পরবাসে

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

“চাচা…, চা…চা!”
চারপাশের কোলাহল ভেদ করে কণ্ঠটা ঠিকই পৌঁছে যায় শরীফ খানের কানে। আগ্রহে মাথাটা একটু বাড়িয়ে ভিড়ের মধ্যে চোখ ফেলতেই দেখতে পান হাজীদের ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে প্রায় ছুটতে ছুটতে আসছে সাদমান, তার আদরের সাদি। এক পলকে চোখের সামনে অনেক বছর আগের একটা দৃশ্য খেলে গেলো। ভরা বর্ষায় প্রায় বিল বনে যাওয়া মাঠে সাবধানে পা ফেলে তিনি এগোচ্ছেন তাদের গ্রামের বাড়ির দিকে, আর পাঁচ-ছয় বছরের সাদি উজ্জ্বল হাসিমুখে জোর কদমে পানি ছিটাতে ছিটাতে ছুটে আসছে তার দিকে, চাচা আসছে-চাচা আসছে চিৎকারে মাছ শিকারী পানকৌড়িদের চমকে দিয়ে।

আজও তেমনি মুখ ভরা হাসি নিয়ে সামনে এসে থামলো সাদি, হাঁপাচ্ছে একটু। হাতের ব্যাগটা নামিয়ে রেখে যেন চাচাকে জড়িয়ে ধরতে এগিয়েও একটু থমকে আগে কদমবুসি করার জন্যে নিচু করলো মাথা, তার আগেই শরীফ খান তাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। টের পেলেন পিছনে শক্ত হাতে তাকে আঁকড়ে ধরা সাদি যেন কাঁপছে একটু একটু।
শব্দের চেয়ে স্পর্শ কখনো কখনো বেশি বাঙময় হয়। দেশে মা, ছোট বোন আর ভাইকে রেখে তিন বছর আগে সৌদিতে আসা সাদির একাকিত্বের কষ্টটুকু যেন কয়েক মুহূর্তেই তার হাতের শক্ত বাঁধনের ফাঁক গলে শিরায় শিরায় বেয়ে পৌঁছে গেলো চাচার কাছে। শরীফ খান ঠিক ঠিক অনুভব করেন, স্বজনের স্পর্শের জন্য কেমন উতলা হয়ে ছিলো সাদি! ছোটবেলায় যেমন চাচার কোল থেকে নামতেই চাইতো না, আজও তার সহজে ছাড়ার ইচ্ছা নেই হাতের বাঁধন। আশেপাশের পথচলতি হাজিদের দিকে তাকিয়ে একটু অস্বস্তি লাগছিলো তার, সাদিকে হালকা করে ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলেন, “বেটা, কেমন আছিস! শুকায়ে গেছিস যে, খেতে পাস না ঠিকমতো? না খেয়ে টাকা পাঠাস নাকি দেশে!”
সাদি উত্তর দেয় না। হাসে, ওর চোখ কেমন ভেজা ভেজা দেখায়। চাচা ওকে নানান প্রশ্ন করেন, সে উত্তর দেয় অল্প কথায়, হাসে বেশি, চাচাকে তাকিয়ে তাকিয়ে শুধু দেখে আরো বেশি। তিন বছর কোনো স্বজনকে না দেখার আক্ষেপ আজ যেন সে চাচার মুখের প্রতিটি রেখা পর্যন্ত মুখস্থ করে ভুলতে চায় ।
“জোহরের ওয়াক্ত হয়ে গেলো রে সাদি। চল্‌ দেখি, তোর ব্যাগটা আমার রুমে রেখে নামাজ পড়তে যাই। কী এতো আনছিস রে?”
“আপনার ব্যাগে জায়গা রাখছেন তো চাচা?” একটু উৎকণ্ঠা ফুটে ওঠে সাদির গলায়, “বলছিলাম না, বাড়ির জন্য কিছু জিনিস দিবো।‘ চাচা তাকে আশ্বস্ত করে হাসেন, আছে জায়গা। তারপর বলেন, “তোর মা-ও তো তোর জন্য কাপড় পাঠিয়েছে, আচার পাঠিয়েছে।“ সাদির মুখ উজ্জ্বল হাসিতে ভরে ওঠে।
হোটেলে ঢোকার মুখটায় বেশ ভিড়। হোটেল ছাড়ছেন একদল হাজি, রাস্তায় দাঁড়ানো কয়েকটি বাসে লাইন করে উঠে যাচ্ছেন। ভিড়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় চাচা টের পান সাদি একহাতে তার কনুইয়ের কাছটায় ধরে রেখেছে। ছোটবেলায় ঈদগাহে নিয়ে গেলে সে একটু ক্ষণের জন্যও হাত ছাড়তে চাইতো না। আজ এই ভিড় দেখে কি সেই হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতি ফিরে এসেছে তার মনে? নাকি এ শুধুই স্পর্শের আকাঙ্খা! এই বিদেশে, সব আত্মীয় স্বজন ছেড়ে এতো দূরে একা একা কিভাবে আছে ছেলেটা! কেবল বাইশ বছর বয়স। বাচ্চাই বলা যায়।

হোটেলের রিসেপশনে এক লম্বা আরবীয়, মাথায় বাহারী পাগড়ি বাঁধা, বিরক্ত মুখে মোবাইলে স্ক্রল করছে। মুখ তুলে একবার তাদের দিকে তাকালে সাদি চাচার হাত আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরে। এই সৌদিরাই এই দেশে তার খাওয়া পরার মালিক, চাচার মনে হলো তাদের সম্পর্কে সাদীর মনোভাবটা ঠিক যেন আরামদায়ক নয়। একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে তার। ছেলেটাকে তারা সব ভাইরা মিলে খরচ দিয়ে দেশে একটা কিছু ব্যবস্থা করে দেওয়া কি যেতো না! অসময়ে ভাই মারা যাওয়ার পর চাচা হিসাবে দায়িত্ব পালনে তারা কি গাফিলতিই করে ফেলেছেন! দেশে থাকতে এতোদিন মনে হয়নি কথাটা। তখন ভেবেছিলেন, যাক না, এই তরুণ বয়সই তো কাজ করার সময়। ভাগের জমিটা বেচে সৌদি এসে যদি পরিবারটাকে টেনে তুলতে পারে মন্দ কী! এখন, একটা মাস এই ধূ ধূ বালির দেশে কাটিয়ে আর আজ এখানে এই অচেনা মানুষদের ভীড়ে সাদির খানিক দিশেহারা মুখটা দেখে মনে হচ্ছে কাজটা বোধহয় ঠিক হয়নি!

হোটেলের এক ঘরে বাংলাদেশের চারজন আছেন শরীফ খানেরা। এখন কেউ নেই, বোধহয় নামাজ পড়তে বেরিয়ে গিয়েছেন। কাবা শরীফে নামাজ পড়ার সুযোগ একবেলার জন্যেও ছাড়েন না কেউ। আর আজ তো শেষ দিন মক্কায়। বিকালেই তাদের বাস ছাড়ার কথা জেদ্দার উদ্দেশ্যে। আহ! দেশে ফিরবেন! মনটা খুশি হয়ে উঠতে উঠতেই সাদির কথা ভেবে আনন্দটা নিভে গেলো। আহা ছেলেটা কবে যেতে পারবে দেশে! উত্তরটা কেমন হবে জানেন তবুও জিজ্ঞেস করেন তিনি, ‘কবে যেতে পারবি রে দেশে?’ চাচার দেখিয়ে দেওয়া চৌকিতে হাতের ব্যাগটা নামাতে নামাতে একটা শুকনো হাসি দিয়ে বলে সাদি, ‘দেশে যাওয়ার টাকা কই চাচা? জমে না তো কিছু!’

‘না না, একটু করে জমা। ওদিকে চলে যাবে একরকম, আমরা আছি না!… না সত্যি, তুই টাকা জমায়ে দেশে চলে আয়। ওইখানেই একটা কিছু ব্যবস্থা করা যাবে।‘

সাদি কৃতজ্ঞ চোখে খানিক তাকায়, তারপর বলে, ‘চাচা আমার আচার? মা পাঠাইছে বললেন!”
‘তর সইছে না, তাই নারে?’ চাচা হাসতে হাসতে বলেন, ‘আগে চল নামাজে, পরে দেবোনি। কাগজ দিয়ে টেপ দিয়ে মোড়ানো একদম, একবারে বাসায় গিয়ে খুলিস …’
নামাজ শেষে সাদি তেমনি চাচার হাত ধরে হাঁটে। ভীড়ও খুব। হাজার হাজার হাজি নামাজ পড়তে এসেছেন কাবায়। কতো দেশের মানুষ। কতো রকমের ভাষা শোনা যাচ্ছে আশেপাশে। দেখতে দেখতে সাদি বলে, ‘হজ্বটা এখনো করতে পারলাম না চাচা, ওমরাহ করে গেছি একবার।‘
‘করিস, দেশে ফেরার আগে করে নিস। তোর বাস কখন সাদি?’

সাদি মক্কার কাছেই আল সাইদাহ শহরে থাকে। একটা মসজিদে ক্লিনারের কাজ করে। চাচার সাথে দেখা করবে বলে আজ ছুটি নিয়েছে। সাদি জানায় তার বাস বিকালেই, চাচা রওনা হলেই সেও যাবে। হঠাৎ সামনে এক বোরকা ঢাকা মহিলা এসে দাঁড়ায়, ‘হাজি হাজি?’ প্রশ্ন করতে করতে সে হাতের কাগজের প্যাকেটটা এগিয়ে দেয় ওদের দিকে। সাদি বিব্রত হয়ে মাথা নাড়ে কিন্তু মহিলাটি আবারো বলে ওঠে, ‘হাজি, তওফা তওফা! রুফাইদা!’

গত কিছুদিনে শরীফ খান এই দৃশ্যের সাথে পরিচিত হয়ে গিয়েছেন। এখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা প্রায়ই হাতে নানা জিনিসপত্র, ফল, বিরিয়ানি কিংবা জুসের প্যাকেট নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, সামনে যাকে পায় তার হাতেই ধরে দেয়। এসব তাদের উপহার। না নিলে তারা আন্তরিকভাবেই দুঃখিত হয়। তাই শরীফ খান শুকরিয়া শুকরিয়া বলতে বলতে হাত বাড়িয়ে প্যাকেটটা নিয়ে নেন। মহিলাটিও খুশি খুশি কণ্ঠে কী যেন একটা বলে চলে যায়। প্যাকেটের ভিতর বেশ কিছু নাশপাতি, খেজুর, আরো কী সব ফল। শরীফ খান প্যাকেটটা সাদির দিকে বাড়িয়ে দেন, ‘নে তুই, বাড়ি গিয়ে খাস।‘ সাদিও একনজর দেখে আবার চাচার দিকেই ঠেলে দেয়, ‘চাচা এইটা আপনি দেশে নিয়ে যান। নাফিসা-আদনান, ওদের যদি দিতে পারেন।‘
চাচা হাসেন, ‘দূর গ্রামে যেতে দেরি আছে। ততোদিনে নষ্ট হয়ে যাবে। আর খেজুর তো আমি নিচ্ছিই সবার জন্যে। তুই খা এগুলো।‘
সাদির মনটা একটু খারাপ হয়ে যায়। ইশশ, এতোগুলো ফল! কী খুশি হতো ছোট ভাইবোন দুটো, মা! সে বাড়ির সবার জন্য জামাকাপড় কিনে এনেছে, চাচার হাতে পাঠাবে বলে। কিন্তু ফল সে কেনেনি।
‘চাচা, একটা স্মার্টফোন কিনছি মা’র জন্য। আপনার কাছে দিবো, মাকে দিয়েন।‘
‘ফোন কিনছিস ভাবীর জন্য? বাহ!’
‘স্মার্ট ফোন চাচা। বাড়ির ফোনটায় তো ভিডিও কল করা যায়না। এইবার চাচা কল দিয়ে সবাইকে দেখতে পারবো। আদনানরে বলছি, ভিডিও কল দিয়ে আমারে গোটা বাড়ি ঘুরায়ে দেখাতে। কতোদিন বাড়ি দেখিনা!’ এমন একটা আকুলতা ফোটে সাদির গলায়, চাচা ওর মুখের দিকে না তাকিয়ে পারেন না। আহা বেচারা! বলেন, ‘আমি গিয়েই ভিডিও কল দিয়ে তোকে গোটা বাড়ি ঘুরায়ে দেখাবো।‘
‘উত্তরের পুকুর পাড় পর্যন্ত দেখায়েন চাচা। আর…আর…’ সাদি একটু থামে, দ্বিধা করে বলতে।
শরীফ খান বুঝতে পারেন। নরম গলায় বলেন, ’তোর বাবার কবর তো? দেখাবোনি!’
সাদি শুধু মাথা নাড়ে, কিছু বলতে পারেনা আর।
হাঁটতে হাঁটতে সাদি দেশকে অনুভব করতে থাকে চাচার মাঝে। ইচ্ছা হয়, কী যে দুর্বার ইচ্ছা হয় চাচার সাথে চলে যাওয়ার। দীর্ঘশ্বাসটা তবু সে চেপে রাখে। চাচাকে শুনতে দেওয়া যাবে না! সে হাসিমুখে তাদের শহরের, তাদের মসজিদের গল্প করে। আর দেশের চেনা মানুষদের খোঁজ নেয়।
খেয়ে নিতে হবে। চাচা সাদিকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে ঢোকেন। বেশ ভীড়। প্যাকেটে করে খাবার নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে অনেকেই। বসার জায়গা নেই দেখে ওরাও নান রুটি আর কাবাব কিনে বেরিয়ে আসে, সাথে ফলের রস। বিরানি কিনতে চেয়েছিলেন চাচা, প্রচণ্ড গরমে সেসব খাওয়ার ইচ্ছা হলো না সাদির।
দুজনে মিলে একটা বেঞ্চে বসে খায়।দেশের খাবারের জন্য আজ সাদির বেশি মন কাঁদে। তার এইসব রুটি খেতে ইচ্ছা করেনা। মায়ের হাতের ভুনা খিচুড়ি বেগুন ভাজা দিয়ে খেতে মন চায়। সে খেতে খেতে চাচার গা ঘেঁষে বসে। চাচার ছোঁয়া যেন দেশেরই ছোঁয়া। সে খায় আর ঘড়ি দেখে। সময় কেটে যাচ্ছে দ্রুত। চাচার বিকালে বাস। তাকেও বাস ধরতে হবে। আর কতোক্ষণ সে দেশের স্পর্শ নিতে পারবে গায়ে মেখে?
‘সাদি’, চাচা ডাকেন, ‘কেমন থাকিস রে এখানে?’
আশ্চর্য! দেশে থাকতে প্রশ্নটা এভাবে মনে আসেনি কখনো, আজ বারবার মনে হচ্ছে। গতকাল একটা দোকানে আতর কিনতে গিয়েছিলেন। সেখানে সেলসম্যান একটা বছর ত্রিশের যুবক; কিভাবে যে বুঝতে পারলো, তার মুখের দিকে তাকিয়ে গভীর আগ্রহে বললো, ‘চাচা বাংলাদেশ থেকে?’ তিনি হ্যাঁ বলতেই ছেলেটি চওড়া একটা হাসি দিয়ে বলেছিলো, ‘হজ্বের সময়টা খুব ভালো লাগে চাচা, দেশের কত্তো মানুষ আসে!’
দেশের হাজার হাজার মানুষ এই সৌদিতে নানারকম কাজ করছে। তবু কিছুদিন এখানে থাকলেই বোধহয় তাদের গা থেকে দেশের সেই মাটি মাটি গন্ধটা হারিয়ে যায়। তাই হয়তো সদ্য দেশ থেকে আসা মানুষগুলোকে দেখলে এরা খুশি হয়ে ওঠে। সাদিও কি তেমনি সবসময় দেশকে খোঁজে!
চাচার প্রশ্ন শুনে সাদি মাথা নাড়ে। একবার বলতে ইচ্ছা করে, ভাল না, একদম ভাল লাগেনা এখানে। বাড়ির সামনের নিচু ধানের জমিটার পাড়ে উবু হয়ে বসে সকালে দাঁতে মাজন করতে মন চায়, বিকালে সাইকেল চালিয়ে চৈতালীর বিলের শুকনা মাঠে ফুটবল খেলতে যেতে মন চায়। ইচ্ছা করে ছোটবোনটার জমিয়ে রাখা আচার চুরি করে খেতে, সন্ধ্যার অন্ধকারে হাতে মাছ ঝুলিয়ে হাট থেকে ফিরতে, জৈষ্ঠ্যের চাঁদি ফাটা গরমে উঠোনের মাচায় রাতভর শুয়ে গা জুড়াতে। কিন্তু চাচাকে সেসব আর বলেনা সে। চাচা যদি মাকে বলেন তার মন খারাপের কথা, মায়ের আরো বেশি খারাপ লাগবে। তাই সে হাসিমুখে বলে, ‘ভালোই আছি চাচা। টাকার একটু টানাটানি যায়। জমাই বেশি, খরচা করি কম। এই আর কি।‘
‘না, না, নিজের যত্ন নিস। এখানে তোর অসুখ করলে দেখবে কে রে!’

সময় বয়ে যাচ্ছে। দুজনের এইভাবেই বসে থাকতে ইচ্ছা করছে সারাবেলা। কিন্তু ফিরতেই হয় হোটেলে। সময় বেশি নেই হাতে। হোটেলে ফিরেই সাদি মায়ের পাঠানো কাপড়টা আর আচারের বোয়ামটা বুকে জড়িয়ে রাখে অনেকক্ষণ। ওর আনা জিনিসগুলো চাচাকে বুঝিয়ে দেয়। মায়ের জন্য সুন্দর একটা ওড়না, বোনের কামিজের আর ছোট ভাইটার জন্য শার্টের কাপড় আর সানগ্লাস, আরো এটা সেটা কিছু জিনিস, আর মোবাইলটা। বোনের জন্য আনা চেনটা দেখিয়ে বলে, ‘চাচা, চেনটা দেওয়ার আগেই বলে দিয়েন, ইমিটেশন, সোনার না। নাইলে আবার মনে করবে সোনার।‘ একটু থেমে সে যোগ করে, ‘আরেকটু টাকা জমলে সোনার গয়নাও কিনবো। মা বলছে, নাফিসার বিয়ের গয়না একটু একটু করে কিনতে।‘
সাদির উপর পরিবারের প্রত্যাশার চাপটা কতখানি, এইবার ভালো করে বোঝেন চাচা। বেচারা সহজে যেতে পারবেনা এদেশ ছেড়ে। বোনটার বিয়ে, ছোট ভাইটা পড়ছে। সাদির সব চাচা ফুফুরই নিজেদের ছেলেমেয়েরা আছে, তারাই বা কতো দেখবেন! একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ে তার। আরেকটু বিত্তশালী হলে কী এমন ক্ষতি হতো! সাদি বসে বসে মলিন মুখে চাচার ব্যাগ গোছানো দেখে। আহ্‌, ঘড়ির কাঁটা এতো ঝটপট এগোয় কেনো! ওর হাতের ফাঁক গলে যেন প্রিয় মুহূর্তগুলো বেরিয়ে যাচ্ছে। আবার কবে পাবে কোনো প্রিয়জনকে এমনভাবে পাশে, এতো কাছে!
মলিন মুখ দেখে চাচা বোঝেন ওর বেদনা। বলেন, ‘আমরা সবাই মিলে টাকা তুলে তোকে পাঠাবো, দেশে ঘুরে যাস।‘
সাদি হাসে। তাকিয়ে তাকিয়ে চাচার মুখ দেখে, দীর্ঘশ্বাস লুকায়। চাচা সাদির জন্য পাঞ্জাবির কাপড় কিনে রেখেছেন, সেইটা বের করে দেন। একসময় বেরোতে হয় রুম থেকে। দলের অন্যেরাও চলে এসেছে, শেষবারের মতো ঝটপট দেখে নিচ্ছে সব ঠিকমতো নেওয়া হলো কিনা। সাদির খুব ইচ্ছা করছিলো চাচাকে আরেকবার জড়িয়ে ধরতে, ঘরের অন্যদের দিকে তাকিয়ে তার লজ্জা করে, প্রাণপণে চেপে রাখে ইচ্ছাটা।

বাস ছাড়তে খানিক দেরি হলো। মুয়াল্লেমের লোকেরা হাতে লিস্ট নিয়ে মিলিয়ে দেখছিলো, যাদের যাওয়ার কথা এই বাসে সবাই হাজির কিনা। একজন এখনো আসেনি। শুনে কয়েকজন বিরস মুখে বিরক্তি প্রকাশ করে, সাদির কিন্তু খুব খুশি লাগে। বাসের একটু দূরে চাচার গা ঘেঁষে সে দাঁড়িয়ে থাকে। এখন দুজনেই চুপ। শুধু অনুভব। চাচা অনুভব করেন সাদির কষ্ট কিভাবে তাকেও ছুঁয়ে যাচ্ছে। সাদি অনুভব করে ওর শুধু ইচ্ছা করছে দেশে ফেরার, দেশে ফেরার! কিন্তু না, তাকে তো থাকতেই হবে। আরো রিয়াল জমাতে হবে তাকে, আরো অনেক রিয়াল! তাকে দেশে টাকা পাঠাতে হবে!
যে লোকটার জন্য অপেক্ষা, তার সাথে ফোনে কথা হয়েছে মুয়াল্লেমের। কাছাকাছি চলে এসেছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে। বাসের সুপারভাইজার তাই এখনো যারা বাসে উঠেনি সবাইকে তাড়া দিতে থাকে উঠে বসার জন্য। আরেকবার মিলিয়ে নেবে তারা যাত্রী তালিকা, তারপর আর কাউকে নামতে দেবেনা। চাচাকে ডেকে কেউ একজন যখন বলে, আসেন আসেন উঠে পড়েন…সাদি হঠাৎ চমকে উঠে চাচার হাত ধরে ফেলে। তার আকুল মুখের দিকে তাকিয়ে চাচাও কিছু বলতে পারেন না কিছুক্ষণ । তারপর বলেন, ‘তুই যা তাহলে সাদি, তোর বাস না আবার ফেল করিস। সেই বাস ধরতে অন্যদিকে যেতে হবে বলছিলি?’
সাদি মাথা নাড়ে, কিন্তু চাচার হাত ছাড়েনা। গলা বুঁজে আসে, কিছু বলতে পারেনা সে। চাচাকে আবার কে যেন ডাকে, এবার চাচা নিজেই সাদিকে জড়িয়ে ধরেন। যেন এরই অপেক্ষায় ছিলো সাদি, হাতের শক্ত বাঁধনে চাচাকে জড়িয়ে এবার সে তার কষ্ট করে মুখে গেঁথে রাখা নির্লিপ্ততার মুখোশটার কথা একেবারে ভুলে যায়। প্রাণপণে আটকে রাখা কষ্টস্রোতের বাঁধ ভেঙ্গে যায়। মুহূর্তের মধ্যেই চাচা বুঝতে পারেন সাদি কাঁদছে। সে কান্না বুক ভাঙ্গা, সে কান্না আসছে হৃদয়ের কোন্‌ গভীর থেকে। সে কান্না অনেক অনেক দিনের জমানো কষ্টের। কান্না চাপার চেষ্টা নেই আর, হু হু শব্দে চারপাশের সবাইকে সচকিত করেই সাদি কাঁদছে।

চাচার চোখেও পানি, মোছার কথা মনে পড়েনা। খানিকক্ষণ কাঁদতে দেন সাদিকে।তারপর মৃদু স্বরে বোঝাতে থাকেন, কিছু একটা ব্যবস্থা করে ওকে নিশ্চয়ই দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন তাড়াতাড়ি। বলেন, এখন তাকে যেতে হবে। এখন সাদিকেও যেতে হবে, তারও বাসের সময় হয়ে গিয়েছে। সাদির কান্না তবু থামেনা। বাসের প্রায় সবাই উঠে গিয়েছে। তার দিকে তাকিয়ে ইশারায় তাড়া দিচ্ছে একজন। সাদিকে সরাতে গিয়ে চাচারও বুক ভেঙে যায় তবু নিষ্ঠুর হতেই হয়, জোর করেই একটু সরিয়ে দেন। পাঞ্জাবির পকেট থেকে রুমাল বের করে ছেলেটার চোখ মুখ মুছে দেন। ঠিক ছোটবেলায় মায়ের বকা খেয়ে তার কাছে এসে কাঁদলে যেভাবে চোখ মুছে দিতেন, সেভাবেই। সাদি এবার নিজেই চোখ মুছতে মুছতে লজ্জার সাথে হাসে একটু। বিব্রত স্বরে বলে, ‘চাচা, মাকে যেন বলেন না…’, বলতে বলতে আবার সে কাঁদে। আবার চোখ মোছে।

‘তুই দেশে চলে আসিস সাদি, আর থাকতে হবেনা’, আবার বলেন চাচা, তারপর দুহাতে শক্ত করে সাদির কাঁধ চেপে ধরে বলেন, ‘এইবার তুই যা, তুই গেলে পরে আমি বাসে উঠবো।‘
‘চাচা, জিনিসগুলা মনে করে…’
‘হ্যাঁ রে হ্যাঁ, মনে করে সব দিবো। যা এখন, তোর বাস পাবিনা পরে।‘
সাদি চায় চাচা বাসে উঠলে তারপরে সে যাবে। কিন্তু চাচা বলেন, না, আমি আগে উঠলে তুই আর যাবিনা জানি। আগে তুই যা। চাচা আরেকবার তাকে একটু জড়িয়ে ধরে পিঠে একটু হাত বুলিয়েই ছেড়ে দেন। সাদি খানিক এগিয়ে হাতের বাঁয়ে একটা মোড়ে ঢোকার আগে একটু দাঁড়ায়। দুজনেই হাত নাড়ে, দুজনেই কান্না লুকিয়ে একটু হাসে। তারপর সাদি মোড়ের ওপাশে হারিয়ে যায়।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাসে উঠে বসেন চাচা। জানলার পাশেই ওনার সিট। সেখানে বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই দেখেন, সেই মোড়টায় সাদি এসে দাঁড়িয়েছে আবার। তাকিয়ে আছে তার দিকেই কী করুণ এক দৃষ্টিতে! নিঃসঙ্গ এই দেশে তার একমাত্র স্বজনকে যতক্ষণ দেখা যাবে সে হয়ত দেখতে চায়। চাচা তাকাতেই বিব্রত হয়ে একটু হাসে সে। বাস থেকে এখন আর নামা যাবেনা। চাচা হাত ইশারায় আর মুখ নেড়ে বারবার বলেন সাদিকে চলে যেতে। শেষ বাসটা ধরতে না পারলে খুব মুশকিল হবে সাদির। সাদি একটু হাত নেড়ে ঘুরে চলে যায় আড়ালে। তবু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চোখ সরান তিনি।

খানিক পরে, বাসটা যখন স্টার্ট দিচ্ছে, চাচা চমকে দেখেন সাদি যায়নি, আরেকটু দূরের এক দোকানের আড়ালে দাঁড়িয়ে মুখ বের করে আবার সে বাসের দিকেই তাকিয়ে আছে। এখান থেকেও বোঝা যাচ্ছে, সে কাঁদছে। বাস চলতে শুরু করেছে। সাদি বাচ্চাদের মতো আকুল হয়ে কাঁদছে আর বারবার চোখ মুছছে। চাচার চোখ থেকেও পানি গড়িয়ে সেই দৃশ্যটাকে ঝাপসা করে দেয়।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত