| 21 এপ্রিল 2024
Categories
ইতিহাস লোকসংস্কৃতি

হারিয়ে যাওয়া একটি লোকনৃত্যের নাম পরভা

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

ছৌ বা ছো নাচের তিন ঘরানার মধ্যে নানা বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল ছিল পরভা। রাজপৃষ্ঠপোষকতায় পুষ্ট লোকনৃত্যটি হারিয়ে যেতে বসেছিল। পরভা উদ্ধারের কাহিনি লিখলেন সুব্রত মুখোপাধ্যায়।


হারিয়ে যাওয়া একটি লোকনৃত্যের নাম পরভা। কিংবা বলা যেতে পারে, পরভা বাঁচিয়ে তোলা একটি নাচের নাম। পরভা আসলে কী? বাংলার লোকনৃত্যের ভাণ্ডারে ছো নাচ একটি রত্ন। এর নান্দনিক বৈশিষ্ট্য, মুখোশ আঁটা শিল্পীদের ঘোরা, লাফানো, রণবাদ্য নাচটিকে জনপ্রিয় করেছে ক্রমশ। উচ্চারণগত এবং ব্যবহারগত দিক থেকে ছো>ছউ>ছৌ। নানা উচ্চারণ। প্রকৃত পক্ষে ছো নাচের তিনটি ঘরানা। একটি ওড়িশার সরাইকেলা, দ্বিতীয়টি পুরুলিয়া এবং শেষটি চিল্কিগড়ের ছো নাচই পরভা নৃত্য নামে পরিচিত।

সরাইকেলা, পুরুলিয়ার থেকে পরভা ছো ব্যতিক্রমী। কিন্তু কেন? চড়িদা পুরুলিয়ার মুখোশ গ্রাম। যেখানের শোলার হালকা বর্ণময় মুখোশ মাথায় পরে ছো শিল্পীরা নাচেন। পুরুলিয়ার ছো নাচ প্রায় বিশ্বজয়ের পথে। কিংবদন্তী ছো শিল্পী পুরুলিয়ার গম্ভীর সিং মুড়া পদ্মশ্রী পেয়েছেন। অন্যদিকে ভারতে বড়লাটের জন্ম উৎসবে সরাইকেলার ছো নাচ প্রদর্শিত হয়েছিল। কিন্তু চিল্কিগড়ের পরভা ছো প্রথম দিকে রাজপরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে বৈশিষ্ট্যে পুরুলিয়া, সরাইকেলার থেকে আলাদা। পরভার মুখোশগুলো কাঠের তৈরি। পরভাগুলো (মুখোশ) মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত বিস্তৃত। ছিল রাজ পৃষ্ঠপোষকতায় পুষ্ট। চৈত্র সংক্রান্তি থেকে বৈশাখ পর্যন্ত চিল্কিগড়ের রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে সন্ধ্যায় শিল্পীদের মহড়া চলত।

বৈশাখের শেষে অথবা জ্যৈষ্ঠের শুরুতে শনি মঙ্গলবার ধরে শিবের গাজন উপলক্ষে পক্ষকাল ধরে প্রতি সন্ধ্যায় পরভা ছো ছিল জামবনি থানার শত শত মানুষের প্রিয় বিনোদন। পালাগুলোর মধ্যে ছা– সোহাগী, বাবু ছো, ভূত ছো, বাঘ ছো, সিংহ ছো উল্লেখযোগ্য। শেষ দিনের আকর্ষণ ছিল সতীর পালা। পরভা পালার জন্য গণেশ চতুর্ভুজা, ষড়ানন, সরস্বতী, লক্ষ্মী, অরুণ, বরুণ, কাক, কুমির, গোরুর মাথা, দশভুজা, যমরাজ, রাবণ, শিব, কার্তিক প্রভৃতি। কাঠ কুঁদে মুখোশগুলো তৈরি করা হত। প্রায় ১৬টি এ জাতীয় মুখোশ তৈরি হয়েছিল। যার মধ্যে ১২টি চিল্কিগড়ের রাজ পরিবারের কাছ থেকে উদ্ধার করে ঝাড়গ্রামের লোকসংস্কৃতি সংগ্রহশালায় রাখা আছে। বাকি ৪টি পরভা আগুনে পুড়ে গিয়েছে। পালা শুরুর আগে কাঠের মুখোশগুলো বাঁশের বাতা দিয়ে তৈরি বৃত্তের উপর রাখা হত। নৃত্যশিল্পী বাঁশ বৃত্তে ঢুকে মুখোশ পরতেন। হাল আমলের ছো নাচের মতো বিশাল ধামসা পরভা ছো নাচে বাজে না। বাজে ঢোল-সানাইয়ের যুগলবন্দি। পালার শুরুতে ধুনুচি হাতে নৃত্যরত বুড়োবুড়ি ও গণক ঠাকুরের প্রবেশ। রাজবাড়ির আঙিনায় মানুষের ঢল, সদর দরজা খোলা। রাজা মানগোবিন্দ তাকিয়ায় বসে তামাক সেবন করছেন। এমনই পরিবেশ তৈরি হত।

১৮৩১-১৮৬০ চিল্কিগড়ের ধবলদের রাজবংশের ‘সুবর্ণ যুগ’। এই সময়কালে রাজা ছিলেন মানগোবিন্দ। প্রজাপালনের পাশাপাশি শিল্প সংস্কৃতিতে ছিল অনুরাগ। ওড়িশার দক্ষ সূত্রধরদের বলা হত করঙ্গা। তাঁদের একজন ‘কালা মিস্ত্রি’ দিয়ে কাঠের মুখোশ তৈরি করান মানগোবিন্দ নির্মাণ করান। পরভা নৃত্যের পত্তন ওই সময়েই। নৃত্যের বিষয় বিন্যাসে সমসাময়িক ঘটনাবলী, স্থূল রসিকতা এবং দেবদেবীর মহিমাকীর্তনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় ভাবে ছো শব্দের অর্থ সং। পরভা নাচে ছা–সোহাগি, বাবু-ছো, ভূত–ছো ইত্যাদি সং প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে দর্শকদের নিপাট হাসির খোরাক যোগান দেওয়ার চেষ্টা। দুর্গা, গণেশ, কার্তিক, সিংহ প্রভৃতি কাঠের মুখোশ পরে দুর্গতিনাশিনী দুর্গা মঞ্চস্থ হত। বাহুবলী দশাননের বীরদর্পী নাচও ছিল পরভার অন্যতম আকর্ষণ। গাজন উপলক্ষে নৃত্যটি বলে শিব–দুর্গা তো ছিলই। সবচেয়ে জনপ্রিয় হল সতীর পালা। সমাপ্তির দিনে নামানো হত। উনিশ শতকে সতীদাহ প্রথার ছোঁয়াচ ঝাড়গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও লেগেছিল। পড়িহাটি গ্রামে পরিত্যক্ত সতীমন্দির এবং চিল্কাগড়ের অদূরে ডুলুং নদীতে সতীঘাটা এর ইঙ্গিত দেয়। সতী পালার টানে গাজনের শেষদিন রাজবাড়ি চত্বর দর্শকে ভরে যেত। সানাইয়ের করুণ সুরে পা মিলিয়ে সতী চরিত্রের অভিনেতা মাখন সিংহের মঞ্চে আত্মপ্রকাশ। গোঁফ কামানো লালপেড়ে শাড়ি, কপালে সিঁদুরে রঞ্জিত। মৃত স্বামীর সঙ্গে সংসার বন্ধনের সুখস্মৃতি স্মরণ করে গান— ‘আমি কি করিব কোথায় যাব বল না গো দ্যুতি/পরানে মারিয়া শেল বড়ালে পিরিতি।।/শিশুকালে ছিলাম ভাল কুসুম শয়ানে।/এবে তনু ঝর ঝর মদনের বাণে’।

ক্ষেত্র সমীক্ষার সময়ে স্মৃতি হাতড়ে গানের দু’কলি শুনিয়েছিলেন অশীতিপর বৃদ্ধ সেদিনের গায়ক ভুবন খামরুই। অধ্যাপক সুশীল বর্মন জঙ্গলমহলের সতীক্ষেত্র প্রবন্ধে পরভা নাচের সতী পালাটির কথা উল্লেখ করেছেন। যতদূর মনে হয় বাংলায় ছো নাচে কাঠের মুখোশের ব্যবহার কেবলমাত্র চিল্কিগড়ের পরভা নৃত্যেই দেখা যায়। বিশ্বে বিভিন্ন দেশে অশুভ শক্তি থেকে পরিত্রাণ ও দৈব কৃপালাভে মুখোশ নৃত্য প্রচলিত। মুখোশের উৎপত্তি সম্ভবত প্রাগৈতিহাসিক যুগে। পাহাড়ের গায়ে ও গুহাচিত্রে মুখোশের আকৃতি মিলেছে। সিন্ধু সভ্যতায় পোড়ামাটির মুখোশের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। যাকে বলা হত পশু-পতিত মুখোশ। মধ্যপ্রদেশে বৈগা উপজাতির মধ্যে কাঠের মুখোশ ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া কেরলে তিরায়াট্টস এবং ভূতা নৃত্যে কাঠের মুখোশের প্রচলন রয়েছে। ঠিক কী ভাবে চিল্কিগড়ে ধবলদেব রাজা মানগোবিন্দ কাঠের মুখোশের পরিকল্পনা ও প্রচলন করে পরভা নৃত্য শুরু করলেন তা গবেষণা সাপেক্ষ। যতদূর মনে হয়, তখনও শোলার ব্যবহার না থাকায় সহজলভ্য কাঠ কুঁদে মুখোশ তৈরি করা হয়েছিল।

কালক্রমে রাজ্যপাট গেলে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে পরভা ক্ষয়িষ্ণু হতে হতে বিশ শতকের নয়ের দশকে স্তব্ধ হয়ে গেল। হারিয়ে গেল চিল্কিগড় ঘরানার ব্যতিক্রমী পরভা ছো। চিল্কিগড়ের রাজ পরিবারও ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকে। সুবিশাল রাজপ্রাসাদ আজ পরিত্যক্ত। শিল্পী ও বাদ্যকারদের অধিকাংশ প্রয়াত।

পরভা বাঁচানোর একটা উদ্যোগ করা গিয়েছিল। বিষয়টি নবান্নে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম। রাজ্য সরকারের আর্থিক সহায়তায় এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে নতুন শিল্পী ও বাদ্যকারদের নিয়ে ২০১৭ সালে মাসাধিক কাল মহড়া চালিয়ে গত ২০১৭ সালের শেষদিনে কলকাতার রবীন্দ্র সদনে নবরূপে পরভা-ছো আবার আত্মপ্রকাশ করে। কাঠের মুখোশের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয় কোমর পর্যন্ত শোলার সুদৃশ্য মুখোশ। নির্মাতা পুরুলিয়ার মুখোশ গ্রাম চড়িদার কারিগর। ইতিমধ্যে পুনরুজ্জীবিত আঙ্গিকটি পরিবেশিত হয়েছে কিছু লোক উৎসবে এবং দাঁতনের রবীন্দ্রভবনে। এখনও বিখ্যাত পালাগুলোর সব উপস্থাপন করা যায়নি। কেবলমাত্র পরভা মডেল তৈরি করা গিয়েছে। বিলুপ্তপ্রায় নাচটি আগের রূপে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। এখন রাজা নেই, রাজ্য নেই। তবে পরভা-ছোকে নবরূপে রাজদরবার থেকে জনতার আঙিনায় আনা গিয়েছে।

 

 

 

 

[লেখক লোকসংস্কৃতির গবেষক]

কৃতজ্ঞতাঃ এবিপি

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত