকে মাথার পরের খা খা মেঘের পাথারপুরী ছেড়ে নেমে এল রাত্রিদিবার যাত্রাপথে কে রে! কী তৃষা তার! কী নিবেদন! মাগছে কিসের ভিখ্‌! উদ্যত পথিক হঠাৎ কেন যাচ্ছে থেমে- আজকে হঠাৎ থামতে কেন হয়! -এই বিজয়ী কার কাছে আজ মাগছে পরাজয়! পথ- আলেয়ার খেয়ায় ধোঁয়ায় ধ্রুবতারার মতন কাহার আঁখি আজকে নিল ডাকি হালভাঙা এই ভুতের জাহাজটারে! মড়ার খুলি-পাহাড়প্রমাণ হাড়ে বুকে তাহার জ’মে গেছে কত শ্মশান-বোঝা! আক্রোশে হা ছুটছিল সে একরোখা, এক সোজা চুম্বকেরই ধ্বংসগিরির পানে, নোঙরহারা মাস্তুলেরই টানে! প্রেতের দলে ঘুরেছিল প্রেমের আসন পাতি, জানে কি সে বুকের মাঝে আছে তাহার সাথী! জানে কি সে ভোরের আকাশ, লক্ষ তারার আলো তাহার মনের দূয়ারপথেই নিরিখ হারালো! জানি নি সে তোহার ঠোঁটের একটি চুমোর তরে কোন্‌ দিওয়ানার সারেং কাঁদে নয়নে নীর ঝরে! কপোত-ব্যথা ফাটে রে কার অপার গগন ভেদি! তাহার বুকের সীমার মাঝেই কাঁদছে কয়েদি কোন্‌ সে অসীম আসি! লক্ষ সাকীর প্রিয় তাহার বুকের পাশাপাশি প্রেমের খবর পুছে কবের থেকে কাঁদতে আছে- ‘পেয়ালা দে রে মুঝে!’   চাঁদিনীতে বেবিলোন কোথা হারায়ে গিয়েছে-মিশর-অসুর কুয়াশাকালো; চাঁদ জেগে আছে আজও অপলক, মেঘের পালকে ঢালিছে আলো! সে যে জানে কত পাথারের কথা, কত ভাঙা হাট মাঠের স্মৃতি! কত যুগ কত যুগান্তরের সে ছিল জোছনা, শুক্লা তিথি! হয়তো সেদিনও আমাদেরই মতো পিলুবারোয়ার বাঁশিটি নিয়া ঘাসের ফরাশে বসিত এমনি দূর পরদেশী প্রিয় ও প্রিয়া! হয়তো তাহারা আমাদেরই মতো মধু-উৎসবে উঠিত মেতে চাঁদের আলোয় চাঁদমারী জুড়ে, সবুজ চরায়, সবজি ক্ষেত! হয়তো তাহারা মদঘূর্ণনে নাচিত কাঞ্চীবাধঁন খুলে এমনি কোন এক চাঁদের আলোয়-মরু ওয়েসিসে তরুর মূলে! বীর যুবাদল শত্রুর সনে বহুদিনব্যাপী রণের শেষে এমনি কোন-এক চাঁদিনীবেলায় দাঁড়াত নগরীতোরণে এসে! কুমারীর ভিড় আসিত ছুটিয়া, প্রণয়ীর গ্রীবা জড়ায়ে নিয়া হেঁটে যেত তারা জোড়ায় জোড়ায় ছায়াবীথিকার পথটি দিয়া! তাদের পায়ের আঙুলের ঘায়ে খড়- খড়- পাতা উঠিত বাজি, তাদের শিয়রে দুলিত জোছনা, চাঁচর-চিকন পত্ররাজি! দখিনা উঠিত মর্মরি মধুবনাণীর লতা-পল্লব ঘিরে চপল মেয়েরা উঠিত হাসিয়া-এল-বল্লভ-এল রে ফিরে!’ তুমি ঢুলে যেতে, দশমীর চাঁদ তাহাদের শিরে সারাটি নিশি, নয়নে তাদের দুলে যেতে তুমি-চাঁদিনী-শরাব, সুরার শিশি! সেদিনও এমনি মেঘের আসরে জ্বলছে পরীর বাসরবাতি, হয়তো সেদিনও ফুটেছে মোতিয়া-ঝরেছে চন্দ্রমল্লীপাতি! হয়তো সেদিনও নেখাখোর মাছি গুমরিয়া গেছে আঙুরবনে, হয়তো সেদিনও আপেলের ফুল কেপেঁছে আঢুল হাওয়ার সনে! হয়তো সেদিনও এলাচির বন আতরের শিশি দিয়েছে ঢেলে হয়তো সেদিনও ডেকেছে পাপিয়া কাঁপিয়া কাঁপিয়া সরোর শাখে, হয়তো সেদিনও পাড়ার নাগরী ফিরেছে এমনি গাগরি কাঁখে! হয়তো সেদিনও পানসী দুলায়ে গেছে মাঝি বাকাঁ ঢেউটি বেয়ে, হয়তো সেদিন মেঘের শকুনডানায় গেছিল আকাশ ছেয়ে! হয়তো সেদিনও মাণিকজোড়ের মরা পাখাটির ঠিকানা মেগে অসীম আকাশে ঘুরেছে পাখিনী ছট্‌ফট্‌ দুটি পাখার বেগে! হয়তো সেদিনও খুর খুর করে খরগোশছানা গিয়েছে ঘুরে ঘন মেহগিনি টার্পিন তলে- বালির জর্দা বিছানা ফুঁেড়! হয়তো সেদিনও জানালার নীল জাফরির পাশে একেলা বসি মনের হরিনী হেরেছে তোমারে-বনের পারের ডাগর শশী! শুক্লা একাদশীর নিশীথে মণিহর্ম্যের তোরণে গিয়া পারাবত-দূত পাঠায়ে দিয়েছে প্রিয়ের তরেতে হয়তো প্রিয়ো! অলিভকুঞ্জে হা হা করে হাওয়া কেঁেদছে কাতর যামিনী ভরি! ঘাসের শাটিনে আলোর ঝালরে মার্টিল পাতা পড়েছে ঝরি’! উইলোর বন উঠেছে ফুঁপায়ে-ইউ তরুশাখা গিয়েছে ভেঙে, তরুনীর দুধ-ধবধবে বুকে সাপিনীর দাঁত উঠেছে রেঙে! কোন্‌ গ্রীস কোন্‌ কার্থেজ, রোম ক্রবেদুর যুগ কোন,- চাঁদের আলোয় স্মৃতির কবর শফরে বেড়ায় মন! জানি না তো কিছু-মনে হয় শুধু এমনি তুহিন চাঁদের নিচে কত দিকে দিকে-কত কালে কালে হয়ে গেছে কত কী যে! কত যে শ্মশান-মশান কত যে-কত যে কামনা পিপাস-আশা অস্তচাঁদের আকাশে বেঁধেছে আরব-উপন্যাসের বাসা!   ছায়া-প্রিয়া দুপুর রাতে ও কার আওয়াজ গান কে গাহে, গান না! কপোতবধূ ঘুমিয়ে আছে নিঝুম ঝিঁঝির বুকের কাছে; অস্তচাঁদের আলোর তলে এ কার তবে কান্না! গান কে গাহে, গান না! সার্সি ঘরের উঠছে বেজে উঠছে কেঁপে পর্দা! বাতাস আজি ঘুমিয়ে আছে জল-ডাহুরের বুকের কাছে; এ কোন্‌ বাঁশি সার্সি বাজায় এ কোন হাওয়া ফর্দা দেয় কাঁপিয়ে পর্দা! নূপুর কাহার বাজল রে ঐ! কাঁকন কাহার কাঁদল পুরের বধু ঘুমিয়ে আছে দুধের শিশুর বুকের কাছে; ঘরে আমার ছায়া-প্রিয়া মায়ার মিলন ফাঁদল কাঁকন যে তার কাঁদল! খসখসাল শাড়ি কাহার! উস্‌খুসাল চুল গো! পুরের বধু ঘুমিয়ে আছে দুধের শিশুর বুকের কাছে: জুল্‌পি কাহার উঠল দুলে! দুলল কাহার দুল গো! উস্‌খুসাল চুল গো! কাঁদছে পাখি পউষনিশির তেপান্তরের বক্ষে! ওর বিধবা বুকের মাঝে যে গো কার কাঁদন বাজে! ঘুম নাহি আজ চাঁদের চোখে, নিদ্‌ নাহি মোর চক্ষে! তেপান্তরের বক্ষে! এল আমার ছায়া-প্রিয়া, কিশোরবেলার সই গো! পুরের বধূ ঘুমিয়ে আছে দুধের শিশুর বুকের কাছে; মনের মধূ-মনোরমা- কই গো সে মোর কই গো! কিশোরবেলার সই গো! ও কার আওয়াজ হাওয়ায় বাজে! গান কে গাহে, গান না! কপোতবধূ ঘুমিয়ে আছে বনের ছায়ায়-মাঠের কাছে; অস্তচাঁদের আলোর তলে এ কার তবে কান্না! গান কে গাহে, গান না!     জীবন-মরণ দুয়ারে আমার সরাইখানার গোলমাল আসে কানে, ঘরের সার্সি বাজে তাহাদের গানে, পর্দা যে উড়ে যায় তাদের হাসির ঝড়ের আঘাতে হায়! -মদের পাত্র গিয়েছে কবে যে ভেঙে! আজও মন ওঠে রেঙে দিলদারদের দরাজ গলায় রবে, সরায়ের উৎসবে! কোন্‌ কিশোরীর চুড়ির মতন হায় পেয়ালা তাদের থেকে থেকে বেজে যায় বেহুঁশ হাওয়ার বুকে! সারা জনমের শুষে-নেওয়া খুন নেচে ওঠে মোর মুখে! পান্ডুর দুটি ঠোঁটে ডালিম ফুলের রক্তিম আভা চকিতে আবার ফোটে! মনের ফলকে জ্বলিছে তাদের হাসি ভরা লাল গাল, ভুলে গেছে তারা এই জীবনের যত কিছু জঞ্জাল! আখেরের ভয় ভুলে দিলওয়ার প্রাণ খুলে জীবন-রবাবে টানিছে ক্ষিপ্ত ছড়ি! অদূরে আকাশে মধুমালতীর পাপড়ি পড়িছে ঝরি- নিভিছে দিনের আলো জীবন মরণ দুয়ারে আমার করে যে বাসিব ভালো একা একা তাই ভাবিয়া মরিছে মন! পূর্ণ হয় নি পিপাসী প্রাণের একটি আকিঞ্চন, নি একটি দল,- যৌবন শতদলে মোর হায় ফোটে নাই পরিমল! উৎসব-লোভী অলি আসে নি হেথায় কীটের আঘাতে শুকায়ে গিয়েছে কবে কামনার কলি! সারাটি জীবন বাতায়নখানি খুলে তাকায়ে দেখেছি নগরী-মরুতে ক্যারাভেন্‌ যায় দুলে আশা-নিরাশার বালু-পারাবার বেয়ে, সুদূর মরুদ্যানের পানেতে চেয়ে! সুখদুঃখের দোদুল ঢেউঢের তালে নেচেছে তাহারা- মায়াবীর জাদুজালে মাতিয়া গিয়েছে খেয়ালী মেজাজ খুলি, মৃগতৃষ্ণার মদের নেশায় ভুলি! মৃগতৃষ্ণার মদের নেশায় ভুলি! মস্তানা সেজে ভেঙে গেছ ঘরদোর, লোহার শিকের আড়ালে জীবন লুটায়ে কেঁদেছে মোর! কারার ধুলায় লুন্ঠিত হ’য়ে বান্দার মতো হায় কেঁদেছে বুকের বেদুঈন মোর দুরাশার পিপাসায়! জীবনপথের তাতার দুস্যুগুলি হুল্লোড় তুলি উড়ায়ে গিয়েছে ধূলি মোর গবাক্ষে কবে! কন্ঠ-বাজের আওয়াজ তাদের বেজেছে স্তব্ধ নভে! আতুর নিদ্রা চকিতে গিয়েছে ভেঙে, সারাটি নিশীথ খুন রোশনাই প্রদীপে মনটি রেঙে একাকী রয়েছি বসি, নিরালা গগনে কখন নিভেছে শশী পাই নি যে তাহা টের! -দূর দিগনে- চ’লে গেছে কোথা খুশরোজী মুসাফের! কোন্‌ সুদুরের তুরাণী-প্রিয়ার তরে, বুকের ডাকাত আজিও আমার জিঞ্জিরে কেঁদে মরে! দীর্ঘ দিবস ব’য়ে গেছে যারা হাসি-অশ্রুর বোঝা চাঁদের আলোকে ভেঙেছে তাদের “রোজা” আমার গগনে ঈদরাত কভু দেয় নি হায় দেখা, পরানে কখনও জাগে নি রোজা’র ঠেকা! কী যে মিঠা এই সুখের দুখের ফেনিল জীবনখানা! এই যে নিষেধ, এই যে বিধান-আইনকানুন, এই যে শাসন মানা, ঘরদোর ভাঙা তুমুল প্রলয়ধ্বনি নিত্য গগনে এই যে উঠিছে রণি যুবানবীনের নটনর্তন তালে, ভাঙনের গান এই যে বাজিছে দেশে দেশে কালে কালে, এই যে তৃষ্ণা-দৈন্য-দুরাশা-জয়-সংগ্রাম-ভুল সফেন সুরার ঝাঝের মতন ক’রে দেয় মজ্‌গুল দিওয়ানা প্রাণের নেশা! ভগবান, ভগবান, তুমি যুগ যুগ থেকে ধ’রেছ শুড়ির পেশা! -লাখো জীবনের শূণ্য পেয়ালা ভরি দিয়া বারবার জীবন-পান্থশালার দেয়ালে তুলিতেছে ঝঙ্কার- মাতালের চিৎকার অনাদি কালের থেকে; মরণশিয়ারে মাথা পেতে তার দস্তুর যাই দেখে! হেরিলাম দূরে বালুকার পরে রূপার তাবিজ প্রায় জীবনের নদী কলরোলে ব’য়ে যায়! কোটি শুঁড় দিয়ে দুখের মরুভ নিতেছে তাহারে শুষে, ছলা-মরীচিকা জ্বলিতেছে তার প্রাণের খেয়াল-খুশে! মরণ-সাহারা আসি নিতে চায় তারে গ্রাসি!- তবু সে হয় না হারা ব্যথার রুধিরধারা জীবনমদের পাত্র জুড়িয়া তার যুগ যুগ ধরি অপরূপ সুরা গড়িছে মশালাদার!     ডাকিয়া কহিল মোরে রাজার দুলাল ডাকিয়া কহিল মোরে রাজার দুলাল,- ডালিম ফুলের মতো ঠোঁট যার রাঙা, আপেলের মতো লাল যার গাল, চুল যার শাঙনের মেঘ, আর আঁখি গোধূলির মতো গোলাপী রঙিন, আমি দেখিয়াছি তারে ঘুমপথে, স্বপ্নে-কত দিন! মোর জানালার পাশে তারে দেখিয়াছি রাতের দুপুরে- তখন শুকনবধু যেতেছিল শ্মশানের পানে উড়ে উড়ে! মেঘের বুরুজ ভেঙে অস্তচাঁদ দিয়েছিল উঁকি সে কোন্‌ বালিকা ‌একা অন্তঃপুরে এল অধোমুখী! পাথারের পারে মোর প্রাসাদের আঙিনার পরে দাঁড়াল সে- বাসররাত্রির বধু-মোর তরে, যেন মোর তরে! তখন নিভিয়া গেছে মণিদীপ-চাঁদ শুধু খেলে লুকোচুরি,- ঘুমের শিয়রে শুধু ফুটিতেছে-ঝরিতেছে ফুলঝুরি, স্বপনের কুঁড়ি! অলস আঢুল হাওয়া জানালায় থেকে থেকে ফুঁপায় উদাসী! কাতর নয়ন কার হাহাকারে চাঁদিনীতে জাগে গো উপাসী! কিঙ্খারে -গালিচা খাটে রাজবধু-ঝিয়ারীর বেশে কভু সে দেয় নি দেখা- মোর তোরণের তলে দাঁড়াল সে এসে! দাঁড়াল সে হেঁটমুখে চোখ তার ভরে গেছে নীল অশ্রুজলে! মীনকুমারীর মতো কোন দূর সিন্ধুর অতলে ঘুরেছে সে মোর লাগি!-উড়েছে সে অসীমের সীমা! অশ্রুর অঙ্গারে তার নিটোল ননীর গলা, নরম লালিমা জ্ব’লে গেছে-নগ্ন হাত, নাই শাখা, হারায়েছে রুলি, এলোমেলো কালো চুলে খ’সে গেছে খোঁপা তার, বেণী গেছে খুলি! সাপিনীর মতো বাঁকা আঙুলে ফুটেছে তার কঙ্কালের রূপ, ভেঙেছে নাকের ডাঁশা,হিম স্তন হিম রোমকূপ! আমি দেখিয়াছি তারে ক্ষুধিত প্রেতের মতো চুমিয়াছি আমি তারই পেয়ালায় হায়! পৃথিবীর উষা ছেড়ে আসিয়াছি নামি কান্তারে- ঘুমের ভিড়ে বাঁধিয়াছি দেউলিয়া বাউলের ঘর, আমি দেখিয়াছি ছায়া, শুনিয়াছি একাকিনী কুহকীর স্বর! বুকে মোর, কোলে মোর- কঙ্কালের কাঁকালের চুমা! গঙ্গার তরঙ্গ কানে গায়,- ঘুমা, ঘুমা! ডাকিয়া কহিল মোর রাজার দুলাল- ডালিম ফুলের মতো ঠোঁট যার রাঙা আপেলের মতো লাল যার গাল, চুল যার শাঙনের মেঘ, আর আঁখি গোধূলির মতো গোলাপী রঙিন; আমি দেখিয়াছি তারে ঘুমপথে, স্বপ্নে-কত দিন!   ডাহুকী মালঞ্চে পুষ্পিত লতা অবনতমুখী- নিদাঘের রৌদ্রতাপে একা সে ডাহুকী বিজন তরুর শাখে ডাকে ধীরে ধীরে বনচ্ছায়া অন্তরালে তরল তিমিরে! আকাশে মন’র মেঘ, নিরালা দুপুর! -নিস্তব্ধ পল্লীর পথে কুহকের সুর বাজিয়া উঠিছে আজ ক্ষনে ক্ষনে ক্ষণে! সে কোন পিপাসা কোন ব্যথা তার মনে! হারায়েছে প্রিয়ারে কি? অসীম আকাশে ঘুরেছে অনন্ত কাল মরীচিকা-আশে? বাঞ্ছিত দেয় নি দেখা নিমেষের তরে!- কবে কোন রুক্ষ কাল বৈশাখীর ঝড়ে ভেঙে গেছে নীড়, গেছে নিরুদ্দেশে ভাসি! -নিঝুম বনের তটে বিমনা উদাসী গেয়ে যায়; সুপ্ত পল্লীতটিনীর তীরে ডাহুকীর প্রতিধ্বনি-ব্যথা যায় ফিরে! পল্লবে নিস্তব্ধ পিক, নীরব পাপিয়া, গাহে একা নিদ্রাহারা বিরহিণী গান! আকাশে গোধূলি এল-দিক্‌ হল ম্লান, ফুরায় না তবু হায় হুতাশীর গান! সি-মিত পল্লীর তটে কাঁদে বারবার, কোন্‌ যেন সুনিভৃত রহস্যের দ্বার উন্মূক্ত হল না আর কোন্‌ সে গোপান নিল না হৃদয়ে তুলি তার নিবেদন!     দক্ষিণা প্রিয়ার গালেতে চুমো খেয়ে যায় চকিতে পিয়াল রেণু!- এল দক্ষিণা-কাননের বীণা, বনানীপথের বেণু! তাই মৃগী আজ মৃগের চোখেতে বুলায়ে নিতেছে আখিঁ, বনের কিনারে কপোত আজিকে নেয় কপোতীরে ডাকি! ঘুঘুর পাখায় ঘুঙুর বাজায় আজিকে আকাশখানা,- আজ দখিনার ফর্দা হাওয়ায় পর্দা মানে না মানা! শিশিরশীর্ণা বালার কপোলে কুহেলির কালো জাল উষ্ণ চুমোর আঘাতে হয়েছে ডালিমের মতো লাল! দাড়িমের বীজ ফাটিয়া পড়িছে অধরের চারি পাশে আজ মাধবীর প্রথম উষার, দখিনা হাওয়ার শ্বাসে! মদের পেয়ালা শুকায়ে গেছিল, উড়ে গিয়েছিল মাছি, দখিনা পরশে ভরা পেয়ালার বুদবুদ্‌ ওঠে নাচি! বেয়ালার সুরে বাজিয়া উঠিছে শিরা-উপশিরাগুলি! শ্মাশানের পথে করোটি হাসিছে-হেসে খুন হল খুলি! এস্রাজ বাজে আজ মলয়ের চিতার রৌদ্রতপ সুরের সুঠোমে নিভে যায় যেন, হেসে ওঠে যেন শব! নিভে যায় রাঙা অঙ্কারমালা বৈতরনীর জলে, সুর-জাহ্নরী ফুটে ওঠে আজ মলয়ের কোলাহলে! আকাশ শিথানে মধু পরিণয়-মিলন বাসর পাতি হিমানীশীর্ণ বিধবা তারারা জ্বলে ওঠে রাতারাতি! ফাগুয়ার রাগে-চাঁদের কপোল চকিতে হয়েছে রাঙা! হিমের ঘোমটা চিরে দেয় কে গো মরমস্নায়ুতে দাঙা! লালসে কাহার আজ নীলিমার আনন রুধির লাল- নিখিলের গালে গাল পাতে কার কুঙ্কুম ভাঙা গাল! নারাঙ্গি ফাটা অধর কাহার আকাশ বাতাসে ঝরে! কাহার বাঁশিটি খুন উথলায়- পরান উদাস করে! কাহার পানেতে ছুটিছে উধাও শিশু পিয়ালের শাখা! ঠোঁটে ঠোঁট ডলে- পরাগ চোঁয়ায় অশোক ফুলের ঝাঁকা! কাহার পরশে পলাশবধুর আঁখির কেশরগুলি মুদে মুদে আসে-আর বার করে কুঁদে কুঁদে কোলাকুলি! পাতার বাজারে বাজে হুল্লোড়-পায়েলার রুণ-রুণ, কিশলয়দের ডাশা পেষে কে গো-চোখ করে ঘুমঘুম! এসেছে দখিনা-ক্ষীরের মাঝারে লুকায়ে কোন্‌-এক হীরের ছুরি!- তার লাগি তবু ক্ষ্যপা শাল নিম, তমাল বকুলে হুড়াহুড়ি! আমের কুঁড়িতে বাউল বোলতা খুনসুড়ি দিয়ে খসে যায়, অঘ্রাণে যার ঘ্রাণ পেয়েছিল, পেয়েছিল যারে পোষলায়, সাতাশে মাঘের বাতাসে তাহার দর বেড়ে গেছে দশগুণ- নিছক হাওয়ায় ঝরিয়া পড়িছে আজ মউলের কষগুণ! ঠেলে ফেলে দিয়ে ণীলমাছি আর প্রজাপতিদের ভিড় দখিনার মুখে রসের বাগান বিকায়ে দিতেছে ক্ষীর! এসেছে নাগর- যামিনীর আজ জাগর রঙিন আঁখি,- কুয়াশার দিনে কাঁচুলি বাঁধিয়া কুচ রেখেছিল ঢাকি- আজিকে কাঞ্চী যেতেছে খুলিয়া, মদঘূর্ণনে হায়! নিশীথের স্বেদসীধুধারা আজ ক্ষরিছে দক্ষিণায়! রূপসী ধরনী বাসকসজ্জা, রূপালি চাঁদের তলে বালুর ফরাশে রাঙা উল্লাসে ঢেউয়ের আগুন জ্বলে! রোল উতরোল শোণিতে শিরায়- হোরীর হা রা রা চিৎকার মুখে মুখে মধু- সুধাসীধু শুধু তিত্‌ কোথা আজ- তিত্‌ কার! শীতের বাস্তুতিতে ভেঙে আজ এল দক্ষিণা মিষ্টি মধু মদনের হুলে ঢুলে ঢুলে ঢুলে হুশহারা হল সৃষ্টি বধূ!     দেশবন্ধু বাংলার অঙ্গনেতে বাজায়েছ নটেশের রঙ্গমল্লী গাঁথা অশান্ত সন্তান ওগো, বিপ্লবিনী পদ্মা ছিল তব নদীমাতা। কাল বৈশাখীর দোলা অনিবার দুলাইতে রক্তপুঞ্জ তব উত্তাল ঊর্মির তালে-বক্ষে তবু লক্ষ কোটি পন্নগ-উৎসব উদ্যত ফণার নৃত্যে আষ্ফালিত ধূর্জটির কন্ঠ-নাগ জিনি, ত্র্যম্বক-পিনাকে তব শঙ্কাকুল ছিল সদা শত্রু অক্ষৌহিণী। স্পর্শে তব পুরোহিত, ক্লেদে প্রাণ নিমেষেতে উঠিত সঞ্চারি, এসেছিলে বিষ্ণুচক্র মর্মন্তুদ–ক্লৈব্যের সংহারী। ভেঙেছিলে বাঙালির সর্বনাশী সুষুপ্তির ঘোর, ভেঙেছিলে ধূলিশ্লিষ্ট শঙ্কিতের শৃঙ্খলের ডোর, ভেঙেছিলে বিলাসের সুরাভান্ড তীব্র দর্পে, বৈরাগের রাগে, দাঁড়ালে সন্ন্যাসী যবে প্রাচীমঞ্চে-পৃথী-পুরোভাগে। নবীন শাক্যের বেশে, কটাক্ষেতে কাম্য পরিহরি ভাসিয়া চলিলে তুমি ভারতের ভাবগঙ্গোত্তরী আর্ত অর্স্পশ্যের তরে, পৃথিবীর পঞ্চমার লাগি; বাদলের মন্দ্র সম মন্ত্র তব দিকে দিকে তুলিলে বৈরাগী। এনেছিলে সঙ্গে করি অবিশ্রাম প্লাবনের দুন্দুভিনিনাদ, শানি-প্রিয় মুমূর্ষৃর শ্মশানেতে এনেছিলে আহব-সংবাদ গান্ডীবের টঙ্কারেতে মুহুর্মুহু বলেছিলে, আশি আমি আছি! কল্পশেষে ভারতের কুরুক্ষেত্রে আসিয়াছি নব সব্যসাচী। ছিলে তুমি দধীচির অস্থিময় বাসবের দম্ভেলির সম, অলঙ্ঘ্য, অজেয়, ওগো লোকোত্তর, পুরুষোত্তম। ছিলে তুমি রূদ্রের ডম্বরুরূপে, বৈষ্ণবের গুপীযন্ত্র মাঝে, অহিংসার তপোবনে তুমি ছিলে চক্রবর্তী ক্ষত্রিয়ের সাজে- অক্ষয় কবচধারী শালপ্রাংশু রক্ষকের বেশে। ফেরুকুল-সঙ্কুলিত উঞ্ছবৃত্তি ভিক্ষুকের দেশে ছিলে তুমি সিংহশিশু, যোজনান্ত বিহরি একাকী স্তব্ধ শিলাসন্ধিতলে ঘন ঘন গর্জনের প্রতিধ্বনি মাখি। ছিলে তুমি নীরবতা-নিষ্পেষিত নির্জীবের নিদ্রিত শিয়রে উন্মত্ত ঝটিকাসম, বহ্নিমান বিপ্লবের ঘোরে; শক্তিশেল অপঘাতে দেশবক্ষে রোমাঞ্চিত বেদনার ধ্বনি ঘুচাতে আসিয়াছিলে মৃত্যুঞ্জয়ী বিশল্যকরণী। ছিলে তুমি ভারতের অমাময় স্পন্দহীন বিহ্বল শ্মশানে শবসাধকের বেশে-সঞ্জীবনী অমৃত সন্ধানে। রণনে রঞ্জনে তব হে বাউল, মন্ত্রমুগ্ধ ভারত, ভারতী; কলাবিৎ সম হায় তুমি শুধু দগ্ধ হলে দেশ-অধিপতি। বিবিবশে দূরগত বন্ধু আজ, ভেঙে গেছে বসুধা-নির্মোক, অন্ধকার দিবাভাগে বাজে তাই কাজরীর শ্লোকে। মল্লারে কাঁদিছে আজ বিমানের বৃন্তহারা মেঘছত্রীদল, গিরিতটে, ভূমিগর্ভ ছায়াচ্ছন্ন-উচ্ছ্বাসউচ্ছল। যৌবনের জলরঙ্গ এসেছিল ঘনস্বনে দরিয়ার দেশে, তৃষ্ণাপাংশু অধরেতে এসেছিল ভোগবতী ধারার আশ্লেষে। অর্চনার হোমকুন্ডে হবি সম প্রাণবিন্দু বারংবার ঢালি, বামদেবতার পদে অকাতরে দিয়ে গেল মেধ্য হিয়া ডালি। গৌরকানি- শঙ্করের অম্বিকার বেদীতলে একা চুপে চুপে রেখে এল পূঞ্জীভূত রক্তস্রোত-রেখা।     নব নবীনের লাগি -নব নবীনের লাগি প্রদীপ ধরিয়া আঁধারের বুকে আমার রয়েছি জাগি! ব্যর্থ পঙ্গু খর্ব প্রাণের বিকল শাসন ভেঙে, নব আকাঙক্ষা আশার স্বপনে হৃদয় মোদের রেঙে, দেবতার দ্বারে নবীন বিধান-নতুন ভিক্ষা মেগে দাঁড়ায়েছি মোরা তরুণ প্রাণের অরুণের অনুরাগী! ঝড়ের বাতাস চাই। চারি দিক ঘিরে শীতের কুহেলি, শ্মশানপথের ছাই, ছড়ায়ে রয়েছে পাহাড় প্রমাণ মৃতের অস্থি খুলি, কে সাজাবে ঘর-দেউলের পর কঙ্কাল তুলি তুলি? সূর্যচন্দ্র নিভায়ে কে নেবে জরার চোখের ঠুলি! মরার ধরায় জ্যান্ত কখনও মাগিতে যাবে কি ঠাঁই! ঘুমায়ে কে আছে ঘরে! মৃতুশিশু-বুকে কল্যাণী পুরকামিনী কি আজ মরে! কে আছে বসিয়া হতাশ উদাস অলস অন্যমনা? দোদুল আকাশে দুলিয়া উঠিছে রাঙা অশনির ফণা, বাজে বাদলের রঙ্গমল্লী. ঝঞ্ঝার ঝঞ্ঝনা! ফিরিছে বালক-ঘর পলাতক ঝরা পালকের ঝড়ে! আমরা অশ্বরোহী!- যাযাবর যুবা, বন্দিনীদের ব্যথা মোরা বুকে বহি, মানবের মাঝে যে দেবতা আছে আমরা তাহারে বরি , মোদের প্রাণের পূজার দেউলে তাহার প্রতিমা গড়ি, চুয়া-চন্দন-গন্ধ বিলায়ে আমরা ঝরিয়া পড়ি, সুবাস ছড়াই উশীরের মতো, ধূপের মতন দহি! গাহি মানবের জয়! কোটি কোটি বুকে কোটি ভগবান আঁখি মেলে জেগে রয়! সবার প্রাণের অশ্রু-বেদনা মোদের বক্ষে লাগে, কোটি বুকে কোটি দেউটি জ্বলিছে-কোটি কোটি শিখা জাগে, প্রদীপ নিভায়ে মানবদেবের দেউল যাহারা ভাঙে, আমরা তাদের শস্ত্র, শাসন, আসন করিব ক্ষয়! -জয় মানবের জয়!     নাবিক কবে তব হৃদয়ের নদী বরি নিল অসম্বৃত সুনীল জলধি! সাগর-শকুন্ত-সম উল্লাসের রবে দূর সিন্ধু-ঝটিকার নভে বাজিয়া উঠিল তব দুরন্ত যৌবন! পৃথ্বীর বেলায় বসি কেঁদে মরে আমাদের শৃঙ্খলিত মন! কারাগার-মর্মরের তলে নিরাশ্রয় বন্দিদের খেদ-কোলাহলে ভ’রে যায় বসুধার আহত আকাশ! অবনত শিরে মোরা ফিরিতেছি ঘৃণ্য বিধিবিধানের দাস! -সহস্রের অঙুলিতর্জন নিত্য সহিতেছি মোরা-বারিধির বিপ্লব-গর্জন বরিয়া লয়েছ তুমি, তারে তুমি বাসিয়াছ ভালো; তোমার পক্ষরতলে টগ্‌বগ্ করে খুন-দুরন্ত, ঝাঁঝালো!- তাই তুমি পদাঘাতে ভেঙে গেলে অচেতন বসুধার দ্বার, অবগুণ্ঠিতার হিমকৃষ্ণ অঙুলির কঙ্কাল-পরশ পরিহরি গেলে তুমি-মৃত্তিকার মদ্যহীন রস তুহিন নির্বিষ নিঃস্ব পানপাত্রখানা চকিতে চূর্ণিয়া গেলে-সীমাহারা আকাশের নীল শামিয়ানা বাড়ব-আরক্ত স্ফীত বারিধির তট, তরঙ্গের তুঙ্গ গিরি, দুর্গম সঙ্কট তোমারে ডাকিয়া নিল মায়াবীর রাঙা মুখ তুলি! নিমেষে ফেলিয়া গেলে ধরণীর শূন্য ভিক্ষাঝুলি! প্রিয়ার পাণ্ডুর আঁখি অশ্রু-কুহেলিকা-মাখা গেলে তুমি ভুলি! ভুলে গেলে ভীরু হৃদয়ের ভিক্ষা, আতুরের লজ্জা অবসাদ,- অগাধের সাধ তোমারে সাজায়ে দেছে ঘরছাড়া ক্ষ্যাপা সিন্দবাদ! মণিময় তোরণের তীরে মৃত্তিকায় প্রমোদ-মন্দিরে নৃত্য-গীত-হাসি-অশ্রু-উৎসবের ফাঁদে হে দুরন্ত দুর্নিবার-প্রাণ তব কাঁদে! ছেড়ে গেলে মর্মন্তুদ মর্মর বেষ্টন, সমুদ্রের যৌবন-গর্জন তোমারে ক্ষ্যাপায়ে দেছে, ওহে বীর শের! টাইফুন্-ডঙ্কার হর্ষে ভুলে গেছ অতীত-আখের হে জলধি পাখি! পে তব নাচিতেছে ল্যহারা দামিনী-বৈশাখী! ললাটে জ্বলিছে তব উদয়াস্ত আকাশের রত্নচূড় ময়ূখের টিপ, কোন্ দূর দারুচিনি লবঙ্গের সুবাসিত দ্বীপ করিতেছে বিভ্রান্ত তোমারে! বিচিত্র বিহঙ্গ কোন্ মণিময় তোরণের দ্বারে সহর্ষ নয়ন মেলি হেরিয়াছ কবে! কোথা দূরে মায়াবনে পরীদল মেতেছে উৎসবে- স্তম্ভিত নয়নে নীল বাতায়নে তাকায়েছ তুমি! অতি দূর আকাশের সন্ধ্যারাগ-প্রতিবিম্বে প্রস্ফুটিত সমুদ্রের আচম্বিত ইন্দ্রজাল চুমি সাজিয়াছ বিচিত্র মায়াবী! সৃজনের জাদুঘর-রহস্যের চাবি আনিয়াছ কবে উন্মোচিয়া হে জল-বেদিয়া! অল্য বন্দর পানে ছুটিতেছ তুমি নিশিদিন সিন্ধু বেদুঈন! নাহি গৃহ, নাহি পান্থশালা- লক্ষ লক্ষ ঊর্মি-নাগবালা তোমারে নিতেছে ডেকে রহস্যপাতালে- বারুণী যেথায় তার মণিদীপ জ্বালে! প্রবাল-পালঙ্ক-পাশে মীননারী ঢুলায় চামর! সেই দুরাশার মোহে ভুলে গেছ পিছুডাকা স্বর ভুলেছ নোঙর! কোন্ দূর কুহকের কূল লক্ষ্য করি ছুটিতেছে নাবিকের হৃদয়-মাস্তুল কে বা তাহা জানে! অচিন আকাশ তারে কোন্ কথা কয় কানে কানে!     নিখিল আমার ভাই নিখিল আমার ভই, -কীটের বুকেতে যেই ব্যথা জাগে আমি সে বেদনা পাই; যে প্রাণ গুমরি কাঁদিছে নিরালা শুনি যেন তার ধ্বনি, কোন্‌ ফণী যেন আকাশে বাতাসে তোলে বিষ গরজনি! কী যেন যাতনা মাটির বুকেতে আনিবার ওঠে রণি, আমার শস্য-স্বর্ণসরা নিমেষে হযে যে ছাই! সবার বুকের বেদনা আমার, নিখিল আমার ভাই। আকাশ হতেছে কালো কাহাদের যেন ছায়াপাতে হায়, নিভে যায় রাঙা আলো! বাতায়নে মোর ভেসে আসে যেন কাদের তপ্ত শ্বাস, অন্তরে মোর জড়ায়ে কাদের বেদনার নাগপাশ, বক্ষে আমার জাগিছে কাদের নিরাশা গ্লানিমা ত্রাস, মনে মনে আমি কাহাদের হায় বেসেছিনু এত ভালো। তাদের ব্যথার কুহেলি- পাথারে আকাশ হতেছে কালো। লভিয়াছে বুঝি ঠাঁই আমার চোখের অশ্রুপুঞ্জে নিখিলের বোন-ভাই! আমার গানেতে জাগিছে তাদের বেদনা-পীড়ার দান, আমার প্রাণেতে জাগিছে তাদের নিপীড়িত ভগবান, আমার হৃদয়যূপেতে তাহারা করিছে রক্তস্নান, আমার মনের চিতানলে জ্বলে লুটায়ে যেতেছে ছাই! আমার চোখের অশ্রুপুঞ্জে লভিয়াছে তারা ঠাঁই।     নীলিমা রৌদ্র ঝিল্‌মিল, উষার আকাশ, মধ্য নিশীথের নীল, অপার ঐশ্বর্যবেশে দেখা তুমি দাও বারে বারে নিঃসহায় নগরীর কারাগার-প্রাচীরের পারে! -উদ্বেলিছে হেথা গাঢ় ধূম্রের কুণ্ডলী, উগ্র চুল্লিবহ্নি হেথা অনিবার উঠিতেছে জ্বলি, আরক্ত কঙ্করগুলো মরুভূর তপ্তশ্বাস মাখা, মরীচিকা-ঢাকা! অগণন যাত্রিকের প্রাণ খুঁজে মরে অনিবার, পায় নাকো পথের সন্ধান; চরণে জড়ায়ে গেছে শাসনের কঠিন শৃঙ্খল- হে নীলিমা নিষ্পলক, লক্ষ বিধিবিধানের এই কারাতল তোমার ও মায়াদণ্ডে ভেঙেছ মায়াবী। জনতার কোলাহলে একা ব’সে ভাবি কোন্ দূর জাদুপুর-রহস্যের ইন্দ্রজাল মাখি বাস্তবের রক্ততটে আসিলে একাকী! স্ফটিক আলোকে তব বিথারিয়া নীলাম্বরখানা মৌন স্বপ্ন-ময়ূরের ডানা! চোখে মোর মুছে যায় ব্যাধবিদ্ধ ধরণীর রুধির-লিপিকা জ্বলে ওঠে অন্তহারা আকাশের গৌরী দীপশিখা! বসুধার অশ্রু-পাংশু আতপ্ত সৈকত, ছিন্নবাস, নগ্নশির ভিক্ষুদল, নিষ্করুণ এই রাজপথ, লক্ষ কোটি মুমূর্ষুর এই কারাগার, এই ধূলি-ধূম্রগর্ভ বিস্তৃত আঁধার ডুবে যায় নীলিমায়-স্বপ্নায়ত মুগ্ধ আঁখিপাতে, -শঙ্খশুভ্র মেঘপুঞ্জে , শুক্লাকাশে, নক্ষত্রের রাতে; ভেঙে যায় কীটপ্রায় ধরণীর বিশীর্ণ নির্মোক, তোমার চকিত স্পর্শে, হে অতন্দ্র দূর কল্পলোক!     পতিতা আগার তাহার বিভীষিকাভরা, জীবন মরণময়! সমাজের বুকে অভিশাপ সে যে – সে যে ব্যাধি, সে যে ক্ষয়; প্রেমের পসরা ভেঙে ফেলে দিয়ে ছলনার কারাগারে রচিয়াছে সে যে, দিনের আলোয় রুদ্ধ ক’রেছে দ্বার! সূর্যকিরণ চকিতে নিভায়ে সাজিয়াছে নিশাচর, কালনাগিনীর ফনার মতন নাচে সে বুকের পর! চক্ষে তাহার কালকুট ঝরে, বিষপঙ্কিল শ্বাস, সারাটি জীবন মরীচিকা তার প্রহসন-পরিহাস! ছোঁয়াচে তাহার ম্লান হয়ে যায় শশীতারকার শিখা, আলোকের পারে নেমে আসে তার আঁধারের যবনিকা! সে যে মন্বন্তর, মৃত্যুর দূত, অপঘাত, মহামারী- মানুষ তবু সে, তার চেয়ে বড় – সে যে নারী, সে যে নারী!     পিরামিড বেলা বয়ে যায় গোধূলির মেঘ-সীমানায় ধূম্র মৌন সাঁঝে নিত্য নব দিবসের মৃতু্যঘন্টা বাজে! শতাব্দীর শবদেহে শ্মশানের ভষ্মবহ্নি জ্বলে! পান্থ ম্লান চিতার কবলে একে একে ডুবে যায় দেশ, জাতি,—সংসার, সমাজ, কার লাগি হে সমাধি, তুমি একা বসে আছ আজ কী এক বিক্ষুব্ধ প্রেতকায়ার মতন অতীতের শোভাযাত্রা কোথায় কখন চকিতে মিলায়ে গেছে-পাও নাই টের! কোন দিবা অবসানে গৌরবের লক্ষ মুসাফের দেউটি নিভায়ে গেছে,—চলে গেছে দেউল ত্যজিয়া, চলে গেছে প্রিয়তম,—চলে গেছে প্রিয়া! যুগান্ত্মের মণিময় গেহবাস ছাড়ি চকিতে চলিয়া গেছে বাসনা-পসারী, কবে কোন্ বেলাশেষে হায় দূর অস্ত্মশেখরের গায়! তোমারে যায়নি তারা শেষ অভিনন্দনের অর্ঘ্য সমর্পিয়া; সাঁজের নীহারনীল সমুদ্য মথিয়া মরমে পশেনি তব তাহাদের বিদায়ের বাণী! তোরণে আসেনি তব লক্ষ লক্ষ মরণ-সন্ধানী অশ্রু-ছলছল চোখে,—পাণ|ডুর বদনে! —কুষ্ঞ যবনিকা করেব ফেলে তারা গেল দূর দ্বারে বাতায়নে জানো নাই তুমি! জানে না তো মিশরেরর মূক মরুভূমি তাদের সন্ধান! হে নির্বাক পিরামিড,—অতীতের স্ত্মব্ধ প্রেত-প্রাণ অবিচল স্মৃতির মন্দির! আকাশের পানে চেয়ে আজো তুমি বসে আছো স্থির! নিষ্পলক যুগ্মভুরু তুলে চেয়ে আছো অনাগত উদধির কূলে মেঘ-রক্ত ময়ূখের পানে! জ্বলিয়া যেতেছে নত্যি নিশি-অবসানে নূতন ভাস্কার! বেজে ওঠে অনাহত মেম্ননের স্বর নিবেদিন অরুণের সনে কোন্ আশা-দূরাশার ক্ষণস্থায়ী অঙ্গুলি-তাড়নে! —পিরামিড-পাষাণের মর্ম ঘেরি নেচে যায় দুদণ্ডের রুধির-ফোয়ারা কি এক প্রগল্ভ উষ্ণ উল্লাসের সাড়া! থেমে যায় পান্থবীণা মুহূর্তে কখন! শতাব্দীর বিরহীর মন নিটল নিথর সন্ত্মরি ফিরিয়া মনে গগনের রক্ত-পীত সাগরের পরে! বালুকার স্ফীত পারাবারে লোল মৃগতৃষ্ঞিকার দ্বারে মিশরের অপহৃত অন্ত্মরের লাগি মৌন ভিক্ষা মাগি!— —খুলে যাবে কবে রুদ্ধ মায়ার দুয়ার! মুখরিত প্রাণের সঞ্চার ধ্বনিত হইবে করেব কলহীন নীলার বেলায়!— —বিচ্ছেদের নিশি জেগে আজো তাই বসে আছে পিরামিড হায়! — কত আগন্তুক-কাল,—অতিথি—সভ্যতা তোমার দুয়ারে এসে কয়ে যায় অসম্বৃত অন্ত্মরের কথা! তুলে যায় উচ্ছৃঙ্খল রুদ্র কোলাহল! —তুমি রহ নিরুত্তর,—নির্বেদী,—নিশ্চল! মৌন, অন্যমনা! —প্রিয়ার বক্ষের পরের বসি একা নীরবে করিছ তুমি শবের সাধনা হে প্রেমিক—স্বতন্হত্র স্বরাট! —কবে সুপ্ত উত্‌সবের স্ত্মব্ধ ভাঙা হাট উঠিবে জাগিয়া! সস্মিত নয়ন তুলি কবে তব প্রিয়া আঁকিবে চুম্বন তব স্বেদ-কৃষ্ণ, পান্ডু, চূর্ণ, ব্যথিত কপোলে! মিশর-অলিন্দে কবে গরিমার দীপ যাবে জ্বলে! বসে আছো অশ্রুহীন স্পন্দহীন তাই! —ওলটিপালটি যুগ-যুগন্ত্মের শ্মশানের ছাই জাগিয়া রয়েছে তব প্রেত-আঁখি,—,প্রেমের প্রহরা! —মোদের জীবনে যবে জাগে পাতা-ঝরা হেমন্ত্মের বিদায়-কুহেলি, অরুন্তুদ আঁখি দুটি মেলি গড়ি মোরা স্মৃতির শ্মশান দুদিনের তরে শুধু,—নবোত্‌ফুল্লা মাধবীর গান মোদের ভুলায়ে নেয় বিচিত্র আকাশে নিমেষে চকিতে! —অতীতের হিমগর্ভ কবরের পাশে ভুলে যাই দুই ফোঁটা অশ্রু ঢেলে দিতে!     বনের চাতক–মনের চাতক বনের চাতক বাঁধল বাসা মেঘের কিনারায়- মনের চাতক হারিয়ে গেল দূরের দুরাশায়! ফুঁপিয়ে ওঠে কাতর আকাশ সেই হতাশার ক্ষোভে- সে কোন্ বোঁটের ফুলের ঠোঁটের মিঠা মদের লোভে বনের চাতক-মনের চাতক কাঁদছে অবেলায়! পুবের হাওয়ায় হাপর জ্বলে, আগুনদানা ফাটে! কোন্ ডাকিনীর বুকের চিতায় পচিম আকাশ টাটে! বাদল-বৌয়ের চুমার মৌয়ের সোয়াদ চেয়ে চেয়ে বনের চাতক-মনের চাতক চলছে আকাশ বেয়ে, ঘাটের ভরা কলসি ও-কার কাঁদছে মাঠে মাঠে! ওরে চাতক, বনের চাতক, আয় রে নেমে ধীরে নিঝুম ছায়া-বৌরা যেথা ঘুমায় দীঘি ঘিরে, “দে জল!” ব’লে ফোঁপাস কেন? মাটির কোলে জল খবর-খোঁজা সোজা চোখের সোহাগে ছল্‌ছল্ ! মজিস নে রে আকাশ-মরুর মরীচিকার তীরে! মনের চাতক, হতাশ উদাস পাখায় দিয়ে পাড়ি কোথায় গেলি ঘরের কোণের কানাকানি ছাড়ি? ননীর কলস আছে রে তার কাঁচা বুকের কাছে, আতার ক্ষীরের মতো সোহাগ সেথায় ঘিরে আছে! আয় রে ফিরে দানোয়-পাওয়া, আয় রে তাড়াতাড়ি। বনের চাতক, মনের চাতক আসে না আর ফিরে, কপোত-ব্যথা বাজায় মেঘের শকুনপাখা ঘিরে! সে কোন্ ছুঁড়ির চুড়ি আকাশ-শুঁড়িখানায় বাজে! চিনিমাখা ছায়ায় ঢাকা চুনীর ঠোঁটের মাঝে লুকিয়ে আছে সে-কোন্ মধু মৌমাছিদের ভিড়ে!       বিবেকানন্দ জয়, তরুণের জয়! জয় পুরোহিত আহিতাগ্নিক, জয় জয় চিন্ময়! স্পর্শে তোমার নিশা টুটেছিল, উষা উঠেছিল জেগে পূর্ব তোরণে, বাংলা আকাশে , অরুণ-রঙিন মেঘে; আলোকে তোমার ভারত, ইশয়া-জগৎ গেছিল রেঙে। হে যুবক মুসাফের, স্থবিরের বুকে ধ্বনিলে শ্‌ঙ্খ জাগরণপর্বের! জিঞ্জির-বাঁধা ভীত চকিতেরে অভয় দানিলে আসি, সুপ্তের বুকে বাজালে তোমার বিষাণ হে সন্ন্যাসী, রক্ষের বুকে বাজালে তোমার কালীয়দমন বাঁশি! আসিলে সবসাচী, কোদন্ডে তব নব উল্লাসে নাচিয়া উঠিল প্রাচী! টঙ্কারে তব দিকে দিকে শুধু রণিয়া উঠিল জয়, ডঙ্কা তোমার উঠিল বাজিয়া মাভৈঃ মন্ত্রময়; শঙ্কাহরণ ওহে সৈনিক, নাহিক তোমার ক্ষয়! তৃতীয় নয়ন তব ম্লান বাসনার মনসিজ নাশি জ্বালাইত উৎসব! কলুষ-পাতকে, ধূর্জটি, তব পিনাক উঠিত রুখে, হানিতে আঘাত দিবানিশি তুমি ক্লেদ-কামনার বুকে, অসুর-আলয়ে শিব-সন্ন্যাসী বেড়াতে শঙ্খ ফুঁকে! কৃষ্ণচক্র সম ক্লৈব্যের হৃদে এসেছিলে তুমি ওগো পুরুষোত্তম, এসেছিলে তুমি ভিখারির দেশে ভিখারির ধর মাগি নেমেছিলে তুমি বাউলের দলে, হে তরুণ বৈরাগী! মর্মে তোমার বাজিত বেদনা আর্ত জীবের লাগি। হে প্রেমিক মহাজন, তোমার পানেতে তাকাইল কোটি দরিদ্রনারায়ণ; অনাথের বেশে ভগবান এসে তোমার তোরণতলে বারবার যবে কেঁদে কেঁদে গেল কাতর আঁখির জলে, অর্পিলে তব প্রীতি-উপায়ন প্রাণের কুসুমদলে। কোথা পাপী? তাপী কোথা? ওগো ধ্যানী. তুমি পতিত পাবন যজ্ঞে সাজিলে হোতা! শিব-সুন্দর-সত্যের লাগি শুরু করে দিলে হোম, কোটি পঞ্চমা আতুরের তরে কাঁপায়ে তুলিলে ব্যোম, মন্ত্রে তোমার বাজিল বিপুল শানি- স্বসি- ওঁ! সোনার মুকুট ভেঙে ললাট তোমার কাঁটার মুকুটে রাখিলে সাধক রেঙে! স্বার্থ লালসা পাসরি ধরিলে আত্মাহুতির ডালি, যঞ্জের যূপে বুকের রুধির অনিবার দিলে ঢালি, বিভাতি তোমার তাই তো অটুট রহিল অংশুমালী! দরিয়ার দেশে নদী! বোধিসত্ত্বের আলয়ে তুমি গো নবীন শ্যামল বোধি! হিংসার রণে আসিলে পথিক প্রেম-খঞ্জর হাতে, আসিলে করুণাপ্রদীপ হসে- হিংসার অমারাতে, ব্যাধি মন্বন্তরে এলে তুমি সুধাজলধরি সংঘাতে! মহামারী ক্রন্দন ঘুটাইলে তুমি শীতল পরশে, ওগো সুকোমল চন্দন! বজ্রকঠোর, কুসুমদুল, আসিলে লোকোত্তর; হানিলে কুলিশ কখন ও ঢালিলে নির্মল নির্ঝর, নাশিলে পাতক, পাতকীর তুমি অর্পিলে নির্ভর। চক্রগদার সাথে এনেছিলে তুমি শঙ্খ পদ্ম, হে ঋষি, তোমার হাতে; এনেছিলে তুমি ঝড় বিদ্যুৎ পেয়েছিলে তুমি সাম, এনেছিলে তুমি রণ-বিপ্লব-শানি- কুসুমদাম; মাভৈঃ শঙ্খে জাগিছে তোমার নরনারায়ণ-নাম! জয়, তরুণের জয়! আত্মহুতির রক্ত কখনও আঁধারে হয় না লয়! তাপসের হাড় বজ্রের মতো বেজে উঠে বারবার! নাহি রে মরণে বিনাশ, শ্মশানে নাহি তার সংহার, দেশে দেশে তার বীণা বাজে-বাজে কালে কালে ঝঙ্কার!     বেদিয়া চুলিচালা সব ফেলেছে সে ভেঙে, পিঞ্জরহারা পাখি! পিছুডাকে কভু আসে না ফিরিয়া, কে তারে আনিবে ডাকি? উদাস উধাও হাওয়ার মতন চকিতে যায় সে উড়ে, গলাটি তাহার সেধেছে অবাধ নদী-ঝর্ণার সুরে; নয় সে বান্দা রংমহলের, মোতিমহলের বাঁদী, ঝোড়ো হাওয়া সে যে, গৃহপ্রাঙ্গণে কে তারে রাখিবে বাঁধি! কোন্ সুদূরের বেনামী পথের নিশানা নেছে সে চিনে, ব্যর্থ ব্যথিত প্রান্তর তার চরণচিহ্ন বিনে! যুগযুগান্ত কত কান্তার তার পানে আছে চেয়ে, কবে সে আসিবে ঊষর ধূসর বালুকা-পথটি বেয়ে তারই প্রতীক্ষা মেগে ব’সে আছে ব্যাকুল বিজন মরু! দিকে দিকে কত নদী-নির্ঝর কত গিরিচূড়া-তরু ঐ বাঞ্ছিত বন্ধুর তরে আসন রেখেছে পেতে কালো মৃত্তিকা ঝরা কুসুমের বন্দনা-মালা গেঁথে ছড়ায়ে পড়িছে দিগ্‌দিগন্তে ক্ষ্যাপা পথিকের লাগি! বাবলা বনের মৃদুল গন্ধে বন্ধুর দেখা মাগি লুটায়ে রয়েছে কোথা সীমান্তে শরৎ উষার শ্বাস! ঘুঘু-হরিয়াল-ডাহুক-শালিখ-গাঙচিল-বুনোহাঁস নিবিড় কাননে তটিনীর কূলে ডেকে যায় ফিরে ফিরে বহু পুরাতন পরিচিত সেই সঙ্গী আসিল কি রে! তারই লাগি ভায় ইন্দ্রধনুক নিবিড় মেঘের কূলে, তারই লাগি আসে জোনাকি নামিয়া গিরিকন্দরমূলে। ঝিনুক-নুড়ির অঞ্জলি ল’য়ে কলরব ক’রে ছুটে নাচিয়া আসিছে অগাধ সিন্ধু তারই দুটি করপুটে। তারই লাগি কোথা বালুপথে দেখা দেয় হীরকের কোণা, তাহারই লাগিয়া উজানী নদীর ঢেউয়ে ভেসে আসে সোনা! চকিতে পরশপাথর কুড়ায়ে বালকের মতো হেসে ছুড়ে ফেলে দেয় উদাসী বেদিয়া কোন্ সে নিরুদ্দেশে! যত্ন করিয়া পালক কুড়ায়, কানে গোঁজে বনফুল, চাহে না রতন-মণিমঞ্জুষা হীরে-মাণিকের দুল, -তার চেয়ে ভালো অমল উষার কনক-রোদের সীঁথি, তার চেয়ে ভালো আলো-ঝল্মল্ শীতল শিশিরবীথি, তার চেয়ে ভালো সুদূর গিরির গোধূলি-রঙিন জটা, তার চেয়ে ভালো বেদিয়া বালার ক্ষিপ্র হাসির ছটা! কী ভাষা বলে সে, কী বাণী জানায়, কিসের বারতা বহে! মনে হয় যেন তারই তরে তবু দুটি কান পেতে রহে আকাশ-বাতাস-আলোক-আঁধার মৌন স্বপ্নভরে, মনে হয় যেন নিখিল বিশ্ব কোল পেতে তার তরে!     মরীচিকার পিছে- ধূম্র তপ্ত আঁধির কুয়াশা তরবারি দিয়ে চিরে সুন্দর দূর মরীচিকাতটে ছলনামায়ার তীরে ছুটে যায় দুটি আঁখি! -কত দূর হায় বাকি! উধাও অশ্ব বগ্লাবিহীন অগাধ মরুভূ ঘিরে পথে পথে তার বাধা জমে যায়-তবু সে আসে না ফিরে! দূরে-দূরে আরো দূরে-আরো দূরে, অসীম মরুর পারাবার-পারে আকাশ সীমানা জুড়ে ভাসিয়াছে মরুতৃষা! -হিয়া হারায়েছে দিশা! কে যেন ডাকিছে আকুল অলস উদাস বাঁশির সুরে কোন্‌ দিগন্তে নির্জন কোন্‌ মৌন মায়াবী-পুরে! কোন্‌-এক সুনীল দরিয়া সেথায় উত্থলিছে অনিবার! -কান পেতে একা শুনেছে সে তার অপরূপ ঝঙ্কার, ছোটে অঞ্জলি পেতে, তৃষার নেশায় মেতে, উষর ধূসর মরুর মাঝারে এমন খেয়াল কার! খুলিয়া দিয়াছে মাতাল ঝর্ণা না জানি কে দিলদার! কে যেন রেখেছে সবুজ ঘাসের কোমল গালিচা পাতি! যত খুন যত খারাবীর ঘোরে পরান আছিল মাতি, নিমেষে গিয়েছে ভেঙে স্বপন-আবেশে রেঙে আঁখিদুটি তার জৌলস্‌ রাঙা হ’য়ে গেছে রাতারাতি! কোন্‌ যেন এক জিন্‌-সর্দার সেজেছে তাহার সাথী। কোন্‌ যেন পরী চেয়ে আছে দুটি চঞ্চল চোখ তুলে! পাগলা হাওয়ায় অনিবার তার ওড়না যেতেছে দুলে! গেঁথে গোলাপের মালা তাকায়ে রয়েছে বালা, বিলায়ে দিয়েছে রাঙা নার্গিস্‌ কালো পশমিনা চুলে! বসেছে বালিকা খর্জুরছায়ে নীল দরিয়ার কূলে। ছুটিছে ক্লিষ্ট ক্লান্ত অশ্ব কশাঘাত জর্জর, চারি দিকে তার বালুর পাথার-মরুর হাওয়ার ঝড়; নাহি শ্রান্তির লেশ, সুদুর নিরুদ্দেশ- অসীম কুহক পাতিয়া রেখেছে তাহার বুকের পর! পথের তালাসে পাগল সোয়ার হারায়ে ফেলেছে ঘর! আঁখির পলকে পাহাড়ের পারে কোথা সে ছুটিয়া যায়! চকিত আকাশ পায় না তাহার নাগাল খুঁজিয়া হায়! ঝড়ের বাতাস মিছে ছুটছে তাহার পিছে! মরুভূর প্রেত চকমিয়া তার চক্ষের পানে চায়- সুরার তালাসে চুমুক দিল কে গরলের পেয়ালায়!     মরুবালু হাড়ের মালা গলায় গেঁথে – অট্টহাসি হেসে উল্লাসেতে টলছে তারা,—জ্বলছে তারা খালি ! ঘুরছে তারা লাল মশানে কপাল—কবর ঘেঁসে , বুকের বোমাবারুদ দিয়ে আকাশটারে জ্বালি পাঁয়জোরে কাল মহাকালের পাঁজর ফেড়ে ফেড়ে মড়ার বুকে চাবুক মেরে ফিরছে মরুর বালি ! সর্বনাশের সঙ্গে তোরা দম্ভে খেলিস পাশা হেথায় কোন এক সৃষ্টিপাতের সূত্রপাতের ভূমি , —শিশু মানব গড়েছিল ঐ সাহারায় বাসা ; —সে সব গেছে কবে ঘুমের চুমার ধোঁয়ায় ধূমি ! অটল আকাশ যাচ্ছে জরির ফিতার মতো ফেড়ে , জবান তোদের জ্বলছে যমের চিতার গেলাস চুমি !   তোদের সনে ‘ডাইনোসুরে’র লড়াই হলো কত,- আলুথালু লুটিয়ে বালুর ডাইনী ছায়ার তলে আজকে তারা ঘুমিয়া আছে ,—চুল্লি শত শত উঠলো জ্বলে তাদের হাড়ে ,—তাদের নাড়ের বলে ; কাঁদছে খাঁ খাঁ কাফন-ঢাকা বালুর চাকার নিচে , মুণ্ড তাদের ,—মড়ার কপাল ভৈরবেরি গলে! তোদের বুকে জাগছে মৃগতৃষ্ণা ,—জাগে ঝর! নিস উড়িয়ে শিকার—সোয়ার ধোঁয়ার পিছে পিছে ,- মেঘে মেঘে চড়াও ,—বাজের বুক চিরে চক্কর ! নাচতে আছিস আকাশখানার গোখরাফণার নিচে, আরব মিশর চীন ভারতের হাওয়ায় ঘুরে ঘুরে ! সত্য ত্রেতা দ্বাপর কলি হাপর খিঁচে খিঁচে ! তোদের ভাষা আস্ফালিছে শেখ সেনানীর বুকে! -লাল সাহারার শেরের সোয়ার ,—বালুর ঘায়ে ঘেয়ো , ধমক মেরে আঁধির বুকে ছুটছে রুখে রুখে! -তোদের মতো নেইকো তাদের সোদর—সাথী কেহ , নেইকো তাদের মোদের মতন পিছুডাকের মায়া, নেইকো তাদের মোদের মতন আর্ত মোহ-স্নেহ ! দানোয়-পাওয়া আগুনদানা ,—দারুণ পথের মুখে ! ঘায়েল করি মেঘের বুরুজ বল্লমেরি ঘর, উড়িয়া হাজার ‘ক্যারাভেন’ ও তাম্বুশিবির বুকে , উজিয়ে মরীচিকার শিখা – কালফণা জর্জর , —টলতে আছিস ,—দলতে আছিস ,—জ্বলতে আছিস ধূ ধূ ! সঙ্গে স্যাঙাত-মসুদ ডাকাত ,—তাতার যাযাবর ! গাড়তে যাবো যারা তোদের বুকের মাঝে বাসা হাড্ডি তাদের ফোফরা হ’য়ে ঝুরবে বালুর মাঝে , এইখানেতে নেইকো দরদ,-নেইকো ভালোবাসা , বর্শা লাফায় ,—উটের গলায় ঘণ্টি শুধু বাজে ! ফুরিয়ে গেছে আশা যাদের,—জুড়িয়ে গেছে জ্বালা , আয় রে বালুর ‘কারবালা’তে, অন্ধকারের ঝাঁঝে !     মিশর ‘মমী’র দেহ বালুর তিমির জাদুর ঘরে লীন- ‘স্ফীঙ্ক্‌স-দানবীর অরাল ঠোঁটের আলাপ আজি চুপ! ঝাঁ ঝাঁ মরুর ‘লু’য়ের ফুঁয়ে হচ্চে বিলীন-ক্ষীণ মিশর দেশের কাফন্‌ পাহাড়-পিরামিতের স্তুপ! নিভে গেছে ঈশিশের রই বেদীর থেকে ধূমা, জুড়িয়ে গেছে লক্‌লকে সেই রক্তজিভার চুমা! এদ্দিনেতে ফুরিয়ে গেছে কুমিরপূজার ঘটা, দুলছে মরুমশান শিরে মহাকালের জটা! ঘুমন্তদের কানে কানে কয় সে-ঘুমা ঘুমা! ঘুমিয়ে গেছে বালুর তলে ফ্যারাও, ফ্যারাওছেলে- তাদের বুকে যাচ্চে আকাশ বর্শা ঠেলে ঠেলে! হাওয়ার সেতার দেয় ফুঁপিয়ে মেম্ননেরই বুক, ডুবে গেছে মিশররবি-বিরাট বেলের ভুখ জিহ্বা দিয়ে জঠর দিয়ে গেছে তোমার জ্বেলে! পিরাপিডের পাশাপাশি লালচে বালুর কাছে স্থবির মরণ-ঘুমের ঘোরে মিশর শুয়ে আছে! সোনার কাঠি নেই কি তাহার? জাগবে না কি আর! মৃত্যু সে কি শেষের কথা? শেষ কি শবাধার? সবাই কি গো ঢালাই হবে চিতার কালির ছাঁচে! নীলার ঘোলা জলের দোলায় লাফায় কালো সাপ। কুমিরগুলোর খুলির খিলান, করাত দাঁতের খাপ উর্ধ্বমুখে রৌদ্র পোহায়; ঘুমপাড়ানির ঘুম হানছে আঘাত-আকাশ বাতাস হচ্ছে যেন গুম্‌! ঘুমের থেকে উপচে পড়ে মৃতের মনস্তাপ! নীলা নীলা—ধুক্‌ধুকিয়ে মিশরকবর পারে রইলে জেগে বোবা বুকের বিকল হাহাকারে লাল আলেয়ার খেয়া ভাসায় রামেসেসের দেশ! অতীত অভিশাপের নিশা এলিয়ে এলোকেশ নিভিয়ে দেছে দেউটি তোমার দেউল-কিনারে! কলসি কোলে নীলনদেতে যেতেছে ঐ নারী ঐ পথেতে চলতে আছে নিগ্রো সারি সারি ইয়াঙ্কী ঐ ঐ য়ুরোপী-চীনে-তাতার মুর তোমার বুকের পাঁজর দ’লে টলতেছে হুড়মুড়্‌- ফেনিয়ে তুলে খুন্‌খারাবি, খেলাপ, খবরদারি! দিনের আলো ঝিমিয়ে গেল-আকাশে ঐ চাঁদ! চপল হাওয়ায় কাঁকন নীলনদেরই বাঁধ! মিশর ছুঁড়ি গাইছে মিঠা শুড়িখানার সুরে বালুর খাতে, প্রিয়ের সাথে—খেজুরবনে দূরে! আফ্রিকা এই, এই যে মিশর-জাদুর এ যে ফাঁদ! ওয়েসিসের ঠান্ডা ছায়ায় চৈতি চাঁদের তলে মিশরবালার বাঁশির গলা কিসের কথা বলে! চলছে বালুর চড়াই ভেঙে উটের পরে উট- এই যে মিশর-আফ্রিকার এই কুহকপাখাপুট! —কী এক মোহ এই হাওয়াতে—এই দরিয়ার জলে! শীতল পিরামিডের মাথা-গীজের মুরতি অঙ্কবিহীন যুগসমাধির মূক মমতা মথি আবার যেন তাকায় অদূর উদয়গিরির পানে! মেম্নেনের ঐ কন্ঠ ভরে চারণ-বীনার গানে! আবার জাগে ঝান্ডাঝালর—জ্যান্ত আলোর জ্যোতি!   যে কামনা নিয়ে যে কামনা নিয়ে মধুমাছি ফেরে বুকে মোর সেই তৃষা! খুঁজে মরি রূপ, ছায়াধূপ জুড়ি, রঙের মাঝারে হেরি রঙডুবি! পরাগের ঠোঁটে পরিমলগুঁড়ি- হারায়ে ফেলি গো দিশা! আমি প্রজাপতি-মিঠা মাঠে মাঠে সোঁদালে সর্ষেক্ষেতে; বোদের সফরে খুঁজি নাকো ঘর, বাঁধি নাকো বাসা-কাঁপি থরথর অতসী ছুঁড়ির ঠোটের উপর শুঁড়ির গেলাসে মেতে! আমি দক্ষিণা-দুলালীর বীণা,পউষপরশহারা! ফুল-আঙিয়ার আমি ঘুমভাঙা পিয়াল চুমিয়া পিলাই গো রাঙা পিয়ালার মধু তুলি রাতজাগা হোরীর হারারা সাড়া! আমি গো লালিমা-গোধূলির সীমা, বাতাসের লাল, ফুল। দুই নিমেষের তরে আমি জ্বালি নীল আকাশের গোলাপী দেয়ালী! আমি খুশরোজী, আমি গো খেয়ালী, চঞ্চল, চুলবুল। বুকে জ্বলে মোর বাসর দেউটি-মধুপরিণয়রাতি! তুলিছে ধরণী বিধবা-নয়ন মনের মাঝারে মদনমোহন মিলননদীর নিধুর কানন রেখেছে রে মোর পাতি!   শ্মশান কুহেলির হিমশয্যা অপসারি ধীরে রূপময়ী তন্বী মাধবীরে ধরণী বরিয়া লয় বারে-বারে-বারে! -আমাদের অশ্রুর পাথারে ফুটে ওঠে সচকিতে উৎসবের হাসি,- অপরূপ বিলাসের বাঁশি! ভগ্ন প্রতিমারে মোরা জীবনের বেদীতটে আরবার গড়ি, ফেনাময় সুরাপাত্র ধরি ভুলে যাই বিষের অস্বাদ! মোহময় যৌবনের সাধ আতপ্ত করিয়া তোলে স্থবিরের তুহিন অধর! চিরমৃত্যুচর হে মৌন শ্মশান ধূম-অবগুন্ঠনের অন্ধকারে আবরি বয়ান হেরিতেছ কিসের স্বপন! ক্ষণে ক্ষণে রক্তবহ্নি করি নির্বাপন স্তব্ধ করি রাখিতেছ বিরহীর ক্রন্দনের ধ্বনি! তবু মুখপানে চেয়ে কবে বৈতরণী হ’য়ে গেছে কলহীন! বক্ষে তব হিম হ’য়ে আছ কত উগ্রশিখা চিতা হে অনাদি পিতা! ভস্মগর্ভে, মরণের অকূল শিয়রে জন্মযুগ দিতেছ প্রহরা- কবে বসুন্ধরা মৃত্যুগাঢ় মদিবার শেষ পাত্রখানি তুলে দেবে হসে- তব, কবে লবে টানি কাঙ্কাল আঙুলি তুলি শ্যামা ধরণীরে শ্মশান-তিমিরে, লোলুপ নয়ন মেলি হেরিবে তাহার বিবসনা শোভা দিব্য মনোলোভা! কোটি কোটি চিতা-ফণা দিয়া রূপসীর অঙ্গ-আলিঙ্গিয়া শুষে নেবে সৌন্দর্যের তামরস-মধু! এ বসুধা-বধূ আপনারে ডারি দেবে উরসে তোমার! ধ্বক্‌-ধ্বক্‌-দারুণ তৃষ্ণার রসনা মেলিয়া অপেক্ষায় জেগে আছে শ্মশানের হিয়া! আলোকে আঁধারে অগণন চিতার দুয়ারে যেতেছে সে ছুটে, তৃপ্তিহীন তিক্ত বক্ষপুটে আনিতেছে নব মৃত্যু পথিকের ডাকি, তুলিতেছে রক্ত-ধুম্র আঁখি! -নিরাশার দীর্ঘশ্বাস শুধু বৈতরণীমরু ঘেরি জ্বলে যায় ধু ধু আসে না প্রেয়সী! নিদ্রাহীন শশী, আকাশের অনাদি তারকা রহিয়াছে জেগে তার সনে; শ্মশানের হিম বাতায়নে শত শত প্রেতবধূ দিয়া যায় দেখা,- তবু সে যে প’ড়ে আছে একা, বিমনা-বিরহী! বক্ষে তার কত লক্ষ সভ্যতার স্মৃতি গেছে দহি, কত শৌর্য-সাম্রাজ্যের সীমা প্রেম-পুণ্য-পূজার গরিমা অকলঙ্ক সৌন্দর্যের বিভা গৌরবের দিবা! তবু তার মেটে নাই তৃষা; বিচ্ছেদের নিশা আজও তার হয় নাই শেষ! আশ্রান্ত অঙুলি সে যে করিছে নির্দেশ অবনীর পক্কবিম্ব অধরের পর! পাতাঝরা হেমন্তের স্বর, ক’রে দেয় সচকিত তারে, হিমানী-পাথারে কুয়াশাপুরীর মৌন জানায়ন তুলে চেয়ে থাকে আঁধারে অকূলে সুদূরের পানে! বৈতরণীখেয়াঘাটে মরণ-সন্ধানে এল কি রে জাহ্নবীর শেষ উর্মিধারা! অপার শ্মশান জুড়ি জ্বলে লক্ষ চিতাবহ্নি-কামনা-সাহারা!   সাগর বলাকা ওরে কিশোর, বেঘোর ঘুমের বেহুঁশ হাওয়া ঠেলে পাতলা পাখা দিলি রে তোর দূর-দুরাশায় মেলে! ফেনার বৌয়ের নোন্‌তা মৌয়ের মদের গেলাস লুটে, ভোর-সাগরের শরাবখানায়–মুসল্লাতে জুটে হিমের ঘুণে বেড়াস খুনের আগুনদানা জ্বেলে! ওরে কিশোর, অস্তরাগের মেঘের চুমায় রেঙে নীল নহরের স্বপন দেখে চৈতি চাঁদে জেগে ছুটছ তুমি চ্ছল চ্ছল জলের কোলাহলের সাথে কই! উছলে ওঠে বুকে তোমার আল্‌তো ফেনা-সই ঢেউয়ের ছিটায় মিঠা আঙুল যাচ্ছে ঠোঁটে লেগে! রে মুসাফের, পাতাল-প্রেতপুরের মরীচিকা সাগরজলের তলে বুঝি জ্বালিয়ে দেছে শিখা! তাই কি গেলে ভেঙে হেথায় বালিয়াড়ির বাড়ি! দিচ্ছ যাযাবরের মতো সাগর-মরু-পাড়ি- ডাইনে তোমার ডাইনীমায়া, পিছের আকাশ ফিকা! বাসা তোমার সাতসাগরের ঘূর্ণী হাওয়ার বুকে! ফুটছে ভাষা কেউটে ঢেউয়ের ফেনার ফণা ঠুকে! প্রায়ণ তোমার প্রবালদ্বীপে, পলার মালা গলে বরুণরানি ফিরছে যেথা, মুক্তপ্রদীপ জ্বলে যেথায় মৌন মীনকুমারীর শঙ্খ ওঠে ফুঁকে। যেই খানে মূক মায়াবিনীর কাঁকন শুধু বাজে সাঁজ সকালে, ঢেউয়ের তালে, মাঝসাগরের মাঝে! যায় না জাহাজ যেথায়- নাবিক, পায় না নাগাল যার, লুঘ উদাস পাখায় ভেসে আঁখির তলে তার ঘুরছে অবুজ সে কোন সবুজ স্বপন-খোজার কাজে! ওরে কিশোর, দূর-সোহাগী ঘর- বিরাগী সুখ! টুকটুকে কোন্‌ মেঘের পারে ফুটেফুটে কার মুখ ডাকছে তোদের ডাগর কাঁচা চোখের কাছে তার! -শাদা শকুনপাখায় যে তাই তুলছে হাহাকার ফাঁপা ঢেউয়ের চাপা কাঁদন-ফাঁপর ফাটা বুক!   সারাটি রাত্রি তারাটির সাথে তারাটিরই কথা হয় চোখদুটো ঘুমে ভরে ঝরা ফসলের গান বুকে নিয়ে আজ ফিরে যাই ঘরে! ফুরায়ে গিয়েছে যা ছিল গোপন- স্বপন কদিন রয়! এসেছে গোধূলি গোলাপীবরণ-এ তবু গোধূলি নয়! সারাটি রাত্রি তারাটির সাথে তারাটিরই কথা হয়, আমাদের মুখ সারাটি রাত্রি মাটির বুকের পরে! চোখদুটো যে নিশি ঢের- এত দিন তবু অন্ধকারের পাই নি তো কোনো টের! দিনের বেলায় যাদের দেখি নি-এসেছে তাহারা সাঁঝে; যাদের পাই নি ধুলায় পথের-ধোঁয়ায়-ভিড়ের মাঝে- শুনেছি স্বপনে তাদের কলসী ছলকে, কাঁকন বাজে! আকাশের নীচে- তারার আলোয় পেয়েছি যে তাহাদের! চোখদুটো ছিল জেগে কত দিন যেন সন্ধ্যা-ভোরের নট্‌কান রাঙা মেঘে! কত দিন আমি ফিরেছি একেলা মেঘলা গাঁয়ের ক্ষেতে! ছায়াধূপে চুপে ফিরিয়াছি প্রজাপতিটির মতো মেতে কত দিন হায়! কবে- অবেলায় এলোমেলো পথে যেতে ঘোর ভেঙে গেল, খেয়ালের খেলাঘরটি গেল যে ভেঙে দুটো চোখ ঘুম ভরে ঝরা ফসলের গান বুকে নিয়ে আজ ফিরে যাই ঘরে! ফুরায়ে গিয়েছে যা ছিল গোপন-স্বপন কদির রয় এসেছে গোধূলি গোলাপীবরণ-এ তবু গোধুলি নয়! সারাটি রাত্রি তারাটির সাথে তারাটিরই কথা হয়- আমাদের মুখ সারাটি রাত্রি মাটির বুকের পরে।   সিন্ধু বুকে তব সুরপরী বিরহবিধুর গেয়ে যায়, হে জলধি, মায়ার মুকুর! কোন্‌ দূর আকাশের ময়ুর-নীলিমা তোমারে উতলা করে! বালুচরসীমা উলঙ্ঘি তুলিছ তাই শিরোপা তোমার,- উচ্ছৃঙ্খল অট্টহাসি-তরঙ্গের বাঁকা তলোয়ার! গলে মৃগতৃষ্ণাবিষ, মারীর আগল তোমার সুরার স্পর্শে আশেক-পাগল! উদ্যত উর্মির বুকে অরূপের ছবি নিত্যকাল বহিছ হে মরমিয়া কবি হে দুন্দুভি দুর্জয়ের, দুরন্ত, আগধ। পেয়েছি শক্তির তৃপ্তি, বিজয়ের স্বাদ তোমার উলঙ্গনীল তরঙ্গের গানে! কালে কালে দেশে দেশে মানুষসন্তানে তুমি শিখায়েছ বন্দু দুর্মদ-দুরাশা! আমাদের বুকে তুমি জাগালে পিপাসা দুশ্চর তটের লাগি-সুদূরের তরে। রহস্যের মায়াসৌধ বক্ষের উপরে ধরেছ দুস্তরকাল; তুচ্ছ অভিলাষ, দুদিনের আশা, শানি-, আকাঙক্ষা, উল্লাস পলকের দৈন্য-জ্বালা-জয়-পরাজয়, ত্রাস্তব্যথা-হাসি-অশ্রু-তপস্যা সঞ্চয়- পিনাক শিখায় তব হল ছারখার ইচ্ছার বাড়বকুন্ডে, উগ্র পিপাসার ধু ধু ধু ধু বেদীতটে আপনারে দিতেছ আহুতি। মোর ক্ষুধা-দেবতারে তুমি কর স্তুতি! নিত্য নব বাসনার হলাহলে রাঙি ‘পারীয়া’র প্রাণ লয়ে আছি মোরা জাগি বসুধার বাঞ্ছাকূপে, উঞ্ছের অঙ্গনে! নিমেষের খেদ-হর্ষ-বিষাদের সনে বীভৎস খঞ্জের মতো করি মাতামাতি! চুরমার হয়ে যায় বেলোয়ারি বাতি! ক্ষুরধার আকাঙ্খার অগ্নি দিয়া চিতা গড়ি তবু বারবার-বারবার ধুতুরার তিতা নিঃস্ব নীল ওষ্ঠ তুলি নিতেছি চুমিয়া। মোর বক্ষকপোতের কপোতিনী প্রিয়া কোথা কবে উড়ে গেছে-পড়ে আছে আহা নষ্ট নীড়, ঝরা পাতা, পুবালিকা হা হা! কাঁদে বুকে মরা নদী, শীতের কুয়াশা! ওহে সিন্ধু, আসিয়াছি আমি সর্বনাশা ভুখারি ভিখারি একা, আসন্ন-বিকাশ! -চাহি না পলার মালা, শুক্তির কলস, মুক্তাতোরণের তট মীনকুমারীর চাহি না নিতল নীড় বারুণীরানির। মোর ক্ষুধা উগ্র আরো, অলঙ্ঘ্য অপার! একদিন কুকুরের মতো হাহাকার তুলেছিনু ফোঁটা ফোঁটা রুধিরের লাগি! একদিন মুখখানা উঠেছিল রাঙি ক্লেদবসাপিন্ড চুমি সিক্ত বাসনার! মোরে ঘিরে কেঁদেছিল কুহেলি আঁধার,- শ্মশানফেরুর পাল, শিশিরর নিশা, আলেয়ার ভিজা মাঠে ভুলেছিনু দিশা! আমার হৃদয়পীঠে মোর ভগবান বেদনার পিরামিড পাহারপ্রমাণ গেঁথে গেছে গরলের পাত্র চুমুকিয়া; রুদ্র তরবার তব উঠুক নাচিয়া উচ্ছিষ্টের কলেজায়, অশিব-স্বপনে, হে জলধি, শব্দভেদী উগ্র আস্ফালনে! পূজাথালা হাতে ল’য়ে আসিয়াছে কত পান’; কত পথবালা সহর্ষে সমুদ্রতীরে; বুকে যার বিষমাখা শায়কের জ্বালা সে শুধু এসেছে বন্ধু চুপে চুপে একা অন্ধকারে একবার দুজনার দেখা! বৈশাখের বেলাতটে সমুদ্রের স্বর- অনন্ত, অভঙ্গ, উষ্ণ, আনন্দসুন্দর! তারপর, দূর পথে অভিযান বাহি চলে যাব জীবনের জয়গান গাহি।     সেদিন এ ধরণীর সেদিন এ ধরণীর সবুজ দ্বীপের ছায়া-উতরোল তরঙ্গের ভিড় মোর চোখে জেগে জেগে ধীরে ধীরে হল অপহত- কুয়াশায় ঝ’রে পড়া আতসের মতো! দিকে দিকে ডুবে গেল কোলাহল,- সহসা উজার জলে ভাটা গেল ভাসি! অতি দুর আকাশের মুখখানা আসি বুকে মোর তুলে গেল যেন হাহাকার সেই দিন মোর অভিসার মৃত্তিকার শূন্য পেয়ালার ব্যথা একাকারে ভেঙে বকের পাখার মতো শাদা লঘু মেঘে ভেসেছিল আতুর, উদাসী! বনের ছায়ার নিচে ভাসে কার ভিজে চোখ কাঁদে কার বারোঁয়ার বাঁশি সেদিন শুনি নি তাহা- ক্ষুধাতুর দুটি আঁখি তুলে অতি দূর তারকার কামনায় তরী মোর দিয়েছিনু খুলে! আমার এ শিরা-উপশিরা চকিতে ছিড়িয়া গেল ধরণীর নাড়ীর বন্ধন- শুনেছিনু কান পেতে জননীর স্থবির ক্রন্দন, মোর তরে পিছুডাক মাটি-মা, তোমার! ডেকেছিল ভিজে ঘাস-হেমন্তের হিম মাস, জোনাকির ঝাড়! আমারে ডাকিয়াছিল আলেয়ার লাল মাঠ-শ্মশানের খেয়াঘাট আসি! কঙ্কালের রাশি, দাউদাউ চিতা,- কত পূর্বজাতকের পিতামহ-পিতা, সর্বনাশ ব্যসন-বাসনা, কত মৃত গোক্ষুরার ফণা, কত তিথি, কত যে অতিথি, কত শত যোনিচক্রস্মৃতি করেছিল উতলা আমারে! আধো আলো-আধেক আঁধারে মোর সাথে মোর পিছে এল তারা ছুটে মাটির বাটের চুমা শিহরি উঠিল মোর ঠোটে-রোমপুটে! ধু ধু মাঠ-ধানক্ষেত-কাশফুল-বুনোহাস-বালুকার চর বকের ছানার মতো যেন মোর বুকের উপর এলোমেলো ডানা মেলে মোর সাথে চলিল নাচিয়া! মাঝপথে থেমে গেল তারা সব, শকুনের মতো শূন্যে পাখা বিথারিয়া দূরে দূরে আরো দূরে-আরো দূরে চলিলাম উড়ে নিঃসহায় মানুষের শিশু একা, অনন্তের শুক্ল অন্তঃপুরে অসীমের আঁচলের তলে! স্ফীত সমুদ্রের মতো আনন্দের আর্ত কোলাহলে উঠিলাম উথলিয়া দুরন্ত সৈকতে, দূর ছায়াপথে! পৃথিবীর প্রেত চোখ বুঝি সহসা উঠিল ভাসি তারক-দর্পণে মোর অপহৃত আননের প্রতিবিম্ব খুঁজি ভ্রূণ-ভ্রষ্ট সন্তানের তরে মাটি-মা ছুটিয়া এল বুকফাটা মিনতির ভরে,- সঙ্গে নিয়ে বোবা শিশু-বৃদ্ধ মৃত পিতা সূতিকা-আলয় আর শ্মশানের চিতা। মোর পাশে দাঁড়াল সে গর্ভিণীর ক্ষোভে, মোর দুটি শিশু আঁখিতারকার লোভে কাঁদিয়ো উঠিল তার পীনস্তন, জননীর প্রাণ। জরায়ূর ডিম্বে তার জন্মিয়াছে সে ঈপ্সিত বাঞ্ছিত সন্তান তার তরে কালে কালে পেতেছে সে শৈবালবিছানা, শালতমালের ছায়া। এনেছে সে নব নব ঋতুরাগ-পউষনিশির মেঘে ফাল্গুনের ফাগুয়ার মায়া! তার তারে বৈতরণীতীরে সে যে ঢালিয়াছে গঙ্গার গাগরী, মৃত্যুর অঙ্গার মথি স্তন তার বারবার ভিজা রসে উঠিয়াছে ভরি। উঠিয়াছে দূর্বাধানে শোভি, মানবের তরে সে যে এনেছে মানবী! মশলা-দরাজ এই মাটিটার ঝাঁঝ যে রে- কেন তবে দু-দণ্ডের অশ্রু-অমানিশা দূর আকাশের তরে বুকে তোর তুলে যায় নেশাখোর মক্ষিকার তৃষা! নয়ন মুদিনু ধীরে- শেষ আলো নিভে গেল পলাতকা নীলিমার পারে, সদ্য প্রসূতির মতো অন্ধকার বসুন্ধরা আবরি আমারে।   স্মৃতি থমথমে রাত, আমার পাশে বসল অতিথি- বললে আমি অতীত ক্ষুধা-তোমার অতীত স্মৃতি! -যে দিনগুলো সাঙ্গ হল ঝড়বাদলের জলে, শুষে গেল মেরুর হিমে, মরুর অনলে ছায়ার মতো মিশেছিলাম আমি তাদের সনে; তারা কোথায়?-বন্দি স্মৃতিই কাঁদছে তোমার মনে! কাঁদছে তোমার মনের খাকে, চাপা ছাইয়ের তলে, কাঁদছে তোমার স্যাঁতসেঁতে শ্বাস-ভিজা চোখের জলে, কাঁদছে তোমার মূক মমতার রিক্ত পাথার ব্যেপে, তোমার বুকের খাড়ার কোপে, খুনের বিষে ক্ষেপে! আজকে রাতে কোন্‌ সে সুদূর ডাক দিয়েছে তারে- থাকবে না সে ত্রিশূলমূলে, শিবের দেউলদ্বারে! মুক্তি আমি দিলেম তারে- উল্লাসেতে দুলে স্মৃতি আমার পালিয়ে গেল বুকের কপাট খুলে নবালোকে-নবীন উষার নহবতের মাঝে। ঘুমিয়েছিলাম, দোরে আমার কার করাঘাত বাজে! -আবার আমায় ডাকলে কেন স্বপনঘোরের থেকে! অই লোকালোক-শৈলচূড়ায় চরণখানা রেখে রয়েছিলাম মেঘের রাঙা মুখের পানে চেয়ে, কোথায় থেকে এলে তুমি হিম সরণি বেয়ে! ঝিমঝিমে চোখ, জটা তোমার ভাসছে হাওয়ার ঝড়ে, শ্মশানশিঙা বাজল তোমার প্রেতের গলার স্বরে! আমার চোখের তারার সনে তোমার আঁখির তারা মিলে গেল, তোমার মাঝে আবার হলেম হারা! হারিয়ে গেলাম ত্রিশূলমূলে, শিবের দেউলদ্বারে; কাঁদছে স্মৃতি-কে দেবে গো-মুক্তি দেবে তারে!   হিন্দু-মুসলমান মহামৈত্রীর বরদ-তীর্থে-পুণ্য ভারতপুরে পূজার ঘন্টা মিশিছে হরষে নমাজের সুরে-সুরে! আহ্নিক হেথা শুরু হয়ে যায় আজান বেলার মাঝে, মুয়াজ্জেনদের উদাস ধ্বনিটি গগনে গগনে বাজে, জপে ঈদগাতে তসবি ফকির, পূজারী মন্ত্র পড়ে, সন্ধ্যা-উষার বেদবাণী যায় মিশে কোরানের স্বরে; সন্ন্যাসী আর পীর মিলে গেছে হেথা-মিশে গেছে হেথা মসজিদ , মন্দির! কে বলে হিন্দু বসিয়া রয়েছে একাকী ভারত জাঁকি? -মুসলমানের হসে- হিন্দু বেঁধেছে মিলন-রাখী; আরব মিশর তাতার তুর্কী ইরানের চেয়ে মোরা ওগো ভারতের মোসলেমদল, তোমাদের বুক-জোড়া! ইন্দ্র প্রস্থ ভেঙেছি আমরা, আর্যাবর্ত ভাঙি গড়েছি নিখিল নতুন ভারত নতুন স্বপনে রাঙি! নবীন প্রাণের সাড়া আকাশে তুলিয়া ছুটিছে মুক্ত যুক্তবেণীর ধারা! রুমের চেয়েও ভারত তোমার আপন, তোমার প্রাণ! হেথায় তোমার ধর্ম অর্থ, হেথায় তোমার ত্রাণ; হেথায় তোমার আশান ভাই গো, হেথায় তোমার আশা; যুগ যুগ ধরি এই ধূলিতলে বাঁধিয়াছ তুমি বাসা, গড়িয়াছ ভাষা কল্পে-কল্পে দরিয়ার তীরে বসি, চক্ষে তোমার ভারতের আলো-ভারতের রবি, শশী, হে ভাই মুসলমান তোমাদের তরে কোল পেতে আছে ভারতের ভগবান! এ ভারতভূমি নহেকো তোমার, নহকো আমার একা, হেথায় পড়েছে হিন্দুর ছাপ- মুসলমানের রেখা, হিন্দু মনীষা জেগেছে এখানে আদিম উষার ক্ষণে, ইন্দ্রদ্যুম্নে উজ্জয়িনীতে মথুরা বৃন্দাবনে! পাটলিপুত্র শ্রাবস্তী কাশী কোশল তক্ষশীলা। অজন্তা আর নালন্দা তার রটিছে কীর্তিলীলা! ভারতী কমলাসীনা কালের বুকেতে বাজায় তাহার নব প্রতিভার বীণা! এই ভারতের তখতে চড়িয়া শাহানশাহার দল স্বপ্নের মণিপ্রদীপে গিয়েছে উজলি আকাশতল! গিয়েছে তাহার কল্পলোকের মুক্তার মালা গাঁথি পরশে তাদের জেগেছে আরব উপন্যাসের রাতি! জেগেছে নবীন মোগল-দিল্লি-লাহোর-ফতেহপুর যমুনাজলের পুরানো বাঁশিতে বেজেছে নবীন সুর! নতুন প্রেমের রাগে তাজমহলের তরুণিমা আজও উষার আরুণে ‌জাগে! জেগেছে হেথায় আকবরী আইন-কালের নিকষ কোলে বারবার যার উজল সোনার পরশ উঠিল জ্বলে। সেলিম, সাজাহাঁ- চোখের জলেতে এক্‌শা করিয়া তারা গড়েছে মীনার মহলা স্তম্ভ কবর ও শাহদারা! ছড়ায়ে রয়েছে তন্দ্রাবিহীন-অপলক, অপরূপ! যেন মায়াবীর তুড়ি স্বপনের ঘোরে ত্বব্ধ করিয়া রেখেছে কনকপুরী! মোতিমহলের অযুত রাত্রি, লক্ষ দীপের ভাতি আজিও বুকের মেহেরাবে যেন জ্বালায়ে যেতেছে বাতি- আজিও অযুত বেগম-বাঁদীর শষ্পশয্যা ঘিরে অতীত রাতের চঞ্চল চোখ চকিতে যেতেছে ফিরে! দিকে দিকে আজও বেজে ওঠে কোন্‌ গজল-ইলাহী গান! পথহারা কোন্‌ ফকিরের তানে কেঁদে ওঠে সারা প্রাণ! -নিখিল ভারতময় মুসলমানের স্বপন-প্রেমের গরিমা জাগিয়া রয়! এসেছিল যারা ঊষর ধুসর মরুগিরিপথ বেয়ে, একদা যাদের শিবিরে সৈন্যে ভারত গেছিল ছেয়ে, আজিকে তাহারা পড়শি মোদের, মোদের বহিন-ভাই; আমাদের বুকে বক্ষে তাদের ,আমাদের কোলে ঠাঁই কাফের যবন টুটিয়া গিয়াছে ছুটিয়া গিয়াছে ঘৃণা, মোস্‌লেম্‌ বিনা ভারত বিকল, বিফল হিন্দু বিনা মহামৈত্রীর গান বাজিছে আকাশে নব ভারতের গরিমায় গরীয়ান!                  

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>