Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

আজ কবিতার দিন

Reading Time: 14 minutes 
আজ ২১ মার্চ “বিশ্ব কবিতা দিবস”। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ মার্চকে বিশ্ব কবিতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এই দিবস পালনের উদ্দেশ্য হল বিশ্বব্যাপী কবিতা পাঠ, রচনা, প্রকাশনা ও শিক্ষাকে উৎসাহিত করা। ইউনেস্কোর অধিবেশনে এই দিবস ঘোষণা করার সময় বলা হয়েছিল, “এই দিবস বিভিন্ন জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কবিতা আন্দোলনগুলোকে নতুন করে স্বীকৃতি ও গতি দান করবে।”
পূর্বে অক্টোবর মাসে বিশ্ব কবিতা দিবস পালন করা হত। প্রথম দিকে কখনও কখনও ৫ অক্টোবর এই উৎসব পালিত হলেও বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে রোমান মহাকাব্য রচয়িতা ও সম্রাট অগস্টাসের রাজকবি ভার্জিলের জন্মদিন স্মরণে ১৫ অক্টোবর এই দিবস পালনের প্রথা শুরু হয়। অনেক দেশে আজও অক্টোবর মাসের কোনো দিন জাতীয় বা আন্তর্জাতিক কবিতা দিবস পালন করা হয়।এই দিবসের বিকল্প হিসেবে অক্টোবর অথবা নভেম্বর মাসের কোনো দিন কবিতা দিবস পালনেরও প্রথা বিদ্যমান।
কাজলা দিদি  যতীন্দ্রমোহন বাগচী    বাঁশ-বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই,  মাগো আমার শোলক্-বলা কাজলা দিদি কই?  পুকুর ধারে লেবুর তলে,  থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে,  ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, একলা জেগে রই,  মাগো আমার কোলের কাছে কাজলা দিদি কই?    সেদিন হতে কেন মা আর দিদিরে না ডাকো;  দিদির কথায় আঁচল দিয়ে মুখটি কেন ঢাকো?  খাবার খেতে আসি যখন  দিদি বলে ডাকি তখন,  ও-ঘর থেকে কেন মা আর দিদি আসে নাকো?  আমি ডাকি, তুমি কেন চুপটি করে থাকো?    বল্ মা দিদি কোথায় গেছে, আসবে আবার কবে?  কাল যে আমার নতুন ঘরে পুতুল বিয়ে হবে!  দিদির মত ফাঁকি দিয়ে  আমিও যদি লুকাই গিয়ে  তুমি তখন একলা ঘরে কেমন ক’রে রবে?  আমিও নাই—দিদিও নাই—কেমন মজা হবে!    ভূঁই-চাঁপাতে ভরে গেছে শিউলী গাছের তল,  মাড়াস্ নে মা পুকুর থেকে আনবি যখন জল |  ডালিম গাছের ফাঁকে ফাঁকে  বুলবুলিটা লুকিয়ে থাকে,  উড়িয়ে তুমি দিও না মা ছিঁড়তে গিয়ে ফল,  দিদি যখন শুনবে এসে বলবি কি মা বল্ |    বাঁশ-বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই,  এমন সময় মাগো আমার কাজলা দিদি কই?  লেবুর তলে পুকুর পাড়ে  ঝিঁঝিঁ ডাকে ঝোপে ঝাড়ে,  ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, তাইতো জেগে রই,—  রাত্রি হোল মাগো, আমার কাজলা দিদি কই?       যমুনাবতী  শঙ্খ ঘোষ    নিভন্ত এই চুল্লিতে মা  একটু আগুন দে,  আরেকটুকাল বেঁচেই থাকি  বাঁচার আনন্দে!  নোটন নোটন পায়রাগুলি  খাঁচাতে বন্দী-  দুয়েক মুঠো ভাত পেলে তা  ওড়াতে মন দিই!    হায় তোকে ভাত দেবো কী করে যে ভাত দেবো হায়  হায় তোকে ভাত দিই কী দিয়ে যে ভাত দিই হায়    ‘নিভন্ত এই চুল্লি তবে  একটু আগুন দে,  হাড়ের শিরায় শিখার মাতন  মরার আনন্দে!  দু’পারে দুই রুই কাতলার  মারণী ফন্দী-  বাঁচার আশায় হাত-হাতিয়ার  মৃত্যুতে মন দিই!    বর্গী না টর্গী না কংকে কে সামলায়  ধার চকচকে থাবা দেখছো না হামলায়?  যাস নে ও হামলায় যাসনে!  কানা কন্যার মায়ের ধমনীতে আকুল ঢেই তোলে- জ্বলে না,  মায়ের কান্নায় মেয়ের রক্তের উষ্ঞ হাহাকার মরেনা  চললো মেয়ে রণে চললো!  বাজে না ডম্বরু অস্ত্র ঝনঝন করে না জানলো না কেউ তা  চললো মেয়ে রণে চললো!  পেশীর দৃঢ় ব্যথ, মুঠোর দৃঢ় কথা, চোখের দৃঢ় জ্বালা সঙ্গে  চললো মেয়ে রণে চললো!    নেকড়ে-ওজর মৃত্যু এলো  মৃত্যুরই গান গা-  মায়ের চোখে বাপের চোখে  দু’তিনটে গঙ্গা!    দূর্বাতে তার রক্ত লেগে  সহস্র সঙ্গী  জাগে ধ্বক ধ্বক, যগ্গে ঢালে  সহস্র মণ ঘি!    যমনাবতী সরস্বতী কাল যমুনার বিয়ে  যমুনা তার বাসর রচে বারুদ বুকে দিয়ে  বিষের টোপর নিয়ে!  যমুনাবতী সরস্বতী গেছে এ-পথ দিয়ে  দিয়েছে পথ গিয়ে!    নিভন্ত এই চুল্লিতে আগুন ফলেছে!!         রাত্রি  অমিয় চক্রবর্তী    অতন্দ্রিলা,  ঘুমোওনি জানি  তাই চুপিচুপি গাঢ় রাত্রে শুয়ে  বলি,শোনো,  সৌরতারা ছাওয়া এই বিছানায়  -সূক্ষ্মজাল রাত্রির মশারি-  কত দীর্ঘ দু-জনার গেল সারাদিন,  আলাদা নিঃশ্বাসে –  এতক্ষণে ছায়া-ছায়া পাশে শুই  কী আশ্চর্য দু-জনে দু-জনা –  অতন্দ্রিলা,  হঠাৎ কখন শুভ্র বিছানায় পড়ে জ্যোৎস্না,  দেখি তুমি নেই।।      
আপনি বলুন, মার্কস
মল্লিকা সেনগুপ্ত
 
 
ছড়া যে বানিয়েছিল, কাঁথা বুনেছিল
দ্রাবিড় যে মেয়ে এসে গমবোনা শুরু
করেছিল
আর্যপুরুষের ক্ষেতে, যে লালন
করেছিল শিশু
সে যদি শ্রমিক নয়, শ্রম কাকে বলে ?
আপনি বলুন মার্কস, কে শ্রমিক,
কে শ্রমিক নয়
নতুনযন্ত্রের যারা মাসমাইনের
কারিগর
শুধু তারা শ্রম করে !
শিল্পযুগ যাকে বস্তি উপহার দিল
সেই শ্রমিকগৃহিণী
প্রতিদিন জল তোলে, ঘর মোছে,
খাবার বানায়
হাড়ভাঙ্গা খাটুনির শেষে রাত হলে
ছেলেকে পিট্টি দিয়ে বসে বসে কাঁদে
সেও কি শ্রমিক নয় !
আপনি বলুন মার্কস, শ্রম কাকে বলে !
গৃহশ্রমে মজুরী হয়না বলে মেয়েগুলি শুধু
ঘরে বসে বিপ্লবীর ভাত রেঁধে দেবে
আর কমরেড শুধু যার
হাতে কাস্তে হাতুড়ি !
আপনাকে মানায় না এই অবিচার
কখনো বিপ্লব হলে
পৃথিবীর স্বর্গরাজ্য হবে
শ্রেণীহীন রাস্ট্রহীন আলোপৃথিবীর
সেই দেশে
আপনি বলুন মার্কস,
মেয়েরা কি বিপ্লবের সেবাদাসী
হবে ?
        যাত্রাভঙ্গ  নির্মলেন্দু গুণ    হাত বাড়িয়ে ছুঁই না তোকে  মন বাড়িয়ে ছুঁই,  দুইকে আমি এক করি না  এক কে করি দুই।    হেমের মাঝে শুই না যবে,  প্রেমের মাঝে শুই  তুই কেমন কর যাবি?  পা বাড়ালেই পায়ের ছায়া  আমাকেই তুই পাবি।    তবুও তুই বলিস যদি যাই,  দেখবি তোর সমুখে পথ নাই।    তখন আমি একটু ছোঁব  হাত বাড়িয়ে জড়াব তোর  বিদায় দুটি পায়ে,  তুই উঠবি আমার নায়,  আমার বৈতরণী নায়।    নায়ের মাঝে বসবো বটে,  না-এর মাঝে শোবো,  হাত দিয়েতো ছোঁব না মুখ  দুঃখ দিয়ে ছোঁব।    তুই কেমন করে যাবি?      
তোমায় আমি
জীবনানন্দ দাশ
তোমায় আমি দেখেছিলাম ব’লে
তুমি আমার পদ্মপাতা হলে;
শিশির কণার মতন শূন্যে ঘুরে
শুনেছিলাম পদ্মপত্র আছে অনেক দূরে
খুঁজে খুঁজে পেলাম তাকে শেষে।
নদী সাগর কোথায় চলে ব’য়ে
পদ্মপাতায় জলের বিন্দু হ’য়ে
জানি না কিছু-দেখি না কিছু আর
এতদিনে মিল হয়েছে তোমার আমার
পদ্মপাতার বুকের ভিতর এসে।
তোমায় ভালোবেসেছি আমি, তাই
শিশির হয়ে থাকতে যে ভয় পাই,
তোমার কোলে জলের বিন্দু পেতে
চাই যে তোমার মধ্যে মিশে যেতে
শরীর যেমন মনের সঙ্গে মেশে।
জানি আমি তুমি রবে-আমার হবে ক্ষয়
পদ্মপাতা একটি শুধু জলের বিন্দু নয়।
এই আছে, নেই-এই আছে নেই-জীবন চঞ্চল;
তা তাকাতেই ফুরিয়ে যায় রে পদ্মপাতার জল
বুঝেছি আমি তোমায় ভালোবেসে।
        ছুটি  সুমন চট্টোপাধ্যায়    তুমি বললেই হবে  উল্টাবে কাজ পৃথিবীর আজ  দারুণ অসম্ভবে।    সূর্য উঠবে অস্ত যাবেনা  রাত্তির আর পাত্তা পাবেনা  এইতো সকাল সবে;    তুমি বললেই হবে।    ছুটবে ইঁদুর ধরতে বেড়াল  বাঘের শ্বশুর হবেই শেয়াল  ওলট পালট তবে;    তুমি বললেই হবে।    বোম্বেটে এক যুদ্ধ মন্ত্রী  হবে বিলকুল শান্তিতন্ত্রী  পায়রার কলরবে;    তুমি বললেই হবে।    আমি একমাস লিখবনা গান  দেখবো দুজন নদীর উজান  অনুভবে অনুভবে;    তুমি বললেই হবে।    চিনবেনা কেউ দুজনকে আর  দু’খানি বেহালা অর্কেস্ট্রার,  বাজায় হৃদয় দুটি,    তুমি বললেই ছুটি।         বাঁশি  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর    কিনু গোয়ালার গলি।  দোতলা বাড়ির  লোহার-গরাদে-দেওয়া একতলা ঘর  পথের ধারেই।  লোনাধরা দেয়ালেতে মাঝে মাঝে ধসে গেছে বালি,  মাঝে মাঝে স্যাঁতাপড়া দাগ।  মার্কিন থানের মার্কা একখানা ছবি  সিদ্ধিদাতা গণেশের  দরজার ‘পরে আঁটা।  আমি ছাড়া ঘরে থাকে আর একটি জীব  এক ভাড়াতেই,  সেটা টিকটিকি।  তফাত আমার সঙ্গে এই শুধু,  নেই তার অন্নের অভাব॥      বেতন পঁচিশ টাকা,  সদাগরি আপিসের কনিষ্ঠ কেরানি।  খেতে পাই দত্তদের বাড়ির ছেলেকে পড়িয়ে।  শেয়ালদা ইস্টিশনে যাই,  সন্ধ্যেটা কাটিয়ে আসি,  আলো জ্বালাবার দায় বাঁচে।  এঞ্জিনের ধস্ ধস্,  বাঁশির আওয়াজ,  যাত্রীর ব্যস্ততা,  কুলির-হাঁকাহাঁকি।  সাড়ে-দশ বেজে যায়,  তার পরে ঘরে এসে নিরালা নিঃঝুম অন্ধকার॥    ধলেশ্বরী-নদীতীরে পিসিদের গ্রাম—  তাঁর দেওরের মেয়ে,  অভাগার সাথে তার বিবাহের ছিল ঠিকঠাক।  লগ্ন শুভ, নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেল—  সেই লগ্নে এসেছি পালিয়ে।  মেয়েটা তো রক্ষে পেলে,  আমি তথৈবচ।    ঘরেতে এল না সে তো, মনে তার নিত্য আসা-যাওয়া—  পরনে ঢাকাই শাড়ি কপালে সিঁদুর॥    বর্ষা ঘনঘোর।  ট্রামের খরচা বাড়ে,  মাঝে মাঝে মাইনেও কাটা যায়।  গলিটার কোণে কোণে  জমে ওঠে, পচে ওঠে  আমের খোসা ও আঁঠি, কাঁঠালের ভূতি,  মাছের কান্‌কা,  মরা বেড়ালের ছানা  ছাইপাঁশ আরো কত কী যে।  ছাতার অবস্থাখানা জরিমানা-দেওয়া  মাইনের মতো,  বহু ছিদ্র তার।  আপিসের সাজ  গোপীকান্ত গোঁসাইয়ের মনটা যেমন,  সর্বদাই রসসিক্ত থাকে।  বাদলের কালো ছায়া  স্যাঁত্‍‌সেঁতে ঘরটাতে ঢুকে  কলে পড়া জন্তুর মতন  মূর্ছায় অসাড়!  দিনরাত, মনে হয়, কোন্ আধমরা  জগতের সঙ্গে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে আছি।    গলির মোড়েই থাকে কান্তবাবু—  যত্নে-পাট-করা লম্বা চুল,  বড়ো বড়ো চোখ,  শৌখিন মেজাজ।  কর্নেট বাজানো তার শখ।  মাঝে মাঝে সুর জেগে ওঠে  এ গলির বীভত্‍‌স বাতাসে—  কখনো গভীর রাতে,  ভোরবেলা আলো-অন্ধকারে,  কখনো বৈকালে  ঝিকিমিকি আলো-ছায়ায়।  হঠাৎ সন্ধ্যায়  সিন্ধু-বারোয়াঁয় লাগে তান,  সমস্ত আকাশে বেজে ওঠে  অনাদি কালের বিরহবেদনা।  তখনি মুহূর্তে ধরা পড়ে  এ গলিটা ঘোর মিছে  দুর্বিষহ মাতালের প্রলাপের মতো।  হঠাৎ খবর পাই মনে,  আকবর বাদশার সঙ্গে  হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই।    বাঁশির করুণ ডাক বেয়ে  ছেঁড়া ছাতা রাজছত্র মিলে চলে গেছে  এক বৈকুণ্ঠের দিকে    এ গান যেখানে সত্য  অনন্ত গোধুলিলগ্নে  সেইখানে বহি চলে ধলেশ্বরী,  তীরে তমালের ঘন ছায়া;  আঙিনাতে যে আছে অপেক্ষা ক’রে, তার  পরনে ঢাকাই শাড়ি,  কপালে সিঁদুর॥         কবর  জসীম উদ্দিন    এই খানে তোর দাদির কবর ডালিম-গাছের তলে,  তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।  এতটুকু তারে ঘরে এনেছিনু সোনার মতন মুখ,  পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক।  এখানে ওখানে ঘুরিয়া ফিরিতে ভেবে হইতাম সারা,  সারা বাড়ি ভরি এত সোনা মোর ছড়াইয়া দিল কারা!  সোনালি ঊষার সোনামুখ তার আমার নয়নে ভরি  লাঙল লইয়া খেতে ছুটিলাম গাঁয়ের ও পথ ধরি।  যাইবার কালে ফিরে ফিরে তারে দেখে লইতাম কত  এ কথা লইয়া ভাবি-সাব মোরে তামাশা করিত শত।  এমনি করিয়া জানি না কখন জীবনের সাথে মিশে  ছোট-খাট তার হাসি ব্যথা মাঝে হারা হয়ে গেনু দিশে।    বাপের বাড়িতে যাইবার কাল কহিত ধরিয়া পা  আমারে দেখিতে যাইও কিন্তু উজান-তলীর গাঁ।  শাপলার হাটে তরমুজ বেচি পয়সা করি দেড়ী,  পুঁতির মালার একছড়া নিতে কখনও হত না দেরি।  দেড় পয়সার তামাক এবং মাজন লইয়া গাঁটে,  সন্ধাবেলায় ছুটে যাইতাম শ্বশুরবাড়ির বাটে!  হেস না হেস না মোন দাদু, সেই তামাক মাজন পায়ে,  দাদি যে তোমার কত খুশি হত দেখিতিস যদি চেয়ে!  নথ নেড়ে নেড়ে কহিত হাসিয়া, এতদিন পরে এলে,  পথ পানে চেয়ে আমি যে হেথায় কেঁদে মরি আঁখি জলে।  আমারে ছাড়িয়া এত ব্যথা যার কেমন করিয়া হায়,  কবর দেশেতে ঘুমায়ে রয়েছে নিঝঝুম নিরালা!  হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু,আয় খোদা! দয়াময়,  আমার দাদরি তরেতে যেন গো ভেস্ত নসিব হয়।    তারপর এই শূন্য জীবনে যত কাটিয়াছি পাড়ি  যেখানে যাহারে জড়ায়ে ধরেছি সেই চলে গেছে ছাড়ি।  শত কাফনের, শত কবরের অঙ্ক হৃদয়ে আঁকি,  গণিয়া গণিয়া ভুল করে গণি সারা দিনরাত জাগি।  এই মোর হাতে কোদাল ধরিয়া কঠিন মাটির তলে,  গাড়িয়া দিয়াছি কত সোনামুখ নাওয়ায়ে চোখের জলে।  মাটিরে আমি যে বড় ভালবাসি, মাটিতে মিশায়ে বুক,  আয়-আয় দাদু, গলাগলি ধরি কেঁদে যদি হয় সুখ।    এইখানে তোর বাপজি ঘুমায়, এইখানে তোর মা,  কাঁদছিস তুই? কী করিব দাদু! পরাণ যে মানে না।  সেই ফালগুনে বাপ তোর এসে কহিল আমারে ডাকি,  বাজান, আমার শরীর আজিকে কী যে করে থাকি থাকি।  ঘরের মেঝেতে সপটি বিছায়ে কহিলাম বাছা শোও,  সেই শে শোয়া তার শেষ হবে তাহা কী জানিত কেউ?  গোরের কাফনে সাজায়ে তাহারে চলিলাম যবে বয়ে,  তুমি যে কহিলা বা-জানরে মোর কোথা যাও দাদু লয়ে?  তোমার কথার উত্তর দিতে কথা থেমে গেল মুখে,  সারা দুনিয়ার যত ভাষা আছে কেঁদে ফিরে গেল দুখে!    তোমার বাপের লাঙল-জোয়াল দুহাতে জড়ায়ে ধরি,  তোমার মায়ে যে কতই কাঁদিতে সারা দিনমান ভরি।  গাছের পাতার সেই বেদনায় বুনো পথে যেতো ঝরে,  ফালগুনী হাওয়া কাঁদিয়া উঠিত শুনো-মাঠখানি ভরে।  পথ দিয়া যেতে গেঁয়ো পথিকেরা মুছিয়া যাইত চোখ,  চরণে তাদের কাঁদিয়া উঠিত গাছের পাতার শোক।  আথালে দুইটি জোয়ান বলদ সারা মাঠ পানে চাহি,  হাম্বা রবেতে বুক ফাটাইত নয়নের জলে নাহি।  গলাটি তাদের জড়ায়ে ধরিয়া কাঁদিত তোমার মা,  চোখের জলের গহীন সায়রে ডুবায়ে সকল গাঁ।    ঊদাসিনী সেই পল্লী-বালার নয়নের জল বুঝি,  কবর দেশের আন্ধারে ঘরে পথ পেয়েছিল খুজি।  তাই জীবনের প্রথম বেলায় ডাকিয়া আনিল সাঁঝ,  হায় অভাগিনী আপনি পরিল মরণ-বিষের তাজ।  মরিবার কালে তোরে কাছে ডেকে কহিল, বাছারে যাই,  বড় ব্যথা রল, দুনিয়াতে তোর মা বলিতে কেহ নাই;  দুলাল আমার, যাদুরে আমার, লক্ষ্মী আমার ওরে,  কত ব্যথা মোর আমি জানি বাছা ছাড়িয়া যাইতে তোরে।  ফোঁটায় ফোঁটায় দুইটি গন্ড ভিজায়ে নয়ন জলে,  কী জানি আশিস করে গেল তোরে মরণ ব্যথার ছলে।    ক্ষণপরে মোর ডাকিয়া কহিল আমার কবর গায়  স্বামীর মাথার মাথালখানিরে ঝুলাইয়া দিও বায়।  সেই যে মাথাল পচিয়া গলিয়া মিশেছে মাটির সনে,  পরাণের ব্যথা মরে নাকো সে যে কেঁদে ওঠে ক্ষণে ক্ষণে।  জোড়মানিকেরা ঘুমায়ে রয়েছে এইখানে তরু ছায়,  গাছের শাখারা স্নেহের মায়ায় লুটায়ে পড়েছে গায়।  জোনকি মেয়েরা সারারাত জাগি জ্বালাইয়া দেয় আলো,  ঝিঁঝিরা বাজায় ঘুমের নূপুর কত যেন বেসে ভালো।  হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু, রহমান খোদা! আয়;  বেহেস্ত নসিব করিও আজিকে আমার বাপ ও মায়!  এখানে তোর বুজির কবর, পরীর মতন মেয়ে,  বিয়ে দিয়েছিনু কাজিদের বাড়ি বনিয়াদি ঘর পেয়ে।  এত আদরের বুজিরে তাহারা ভালবাসিত না মোটে,  হাতেতে যদিও না মারিত তারে শত যে মারিত ঠোঁটে।  খবরের পর খবর পাঠাত, দাদু যেন কাল এসে  দুদিনের তরে নিয়ে যায় মোরে বাপের বাড়ির দেশে।  শ্বশুর তাহার কশাই চামার, চাহে কি ছাড়িয়া দিতে  অনেক কহিয়া সেবার তাহারে আনিলাম এক শীতে।  সেই সোনামুখ মলিন হয়েছে ফোটে না সেথায় হাসি,  কালো দুটি চোখে রহিয়া রহিয়া অশ্রু উঠিছে ভাসি।  বাপের মায়ের কবরে বসিয়া কাঁদিয়া কাটাত দিন,  কে জানিত হায়, তাহারও পরাণে বাজিবে মরণ বীণ!  কী জানি পচানো জ্বরেতে ধরিল আর উঠিল না ফিরে,  এইখানে তারে কবর দিয়েছি দেখে যাও দাদু! ধীরে।    ব্যথাতুরা সেই হতভাগিনীরে বাসে নাই কেহ ভালো,  কবরে তাহার জড়ায়ে রয়েছে বুনো ঘাসগুলি কালো।  বনের ঘুঘুরা উহু উহু করি কেঁদে মরে রাতদিন,  পাতায় পাতায় কেঁপে উঠে যেন তারি বেদনার বীণ।  হাত জোড় করে দোয়া মাঙ দাদু, আয় খোদা! দয়াময়।  আমার বুজীর তরেতে যেন গো বেস্ত নসিব হয়।    হেথায় ঘুমায় তোর ছোট ফুপু, সাত বছরের মেয়ে,  রামধনু বুঝি নেমে এসেছিল ভেস্তের দ্বার বেয়ে।  ছোট বয়সেই মায়েরে হারায়ে কী জানি ভাবিত সদা,  অতটুকু বুকে লুকাইয়াছিল কে জানিত কত ব্যথা!  ফুলের মতন মুখখানি তার দেখিতাম যবে চেয়ে,  তোমার দাদির ছবিখানি মোর হদয়ে উঠিত ছেয়ে।  বুকেতে তাহারে জড়ায়ে ধরিয়া কেঁদে হইতাম সারা,  রঙিন সাঁঝেরে ধুয়ে মুছে দিত মোদের চোখের ধারা।    একদিন গেনু গজনার হাটে তাহারে রাখিয়া ঘরে,  ফিরে এসে দেখি সোনার প্রতিমা লুটায় পথের পরে।  সেই সোনামুখ গোলগাল হাত সকলি তেমন আছে।  কী জানি সাপের দংশন পেয়ে মা আমার চলে গেছে।  আপন হস্তে সোনার প্রতিমা কবরে দিলাম গাড়ি,  দাদু! ধর¬ধর¬ বুক ফেটে যায়, আর বুঝি নাহি পারি।  এইখানে এই কবরের পাশে আরও কাছে আয় দাদু,  কথা কস নাকো, জাগিয়া উটিবে ঘুম¬ভোলা মোর যাদু।  আস্তে আস্তে খুঁড়ে দেখ দেখি কঠিন মাটির তলে,    ওই দূর বনে সন্ধ্যা নামিয়ে ঘন আবিরের রাগে,  অমনি করিয়া লুটায়ে পড়িত বড় সাধ আজ জাগে।  মজিদ হইতে আযান হাঁকিছে বড় সুকরুণ সুরে,  মোর জীবনের রোজকেয়ামত ভাবিতেছি কত দূরে।  জোড়হাত দাদু মোনাজাত কর, আয় খোদা! রহমান।  ভেস্ত নসিব করিও সকল মৃত্যু ব্যথিত প্রাণ।       অমলকান্তি  নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী    অমলকান্তি আমার বন্ধু,  ইস্কুলে আমরা একসঙ্গে পড়তাম।  রোজ দেরি করে ক্লাসে আসতো, পড়া পারত না,  শব্দরূপ জিজ্ঞেস করলে  এমন অবাক হয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে থাকতো যে,  দেখে ভারী কষ্ট হত আমাদের।    আমরা কেউ মাষ্টার হতে চেয়েছিলাম, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল।  অমলকান্তি সে-সব কিছু হতে চায়নি।  সে রোদ্দুর হতে চেয়েছিল!  ক্ষান্তবর্ষণ কাক-ডাকা বিকেলের সেই লাজুক রোদ্দুর,  জাম আর জামরুলের পাতায়  যা নাকি অল্প-একটু হাসির মতন লেগে থাকে।    আমরা কেউ মাষ্টার হয়েছি, কেউ ডাক্তার, কেউ উকিল।  অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।  সে এখন অন্ধকার একটা ছাপাখানায় কাজ করে।  মাঝে মধ্যে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে;  চা খায়, এটা-ওটা গল্প করে, তারপর বলে, “উঠি তাহলে।”  আমি ওকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।    আমাদের মধ্যে যে এখন মাষ্টারি করে,  অনায়াসে সে ডাক্তার হতে পারত,  যে ডাক্তার হতে চেয়েছিল,  উকিল হলে তার এমন কিছু ক্ষতি হত না।  অথচ, সকলেরই ইচ্ছেপূরণ হল, এক অমলকান্তি ছাড়া।  অমলকান্তি রোদ্দুর হতে পারেনি।  সেই অমলকান্তি–রোদ্দুরের কথা ভাবতে-ভাবতে  ভাবতে-ভাবতে  যে একদিন রোদ্দুর হতে চেয়েছিল।        
একবার তুমি
শক্তি চট্টোপাধ্যায়
 
একবার তুমি ভালোবাসতে চেষ্টা করো–
দেখবে, নদীর ভিতরে, মাছের বুক থেকে পাথর ঝরে পড়ছে
পাথর পাথর পাথর আর নদী-সমুদ্রের জল
নীল পাথর লাল হচ্ছে, লাল পাথর নীল
একবার তুমি ভালোবাসতে চেষ্টা করো ।
 
বুকের ভেতর কিছু পাথর থাকা ভালো- ধ্বনি দিলে প্রতিধ্বনি পাওয়া যায়
সমস্ত পায়ে-হাঁটা পথই যখন পিচ্ছিল, তখন ওই পাথরের পাল একের পর এক বিছিয়ে
যেন কবিতার নগ্ন ব্যবহার , যেন ঢেউ, যেন কুমোরটুলির সালমা-চুমকি- জরি-মাখা প্রতিমা
বহুদূর হেমন্তের পাঁশুটে নক্ষত্রের দরোজা পর্যন্ত দেখে আসতে পারি ।
 
বুকের ভেতরে কিছু পাথর থাকা ভাল
চিঠি-পত্রের বাক্স বলতে তো কিছু নেই – পাথরের ফাঁক – ফোকরে রেখে এলেই কাজ হাসিল-
অনেক সময়তো ঘর গড়তেও মন চায় ।
 
মাছের বুকের পাথর ক্রমেই আমাদের বুকে এসে জায়গা করে নিচ্ছে
আমাদের সবই দরকার । আমরা ঘরবাড়ি গড়বো – সভ্যতার একটা স্থায়ী স্তম্ভ তুলে ধরবো
রূপোলী মাছ পাথর ঝরাতে ঝরাতে চলে গেলে
একবার তুমি ভলবাসতে চেষ্টা করো ।
          অনির্বাণ  নচিকেতা চক্রবর্তী    অনির্বাণ আমার বন্ধু।  অনির্বাণের সাথে যখন আমার দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিল,  তখন সময়টা ছিল বড় অদ্ভুত!  আমরা হাইওয়ের উপর দিয়ে, অনেক দূরে একটা অনুষ্ঠান করতে যাচ্ছি;  লাল আকাশ, সন্ধ্যে হয়ে আসছে-দুপাশে ফাঁকা মাঠ  আমরা চা খাব বলে গাড়িটা দাঁড় করিয়েছি  একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত চায়ের দোকানে;  এমন সময় দেখতে পেলাম, লাল আকাশকে পেছনে রেখে,  একটা ছেলে মাঠ পার হয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে।  আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললঃ ‘চিনতে পাচ্ছিস’?  আমি বললামঃ ‘না’।  ও বলেঃ ‘ভালো করে দেখ’।  আমি সেই চুরি যাওয়া আলোতে ওকে চিনলাম-  আমার বন্ধু অনির্বাণ।  আমার চোখের সামনে পুরনো দিনগুলো ছায়াছবির মত ভেসে উঠছে।  আমি ওকে প্রশ্ন করলামঃ ‘অনির্বাণ, তুই এখানে!’  ও বললোঃ ‘তাইতো কথা ছিল বন্ধু। আমাদের তো এখানেই থাকার কথা ছিল।’  আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে।  আমি খুব বোকার মত ওকে প্রশ্ন করলামঃ ‘অনির্বাণ, কি করছিস এখন’?  ও বললোঃ ‘যা কথা ছিল বন্ধু; মানুষের মাঝখানেই আছি’।  আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিনা। একটা অপরাধ বোধ আমাকে গ্রাস করছে।  ও বললোঃ ‘তোর দেরি হয়ে যাচ্ছে’।  আমি গাড়িতে গিয়ে বসলাম।  ও জানালার কাছে এসে বললোঃ ‘এখন তো তোর নাম হয়ে গেছে-তুই তো বিখ্যাত হয়ে গেছিস! সুখেই আছিস, কি বল?’  আমার গাড়ি স্টার্ট নিয়ে নিয়েছে,  অনির্বাণ আমার জীবন থেকে বেড়িয়ে যাচ্ছে।  অনির্বাণের শেষ কথা গুলো আজোও আমার কানে আলপিনের মত বেঁধে-  সুখেই আছিস…  সুখেই আছিস…         সেই গল্পটা  পূর্ণেন্দু পত্রী    আমার সেই গল্পটা এখনো শেষ হয়নি  শোন,পাহাড়টা, আগেই বলেছি ভালোবেসেছিল মেঘকে  আর মেঘ কিভাবে শুকনো খটখটে পাহাড়টাকে  বানিয়ে ফেলেছিল ছাব্বিশ বছরের ছোকড়া।  সে তো আগেই শুনেছো  সেদিন ছিল পাহাড়টার জন্মদিন  পাহাড় মেঘকে বলল, আজ তুমি লাল শাড়ি পড়ে আসবে  মেঘ পাহাড়কে বলল, আজ তোমাকে স্নান করিয়ে দেব চন্দন জলে  ভালোবাসলে নারীরা হয়ে যায় নরোম নদী  পুরুষরা জ্বলন্ত কাঠ।  সেইভাবেই সেইভাবেই মেঘ ছিল পাহাড়ের আলিঙ্গনের আগুনে  পাহাড় ছিল মেঘের ঢেউ জলে  হঠাৎ আকাশ জুড়ে বেজে উঠল ঝড়ের যত ঝম্ফ  ঝাকড়া চুল উড়িয়ে ছিনতাইয়ের হুমকিতে ছুটে এল এক ঝাঁক হাওয়া  মেঘের আঁচলে টান মেরে বলল  ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে।  এখনও শেষ হয়নি গল্পটা  বজ্রের সঙ্গে মেঘের বিয়ে হয়ে গেল ঠিকই  কিন্তু পাহাড়কে সে কোনদিনই ভুলতে পারলো না  বিশ্বাস না হয়তো চিড়ে দেখতে পারো পাহাড়টার হাড়-পাজর  ভেতরে থৈ থৈ করছে শত ঝরনার জল।       মেজাজ  সুভাষ মুখোপাধ্যায়    থলির ভেতর হাত ঢেকে  শাশুড়ি বিড় বিড় ক’রে মালা জপছেন;  বউ  গটগট করে হেটে গেল।  আওয়াজটা বেয়াড়া ; রোজকার আটপৌরে নয়।  যেন বাড়িতে ফেরিওয়ালা ডেকে  শখ করে নতুন কেনা হয়েছে।      সুতরাং  মালাটা থেমে গেল ; এবং  চোখ দুটো বিষ হয়ে  ঘাড়টাকে হেলিয়ে দিয়ে যেদিকে বউ যাচ্ছিল  সেইদিকে ঢ’লে পড়ল।  নিচের চোয়ালটা সামনে ঠেলে  দাঁতে দাঁত লাগল।    বিলক্ষণ রাগ দেখিয়ে  পরমুহূর্তেই শাশুড়ির দাঁত চোখ ঘাড় চোয়াল  যে যার জায়গায় ফিরে এল।  তারপর সারা বাড়িটাকে আঁচড়ে-আঁচড়ে  কলতলায়  ঝমর ঝম খনর খন ক্যাঁচ ঘ্যাঁষঘিঁষ ক্যাঁচর ক্যাঁচর  শব্দ উঠল।  বাসনগুলো কোনদিন তো এত ঝঁঝ দেখায় না –  বড় তেল হয়েছে।    ঘুরতে ঘুরতে মালাটা দাঁড়িয়ে পড়ল।  নোড়া দিয়ে মুখ ভেঙ্গে দিতে হয় –  মালাটা একবার ঝাঁকুনি খেয়ে  আবার চলতে লাগল।  নাকে অস্ফুট শব্দ ক’রে  থলির ভেতর পাঁচটা আঙ্গুল হঠাত  মালাটার গলা চেপে ধরল।  মি্নসের আক্কেলেরও বলিহারি !  কোত্থেকে এক কালো অলক্ষুণে  পায়ে খুরঅলা ধিঙ্গি মেয়ে ধ’রে এনে  ছেলেটার গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে চলে গেল।  কেন ? বাংলাদেশে ফরসা মেয়ে ছিলনা ?  বাপ অবশ্য দিয়েছিওল থুয়েছিল –  হ্যাঁ দিয়েছিল !  গলায় রসুড়ি দিয়ে আদায় করা হয়েছিল না ?    এবার মালাটাকে দয়া ক’রে ছেড়ে দেয়া হল।  শাশুড়ির মুখ দেখে মনে হচ্ছিল  থলির ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিয়ে এইসময়ে  কী যেন তিনি লুকোচ্ছিলেন।  একটা জিনিস –  ক’মাস আগে বউমা  মরবার জন্যে বিষ খেয়েছিল।  ভাশুরপো ডাক্তার না হলে  ও-বউ এ-বংশের গায়ে ঠিক চুনকালি মাখাত।  কেন ? অসুখ ক’রে মরলে কি হয় ?  ঢঙ্গী আর বলেছে কাকে !    হাতে একরাশ ময়লা কপড় নিয়ে  কালো বউ  গটগট গটগট ক’রে সামনে দিয়ে চলে গেল।  নাঃ আর বাড়তে দেওয়া ঠিক নয়।  ‘বউমা – ‘  ‘বলুন।’  উঁহু, গলার স্বরটা ঠিক কাছা-গলায়-দেওয়ার মত নয়  বড্ড ন্যাড়া।  হঠাত এই দেমাগ এল কোত্থেকে ?  বাপের বাড়ির কেউ তো  ভাইফোঁটার পর আর এদিক মাড়ায় নি ?    বাড়িটা যেন ঝড়ের অপেক্ষায়  থমথম করছে।  ছোট ছেলে কলেজে ;  মেজোটি সামনের বাড়ির রোয়াকে ব’সে  রাস্তায় মেয়ে দেখছে ;  ফরসা ফরসা মেয়ে –  বউদির মত ভুশুন্ডি কালো নয়।  বালতি ঠনঠনিয়ে  বউ যেন মা-কালীর মত রণরঙিণী বেশে  কোমড়ে আঁচল জড়িয়ে  চোখে চোখ রেখে শাশুড়ির সামনে দাঁড়ালো।    শাশুড়ির কেমন যেন  হঠাত গা ছমছম করতে লাগল।  তাড়াতাড়ি থলের মধ্যে হাতটা লুকিয়ে ফেলে  চোখ নামিয়ে বললেন: আচ্ছা থাক, এখন যাও।  বউ মাথা উঁচু ক’রে  গটগট ক’রে চলে গেল !    তারপর একা একা পা ছড়িয়ে ব’সে  মোটা চশমায় কাঁথা সেলাই করতে করতে  শাশুড়ি এ-ফোঁড় ও-ফোঁড় হয়ে ভাবতে লাগলেন  বউ হঠাত কেন বিগড়ে গেল  তার একটা অন্তত তদন্ত হওয়া দরকার।    তারপর দরজা দেবার পর  রাত্রে  বড় ছেলের ঘরে আড়ি পেতে  এই এই কথা কানে এল –    বউ বলছে : ‘একটা সুখবর আছে।’  পরের কথাগুলো এত আস্তে যে শোনা গেল না।  খানিক পরে চকাস চকাস শব্দ,  মা হয়ে আর দাঁড়াতে লজ্জা করছিল।  কিন্তু তদন্তটা শেষ হওয়া দরকার –  বউয়ের গলা ; মা কান খাড়া করলেন।  বলছে : ‘দেখো, ঠিক আমার মত কালো হবে।’  এরপর একটা ঠাস করে শব্দ হওয়া উচিত।  ওমা, বউমা বেশ ডগমগ হয়ে বলছে :  ‘কী নাম দেব, জানো ?  আফ্রিকা।  কালো মানুষেরা কী কান্ডই না করছে সেখানে।’        
হোটেলের ঘরে একজন
জয় গোস্বামী
 
 
তোরা সব উঠে গেলি পাহাড়ে ঝোলানো সরু ব্রীজে-
তোদের ধূসর জামা, ছেঁড়া-ছেঁড়া নীল-সাদা টুপি
ভেসে ভেসে এলো আর হোটেলের সারাঘর ভিজে-
প্যাগোডার মতো ছাদ – তার পাশ দিয়ে চুপি চুপি
 
এমন বিব্রত, সিক্ত ঘরখানি লক্ষ করে তিনখানি ঝাউ ।
সার বেঁধে উঠে যাওয়া পাইনের সবুজ রিবনে
যে-কটি জলের কণা ছিল, তারা হাওয়া লেগে বাতাসে উধাও …
এমন বাতাস যার কোনোদিন ওঠেনি জীবনে
 
সে দ্যাখে : আকাশ থেকে নেমে এসে একজন লামা
মুন্ডিত মাথায় একা বসেছেন তাঁর শুভ্র মঠের শিখরে
রূপোলী ঝলকে জ্বলছে দূরের ঝুলন্ত ব্রীজ, ভাসমান নীল-সাদা জামা
একজন মুগ্ধ শুধু বসে আছে হোটেলের ঘরে ।
          চিঠি দিও  মহাদেব সাহা    করুণা করে হলেও চিঠি দিও,  খামে ভরে তুলে দিও আঙ্গুলের মিহিন সেলাই  ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও,  এটুকু সামান্য দাবি, চিঠি দিও,  তোমার শাড়ির মতো  অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি।    চুলের মতন কোনো চিহ্ন দিও বিস্ময় বোঝাতে যদি চাও …  বর্ণনা আলস্য লাগে তোমার চোখের মতো চিহ্ন কিছু দিও!    আজও তো অমল আমি চিঠি চাই, পথ চেয়ে আছি,  আসবেন অচেনা রাজার লোক  তার হাতে চিঠি দিও, বাড়ি পৌঁছে দেবে ….  এমন ব্যস্ততা যদি  শুদ্ধ করে একটি শব্দই শুধু লিখো, তোমার কুশল! …    করুণা করে হলেও চিঠি দিও,  ভুলে গিয়ে ভুল করে একখানি চিঠি দিও খামে  কিছুই লেখার নেই তবু লিখো একটি পাখির শিস  একটি ফুলের ছোট নাম,  টুকিটাকি হয়তো হারিয়ে গেছে  কিছু হয়তো পাওনি খুঁজে  সেইসব চুপচাপ কোন দুপুরবেলার গল্প  খুব মেঘ করে এলে কখনো কখনো বড় একা লাগে, তাই লিখো    করুণা করে হলেও চিঠি দিও, মিথ্যে করে হলেও বোলো, ভালবাসি !      
উৎসর্গ
উৎপলকুমার বসু
 
দয়িতা, তোমার প্রেম আমাদের সাক্ষ্য মানে নাকি?
সূর্য-ডোবা শেষ হল কেননা সূর্যের যাত্রা বহুদূর।
নক্ষত্র ফোটার আগে আমি একা মৃত্তিকার পরিত্যক্ত,বাকি
আঙুর, ফলের ঘ্রাণ, গম, যব, তরল মধু-র
রৌদ্রসমুজ্জল স্নান শেষ করি। এখন আকাশতলে সিন্ধুসমাজের
ভাঙা উতরোল স্বর শোনা যায় গুঞ্জনের মতো-
দয়িতা, তোমার প্রেম অন্ধকারে শুধু প্রবাসের
আরেক সমাজযাত্রা। আমাদেরই বাহুবল বিচূর্ণ, আহত
সেই সব সাক্ষ্যগুলি জেগে ওঠে। মনে হল
প্রতিশ্রুত দিন হতে ক্রমাগত, ধীরে ধীরে, গোধুলিনির্ভর
সূর্যের যাত্রার পথ। তবু কেন ষোলো
অথবা সতের-এই খেতের উৎসব শেষে, ফল হাতে, শস্যের বাজারে
আমাদের ডেকেছিলে সাক্ষ্য দিতে? তুমুল, সত্বর,
পরস্পরাহীন সাক্ষ্য সমাপন হতে হতে ক্রমান্বয়ে বাড়ে।
      যাতায়াত  হেলাল হাফিজ    কেউ জানে না আমার কেন এমন হলো ।    কেন আমার দিন কাটে না রাত কাটে না  রাত কাটে তো ভোর দেখি না  কেন আমার হাতের মাঝে হাত থাকে না; কেউ জানেনা ।    নষ্ট রাখীর কষ্ট নিয়ে অতোটা পথ একলা এলাম  পেছন থেকে কেউ বলেনি করুণ পথিক  দুপুর রোদে গাছের নিচে একটু বসে জিরিয়ে নিও,  কেউ বলেনি ভালো থেকো। সুখেই থেকো!  যুগল চোখে জলের ভাষায়, আসার সময় কেউ বলেনি  মাথার কসম আবার এসো ।    জন্মাবধি ভেতরে এক রঙিন পাখি কেঁদেই গেলো  শুনলো না কেউ ধ্রুপদী ডাক,  চৈত্রাগুণে জ্বলে গেলো আমার বুকের গেরস্থালি  বললো না কেউ; তরুণ তাপস, এই নে চারু শীতল কলস ।    লন্ডভন্ড হয়ে গেলাম তবু এলাম ।    ক্যাঙ্গারু তার শাবক নিয়ে যেমন করে বিপদ পেরোয়  আমিও ঠিক তেমনি করে সভ্যতা আর শুভ্রতাকে বুকে নিয়েই  দুঃসময়ে এতোটা পথ একলা এলাম শুশ্রূষাহীন ।  কেউ ডাকেনি তবু এলাম,  বলতে এলাম-  ভালোবাসি!                

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>