| 29 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
পাঠ প্রতিক্রিয়া সাহিত্য

মেনকি ফান্দার অপরাধ কিংবা পাপ

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

ভালোবাসা বোধ হয় মলিন হয়ে ওঠে রোজকার তেল নুন ধুলো বালির সংসারে সুখ স্বাচ্ছন্দ্য আর তৃপ্তির ঝাঁজে। তাই যে প্রণয়ী কখনো অমীমাংসিত হিসাবের খাতায় কিংবা হৃদয়ের জটিল রসায়নে অনুত্তীর্ণ হয়েছিল সে গোপন দেরাজের চিঠির মতো চিরকাল স্মৃতিজাগানিয়া হয়ে থেকে যায়! তাকে অস্বীকার করতে চাইলেও অতিক্রম করা যায় না। তবু ‘অংশুমানকে আমি কখনো ভালোবাসিনি’ গল্পের সেতু বর্তমানে বসে নিজেকে প্রবোধ দেয় সে কখনো ভালোবাসেনি অংশুমানকে।

পড়ছিলাম সাদিয়া সুলতানার গল্পগ্রন্থ ‘মেনকি ফান্দার অপরাধ কিংবা পাপ’। প্রথম গল্পটি পড়ে এই ভাবনাটুকু ভেতরে ভেতরে আলোড়ন তুলে গেছে। বোধ হয় গল্পের মতো বাস্তবের সেতু বা অংশুমানদের কাহন কখনো শোনার অবসর হয়নি বলে।

অংশুমান সেতুকে বলেছিল- ‘আপনাকে আমি সুখী হবার অভিশাপ দিয়েছি। যেই সুখী মানুষ জীবনের শেষ প্রান্তে গিয়েও আমার কথা মনে করে প্রচণ্ড আন্তরিকতায় ভেঙে পড়বে আর আমার ভালোবাসার যে প্রাচুর্য তার করতলে ধারণযোগ্য হয়নি তার বায়বীয়তায় আজীবন দীর্ঘশ্বাস ফেলবে। ‘ সেতু অভিশাপ মাথা পেতে নিয়ে সুখীই হয়েছে জীবনে। তবু ভালোবেসেছে বলে নয়, শুধুমাত্র গভীর আন্তরিকতা থেকে সে অংশুমানকে খুঁজে ফিরছে। যেমন আমরাও খুঁজে বেড়াই এমন কাউকে, ভালোবাসি বলে নয়, স্মৃতিভার হালকা করবো বলে, হৃদয়ে জমে থাকা পাথরটাকে সরাবো বলে৷

অবিশ্রান্ত রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধে সর্বস্ব আহুতি দেয়ার পরেও এই দেশে যারা অস্পৃশ্য, অপাংক্তেয় থেকে গেছে তাদের নিয়ে বইটির দ্বিতীয় গল্প। গল্পের নাম ‘আহুতি’। ওরা কখনো আল্লাহকে ডেকেছে, কখনো ভগবানকে। সিলিংফ্যানে ঝুলতে থাকা অজ্ঞাতকুলশীল সঙ্গীটিকে ঈর্ষা করেছে। বুক ভরে বাতাস টেনে নিয়ে, সবটুকু আলো কেড়ে নিয়ে নিজের ‘নোংরা শরীর’ এ মেখেছে। তারপর আরো অনেক অনেক তিতিক্ষার পর যেদিন বন্ধ জানালাটা খুলে গেছে, দরজাটাও আর রুদ্ধ থাকেনি, আকাশ উপচে পড়া মুক্ত আলো এসে ডুবিয়ে দিয়েছে সমস্ত কিছু সেদিন ওদের ক্ষতবিক্ষত শরীরেও আনন্দের তীব্রতা এসেছিল। তবু তাদের পরিচয় হয় ‘বেবুশ্যে মাগিরা’ হিসেবে। মুক্তির জন্য অগণিত বীরাঙ্গনা যে অর্ঘ্য রেখে গেছে তার আখ্যানটি পড়তে গিয়ে বারবার ভারাক্রান্ত হয়েছে মন। সন্তাপে, শোকে মুহ্যমান হয়েছি, শ্রদ্ধায় অবনত হয়েছি তাদের আহুতির কথা স্মরণ করে।

শতবর্ষী এক শিরিষ গাছ নিয়ে নানারকম জনশ্রুতি আছে বুজরুক মাহদীপুরে। আর আছে অলৌকিক ঘটনার ইতিহাস যার সাক্ষী পুরো এলাকার মানুষ। পথচারীরা সেসব কাহিনী শুনতে পায় দফাদার দুলাল বাসফোড়ের মুখে মুখে। সে সারাদিন সবাইকে ‘সাবধান! হুঁশিয়ার’ বলে সতর্ক করে বেড়ায়। তারপর একদিন সরকারী আদেশে লোকজন এই গাছটি কাটতে এলে ‘ অশ্রুগাছ’ গল্পটি দানা বাঁধতে শুরু করে। গল্পটিতে জাদুবাস্তবতার আমেজ পেয়েছি । দফাদার দুলাল বলে ওঠে- ‘দ্যাখ দ্যাখ ঐ যে ঐ আসমানে উইড়া যায় নীলকন্ঠ পাখি’। তার চোখে এ পাখি তো পাখি নয় , এ হচ্ছে জমিদার হেমেন্দ্রকুমারের আত্মা! বয়েসী শিরিষের পাকা বেদীতে প্রাণহীন, অদ্ভুত খোলস নিয়ে বসে থাকে এক অদ্ভুত মানব, জমিদারেরই এক বিস্মৃত উত্তরসূরী। গল্পকারের ভাষায়- ‘ক্রমশ লোকটির মাথার ওপরে গাছের পাতায় পাতায় জমা হতে থাকে তরল অন্ধকার। মৃদু হাওয়া বয়। অপস্রিয়মাণ হাওয়ার তালে সবুজে সবুজে দোলা লেগে অবিরাম অশ্রুবিন্দু ঝরতে থাকে। অশ্রুর সঙ্গে মেঘশিরিষের লাল লাল ফুল টুপটাপ ঝরে পড়ে।’ সেই গাছটির আরেক নাম অশ্রুগাছ। এই যে গাছ থেমে ঝরে পড়া অশ্রুজল, নীলকণ্ঠ পাখি, সাতটি চাঁপা আর একটি পারুলের ফিসফাস তা এক অদ্ভুত ধূম্রজালের মতো পাঠকের মনে প্রশ্ন রেখে যায়,ভাবনাকে ধোঁয়াটে করে দেয়।

ডিমেনশিয়ার সেপিয়ায় আক্রান্ত এক বৃদ্ধের স্মৃতি হাতড়ে বেড়ানোর গল্প ‘জয়ন্তর সাদা বল’। পথে পথে ঘুরে তিনি অতীত আর বর্তমানের সাঁকোতে দাঁড়িয়ে সময়ের স্রোতে পরিভ্রমণ করেন। কোন প্রান্ত তার ঠিকানা ছিল, গন্তব্যটা বা কোথায় তাই নিয়ে বিভ্রান্ত হতে থাকেন। পরিচিত কোনো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে শুনতে পান কেউ পাল্লা খুলে দিয়ে বলছে- ‘তোদের বল ঢোকেনি বাগানে।’

থোকা থোকা টগরের সাদা রঙ রোদের আভায় ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। বহু বছর আগের হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি ডুবসাঁতার থেকে মাথা তুলে তাকায়, অলীক আনন্দ হাসি হয়ে ঝরে পড়ে। গল্পের এইসব মেদুর ভাষা, শান্ত বিস্তার পাঠশেষে রেশ রেখে গেছে অনেকটা সময়।

এই বইটিতে আমার অন্যতম প্রিয় গল্প ‘ডুবসাঁতার’। লেখকের মানস ঘরে ভাবনার রোদকে যে শুধু সমান্তরাল নয়, কৌণিকভাবেও প্রবেশ করতে হয় ,প্রথমবার এই গল্পটি পড়ে আমার তাই মনে হয়েছে।

ভালোবাসি কথাটা জীবনে একবারও না বলে সহস্রভাবে অনুভব করা যায়। সময়ের ব্যবধানে সেই অনুভবটুকু নতুন করে কথার ফুলঝুরিতে বাঙময় হয়ে ওঠে না। গল্পকার সুনিপুণভাবে এই উপলব্ধিটুকু পাঠকের হৃদয়ে সঞ্চারিত করেতে পেরেছেন। তিনি লিখেছেন- ‘হাওয়ার খেলায় দুলতে দুলতে মেঘেরা রেখার আদলে বদলে যেতে থাকে। মেঘের সাদা নীল ধূসর পালকগুলো কোনাকুনি জুড়ে গিয়ে আকাশে অদ্ভুত এক অবয়ব তৈরি হয়। শব্দহীন মোনা আপা আর আমি, দু’জনে চুপচাপ বসে সমকোণে নিমগ্ন মেঘ দেখতে থাকি। ‘

হৃদয়ে হৃদয়ে যে সম্পর্ক তার রয়েছে কত শত স্তর আর সেসব স্তরের ঘ্রাণটাও একেক রকম, যার সবগুলো হয়তো এক জীবনে আমাদের পুরোপুরি অনুভব করা হয়ে ওঠে না। এই গল্পটি সেরকম এক ঘ্রাণের উপাখ্যান যা চমৎকার নান্দনিকতার সাথে গল্পকার রচনা করেছেন।

‘গোলাইচাঁদের খাবনামা’ গল্পটি পড়ার সময় বুঝতে পারছিলাম গল্পকার কতটা প্রস্তুতি নিয়ে লেখেন। শব্দচয়নে দারুণ তার দক্ষতা। গল্পের মূল চরিত্র এক রহস্যাবৃত মসজিদের খাদিম গোলাইচাঁদ। সে পরীর স্বপ্নে বিভোর থাকে। পরী মাটিতে নেমে এলে আনন্দে মিশমিশে কালো মুখটি চাঁদের মতো ঝলমল করে৷ পরীর মতো মাকে মনে পড়ে তার। তখন আর এই স্বপ্নটা থাকে না। রাতের আঁধারে হারিয়ে যায় পরীর অমীমাংসিত রহস্য। প্রায়দিনই স্বপ্নটা মিথ্যে হয়ে ওঠে, রাজহাঁসের ডানায় চেপে কেউ আসে না। ‘গোলাইচাঁদের খাবনামা’ গল্পটায় সুররিয়ালিজম এভাবেই জমে উঠেছে।

একদিন অদ্ভুত এক ভোর আসে। বদলিবাথানের বসা মসজিদটি নিয়ে অলৌকিক এক ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় পরীর স্বপ্নে বিভোর গোলাইচাঁদের আমলনামাকে দায়ী করে স্থানীয় মানুষ। তবে খুব দ্রুতই অভিযোগটি আরোপিত হয় অন্য কারো উপর। আর এভাবে কাহিনীর বিস্তার ক্রমশ সমসাময়িক কালের সাথে দারুণভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। গল্পটি পড়তে গিয়ে বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করেছি গল্পকার শুধু শব্দের জাল বুনে যাননি, বেশ মুন্সিয়ানার সঙ্গে কাহিনীকে গ্রোথিত করেছেন সময় এবং পারিপার্শ্বিকতার সাথে।

‘অপরাধ কী? পাপই বা কী? সব অপরাধ কি পাপ? সব পাপ কি অপরাধ? প্রশ্নগুলো পরস্পরের সঙ্গে এত নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকে যে এদের উত্তর পাওয়া মুশকিল হয়।’ গভীর তাৎপর্যপূর্ণ এই কথাগুলো বইটির শিরোনাম গল্প ‘মেনকি ফান্দার অপরাধ কিংবা পাপ’ থেকে উদ্ধৃত। একটি মৃত হাতি আর তার চুরি হয়ে যাওয়া দাঁতকে ঘিরে এই গল্পের কাহিনী আবর্তিত হয়েছে। প্রকৃত অপরাধীর খোঁজে যখন সবাই ব্যতিব্যস্ত তখন গল্পের প্রতিটি চরিত্র যার যার গোপন পাপ আর অপরাধের ব্যবচ্ছেদও করতে বসেছে মনে মনে। মৃত হাতি নিয়ে কাহিনীর সূত্রপাত হলেও পাপ আর অপরাধ নিয়ে এই যে দ্বিধা বা প্রশ্নের অবতারণা, গভীর ভাবনার উদ্রেক এটিই গল্পের মূল উদ্দেশ্য। এমন একটি গল্পের রচয়িতা তার স্বকীয়তায়, মেধায় সমসাময়িক কালের সাহিত্যজগতে শক্তিশালী একটি অবস্থানে আসীন হবে বলে সহজেই অনুমান করা যায়।

মোট সতেরোটি গল্প রয়েছে এই সংকলনে। গল্পগুলোর বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য উল্লেখ করবার মতোন। ‘নিহতস্বপ্নের শেষে’, ‘সাং বেতুয়ান’ এর মতো ধর্মীয় ভেদাভেদ নিয়ে গল্প আছে এতে। ‘একটি বেমানান পাখি’ প্রতি বছর পত্রিকায় শিরোনাম হয়ে প্রকাশিত হয়। ‘সুখ ও প্রাপ্তি বিষয়ক’ এর মতো গল্পে আছে জীবনে প্রত্যাশা আর প্রাপ্তি কত ভিন্ন ভিন্ন রং ধারণ করে মানুষের বোধকে আক্রান্ত করতে পারে। বইটিতে দু’য়েকটি গল্পে চরিত্রের আধিক্য মনোযোগ ব্যাহত করেছে এবং বর্ণনা আরো কিছু কম হলে হয়তো গল্পগুলো নির্মেদ হতে পারতো। ‘সো হোয়াট’ এবং ‘মাটি’ গল্প দু’টো অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী বলে মনে হলেও এই দু’টোর মধ্যেও লেখক তার বার্তা রেখে গেছেন।

কথাশিল্পী সাদিয়া সুলতানার চমৎকার একটি গদ্য ভঙ্গি আছে যা তার একান্ত নিজস্ব। আর আছে জীবন ও মানুষকে নানান আঙ্গিক থেকে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করার প্রখর দৃষ্টি। ‘মেনকি ফান্দার অপরাধ কিংবা পাপ’ গ্রন্থটির পাঠ শেষে পাঠকের এটুকু উপলব্ধি হবে। এই বইটি লেখকের চতুর্থ গল্পগ্রন্থ। প্রকাশ করেছে চৈতন্য প্রকাশনী এবং চমৎকার প্রচ্ছদটির শিল্পী নির্ঝর নৈঃশব্দ্য।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত