Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

বাবা স্মরণে

Reading Time: 3 minutes

কোনোরকম পূর্বাভাস ছাড়া, এমনকি কাছে-দূরের সকলের সাধারণ ধারণাকে ধূলিসাৎ করে দিয়ে আমার এসএসসি পরীক্ষার ফল ভালো হয়ে গিয়েছিল। আমি বরাবর সাধারণ অপেক্ষা নিম্ন মানের ছাত্রী হিসেবেই পরিচিত ছিলাম। মেধাবী শব্দটি আমার নামের আগে ছিল একেবারেই বেমানান। সঙ্গত কারণেই সে সময়ের দৃষ্টিকোণে ঘটনাটি গ্রামের ক্ষুদ্র পরিসরে কিছুটা আলোড়নও তুলেছিল। বাবার এক জ্ঞাতি চাচা (পাকিস্তান আমল ও স্বাধীন বাংলাদেশেরও মুসলিম লীগের প্রাক্তন এমপি, গ্রামের একমাত্র সর্বোচ্চ শিক্ষিত ও একমাত্র ঢাকায় বসবাসকারী) আমার পরীক্ষার ফল শুনে আব্বাকে বললেন মেয়েকে ঢাকায় ভর্তি করাতে। পূর্ব ইতিহাস ছিল, আমার দাদার বাবা তাঁর ছেলেকে পড়াশোনা করার জন্য কোলকাতায় পাঠিয়েছিলেন কিন্তু সে পাঠ সম্পন্ন করা হয়নি। তিনি ঘোড়ায় চড়ে পাঠশালায় যেতে পছন্দ করতেন। তাতে ঘোড়ারোগের পাঠ যেমন হয়, তেমনই হয়েছিল। ছোটবেলায় পিতৃহারা হওয়ায় আমার বড় চাচা নিজে খুব বেশি লেখাপড়া করতে না পারলেও সন্তানতুল্য আমার আব্বাকে পঞ্চাশ/ষাটের দশকে পাঠগ্রহণের নিমিত্তে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন। তবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি বেশি মনোযোগী হওয়ায় তিনিও পাঠ সম্পন্ন করতে পারেননি। অতএব সঙ্গত কারণেই ঢাকায় পাঠিয়ে আমার যে পাঠ সম্পন্ন হবে, একথা কেউই সমর্থন করেনি। কেবল সেই এমপি দাদার প্রেরণা আর বাবার উদ্যোগে পিতৃ-অধিক বড় চাচা অনেক উৎসাহ নিয়ে উচ্চশিক্ষার নিমিত্তে আমাকে ঢাকায় এনে সেই দাদার বাসায় দিয়ে গেলেন।

প্রথম রাজধানী শহর ঢাকা দর্শন। শুরু হলো ঢাকার শিক্ষাজীবন। হঠাৎ ফলাফল ভালো করে ফেলায় এর বিশাল দায়ভার বহন করা বেশ কঠিন ও দুঃসাধ্য ঠেকতে লাগল। তদুপরি অনেক প্রতিকূলতার বিপরীতে ঢাকায় ভর্তির বাবার একক সিদ্ধান্তের প্রতি অনেক বেশি কৃতজ্ঞ ও শ্রদ্ধাশীল ছিলাম। সাথে ছিল বিভিন্ন সময়ে লেখা বাবার প্রেরণাদায়ক চিঠি। সেসব চিঠির বিষয়বস্তুর মধ্যে থাকত সিএসপি ও বিসিএসের কথা, থাকত সোহরাওয়ার্দী পরিবারের আটজন ডক্টরেট ডিগ্রিধারীর কথা, বাংলাদেশের প্রথম মহিলা ডক্টরেটের নাম। এ সমস্ত কিছু একত্র হয়ে যেন আমাকে পেছন থেকে চাবুকতাড়িত করতে লাগল। সবকিছুর মধ্যে কোনো সরল সমান্তরাল ভারসাম্য না হওয়ায় যা হবার তাই হলো। প্রচণ্ড আন্তরিকতা থাকা সত্ত্বেও এইচএসসির ফলাফল আশানুরূপ হলো না। যে যেমনই বলুক, আব্বার সামনে যেন কিছুতেই যেতে পারছিলাম না, দাঁড়াতে পারছিলাম না। তার চেয়েও বড় কথা, মনে হচ্ছিল আব্বাকে আমি অনেক ছোট করে ফেলেছি। এ মর্মযাতনা আমাকে কুড়ে কুড়ে নিঃশেষ করতে লাগল। আব্বা আমাকে কিছুই বললেন না। এই না বলাটাই যেন অদৃশ্য শক্তি হয়ে আমাকে চারপাশ থেকে আরও বেশি জাপটে ধরল।

আমাকে শুধু আমিই বললাম, আমার মুক্তি নেই যদি আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হতে না পারি। সেদিনের সেই আমিকে আমি ছাড়া আর কেউ দেখেনি। এ দেখা সম্ভব হয়েছিল আমাকে নিয়ে আমার বাবার নিষ্কলুষ, নিঃস্বার্থ আর নিষ্পাপ আকাঙ্ক্ষার স্বপ্নের কারণে যা আমাকে পলে পলে মর্মে মর্মে বাধ্য করেছিল সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান দেখাতে। এই যে ক্ষুদ্র একটি মুক্তোকণাসম পিতৃহৃদয়ের চেতনার রেশ, যা মহত্ব ও মহানুভবতায় পরিপূর্ণ, যা কোনো আটপৌরে দৃষ্টিতে যে কারও চোখে পড়ার কথা নয়, তা কেমন করে যেন আমার চেতনার তন্ত্রে তন্ত্রে লহরি তুলেছিল। আত্মীয়সাধারণের নিকট আব্বার সম্মান ও মর্যাদা কতখানি ছিল তা আমার কাছে তেমন বিবেচ্য ছিল না বা উপলব্ধিও করতে শিখিনি। আমি দেখতাম শুধু তাঁর মহত্ব আর অনুভব করতাম তাঁর মহানুভবতা।(তার উদাহরণও আছে অগনিত, তবে এখানে সেগুলো অপ্রাসঙ্গিক মনে করছি)।

সেদিন শুধু মনে হয়েছিল, এমন অনন্য পিতৃহদয়ের অতল স্পর্শ অনেক সন্তানের ভাগ্যেই জোটে না। ঠিক সেখানটাতে নিজেকে যেমন অনেক সৌভাগ্যবান মনে হতো, তেমনি মনে হতো এমন প্রশস্ত ও কোমল হৃদয়ের মহান পিতৃস্পর্শ কজন সন্তানের ভাগ্যে জোটে!

পৃথিবীতে আমার জীবনে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব, শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, শ্রেষ্ঠ অনুসরণীয়, শ্রেষ্ঠ অনুকরণীয়, শ্রেষ্ঠ ভালোবাসার নাম আমার আব্বা। তিনি কখনো শাসন করেছেন কি না, তা বিন্দুমাত্র মনে পড়ে না। তবে তাঁর অনুশাসনের ভিত যে কত শক্ত ছিল, তা শুধু অনুভব করেছিলাম সেদিনের সেই ফলাফল বিপর্যয়ে। আজ যেন তা উপলব্ধি করি তার চেয়েও শত গুণে।

সেদিনের সেই অনুশাসন নির্মমভাবে শিক্ষা দিয়েছিল, জীবনে ভুল-ত্রুটি যাই থাকুক, নিজেই নিজেকে শুধরে চলার কোনো বিকল্প নেই। এ শিক্ষা যেন এ কথাই বলে, মানুষ সতত নিজেই নিজের শিক্ষক।

পিতারা চিরকাল বেঁচে থাকেন না। পৃথিবীতে দেবতাতূল্য পিতাদের মহান আদর্শ তাঁদের অন্তরালে আলোকবর্তিকা হয়ে, রেখে যাওয়া সন্তানদের এভাবেই যুগ যুগ ধরে পথ দেখিয়ে চলে। আর এটাই পিতৃত্বের বড় সার্থকতা। সেখানে অর্থ, সম্পদ, যশ অনেকখানিই নিরর্থক। আজকের দিনে একথাই বলতে চাই — বাবা ও সন্তানের মুখ্য সম্পর্ক হোক আত্মার বন্ধনে গ্রন্থিত। বাবা দিবসে জীবিত ও লোকান্তরিত সকল বাবার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

       

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>