| 19 এপ্রিল 2024
Categories
সেল বাজার

বইমেলা ২০২০

আনুমানিক পঠনকাল: 6 মিনিট

 

মেলা বাঙালি লোক-সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। একালে নাগরিক জীবনকেও স্পর্শ করেছে মেলা। মেলার উপলক্ষ ও অনুষঙ্গের বহুমাত্রিকতার প্রমাণ বইমেলা। বইমেলার বাতাস বইবে কলকাতা ও তার আশপাশের জেলা গুলোয়, সদ্য বইমেলা শেষ হলো ত্রিপুরায়, আসামের বইমেলা আসছে, মহান ভাষা আন্দোলনে বাঙালির আত্মদানের মাস ফেব্রুয়ারি জুড়ে বাংলাদেশে বাংলা একাডেমি আয়োজন করে বইমেলার। এই মেলা বাঙালির আধুনিক জীবন-সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২০ বইমেলায় প্রকাশ পাবে যে সব বই তা নিয়েই ইরাবতীর আয়োজন “বইমেলা”।

আজ থাকছে প্রতিভা সরকারের  ২০২০ বইমেলায় গুরুচন্ডালী প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত গল্পের বই ‘ফরিশতা ও মেয়েরা’ বইটি নিয়ে কিছু কথা।


Irabotee.com,শৌনক দত্ত,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,iraboti,irabotee.com in
গল্পকার প্রতিভা সরকার

ফরিশতা ও মেয়েরা বইটির ভূমিকা লিখেছেন সাহিত্য একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত যশস্বী সাহিত্যিক শ্রী অমর মিত্র –

“প্রতিভা সরকারের গল্প আমি পড়িনি আগে। না পড়া তো আমার অসম্পূর্ণতা, তা বুঝেও বলছি, যত পড়তে পেরেছি, তার শতগুণ না পড়ে আছি। গল্প-উপন্যাস পড়াও এক নিয়মাধীন, পড়তে গিয়ে যদি হতাশ হই, তখন না পড়ার দিকেই ঢলে পড়ব ধীরে ধীরে। তার ফলে অনেক ভালো লেখা যা পড়ে আমার ভিতরের নিস্তব্ধতা গভীর হত, তা বাদ চলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হত। সুতরাং পড়তে হয়, কিছুটা পড়ে থামতে হয়, কিংবা হয় না। যদি লেখক আমাকে টানতে থাকেন ক্রমাগত, আমি পড়তে বাধ্য। আসলে পাঠক পড়েন না, লেখক তাঁকে পড়িয়ে নেন। লেখক তাকে নতুন অভিজ্ঞতায় উজ্জীবিত করেন। লেখক যদি বাধ্য করেন, তিনি জিতে গেলেন, হ্যাঁ, পাঠকও। প্রতিভা সরকারের লেখার ফাইলটি কতদিন পড়ে আছে। ভূমিকা লিখব, কিন্তু আমার কোনো ধারণা নেই উনি গল্প কেমন লেখেন। উনি সামাজিক আন্দোলনে সক্রিয়, রিপোরটাজ পড়েছি, ওঁর প্রতিবাদের ভাষা আমি জানি। কিন্তু সেই ভাষা তো ছোট গল্পের ভাষা নয়। ছোট গল্প তো না চেনা ভূখন্ডকে আবিষ্কার করা। ছোট গল্প এক অজানা ভূখন্ডের দিকে যাত্রা, লেখক জানেন না তিনি কোন পথে কোন ‘অবশেষে’ গিয়ে পৌছবেন। সাহিত্যই এক অনিশ্চিত যাত্রা। সেই অনিশ্চিত যাত্রায় তিনি কতদূর যাবেন, তাইই নির্ণয় করবে তাঁর গল্পের হয়ে ওঠা। প্রতিভা সরকার আমাকে পড়িয়ে নিয়ে নিয়েছেন। বাধ্য করেছেন। ল্যাপটপ খুলে তাঁর ফাইলে চোখ রেখে আর সরাতে পারিনি। তাঁর জয় হয়েছে। হ্যাঁ, আমি এমনি ভাবে হেরে গিয়ে জিতে যেতে চাই। এমনি না পড়া লেখককে পড়ে নিজের নিশ্চিন্ততায় জারিত হতে চাই। এই লেখক অনেক দূরের যাত্রী। প্রথম বই, সেই বই আমাকে অভিভূত করেছে। তাঁর কলম সজাগ ও শিল্পিত।

তাঁর প্রকাশিতব্য গল্পের বই ‘ফরিশতা ও মানুষেরা’ ১৫টি গল্পের সংকলন। গল্পে বৈচিত্র আছে। গল্পে আধুনিক ভাবনা আছে। সুতরাং গল্প পাঠে বিস্ময় আছে। ‘ফরিশতা’ গল্পটি আকাশের নিচে যে মানুষ, যে মানুষের গায়ের ক্লেদ আপনা-আপনি ঝরে যায়, পাপের ফিরিস্তি লিখতে বসে কাঁধের ডানদিকে এসে বসা ফরিশতার কাছে অনুমতি চেয়ে কলম থামিয়ে বসেই থাকে পাপের ফিরিস্তি লেখার কলম নিয়ে আর এক দেবদূত, সেই মানুষের গল্প। না, মানুষ নয়, এক ফরিশতার গল্প। ফরিশতার পাপ-পুণ্য লিখবে কী করে ঈশ্বরের পাঠানো দূত? গল্পটি এক ভিস্তিওয়ালার। সে কবরে জল ছিটায়, কবরবাসীরা জল পায়, পাখ-পাখালি, ইঁদুর, কাঠবিড়ালি জল পায়। শান্ত মানুষ। ভিস্তিওয়ালার জীবন বর্ণনা করেছেন তিনি অসামান্য স্নিগ্ধ এক ভাষায়। আসলে গল্পের ভাষা বিষয় নির্ভর হয়ে ওঠে যে তা প্রতিভা সরকারের এই বই পড়লে ধরা যায়। ভিস্তিওয়ালাকে নিয়ে কিংবদন্তী, ইতিহাস, কল্পনা তিনি লিখেছেন সুন্দর। এক শিখ তরুণের প্রেমের কাহিনির সঙ্গে মতিউর ভিস্তিওয়ালার জীবন জুড়ে এই গল্প হয়ে ওঠে মহৎ জীবনের মহৎ কাহিনি।গল্প তৈরিতে তাঁর মুন্সিয়ানা আছে। গল্প না থাকলে গল্প পড়ব কেন ? আবার কাহিনিবৃত্তে গল্পের যে মাত্রা হানি হয়, তিনি সচেতন। এই গল্প না হয়েও শেষ হয়েছে, কিংবা হয়নি। চলতেই থাকে। কী নির্ভার, বাতাসের মত অলৌকিক তাঁর গদ্য ভাষা, উদ্ধৃত করছি।

“ চাচাজি! গর্বে গরিব ভিস্তিওয়ালার বুক ফুলে ওঠে। তার মনে পড়ে যায় আব্বুর বলা আর-এক গল্প।
দেড়হাজার বছর আগে কারবালা যুদ্ধের গল্প। হুসেইন ছিলেন নবিজির নাতি। তাঁর বাহিনীর তৃষ্ণা মেটাবার দায়িত্বে ছিল অনেক ভিস্তিওয়ালা। বুদ্ধিমান শত্রুর বিষমাখানো তির এসে প্রথমেই এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয় তাদের আর তাদের ভিস্তির শরীরগুলোকে। তেষ্টার পানি নেই, গাছের ছায়া নেই, আছে শুধু রক্ত, রৌদ্র আর বড়ো বড়ো স্তম্ভের মতো বীর যোদ্ধাদের পতন। আজও মহরমের দিন ‘হায় হাসান, হায় হোসেইন’ রবে সেই বীরগাথা কান্না আর রক্ত হয়ে ঝরে পড়ে প্রাচীন নগরীর রাস্তায় রাস্তায়। কর্পোরেশন পানি কা ট্যাংকির ব্যবহার শুরু না করা অবধি দিল্লির ভিস্তিওয়ালাদের কাজ ছিল ফি মহরমে সেই রক্তের দাগ জল দিয়ে ধুয়ে ফেলা।
প্রাচীনকালে নিহত বিশ্বস্ত ভিস্তিওয়ালার মতোই পবিত্র কোনো দায়িত্বভার যেন মতির কাঁধে এসে পড়ে। তাকে পাহাড়ের মতো উঁচু আর গম্ভীর করে দেয়।”
আর এক গল্প, ‘আত্মজা’ একটি দুর্ঘটনার। বাসটি ভোরের কুয়াশা ভেঙে ছুটছিল। এক প্রবীণা ছিলেন। তাঁর আত্মকথাই গল্প। গল্পটি আমাকে স্তম্ভিত করেছে নির্মাণে। জীবন সায়াহ্নে এসে পৌঁছন নারী ভোরের বাসে চলেছিলেন তাঁর বোনের কাছে। তাদের দুটি সন্তান আছে, তাদের কাছেও। তাঁর জীবনে এসব ঘটেনি। কোনো এক শৈলেনের সঙ্গে প্রেম হয়েছিল কম বয়সে, শৈলেন তাঁকে ছেড়ে গেলে তিনি সারা জীবন একাই থেকে গেলেন। দুর্ঘটনার পরে পরে যা যা ঘটে থাকে এই গল্পটি তা। কী ঘটে থাকে, তা গল্পে আছে।

“তারপরেই একটি হ্যাঁচকা টানে উঠে এলাম রাবার র‍্যাফটের মধ্যখানে। চার জোয়ান ছোকরা এক র‍্যাফট থেকে হালকা দুলিয়ে চ্যাংদোলা করে আলতো ছুড়ে দিল পাশেরটায়। আমি গিয়ে পড়লুম এক তরুণীর পাশে। কী ভাগ্যিস, রাইগর মর্টিসে তার শক্ত দু-হাত গাছের ডালের মতো খাড়া ছিল আকাশমুখো। না-হলে ডোবা বাসে যেমন, তার শরীর অর্ধেকটাই চেপটে যেত আমার শরীরের ভারে। বললে কেউ বিশ্বাস করবে না, আমি তার কানের লতিতে আতরের গন্ধ পেলাম। প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করবে বলে ভোর ভোর চেপেছিল হয়তো এই বাসটায়। লঝঝর ইঞ্জিন জেনেও যেটাকে রাস্তায় ছোটবার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ছেলেটি হয়তো এতক্ষণ খবর পেয়েছে। এসে পৌঁছেছে ব্রিজের মাথায়। দেখতে পাচ্ছে না এত নীচে আকাশমুখো হয়ে হাততোলা শবটিকে। আর দেখেই বা কী হবে, সে তো আর তার ভালোবাসার মানুষ নয়, পচন ধরা এক মৃতদেহ, যে অপেক্ষা করে আছে মাতাল ডোমের ছুরি ছানাছানির জন্য।
এরপর স্পষ্ট কানে আসছিল মেয়েলি গলার তীক্ষ্ণ কান্না, “হায় পোড়া কপাল, আমি দাদা বইলব কাকে!”
মানে মেয়েটির দাদার মৃতদেহ আগেই পাওয়া গেছে।
অনেক ক্যামেরার আলো আমার শরীরে ঝলকাতে কান্না দ্বিগুণ হয়ে গেল, “আমাদের কেউ নাই গো!”
আমি একটু থতমত খেলাম। জানতাম বোন আর ওর মেয়েরা খবর না পাওয়া অবধি আমারই কেউ নেই দু-ফোঁটা চোখের জল ফেলবার। এখন দেখছি কারোরই কেউ নেই, তো এত লোক এখানে জড়ো হল কোত্থেকে! ”

মৃতার বয়ানে এই গল্প এগোয়। এই অংশটুকুর অসামান্য। এই গল্প যে কত মাত্রা নিয়ে আসে। তিনি লিখছেন, মৃত যুবতীর শরীরও নিশ্চিন্ত নয়। তখন আত্মজাজ্ঞানে অচেনা যুবতীর দেহটি নিয়ে জলে আবার ভাসল প্রবীণা। মৃতা যুবতীকে শ্লীলতাহানি থেকে বাঁচিয়ে দিল মৃতা প্রবীণা। গল্পটির নাম ‘আত্মজা’। এমন নিরুচ্চার শিরোনামের জন্যই গল্পটি যেন এই বইয়ে সেরা, যদিও তাঁর কাহিনির বয়ান অন্য রকম ভাবা যেতে পারত। অন্য রকম হতে পারত। গল্পটি পড়তে পড়তে আমার মনে আর এক গল্পের জন্ম হতে থাকে ক্রমাগত। এই গল্প আমার মনে থাকবে বহুদিন।

আত্মজার অন্য এক কাহিনি আছে। গল্পটির নাম “ক্ষত”। আমি এই গল্প মেনে নিতে পারিনি। যা অস্বাভাবিক, স্বাভাবিক ভাবে যা ঘটে না, তা আমার কাছে গল্প নয়, সংবাদ মাত্র। ছ-মাসের শিশু কন্যাকে বাবার কাছে রাখতে সাহস করছে না মা, মায়ের শিশুবেলার এক স্মৃতি তাকে তাড়িত করে এখনো। ব্যতিক্রম হিশেবে এই কাহিনির পক্ষে কলম ধরা যায়, কিন্তু ব্যতিক্রম যা তা কি সত্যই গল্প হয়ে উঠতে পারে? যিনি ভিস্তিওয়ালার ভিতর ঈশ্বরের সন্ধান পান, তিনি ছমাসের শিশু কন্যাকে পিতার কাছে অরক্ষিত মনে করেন। আমি মনে করি না। এই নারীবাদ নারী ও পুরুষ-উভয়ের প্রতি সুবিচার করে না।

‘তেভাগু’ গল্পটি এক অপমানিত দরিদ্র কিশোরীর কাহিনি। গ্রাম থেকে প্রেমিক গোপালের হাত ধরে শহরে এসে পাচার হয়ে কলকাতার সোনাগাছিতে এসে পড়া তেভাগু নামের মেয়েটি বেশ্যা বৃত্তিতে থাকবে, না কি তার বয়স ১৮ হয়নি বলে গাঁয়ে ফিরে যাবে, এই সমস্যার ভিতরে পড়ে প্রতারিত কন্যা ঘুমাতে চায়। ঘুমের ভিতরে দুঃস্বপ্ন আসে। যে এন জি ও তাকে উদ্ধার করে রেখেছে এক বুড়ি বেশ্যার কাছে, সেই এন জি ও-ই তাকে ফিরিয়ে দেবে বাংলা ওড়িশা সীমান্তের সেই গ্রামে। এই গল্প যেখানে নিয়ে গিয়েছেন লেখক, তার জন্য মাথা নামিয়ে দাঁড়াতে হয়। আমি বিস্মিত হয়েছি, তাঁকে পড়িনি কেন এতদিন ? স্বপ্নের ভিতরে কী হয় শুনুন পাঠকঃ

“জেদি তেভাগু ঘাড় নাড়ে।
খ্যা খ্যা হাসে গোপাল। লালায় ভেজা ওর আলজিভটা অবধি দেখা যায়। দু-হাতে পাকড়ে ধরে ওকে। তেভাগু চেঁচাতে থাকে, “ছাড়, কুত্তার বাচ্চা। জুত্তা মারি তর মুখ ফাটি দেবা। সব লোক ডাকি কইবা, মাইর খাওয়াইবা।”
—তাই নাকি! মাইর খাওয়াইবা! জুত্তা মারি মুখ ফাটি দেবা! এত্ত সাহস! দ্যাখ কাইয়া মাইজি, দ্যাখ…
তেভাগুর চোখের সামনে গোপাল যেন গলে গলে পড়তে থাকে। তার চোখ বিশাল গোল হয়ে ওঠে, ফরসা চামড়ায় মেশে কালচে নীল। হাঁটুর নীচটা গলে পড়তে তেভাগুর কোমরের কাছে এসে পড়ে তার মাথা। হাতদুটো কনুইয়ের পরে মিলিয়ে যাবার আগেই সে খামচে ধরে তেভাগুর বুক, “চিল্লা কাইয়া মাইজি চিল্লা। আরে আমিই জগতের নাথো। তোকে বাঁচাইবে কে?”
এইবার ডুকরে ওঠে তেভাগু,
—বাবা… বাঁচাও।”

তেভাগুর প্রেমিক ছিল গোপাল। গোপালই তাকে ভুবনেশ্বর হয়ে কলকাতায় এনে বেচে দিয়েছিল দালালের হাতে। স্বপ্নে সেই গোপাল প্রভু ‘জগন্নাথ’ হয়ে যায়। এই রূপান্তর সত্য। আমি যেন দেখতে পাই এই বদলটি। তেভাগু-র ছিল জগন্নাথ দেব। গোপাল সেই জগন্নাথের রুপ পরিগ্রহ করে। এই গল্পও বহুদিন মনে থাকবে।

গল্প ধরে ধরে অনেক কথা বলা যায়। কিন্তু আমি নিজেকে থামালাম। পাঠক নিজে বিচার করুন। বাংলা সাহিত্য একজন বড় ছোট গল্পকার পেয়েছে। সাহিত্যের এই নিরন্তর প্রবহমানতায় তাঁকে আমি স্বাগত জানাই।”

Irabotee.com,শৌনক দত্ত,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com,iraboti,irabotee.com in

বইটি নিয়ে কৌশিক ঘোষ লিখছেন-

যে পাঠক এখনো প্রতিভা সরকারের কোনো গল্প পড়েন নি তাঁর জন্যই লিখছি। যাঁরা পড়েছেন, তাঁদের জন্য এ লেখা অদরকারি, অবান্তর। যদিও, এই দ্বিতীয় পাঠককূলের মধ্যেই আমার অবস্থান। লেখিকা প্রতিভার যেকোনো লেখাই ঐকিক―তা অবলীলায় চিহ্নিত করে তাঁর জীবনদর্শন ও শ্রেণীগত অবস্থান, ইতিহাসের প্রতি বিস্ময়কর ঝোঁক ও ভাষার মায়াময় ও সহজিয়া স্বভাব। তাঁর দুখজাগানিয়া ও সহমরমিয়া কলমের পক্ষপাত প্রান্তবর্তী লোকজীবনের দিকে, একবগ্গা। এই লোকজীবন প্রতিভাদি খুঁজে পেয়েছেন তাঁর নিজস্ব আন্তরিক পর্যটনে।

আমরা, যাঁরা আগে বিচ্ছিন্নভাবে তাঁর গল্প পড়েছি ও ফেসবুকে শেয়ার করেছি, তারা অপেক্ষায় ছিলাম, এবং, প্রতিভাদির বই বেরুলো: ফরিশতা ও মেয়েরা। প্রকাশক: গুরুচন্ডালি। এই বইয়ের সমূহ নারী-চরিত্রগুলি এতই জীবন্ত, তা শুধু বাংলার নয়, আজকের ভারতীয় প্রেক্ষাপটের জন্য যেন আরো সত্যি। একটা বড় ও ব্যাপক পরিসরে পাঠক দেখতে পাবেন প্রান্তিক নারীর চূড়ান্ত রক্তাক্ত ও পীড়িত অবস্থান। তবুও এই নারী পুরুষশাসিত হাজারো অবদমনেও নাছোড় লড়াকু, এই নারীই তাই শেষাবধি কবিতা, প্রেম ও শুশ্রূষা।

ভাষার সৌকর্যে লোকজীবনে রূপকথার আদল এনে দেয় প্রতিভা-কলম, তবু তা জীবনকে দেখার খন্ডিত কোনো একপেশে দর্শন নয়। তাঁর লেখায় শ্রেণীচেতনা রয়েছে, কিন্তু তার চেয়েও সুস্পষ্ট, জেন্ডার-প্রশ্নে নারীগত, অ-নিরপেক্ষ অবস্থান। তাঁর এই লেখায় পাঠক জানতে পারবেন লোকজীবনের অরন্তুদ টোটেম, ট্র্যাডিশনের বেড়ি ও শৃঙ্খল। পড়তে পড়তে মনে হবে, এই চেনা দেশ এত অজানা ছিলো? ‘ফরিশতা ও মেয়েরা’ সেই না-লেখা আধুনিক ভারতের কাহিনী― যে আধুনিক ভারতের ঝাঁ চকচকে শপিং মল ও মসৃণ রানওয়ের সঙ্গেই বাস করে আরেক অরণ্যবর্তী ও নদীমাতৃক প্রান্তিক দেশ, যা এখনো মধ্যযুগীয়, আদিম, প্রথানুগ, সনাতন ও পুরুষশাসিত।

তবুও, এই লেখায় প্রতিভাদির আশ্চর্য কলমকে বর্ণনা করা গেল না। তাই, অনুরোধ, কিনুন ও পড়ুন, ‘ফরিশতা ও মেয়েরা’। আপাতত বইমেলা গন্তব্য, পাওয়া যাবে গুরুচন্ডালির ৪৪৬ নম্বর স্টলে।

ফরিশতা ও মেয়েরা

প্রতিভা সরকার

গুরুচন্ডালি প্রকাশনা

প্রচ্ছদঃ বিমলেন্দ্র চক্রবর্তীর ছবি থেকে, সায়ন কর ভৌমিক

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত