| 15 জুলাই 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

সুচ সুতোর গল্প

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট
পাশের ঘরের সেলাই মেশিনের ঘ্যার ঘ্যার শব্দটা ক্রমশ দ্রুত থেকে আরো দ্রুত গতিতে বাড়ছে। ভয়ঙ্কর চিৎকারের মতো একটা বিকট শব্দ রিনিদের দু’কামড়ার ঘিঞ্জি ঘরের পাঁচ ইঞ্চির দেওয়াল ভেদ করে সুস্মিতাদের কুড়ি ইঞ্চির দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে যাচ্ছে সমগ্র কাশীবোস লেনে। কখনো মেশিনের মিহি কাঁদুনে শব্দ আবার কখনো বা গুরুগম্ভীর হুঙ্কার। বারো বছর ধরে এই এক কাঁদুনে শুনতে শুনতে কানে তালা লেগে গেছে রিনির। তবুও এর ক্ষান্তি নেই। অসহ্য লাগে তার। পাশের ঘর থেকে রিনি হুড়মুড়িয়ে এসে দাঁত খিঁচিয়ে ওঠে মা পরমার ওপর…
– অসহ্য অসহ্য। তুমি কি একটুও শান্তিতে বাঁচাতে দেবে না আমায়? সারাদিন শুধু ঘ্যারঘ্যার ঘ্যারঘ্যার দানবে লাগাম টানো। না যায় পড়াশোনা করা, না যায় করা অন্যকিছু ।
মা পরমা বড় মেয়ে রিনির এই প্রত্যাশিত আচরণে তার দিকে সংকোচ দৃষ্টিতে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে আবার মেশিনের দিকে দৃষ্টিপাত করে। তারপর মেয়ের প্রতি করুণ-স্বরে বলে…
– আহা রাগ করছিস কেন মা, কী করব বল, এছাড়া আর উপায় কী !
মায়ের এই তাচ্ছিল্য ভঙ্গিতে মেয়ে যেন আরো তেলেবেগুণে জ্বলে ওঠে। চিৎকার করে আরো কিছু বলতে যায় রিনি। এমন সময় বারো বছরের বৃষ্টি ছুটে এসে গলা জড়িয়ে ধরে পরমার।
এ ঘটনা পরমা ও তার দুই মেয়ের কাছেই পরিচিত। তবুও প্রতিদিনই যেন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। তারপর আবার সবাই নিজের নিজের কাজে মনোনিবেশ করে। সরু মোটা কাপড়ের ওপর রঙ বেরঙের মিহিন সুতোর কান্না আবার গর্জে ওঠে।
কাশীবোস লেনের এক স্যাঁতসেঁতে সরু গলির শেষ প্রান্তে দু’খুপড়ির ভাড়ার আস্তানায় পরমা তার দুই সন্তানকে নিয়ে বারো বছর ধরে সেলাই মেশিনের লাগাম টেনে যাচ্ছে। মেশিনের ঘ্যারঘ্যার খুট খুট শব্দ পরমার বুকের খিঁচধরা ব্যথাটাকে কখনো দমাতে পারে না। কিন্তু মাঝে মাঝেই মেশিনের মিহি করুণ শব্দ সুচের প্রতিটি স্পর্শে বিদ্ধ করে পরমার পাঁজরের নীচে আচ্ছন্ন আর একটা যন্ত্রণাকে। পরমা হারিয়ে যায় বারো বছর আগের সূর্য সেন স্ট্রিটের সেই চুনখসা দোতলা বাড়ির অন্দরে। তার ভরা সংসার। স্বামী, ছ’বছরের রিনি আর সদ্যজাত বৃষ্টিকে নিয়ে স্বপ্নের অলিন্দে আরো একবার করাঘাত করতে চায় সে। কিন্তু বারো বছর আগেই কীভাবে যেন এ বাড়ির সব দরজা বন্ধ হয়ে গেল। আচমকা স্বামীর আত্মহত্যা এবং তার পরেই নিলাম হয়ে যাওয়া আমহার স্ট্রিটের পরমা টেলারিং ও সূর্য সেন স্ট্রিটের এই হলুদ দোতলা বাড়ি। তারপরেই কেমন যেন ওলটপালট হয়ে যায় পরমার জীবন। সেই বারোটা বছর ধরে কাশীবোস লেনের একতলা স্যাঁতসেঁতে এই ভাড়া বাড়িতেই স্বামীর সেলাই মেশিনে ভর করে দুই মেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করার স্বপ্ন বুনছে পরমা। সেলাই মেশিনের ঘ্যারঘ্যার শব্দ ছোটে দ্রুত, আরো দ্রুত । পরমার বুকের দমধরা ব্যথাকেও যা অতিক্রম করে যায়।
তেরো নম্বর ঘর। ইতিহাস অনার্সের ক্লাস। সেকেন্ড কাউন্সিলিং-এ ভর্তি হওয়া রিনির কলেজে আজ প্রথম দিন, প্রথম ক্লাস। গুটি গুটি পায়ে অনার্সের ঘরের মাঝামাঝি একটা ফাঁকা বেঞ্চের এক কোণে গিয়ে বসল সে। ক্লাসের ছেলে-মেয়েদের ভাব ভঙ্গিতে বোঝা যায় কেউ তাকে লক্ষ্য করেনি। কিন্তু এক কোণায় বসে থাকা রিনি বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করছে সকলকে। তাদের হাল-চাল, পোশাক-পরিচ্ছেদ, কথা-বার্তা। বড্ড সংকোচ হতে লাগল রিনির। একরঙা থানের সালোয়ার কামিজ পরা রিনির বার বার মনে হতে লাগল ক্লাসের সবাই তাকে নিয়েই গুনগুন করে হাসাহাসি করছে। ক্লাসমেটদের পাশে নিজের বেখাপ্পা পোশাক, আনস্মার্ট চেহারা নিয়ে লজ্জায় ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছে করছিল তার। 
-গুড মর্নিং।
হাসি মুখে প্রফেসর কে.সি.-র প্রবেশ। ক্লাসসুদ্ধ ছেলে-মেয়ে সমবেত স্বরে পুনরায় ‘গুড মর্নিং’ বলে স্যারকে স্বাগত জানায়। সকলে উচ্ছ্বসিত। কিন্তু এক কোণায় যুবুথুবু হয়ে বসে থাকা রিনি নিজের প্রতি কুণ্ঠায় স্যারকে স্বাগত জানাতেও পারে না। একটা গুমোট ধরা অস্বস্তি তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। 
কলেজের প্রথম দিনে ছাত্র শিক্ষকদের আলাপ চারিতায় কেটে গেল প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় থেকে শেষ পিরিয়ড পর্যন্ত। ক্লাসে এলেন কে.সি., আর.এন., এ.বি.-র মতো ঝাঁ চকচকে পোশাক পরা রথী-মহারথী প্রফেসরেরা। কেউ গম্ভীর, কেউবা হাসিখুশি। রিনি বুঝেছে এনাদের সামনে দাঁড়ানোর যোগ্যতাও তার নেই। তার পোশাক, তার চালচলন বড্ড সেকেলে, ভিখিরি টাইপের। তাছাড়া দিনভর সে শুনেছে তার সহপাঠীদের নাম-ধাম-পরিচয়। কারোর বাবা ডাক্তার, কেউ প্রফেসরের মেয়ে, আবার কেউবা ঐতিহ্যপূর্ণ জমিদার পরিবারের সন্তান। রিনি জেনেছে সেই সবথেকে গরিব। তার মা সেলাই করে, তাদের দু’কামড়ার স্যাঁতসেঁতে ভাড়াবাড়ি, বাবা আত্মহত্যা করেছে, নিলাম হয়েছে তাদের পুরনো বাড়ি আর মায়ের নামের পরমা টেলারিং। রিনির লজ্জায় ঘেন্নায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছিল। সব রাগ গিয়ে পড়ল তার মায়ের ওপর। মা-ই যেন এ সবকিছুর জন্য দায়ী। সে কী করে সবার সামনে তার এই পরিচয় দেবে। এসব ভাবতে ভাবতে রিনি বাড়ির গলির মুখে এসে দাঁড়ায়। সেই স্যাঁতসেঁতে সরু গলির শেষ প্রান্তের ভাঙাচুড়া ভাড়ার ঘর দুটো তাদের। ভাবতেই গা রি রি করে ওঠে তার। বাড়ির গলিতে পা দেওয়ার আগেই রিনির চোখ পড়ে গলির বাইরের সুস্মিতাদের ব্রিটিশ আমলের বড় বড় থামওয়ালা বাড়িটার দিকে। কিন্তু হঠাৎ করেই আজ প্রথমবার রিনি অনুভব করল এই বাড়ির দেওয়াহলেও ঝোলানো আছে তার অনধিকার প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা। সাথে সাথে সচ্ছল সুস্মিতাকেও তখন অসহ্য লাগতে শুরু করল রিনির।
ঘরে ঢুকেই রিনি দেখে মা পরমা সুতোর রিল গোছাচ্ছে। বোন চৌকির ওপর বই নিয়ে বসে। চৌকির পায়ার থেকে একটু দূরে স্টোভের ওপরে বসানো দুধের বাটি। আগুনের জ্বালে ফেনার মতো দুধ উথলে প্রায় পড়ে পড়ে। অন্যদিন হলে রিনি দৌড়ে গিয়ে আগে দুধের বাটিটা নামাত। কিন্তু আজ সে কোনো কিছুকে ভ্রুক্ষেপ না করে গট গট করে ঢুকে গেল নিজের ঘরে। পরমা প্রথমে রিনির আচমকা প্রবেশ খেয়াল করেনি। রিনির ঘরের দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পরমা ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার বাইরে থেকেই হাসি মুখে বলল…
-কী রে রিনি তাড়াতাড়িই তো চলে এলি। কেমন লাগল এতবড় কলেজ ?
তারপর কিছুক্ষণ সব চুপ। দরজার বাইরে পরমা কোনো রকম উত্তর না পেয়ে বাটিতে দুধ-মুড়ি মেখে মেয়ের ঘরের দরজায় টোকা দেয় । তাতেও কোনো উত্তর মেলে না। পরমা আবার বলে…
-কী রে, কী হয়েছে, দুধ-মুড়ি নিয়েছি খেয়ে নে।
এবার ভেতর থেকে উত্তর আসে…
-খাব না।
-কেন?
-খিদে নেই।
পরমা মিটিমিটি হেসে মেয়ের সাথে একটু রসিকতার সুরে বলে…
-বন্ধুরা বুঝি মণ্ডা মিঠাই খাইয়েছে?
একথা শুনে ছোট মেয়ে বৃষ্টি খিল খিল করে হেসে ওঠে। অন্যদিকে রাগে, দুঃখে, বিরক্তিতে রিনি এবার ফেটে পড়ে। তারপর হুড়ম করে সশব্দে দরজা খুলে ব্যঙ্গাত্মক সুরে গর্জে ওঠে মায়ের ওপর। 
-হ্যাঁ, তুমি তো কোটিপতি, তোমার মেয়ে তো রাজার কন্যে। তোমার মেয়েকে ডেকে মণ্ডা মিঠাই খাওয়াবে না তো কাকে খাওয়াবে? ভিখিরির মেয়ের কপালে দু’পয়সার দুধ-মুড়িই শুধু জুটবে। এ সব যে তোমার জন্য হয়েছে তুমি মনে হয় তা জান না! আমার ঘেন্না হয়।
রিনির এই অপ্রত্যাশিত আচরণে পরমা ও বৃষ্টি দুজনেই স্তম্ভিত। দুধ-মুড়ির বাটি হাতে কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে পরমা। তার চোখ ছলছল। রিনির বদরাগি স্বভাব তার অজানা নয়। তাইবলে এতবড় কথা বলবে সে! পরমা আর কিছু ভাবতে পারে না। তার মাথার চারিদিকে রিনির বলা কথাগুলোই বারবার ঘুরপাক খেতে থাকে। 
আজ একটু সকাল সকাল উনুনে আঁচ দিয়েছে পরমা। রিনির পছন্দের রান্না করবে আজ। আসলে ছোট থেকেই অভাবে ধাতস্থ ছিল না মেয়েটা। তাই হয়তো মনে মনে মেনে নিতে পারে না তাদের এই দারিদ্র, তাদের অভাবের সংসার। এমন আরো অনেক কিছু ভেবে নিজের মনকে শান্তনা দেয় পরমা। তারপর একমনে রান্না করে। হঠাত্ করেই তার হুঁশ হয়, নটা বেজে গেছে। রিনি এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি। তবে কলেজের জন্য তৈরি হবে কখন! হাতের কাজ ফেলে রিনিকে ডাকতে যায় সে।
-রিনি, এই রিনি, ওঠ। কলেজ যাবি না?
রিনি আধবোজা চোখে বিরক্তিসহকারে বলে…
-না।
-সে কী, কেন ? দ্বিতীয় দিনই কলেজ কামাই করবি ? নাম কেটে দেয় যদি!
রিনি এবার মায়ের ওপর ঝাঁঝিয়ে ওঠে…
-দেবে বেশ করবে। দেওয়াই উচিত। ওখানে সব বড়লোকদের ছেলে-মেয়েরা পড়ে। আমার মতো কেউ অমন বিচ্ছিরি থানের চুরিদার পরে যায় না।
মেয়ের কথা শুনে পরমা আমতা আমতা করে বলে…
-তা এই জন্য তুই কলেজ যাবি না?
-না যাব না। যাও এখন, জালিও না। এনে দেওয়ার মুরোদ তো তোমার নেই। অন্তত একটু শান্তিতে থাকতে দাও আমাকে।
আর কোনো কথা না বাড়িয়ে পরমা নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। সে জানে তার এই টানাটানির সংসারে মেয়েদের হাজার শখ আল্লাদ সে পূরণ করতে পারে না। কিন্তু সময় বদলেছে, যুগ বদলেছে, মেয়েরা বড় হচ্ছে, তাদের তো শখ আল্লাদ থাকবেই। এতে আর দোষ কী! বরং সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে না পারাটা পরমা তার নিজের ব্যর্থতা বলেই মনে করে। 
দেরাজ থেকে একটা পালিশ করা কাঠের পুরনো বাক্স বের করে আনল পরমা। তার ওপর হাত বুলিয়ে খুব সযত্নে সেটা খুলে সেখান থেকে তুলে নিল কিছু টাকা।তারপর বড় মেয়ে রিনির মাথায় কাছে এসে বসল। চোখবোজা রিনির হাতে টাকাটা গুঁজে দিয়ে তার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে সস্নেনে পরমা বলে-
-নে, ওঠ এবার। যা কলেজ যা। যাওয়ার সময় পছন্দমতো পোশাক কিনে নিস।
রিনির চোখ খুলতেই হাতের টাকার দিকে নজর পড়ে। আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তার মুখ। তারপর মায়ের দিকে তাকায়। হাস্যমুখী পরমা তখন স্নেহের চাহনিতে মেয়ের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে তার হাসি মুখের স্বাদটুকু অনুভব করছিল। 
পরমা আজকাল বড্ড বেশি পরিশ্রম করে। নাওয়া খাওয়া ভুলে সারাদিন শুধু ঘ্যারঘ্যার ঘ্যারঘ্যার করে ঝড়ের বেগে মেশিন চালিয়ে যায়। আগের থেকে ঢেরগুণ বেশি সেলাই করে। তার ঘরের চৌকাঠ ছাড়িয়ে সারা কাশীবোস লেনও তা টের পায়। রিনি আজকাল বেশিরভাগ সময়ই বাড়ির বাইরে থাকে। আর ছোট মেয়ে বৃষ্টি বরাবরই শান্ত, মা নেওটা। তাই মেশিনের ঘ্যারঘ্যার শব্দে বিরক্ত হয়ে খ্যাচখ্যাচ করারো কেউ নেই। স্বাচ্ছন্দে সেলাই করে পরমা। 
-মা মা দেখ আমার নতুন জুতোটা ছিঁড়ে গেছে।
বৃষ্টি কাঁদো কাঁদো মুখে এক পাটি ছেঁড়া জুতো হাতে মায়ের সামনে এসে দাঁড়ায়। পরমা ভুরু কুঁচকে বিস্ময়ের সঙ্গে মেয়েকে জিজ্ঞেস করে-
-কী করে ছিঁড়লি?
বৃষ্টি ঠোঁট ফুলিয়ে উত্তর দেয়-
-দিদি ছিঁড়ে দিয়েছে।
-দিদি কেন ছিঁড়বে তোর জুতো।
-কাল দিদি কলেজে পরে গিয়েছিল। ওর পায়ে তো ছোট হচ্ছিল, তাই বোধহয় …
বৃষ্টির মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই রিনি কলেজ থেকে ফিরে ঘরে ঢোকে। বৃষ্টি আর কিছু বলতে পারল না। দিদিকে সে বড্ড ভয় পায়। পরমাও আর কথা না বাড়িয়ে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বলল –
-বেশ, কাঁদিস না আর। পরে একজোড়া নিয়ে আসতে বলব দিদিকে।
মায়ের কথা শেষ না হতেই উৎসাহের সাথে রিনি বলে উঠল –
-বেশ তো, কাল আমি এনে দেব। আমারও একজোড়া লাগবে।
রিনির বলার ধরণ ও মুখভঙ্গিমায় পরমা যেন একটু বিরক্তই হল। তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে গম্ভীর মেজাজের সুরে মেয়েকে বলল –
-এখন আর দুজোড়া জুতোর টাকা হবে না। তুই পরে কিনিস।
কিন্তু রিনি কোনোদিনই মায়ের মেজাজের ধার ধারেনি। মা-কে থামিয়ে দিয়ে সে নিজেই বলতে শুরু করে –
-না না, তা বললে কী করে হবে। এমনিতেই বন্ধুরা আমায় ব্যাকডেটেড বলে। তার ওপর যদি একই জুতো রোজ রোজ পরি তবে আরও বলতে ছাড়বে না।
রিনি নিজের ঘরে চলে গেল । পরমা সেলাই থামিয়ে চুপ করে বসে থাকে। বৃষ্টিও আর বায়না করে না। সে চুপ করে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তার অল্পবয়সী সরল দৃষ্টিতে কী যেন বোঝার চেষ্টা করে।
পাড়ার ইস্কুলে পড়া সরু গলির গণ্ডিবদ্ধ সেই রিনি আজ খোলা শহরের বুকে ডানা মেলতে চায়। কলেজ ক্যাম্পাস, বন্ধুদের হাতছানি তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায় এক উচ্চাকাঙ্ক্ষার দেশে । রিনিও ভেসে যায় নিজেকে উজাড় করে। হয়তো সে কখনো কখনো বোঝে তাদের দারিদ্র্য, মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম। কিন্তু তার স্বপ্ন পূরণের নেশা ও আকাশ ছোঁয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিমেষের মধ্যে তার দুর্বল মনকে দমিয়ে দেয়। তার পোশাকেও এসেছে ফ্যাশনে মোরা আভিজাত্য।
বেশ কিছুদিন ধরেই পরমা আর আগের মতো একটানা সেলাই নিয়ে বসে পারে না। বুকের দমধরা ব্যথাটা দিন দিন বেড়েই চলছে। শরীরের ক্লান্তিও আগের থেকে অনেকটাই বেশি। তবু পরমা ব্যথা নিয়ে কাতরায় না। অসময়ের জন্য তুলে রাখতে চায় টাকা। কাঠের বাক্সের টাকাটাও প্রায় শেষের পথে। এসব চিন্তা করতে করতে পরমার দু’চোখ বুজে আসে। মেশিনের ঘ্যার ঘ্যারানি ক্রমশ ক্ষীণ হতে হতে একসময় থেমে যায়।
-মা, ও মা, কী হল, অসময়ে ঘুমোলে যে?
বৃষ্টির গলার আওয়াজ মৃদু হয়ে হাওয়ার মতো ভেসে আসছে পরমার কানে। কিন্তু সারা দেওয়ার মতো শারীরিক ক্ষমতা তখন আর তার নেই। পাঁজরের নীচের যন্ত্রণাটা খিঁচ ধরে তার বুকের ওপর চেপে বসে তাকে অসাড় করে দিচ্ছে। বৃষ্টির অনেক বার ডাকেও পরমা সারা দেয় না। মায়ের এই স্বভাববিরুদ্ধ আচরণে বৃষ্টি এবার কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে –
-মা, মা গো, তোমার কী হয়েছে? বুকের ব্যথাটা কি খুব বেড়েছে? চল ডাক্তারের কাছে যাই।
পরমা এবার একটু অসম্মতি সূচক ঘাড় নাড়ে। যেন বোঝাতে চায় ঠিক হয়ে যাবে। মায়ের একরকম সারা পেয়ে বৃষ্টি কিছুটা স্বস্তি পেলেও তার অবাধ্য মায়ের কথা মানতে নারাজ। তাই বারবার সে একই কথা বলে চলল।
রিনির সেকেন্ড ইয়ারের নতুন ক্লাস শুরু হয়েছে কয়েক মাস আগে। সিলেবাসের ভেতরে বাইরে কত নতুন নতুন অজানা ইতিহাস। ইতিহাসপ্রেমী রিনি আজকাল ইতিহাসের পাতায় পাতায় বড্ড বেশি বিভোর হয়ে ওঠে। হারিয়ে যায় ঐতিহাসিক বিভিন্ন চরিত্র পটে। সাম্রাজ্যের উত্থান পতন। আর প্রতিটি পতনের পেছনেই থাকে এক জঘন্য কুটিল চক্রান্ত। সিংহাসনের লোভে রক্তাক্ত কত ইতিহাস। সন্তান-স্নেহে অন্ধ রাজার অসহায়তা। রিনি নিজেও ইতিহাসের এক একটা চরিত্র হয়ে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে তার আশপাশটাকেও এক ঐতিহাসিক পটে বসিয়ে নেয়। স্যাঁতসেঁতে গলিতে থাকা তার অসহায় মা-কেও তখন কল্পনা করে এক সাম্রাজ্যহারা সম্রাজ্ঞী। ভেসে ওঠে তার করুণ মুখ। হঠাত্ করেই মায়ের প্রতি করুণায় সহানুভূতিতে তার বুকটা হু হু করে কেঁদে ওঠে। তখন আর মায়ের ওপর রাগ থাকে না তার। বরং কোনো এক মায়ার বলে মায়ের সমস্ত দুঃখ ঘুচিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। ক্ষণিকের মধ্যেই রিনি নেমে আসে বাস্তব জগতে। তারপর আগের মতোই বাস্তবের মাটিতে পা ফেলে জোরে জোরে হাঁটতে থাকে বাড়ির পথে। 
বাড়িতে পা ফেলেই অবাক হয়ে যায় রিনি। মা অচৈতন্যের মতো শুয়ে আছে বিছানায়। আর বোন মায়ের পাশে বসে কাঁদছে। রিনির আঠারো ঊনিশ বছরের স্মৃতিতে মা-কে কখনও এভাবে শুয়ে থাকতে দেখেছে বলে তার মনে পড়ে না। তাই প্রথমে একটু থতমত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর কেমন যেন দুরু দুরু বুকে বৃষ্টিকে জিজ্ঞেস করে –
-এভাবে কাঁদছিস কেন রে তুই? মায়ের কি শরীর খারাপ?
বৃষ্টি কাঁদো কাঁদো মুখে বলে –
-দেখ না দিদি, মা কেমন করছে, কথা বলছে না।
-কী, কথা বলছে না?
-হ্যাঁ, অনেকক্ষণ ধরে ডাকছি।
বৃষ্টির কথায় রিনির বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে ওঠে। কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে তারপর ছুটে যায় মায়ের কাছে। মায়ের মুখের কাছে মুখ নিয়ে বারবার ডাকে মাকে। কিন্তু কোনো সারা পায় না। অজান্তেই রিনি এবার মায়ের বুকের বাঁ দিকটা চেপে ধরে। তারপর আচমকাই ক্ষীণ আর্তনাদ করে ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠে পরমা। বৃষ্টি আবার কাঁদতে থাকে। কাঁদতে কাঁদতে বলে-
-মায়ের বুকের ব্যথাটা কদিন ধরেই খুব বেড়েছে।
চমকে ওঠে রিনি। বিস্ময়ের সাথে জিজ্ঞেস করে-
-মায়ের বুকে ব্যথা? কবে থেকে?
-অনেকদিন ধরে।
-আর এতদিন ধরে বলিসনি আমায়?
বৃষ্টি আর কোনো কথা বলে না। রিনি কী করবে বুঝে না পারে না। তারপর ব্যতিব্যস্ত হয়ে মায়ের দেরাজের তালা খুলে বের করে আনে সযত্নে রাখা পরমার কাঠের বাক্সটা। বাক্সটা বার করতে দেখেই বৃষ্টি সঙ্গে সঙ্গে ছিটকে আসে রিনির কাছে। দিদিকে বাধা দিয়ে বলে –
-কী করবি তুই টাকা? মায়ের কষ্টের টাকা আর নষ্ট করিস না দিদি।
বোনের মুখের এই অপ্রত্যাশিত কথাগুলো রিনির পাঁজরে গিয়ে আঘাত করে। নিজেকে আজ বড্ড বেশি অপরাধী মনে হচ্ছে তার। সে অপরাধী তার অসুস্থ মায়ের কাছে, ছোট বোনের কাছে এবং সবথেকে বেশি নিজের কাছে । রিনি কিছুক্ষণ বোনের দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে শান্ত সুরে বলে –
-মায়ের চিকিৎসার জন্য টাকা লাগবে। হসপিটালে ভর্তি করতে হবে। আজ আর বাধা দিস না আমায়।
কিন্তু বাক্সের মুখ খুলে স্তম্ভিত হয়ে যায় তারা দুজনেই। বৃষ্টি চিৎকার করে বলে ওঠে-
-এ কী, টাকা কই, এ যে শুধুই কিছু খুচরো পয়সা !
তারপর তাকায় দিদির দিকে। তার চোখে মুখে যেন ফেটে পড়ছে দিদির প্রতি তীব্র রাগ। রিনির মুখও তখন বিবর্ণ হয়ে ওঠে। কাঁদো কাঁদো নির্বাক রিনি পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ করে ছুটে যায় নিজের ঘরে। নিমেষের মধ্যে বইয়ের তাক তন্ন তন্ন করে খুঁজে বের করে আনে তার জমান সামান্য কিছু টাকা। তারপর ফোন করে অ্যাম্বুলেন্সে। 
অপরাধীর মতো গুটি গুটি পায়ে রিনি মায়ের কাছে এসে বসে। মায়ের ওপর ঝুঁকে পড়ে মাকে জড়িয়ে ধরে গুমরে কেঁদে ওঠে। সমস্ত রাগ অভিমান অপরাধ ভুলে তার দরিদ্র মায়ের শীর্ণ বুকে নিজেকে মিশিয়ে দিতে চায় সে। এই প্রথম বার রিনি এক উষ্ণ আশ্রয়ের গভীর প্রশান্তিতে ডুবে যায়। তার সমস্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা এই নির্বাক অনুভূতির কাছে ক্রমশ মাথানত হতে হতে ঝুঁকে পড়ে।

0 thoughts on “সুচ সুতোর গল্প

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত