| 30 মে 2024
Categories
অনুবাদ অনুবাদিত গল্প গল্প সাহিত্য

মান্দলার মেমসাহেব

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

অনুবাদ : আন্দালিব রাশদী

 

জন ডাইসন পাহাড়ের চূড়ায় নামলেন এবং চারদিকের দৃশ্য দেখে নিলেন। জঙ্গলের কেন্দ্রে একটুখানি ফাঁকা জায়গায় লাল ইটের রেস্টহাউস। চারদিকে যেখানে পাহাড়ের ঢাল নেমে গেছে, সেখানেই দাঁড়িয়ে গেছে  গাছ ও লতাগুল্মের উঁচু দেয়াল – লতাগাছগুলো শাখা-প্রশাখার মধ্যে মাকড়সার জালের মতো ছড়িয়ে আছে। যেদিক থেকে রাস্তা উপত্যকার দিকে নেমে গেছে সেখানটাই ফাঁকা। চোখ মেললে দেখা যায়, মাইলের পর মাইল উপত্যকা ঘন বনে ছেয়ে আছে।

মালামাল এর মধ্যে চলে এসেছে এবং বারান্দায় স্তূপ করে রাখা হয়েছে। সার্ভেন্ট কোয়ার্টারের কাছে নিজেদের পাছার ওপর বসে কুলিরা পালা করে মা টানছে। ওভারশিয়ার একটি লোহার চেয়ারে বসে তাদের সঙ্গে কথা বলছে।

সার্ভেন্ট কোয়ার্টারের হুঁক্কা পার্টি শেষ হলে ওভারশিয়ার ডাইসনের সঙ্গে দেখা করতে এগিয়ে গেল। তাকে লক্ষ করে ডাইসন বললেন, ‘চমৎকার বাগান। কে এর পরিচর্যা করে?’

‘সাহেব, একজন বুড়ো মালি আছে, পঞ্চাশ বছর ধরে বুড়ো এখানে বাস করছে – এ-বাড়ি যদ্দিন ধরে আছে, তদ্দিন মালিও এখানে কাজ করে যাচ্ছে।’

ভিড় ঠেলে একজন হাড় জিরজিরে বুড়ো এগিয়ে এসে হাতজোড় করে জন ডাইসনের সামনে মাথা নুইয়ে তাকে সম্মান জানিয়ে বলল, ‘গরিবের দয়াল আমিই মালি। পনেরো বছর বয়স থেকে আমি এই বাগানের মালি। জিন মেমসাহেব আমাকে এখানে এনেছিলেন আর এখন আমার বয়স ষাট বছর। জিন মেমসাহেব এখানেই মারা গেছেন। আমার মৃত্যু হবে এখানেই।’

‘জিন মেমসাহেব?’ ওভারশিয়ারের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মানে কটনের স্ত্রী নাকি?’

‘না স্যার, কেউ তার সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না। তিনি সমাজকর্মী শিক্ষক কিংবা মিশনারি – এ-ধরনের কিছু একটা ছিলেন। তিনি এই বাংলোটা বানিয়েছিলেন, বাচ্চাদের জন্য একটা স্কুল করেছিলেন। তারপর হঠাৎ একদিন মারা গেলেন। কেউ কিছু জানত বলে মনে হয় না। সরকার এই বাংলোটার দখল নিয়ে এটাকে বন বিভাগের অফিসারদের রেস্টহাউস বানিয়ে ফেলল।’

কুলিদের চেঁচামেচিতে এই আলোচনা বাধা পেল। তারা পালকি চেয়ারে বসিয়ে মিসেস ডাইসন ও তার মেয়ে জেনিফারকে বহন করে নিয়ে আসছে।

বাড়িটির দিকে হাত নেড়ে ডাইসন বললেন, ‘ওল্ড মিশন স্কুল। জায়গাটা মন্দ নয়, তাই না?’

ডাইসন পরিবারের সদস্যরা নীরবে চারদিক দেখে নিচ্ছে। পড়ন্ত সূর্য এই বাংলো, লন, ফুলবাগান এবং লতাগুল্মঢাকা চন্দন বন সোনালি আলোর ছটায় রাঙিয়ে রেখেছে। শান্তি ও শান্তিময় পরিবেশ। উপত্যকায় নেমে আসা মর্মরধ্বনি সন্ধ্যার নিস্তব্ধতাকে আরো স্পষ্ট করে তুলেছে।

সূর্য ডোবার আগেই ওভারশিয়ার ও কুলিদের সবাই উপত্যকায় গ্রামের পথে চলে গেল। ডাইসনরা গোছগাছ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। বেয়ারারা হারিকেন-লণ্ঠনে আলো দিতে, ডিনার টেবিল ঠিকঠাক করতে এবং বিছানায় মশারি খাটাতে লেগে গেছে। মিসেস ডাইসন জেনিফারকে নিয়ে রুমগুলো ঠিকঠাক আছে কিনা দেখছেন। বারান্দায় হাতাওয়ালা বড় বেতের চেয়ারে গায়ে টানা দিয়ে এলিয়ে পড়েছেন, পাইপ ধরিয়ে স্কচের হুকুম দিয়েছেন। তিনি দেখছেন অস্তগামী সূর্য মৌসুমি মেঘের রং বদলে দিচ্ছে – প্রথমে বার্নিশ করা সোনার রং, তারপর তামাটে লাল, কমলা, গোলাপি-সাদা এবং সবশেষে গোমরা ধূসর। গোধূলি রাতের ভেতর ডুবে যেতেই এই উষ্ণ অঞ্চলের জঙ্গলে নেমে এলো এক রহস্যময় নিস্তব্ধতা। আঁধার গাঢ় হয়ে আসার ক-মিনিটের মধ্যেই পাখিরা স্থির হয়ে গেল। এখন জঙ্গলে এক ভিন্ন ধরনের সজীবতা – ব্যাঙ ডাকছে, শেয়াল ও হায়েনা ডাকছে। ডাইসন যেখানে বসে স্কচের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছেন, সিগারেট ফুঁকছেন ঘাসের ওপর নেমে আসা জোনাকিরা প্রায় সেখানেই চলে এলো।

বেয়ারা জানাল, ডিনার তৈরি। ডাইনিং টেবিলে মোমবাতি জ্বালানো হয়েছে। বাতিদানে রাখা হারিকেনের বিবর্ণ হলদে আলো বয়স আর মৌসুমি বৃষ্টির কারণে রংহারানো দেয়ালের ধূসর প্লাস্টারের ওপর পড়ছে।

ডিনার টেবিলে তেমন কথা হয়নি। কেবল চেয়ার-প্লেট আর বিভিন্ন পদের খাবার নিয়ে আসছে-যাচ্ছে, প্লেট আর চামচের শব্দ নিপীড়নকারী নীরবতা ভাঙছে। জেনিফার বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। যখন সে বাড়িটা ঘুরেফিরে দেখছিল, বেয়ারা তখন ডাইনিং রুমে আসার আহবান জানালে তাতে বাধা পড়ে। শব্দ করে ছুরি আর কাঁটাচামচ রেখে জেনিফার উঠে পড়ে।

‘দেখো মা, দেয়ালে একটা ছবি।’

মিসেস ডাইসন কেঁপে উঠে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালেন। সিলিং থেকে মেঝেতে চুঁইয়ে পড়া পানির লম্বা দাগ ডিস্টেম্পারের রং নষ্ট করে দিয়েছে।

বাতির মিটমিটে আলোর ওঠা-নামায় দেয়ালের ওপর সৃষ্টি হওয়া নকশাগুলোকে বদলে দিচ্ছে।

কর্কশকণ্ঠে মিসেস ডাইসন বললেন, ‘জেনিফার আমাকে ভয় দেখানো বন্ধ করে নিজের খাবার শেষ করো।’

ডিনারের বাকি সময়টুকুতে নীরবে খাবার গ্রহণ করা হলো। যখন কফি সার্ভ করা হলো জেনিফারকে ততক্ষণে বিছানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মিসেস ডাইসন আরো একবার দেয়ালের দিকে তাকালেন। দেয়ালে কিছুই নেই।

‘জন, জায়গাটা আমার পছন্দ হয়নি।’

ডাইসন মন্থরগতিতে পাইপ ধরালেন, ম্যাচবাক্স দিয়ে তামাকটা পাইপে চেপে ধরলেন।

মিসেস ডাইসন আবার বললেন, ‘জন, জায়গাটা আমার পছন্দ হয়নি।’

‘তুমি তো ক্লান্ত। বরং তুমি বিছানায় চলে যাও।’

মিসেস ডাইসন বিছানায় গেলেন। কিছুক্ষণ পর তার স্বামী তাকে অনুসরণ করলেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে তিনি নাক ডাকতে শুরু করলেন।

মিসেস ডাইসন ঘুমোতে পারলেন না। মশারি টানানোর খুঁটিতে বালিশ ফেলে তাতে হেলান দিয়ে বাগানের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সে-রাতে চাঁদ ছিল না, কিন্তু আকাশ ছিল স্বচ্ছ এবং বাগানে ছিল নক্ষত্রের আবছা আলো।

সবুজ লন পেরিয়ে বন উঁচু কালো দেয়ালের মতো দাঁড়িয়ে। ব্যাঙ ও কীটপতঙ্গের ডাক, মাঝেমধ্যে পাখির তীক্ষ্ণ কিচিরমিচির, হায়েনার হাসি, শেয়ালের হুক্কাহুয়া জঙ্গলটাকে বিভিন্ন রকম ধ্বনিতে ভরে রেখেছে। এতে মিসেস ডাইসনের কপালে শীতল ঘাম জমে উঠল।

অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলে জঙ্গলের চূড়ায় মলিন চাঁদ উঠল, বিবর্ণ আভা বাগানে ছড়িয়ে পড়ল। শিশিরঢাকা লনে সাদা রঙের জাল বিছানো।

আতঙ্কের অনুভূতি ঝেড়ে ফেলতে মিসেস ডাইসন একটু হাঁটাহাঁটি করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তার খালি পায়ের নিচে ঘাস ঠান্ডা ও ভেজা। হাঁটতে হাঁটতে পেছন ফিরে দেখেন সাদা শিশির কেটে এগিয়ে আসায় পেছনে সবুজের লম্বা রেখা তৈরি হয়েছে। তিনি এমনভাবে মাথা ঝাঁকালেন যেন একটা বড় বোঝা ফেলে দিচ্ছেন; আর বেশ ক-বার গভীর নিশ্বাস নিলেন। তিনি সতেজ ও উল্লসিত বোধ করলেন।

মিসেস ডাইসন চন্দ্রালোকিত লনে বেশ কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলেন। তরতাজা ভাব ফিরে এলে বিছানায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। বারান্দা পর্যন্ত এসেই তিনি হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলেন। তার কয়েক কদম সামনে থেকে ঘাসের ওপর পায়ের ছাপ ভেসে উঠতে থাকল। অদৃশ্য পায়ের পা ফেলার চিহ্ন বাগানের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত গিয়ে জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেছে। মার্গারেট ডাইসন জ্বরজ্বর অনুভব করলেন; হাঁটু দুর্বল হয়ে আসছে, একসময় তিনি পড়ে গেলেন।

যখন তার জ্ঞান ফিরল, ভোর হয়-হয়। পাখির গানে পুরো গ্রামাঞ্চল সজীব হয়ে উঠেছে। ভীষণ ক্লান্ত মিসেস ডাইসন টেনে-টেনে নিজেকে বিছানায় নিয়ে এলেন।

বেয়ারা যখন চা নিয়ে এলো, বারান্দা দিয়ে রোদ ঢুকছে। ডাইসন সাহেব নাশতা সেরে বাইরে যাওয়ার জন্য তৈরি। লনের আরো দূরপ্রান্তে ওভারশিয়ার ও কুলিরা তার জন্য অপেক্ষা করছে।

সূর্য ডোবার কিছুক্ষণ আগে ডাইসন ফিরে এলেন। হুইস্কি ও সোডার আদেশ দিয়ে তিনি তার জুতো খোলার জন্য বেয়ারার দিকে পা বাড়িয়ে দিলেন। কয়েকটা হুইস্কি মেরে দেওয়ার পর তিনি আমুদে হয়ে উঠলেন।

‘আমরা ডিনারে কী খাচ্ছি? মুরগি-তরকারির গন্ধ আসছে। আমার ক্ষিধে পেয়েছে – খাবারের গন্ধ নিয়ে আসা বাতাসকে তো আর টলাতে পারছি না।’

ডাইসন পরিবার নীরবে ডিনার সারছে, তিনি খাবারটা খুব উপভোগ করছেন। লন ধরে হেঁটে একটি খেঁকশেয়াল প্রায় ডাইনিং রুমের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এসে হুক্কাহুয়া ডেকে উঠল। মিসেস ডাইসনের কাঁটাচামচ হাত থেকে পড়ে গেল। তার স্বামী মুখ খোলার আগেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং কর্কশ ফিসফিসানিতে বললেন, ‘জন, আমি এ-জায়গাটা পছন্দ করছি না।’

‘তোমার নার্ভগুলো ঠিক কাজ করছে না। এটা তো কেবল একটা খেঁকশেয়াল। আমি কটা গুলি করে মারব। এরা তোমাকে আর বিরক্ত করবে না। এ নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। কালরাতে তোমার ভালো ঘুম হয়েছে তো?’

‘হ্যাঁ, ধন্যবাদ।’

কথার মাঝখানে ঢুকে পড়ে জেনিফার বলল, ‘মা আমি তোমাকে লনে হাঁটতে দেখেছি।’

মিসেস ডাইসন বললেন, ‘তোমার ভাগের পুডিং শেষ করে বিছানায় যাও।’

‘কিন্তু মা, আমি তোমাকে দেখেছি। তুমি সাদা গাউন পরেছিলে, আমি ঘুমোচ্ছি কিনা তুমি মশারির ভেতর তাকিয়ে দেখলে। আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। আমি তোমাকে দেখেছি।’

মিসেস ডাইসন ফ্যাকাসে হয়ে উঠলেন।

‘বাজে কথা বলো না জেনিফার, ঘুমোতে যাও। আমার যে কোনো সাদা ড্রেসিং গাউন নেই এটা তো জানোই। মিসেস ডাইসন টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, স্বামী এসে তার সঙ্গে যোগ দিলো।

‘তোমার কি রাতে ঘুম হয়নি?’

‘আমার মোটেও ঘুম হয়নি। কিন্তু জন, আমার তো কোনো সাদা গাউন নেই আর আমি জেনিফারকে বিছানায় দেখতে যাইনি।

‘ধ্যাৎ, ও বাজে বকছে। এসো জেনিফার, পুডিংটা শেষ করে তুমি বিছানায় চলে যাও। আমি বন্দুক নিয়ে এগুলোর মধ্যে একটা শেয়াল তো মারি। তুমি খেঁকশিয়ালের চামড়ায় তৈরি ফার কোট পছন্দ করবে?’ মেকি দরদ দিয়ে ডাইসন জিজ্ঞেস করলেন।

‘না, খেঁকশেয়াল আমার পছন্দ নয়।’

ডাইসন বন্দুক তুলে নিলেন, গুলি ভরলেন, বিছানার কাছে দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখলেন। তিনি পাইপ ধরালেন, যতক্ষণ না ঘুম আসে অবিরাম কথা বলে চললেন।

স্ত্রীকে বললেন, ‘যদি খেঁকশেয়ালের ডাক শুনতে পাও, আমাকে জাগিয়ে দিয়ো।’

‘ঠিক আছে সোনা।’

ক-মিনিটের মধ্যেই ডাইসন দ্রুত ঘুমিয়ে পড়লেন।

জেনিফারও ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু মিসেস ডাইসন বিছানায় শুয়ে দুচোখ খুলে মশারির ভেতর দিয়ে লন এবং জঙ্গলের সীমানায় বৃক্ষপ্রাচীরের দিকে তাকিয়ে আছেন।

ধোঁয়াশে কুয়াশার ভেতর থেকে লম্বা সাদা ড্রেসিং গাউনের একজন নারীর অভ্যুদয় ঘটল। তার চুল দুটো বিনুনিতে বাঁধা, ঘাড়ের ওপর বিছানো। তার চেহারায় শনাক্ত করার মতো বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্য না থাকলেও তার চোখ দুটোতে এক অমানবিক উজ্জ্বলতা। মিসেস ডাইসন শীতল হয়ে আতঙ্কে পাথরে পরিণত হলেন। তিনি চিৎকার করতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু গলাচাপা গোঙানির শব্দ কেবল বের হলো। জন ডাইসন তখন অবিরাম নাক ডেকে চলেছেন। এই ছায়ামূর্তি মিসেস ডাইসনের দিকে চোখ রেখে বারান্দার দিকে এগিয়ে আসছে। ছায়ামূর্তি যখন লনের মাঝামাঝি, ভোঁ-দৌড়ে একটি খেঁকশেয়াল এসে তার মুখোমুখি দাঁড়াল। জন্তুটি মাথা উঁচিয়ে বড় করে ডাক দিলো এবং সঙ্গে সঙ্গেই অন্যরা তার সঙ্গে কোরাসে যোগ দিলো।

মিসেস ডাইসন দেখলেন তার স্বর ও গোঙানি বদলে গিয়ে উন্মত্ত আর্তচিৎকারে পরিণত হয়েছে।

হঠাৎ চমকে জন ডাইসন জেগে উঠলেন এবং দ্রুত বন্দুকের দিকে ছুটলেন। কিন্তু স্থিত হয়ে শেয়ালের দিকে তাক করার আগেই ওরা অন্যদিকে ছুটে গেল। ডাইসন একটিকে লক্ষ করে বন্দুকের ব্যারেল খালি করে ফেললেন, কিন্তু লক্ষ্যটি তার গুলির আওতার বাইরে।

ডাইসন বিড়বিড় করে নিজেকে বোঝালেন, জারজটার গায়ে লাগাতে পারিনি।

পরদিন সকালে ডাইসনদের স্নায়ু বেশি খিচড়ে আছে। ডাইসন বললেন, ‘আমি দুঃখিত লক্ষ্মীসোনা, আমি তোমাকে গতরাতে ভয় পাইয়ে দিয়েছি। আজ এগুলোকে অবশ্যই দেখে নেব।’

‘জন, তুমি কি আর কিছু দেখোনি?’

‘আর কিছু? আর কী?’

‘সাদা পোশাকের একজন নারী। তুমি যখন গুলি করলে হেঁটে-হেঁটে সোজা আমাদের দিকে আসছিল।’

‘বাজে বকো না। দুঃখিত যে, শেয়ালটাকে সই করতে পারিনি। আর তুমি নিজে ধাতস্থ হও।’

‘কিন্তু জন আমাকে তোমার বিশ্বাস করতে হবে। প্রথম রাতে লনে আমি তার পায়ের ছাপ দেখেছি।’

মিসেস ডাইসন একটু দম নিলেন, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘এসো, দেখে যাও।’

তিনি স্বামীকে লনে নিয়ে গেলেন। তখনো ঘাস দুধেল সাদা, সূর্যের আলোতে চকচক করছে। ঘাসের ওপর পায়ের ছাপ। ডাইসন পায়ের ছাপ অনুসরণ করতে করতে গাছগাছালিহীন একটি খালি জায়গায় এসে থামলেন। খোলা জায়গার ঠিক মাঝখানে একটি কবর, পুরনো জীর্ণ কবর – কোনো পাথর বসানো নেই, কোনো কিছু লেখাও নেই। এর চারদিকে শ্যাওলা গজিয়েছে। প্লাস্টারের ফাটল দিয়ে আগাছা ও ফার্নগাছ গজিয়েছে।

ডাইসন ভয় পেয়েছেন, কিন্তু নিজের স্বর বদল হতে দেননি। তিনি বললেন, ‘ধ্যাৎ, বড্ড বাজে। কথায় তা কেমন করে ফেলবে।’ যখন ওভারশিয়ার এলো, ডাইসন তাকে অফিস থেকে ডেকে পাঠিয়ে পেছনের দরজা বন্ধ করলেন।

‘সুন্দরলাল, এ-বাড়ি সম্পর্কে তুমি কী জানো?’

‘তেমন কিছু না স্যার’, তোতলাতে তোতলাতে বলল, ‘এ-নিয়ে গ্রামে অনেক কথা বলা হয়, কুসংস্কারে আচ্ছন্ন মানুষেরা তা বিশ্বাস করে। বহু বছর কেউ এই বাড়ির দখল নেয়নি। এমনকি সরকার হুকুমদখল করে বাড়িটি নিয়ে যাওয়ার পর ভারতীয় অফিসাররা এখানে থাকতে রাজি হননি। কিন্তু মালি প্রথম থেকে এখানেই আছে; মনে হয় বেশ সুখেই আছে।’

‘মালিকে ডেকে পাঠাও।’

সুন্দরলাল মালিকে ডেকে নিয়ে এলো।

‘সাহেব বাড়িটা সম্পর্কে জানতে চাচ্ছেন। যা জানো সাহেবকে বলে দাও।’

হিন্দুস্তানি ভাষায় মালি বলল, ‘আপনি গরিবের দয়াল, শুনুন। মান্দলা থেকে এসে জিন মেমসাহেব এই বাড়িটা বানিয়েছিলেন। বাচ্চাদের একটা স্কুলও করেছিলেন। খাসজমির ওপর করা ছিল বলে এ নিয়ে অনেক বছরের আইন-আদালতের পর সরকার জিতে যায় এবং বাড়িটা দখল করে নেয়।’

ডাইসন জিজ্ঞেস করলেন, ‘জিন মেমসাহেবের কী হলো?’

‘সাহেব তিনি এ-বাড়িতেই মারা যান। সরকার বাড়ি দখলে নেওয়ার পর বেগম সাহেব স্কুলটি বন্ধ করে দেন। তিনিও অসুস্থ হয়ে পড়েন। বৃষ্টির দিনে তিনি বাগানে হেঁটে বেড়াতেন, ম্যালেরিয়া বাধিয়ে বসলেন। বেশ ক-বার ম্যালেরিয়ায় ভোগার পর বেগম সাহেব মারা গেলেন। তখন কেবল তার মুসলমান বেয়ারা রিয়াজ আর আমিই উপস্থিত ছিলাম। সাহেবদের খবরটা জানাতে আমরা মান্দলা গিয়েছিলাম। কিন্তু সাহেবদের কেউ তাকে চেনেন বলে মনে হলো না। আমরা বেগম সাহেবকে এই জঙ্গলে কবর দিলাম। রিয়াজ চলে গেছে মান্দলায়, বেয়ারা হিসেবে কাজ করছে। আর আমি এখানে সরকারের সঙ্গেই রয়ে গেলাম।’

‘তার মৃত্যুর পর কজন এ-বাড়িতে বসবাস করেছেন।’

‘সাহেব একজনও না। অফিসাররা এসেছেন, চলে গেছেন। মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে গেছে – এ-বাড়িতে জিন মেমসাহেবের অভিশাপ রয়েছে। কিন্তু আমি তো পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় এখানেই বসবাস করছি, আমার কোনো ক্ষতি হয়নি।’

জন ডাইসন ওভারশিয়ার আর মালিকে বিদায় করে স্ত্রীর কাছে এলেন। নির্বিকারভাবে বললেন, ‘এখনই ওভারশিয়ার আর মালির সঙ্গে কথা বলে এলাম। এ-বাড়িতে কেউ থাকতে পারে না – এ নিয়ে বহু গল্প চালু আছে। কিন্তু মালি তো এখানে পঞ্চাশ বছর ধরে বসবাস করছে। আমিও এখানেই থাকব আর চিরদিনের জন্য ভূতের ব্যাপারটার সুরাহা করব।’

সে-রাতে ডাইসন বন্দুকে গুলি ভরে নিলেন। বন্দুকের সেইফটি ক্যাচ খুলে ফেললেন। ডিনারের পর বেশ ক-কাপ কালো কফি খেলেন। বিছানার পাশে হারিকেন বাতি রেখে আলমারিতে খুঁজে পাওয়া ব্ল্যাকউডস ম্যাগাজিনের পুরনো কপির পাতা ওলটাতে লাগলেন।

ঘরে আলো জ্বলছে এবং স্বামী জেগে আছে – এতে আশ্বস্ত হওয়ায় বালিশে মাথা রাখার পরপরই মিসেস ডাইসন ঘুমিয়ে পড়লেন।

জন ডাইসন কিছুক্ষণ পাইপ টানলেন এবং পড়লেন। তারপর আলো কমিয়ে কেবল ধূমপান।

রাতটা আগের দু-রাতের চেয়ে বেশি অন্ধকার। আকাশে মেঘ, স্যাঁতসেঁতে বাতাস বৃষ্টির আভাস দিচ্ছে। মধ্যরাতের বেশ কিছু সময় পর বিদ্যুৎ চমকালো, বজ্রপাত হলো এবং বৃষ্টি ঝরতে শুরু করল – একেবারে মুষলধারায়, গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলে যেমন হয়। বাতাস বারান্দা হয়ে মশারির ভেতর পর্যন্ত হালকা শীতল ছটা ছড়িয়ে দিলো। বিজলি আর বজ্রপাতের মধ্যে মিসেস ডাইসন ও তার মেয়ে বেশ ঘুমিয়ে আছে। শীতল বৃষ্টি ও বাতাসের ছটায় জন ডাইসনেরও চোখ লেগে আসতে চাইছে। তিনি ঝিমুতে-ঝিমুতে বালিশে হেলান দিয়ে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন।

একটি খেঁকশেয়াল বারান্দার কাছাকাছি এসে ডাক দিয়ে উঠল। ঝাঁকুনি খেয়ে ডাইসন জেগে উঠলেন। ঠিক তখনই টিমটিম করে জ্বলে উঠে বাতিটা নিভে গেল। মশারির বাইরে তার পায়ের কাছে একটি মনুষ্যমূর্তি চোখে পড়ল। একজোড়া উজ্জ্বল চোখ তার ওপর দৃঢ় চাহনি ফেলেছে। হঠাৎ আলো ঝলসে উঠতে তিনি দেখলেন সাদা পোশাকের নারী, কাঁধের ওপর দুই বিনুনি। বিজলি চমকের পরপর বজ্রপাত তাকে কাঁপিয়ে সক্রিয় করে তুললো। আতঙ্কে চিৎকার দিয়ে তিনি বিছানা থেকে লাফিয়ে বিছানার পাশের নারীমূর্তির ওপর থেকে বৃষ্টি না সরিয়ে বন্দুক খুঁজতে থাকলেন। বন্দুকের বাঁট ধরে হন্যে হয়ে ট্রিগার হাতড়ালেন।  গুলির দুটি জোর শব্দ শোনা গেল। ডাইসন লুটিয়ে পড়লেন, গুলি তার মুখেই বর্ষিত হয়েছে।

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত