| 17 জুন 2024
Categories
ধারাবাহিক সাহিত্য

সবজে রুমাল রহস্য (পর্ব ৭)

আনুমানিক পঠনকাল: 8 মিনিট

অপ্রত্যাশিত প্ল্যান থেকে জন্ম নেয়া একটি নভেলা। তৃষ্ণা বসাকের ভাবনা।
সেদিন কয়েকজন সৃষ্টিশীল মানুষ আড্ডা দিচ্ছিলেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে, আড্ডার শেষে একটি সবুজ রুমালের দেখা মিললো। একটি রুমাল কে বিড়াল করে দেবার জাদু তো প্রবাদের মত। এখানেও হলো তাই হঠাৎ পাওয়া সবুজ রুমাল টি পেয়েই সব ওলটপালট হয়ে গেল একদল সৃষ্টিশীল মানুষের ভাবনায়।জাদুর মতোই কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই ফেলে যাওয়া এক টুকরো রুমাল হয়ে গেলো ১২-ইয়ারি নভেলা ‘সবজে রুমাল রহস্য’।

পরপর লিখবেন ১২ জন। প্রথম পর্ব লিখলেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং শেষ করবেন তৃষ্ণা বসাক। মধ্যে থাকবেন ১০ জন যথাক্রমেঃ 

সোনালি, তপশ্রী পাল, ব্রততী সেন দাস, নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত, নন্দিনী সেনগুপ্ত, শ্যামলী আচার্য, কৃষ্ণা রায়, ইন্দ্রনীল বক্সী, সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়, অমিতাভ দাস। আজ থাকছে শ্যামলী আচার্য’র লেখা রহস্য নভেলার সপ্তম পর্ব।


নীতার মাথাটা আজ বেশ ধরেছে। দিল্লি থেকে একগাদা ফোন। অকশন হাউজের ম্যানেজার, দুজন বিদেশি ক্লায়েন্ট। যারা ওর এই ভীষণ ব্যক্তিগত নম্বরটা জানে। সবথেকে বিরক্তিকর ফিরোজের ফোন। আর সেই একঘেয়ে হুমকি। নির্বিষ সাপের মতো। কেবল ফোঁস ফোঁস করেই যাবে। মুরোদ নেই কানাকড়ি। ফিরোজের কাছেও এই নম্বরটা রয়েছে। আর নম্বর না থাকলেও ফিরোজ ঠিক জেনে নেবে। ছিনে জোঁক একটা। ওর জীবনের রাহু। অথচ এই ফিরোজের নীল চোখের তারায় একদিন নিজেকে খুঁজেছিল নীতা।  ফিরোজ। ওর কাঁচা বয়সের প্রথম ভুল। 

নীতার বাবা গুলাব কালানি ছিলেন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির উচ্চপদস্থ অফিসার। ছত্রিশ বছর বয়সে তাঁর যখন পোস্টিং হয় মিশরে, নীতার মা বেশ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নীতার দাদা তখন মাত্র বছর দশেক। নীতার বয়স তিন। তবু ওই বয়সেই দিল্লির পরিচিত গন্ডি ছেড়ে, স্কুল বদলে নীতার দাদা একেবারেই যেতে চায়নি অচেনা শহরে। নীতার মায়ের জেদও কম নয়। তিনিও বেঁকে বসেন। গুলাব কালানি একাই মিশরে চলে যেতে বাধ্য হন। দিল্লিতে পড়ে থাকে তাঁর সাজানো সংসার। মিকি আর নীতা একই স্কুল। গুলাব যখন মিশরে তাঁদের কোম্পানিতে ঘাঁটি গেড়ে বসে ভাবতে শুরু করেছেন স্ত্রী-ছেলে-মেয়েকে এখানে এনে এবার নতুন করে সংসার গুছিয়ে নেবেন, ঠিক সেই সময় গুলাবের স্ত্রী মিনুর লিভার ক্যানসার ধরা পড়ে। মায়ের শরীরে কর্কট রোগের অবিশ্বাস্য দ্রুত ছোবলে ভয় পায় একা নীতা। অসহায় লাগে। কী করবে সে? কোথায় যাবে? বাবার দিকে আত্মীয়স্বজন দিল্লিতে প্রায় কেউ নেই বললেই চলে। মাত্র অল্প কয়েকজন তারা আবার রাজস্থানে। এদিকে মিকি বরাবর বহির্মুখী। ছেলেবেলা থেকেই মিকির উৎসাহ গাড়ির দিকে। গাড়ি চড়বে, গাড়ি নিয়েই পড়বে। অতএব সে দিল্লিতেই হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করবে। মায়ের অসুস্থতা বা মৃত্যুতে প্রবাসী বাবার বিপন্নতা বা ছোট বোনের অস্থিরতা নিয়ে তার বিন্দুমাত্র হেলদোল নেই। নিজেকে ঘষেমেজে অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার যোগ্য করে তুলেছিল সে। খুব দ্রুত নিজের পছন্দের কেরিয়ার গড়ে সে এখন মার্কিন মুলুকে থিতু। পরিবারের সঙ্গে দূরত্ব তার বরাবরই ছিল। এখন পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন।      

মা অকালে চলে যান। অতএব নীতা এবার বাবার কাছে। তাকে বেছে নিতে হয় মিশরের ক্লান্তিকর বেরঙিন জীবন। সেই সময় এছাড়া তার কাছে আর কোনও উপায়ও ছিল না। দেশভাগের সময় পাকিস্তান থেকে উৎখাত হয়ে এদেশে চলে আসা হিন্দু সিন্ধি কালানি পরিবারটি এমনিতেই ছিন্নমূল। পাকিস্তানের সিন্ধ প্রদেশেও তাঁদের ছেড়ে আসা ভিটেমাটি এখন অন্যের কবজায়। এদেশে কালানি পরিবার স্বাধীনতার পর থেকেই সর্বহারা উদ্বাস্তুর দলে। এই  ভিড়ের মধ্যে থেকে যে দু’চারটি আগুনের ফুলকি হার-না-মানা জেদ নিয়ে নিজেদের প্রাপ্য বুঝে নিয়েছিল, তাদের মধ্যে  একজন নীতার ঠাকুর্দা। অবশ্য সে কাহিনি নীতা বা মিকি জানেও না, জানতে চায়ও না। দেশভাগ, রাষ্ট্রের বঞ্চনা, নাগরিকের প্রাপ্য নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। তারা শুধু নিজেদের ভাল-মন্দ নিয়ে সন্তুষ্ট। মিকি নিজের কেরিয়ার গুছিয়ে নেয়। কিন্তু নীতার হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করা নিয়ে আপত্তি করেন গুলাব কালানি। নীতা চলে আসে মিশরে। সদ্য তখন সে স্কুলের গন্ডি পেরিয়েছে।  

কায়রোর ইউনিভার্সিটি নীতার সামনে এক অন্য জগত খুলে দিল। বরাবর তার পছন্দের বিষয় ইতিহাস। কিন্তু সরাসরি ইতিহাস না নিয়ে নীতা বেছে নিল অ্যানথ্রপলজি। মানুষ এল কোথা থেকে। এই মিশরেই ফিরোজের সঙ্গে তার প্রথম দেখা। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজ পড়তে এসেছিল ফিরোজ। তার পরিবার ময়মনসিংহ জেলার কোতোয়ালি থানার আদি বাসিন্দা। মিশরে বাংলাদেশ স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশনের সক্রিয় কর্মী।   

অ্যানথ্রোপলজির ছাত্র-ছাত্রীদের দল বেঁধে যাওয়া সেদিন ব্যারন’স প্যালেসে। হিন্দু মন্দিরের আদলে তৈরি এক বিশাল প্রাসাদ। নীলনদের তীরে পিরামিডের দেশে এইরকম একটি রাজকীয় প্রাসাদ আছে জেনেই কৌতুহলী হয় নীতা। কংক্রিটে তৈরি এই প্রাসাদের সিঁড়ি, লিভিং রুম, লাইব্রেরির সর্বত্র অপূর্ব স্থাপত্য। চোখ ফেরানো যায় না। দূর থেকে দেখলে মনে হয় আঙ্কোরভাটের স্থাপত্য হুবহু বসানো। প্রাসাদের দেওয়ালে হিন্দু পুরাণের অসংখ্য ছবি খোদাই করা। শোনা যায়, এই প্রাসাদে অদ্ভুতুড়ে সব ‘ভূতের উপদ্রব’ নিয়ে বিপর্যস্ত ছিল প্রশাসন। লোকে ভয়ে এর ধারেকাছে ঘেঁষত না। বহুদিন এটি তালাবন্ধ পড়ে থাকে। দিব্যি হিন্দু মন্দিরের গড়ন বলেই বোধহয় ভারতীয় দূতাবাস একসময় এটিকে অধিগ্রহণ করে একটি কালচারাল সেন্টার তৈরি করতে চেয়েছিল। আপাতত ইজিপ্ট সরকার নিজেরাই দায়িত্ব নিয়ে এর দেখভাল করছে। সাফসুতরো চলছে। সাধারণ মানুষের যদিও ঢোকা বারণ। ইউনিভার্সিটির দৌলতে স্পেশাল পারমিশন নিয়ে নীতারা গিয়েছিল দল বেঁধে। ঢুকতে অসুবিধে হয়নি।      

অসুবিধে হল একটু পর থেকে। ‘কুয়াসর-ই-ব্যারন’-এর লাইব্রেরির দেওয়ালে অদ্ভূত অচেনা কিছু লিপি। পর পর সারি দিয়ে আঁকা মাছের গায়ে যেন দানার মতো কিছু লেগে রয়েছে। নীতাদের ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র শাহিরার স্পেশাল পেপার পিক্টোগ্রাফ। ওর শরণাপন্ন সকলে।  

শাহিরা বলল, যতদূর জানি, এই মাছের মতো দেখতে তীরচিহ্নগুলো আসলে কুয়েনিফর্ম চিহ্ন। কিন্তু এর বেশি তেমন কিছু এক্ষুনি বলতে পারছি না। ওগুলো সুমেরীয় লিপি।

অচেনা গলার স্বরে সকলেই ফিরে তাকায়। এলোমেলো চুল, নীল চোখ আর বাদামি গায়ের রঙ নিয়ে যে প্রায় ছ’ফুট উচ্চতার যে যুবকটি এগিয়ে আসে, তার আর্য চেহারা দেখে ফিদা না হওয়াই অস্বাভাবিক।

এই যে দেখছেন ত্রিভুজাকৃতি চিহ্ন, এই অংশটা সুমেরীয়। আর এই যে মাছের মত নকসা, এটা সিন্ধুলিপি ছাড়া কোথাও দেখা যায় না। সুমেরীয় কুয়েনিফর্ম চিহ্নের প্রধান চরিত্র বা নায়ক হল বার্লিদানা। ওই যে, ভাল করে দেখুন, যেগুলো ওই মাছের গায়ে লেগে রয়েছে। বার্লিদানাকে একক মানে ইউনিট হিসেবে নিয়ে নানা প্যাটার্ন বানিয়ে এখানে লেখালেখি শুরু হয়েছিল। বার্লি চাষ হত বলেই বোধহয় বার্লিকে ওরা লিপিতেও জায়গা দিয়েছে। তবে এটা তো কোনো ভাষা নয়। শুধু লিপি। কাদার ওপরে আঁকা হত নলখাগড়ার কাঠি দিয়ে। খুঁটির মতো করে আঁকা। তাই কুয়েনিফর্ম’।  

ইতিহাস বলে, মেসোপটেমিয়ার সুমেরীয় ভাষা লিখিতভাবে পাওয়া সবচেয়ে পুরনো ভাষা। কিন্তু সেদিন প্রথম আলাপে নীতা এবং ফিরোজের চোখের ভাষায় অন্য ইঙ্গিত ছিল। নীলনদের শহরে দাঁড়িয়ে সুমেরীয় ভাষাকে ‘ল্যাঙ্গুয়েজ আইসোলেট’ বা ‘বিচ্ছিন্ন ভাষা’ বোঝাতে চেয়েছিল ফিরোজ।  আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক স্টাডিজের ছাত্র। কিন্তু শরীর আদিম ভাষা বোঝে। সে অবিচ্ছিন্নতা চায়। প্রায় সমবয়সী নীতা-ফিরোজের সব সাংকেতিক ভাষা মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতে বেশি সময় লাগে না। প্রাচীন কায়রো শহর মিলিয়ে দিল দুটি যুবক-যুবতীকে। একজন ভারতীয় আর অন্যজন বাংলাদেশি।

নীতার এখনও প্রতি মুহূর্তে মনে হয় তাৎক্ষণিক মোহের বশে ফিরোজকে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া তার জীবনের ভয়ানক টার্নিং পয়েন্ট। অস্বাভাবিক মেধা আর উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফিরোজ যে মেয়েদের ব্যাপারে, বিশেষ করে নিজের স্ত্রীয়ের ক্ষেত্রে অত কনজারভেটিভ, সেটা নীতার পক্ষে প্রাথমিকভাবে বোঝা অসম্ভব ছিল। বুঝতে একটু সময় লেগেছে, কিন্তু ততদিনে নীতা দুটি জিনিস স্পষ্ট বুঝেছে। এক, সে ডানাকাটা পরী না হলেও তার শরীরের যে কোনও খাঁজ অত্যন্ত গভীর। পুরুষের পক্ষে বিপজ্জনক। আর দ্বিতীয়টি হল, ফিরোজের যৌনক্ষুধা সামলে মারধোর খাওয়ার চেয়ে তার ঈশ্বরপ্রদত্ত এই উপহার একটু খোলামেলা রাখাই ভাল। এতে আখেরে লাভই হয়।

রাহুল ভাবনানীর সঙ্গে তার এয়ারপোর্টেই আলাপ। বাবাকে জানিয়ে ফিরোজের হাত থেকে নিস্তার পেতে তখন সে পাকাপাকি দিল্লিতে ফিরছে। কতদিন আগের কথা। অথচ মনে হয়, এই তো সেদিন! ভাবনানীর কথা মনে পড়তেই গা গোলায় নীতার। বড্ড হাঁচোড়-পাচোড় করত লোকটা। বড় বড় নখ। ময়লা ভর্তি। চুমু খেতে জানতই না। বন্য জন্তুর মতো। লালা মাখিয়ে থুতু ছিটিয়ে… ছ্যাঃ। মরার দিনও গাড়িতে হামলে পড়েছিল। বেআক্কেলের মতো চুক্তিটা ডুবিয়ে দিল। প্রচুর মালের লোকসান। তার ওপর বেফালতু খুন হয়ে গিয়ে কেসটা পুরো গুবলেট হয়ে গেল। মরার দিন একই গাড়িতে তার সঙ্গে ফেরার অজুহাতে পুলিশ এখন ওকেও কিছুদিন চাটবে। যত্তসব বখেড়া।   

মাথা ব্যথার জন্য নীতা কোনও ওষুধ খাবে কি না ভাবছে, ঠিক এই সময় হোয়্যাটসঅ্যাপে ভিডিও কল। অচেনা নম্বর। চেহারাটা খুব চেনা। গলফ ক্লাবে দেখা সেই ছেলেটা না? নীতার পার্সোনাল নম্বর পেল কোত্থেকে? ও কি পুলিশ না সাংবাদিক?  

       “যাই বলো, তোমার আসল নাম যে গোগোল, এটা জেনেই বড্ড আরাম লাগছে”।

সুচন্দ্রার কথায় মিষ্টি করে হাসে গোগোল। গোগোল ওরফে দুর্গাদাস সুচন্দ্রার ফেসবুক ফ্রেন্ড। আজকাল ভার্চুয়াল বন্ধুদেরও কমন প্ল্যাটফর্ম তৈরি হচ্ছে। ছোট ছোট গ্রুপ। কিছুদিন চ্যাটে হইচই। অনলাইন হলেই নানান গপ্পোগাছা। তারপর একদিন সুবিধেমতো সকলের দেখাসাক্ষাৎ। সুচন্দ্রা এইরকম তিনটি গ্রুপে রয়েছে। একটিতে তো রীতিমতো অ্যাকটিভ অ্যাডমিন। ‘দেশান্তরী’ গ্রুপ। এই ‘দেশান্তরী’তেই দুর্গাদাসের সঙ্গে আলাপ। ভারিক্কি নাম, অথচ বড় চিকন চেহারা। দেশ-বিদেশে কাজের সূত্রে তার নিত্য যাতায়াত। অপূর্ব সব ট্র্যাভেলগ লেখে দুর্গাদাস। ইতিহাস, ভূগোল, মাইথোলজিতে অগাধ পান্ডিত্য। চমৎকার সব কিউরিওর সংগ্রহ। এক-আধ দিন ওর ছোট্ট কিছু কালেকশনের ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করে। শুধু ছবি নয়। সেই জিনিসটি কোত্থেকে কিনেছে, কেন কিনল, কী সেই জিনিসটির বৈশিষ্ট্য–  সবকিছু নিয়ে এক আশ্চর্য বর্ণনা। নেশা ধরে যায়। এমনভাবে লেখে, যেন সমস্ত পৃথিবীতে ওই অমূল্য জিনিসটি শুধু ওর ঘরেই ঠিকঠাক রয়েছে। ওখানেই ওর থাকার কথা। এত যত্নে কে আর রাখতে পারে! দুয়েকবার সুচন্দ্রা ভেবেছে মেসেঞ্জারে ওকে বারণ করবে। কী দরকার বাপু অত ছবি পোস্টানোর? মানুষের লোভের তো শেষ নেই। কার মনে কি আছে, কে জানে! দুর্মূল্য কিউরিওর ছবি দেখিয়ে বাড়িতে চোর-ডাকাত ডেকে আনার কোনও মানেই হয় না। যা দিনকাল পড়েছে!  

-সেদিন তুমি এলে না। আমরা খুব মিস করেছি তোমায়”।

-দেশান্তরীর পরের আড্ডায় ঠিক আসব সুচন্দ্রাদি। আসলে ওই যে বললাম আপনাকে। একটা মেডিটেশান কোর্স করছি। ওটা নিয়ে বেশ ব্যস্ত।বসার ঘরের ভারি পর্দা ঠেলে সুচন্দ্রার শাশুড়ি ঢুকলেন। 

-ওসব তোদের আড্ডার কথা ছাড় দিকিনি। এই নে। পরশু মালপোয়া করেছিলুম। ভাগ্যিস খানকতক ছিল। নে, খা। খেয়ে বল দিকিনি, কেমন হয়েছে?”

সুচন্দ্রার শাশুড়িমায়ের উচ্ছল আচরণ দেখে একটু অবাক হন। মা আজকাল একটু বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন সংসারের দৈনন্দিন কাজ থেকে। সামাজিকতায় আদর-আপ্যায়ণে এখন সুচন্দ্রাকেই বেশি ভরসা করেন। খুব ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন এলেও নিজের ঘরের মধ্যেই থাকেন। সেখানেই তাদের ডেকে নেন। বড়জোর বাইরের ঘরের কাঠের ইজিচেয়ারটায় এসে বসেন। আজ তাঁর এত উচ্ছ্বাস দেখে সুচন্দ্রার ভালই লাগে।

-জানো বউমা, ওই গোগোলের দাদু, দুগগাবাবু, সে তো তোমার শ্বশুরমশায়ের ভীষণ বন্ধু ছিলেন! আহা, আমি বলতুম, জানের জান প্রাণের আধখান। কত জায়গায় ঘুরতেন। ওই ছিল ওঁর এক নেশা। তাড়িয়ে বেড়াত যেন। এখানে সেখানে। কত দেশ-বিদেশ চলে যেতেন। হঠাৎ হঠাৎ।

গোগোলের সঙ্গে এই বাড়ির পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে জেনে ভারি ভাল লাগে সুচন্দ্রার। এত গুণী ছেলে, এত পন্ডিত। একটুও অহঙ্কার নেই। নিজেকে জাহির করেনা কখনও। যদিও ওর কাজ-কারবার সম্পর্কে কিছুই জানে না সুচন্দ্রা। জানার মতো সুযোগও হয়নি। ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব যে গন্ডিতে আটকে আছে, তাতে ওর নামটাই তো পুরো জানত না সুচন্দ্রা। জানা উচিত ছিল। অ্যাডমিন হিসেবে গ্রুপ মেম্বারদের সম্পর্কে আর একটু খোঁজখবর নেওয়া দরকার। ভবিষ্যতে সতর্ক থাকতে হবে।

-কিন্তু মা, ওকে আপনি চিনলেন কেমন করে?

-কেমন করে আবার? দুগগাবাবুর ওই নাক আর চওড়া কপাল। অমন টিকোলো নাক, দেখেই সন্দেহ হোল। ও তো তোমার নাম বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। আমার দেখেই কেমন সেই চল্লিশ বছর আগের চেহারাটা ভেসে উঠল। ফস করে জিগ্যেস করে ফেললুম। এই ছেলেই যে আবার তোমার বন্ধু হয়েছে, তা’ তো জানতুম না।  

-দেখুন কান্ড। মানুষের সঙ্গে মানুষের আজকাল কি অদ্ভূতভাবে যোগাযোগ হচ্ছে।

-তা সত্যি। তা হ্যাঁ গো বউমা, বাড়ির সেই রুমালে কীসব আঁকাজোকা আছে বলছিলে, ওকে একবার দেখাও না। ও তো দাদুর ধারাই পেয়েছে। দেশ বিদেশে কাজেকর্মে থাকে। দেখো না, ঠিক হয়ত কিছু বলতে পারবে।

শাশুড়ির প্রস্তাবে দৃশ্যতই বেশ অস্বস্তি বোধ করে সুচন্দ্রা। এটা ঠিকই যে সবুজ রুমালটা নিয়ে তাদের বাড়িতে একটা উত্তেজনা চলছে। রোজই কেউ না কেউ দিনে একবার অন্তত এই নিয়ে আলোচনা করে, কিন্তু শাশুড়িমা যে এমন দুম করে গোগোলের সামনে এই প্রসঙ্গটা তুলে আনবেন, এটা সুচন্দ্রা ঠিক আশা করেনি।

-না, মানে, ওটা তো অন্য কার রুমাল… কেউ ফেলে গেছে… কে যে ফেলে গেল। সুচন্দ্রা বিষয়টাকে এড়িয়ে যেতে চায়। কিন্তু অনভ্যস্ততায় অপ্রস্তুত অবস্থাটাকে চাপা দিতে পারে না।

-যে ফেলে গেছে, তাকে তো খুঁজে পেলে না। অথচ রোজই তোমাদের গুনগুন। এ আসে, সে আসে। ফোন, আলোচনা সবই তো কানে আসে বউমা। গোগোল তো ঘরের ছেলে। ওকে দেখাতেও তোমার আপত্তি? বুদ্ধিমতী সুচন্দ্রা এক মুহূর্তে অস্বস্তি কাটিয়ে স্বাভাবিক। গোগোলের সামনে শাশুড়ির উষ্মা তিনি আর বাড়তে দেবেন না।

-কি যে বলেন মা, ছেলেটা এই তো প্রথম আমাদের বাড়িতে এল। তার ওপর এই বাড়ির সঙ্গে কোন যুগের সম্পর্ক। ওকে একটু থিতু হয়ে বসতে দিন আগে। সব দেখাব। আগে ওর জন্য নিয়ে আসি কিছু।

-শুধু মালপোয়াতে হবে নাকি? কী খাবে ভাই, চা না কফি?

-কফি খাব সুচন্দ্রাদি। কড়া। কালো কফি। যদি সম্ভব হয় একটু মধু দেবেন। আর তা না হলে শুধু কফি। চিনি ছাড়া।    

রান্নাঘরে কফি মেশিনে জল চড়িয়ে খানিকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে সুচন্দ্রা। কতটা উচিত হবে গোগোলকে রুমালটা দেখানো। ওর গাড়ির টিস্যুপেপারের বাক্স থেকে সেদিন সুচন্দ্রা যে সাদা ন্যাপকিন নিয়ে এসেছিল, তার কোনাতেও একটা মাছের মোটিফ ছিল। কিন্তু বাড়িতে এনে দুটোকে হুবহু একরকম বলে মনে হয়নি। খটকাটা থেকেই যাচ্ছে।  

রুমালের মোটিফে হায়ারোগ্লিফিক ছাঁদ নেই জেনে বেশ আশ্চর্যই হয়েছিল সুচন্দ্রা। শুরুতে ব্রাহ্মীলিপি আর সিন্ধুসভ্যতা নিয়ে জব্বর টানাপোড়েন থাকলেও ছেলেবেলা থেকেই ইতিহাস বইয়ে হায়ারোগ্লিফিক দেখে শুনে পড়ে যে রোম্যান্টিসিজম আর মিস্টিক ব্যাপারটা তৈরি হয়, তাতে চারপাশে চেনা অচেনা যে কোনও ছবি আঁকা লিপি দেখলেই প্রথমে ওই হায়ারোগ্লিফিকের কথাই মাথায় আসে। এটাই স্বাভাবিক। সরস্বতী থেকে নীলনদ, মনে মনে বেশ একটা ম্যাপ তৈরি করে নেয় সুচন্দ্রা। সুমেরদের কিউনিফর্ম, সিন্ধুলিপির মাছের মত নকসা… উফ। পুরো চন্দ্রবিন্দুর চ আর বেড়ালের তালব্য শ। আর তার সঙ্গে রুমালের মা… ভাবতে ভাবতেই গায়ে কাঁটা দেয় সুচন্দ্রার। রুমালে স্বস্তিক চিহ্ন, ফ্লরোসেন্ট রঙে পবিত্র চিহ্ন আঁকা। বেশ লক্ষ্মীমন্ত রুমাল! রুমালটা আসা ইস্তক দিব্যি কাটছে। অথচ অস্বস্তিটা যাচ্ছে না কিছুতেই।

জল ফোটার শোঁ শোঁ আওয়াজে হুঁশ ফিরল। উফ, এই রুমালের জ্বালায় মাঝে মাঝে সব কাজকারবার একদম লাটে ওঠে।

মধু দেওয়া কালো কফি আর কুকিজ বিস্কিট নিয়ে ঘরে ঢুকে দেখেন, শাশুড়িমা কাঠের ইজিচেয়ারে স্থির হয়ে বসে। তাঁর দুচোখ বন্ধ। মুখে অদ্ভূত প্রশান্তি। গোগোল ওরফে দুর্গাদাস বসে আছে তাঁর ঠিক সামনে। হাঁটুতে হাঁটু ঠেকিয়ে। তার দুচোখ বন্ধ। ডান হাতের তর্জনী দিয়ে সে তার নিজের কপালে আঁকছে একটা বিশেষ কোনও মোটিফ। সুচন্দ্রা থমকে গেলেন। গোগোল মাছ আঁকছে। তার চারদিকে স্বস্তিকা চিহ্ন। পরপর তিনবার। তার বাঁহাতটির তর্জনী আর বুড়ো আঙুল শক্ত করে চেপে ধরা। সেটি শুধু ছুঁয়ে রয়েছে শাশুড়িমায়ের দুই ভুরুর মাঝখানের অংশ। যাকে আমরা বলি তৃতীয় নয়ন। আজ্ঞাচক্র। রাত দেড়টা কোনও রাতই নয় কলকাতার ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। ঝলমলে চারদিক। ভিড় রয়েছে। ইমিগ্রেশন থেকে বহু জিজ্ঞাসাবাদ সামলে নিজের পাসপোর্ট ফেরত নেয় একটি সুদর্শন পুরুষ।

প্রথমেই মোবাইলে সে একটি অন্য সিমকার্ড ভরে নেয়। তার লাগেজ বলতে মামুলি একটা গাঢ় নীল হ্যান্ডব্যাগ। ঝাড়া হাত-পা। মোবাইলে অ্যাপ থেকে ক্যাব বুক করে দাঁড়ায় কিছুক্ষণ। দমদম এয়ারপোর্টের বাইরের খোলা হাওয়া তার কাছে একদমই অচেনা বা অপরিচিত নয়। এর আগেও কতবার। ক্যাব পেতে দেরি হয় না একদম। সাদা রঙের গাড়ির স্বচ্ছ কাঁচ নামিয়ে পেশাদার ক্যাব ড্রাইভার জিজ্ঞেস করে,

-আপকা নাম?”

-ফিরোজ। ফিরোজ আহমেদ। মাঝবয়সী ড্রাইভারের অভিজ্ঞ চোখ লক্ষ্য করে তার অনেক পিছনে দাঁড়ানো একটি কোয়ালিস গাড়ি তাকে খুব ধীরে অনুসরণ করতে শুরু করল।

-কাঁহা যাইয়েগা ভাইসাব?

-লোকেশন দেখ লো। মুঝে পতা নেহি।

চৌরঙ্গীর একটি মামুলি হোটেলের লোকেশন। ক্যাব চলতে শুরু করে। পিছনে কোয়ালিস। ফিরোজ গাড়ির ব্যাক সিটে ঘাড় হেলিয়ে দেয়। ইমিগ্রেশনের এত জেরায় সে বড্ড ক্লান্ত। এবার একটা মেসেজ করে ফিরোজ। ‘মছলি পে থোড়া নমক ডালনা’। সেন্ট। মেসেজ চলে যায় জিডিবির কাছে।  কোয়ালিস গাড়ির মধ্যে থেকে ফোন যায়।

-স্যার, মালপত্র কিচ্ছু নেই। প্রচুর সার্চ হয়েছে। নার্কোটিক্স ব্যুরো থেকেও দুজন ছিলেন।

-তাড়াহুড়ো কোরো না। ফলো করো। গভীর জলের মাছ। ল্যাজে খেলাবে।

      

          

             

        

         

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত